পুরনো ওয়েবসাইট থেকে পুনরুদ্ধার করা লেখা। ছবি ও কিছু অংশ শীঘ্রই যুক্ত হবে।
পর্ব-১৬
স্টেশনের কাছে দাঁড়িয়ে আছে দিবাকর। সকাল থেকেই দাঁড়িয়ে আছে। কোনো ট্রেনের আসা-যাওয়া নেই। প্যাসেঞ্জার নেই। স্টেশনের কাছেই দাঁড়িয়ে আছে দিবাকর। ট্রেন তো আসবেই। সে উঠবে কোনো কামরায়। বিক্রি করবে ঝলমুড়ি। দশ-টাকা ঠোঙা। সকালের ট্রেনে আদ্রা অব্দি যাওয়া। ফিরতে ফিরতে দুপুর। দুপুর হয়ে গেছে আজও। দিবাকরের একটুও খিদে পায় না। পেট মরে গেছে। মন মরে যাবে শিগগির। বিধবা মায়ের একমাত্র সন্তান দিবাকর। দিবাকর দে। তার বাবা কাজ করতো মল্লিকদের গোলদারি দোকানে। হঠাৎ মারা গেল। দিবাকর তখন ক্লাস টেন। মাধ্যমিক দিতে পারে নি। তার মায়ের তরফ থেকেও দিবাকরের উপর চাপ ছিল না। লেখাপড়ার প্রতি ও তার আগ্রহ ছিল না। ছোট ছিল বলে মা চাপ দেয়নি।
কিন্তু কতদিন আর! সংসারে নেই নেই নিঃশব্দ এক আর্তনাদ, দিবাকর শুনতে পেয়েছিল তার ১৯ বছর বয়সেই। তার মা-ও ছেলেকে ঢুকিয়ে দিয়েছিল মল্লিকদের হোটেলে। বেতন যাই হোক দু’বেলা খেতে তো পাবে। দিবাকরকে চিনতো শ্যামাপদ মল্লিক। স্বজাতি বলেই চিনতো। তাই হয়ত দিবাকরের মায়ের এক কথায় দিবাকরকে কাজে রেখেছিল শ্যামাপদ মল্লিক। খুব সামান্য বেতন। দৈনিক ৬০ টাকা। দিবাকরের মায়ের মনে হয়েছিল, ৬০ টাকা ও যথেষ্ট টাকা। খাওয়ার খরচ তো লাগছে না। সে নিজে একা একা চারটি চাল ফুটিয়ে খেয়ে নিতে পারবে। দিবাকর দেখলো এক মাসের মধ্যেই শুধু ভাত পরিবেশন নয় তাকে এঁটো থালা বাটি ধুতে হচ্ছে। সে বাড়িতে গিয়ে মাকে জানায়। মা বলে, দু চারদিন কর্—আমি শ্যামাপদকে বলে দিব—তোকে দিয়ে আর এঁটো থালা-বাসন ধোয়াবে না। দেখছিস তো কোথাও কোনো কাজ নেই—এখন মন দিয়ে কর্। পরে দেখবি, বেতনটাও বেড়েছে। দিবাকর দু’মাসও থাকতে পারেনি। দুম্ করে ছেড়ে দিল কাজ। তার মা ছেলেকে কিছুই বলে না। শুধু মলিন হয়ে যায় মনে মনে।
দিবাকরের বাপের জমানো কোন টাকা নেই। একসময় ব্যবসা করার জন্যেই পুরুলিয়া এসেছিল বাঁকুড়া থেকে। লোকটার মাথায় ব্যবসা-বাণিজ্যের কোনো বুদ্ধি ছিল না বলে, ঘরে বসে বসে শেষ করেছে পুঁজি। তারপর তো লোকের দোকানে কাজ। দিবাকরের মা ভাবে কপাল তার মন্দ। নইলে শ্বশুরের ভিটা ছেড়ে পুরুলিয়াতে আসে! দিবাকরের এক বন্ধু এক হকারের সঙ্গে তার যোগাযোগ করিয়ে দিয়েছিল। কথা শুনে আগ্রহ প্রকাশ করেছিল দিবাকর। স্বাধীন কাজ। পুঁজিও লাগবে না বেশি। কেবল হকার ইউনিয়নের একটা হ্যাঁ চাই। ব্যবস্থা হয়ে গেছিল সব। ট্রেনে হকারি করতেও মনে এক বৈচিত্র পায় দিবাকর। কত রকম প্যাসেঞ্জার কত রকম মুখ। নানা কথা। কেউ কেউ বলে, ১০ টাকায় এই এতোটুকু! নারকেলের পিসটাও কত ছোট রে বাবা। আবার কেউ কেউ চুপচাপ ১০ টাকা দিয়ে মনের আনন্দে ঝাল মুড়ি খায়। হকারি লাইনে হকার বন্ধু জুটে গেছে অনেক। কেউ হয়তো সারাদিন চা বিক্রি করে। কেউ বা রুমাল বিক্রি করে। তাদের কারো কারো বাড়িও গেছে দিবাকর। কুশটাঁড়ের এক বেনে ঘরেও একবার গেছিল সে বিয়ে বাড়ি উপলক্ষে। হকার বন্ধুটির বোনের বিয়ে ছিল। সেই বিয়ে বাড়িতেই তার বন্ধুর মা তাকে বলেছিল, তুমি তো আমাদের বেনে ছেলে বাবা, আমার এক বোনের মেয়ে আছে তাকে উদ্ধার করে দাও। দিবাকর কিছুই বলেনি। হকারি করে কে বিয়ে করা যায়? কোনো ভবিষ্যৎ নেই যে। ট্রেনে যেতে যেতে জানলা দিয়ে দেখে, রেল লাইনের ধারে ধারে ঝুপড়ি ঘর। তার ভালো লাগে। কেননা, আজও তো তার ও তার মায়ের জন্য কোনো ঘর নেই। ভাড়া ঘরে থাকতে হয়।
এখন একটাই রক্ষে, হকারের কাজ। স্বাধীন কাজ। ১২ ঘন্টা করতেও হয় না। আর এখন কোনো ট্রেন নেই। ট্রেনের আসা-যাওয়া নেই। রেলের লাইনগুলি ট্রেনের চাকায় পিষ্ট হয়ে যেরকম ঝকমক করতো, এখন করছে না। যেন তারাও মিইয়ে গেছে। তাদের কাছেও কোনো স্পর্শ নেই। চাকার ঘর্ষণ থেকে খুশির যে ফুলকি ওড়ে এখন উড়ছে না।
এখন লকডাউন।
এখন করোনা-ভাইরাস। এখন বন্ধ বন্ধ বন্ধ।
স্টেশনের কাছেই দাঁড়িয়ে আছে দিবাকর। হঠাৎ মনে হলো তার—সামনে এসে কেউ যেন বলছে: দিবাকর, দিবাকর আমাকে একটা ঠোঙা দাওতো—ট্রেন এসে গেল আমার। তুমিও তো উঠবে কামরায়। চলো চলো—
কোথায় যাবে দিবাকর?
লাইনে জল পড়ছে।
হঠাৎ বৃষ্টি।
১৮ বৈশাখ, ১৪২৭
রাত্রি: ৮-৩১