সোনাঝুরির লাল কাঁকড়ের রাস্তার পাশ দিয়ে এক-সমুদ্র সফেন-শব্দ হ

পুরনো ওয়েবসাইট থেকে পুনরুদ্ধার করা লেখা। ছবি ও কিছু অংশ শীঘ্রই যুক্ত হবে।

সোনাঝুরির লাল কাঁকড়ের রাস্তার পাশ দিয়ে এক-সমুদ্র সফেন-শব্দ হেঁটে চলে গেলে যতটা নীরবতা, তার চেয়ে একটু বেশি আকুলি-বিকুলি যাপন নিয়ে কবি অমিত সাহার লেখাসমুদ্র ‘পাহাড়িয়া পাথরে’ লেখা কবিতাগুচ্ছ ‘শূন্যতার আরও কাছে আসি’ (কবিতা আশ্রম, বনগাঁ, ১৫০ টাকা) কিছু ‘সরল সান্ত্বনাহাসি’ আর আবহমানের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে সন্তর্পণে এসে দাঁড়িয়েছেন পাঠকের সামনে। তাঁর লেখা-পথের প্রতিটি পাথরে পড়ে আছে কবিতা-কণা। তাঁর আপাত-সফল জীবনের আড়ালে থাকা নানা সংগ্রাম নিয়ে কত কথা শোনা-র জীবনে তবু অমিত স্বীকার করেন, ‘অভিমানী হওয়ার কোনো গুণ আমার ছিল না।’ আজীবনের সহজ পথের ‘প্রতিম্বিম্বের প্রতিশ্রুতি’ তাঁর চলার পথে সশব্দে হেঁটে চলে। আর কবি দেখেন, শুকতারার সামনে মেঘের সামিয়ানা টাঙানো রয়েছে কেমন। এইসব মন-কেমনের লিপি, এইসব আমার-তোমার-আমাদের ‘খুচরো স্মৃতির চৌরাশিয়া আবহ’ চেয়ে আছে সমস্ত কবিতা-বইটির পাতায়-পাতায়। নিজের প্রতিটি অণুভবের কাছে, নিজের সামান্য গদ্য-বহতার স্বপ্নচারিতা নিয়ে অমিত এক ‘শব্দ-নেশাগ্রস্ত কবি’, যে ‘সোনাঝুরির শেকড়ে কান পেতে/ ব্রহ্মনাদ শোনে।’ আর দেখে কীরকম ‘পাতাদের প্রচ্ছদে ঘুমিয়ে পড়েছে ক্লোরোফিল’। এই মুগ্ধ ভাষাসংশ্লেষ তাঁকে শিখিয়েছে আসলে ‘প্রতিটি কবিজন্মই প্রতিকূল যাপনে অভ্যস্ত।’ আমাদের কেবল সেই প্রতিকূলতার কাছে দাঁড়ানো বাকি। তবু আমাদের সংশয় নিয়ে ক্লান্ত, আঘাতে-আঘাতে দীর্ণ অমিতকেও ভাবিয়েছে সেই প্রশ্ন। ‘তবে কি কবিতা মিথ্যা? সত্য শুধু শরীরের ঘাম?/ … মাথা নীচু বসে থাকি, শব্দে-শব্দে শব্দ-হীনতায়/ অগুনতি তারার মতো শূন্যতার আরও কাছে আসি।’ অমিতের শুরুর দিকের অন্বেষণ আর কবিতার নুড়ি-কাঁকড়ের শব্দে লেখা কবিতামালা নিয়ে ‘পুরোনো চিঠির মতো গাছভর্তি মায়াময় মেঘ’ সমস্ত বই-এর এখানে-ওখানে ছড়িয়ে রয়েছে। রয়েছে এক অমোঘ উচ্চারণ-ও। ‘প্রকৃতি মিথ্যুক নয়’। আর সেই বিশ্বাসের কাছে, শূন্যতার কাছে এসে অমিত এসব সাফল্য-ব্যর্থতার হিসেবের গোলমালে কেবল বলে যাচ্ছেন, ‘এসো ব্যর্থ নিয়ে বাঁচি, সফলেই পৃথিবীর ভয়’। আপনার এই ডাকে আমরাও সামিল হলাম।

তোমাকে না পাওয়ার ক্ষতগুলোয়’ লেগে থাকা মাছরাঙার পালকটিও আজ রঙিন। তাহলে আর আর আমাদের মনখারাপ করে কী লাভ? তবু, মনে হয়, দেখি। মনে হয়, কখনও তুমি কেঁদে উঠলে পাশে দাঁড়াই। তুমি কি টের পাও আমার এই এসে দাঁড়ানো? আর আমি যে ‘ঘুম আসছে না — এই লাইনটা কিছুতেই লিখতে পারছি না।/ লিখছি আর কাটছি। যতবার যতরকম ভাবে লিখি/ মনে হয় মরা লাইন।’ তাকিয়ে তাকিয়ে দেখি, ‘চাঁদ থুতু ফেলছে…’ আর ‘জ্যোৎস্না বিঁধে আছে। পাখির ডানায়’। আর এইসব হৃদয়সংবাদী নানান কথামুখরের রাত্রে ‘ফোন খুলেই তুমি লিখছ — ঘুমোওনি!’ এরকম সব স্বপ্নছবি, এরকম সব অস্তরাগ, ঝিঁঝিদের গান, জাতকের গল্প নিয়ে আমাদের বিভ্রমের জীবনে এসে চুপিচুপি দাঁড়ালেন কবি বঙ্কিম লেট। তাঁর ‘কুর্চিফুলের ফিনকি লিলির ফোয়ারা লাল ভ্রমরের ঘূর্ণিঝাঁক’ দেখতে-দেখতে মনে হবে, সেই প্রেমের কথা, কল্পনায় যে এলে দেখতে পেতাম, ‘নাভি জুড়ে ফুটে আছে জারবেরা ফুল’। এসব কল্পনার রাত্রে আকাশমুখরতার দিকে তাকিয়ে দেখা স্বপ্ন মনে পড়ে। মনে পড়ে তুমি ‘জলপাই কাঠের সিড়ি ভেঙে/ নীচে নেমে আসবে একদিন/ পর্দা সরাবে, জানালা খুলবে/ দেখবে আরেকটি জলপাই গাছে/ হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে কবেকার বাতাস’। এই কবেকার বাতাসের খোঁজে বঙ্কিমের কবিতা বই, ‘জ্যোৎস্না বিঁধে আছে’ (কবিতা আশ্রম, বনগাঁ, ১৫০ টাকা) শব্দে-শব্দে, পাতায়-পাতায় কী ভীষণ পরিপূর্ণ তাঁর আন্তর্জাতিকতা বোধের শব্দপ্রকাশে। বঙ্কিমের কবিতায় কেবল ‘থোকায় থোকায় ফুল নয়’, রয়েছে ‘আমাদের নিত্যঅশ্রু/ আনন্দের ফল্গুধারা’। তাঁর কবিতার মাঠে পুড়ছে আজীবনের ছায়াময়ূর। আর শব্দ নিয়ে খেলতে-খেলতে বঙ্কিম শুনতে পাচ্ছেন, ‘সব শব্দ শব্দ নয়’। নৈঃশব্দের সাজানো পাবকপুষ্প সাজিয়ে এই এসে দাঁড়ানোকে  আসুন, হে পাঠক, আমরাও কোনও মেষপালকের প্রিয় গান শোনাই।

মন্তব্য করুন