শ্রেষ্ঠ নয় সমগ্রের খোঁজে

।। কবিতা আশ্রম পরিবারে সকলকে স্বাগত।।"কবিতা আশ্রম একটি গুরুত্বপূর্ণ পত্রিকা। এই পত্রিকা থেকে তরুণদের কবিতা আর কবিতা-ভাবনা কোন পথে চলেছে তার এক রকমের চিহ্ন পাওয়া যায়।"--কবি জয় গোস্বামী ।। "তথাকথিত শিবিরের ধারণাকে ধ্বংস করে দিয়ে কবিতা আশ্রম এই সময়ের বাংলা কবিতার প্রচ্ছদ হয়ে উঠেছে। নানা মাত্রার , মার্গের , স্রোতের , ঘরানার এমন নিরভিমান উদযাপনের শরিক না হয়ে কেউ পারবেন না , এটা আমার বিশ্বাস ।"--সুমন গুণ ।। "কবিতা আশ্রম চমৎকার ম্যাগাজিন ।কখনও লিখিনি , এবার লিখতে পেরে ভালো লাগছে"--কবি মৃদুল দাশগুপ্ত।।"আমি কবিতা আশ্রম পত্রিকা পাই এবং আগ্রহ দিয়ে পড়ি । যে সকল কবিতা ও গদ্য প্রকাশিত হয় সে-সবই অত্যন্ত ভালো লেখা এবং সু-সম্পাদিত,যা আমার খুবই ভালো লাগে । এছাড়াও কবিতা আশ্রম পত্রিকাকে কেন্দ্র করে বেশ কিছু তরুণ কবি ও গদ্যকার আগামীর জন্যে তৈরী হয়ে উঠছে । তরুণ কবি ও গদ্যকার-দের প্রশয় দেওয়ার ক্ষেত্রে কবিতা আশ্রম পত্রিকাটি খুবই উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রেখেছে ।"--কবি দেবদাস আচার্য।।"প্রকৃত কবিতাকে জহুরির চোখে খুঁজে আনছে কবিতা আশ্রম। প্রচারের আড়ালে থাকা তরুণ কবি প্রতিভাকে পাঠকের সামনে নিয়ে আসার এই প্রয়াসকে কুর্নিশ জানাই ।"--কবি অঞ্জলি দাশ।।"দূরে গেলে কিছু জিনিস আবছা দেখায় । আরও দূরে গেলে কিছু জিনিস স্পস্ট হয়ে ওঠে । কবিতা আশ্রমকে আমি স্পস্ট দেখতে পাচ্ছি। যেভাবে আত্মত্যাগের মধ্যে দিয়ে মাথা তুলে কাগজটিকে ক্রমশ আইকনিক তুলছে সেটা একটা দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে ।"--কবি সুবোধ সরকার।। “কবিতা আশ্রম প্রকৃত অর্থেই বাংলা কবিতার লাইট হাউস ।তরুণ কবিদের খোঁজে আমি তাই প্রতিটি সংখ্যা পড়ি”।–রাহুল পুরকায়স্থ ।।“অচেনা নতুন কবিদের দিকে এখন তাকিয়ে থাকি।‘কবিতা আশ্রম’ এই সব কবিকে সামনে নিয়ে আসছে।এ একটা প্রশংসনীয় উদ্যোগ। এই জাতীয় উদ্যোগ বাংলা কবিতার ক্ষেত্রটিকে প্রসারিত করছে”।–কবি কালীকৃষ্ণ গুহ ।।“কবিতা আশ্রম আমার প্রিয় পত্রিকা । পড়ে এবং লিখে তৃপ্তি পাই। সারা বাংলার তরুণদের খুঁজে আনছে কবিতা আশ্রম”।–কবি সমর রায়চৌধুরী ।। "সব চেয়ে ভালবাসি নিজেকে কারণ সে লোকটার ভেতরে কবিতার আবাস । সেই নিজেকে দেখার জন্যে এক টুকরো আয়না খুঁজছিলাম বহুদিন । কোথাও পাইনি । কে জানতো একটি আশ্রমের ভেতর সেই টুকরোটুকু আমার জন্য অপেক্ষা করছে।"--দিশারী মুখোপাধ্যায় ।।

একটি কবিতার মৃত্যু ঘিরে

মণিশঙ্কর

 

হাত-পা’হীন শরীরটা দাউ-দাউ আগুন রেখার বেষ্টনে ঝুল আঙরা। প্রথমে ডানপা, তারপর একে একে বাঁ’পা আর হাত দুটো হাঁটু আর আঁখা থেকে খসে গিয়ে পিঠের উপর জড়ো করা। অবশ্য এখন সেগুলোও ঠিক হাত-পা নয় আর। ফুঁস-ফুঁস শব্দে জ্বলন্ত বাঁশ। সেদিকে তাকিয়ে উবু হয়ে নিথর বসে আছে প্রশান্ত। পা’জোড়াকে দু’হাতে জড়িয়ে ধরে। হাঁটুতে গুঁজে রেখেছে থুতনিটা। স্থির চোখজোড়ায় তার আগুনশিখার তিরতির কাঁপন। হাত দশেক দূরে উঁচু বেদিটায় পাছাপেতে বসে আছে প্রকাশ দত্ত। ডান পা ঝুলছে বেদি থেকে। তার হাইপাওয়ার-চশমার মোটা লেন্সে একটা গোটা চিতার দাউ-দাউ। পাশে বসে আছে সাগ্নিক। হাঁটুমোড়া। পা’জোড়াকে দু’হাতে জড়িয়ে। পিছন দিকে হেলে আছে একটুখানি। উদাস মুখখানা তুলে রেখেছে বটগাছের শাখার দিকে। দু’চোখে হৈমন্তিক রিক্ত মাঠ। তার ঠিক পিছনে বসে আছে সমীর সরকার। চিতার দিকে পিছন ফেরা। দু’আঙ্গুলের ফাঁকে গোঁজা সিগারেট। তারই পিছনে মৃদু মৃদু টান দিচ্ছে। তার হালকা চালের দোলনে কেমন একটা নির্বিকার ভঙ্গী। সুজাতাও এসেছে। চাতালের থাম্বায় হেলা দিয়ে সাত-পাঁচ কী যে ভাবছে দেখে তার কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। বাকি সব শ্মশানযাত্রী এদিক-ওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে। ছোটো ছোটো দলে বিভক্ত। এই সময় একখানা মোটর বাইক ভুটভুট শব্দে এসে দাঁড়াল চাতালটার পাশে। তার পিঠ থেকে নামল সত্যব্রত রায়। এগিয়ে এল চাতালের কাছে। কোমরে ডান হাত দিয়ে দাঁড়াল। থমথমে মুখটাকে জ্বলন্ত চিতার দিকে তুলল। অমনি তার চোখের তারায় ঝলসে উঠল গোটা চিতাটা।

“আয়। বস এখানে।” দীর্ঘক্ষণের জমাট নীরবতাকে ভাঙল প্রকাশ দত্তই। আহ্বান জানাল তাকে। বাঁ হাত দিয়ে চাতালে তার পাশের ফাঁকা জায়গাটা দেখাল। সত্যব্রত কোনো কথা বলল না। ঝাঁপিয়ে বসল চাতালটায়। দু’পা ঝুলিয়ে দিল। চোখে তার এখনও জ্বলন্ত চিতা। প্রকাশ দত্ত জিজ্ঞাসা করল, “এত দেরি করলি যে?”

“একটু দেরি হয়ে গেল আরকি!” সত্যব্রত একটা দীর্ঘশ্বাস গিলে ফেলল। বলল, “আসলে একটা পার্টি মীট ছিল। ও, তোমরাও এসেছো?” সুজাতার দিকে চোখ ফেলে জিজ্ঞাসাটা ছুঁড়ে দিল সত্যব্রত। আবার গুটিয়েও নিল দৃষ্টিরেখা। চিতার বুকে চোখ পেতে আবার জিজ্ঞাসা করল, “তা, কতক্ষণ এলে?”

কিন্তু সুজাতার মধ্যে কোনোও ভাবান্তর দেখা গেল না। তবে উত্তর দিল সাগ্নিক। মুখখানাকে উপর দিকে ধরে রেখেই বলল, “এই ঘন্টাখানেক হবে। ধর্মতলা থেকে লাস্ট ভলভোটা পেয়ে গেলাম।”

“অ।” অস্ফুটে শব্দ করল সত্যব্রত। ব্যস, আর কোনো কথা সরল না কারো মুখে। একটু আগের নীরবতা আবার বিছিয়ে পড়ল চাতালটা ঘিরে। হঠাৎ প্রকাশ দত্ত একটু কেশে গলাটা পরিস্কার করে নিল। তারপর বলল, “সোজা এখানেই এলি? নাকি–”

“নাঃ। আগে বাড়িতেই গিয়েছিলাম।”

“কী বললো ওরা?”

“বললো, রাত দশটা নাগাদ শ্মশানে নিয়ে গেছে। তাড়াতাড়ি আসতে পারলে শেষ দেখাটা দেখতে পেতেও পারি।”

“হ্যাঁ, বডি পেতে পেতেই তো আটটা বেজে গেল। পোস্টমর্টেম না করে ছাড়লো না। তারপর অন্যান্য সব ব্যাপার-স্যাপার সারতেই দশটা। এই মিনিট পনেরো-কুড়ি হলো আগুন দেওয়া হয়েছে।”

“মুখাগ্নি কে করল?”

“ওই ভাইপোটাই করেছে। ওর দাদা অবশ্য ওসব ঝামেলার মধ্যে যেতে চায়নি। দশের আগুন দেওয়ার কথাই বলেছিল। কিন্তু ভাইপোটা শুনল না। ঘরের মধ্যে তো ওই যা একটু ভালোটালো বাসতো। সে যাকগে, আর কিছু বললো না?”

“নাঃ। কীই বা আর বলবে!” গুমরাতে চাওয়া দীর্ঘশ্বাসটাকে চাপা দিল সত্যব্রত। একটা শুকনো ঢোক গিলে ফেলল। গলার কাছে আটকে থাকা দলাটাকে ভিতরে চালান দিতে চেয়ে আবার বলল, “যা কাজ করল! তাতে কারো কিছুই বলার নেই।”

চিতা থেকে ফিরিয়ে নিল দৃষ্টিটাকে। ছুঁড়ে দিল একটু দূরের পুটুশ-পার্থেনিয়াম ঝোঁপগুলোর দিকে। একচিলতে অভিমানী অন্ধকার সেখানে গুঁড়িমেরে বসে আছে। চিতার আগুনকে অগ্রাহ্য করে মাথা তুলতে পারছে না কিছুতেই। এক প্রকারের গুমরানো অসহায়ত্ব ঝোঁপগুলোর আনাচে-কানাচে। সেদিকে তাকিয়ে সত্যব্রতর কথাতে কথা যোগ করতে চেয়ে প্রকাশ দত্ত বলল, “তা অবশ্য ঠিক। এমন একটা প্রাণবন্ত ছেলে যে এভাবে নিজেকে শেষ করে দেবে, কে ভেবেছিল!”

“হুঁ! সে কথা ঠিক।” সমীর তার হালকাচালের দোলন অব্যাহত রেখে এতক্ষণে সাড়া দিল। অবিকৃত ভাবেই বলল, “তবে শেষের দিকটায় যা শুরু করেছিল!”

“শুধু শেষদিকটায় বলছিস কেন?” খেঁকিয়ে উঠল সত্যব্রত। পাশের দিকে একদালা থুতু ছুঁড়ে ফেলে বলল, “চিরদিনই তো ও ওই রকম। সম্পর্কগুলোকে কচলে কচলে তেতো না করা পর্যন্ত ওর শান্তি হতো না।”

“সেটাও অবিশ্যি ঠিক কথা।” নিরাসক্ত ভঙ্গীতেই সিগারেটে টান দিল সমীর। লম্বা করে ধোঁয়া ছেড়ে বলল, “ওই ছিল ওর এক রোগ।”

অমনি চিতার আগুন কাঁপিয়ে ফট করে একটা কাঠ ফাটার শব্দ হল। সঙ্গে সঙ্গে সাজানো চিতাটা গেল হড়কে। প্রাণহীন শরীরটাকেও বসিয়ে দিল কিছুটা। কতকগুলো ফুলকি আকাশমুখী হয়েই মিলিয়ে গেল অন্ধকারে। একটা পা টাল খেয়ে পড়ে গেল পাশে। ডোমদের ছেলেটা নির্বিকার মুখে সেটাকে বাঁশ দিয়ে তুলে দিল পিঠে। সত্যব্রতর মুখে কিলবিল করে উঠল কতকগুলো বাঁকাচোরা রেখা। তা নিয়েই তাকিয়ে থাকল চিতাটার দিকে। বলল, “কাকে বিরক্ত করেনি বল তো? কোনো বিষয়েই ওর কোনো লিমিট ছিল না।”

“ওভাবে বলছিস কেন?” প্রকাশ দত্ত তার স্বভাবসুলভ ভঙ্গীতে মৃদু আপত্তি জানাল সত্যব্রতর কথার। বলল, “সব বিষয়ে একটু বেশি বেশি করে ফেলতো ঠিক কথাই। তাই বলে তো ছেলেটা মন্দ ছিল না! যে যখন বিপদে পড়েছে তখন তো ওই সবার আগে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। টাকা-পয়সার পর্যন্ত তোয়াক্কা করেনি। আমরা সকলেই তো কমবেশি ওর কাছে ঋণী।”

“তা কেন বলছেন?” সত্যব্রত বোঁ করে ঘুরল প্রকাশ দত্তের দিকে। ভ্রূ কুঁচকে বলল, “ও যেমন করেছে, তেমনি আমরাও তো ওর যেকোনো কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েছি। ওর ক্ষ্যাপামোতে সায় দিতে গিয়ে আমাদেরই কি কম খেসারত দিতে হয়েছে?”

“আমার মনে হয় না, ও এসব কথা ভাবতো।” এতক্ষণে আবার নিজের মৌনতা ভেঙে সরব হল সাগ্নিক। সত্যব্রতর কুঞ্চিত ভ্রূর রেখা আরও গভীর হয়ে উঠল। বলল, “কোন্ সব কথার কথা তুমি বলছো সাগ্নিকদা?”

“এই দেনা-পাওনার হিসেবনিকেশ নিয়ে তোমরা যে নিক্তি বিচারে বসেছো, আমি তার কথাই বলছি।” বটগাছের শাখা থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে আনল সাগ্নিক। পা’জোড়া ছেড়ে দিয়ে সোজা হয়ে বসল। জ্বলন্ত আগুনের প্রতিবিম্বসহ চোখ পাতল সত্যব্রতর হালকা আগুনরঙা মুখের উপর। কন্ঠে কিছুটা বিদ্রূপ ছলকে বলল, “তোমার কি মনে হয় না, আমাদের এই সব হিসেবনিকেশ কিছুটা হলেও ওর এই পরিণতির জন্য দায়ী?”

“আশ্চর্য কথা বলছো তো তুমি সাগ্নিকদা! জীবন সম্পর্কে চরমভাবে হতাশ একটা অকর্মন্য মাতাল যদি পালিয়ে যাবার জন্য আত্মহত্যা করে তাহলে তার জন্য কি দায়ী আমরা?”

“আত্মহত্যা! তোমাকে কে বল্ল, ও আত্মহত্যা করেছে?”

“দিনের পর দিন মদ খেয়ে খেয়ে লিভারের বারোটা বাজানোকে আত্মহত্যা বলবে না তো আর কী বলবে? হুঃ, কাওয়ার্ড!”

শেষ কথাটা একদালা ঘৃণার সঙ্গে উগরে দিল সত্যব্রত। মুখ ফেরাল অন্যদিকে। অমনি জ্বলন্ত আঙরায় জল পড়ার মতো একটানা ছাঁ-ই-ই-ই-ই শব্দ ভেসে এল চিতাটা থেকে। চোখ দু’টোও হয়তো গলে গেল এতক্ষণে। কিংবা শরীরের কোনো জায়গার জমা জল বেরিয়ে এলো আগুনের তাপে। কিন্তু সেদিকে কান দিল না সাগ্নিক। কিছুটা স্বগতোক্তির মতো বলল, “হুম্ কাওয়ার্ড! কাওয়ার্ডটা কে বলতে পারো?”

দীর্ঘশ্বাসকে সঙ্গী করে ফিসফিসিয়ে ধ্বনিত হল সাগ্নিকের কণ্ঠ। ভ্রূ-কুঁচকে সত্যব্রত কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল তার মুখের দিকে। তারপর ঘাড়টাকে আরেকটু এগিয়ে নিয়ে গেল। আশ্চর্য হওয়ার ভঙ্গীতে পাল্টা প্রশ্ন করল, “তুমি কি প্রশ্নটা আমাকে করছো?”

সত্যব্রতর কথার সরাসরি উত্তর দিল না সাগ্নিক। আনমনে আওড়াল, “কবির কলমে আমি রদ্দুর হতে চেয়েছিলাম। পারিনি। পালিয়ে বেড়িয়েছি সূর্য-হাতছানি সইতে না পেরে। তবু আমি কাওয়ার্ড নই।”

থামল সাগ্নিক। তাকাল চিতাটার দিকে। একটা দীর্ঘশ্বাস আটকে গেল কন্ঠের তলায়। তার ব্যথাটুকুতেই বাষ্পাকুল হয় এল তার দুই চোখের কোল। সুজাতাও আর চুপ থাকতে পারল না। মাথাটা চাতালের থাম্বাতে এলিয়ে রেখেই আবৃত্তি করল,

“একটি কবিতার জন্য একটি গাছ হতে চাওয়া;

একটি তারা ক্লান্তিহীন–ফুল হয়ে ফোটে

টানাটানি মাড়ুলি-উঠোনে।

এসব ধরে কবির

নাছোড় দুঃখ সওয়া!

 

প্রকৃত মানুষ চায় কতটুকু জমি!

স্বাধীন পাখি ক’খানা ডাল!

আকাশের বুকে জমা থাকে

যতটুকু কান্না,

তা নিয়ে বুঁদ থাক কবির

এ দুখ-ভরা হালচাল।

 

দুঃখ দাও দুঃখ দাও–

এজমি শুধু কবির বাসা

প্রকৃত কবিতা আর গাছেদের ডালে

জেগে থাক চিরদুখী

মোহময় ভালোবাসা…”

আবৃত্তি শেষে আবার থামল সুজাতা। মাথাটা সোজা করল থাম্বার আলস্য থেকে। তীক্ষ্ণচোখে তাকাল সত্যব্রতর দিকে। ধরাগলায় বিড়বিড় করল, “এই কবিতাটা তো তোমারই লেখা, তাই না?”

“হ্যাঁ। কিন্তু তাতেই বা কী?”

কিন্তু সুজাতা আর কিছু বলল না। মাথাটাকে আবার হেলিয়ে দিল থাম্বাটার গায়ে। বদলে সাগ্নিক বলে উঠল, “তবু তুমি কাওয়ার্ড নও। অথচ তোমার জীবন আজ আর যাইহোক কোনোভাবেই ওই পঙক্তিগুলো নয়।”

“তার সঙ্গে ওর মৃত্যুর কী সম্পর্ক?”

“খুব সোজা সম্পর্ক। এই যে আমরা সবাই লেনদেনের একটা ব্যালেন্সসিট তৈরি করে যে যার দায় ঝেড়ে ফেলতে চাইছি–তুমি মুখে বলছো, আমরা তা না করলেও মনে মনে তো তাই করছি! কিন্তু ও কখনো তা করেনি। যা করেছে ভালোবাসার দায় থেকে করেছে। আবেগের তাড়নায় করেছে। আমাদের করাটা নিয়েছেও সেভাবেই। কিন্তু আমরা আত্মপীড়নের বোঝা ঝেড়ে ফেলে দায় মুক্ত হতে চাইছি। এই যে প্রকাশদা ওর উদারতাকে স্বীকার করে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে চাইছে, এটাও ওকে অপমান করাই হচ্ছে। তোমার কি মনে হয় না, ওর মৃত্যু আমাদের এই মননের কাছে একটা তীব্র প্রতিবাদ?”

একটানা কথাগুলো বলে থামল সাগ্নিক। একটু হাঁফও ধরে গেল। তাই প্যান্টের পকেট থেকে ইনহেলারটা বের করল। দু’বার ঝাঁকিয়ে চেপে ধরল মুখে। খানিকক্ষণ পরেই হাঁফ ধরাটা স্বাভাবিক হয়ে এল। ইনহেলারটা পকেটে চালান দিয়ে তাকাল চিতাটার দিকে। ডোমদের ছেলেটা এখন বাঁশ দিয়ে আলতো করে শরীরটাকে ঠুকে ঠুকে জমা কার্বন ঝাড়ছে। যত ঝাড়ছে ততই লকলক করে সাপের চেরা জিভের মতো আগুনের শিখাগুলো উঠে যাচ্ছে উপর দিকে। ওই লকলকে আগুনরেখার দিকে তাকিয়েই আবার কথা শুরু করল সাগ্নিক, “রাগ করো না সত্যব্রত। কথাগুলো আমি শুধু তোমাকেই বলছি না। বলছি নিজেকেও। আসলে কী জানো? আমরা পেরেছি। কিন্তু ও পারেনি। কিংবা হয়তো ওই আসল পারাটা পেরেছে। আমরাই পারিনি। নকলের পিছনে পড়ে আছি হাপিত্যেশে!”

“মানে? তোমার কথাটা ঠিক বুঝলাম না তো!” সাগ্নিকের দিকে মুখ ফেরাল সত্যব্রত। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে তার প্রশ্নের কোনো উত্তর দিল না সাগ্নিক। একটুক্ষণ নীরব থাকল। কালী মন্দীরের গা-ঘেঁষা কৃষ্ণচূড়া গাছটার দিকে তাকাল। গাছটার ঝিরঝিরে পাতায় কেমন এক প্রকারের বিষাদ-বিমূঢ়তা। সেই বিমূঢ়তাকে মুখে মেখে সাগ্নিক মনে মনে কিছু ভাবল। তারপর একটু বাঁকা হাসল। দৃষ্টি ফিরিয়ে আনল সত্যব্রতর মুখের উপর। বলল, “মানে? মানেটাই তো বড়ো জটিল সত্যব্রত। ধরো, আমরা, যারা আজকে সফল হয়েছি–সফল মানে, আমাদের যাদের বৌ-বাচ্চা, গাড়ি-বাড়ি নিয়ে ভরাসংসার, কারো কারো নাম-খ্যাতি-যশ সবই হয়েছে, তোমার মতে তো তারাই পেরেছি?”

“নিশ্চয়ই।”

“কী পেরেছি? শুধু আপোস আপোস আর আপোস করতে! কিন্তু একদিন আমরা সবাই কি এই স্বপ্নই দেখেছিলাম? এই জন্যেই কি ও নিজের শেষ সম্বলটুকু দিয়ে গড়ে তুলেছিল ওই আশ্রম! ডেকে এনেছিল আমাদের। একজায়গায় দাঁড় করিয়েছিল কতকগুলো ব্যর্থ-হতাশাগ্রস্ত দুখী মানুষকে? এর মধ্যেই ভুলে গেলে সেসব দিনের কথা! যখন সকলে মিলে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, এই সমাজে থেকেও একটা প্যারালাল মডেল গড়ার! যেখানে আমার বলে কিছু থাকবে না। সবই সবারই। কোনো বিপ্লব নয়। রাজনৈতিক ঝোল টানাটানি নয়। শুধু পরস্পরের সহযোগী হয়ে ওঠার মতো একটা প্যারালাল মডেল। বলো, তুমি দেখোনি এ স্বপ্ন?”

“হ্যাঁ দেখেছিলাম।”

“তাহলে আজ তোমার সেস্বপ্ন কোথায়?”

“স্বপ্ন আর বাস্তবে অনেক ফারাক আছে। সে ছিল আমার কম বয়েসের রোমান্টিকতা। শুধু আমার কেন! আমার, তোমার, আমাদের সকলেরই।” কথাটা বলেই সকলের দিকে তাকাল সত্যব্রত। কিন্তু কারো মধ্যে কোনো ভাবান্তর দেখতে পেল না। শুধু সাগ্নিক বলে চলল, “ঠিক কথা। আমাদের সকলের। কিন্তু ওর তা ছিল না। ও মনেপ্রাণে পেরেছিল স্বপ্ন আর বাস্তবের ফারাকটাকে মুছে ফেলতে।”

“হুঃ! কর্মহীন হয়ে বাউণ্ডুলেপনা করে বেড়ানো যদি ফারাক মোছা হয় তাহলে আর–”

“কর্মহীন কাকে বলছো সত্যব্রতদা?” সুজাতা আর নিজের উদাসী-আলস্য ধরে রাখতে পারল না। না চাইতেও কণ্ঠে বিরক্তির ঝাঁজ ঝরে পড়ল তার। একথা সত্য, সারাদিন সেও নানা ভাবে নিজেকে দায় মুক্ত ভাবতে চেয়েছে। যত চেয়েছে ততই নিজের অস্ত্রে নিজেই ক্ষত-বিক্ষত হয়েছে। তাই এতক্ষণ ক্লান্ত শরীরটা নিয়ে এসব বাক-বিতণ্ডায় যোগ দিতে তার মন চায়নি। কিন্তু এখন আর সইতে পারল না। সোজা হয়ে বসল। কণ্ঠের ঝাঁজ নিয়ে প্রশ্ন করল সত্যব্রতকে। সত্যব্রত হয়তো এমনটা আশা করেনি। তাই একটু হকচকিয়ে গেল। ঠিক কী বলা উচিৎ, সেই যুতসই কথাটি যেন খুঁজে পেল না। সুজাতা একটু অপেক্ষা করল। তীক্ষ্ণচোখে তাকিয়ে থাকল সত্যব্রতর মুখের দিকে। কিন্তু কোনো উত্তর না পেয়ে আবার বলতে শুরু করল, “কর্মহীন তো ও ছিল না। বরং আমাদের সবার চাইতে ও কাজ করত অনেক বেশি। সবাইকে কাজে উৎসাহও দিত ওই সবচেয়ে বেশি। যখন হৈ হৈ-এর পালা সাঙ্গ করে আমরা হতাশ হয়ে পড়েছি, তখন ওই প্রতি মুহূর্তে আশ্বাস জাগিয়েছে আমাদের মধ্যে। আজ যে প্রফেশনে তুমি সফল, তাতে তোমাকে নামিয়েছিল কে? কে দিয়েছিল প্রাথমিক ক্যাপিটাল? ওই। সেই তার সম্পর্কে আজকের দিনে এসব কথা ভাবতে তোমার বিবেকে বাধছে না একটুও? ছিঃ!”

“ও। শুধু আমাকেই নামিয়েছিল না? আর তোমরা? তোমরা সব ধোয়া তুলসিপাতা! আমি জানি না, নিজে ওঠার জন্য তোমরা কে কীভাবে ওকে ব্যবহার করেছো! আজ যখন সাফল্যে তোমরা সব এক একটা দিকপাল, তখন নাকি কান্না দেখিয়ে ন্যাকামো করছো! আমি আর যাই করি, তোমাদের মতো ভেকধারী বৈষ্ণব সাজিনি কখনও! হুঃ! ছি! আমার বেলায় ছি! আর নিজেরা সব–”

“হ্যাঁ করেছি ব্যবহার। আর তা যে ও জানতো না তা তো নয়।” সুজাতার বদলে সাগ্নিকই উত্তর দিল সত্যব্রতর অভিযোগের। আবেগ তাড়িত কণ্ঠে বলল, “ও শুধু চেয়েছিল আমরা সকলে মিলেমিশে আনন্দে থাকি। জীবনটা একটা বোঝা না হয়ে যেন হয়ে ওঠে একটা আর্ট। নদীর চরে দাঁড়িয়ে অনন্ত আকাশের দিকে মেলে দিত দুই হাত। অকৃত্রিম কণ্ঠে বলতে পারত, ‘লাইফ ইজ আ গ্রেট আর্ট। বাট ডোন্ট ফরগেট, আর্ট ইজ অলয়েজ ফর লাইফসেক।’ কর্মহীন যে মাতলামোর কথা তুমি বলছো, সে তো শেষ দিকে। আমরা ওকে যত এড়িয়ে গেছি, ওর ভালোবাসাকে অস্বীকার করে আত্মকেন্দ্রিক হয়ে উঠেছি, বিরক্ত হয়ে ওর আবেগের বন্ধন থেকে মুক্তি পেতে চেয়েছি, অপমান করে ওকে তাড়িয়ে দিয়েছি, ততই ও মাদকাসক্তির দিকে ঝুঁকে পড়েছে। মুখের সামনে অপমান না করলেও ঘেরেঘারে সেটা বোঝাতে তো ছাড়িনি আমরা কেউই। সত্যব্রত, আমরা কবিতা লিখি কাগজে কলমে। ও লিখতো জীবন দিয়ে। লিখতো কেন! বরং বলা উচিৎ ওর জীবনটাকেই করে তুলেছিল একটা কবিতা। আজ সেই কবিতারই মৃত্যু হলো। এরপর ও লিখবে কাগজে কলমে। আমাদের মতোই বাহবা কুড়োবে নানান সভাসমিতিতে। ও মরেনি। যে মৃত্যু বহুদিন আগে হয়েছে আমাদের, সে মৃত্যুটুকুই আজ ঘটল ওর।”

কথা শেষ করে সাগ্নিক আবার জড়িয়ে ধরল হাঁটুজোড়া। তার ফাঁকে গুঁজে দিল নিজের মুখ। তাতে আড়াল হয়ে গেল তার অভিব্যক্তি। শুধু পিঠটা থেক থেকে কেঁপে উঠল কাটা ছাগলের মতো। প্রকাশ দত্ত তার পিঠে হাত রেখে বলল, “আমার মনে হয়, তুই একটু বেশিই আবেগগ্রস্ত হয়ে পড়ছিস সাগ্নিক। নিজেকে সামলা। দ্যাখ, ও এভাবে চলে যাওয়ায় কষ্ট আমাদের সকলেরই হচ্ছে। তাই বলে–”

“না না প্রকাশদা, আমাদের কি আর কষ্ট হচ্ছে? যত কষ্ট হচ্ছে সব ওদের দু’জনের।” প্রকাশ দত্তকে কথা শেষ করতে না দিয়ে চেঁচিয়ে উঠল সত্যব্রত। চাতালটা থেকে নেমে পড়ল ঝাঁপিয়ে। গলাটা তারও ভেঙে গেল। সেটাকে গিলে ফেলার জন্য একটা ঢোক গিলল। কিছুক্ষণ আগেই শ্মশানঘাটটার ধারে ধারে যে কয়েকজোড়া চোখ জ্বলজ্বল করে উঠেছিল, সেগুলো ঘাবড়ে গিয়ে গা ঢাকা দিল কাছেপিঠের ঝোঁপঝাড়ে। ডোমদের ছেলেটা চমকে উঠল। ভুলে গেল চিতা খুচাতে। তাকাল চাতালটার দিকে। সেসব তোয়াক্কা করল না সত্যব্রত। স্থানকাল ভুলে কান্নাভাঙা গলায় চিৎকার করল, “মুখে তো আজ খুব বড়ো বড়ো কথা বলছো! তাহলে তোমরাই বা কেন ওকে এড়িয়ে চলতে? কেন শেষ পর্যন্ত পাশে থাকলে না? মুখে ওরকম তত্ত্বকথা সবাই আওড়াতে পারে। তুমি জানো, প্রতিটা মুহূর্ত ও আমাকে কীভাবে জ্বালিয়েছে? আজ এখানে চল, কাল সেটা কর। ওর জন্য আমি–আর আজ–আজও–ওঃ! স্বার্থপর–মাতাল–কাণ্ডজ্ঞানহীন! একটা–একটা–”

শেষকথা আর খুঁজে পেল না সত্যব্রত। কান্নার যে দলাটা এতক্ষণ আটকে ছিল কণ্ঠে সেটাই অঝোরে ঝরে পড়ল হু-হু করে।

প্রথম থেকেই কিছুটা দূরে মাটিতে পাছাপেতে বসেছিল হাবাগোবা প্রশান্ত। হাঁটুতে থুতনি পেতে একদৃষ্টিতে তাকিয়েছিল চিতার মাঝে তিলে তিলে ক্ষয়ে যাওয়া শরীরটার দিকে। হঠাৎ সে উঠে দাঁড়াল। চিতা থেকে ফিরিয়ে নিল দৃষ্টি। এক লাফে চলে এল চাতালটার কাছে। দু’টো চোখের জ্বলন্ত দৃষ্টি নিক্ষেপ করল সকলের মুখের উপর। সত্যব্রতর মতোই গলা তুলে চিৎকার করতে চাইল, “ঠিক বলেছো সত্যদা। একদম ঠিক বলেছো। বাস্তব জ্ঞানহীন একটা মাতাল, তার এরকম পরিণতিই হওয়া উচিৎ। ও জানতো না, এ সমাজে বাস করে ওভাবে একসঙ্গে বাঁচার স্বপ্ন দেখতে নেই? অন্যরকম দৃষ্টান্ত গড়ার সাহস সে দেখায় কোন আক্কেলে? এসব যে এ সমাজে ঘোরতর অন্যায়, যে এ সত্যটুকু বোঝেনি তার আরও ভয়ংকর পরিণতি হওয়া উচিৎ। সভ্য সমাজের কাছে সে ক্ষমার আশা করে কোন দুঃসাহসে! ক্ষমা করো না। তোমরা কেউ ক্ষমা করো না ওকে। কড়ায়গণ্ডায় প্রতিশোধ নাও প্রতিটি ক্ষতির। খাড়ার ঘা’টুকুও বাকি রেখো না। এসো, এসো সবাই।”

কিন্তু মুখ দিয়ে একটি শব্দও উচ্চারিত হল না। বদলে অর্থহীন কতকগুলো গলগল আচ্ছন্ন করে ফেলল তার চাওয়াকে। মুখের রেখাগুলো সব কিলবিল করে উঠল। চাতালটা থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়ে তাকাল এদিক ওদিক। হাতের কাছে কিছু না পেয়ে ছুটে গেল ডোমদের ছেলেটার কাছে। তার হাত থেকে কেড়ে নিল বাঁশের লাঠিটা। দুমদাম বাড়ি মারতে মারতে ঝাড়তে থাকল শরীরটার উপর জমা হওয়া কার্বন। অমনি লকলক করে মাথা তুলল চিতার আগুন। সে-আগুন তার চোখের জল আর কষ বেয়ে গড়িয়ে পড়া লালাতে তরল হয়ে ঝরে চলল একরোখা আক্রোশে। হকচকিয়ে গেল ডোমদের ছেলেটা। তার হাতেই লাঠিটা ফেরত দিয়ে প্রশান্ত আবার কীসব গলগল করে বলে গেল জ্বলন্ত শরীরটাকে। থুতু ছিটিয়ে হঠাৎ চিৎকার করে কেঁদে উঠল আকাশের দিকে তাকিয়ে। ঠিক এই মুহূর্তেই ঝোঁপঝাড়গুলো থেকে সমস্বরে চিৎকার জুড়ে দিল জ্বলন্ত চোখগুলো–হুক্কি-হুয়া–হুয়া–হুয়া–হুয়া–

সেচিৎকার আর প্রশান্তর কান্না মিলেমিশে খানখান করে দিল রাত্রিকালীন শ্মশান-মৌনতাকে। তবু জ্বলন্ত চিতায় একটু একটু করে ছাই হতে থাকল একটা গোটা অথচ অসম্পূর্ণ কবিতার এক একটা পঙক্তি। আর আশপাশে হুতাশ তুলল একটাই কথা– “লাইফ ইজ আ গ্রেট আর্ট। বাট ডোন্ট ফরগেট, আর্ট ইজ অলয়েজ ফর লাইফসেক।”

 

(দুই)

ফট করে ফাটিয়ে দিল মাথাটা। গদগদ করে বেরিয়ে এল এতদিনের রক্ষিত স্মৃতি। হাত-পাগুলো তো আগেই গিয়েছিল। এখন বাঁশের খোঁচায় ফালাফালা হয়ে গেল বুকটা। বেরিয়ে এল হৃৎপিণ্ড। সেটাকেই বাঁশের চাপে থেতলে দিচ্ছে ডোমদের ছেলেটা। বড়ো সাধ ছিল, নিজের ঘাটপূজার পূজারি হবো নিজেই। কিন্তু তা আর হলো না। ভাইপোটা সারাগায়ে ঘি মাখিয়ে বেমুখ হয়ে মুখে ঠেকিয়ে গেছে পাঠকাঠির আগুন। এখন তারই দাউ দাউ বেষ্টনে আমিও জ্বলন্ত আঙরা।

নাম? আমার? তাতো ঠিক বলতে পারবো না। কত নামেই তো ডাকে লোকে। কেউ বলে প্রকাশ, কেউ বলে সাগ্নিক, কেউ সত্যব্রত, সমীর, সুজাতা আরও কত কী যে! এমনকি প্রশান্ত নামেও ডাকে কেউ কেউ। সেসব ডাকাডাকির সরগোল থামিয়ে আমি যে ঠিক কোনটি আজও তা বুঝে উঠতে পারিনি।

অ্যাঁ? কী বলছেন? বয়স? এই তো আপনাদের সমস্যা মশায়! চোখের সামনে আস্ত একটা আমিকে পেয়েও আপনাদের খেদ মেটে না। বয়স জিজ্ঞাসা করছেন। এরপরই আসবে বাবা-মা। তারপর ঘরবাড়ি–সুলুক-সন্ধান। আপনার কৌতূহল তাতেও বাগ মানবে না। উঁকি দেবে আমার শোবার ঘরে। বিছানায় ক’টি চুল ঝরেছে! তাদের দৈর্ঘ কত! সেটুকুরও মাপ না জানা পর্যন্ত আপনাদের স্বস্তি নেই।

জন্ম? হ্যাঁ তা হয়েছিল বৈকি। কী মুশকিল! সত্যিই তো আর কেউ আকাশ থেকে টপকে পড়ে না। সুতরাং জন্ম আমারও হয়েছিল। তবে ঠিক কবে সেহিসেব দেওয়া আমার পক্ষে বেশ মুশকিল। কেউ বলে, যখন সারা তপোবন কাঁপিয়ে অনুরণিত হয়েছিল,

“মা নিষাদ প্রতিষ্ঠাং ত্বমগমঃ শাশ্বতীঃ সমাঃ।

যৎ ক্রৌঞ্চমিথুনাদেকমবধীঃ কামমোহিতম্।।”

তখনই আমি টুকুস করে ঝরে পড়ি কবির চোখ থেকে। আবার কেউ কেউ তো সেটাকেও উড়িয়ে দিতে চায়। বলে, “আরে ধুর! তা কেন হবে? সারা বন নিজ্ঝুম। চারিদিক শ্বাপদের ভয়ে কম্পমান। হঠাৎ জ্বলে উঠলো আগুন। তাতে গোব্যচর্বি আহুতি দিয়ে যেই উচ্চারিত হলো,

অগ্নিমীলে পুরোহিতং যজ্ঞস্য দেবমৃত্বিজম্। হোতারং রত্নধাতমম্।।”

ঠিক তখনই নাকি আমার কায়াধারণ। কিন্তু আমি বলি তাও নয়। সেই যে, বনের মর্মরে প্রথম কোনো মনে জেগেছিল হুতাশ, ঝর্ণার কলকলে প্রথম কেউ শুনেছিল মেঘমল্লার, কেউ বা পুলকিত হয়েছিল বর্ষাবতী মেঘের গর্ভসঞ্চারে, কিংবা ঘাসফুল তুলে গোপনে সাজিয়ে দিয়েছিল কোনো লাজবতীর খোঁপা–তখন। হ্যাঁ, তখনই আমি কায়া ধারণ করেছিলাম।

কী বলছেন? ওই যে মাতম চলছে শ্মশান ঘাটকে ঘিরে? ওটাও তো আমার এক জন্মই গো।

অ্যাঁ? মাথাটা? একেবারেই গেছে? হে-হে-হে–তা গেছে। পাগল হয়েই তো সবাই অন্যকে পাগল বানায়। তবে আমি এমনি এমনিই পাগল হয়নি। তার পিছনেও একটা গল্প আছে বৈকি। আছে কাউকে নিজের করে পেতে চাওয়ার উন্মাদনা। আর আছে তাকে গোপনে লালন করার মতো দু’টি অনিমিখ চোখের কোল।

তবে বলি শুনুন, সেদিনও ছিল এমনি অঘ্রানের অমাবস্যা। ঘুরঘুট্টি অন্ধকারের বুকচিরে উড়ে বেড়াচ্ছিল জোনাকির কিলবিল। আমি বসে যে কী সব সাতপাঁচ ভাবছিলাম! হঠাৎ একটা মধুর গান শুনতে পেলাম। যেন বহুদূর থেকে ভেসে আসা কোনো বন্দিনীর মোহিনী কান্না। কেউ গাইছে,

“আঁধারগর্ভে আলোর ঝিলিক জাগে

রোদের নাকি বিরহতে বাস

খবর এলো মহুলগাছের পাতে

পথ চাওয়াচোখ কাটায় বারোমাস

 

অন্যপারেও আকুলচোখের দিন

নদীর বুকে জমায় বিষাদচর

বর্ষাজাগান ব্যঙ-ডাহুকের গানে

গোপন সে স্রোত খেলে অন্তাক্ষর

 

এমনি করেই খেলার খেলায় রোদ

গভীরচোখে করে জ্যোৎস্নাস্নান

নাব্যশীতের একটিমাত্র চাওয়া

রোদের ছোঁয়ায় ভাঙুক অভিমান…”

আমি ছুটলাম সেসুরের সুতো ধরে। বেশ খানিকটা যাওয়ার পর দেখলাম সে এক বনবালিকা। ধু-ধু প্রান্তরে বসে একাই গাইছে তার গান। আমি কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। ফিসফিসিয়ে ডাকলাম, “শোনো!”

মুখ তুলে চাইল সে। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, “এ গান কার জন্য গাইছো তুমি মেয়ে?”

কোনো উত্তর দিল না। ফিরিয়ে নিল মুখ। ওই নিকষ অন্ধকার ফালাফালা করে চেয়ে রইলো দূরে। আমি বসলাম ঠিক তার পাশটিতে। বললাম, “তোমার এ গানের ভাগ দেবে আমাকে?”

আবার চাইল আমার দিকে। হাসলো যেন একটুখানি। তারপর উঠে দাঁড়ালো। পা বাড়ালো সেই অন্ধকারে। আমি সেখানেই বসে রইলাম। কতক্ষণ তা জানি না। সময়ও যেন আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল ওই একটি সুরের অনুরণনে। একসময় পুবের আকাশ ফাটল ধরালো আঁধারের গায়ে। আমি উঠলাম। মনে মনে গুনগুন চলতেই লাগল–‘রোদের ছোঁয়ায় ভাঙুক অভিমান…’

তারপর থেকে যে কতবার কত জায়গাতেই দেখেছি তাকে! কখনও গোবরকুড়ানির ক্লান্তিতে, কখনও দূর চর থেকে জল বয়ে আনা গৃহবতীর কাঁকালে, কখনও বা শুয়োরের পাল নিয়ে প্রান্তরচরা বালিকার উদাসী চাউনীতে। আরও যে কোথায় কোথায়–রাত্রি-প্রান্তরে নির্জনতার মতো, তার হিসেব নেই। বিমূঢ় গাছেরাও অবাক মেনেছে মনে মনে। হয়তো ভেবেছে, এ কোন্ কাঙ্গাল! সর্বস্ব লুটিয়ে হয়েছে বিবাগী! ভস্মকে করেছে ভূষণ। হ্যাঁ, তখন আমি বামাচারী। গায়ে ধুলিধূসর নিঃস্বতা। আকুল পিপাসায় কাতর প্রতিটি অঙ্গ। কিন্তু কী সে, তা নিজেও জানি না। শুধু নির্নিমেশে চেয়ে থাকি ধু ধু প্রান্তরের দিকে।

তারপর একদিন। সেদিনও ছিল আষাড়স্য প্রথম দিবস। প্রান্তরজুড়ে ঝুলে পড়েছে মেঘ। মেঘ জেগেছে চোখের কোণে। বিবাগী মন গুনগুন করে আওড়াচ্ছে বীজগ্রহণের গান,

“যেসব শুধুই মেঠো,

যেসব শুধুই সোঁদা,

যে ফুলটি অযত্নে ফোটে,

তার মিটিমিটিতেই

যত ঝোঁক ছেলেটির।

দ্যাখে, আর বলে,

আমরাও একদিন গাছ হবো–

মাটির গভীর থেকে

তুলে নেবো নাইট্রোজেন;

বৃষ্টি হবো চাতকের–

নদীর কাঁকাল থেকে

ছেঁচে নেবো মাটিজনমের

গুপ্ত ইতিহাস–

 

ভালোবাসা, আসলে একটি

নীরব লেনদেন!

 

ঠিক এ সময়ে বৃষ্টি এল।

বৃষ্টি হল পাতা থেকে ডালে–

বৃষ্টি এল চোখের তারায়।

ভিজল তাতে শুকনো কথা

সুপ্ত বীজের গুপ্ত ব্যথা।

 

দিগন্তের কোলে হাত পেতে

মেয়েটিই গাইল,

বীজ গ্রহণের গান।

বীজ দাও বীজ দাও…

জলের আশ্রয় হবো আমি।

দুঃখ হবো যত সৃজনের–

একটি আকাশ মুছে গেছে

একটি আকাশ গড়ে নেবো

নীল বেদনের।

 

এমনি করে নিরুদ্বেগে

বিকেল গড়ায়–

রক্তিম হয় দিগন্ত;

ছেলেটি আর মেয়েটি

গড়ে আবোলতাবোল,

নদীচরে বেলা বয়ে যায়।

 

বেলা বয় বেখেয়ালে;

স্বপ্নগুলি সরে সরে হায়

কখন ছেলেটি মাটি ভোলে!

কখন মেয়েটি হাত পেতে

স্বপ্ন হারায়!

 

এখন শুধু তপ্ত বাতাস

ব্যথাদীর্ণ ঘ্রাণে

কানে কানে কেঁদে ফেরে

বরষণ বিহীন অভিমানে।

বরষণ নেই বরষণ নেই

স্তব্ধ ব্যাঙেরা ডাকে–

আয় ছুঁয়ে যা সোনার মেয়ে

ফেলে যাওয়া গাছটাকে।

ছুঁয়ে দ্যাখ গাছেদের

প্রাণহীন জাইলেম–

এই মরুতে বুনবি প্রেম

সেই আশায় ঘুরে এলেম।

 

তুই হবি ক্লোরোফিল

আমিও ফুলের বেদনায়–

একবার শুধু আনমনে

হেসে ডাকিস। দেখিস

ফুল হয়ে ফুটতে পারি

তোর একলা বারান্দায়…”

হঠাৎ আমার কাঁধে পেলাম একটা ছোঁয়া। যেন বহুদিনের কাঙ্খিত এক স্পর্শ। আমি চমকে উঠলাম। চেয়ে দেখলাম, আমার ঠিক পাশটি ঘেঁষে দাঁড়িয়েছে ওই স্বপ্নহারানো মেয়ে। সুজাতা! না, না। এ যে সত্যব্রত! নাকি সাগ্নিক! নাকি প্রকাশ-সমীর অথবা প্রশান্ত! কিংবা তারা কেউই নয়। এ আসলে ঘোর জাগানিয়া সেই বনবালিকাই। তার নিটোল জঙ্ঘা আমার মাথা ছুঁয়ে। কী যে ঘ্রাণ আমার নাকে! তা বোঝানো কোনো শব্দের কম্ম নয়। আচ্ছন্নের মতো উঠে দাঁড়ালাম আমি। হাত বাড়ালাম। আঁজলায় ভরে নিতে চাইলাম সে মেঘবিলাসীর মুখ। অমনি আমার বুকে একটা ধাক্কা দিয়ে দৌড় দিল সে। আকাশে দেখা গেল বিদ্যুতের ঝিলিক। মেঘ গর্জনের সঙ্গে তার খিলখিল হাসি যেন চারিদিকে প্রতিধ্বনিত হতে লাগলো। অমনি বর্ষণহীন যে আকুলতা এতক্ষণ গুমরে মরছিল নীরব গুনগুনানিতে, তাই ঝরে পড়ল দিগ্বিদিকে। আমি পাগলের মতো চারিদিকে ছুটে বেড়াতে লাগলাম। কিন্তু আর দেখা পেলাম না তার। আকাশের অঝোর আশ্রয় নিল আমার চোখের কোণে।

তারপর? তারপরটা আর নাই বা শুনলেন। ওটুকু না হয় আমার জন্যই থাক। একান্ত আমার হয়ে। সমীরের কিংবা প্রকাশের হয়ে। সাগ্নিক কিংবা সুজাতার–সত্যব্রত বা প্রশান্ত অথবা চিতা খুচানো ওই ডোমদের ছেলেটার হয়ে।

অ্যাঁ? ধাপ্পা দিচ্ছি? না, না। বিশ্বাস করুন, এ আমার প্রলাপ নয়। অ্যাঁ? তাহলে মরলাম কেন? কী মুশকিল? পৃথিবীর কোন জীব অমর? কোন মানুষটাই বা না মরে অনন্তের থেকে কায়া ছিনিয়ে নিতে পারে? ও আচ্ছা! তাই বলুন, এতে আপনাদের মতি নেই। বেশ তাহলে যেটুকু না বললে আপনাদের কৌতূহলের নিরসন হয় না, তাই বলি। তবে প্রথমেই কয়েকটা কথা পরিষ্কার করে দেওয়া ভালো। এতক্ষণ শ্মশান ঘাটে ওদের–মানে আমার মৃত মুখদের থেকে যা কিছু শুনলেন, সেটুকুই সব নয়। হ্যাঁ, আমি মাতাল। কিন্তু তা কোনো অভিমানের চোরাস্রোত নয়। আপনাদের সামনে আমি সত্যি কথাই বলবো। নেশা, নেশা। এক সর্বনাশা মোহময় আসক্তি। সেই ভয়ংকর আসক্তিতেই আমি মাতাল। তাই তো আজও এত হুতাশ জাগে প্রান্তরের একলাসেড়ে তালের পাতায়। অস্থির হয়ে ছুটে চলে নাম না জানা নদী। পুড়ে খাক হয়ে যায় সমীরের কিংবা প্রকাশের মন, সাগ্নিক কিংবা সুজাতার আবেগ, সত্যব্রত বা প্রশান্তর ধৈর্য অথবা চিতা খুচানো ডোমদের ছেলেটার উদাসীন ক্লান্তি।

হ্যাঁ, একথা ঠিক, আমি কাউকেই জোর করে আমাতে আসক্ত করিনি। বরং ওরা নিজেরাই মেতে ছিল আমাতে। ওরাই স্বপ্ন দেখেছিল প্যারালাল মডেলের। ওই যে সুজাতা! সে তো আমার জন্যই নিঃস্ব! কিন্তু কী দিতে পেরেছি তাকে! জানি, আপনারা বলবেন, দেওয়ার কোনো দায় নিয়ে তো বাপু তুমি ধরা দাওনি। সেও কোনো আশা রাখেনি তোমার কাছে। সেকথা অবিশ্যি সত্য। তবু তো মন চায়। নিজেরটি করে পেতে। অন্যেরটির হয়ে ধরা দিতে। সেই চাওয়া থেকেই তো আমি তাড়িয়ে নিয়ে বেড়িয়েছি ওদের। মুক্তির মোহে আষ্টেপিষ্টে বেঁধে ফেলেছি অজ্ঞাত আকর্ষণে। যখন দম বন্ধ হয়ে এসেছে, তখন কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে ফিসফিসিয়ে বলেছি, “জীবন! সে এক মস্ত শিল্পকলা। এক অন্তহীন দুঃখ যাপনের নাম।”

বলেছি বটে! কিন্তু নিজেই কি পেরেছি তাকে আর্ট করে তুলতে! নিজের নেশায় নিজেকে হারিয়ে ফেলেছে সুজাতা। সাগ্নিকও তরী ভিড়িয়েছে নিজের চাহিদার কিনারে। বাকি সবরাও তো যে যার মতো। আমিই শুধু এখনও পাক খেয়ে মরি ধু-ধু প্রান্তরের ঘুর্ণী হয়ে। আমার বুকজুড়েই শুধু ঘুঘু ডাকের হাহাকার– ঘুঘুচ্চু–ঘুঘুচ্চু–ঘুঘুচ্চু–

যেমন করে প্রতিটি পুরুষ কাঙ্গাল হয় প্রতিটি নদীর কাছে। আর নদী হয়ে ওঠে এক-একটি নারী–তাদের কাছেই চেয়েছি কৃপাভিক্ষা। হয়ে পড়েছি জ্বলন্ত কাঠ। নিজে তো পুড়েছিই। পুড়িয়েছিও চারিপাশ।

এই যে আধপোড়া দেহ, এই যে ফেটে যাওয়া মাথা, এই যে তিলে তিলে ক্ষয়ে যাওয়া যাপনের আস্বাদ; এ সাধনাই তো আমার সাধনা–সমীর কিংবা প্রকাশের, সাগ্নিক কিংবা সুজাতার, সত্যব্রত বা প্রশান্তর অথবা ডোমদের ছেলেটার সাধনা! এই তো ইতিহাসের গতি। ভবিষ্যতের পরিণতি! তাইতো–

প্রিয় নদীটির পাশ দিয়ে

বয়ে গেছে যে গুল্মসিরিজ

তারা জানে, ইতিহাস

শুধুই নিষিদ্ধ

পাণ্ডুলিপির প্রলাপ!

 

এই ক্ষয়ে যাওয়া দিন,

এই চিতামগ্ন হাড়,

এরাই জানে, যাপন

মানে স্বপ্নের আশ্বাস।

 

অথচ দৈনন্দিনতা মন খারাপের বাঁশি…

তার সুরে গাছেদের শাখা

নিমগ্ন উপশিরার পাঠে।

তবু নিশিশ্মশানের ধারে

প্রিয় তারাটি ঈশারা করে

আয়, কাছে আয়

চিরন্তনতার সূত্র ধরে…

Pages ( 19 of 20 ): « Previous1 ... 1718 19 20Next »
Close Menu
×
×

Basket