শ্রেষ্ঠ নয় সমগ্রের খোঁজে

।। কবিতা আশ্রম পরিবারে সকলকে স্বাগত।।"কবিতা আশ্রম একটি গুরুত্বপূর্ণ পত্রিকা। এই পত্রিকা থেকে তরুণদের কবিতা আর কবিতা-ভাবনা কোন পথে চলেছে তার এক রকমের চিহ্ন পাওয়া যায়।"--কবি জয় গোস্বামী ।। "তথাকথিত শিবিরের ধারণাকে ধ্বংস করে দিয়ে কবিতা আশ্রম এই সময়ের বাংলা কবিতার প্রচ্ছদ হয়ে উঠেছে। নানা মাত্রার , মার্গের , স্রোতের , ঘরানার এমন নিরভিমান উদযাপনের শরিক না হয়ে কেউ পারবেন না , এটা আমার বিশ্বাস ।"--সুমন গুণ ।। "কবিতা আশ্রম চমৎকার ম্যাগাজিন ।কখনও লিখিনি , এবার লিখতে পেরে ভালো লাগছে"--কবি মৃদুল দাশগুপ্ত।।"আমি কবিতা আশ্রম পত্রিকা পাই এবং আগ্রহ দিয়ে পড়ি । যে সকল কবিতা ও গদ্য প্রকাশিত হয় সে-সবই অত্যন্ত ভালো লেখা এবং সু-সম্পাদিত,যা আমার খুবই ভালো লাগে । এছাড়াও কবিতা আশ্রম পত্রিকাকে কেন্দ্র করে বেশ কিছু তরুণ কবি ও গদ্যকার আগামীর জন্যে তৈরী হয়ে উঠছে । তরুণ কবি ও গদ্যকার-দের প্রশয় দেওয়ার ক্ষেত্রে কবিতা আশ্রম পত্রিকাটি খুবই উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রেখেছে ।"--কবি দেবদাস আচার্য।।"প্রকৃত কবিতাকে জহুরির চোখে খুঁজে আনছে কবিতা আশ্রম। প্রচারের আড়ালে থাকা তরুণ কবি প্রতিভাকে পাঠকের সামনে নিয়ে আসার এই প্রয়াসকে কুর্নিশ জানাই ।"--কবি অঞ্জলি দাশ।।"দূরে গেলে কিছু জিনিস আবছা দেখায় । আরও দূরে গেলে কিছু জিনিস স্পস্ট হয়ে ওঠে । কবিতা আশ্রমকে আমি স্পস্ট দেখতে পাচ্ছি। যেভাবে আত্মত্যাগের মধ্যে দিয়ে মাথা তুলে কাগজটিকে ক্রমশ আইকনিক তুলছে সেটা একটা দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে ।"--কবি সুবোধ সরকার।। “কবিতা আশ্রম প্রকৃত অর্থেই বাংলা কবিতার লাইট হাউস ।তরুণ কবিদের খোঁজে আমি তাই প্রতিটি সংখ্যা পড়ি”।–রাহুল পুরকায়স্থ ।।“অচেনা নতুন কবিদের দিকে এখন তাকিয়ে থাকি।‘কবিতা আশ্রম’ এই সব কবিকে সামনে নিয়ে আসছে।এ একটা প্রশংসনীয় উদ্যোগ। এই জাতীয় উদ্যোগ বাংলা কবিতার ক্ষেত্রটিকে প্রসারিত করছে”।–কবি কালীকৃষ্ণ গুহ ।।“কবিতা আশ্রম আমার প্রিয় পত্রিকা । পড়ে এবং লিখে তৃপ্তি পাই। সারা বাংলার তরুণদের খুঁজে আনছে কবিতা আশ্রম”।–কবি সমর রায়চৌধুরী ।। "সব চেয়ে ভালবাসি নিজেকে কারণ সে লোকটার ভেতরে কবিতার আবাস । সেই নিজেকে দেখার জন্যে এক টুকরো আয়না খুঁজছিলাম বহুদিন । কোথাও পাইনি । কে জানতো একটি আশ্রমের ভেতর সেই টুকরোটুকু আমার জন্য অপেক্ষা করছে।"--দিশারী মুখোপাধ্যায় ।।

ধারাবাহিক

লোহার

মণিশঙ্কর

 

অনুকথা

(এগারো)

এখনই যে এভাবে বর্ষা শুরু হবে তা কেউ ভাবেনি। গতরাত থেকেই মেঘের হাঁকডাক শুরু। আর কাকভোর থেকে অঝোর। ফলত লোহারপাড়াটা গৃহপালিত শুয়োর-মুরগীর সঙ্গে খোঁয়াড়বন্দি। এখন, এই সন্ধ্যার গোড়ায় এসে টান পড়েছে অঝোরে। তবে নুনগুড়ির বিরাম নেই। তার সঙ্গে মিশেছে একটা মেছো বকের একটানা সুর– জল দে মাছ খাবো, জল দে মাছ খাব। এসুর পোয়াতি মেঘের ভারকে বাড়িয়ে দিচ্ছে বেশ কয়েকগুন। তারমধ্যে কয়েকটা চড়ুই চালসাঙার বাসা ছেড়ে নেমেছে উঠোনে। চিড়িক-চাড়িক করে খাবার খুঁটছে। গরবি মাথার উপর কাপড়ের খুটটা তুলে দিয়ে উঠোনের একধারে এসে দাঁড়াল। খুলে দিল মুরগীখোঁয়াড়টার মুখ। অমনি গোটাপাঁচেক ছোটোবড়ো মুরগী আর দু’টো মোরগ কুঁককুঁক করতে করতে বেরিয়ে এল। একটা মোরগ ডানা ঝাপটে আড়মোড়ার ভাঙল। সঙ্গে গলা ফুলিয়ে ছাড়ল ডাক– কুঁক-কুঁক-কুঁকড়ুচ্চু।

একভাবে ডেকে উঠল অন্য মোরগটাও। সঙ্গে সঙ্গে সাড়া দিল সারাপাড়া। মুখর হয়ে উঠল চারিদিক। গরবি কিছু ধান ছড়িয়ে দিল ভিজে উঠোনে। ডাকল, “আয়-আয়, খা। চাট্টি খাঁইয়ে ল্যা দেখি। আজ সুকাল থাকে ত একটি দানাও যায় নাই তুদের মুয়ে।” জনককে বলল, “হ্যাঁ গ, বরাগুলাকেঅ একটুকুন খুলে দুব নাকি?”

জনক দাওয়ায় বসে আছে। চুপচাপ। আনমনে তাকিয়ে আছে ভিজে উঠোনটার দিকে। মুখে তার অদ্ভুত প্রশান্তি ছিড়িয়ে। তাই মৃদুগলায় বলল, “নাঃ, ই সঞ্ঝ্যাবেলাতে আর উয়াদেরকে ছাইড়ে কী করবি! রাতে মাড়েভাতে ধরে দিলেই হবেক্।”

তারপর আবার আচ্ছন্নের মতো ডুবে গেল নিজের ভাবনায়। আজ আষাঢ় মাসের পাঁচ। আর দু’দিন পরেই অম্বুবাচী। লোহাররা বলে আম্বাবতী। তার বাপের আমল পর্যন্তও এই দিনটা ছিল তাদের কাছে এক বিরাট পরবের দিন– আষাঢ়ি পরব। পয়লা আষাঢ় থেকেই পাড়ায় শুরু হয়ে যেত তার প্রস্তুতির ব্যস্ততা। বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠমাস গলার জমিতে গরুর গাড়িভর্তি গোবরসার চালানো আর বীজতলা জতরানোতে ব্যস্ত থাকত সকলেই। তারপর রোহিণীর দিনে ছড়াত বীজ।

রোহিণীর কথা মনে উঁকি দিতেই তার বাপের কথা মনে পড়ল জনকের। যেমনটা ইদানীং হয়। সকলের অজান্তে। চাষবাসের এমন অভিজ্ঞতা ক’জনের থাকে! গ্রীষ্মকালে আকাশের রঙ দেখে বলে দিতে পারত সেবছর বর্ষার বাত কেমন হবে। আর জ্যৈষ্ঠমাসের বারো তারিখ এলেই সুর ক’রে ছড়াকাটত,

“রোহিণীর বিচেতে(বীজে) লোকে খায় দুধেভাতে

ম্যাঘের বাতে লাগালে বীচ হয় ঘাসেপাতে

আর ডাহাতে বীচ লাগালে ভাই হয় রে হায় হায়

চাষীর ত্খন মাথায় হাত কী করবেক্ তায়।”

কিন্তু এখন আর চাষীদের কাছে এসবের কোনও অর্থ নেই। রোহিণীতে বীজ ছড়ানোর ঝুঁকি কেউ নেয় না। বর্ষা নামলে ধান ভিজিয়ে অঙ্কুরিত বীজ আছাড়ে দেয় কাদাভরা বীজতলায়। জমিতে উগল-পাখনা দিয়ে ঘাসপাত বা মাটিকেও পচাচ্ছে না কেউ। একদিনে ঘেঁটেঘুটে পুতে দিচ্ছে ধানের গুছি। তারপর দমেমস্ত ইউরিয়া-ডিওপি। অমনি আষাঢ়ি মেঘের মতো দু’দিনেই হেরিয়ে আসছে ধানের গোছা। কিন্তু জনক ঠিক করেছে অত খরচ সে করবে না। সেকথা বলেও দিয়েছে নিমাই মড়লকে, “দ্যাখ মড়ল, চাষ কইত্তে বলচ বটে। কিন্তুক্ আমি আমার পারা কইরে চাষ করব। তখন কিছু বইলতে পাবে নাই কিন্তুক্।”

নিমাই মড়ল বুঝতে পারেনি জনকের কথা। সংশয় প্রকাশ করে বলেছিল, “তুর পারা কইরে মানে? তুঁই আবার লোতুন কইরে জমি জতরাবি নাকি রে ব?”

“না, লোতুন কইরে ক্যানে হবেক্! যেমন কইরে বাপ-ঠাকুদ্দাদারা করিচে তেমন করেই করব। উগলাব, পাখনা দুব, তাবাদে যাঁইয়ে ক্ষেত কাদাইঁয়ে গুছি পুতব। তাগাদা দিলে কিন্তুক্ আমার দ্বারা হবেক্ নাই। আগেভাগেই বইলে রাখচি।”

“হঁ রে ব, হঁ। আমরাও সেসোব জানি। কিন্তুক্ চাষারা কি আর সাদে উসোব করে নাই ভাবিস্! তু শালা ছুটুলোকদের যা মিজাজ হঁইচে! হুঁ-কত্তেই ত ইস্টাইক ডাকে বসিস্। দায়ে পড়েই উসোব বাদ দিতে হঁইচে। ত, তুঁই যখন সেসোব কইত্তে খুঁজচিস তখন ত স্যা ভাল কথাই বটে রে ব। মাটি ত আর শুদু মাটিই লয় রে! মা-টিঅ বটে। ত তাখে যতন-আত্তি না কইল্লে চলবেক্ ক্যানে! শুদুমুদু আমি তুর পঁদে তাড়া মাইতে যাব কি লাইচতে!”

জনক কিন্তু আসল কথাটা চেপে গিয়েছিল। রাতের স্বপ্নের কথা শুধু নিমাই মড়ল কেন, গরবিকেও বলেনি। কিন্তু মন তো কেঁদেছে। দেউয়ী বলে কথা! সে যদি স্বপ্নে এসে এমন হাউমাউ করে কাঁদে তাহলে মানুষের দেহ ধরে নিজেকে ঠিক রাখে কেমন করে! আর ওই ক্ষতবিক্ষত স্তনজোড়া! ভেদকিফোটা যোনি– সে-ও তো দেউয়ীরই। সেসব দেখিয়েই তো দেউয়ী কেঁদে বলেছিল, “হ্যাঁ রে জনকা, তুর বাপ ত নাইলে আমাকে ভুলে দিন বদলানতে মাতলেক্। আর তুঁই! তুঁই থাকতেও আমার অমন দশা হবেক্ বাপ্! দেউ নাইলে তুদেরকে লিজের রাজ্য থাকে খেদেই দিঁইচে, তাই বলে কি আমি কখনু তুদেরকে লিজের ছাঁয়ের থাকে কিছু কম করিচি?”

জনক বুঝতে পারেনি দেউয়ীর ইঙ্গিত। ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বলেছিল, “ক্যানে মা, আমি কী করিচি?”

“না, তুঁই আর কী করবি বাপ্! করিচে আমার কুপালে! কিন্তুক্ উ জমিজিরাত যে আমার যোনিই বটে রে, ইকুথা ক্যামন কইরে ভুলে গেলি বল দেখি?”

“ভুলি নাই মা, একদিনকেও ভুলি নাই। কিন্তুক্–”

“কিন্তুক্ আবার কী বটে রে? কিন্তুক্ আবার কী বটে, আঁ! উ বিষ দিঁইয়ে আমার গুটা গতরকে যে ভেদকিফুটা কইরে দিলি বাপ্! আমি যে আর উ বিষের জ্বলন সইতে লাচ্চি রে!”

“বিষ! ই তুমি কী বইলচ গ মা!”

“ঠিকেই বলচি বাপ্! বিষ ছাড়া উ আর কী বটে। ফলন ফলন কইরেই মল্লি। কিন্তুক্ উয়াতে যে আমার কী হছে তা একটি বারের লাগে ভাবলি নাই বাপ্!”

“তা লিঁইয়ে আমরা কী করব, তুমিয়েই বল ক্যানে! জমিজিরাত কি আর আমাদের রইচে গ! যাদের চাষ তারা যদি হড়হড়াঁইয়ে ঢালে উসোব ত আমাদের আর কী করার থাকে! কামিন-মুনিস ছাড়া ত আর কিছুয়েই লই!”

“না, লোস্। তবু তুরাই ত ঢালিস্! হ্যাঁ রে, তুদের অত অভর প্যাট! মায়ের দেহিকে অমন কইরে বিষের জ্বালায় জ্বলাতে আছে রে বাপ্! এক কালকূট গলায় ধরিছিলেক্ দেউ। ত তার জ্বলনকেও হার মানায় ছিলেক্ আমার বুকের দুধ। আর ই বিষ যে তার থাকেও জ্বালা ধরানঅ বটে রে! আমাকে তুঁই বাঁচা বাপ্ আমার। আমাকে তুঁই বাঁচা। আমি তুখে দু’হাত ভরে ধান দুব রে।”

হাউমাউ করে কেঁদে ফেলেছিল দেউয়ী। আর তখনই তড়াক করে ঘুম ভেঙে গিয়েছিল জনকের। প্রথমটা ধাঁদুমাদু লেগেছিল তার। কিছুই বুঝতে পারেনি। তারপরই শুনতে পেয়েছিল, কে যেন ডুকরে কাঁদছে। তাদের উঠোনেই তো! জনক বিছানা ছেড়ে বেরিয়েছিল বাইরে। কিন্তু রাতের আঁধারচিরে জোনাকির আঁকিবুকি ছাড়া আর কিছু দেখতে পায়নি। ডুকরানো কান্না ছাড়া শুনতেও পায়নি কিছু। এমনকি রাতচোরা পাখির বুককাঁপানো কুব শব্দটাও থমকে ছিল শ্যামপুকুরের পারে।

সে রাতের পর থেকে জনক যেখানেই যাচ্ছে সেখানেই নেপথ্য আবহের মতো শুনতে পাচ্ছে ওই মুখচাপা কান্না। ওই হায় হায়, আর আবছায়ায় দেখতে পাচ্ছে, ভেদকিফুটা একটা নারীদেহ। কিন্তু স্বপ্নে শোনা সে কান্না কাউকে বলতে পারেনি। যেমন বলতে পারেনি নিমাই মোড়লকেও। শুধু নিজের সিদ্ধান্ত জানিয়ে ফিরেছিল ঘরে।

বলেছিল বটে, সঙ্গে চিন্তাও বেড়েছিল। ওভাবে চাষ করতে গেলে যে সময় লাগবে তাতে লেবারে পোষাবে না। তাছাড়া ওসব বিষ না দিলে কী আর ফলন হবে! গোবরকুড় তো ফাঁকা। আগের পারা না আছে গাইগরু আর না আছে তাদের গোবর। তবু এই ক’দিনে জনক আর গরবি শূন্য মাঠে মাঠে গোবর কুড়িয়েছে। কিন্তু তা কতটুকুই বা! তাই ভেবেছে এ বছরটা অন্তত ও বিষ ঢালতেই হবে মাঠে। তাতে দেউয়ী স্বপ্নে এসে যতই তাকে জ্বালাক না কেন!

যদিও এসব ভাবনা সবসময় জনককে অস্থির করে রাখছে। তবে তা তাকে ততখানি জব্দ করতে পারেনি। সব থেকে বেশি কাবু করেছে পঞ্চায়েতের খবরটা। কানাঘুষায় সে যা শুনেছে তাতে চিন্তার কথাই। ভেতরে ভেতরে নাকি সকলকে তার সঙ্গে চাষ করতে মানা করেছে সুভাষ মান। তাতে কেলিয়াও খানিকটা আশ্বাস পেয়েছে। যদিও জনকের বিশ্বাস তার কথা পাড়ার লোক কেউ ফেলে দেবে না। বিপদে-আপদে সে তো তাদের পাশে সবসময় থেকেছে। তাহলে!

এই তাহলেতে এসে জনক থমকে দিল তার ভাবনার গতি। দাওয়া থেকে নেমে দাঁড়াল। চলে এল কারু লোহারের ঘরের সামনে। হাঁক পাড়ল, “কারু ঘরে রইচিস রে?”

“হঁ-হঁ, ক্যা বটিস? জনকা না ক্যা রে?”

“হঁ, আমিয়েই বটি। একটুকুন বেরাঁইয়ে আয় ক্যানে! তুর সঙে দু’টা কথা ছিলেক্।”

বেরিয়ে এল কারু। বলল, “বল, কী বলবি?”

প্রথম জিজ্ঞাসাতেই খটকা লাগল জনকের। ঘরের দাওয়ায় ডাকা নেই। বসতে বলা নেই। সরাসরি কারণ জানতে চাওয়া! তাও এমন গলায়! এমনটা তো হওয়ার কথা নয়! তবে কি! জনক মনে মনে নিজেকে প্রস্তুত করল আসল ধাক্কাটা খাওয়ার। বলল, “তুরা ত সোবেই শুনেচিস। ইবছর নিমাই মড়লের আইদরি চাষটা আমিয়েই লিলম।”

“হঁ। স্যা শুনেচি বৈকি!”

“ত, তুরা সোব খাটবি ত আমার সঙে?”

“বাকিদের কথা বাকিরা লিজরাই বইলবেক্, আমি ত আর সুবায়ের ঠিকা লিঁইয়ে বইসে নাই! তবে আমি তুর সঙে খাইটতে লাইরব, ইকুথা সাফ জানাই দিলম। আমি গতান্যাতে ঢুকে গেইচি।”

“ক্যানে? লারবি ক্যানে? অতদিন ত নিমাই মড়লের ক্ষেতেই মুনিস খাটে আসেচিস! থালে ই বছর কী হলেক রে ব?” ভ্রূ-কুঁচকে জানতে চাইল জনক। কারু প্রশ্ন এড়িয়ে গিয়ে বলল, “শুন্ জনকা, অ্যাত জবাব তুখে আমি দিতে লাইরব। তবে জানতে খুঁজলি তাথেই কথাটা তুখে জানাই দিলম। পরে আবার আমাকে ক্যানে দোষ দিস! তার থাকে আগেভাগে বলে দিয়াই ভাল।”

“সে নাইলে ভাল। কিন্তুক্ আজকে আমার বেলায় না বলে দিলি! ক্যানে? আমি কি তুরদেরকে কেলিয়ার থাকে কিছু কম দুব? ইটা ত ভাল কথা লয় ব!”

“ক্যানে, ভাল লয়টা ক্যানে শুনি? তুঁই যা করবি তা সোবেই ভাল, আর আমরা কিছু কইল্লে পদেই সেইট্যা খারাপ বটে! তুঁই আমাদের কাখে মাইনেচিস, য্যা আজকে তুর মানের কুথা বইলতে আইচিস?”

স্পষ্টতই অসন্তোষের ইঙ্গিত পেল জনক। অমনি দুম করে জ্বলে উঠল তার মাথা। হেঁকে উঠল সে-ও, “ব্যাশ, করিস নাই কাজ। তুঁই ইকা কাজ না কইল্লে আমার চাষের গুছি উঠবেক্ নাই, স্যাকথা ভাবিস নাই।”

“হঁ-হঁ, আমরাও দেখে লুব কী কইরে চাষ করিস তুঁই। শালা জাতভাইয়ের প্যাটে লাত মাইত্তে তুর একফঁটা মনে বাজে নাই! শুধু আমি ক্যানে গুটা নুয়ারপাড়ায় কেউ মুত্তে যাবেক নাই তুর ক্ষ্যাতে। ই কথাটা ভাল কইরে শুনে রাখ।”

এর উত্তরে জনক আর কিছু বলল না। বোঁ করে ঘুরে চলে এল কারুর উঠোন ছেড়ে। দাঁড়াল গুইরামের বাদাড়গোড়ায়। হাঁক দিল, “দাদা রইচিস্ রে? অ্যা দাদা!”

“হঁ রে! ক্যানে, কী হঁইচে কী?”

“একবার আমার ঘরকে আয় ত। আর শুন বড়কিকেও লিঁইয়ে আয়। আমি বালি বৌকেও আসতে বলচি।”

“ইবাবা! বিপারটা কী বটে সেইট্যা বলবি ত আগে!”

“তুঁই আয় না ঘরকে। তাবাদে বলচি সোব।”

আর দাঁড়াল না জনক। একেবারে বালিকে ডাক দিয়ে ফিরে এল ঘরে। বসল দাওয়ায়। তার দুমদাম পা ফেলায় ভিড়কে গেল চড়ুইগুলো। ফুড়ুৎ-ফাড়ুৎ করে উড়ে গেল চালসাঙার বাসার দিকে। গরবি ভ্রূ-কুঁচকে বলল, “কী হলেক্ গ আবার? অমন কইরে–”

কিন্তু তার জিজ্ঞাসা শেষ হওয়ার সুযোগ পেল না। তার আগেই গুইরাম আর পার্বতী এসে দাঁড়াল জনকের সামনে। গুইরাম বলল, “বল, কী বলবি?”

এল বালিও। জনক সকলকে বলল, “দাওয়াতে উঠে আয়।”

সকলেই দেখল আকাশের জলভরা মেঘ থমথম করছে জনকের মুখের রেখায়। তবু দাওয়ায় বসল একে একে। জনক বলল, “তুরা সুবাই ত জানিস্, মড়লের চাষটা আমিই লিঁইচি। অখন তুরা বল, আমার সঙে মাঠে নামবি? না সোব গতান্যাতেই জেবন কালি করবি?”

“তুর সঙে মাঠে নামব আবার কী রে? আমরা যে বাউনকত্তাদিগকে গতান্যা–”

“হঁ-হঁ, স্যা আমিঅ জানি। উ লিঁইয়ে তুখে ভাবতে হবেক্ নাই। গতান্যা থাকে জনম লেখে দিস্ নাই তুঁই উয়াদেরকে। আর আমি তুদেরকে কামিন-মুনিস খাটতেও বলি নাই। ঘরের সুবাই মেলে চাষ করব। ভাগ যা পাব, তা সুবাই সুমন ভাগাভাগি কইরে লুব। ইবারে বল, কী বলচিস্?”

“দ্যাখ ছুটুকত্তা, আমি কনকালেই গতান্যা খাটি নাই।” আগবাড়িয়ে বালিই মুখ খুলল। বলল, “য্যা ডাকে, তার মাঠকেই ছুটি। থালে তাদের মাঠ আর তুমার মাঠ। আমার কাছে একেই হলেক্।”

জনক বলল, “থালে তুঁই থাকচিস্ আমার সঙে! আর গুইয়াদাদা? তুরা কী করবি?”

“সেই ত রে ব! ই য মহা আতন্তরে ফেল্লি। এখ্যানবুড়িকে সাক্ষিমানে বাউনকত্তাকে কুথা দিঁইচি–”

“কুথা দিঁইচি ত কী হঁইচে।” খেঁকিয়ে উঠল পার্বতী। বলল, “ছুটুকত্তা ত কিছু মন্দ বলে নাই। আর কেউ হলে আঁকাড় কইরে লিজের হাতেই রাখথক্ চাষ। আর উ যাচে আমাদেরকে ঢুকাতে খুঁজচে। শুন, ছুটুকত্তা, তুমার দাদাতে যা বইলচে বলুক্ ক্যানে, আমি তুমার সঙেই নামব মাঠে।”

“ই ত শালা আচ্ছা ঝঞ্ঝাটে পড়া গেলেক্! অ্যাখন ঘর রাখি না বার রাখি! ত, হ্যাঁ রে, বলি, মড়লের মাঠে আগে যারা ছিলেক্ তারা কী বইলচে?”

“তারাতে কী বইলচে না বইলচে, স্যা লিঁইয়ে তুখে মাথা ঘামাতে হবেক্ নাই। তুঁই আপনার তুরটা বল।” মুখের রেখারা এঁকেবেঁকে উঠল জনকের। গুইরাম তবুও কোনও সিদ্ধান্ত জানাতে পারল না। জনকই বলল, “ব্যাশ, তুখে এখনেই কিছু বলার দুরকার নাই। দু’দিন ভাবে ল্যা। তাবাদে আমাকে বলবি। অ্যাখন যা। আমার আর ভাললাগে নাই চাঁদি!”

আর কথা বাড়াতে দিল না জনক। কথা বাড়াল না বাকিরাও। একে একে উঠে গেল সেখান থেকে। গরবি জনকের কাছে এসে বলল, “কী হঁইচে বল দেখি? অ্যাখনেই কত ভাল ছিলে আবার এখনেই–”

অমনি জনকের কানে ভেসে এল আদ্যিকালের কান্না– চাষ চাষ কর দেউয়ী চাষ বড় জঞ্জাল… দুমড়েমুচড়ে গেল তার মুখের রেখারা। চোখ তুলে চাইল গরবির দিকে। গরবি দেখল, রাঙাজবার মতো লাল হয়ে উঠেছে চোখজোড়া। অমনি তার নিজের বুকটা টনটন করে এল। জনক বিড়বিড় করল, “শালারা সোব এক হঁইচে! এক হঁইচে জনকা নুয়ার বিরুদ্ধে! আমিঅ জনকা নুয়ার, কালিন্দী নুয়ারের ব্যাটা। জান দুব তবু মান দুব নাই। ই জঞ্জালে যদি আমিঅ সুনা ফলাঁই না দেখাঁইচি ত আমি একবাপের ব্যাটা লই। শালারা পাটি মারাচ্চে। হুঃ, পাটি!”

গরবি বুঝল সবই। তাই আর কথা বাড়াল না। কথা বাড়াল না জনকও। পুঁটিকে নিজের দিকে টেনে নিয়ে তাকাল আকাশটার দিকে। দেখল, সারা আকশে জলভরা মেঘ ধীরে ধীরে লাল হয়ে উঠছে। সেই লালের ঘনত্ব ফুঁড়ে ভেসে উঠছে একটা মুখ। তার ঢেউ খেলানো ঝাঁকড়া চুল ছড়িয়ে পড়ছে আকাশজুড়ে। তবু ঢাকা দিতে পারছে না লালের বন্যা। জনক মনে মনে বিড়বিড় করল, “বাপ্ হ্যা, আমিঅ জানি, ই শালার জঞ্জালেই বটে। তবু ইয়াকে না যোতলে ই প্যাটের খুল্যা যে মানবেক্ নাই বাপ্! আজ থাকে তুর লাল আর আমার লাল আলেদা করে দিলম বাপ্। জমি আমি জতরাবোই।”

কিন্তু তার মনের এসব খবর গরবি পেল না। কোনও সান্ত্বনাও দিতে পারল না জনককে। শুধু এই আষাঢ়ি মেঘের মতোই ভারী হয়ে এল তার চোখজোড়া। হঠাৎ জনক বলল, “ছুটুবৌ, আম্বাবতীর আর মাত্তর দু’দিন রইচে। আর ত ঘরে হেঁড়্যা পাতা যাবেক্ নাই। স্যা নাইলে আমি সাঁওতাল পাড়াতে যাঁইয়ে লিঁইয়ে আসব। তুঁই বাকি জুগাড়জান্তি কর। আমি আম্বাবতীর দিনকে আষাঢ়িতে বাবা কালকুদরার থানে হাল-ফালের পূজা দুব। রাতজাগাব বাবাকে। মাটিমু করাব কদালকে। তবে নামব মাঠে। দেখি ক্যা বড় হয়– দেউয়ের শাপ-শাপান্তি, না আমার বাপ-ঠাকুদ্দাদার পাথরগলান রক্ত– পাটির পঁদধরা হারামিগুলান, না বাবা কালকুদরার বর!”

জনকের সব কথা যে গরবি বুঝল এমনটা নয়। তবু বলল, “বাবা কালকুদরার পূজা ত আর এমনি এমনি হবেক্ নাই। বরা বলি দিতে হবেক্। তাবাদে ধর ক্যানে, আমাদের কেউয়েই ত আর উয়ার পূজা করে নাই গ। দিঁইয়ে পদে যদি ই লিঁইয়েও কোনু গোল বাঁদে পাড়াতে?”

“বাঁদাক গোল। আমি নুয়ারের বাচ্চা নুয়ার। আর কেউ লই, লই আমি আর কেউ। আমার জাতে পাথর গলাঁই লুয়া বার করেছিলেক্। আর তাদের রক্ত হঁইয়ে লিজেকে বিকাঁই দুব হাঁ সুভাষ মানের পঁদে! পাটির পঁদে! কিছুতেই লয়। ই আমার জাতধম্ম বটে। হঁ-হঁ, বটে আমার জাতধম্ম। আমি বরাও বলি দুব আর গায়েন গাঁইয়ে রাতঅ জাগাব বাবাকে। দেখি কন শালা আমার কীট্যা কইরে ল্যায়!”

জেদ চাগাড় দিল জনকের মাথায়। চোখজোড়া কুচলাফলের মতো রাঙা হয়ে উঠল। সারাশরীরের রক্ত বনবন করে ছুটতে লাগল মাথার দিকে। তারই দপদপ শব্দে জনকের কানে জেগে উঠল শয়ে শয়ে পা ফেলার শব্দ। তেড়ে আসা হৈ-হৈ রৈ-রৈ। দুমদাম লাঠির শব্দ আর একটা লোকের আর্তনাদ। সেই সঙ্গে মিলিত শ্লোগান– বন্দে-মা-ত-রম– ইন-ক্যা-লাপ  জিন্দা-বা-দ!

জনক মনে মনে আবার বিড়বিড় করল, “বাপ্! পাশে থাকিস্ বাপ্! আমি তুর নাম ডুবাব নাই। তবে আজ থাকে রাস্তা আলেদা। তুর রাস্তা তুর আর আমার রাস্তা আমার।”

অমনি আকাশ চিরে দিল নীলচে ঝিলিকে। ধামসার বোলের মতো গুড়গুড় করে উঠল মেঘ। কারা যেন ফূর্তিতে নেচে উঠল সারা আকাশজুড়ে। অট্টহাসির সঙ্গে গেয়ে উঠল– “চাষ চাষ করিস্ দেউয়ী চাষ বড় জঞ্জাল…”

হঠাৎ মেঘবতী সন্ধ্যাটা আবার জমাট বেঁধে এল। এমন সময় সাগরা তার বেঢপ শরীর নিয়ে নাচতে নাচতে উঠোনে ঢুকল। সঙ্গে হেঁড়ে গলায় হাঁকল পাল্লার গান,

“বলে সাঙাত আমার লোক ভাল

এমন মনে

তার এমন ক্যা দাগা দিল

মাইরি এমন মনে…

হে-হে-হে– কী হইলেক হ্যা সাঙাত? মু’খ্যানা অমন হাঁড়িপানা কইরে বইসে রইচে ক্যানে? আস-আস। দু’সাঙ্গাতে একটুকুন ভিজে লিই।”

তার চিৎকারে ছিঁড়ে গেল জনকের ভাবনার তার। ফিকে হয়ে এল চোখের সামনের অন্ধকার। তার বদলে গরবিই বলল, “অ্যাঃ, সাগর সাঙাত, ই পুয়ানি বাদলানিতে অমন কইরে ভিজ নাই হ্যা। শরীলখারাপ ধরাবে নাকি?”

“হে-হে-হে– ইটা ত তুমার ঠিক কথা হলেক্ নাই সাঙাতান, ইটা তুমার ঠিক কথা হলেক্ নাই গ। অমন বাদলানিতে মন পানাবেক্ নাই ত আর কখন পানাবেক্? আস-আস ত, তুমিঅ একটুকুন ভিজে লিবে আমার সঙে।”

তারপর আবার গাইল,

“বলে ই লিশা লয় স্যা লিশা

নিদয় মাজে

নিদয় মাজে বাজিচে ধামসা হ্যা

আমার নিদয় মাঝে…”

ঘুরেফিরে নাচতে লাগল সাগরা। নাচ থামিয়ে হাঁকল, “জয় বাবা কালভৈরব, জয় বাবা বোঙা ঠাকুর, বাবা কালকুদরা হ্যা– জয় মা মনসা–”

ফুর্তির তোড়ে সাগরা সব ঠাকুরের নামে জয়ধ্বনি দিতে শুরু করল। হঠাৎ বংশী লাফিয়ে দাওয়া থেকে উঠোনে নামল। দৌড় লাগাল বাইরের দিকে। দাওয়ার এককোনা থেকে ভাবি ঘড়ঘড়ে গলায় চেঁচিয়ে উঠল, “বলি অ্যা ছঁড়া, ই ভরসঞ্ঝ্যা বেলায় তুঁই আবার কুথাকে বেরালি। বলি হ্যাঁ-লো গরবি, কুথাকে গেলেক্ ছঁড়া?”

“আমি কী কইরে জানব! সারাদিনটি আজ বাঁদাগরুর পারা থাইকতে হঁইয়েচে ঘরে। অ্যাখন কি আর সে বাগ মানবেক্!”

থমথমে মুখে চুপ করে গেল গরবি। চুপ করে থাকল জনকও। তার পাশে বসে পুঁটি তারই গামছার খুটটা নিয়ে নাড়াচাড়া করতে লাগল। সাগরাও নাচ থামিয়ে উঠে এল দাওয়ায়। বসল পাছাপেতে। খানিক্ষণ জনকের মুখের দিকে চেয়ে থেকে বলল, “অ্যা সাঙাত, মু’টি তুমার ই রকম পারা লাইগচে ক্যানে হ্যা?”

একটু অপেক্ষা করে আবার বলল, “তুমি কী ভাইবচ আমি জানি সাঙাত। তুমি ভাইবচ ত, ই শালা উদামাদা লোক! তুমার মনপুড়ুনির আমি আর কী বুজব! এয়েই ভাবচ ত? ভাইব নাই সাঙাত। কিচ্ছু ভাইব নাই। আমি যতই উদামাদা হই, সোবকুথাই কানে ঢুকে আমারঅ।”

আবার থামল সাগরা। মুখ থেকে মুছে নিল জল। একটা ঢোক গিলল। ধরা গলায় বলল, “আমি য্যা সোব শুনেচি সাঙাত! সোবাই বলাবলি কইচ্চে, ক্যামন কইরে তুর সাঙাত গুছি পুতে আমরাও দেখে লুব। আমিঅ শুনাই দিঁইচি, হঁ-হঁ, সোব দেখে লিবে ক্যামন সুনা ফলে আমার সাঙাতের হাতে। ভাল করি নাই? বল, অ্যা সাঙাত, ভাল করি নাই আমি?”

“হঁ।” ঝটকরে সাগরার একটা হাত নিজের হাতে টেনে নিল জনক। আবেগভরা গলায় বলল, “ভাল করিচ সাঙাত। খুবেই ভাল করিচ।”

চমকে উঠে মুখ তুলল সাগরা। তার কুচলাফলের মতো চোখজোড়া আচমকাই টলটল করে এল। টলটল করে এল জনকের চোখজোড়াও। এইসময় খোঁয়াড়ে ঢুকে আজকের মতো শেষ ডাক ছাড়ল মোরগটি– কুঁক কুঁক কুকড়ুচ্চু–

 

অনুকথা

(বারো)

কয়েকদিনের মধ্যেই লোহারপাড়াটা প্রায় ফাঁকা। বেশিরভাগই চলে গেছে পুবখাটতে। পুব বলতে এ অঞ্চলের লোকরা বর্ধমান জেলার পূর্ব দিককে বোঝে। বৃষ্টি হোক বা না হোক, দামোদর নদের ক্যানেলের জন্য ওখানে চাষ বন্ধ হয় না সহজে। তাই কৃষিশ্রমিকেরও প্রয়োজন হয়। একবার গিয়ে পড়লে কাজের অভাব হয় না। পাওনাগণ্ডাও দেয়থোয় এখানের চেয়ে অনেক বেশি। তাই বাঁকুড়া-পুরুলিয়া জেলার অধিকাংস খেটেখাওয়া মানুষরা চলে যায় পুবে। বিশেষকরে যে বছর বর্ষার মেঘে টান পড়ে। তাছাড়া যাওয়া মানে তো বোচকাবুচকি, ছানাপনা সব সঙ্গে বেঁধে যাওয়া। সাধকরে কে আর ঘরছাড়া হয়ে পড়ে থাকতে চায় বিভুঁইয়ে! কিন্তু পেট যে বড়ো বালাই!

এবছর বৃষ্টির বাত দেখে তাই যারই সুযোগ আছে সেই ছুটেছে পুবে। এমনকি মনসামেলার তাসগুলোও নিশ্চুপ। ধুলোগায়ে পড়ে আছে কুলুঙ্গিতে। শুধু কয়েকটা ঘরে রয়েছে মানুষের সাড়া– হা-হুতাশ। যাদের হাড়ে বয়েসের জঙ ধরেছে। যাদের মাথার উপরে জোয়ান ছেলের ছায়া নেই। আর আছে ওই তিনটি ঘর, যারা স্বপ্ন দেখেছিল, চাষটা অন্যভাবে করার। করে দেখানোর। কিন্তু ভাবলে কী হবে! দেবতায় সেধেছে বাদ। অবশ্য আরও কয়েকটা ঘর পাড়া ছাড়েনি। কেলিয়া, কারু আরও জনাকতক। হাতে কাজ নেই। পেটে পড়ছে টান। তবু অদ্ভুত তৃপ্তিতে তাদের মনের জ্বালায় পড়ছে প্রলেপ। এর শেষ তারা দেখতে চায়। দেখতে চায়, শুধু দামড়ার মতো জেদ নিয়ে কী করে কী করে জনকা!

এদিকে আষাঢ়মাস প্রায় শেষ হতে গেল। এখনও জল লাগেনি মাঠে। মাঝে মাঝে ঝিরিঝিরি পুষ্পবৃষ্টির মতো ঝরছে ঠিক কথাই কিন্তু তাতে শুধু মাঠের আগাছা বাড়ছে। আর বাড়ছে জনকের উঠোনে দুশ্চিন্তার ছায়া। বাড়ছে গুইরামের তেজ। মেজাজ হারিয়ে বলছে, “ল্যা ক্যালা, ইবারে সমবছরটা কী খাব খাই!”

জনক কোনও আশ্বাস দিতে পারছে না। দীর্ঘশ্বাসের সঙ্গে বলছে, “অ্যাখনি তুঁই অমন কইরে ভাঙে পড়চিস্ ক্যানে বল দেখিনি? দাঁড়া ক্যানে, আর দু’ট্যা দিন দেখে লিই।”

“দু’ট্যা দু’ট্যা কইরে য্যা গুটা মাসটাই শ্যাষ হঁইয়ে গেলেক্ রে ব! ই শালা আচ্ছা আকালে পড়া গেলেক্ বাপ্! উঃ, ই চাঁদির দেবতা অমন কইরে মাইল্লেক্ রে ব আমাদেরকে!”

“অ্যা দাদা, অমন করিস্ নাই ত তুঁই।”

“কচ্চি কি আর সাদ কইরে রে! শালা মাঠের বীচ য্যা সোব বীচতলাতেই থুবড়াঁই গেলেক্! ইয়ার পদে জল লাগালেই বা আর কীট্যা হবেক্ শুনি!”

এসব হা-হুতাশের উত্তরে কী যে বলা যায় ভেবে পাচ্ছে না জনক। যদিও চাষ না লাগানোর জন্য লোহারপাড়ার পাড়াকামড়ে থাকা লোকগুলোর কারোর হাতেই কাজ নেই। সুতরাং মুখুজ্জেদের গতন্যা মুনিস থেকেও যে কোনওই সুবিধা করতে পারত না সেকথাও গুইরামের মাথায় থাকছে না। তার কেবলই মনে হচ্ছে, তবে কি গঁড়ার সাঙালি বৌকে বিয়ালি করে চালানোর ফল এটা! কিন্তু আহ্লাদীর মুখপানে তাকালেও তো সেচিন্তা বেশিক্ষণ স্থায়ী হচ্ছে না তার মনে। এমন লক্ষ্মীমন্ত মুখ! তবে!

এই তবেতে এসেই তার সমস্ত চিন্তাশক্তি মুখথুবড়ে পড়ছে। মুখথুবড়ে পড়ছে জনকের এক-একটা চেষ্টা। তবু সে হাল ছাড়তে নারাজ। সেই চেষ্টারই ফলস্বরূপ আজ ঠিক করেছে ব্যাঙের বিয়ে দিয়ে জলদেবীর কাছে জোড়ামোরগ মারত করবে। তারই তোড়জোড় চলছে তার ঘরে। আহ্লাদীর উপর ভার পড়েছে সবটা করার। একে তো সে এয়োতি। তার উপর এখনও তার কোল ভরেনি। এমনি মেয়েই তো লাগে মা ষষ্ঠীর মানতে! তাই আহ্লাদী পাঁকেভরা শ্যামপুকুরের হাঁটুজলে একট ডুব দিয়ে চলে এল জনকের ঘরে। হাসিমুখে বলল, “কই গ খুড়ি, বল আমাকে কী কইত্তে হবেক্?”

গরবি দাওয়ায় বসে কাঁঠালপাতার খালা বানাচ্ছিল। বলল, “আসে গেইচিস্! আয় মা, আয়। আমার কাছটিতে থির হঁইয়ে বোস দেখি।”

আহ্লাদী ভিজে কাপড়ে দাওয়ায় উঠল। ভাবির দিকে তাকাল। বলল, “ভাল রইচ, অ্যা দিদিম্যা?”

উত্তরে ভাবি কিছু বলল না। শুধু মাড়ি বের করে হাসল একটুখানি। আহ্লাদী পুঁটির গাল টিপতে গিয়ে বলতে গেল, “আর তুঁই–”

“হাঁ-হাঁ-হাঁ– কী কচ্চিস্ কী?” তার আগেই হাঁ-হাঁ করে উঠল গরবি। বলল, “উয়াকে তুঁই ছুঁস নাই মা। উ অ্যাখনঅতক্ক বাসি কাপড়েই রইচে।”

“অ! ত, আমাকে কী কইত্তে হবেক্ বল ইবার‍্যা?”

“করবি আবার কী! ল্যা, বাকি খালাগুলান হাতে হাতে কইরে ল্যা দেখি। আমি তখনকে দু’ট্যা দুব্বাঘাস তুলে আনি যাঁইয়ে।”

“দুব্বাঘাস ত আমি বাদাড়ের ধার থাকে তুলে আনলম গ! হাঁই ভাল ক্যানে।”

“আনিচিস্! ব্যাশ করিচিস্ মা। ভাল করিচিস্। সাদে কি তুর কাকাতে বলে লো–”

গরবি কথাটা শেষ করল না। তাতেই আহ্লাদীর মুখের আদলে খেলে গেল হালকা লালিমা। হাতের দুব্বাগুলো একটা কাঁঠালপাতার খালায় রাখল পরিপাটি করে। বলল, “কাকা আমার কী বলে গ খুড়ি?”

“উম্! বিটির আমার লিজের বাহবা শুনতে গাদে ভাললাগে, লায়!”

“ধুর, তুমি য্যা কী বল নাই খুড়ি! আমি কি তার লাগে বল্লম নাকি! আমি ত–” কথাটা শেষ করতে পারল না আহ্লাদী। একরাশ লজ্জা এসে আটকে দিল তার গলা। গরবি তাকাল তার আনত মুখের দিকে। মুচকি হাসল। বলল, “ তুঁই ত কী? বল তুঁই ত কী বটে? আমিঅ নাইলে শুনি তুর মনের কুথাটা।”

“জানি না যাও!” ঘাড়ে একটা ঝাঁকুনি দিল আহ্লাদী। ছেলেমানুষের মতো ফুলে উঠল তার মুখ। তাতেই ফিক কয়রে হেসে ফেলল গরবি। আরেকবার খোঁচা দিয়ে বলল, “তুঁই ত লিজের কুথা কখনু শুনতে খুঁজিস্ নাই, এই ত?”

“হুঁ।” হঠাৎ আহ্লাদী আনমনা হয়ে পড়ল। আর তা দেখে গরবিও গুটিয়ে নিল নিজের হাসি। সেই যে বিয়ে হয়ে এসেছে, তখন থেকে এই অভাগা মেয়েটার প্রতি তার স্নেহের মাত্রাটা যেন একটু বেশিই। বিশেষ করে আহ্লাদীর স্বভাবের জন্য তাকে তার নিজের মেয়েই মনে হয়। সবসময় হাসিমুখ। সামান্য কারণে ওই হাসিতে টান পড়লে গরবি তা সইতে পারে না। তাই আহ্লাদীর চিবুক তুলে ধরল। বলল, “ই বাবা, অমনি বিটির আমার মান হঁইয়ে গেলেক্!”

“মান হবেক্ ক্যানে! আমি কি আর ছুটুটি বটি নাকি!”

“লোস্? ছুটুটি লোস্? থালে কত ডাগরটি হঁইচিস্ বল ক্যানে আমাকে!”

“আমি জানি না যাও।” আবার একটা ঝাঁকুনি দিল আহ্লাদী। অমনি গরবির মুখের রঙ ফিরে এল। মনে মনে বলল, “ছেল্যামানুষ আর কাখে বলিচে!” কিন্তু মুখে সেকথা উচ্চারণ করল না। নিজের আঙ্গুলের ডোগাগুলো ছোঁয়াল আহ্লাদীর চিবুকে। তাতে চুমু খেয়ে বলল, “অ্যানেক ডাগরটি হঁইচিস্ মা! অ্যানেক বড় হঁইচিস্। ঘরবর লিঁইয়ে ঘরকন্না কচ্চিস্! বড়টি না হইলে কি আর ঘরবর হয় রে মা! যেমন সারা জনমটি এমনি বড়টি হঁইয়েই সুবাইকে লিঁইয়ে তুঁই কালকাটাতে পারিস্! অবিশ্যি, ইবারে তুঁই তা পারবিঅ। গঁড়া ত আমাদের ছেল্যা মন্দ লয়। তবু ডর লাগে রে মা।”

একটা দীর্ঘশ্বাস ভারী করে তুলল আশপাশের বাতাসকে। সেভারটুকু নিয়ে গরবি উঠে গেল ভেতরে। ভার চেপে বসল আহ্লাদীর মনেও। সত্যিকারের গম্ভীর্য তার মুখের নিটোলকে শক্ত করে তুলল। এসের থেকে এই একটি আশীর্বাদ সে যে কতবার কত লোকের মুখ থেকে কত রকমভাবে শুনেছে তার কোনও হিসেব নেই। যদিও আহ্লাদী জানে গরবির মনে তার মঙ্গলচিন্তা ছাড়া আর কিছু নেই। তবু!

এই তবুতে এসেই আহ্লাদীর ভালো লাগাটুকুও হোঁচট খেল। মনে পড়ল ফেলে আসা জীবনের কথা। মনে করিয়ে দিল, সে আর পাঁচজনের মতো স্বাভাবিক বৌ নয়। দয়ার বৌ। দয়ার ঘরকন্না তার। তাছাড়া গঁড়ার কথাও তো বলে সকলে। কেন বলে! সেকি গঁড়াকে খারাপ ভাবে! আজ পর্যন্ত গঁড়ার সঙ্গে তার তো তেমন কোনও বিবাদ হয়নি। সে-ও তো গঁড়াকে ভালোটি বাসতেই চায়। দিতে চায় তার মনের সবটুকু মাধুর্য। কিন্তু সবসময় যে পারে, তা নয়। কোথায় যে একটা তালকাটা খচখচানি এক একসময় আড়ষ্ট করে দেয় তার ভালো লাগার পেলবতাকে তা সে নিজেই বোঝে না। তাই বলে কি সে গঁড়াকে তার সবটুকু দেয়নি! আজও দেয় না! নাকি কালই আর দেবে না! তাহলে?

এই তাহলেরও কোনও উত্তর খুঁজে পেল না আহ্লাদী। চেষ্টাও করল না। শুধু মনটা ভারী হয়ে রইল আষাঢ়ি মেঘের মতো। বাবামায়ের কথা মনে পড়ল। মনে পড়ল কন্যামারা গাঁয়ের বাঁধের কথা। তার পাড়ে বুড়ো মহুয়াগাছটার কথা।

“উ কী লো, আহ্লাদী! অমন চুপ কইরে কী ভাইবচিস্ তুঁই?”

ভাবনার মাঝে হঠাৎ নিজের নাম শুনে চমকে উঠল আহ্লাদী। তাকাল মুখ তুলে। দেখল বিকাশের মা বালি। তার ভাবনার ফাঁকে কখন যে এসে দাঁড়িয়েছে তার সুমুখটিতে সে তা টেরই পায়নি। এখন তার দিকেই বালিকে সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে দেখে একটা অস্বস্তি ঘিরে ধরতে চাইল আহ্লাদীকে। সেটাকে আস্কারা না দিয়ে চটজলদি সামলে নিল থমমারা রেখাদের। চোখচুরিয়ে বলল, “কই, কিছুয়েই ভাবি নাই ত। এই খালাগুলা একটুকুন কইরে লিচ্ছিলম।”

“ক্যা বটে ক্যা রে আহ্লাদী?” ভিতর থেকে জানতে চাইলে গরবি। আর আহ্লাদীও যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। গলাতুলে বলল, “মেজ খুড়ি আইচে গ।”

“অ! ত উয়াকে বসতে বইলে তুঁই একটুকুন ভিতরবেগে আয় দেখনি। এই হলুদগুলা লিঁইয়ে যা।” বলল বটে। কিন্তু আহ্লাদী ওঠার আগেই বেরিয়ে এল গরবি। বলল, “হাঁই ল্যা, ইগুলান বাটে লিঁইয়ে আয়।”

“হলুদঅ লাইগবেক্?” ছেলেমানুষের মতো জানতে চাইল আহ্লাদী। তাতেই খিলখিলিয়ে উঠল গরবি। বালির দিকে তাকিয়ে বলল, “আমাদের আহ্লাদী কী বলে দ্যাখ লো মেজকি?”

“ই বাবা! বিটির আমার অত দিগে খিয়াল আর ই খিয়ালটি নাই? বিয়া দিতে গেলে গায়ে হলুদ দিতে হবেক্ নাই? ক্যানে, তুর বিয়াতে কি তুর গায়ে হলুদ দ্যায় নাই আমাদের বিয়ান? হি-হি-হি!”

রাঙা হয়ে উঠল আহ্লাদীর গাল। বলল, “ধুর, তা দিবেক্ নাই ক্যানে! কিন্তুক্ ব্যাঙের বিয়াতেও গায়েহলুদ হবেক্!”

“হঁ লো হঁ, গায়েহলুদ হবেক্, সিঁদুর দান হবেক্, বিটির হাতে লুয়া পড়বেক্। সোবেই হবেক্। তবে যাই বল গরবি, বিটির আমাদের আক্কেল রইচে। ক্যামন সোন্দর পারা খালাগুলান করিচে দ্যাখ ক্যানে!”

বালির প্রশংসায় আহ্লাদী তাকাল গরবির দিকে। ফিক করে হেসেও ফেলল একটুখানি। গরবি প্রশ্রয়মেশানো ধমক দিয়ে বলল, “হঁ-হঁ, ল্যা, হঁইচে! আর ভাবড়া দ্যাখাতে হবেক্ নাই তুখে। যা হলুদ ক’টা বাঁটে লিঁইয়ে আয়।”

আহ্লাদী আর কিছু বলল না। ভালো লাগার অনুভূতিটুকু গায়ে জড়িয়ে উঠে গেল সেখান থেকে। এইসময় ঘরে ঢুকল ফোকলামাড়ির বুড়ি। বলল, “বলি, কই লো সোব! জুগাড়জান্তি কদ্দুর কল্লি?”

“আস গ আস। এই য এক এক কইরে কচ্চি সোব জুগাড়।”

“অ, হয় নাই অ্যাখনঅ! উবাবা, উটি ক্যা বটে লো? আমার সতীন নাকি?”

শিলনড়ার কাছে আহ্লাদীকে হলুদ বাঁটতে দেখে জিজ্ঞাসা করল বুড়ি। বিয়ের দিন সেই যে ঠাট্টা করে তাকে সতীন বলেছিল, আর তা ছাড়েনি। এখন সেই ঠাট্টার রেশটুকু ধরেই গুনগুনিয়ে উঠল পাল্লার গানে,

“বলে আয় দেখে যা পাড়ালি

হলুদ-ত্যালে

মাইরি হলুদ-ত্যালে খেলছে সাঙালি লো

হলুদ-ত্যালে…”

অমনি প্রমাদগুনল গরবি। ভাবল, এই বুঝি খেঁকিয়ে ওঠে বুড়ি, “বলি, ই তুদের ক্যামন পারা আক্কেল লো গরবি, আঁ? সাঙালি বৌকে দিঁইয়ে ব্যাঙবিয়ার কাজ করাচ্চিস্? বলি, জাত-ধম্মের মাথা খাঁইচিস্ সোব, নাকি? হায়াপিত বলে কিছু নাই তুদের?”

কিন্তু বুড়ি সেদিকে গেল না। গুনগুনানি থামিয়ে আপনমনেই বিড়বিড় করল, “তাথেই ত আমিঅ বলি, ছঁড়াদের ই কাজটা ভাল হলেক্ নাই!”

“কাদের কুথা বইলচ গ তুমি? কার কন কাজটা ঠিক হলেক্ নাই?”

“বলে আপন ভালয় জগৎ আল করবি কী তা বল/ সুবার কুথা ভাবলে পরে পাবি পাকা ফল।” দাওয়ার একধারে বসতে বসতে শোলোক কাটল বুড়ি। কিন্তু তাতেও তার মনের ভাব পরিষ্কার হল না। বরং আশংকার ঘোর জমে বসল আষাঢ়ি গুমোটে। সেই গুমোট নিয়েই গরবি তাকাল বালির দিকে। বোঝার চেষ্টা করল ইঙ্গিত। বুড়ি অবশ্য আপন মনেই বলতে শুরু করল, “এই য তুদের ব্যাঙের বিয়া দিয়া লিঁইয়ে পাড়াতে যা হলেক্ স্যাকুথাই বলচি লো, স্যাকুথাই বলচি আমি। আর কিছু লয়।”

“ক্যানে, ইসোব লিঁইয়ে আবার কার পঁদে আগুন লাগলেক্? অ্যাখন নাইলে আমরা যা করি তা সোবেই পাড়াতে দোষের হয়।” আর ধৈর্য ধরতে পারল না গরবি। না চাইতেও গলায় একটুখনি ঝাঁজ এসেই গেল। বুড়িও বলল, “সেইকুথাই ত আমিঅ বলচি লো। ত, তুঁই য্যা আমাকেই কামড়াতে আসচিস্! বলে, লোকের ভাল মাগতে নাই/ বরঞ্চ কাল দড়ার পঁদ চুষিগা যাই। বের‍্যা, ধুর হঁইয়ে যা।”

“না, কামড়াতে যাব ক্যানে!” বুড়ির গলায় অসন্তোষের ইঙ্গিত পেয়ে নিজেকে সামলে নিল গরবি। বলল, “তুমি বইল্লে বলেই জানতে খুঁজলম। নাইলে আমার কী দায় পড়িচে বল কারু পঁদে কামড়াকামড়ি কইত্তে!”

“অ, তাই বল ক্যানে! তবে শুন্, তুদের ইসোবের লাগে পাড়ায় য্যা দমতক কুথা হচ্ছে লো। আমিঅ শুনাই দিঁইয়ে আসিচি সোবকে, তুরা কেউ যা আর নাই যা, আমি আপনার যাব। যদি জল হয়েই ত স্যা কি উয়ারা ইকাই লিবেক্! বল বটে কিনা? আমার বাপু পষ্ট কুথার কষ্ট নাই।”

তা বুড়ির কষ্ট থাক বা না থাক গরবি এতক্ষণে একটুখানি আশ্বস্ত হল। তাই গোল এড়াতে চেয়ে বলল, “ভালই ত করিচ।” তারপরই আহ্লাদীকে তাড়া দিল, “অ্যা আহ্লাদী, তুর হলেক্? উ ক’টা হলুদ বাঁটতে কতক্ষণ লাইগচে, কতক্ষণ?”

“হঁ, এই য হঁইয়ে গেইচে।”

“ত, লিঁইয়ে আয় তাগাদা কইরে। দিঁইয়ে খালাগুলানে ধান-দুব্বা, গোবুর সোব সাজাঁই ল্যা।”

“হঁ-হঁ, এই য যেছি।” বাটাহলুদ নিয়ে কাছে এসে বসল আহ্লাদী। রাখল একটা খালায়। একে একে সামগ্রীগুলি সাজাল ডালায়। এইসময় পার্বতি এসে জিজ্ঞাসা করল, “কই লো গরবি, ছুটুকত্তা ঘুল্লেক্, না ঘুরে নাই অখনঅ?”

“না, অখনঅ ঘুরে নাই ত। সেই য উয়ারা দু’সাঙাত মেলে গেইচে বরকন্যা ধইত্তে, ত গেইচেই। ঘুরার নামগন্ধতক্ক নাই। উঃ, আমি আর লাচ্চি সোবদিগ দেখতে।” দুমদাম পা ফেলে উঠে গেল গরবি। পার্বতী সুর টেনে বলল, “স্যা কী লো, অখনঅ ঘুরে নাই? ই বাবা! অতটি বেলা হলেক্!”

“হঁ-হঁ, আসে গেইচি লাও। আর ভাইবতে হবেক্ নাই তুমাদেরকে।” হঠাৎ আগুড়ের কাছে হৈ-হৈ করে উঠল সাগরা। ঢুকল উঠোনে। তার নিজের হাতে একটি সোনা ব্যাঙ আর জনকের হাত একটি। সঙ্গে এসেছে গুইরাম আর গঁড়াও। সাগরা দাওয়ার কাছে এসে বলল, “বাবা রি, সাঙাতান, তুমাকে কী বইলব! দু’সাঙাতে মেলে ডুবা হেঁচে হেঁচে লবজান হঁইয়ে গেলম গ। সোব শালারা মাঠে বিষ দিঁইয়ে দিঁইয়ে কি আর সাপ-ব্যাঙ কিছু রাখিচে!”

“পাঁইচ ত!” সাগরার কথায় গরবির মনের মেঘ সরে গেল খানিকটা। একচিলতে হাসি এনে বলল, “থালেই হবেক্। লাও ত ইবারে তাগাদা কর সোব।”

সাগরা দাওয়ায় পাছাপেতে বসে বলল, “ই বাবা, পাব নাই মানে! আমার সাঙাত কি আর যেমন তেমন লোক বটে নাকি! না কী বল হ্যা সাঙাত?”

এর উত্তরে জনক কিছুই বলল না ঠিকই কিন্তু খেঁকিয়ে উঠল গুইরাম, “হঁ-হঁ ল্যা, তুখে আর ফপরদালালি মারাতে হবেক্ নাই। খিদাতে শালা আমার প্যাটের খুল্যা জ্বলে যেছে! যা করবি, তাগাদা কইরে কর ক্যালা।”

তাড়া খেয়ে গরবি জলভরা ঘটি তুলে নিল হাতে। জলের ধারার সঙ্গে দিল হ্লুধ্বনি। এগিয়ে এল দাওয়ার উপর। অমনি সমবেত হ্লুধ্বনিতে সজাগ হয়ে উঠল লোহারপাড়ার ঝোপঝাড়। শুরু হল ব্যাঙের বিয়ে। তেল, হলুদ, সিঁদুর একে একে সব দেওয়া হল ব্যাঙ দু’টির গায়ে। দু’টিকে নিয়ে সকলে এগিয়ে গেল শ্যামপুকুরের দিকে। সেখানে এসে গলায় গামছা দিল জনক। ঘাটপুজো করল সবটুকু ভক্তি দিয়ে। আহ্লাদী পাশ থেকে এগিয়ে দিল এক একটি সামগ্রী। এমনকি স্ত্রী ব্যাঙের সামনের পায়ে পরিয়ে দেওয়া হল একটি ছোট্ট লোহার বেড়ি। শেষে ব্যাঙ দু’টিকে পুকুরের জলে ছেড়ে দিতেই তারা বাঁইবুঁই করে দু’দিকে দু’টি সাঁতরে এগিয়ে চলল। জনক জোড়হাত বুকে ধরে বিড়বিড় করল, “হ্যা মা জলবুড়ি! জল দাও মা, জল দাও। আমি তুমাকে জুড়ামোরগ বলি দুব মা। বুকফাড়ে রক্ত দুব তুমাকে। একবার মু’তুলে ভাল গ মা আমার।”

তারপর একআঁজলা জল তুলে ছিঁটিয়ে নিল নিজের মাথায়। তার দেখাদেখি বাকি সকলেও হাতজোড় করে কাতর প্রার্থনা জানাল জলবুড়ির উদ্দেশ্যে। শুধু বালির কোলে বসে থাকা পুঁটি এসবের কিছুই বুঝল না। জুলজুলে চোখে তাকিয়ে থাকল সকলের দিকে।

 

Pages ( 32 of 35 ): « Previous1 ... 3031 32 333435Next »
Close Menu