পুরনো ওয়েবসাইট থেকে পুনরুদ্ধার করা লেখা। ছবি ও কিছু অংশ শীঘ্রই যুক্ত হবে।
কবিতা , জুন ২০১৯
৬ জুন ২০১৯
মাসুদার রহমান
চিতা
জঙ্গলে কাঠ আনতে গিয়ে বাঘের থাবায়
নরেশ কাকু মারা গিয়েছিলেন
জঙ্গলের পাশেই শ্মশান। চিতায় শুয়ে রাখা নরেশ কাকুর লাশ
মুখাগ্নি করা হবে, এমন সময়
বাঘ!
নরেশ কাকু হামাগুড়ি দিয়ে চিতার উপরে উঠে বসেছেন
তারপর চিতা থেকে লাফ দিয়ে নেমে জঙ্গলে হারিয়ে গেলেন
জয়দেব বাউরী
উপেক্ষাগুচ্ছ
কারা ফিরে চলে গেছে দীর্ঘ-আয়ু অপেক্ষার পর!
দেখেছি প্রখর দিন, ভেতরের আই-হোল থেকে।
অতি সাধারণ, অতি রুখু সুখু সামান্য চেতনা…
সামান্য সামান্য ভেবে উপেক্ষা করেছি রোজ আর
সেইসব নিঃস্ব চোখ,সেইসব দেহমনি হাড়
বহুদূর ডেকে ডেকে সন্ধ্যা নাম নদী হয়ে গেছে…
বিভাস রায়চৌধুরী
উদয়ের পথে
সন্ধ্যায় তোমাকে দেখি শেষবারের মতন
আরও ঊর্ধ্বে মহাপক্ষী চূড়া থেকে কোথাও নড়েনি
কবিজন্ম ঘুমঘুম নৈশভোজ সারে…
রাতশেষে মহাকায় পাখিটি উধাও !
গড়াচ্ছে একটি ডিম
আর
কুসুম-কুসুম বমি
ধাপে ধাপে নামছে পাহাড়ে…
পিন্টু পাল
ঘর
আমাদের ঘরের দরজা খোলা থাকে
বাবা মাঝে মাঝে বিছানা থেকে উঠে
আকাশের তারাদের সাথে কথা বলে
মা মিতভাষী
আর বাবার গোটা দিন কম পড়ে যায়
আমাদের ঘরে হারমোনিয়াম নেই ; তবলাও নেই
মা উনুনে স্বপ্ন রান্না করে
বাবা বসে বসে ফুঁ দেয় …
প্রদীপ কর
উপহার
এ কবিতার একটিমাত্র লাইন আমার লেখা।
দু’লাইন লেখা হয়েছে পুরুলিয়ায়। দু’লাইন জঙ্গলমহলে
পাহাড়ে বরফপড়া শুরু হলে, তারাও কয়েকলাইন লিখবে বলেছে
পদ্মাপারের বন্ধুরা বলেছে, তারাও সবাইমিলে
গোটা একটা স্তবক লিখে পাঠাতে চায়
যন্তরমন্তরের ধর্ণা থেকে দুরন্ত একটা পংক্তি উঠে এসে
ধূসর বারুদের মতো মিশে আছে অক্ষরের অবচেতন প্রেমে
একটু দূরেই অনন্তজ্যোতির আগুন লকলক করে তাকে ডাকছে…
চিলিতে, গোপনে, লেখা হচ্ছে আরো কয়েকটা লাইন
নাজিম হিকমতের বংশধর জানাচ্ছেন, এ কবিতা দিয়েই
তিনি কবিজীবন শুরু করতে চান
যাঁরা লোরকার মৃত্যু সামনে থেকে দেখেছিলেন, তাঁরাও লিখবেন
নিকানোর পাররা বলেছেন, এ কবিতাই হবে তাঁর শ্রেষ্ঠ কবিতা
এ কবিতায় কয়েক লাইন সংযোজন করতে চান
ঊনত্রিশ বছরের ভ্যান গখ!
কবিতাটি সংশোধন বা কাটাকুটি করবেন স্বয়ং নেরুদা
গোলাপের পাপড়িতে মুড়ে, কবিতাটি উপহার পাঠাবো, তোমাকে।
তুমি, সহ্য করতে পারবে তো,
শাসক?
নিবেদিতা আচার্য
প্রেমিক ফিরত না
আংটিটা গ্রিলের গায়ে বাজলেই প্রেমিক আসত
(রাজা সলমানের আংটি)
উল্টোদিকের ব্যালকনিতে প্রেমিক আসত
আমি বিশ্বাস করেছিলাম, ঠিক মত বাজাতে হবে
খুকুর কাচের চোখ, নকল বুক, চুলের ভেতর কাঁটা
প্রেমিক গরম হাওয়ায় মিলিয়ে যেত
স্কুটারের শব্দ মিলিয়ে যেত
খুকু আমাকে আংটিটা একদিন দেবে মাথার নীল স্কার্ফটাও
প্রেমিকের বাবা রাস্তার এমাথা ওমাথা হাঁটত
স্কুটার ফিরত না প্রেমিক ফিরত না
খুকুর ক্রুশ দিয়ে তৈরি লেস লম্বায় একটা নদী
কোনও দিন ফুরবে না
আমাকে পাউডার লাগাত
জামার উপর পুতির হাঁর দুলিয়ে দিত
আংটির কোনও দাম ছিল না ওটা কেবল জ্যান্ত
খুকু উল্টোদিকের বাড়ির ফাঁক গলে প্রেমিকের কোঠরিতে ঢুকে যায় একদিন
বুকের ওপর লেসের চাদর
আমরা বসে ছিলাম অনেক দিনের পর
কোনও গান ছাড়া কোনও প্রেমিক ছাড়া
আমার হাতে খুকুর হাত কাঁচের চোখ জ্বলছে নিভছে
বড় হয়ে গেলি তুঁই চুলের ভেতর কাঁটা খোঁজে
আংটিটা আবছা হয়ে হারিয়ে গেল (রাজা সলমানের আংটি)
আমার এই লেখার ওপর খুকুর সই ছিল
গীতাঞ্জলি সেন চট্টোপাধ্যায়
কোনও ডেট ছাড়া
রণদেব দাশগুপ্ত
আনুবিস
এসব নতুন নয় _
এই কথা বলেছিল প্রাচীন যুবক
আজ তার ঠোঁট থেকে সিমেন্টের গুঁড়ো
আজ তার চুল বেয়ে টায়ারের ধোঁয়া
মূর্খ অভিধান আমি
মানে বুঝতে পঞ্চাশ বছর
পাতা উল্টে দেখলাম
ভালবাসা আহত অক্ষর
পাতালে অমৃত আছে
এই ভেবে পাতিয়েছি সই , তোর সাথে _
বিরহ মেয়েলি দুঃখ , পৃথিবীতে কত কি যে ভুল
মাঝে মাঝে এইটুকু দুর্বল কথায়
কান না দিলেও চলে
ঝরে যাচ্ছে বোকা চৈত্রফুল।
শৃগালডাকের রাত ,
নাকি দেবতার হা হা হাসি _
নীল বালি বলেছিল
শৃগালও দেবতা হতে পারে ;
আমি তাই মেনে নিয়ে , রক্ত মুখে
দাঁড়িয়েছি পূজা ও নমাজ খাব বলে
এ আমার আদিগন্ত হক
এসব নতুন নয় _
বলেছিল প্রাচীন যুবক ।
গৌতম দত্ত
অলজহাইমার ও এক সম্পূর্ণ কবিতা
বৃষ্টি পড়ে মুষলধারে আমি হাঁটছি, কেউ বলছে কালবৈশাখী কেউ বলছে সাইক্লোন, কেউ বলছে তোমার বিষাদ বারি, ছাতা ধরার কেউ নেই, এমনকী একটা বর্ষাতি নেই হাতে, তবু আমি শুকনো খটখটে, আমি তো তোমার সঙ্গে ভিজব বলেই পা রেখেছি রাস্তায়।
অনেক সময় তোমার ইচ্ছা অনিচ্ছাতে কিছু যায় আসে না। আমি কী চেয়েছিলাম যুদ্ধ, মৃত অশ্বের স্কন্ধকাটা চিৎকার, না স্মৃতির ঘরে আগুন, এত বছরের মিথ্যে প্রতিশ্রুতি, প্রত্যহ শুকনো রুটির সমঝোতা, রিক্ত হিংসার রাংতা মোড়া চকোলেট জীবন।
দুপায়ের তলা দিয়ে বইছে কষ্ট নদীর স্রোত, দাঁড়িয়ে আছি শুকনো সংসার বালির ওপর যেখানে একমাত্র নোনাজল তাও সে নিজেদের শরীরেরই অংশমাত্র।
মুহূর্তগুলো হারিয়ে যায় আর এক সময়ের জটিলতায়। এত জটিল আর প্রাচীন এই ব্রেণবটবৃক্ষ যে আমার চেতনা কী করে অবলুপ্ত হয় নিজের অজান্তে। এই তুমি তুমিও অচেনা হও সন্তানের সঙ্গে সঙ্গে। তোমরা বলবে অলজহাইমার আর আমি বলব এবার আমি সম্পূর্ণ কবিতা।
অরণ্যা সরকার
যে কথা প্রশ্নে নিহিত
শুধু নিবিড় জন্মাবে বলে তর্কের ভেতরও অন্তমিল, কিছু বনিবনা
সকালের কাঁধে হাত রেখে মধ্যবয়সী নিমন্ত্রণ
টবের মাটিতে ব্যঞ্জনার চারা, ফুলেল মূর্ছনা জ্বেলে বসে আছে যত্ন আত্তি
ফাটা ঠোঁটে এক আশ্চর্য ধ্যানের নোঙর, চাষযোগ্য নির্জনতা
সবুজের ছায়াপড়া জল নড়ে ওঠে, কি গোপন লুকোতে ব্যস্ত
ধানফুল, তুমিও তো জানো একপেট খিদের গল্প
দুধ আনো, খোসার অন্ধকারে তবুও কি সুগন্ধ জমে স্থির
রৌদ্রময়ী কীর্তির চোখে ছায়ার সুরমা
কেন ধু ধু ইস্তেহার এমন তবে, কেন বালির ফোরপ্লে ?
কত নিক্ষেপ শেষে বোধ এক মাটির আতর ?
কত বিশেষ জমালে ফিরে আসে সেই ধরা পড়া জর্দা গন্ধের সামান্য ?
অঞ্জন বর্মন
নির্জন যাপন
সমস্তদিন হাড়ভাঙা খেটে বিকেলে হঠাৎ বৃষ্টি
ভিজে শার্সিতে একা টুপটাপ তোমায় ডেকে আনল
বারান্দা জুড়ে সোঁদা জলছাপ মৃদু রিনরিনে সুরটি
হু হু গাছপালা গায়ে শিরশির অনন্তকাল ঘিরছে
আলো ঝুপ করে নিভছে তোমার ফর্সা মুখের ছমছম
বুনো দরজায় ছায়া ছায়া ঘুম ভেঙে দেয় নস্টালজিক
ছুঁয়ে নির্জন দূরভাষ্য কথা বলে ওঠে ঘন ব্যারিটোন
মৃদু রূপটান অনাবশ্যক বুকে বেদনার মত বাজছে
ডুবে শহরের গলি পথঘাট অফিসফেরত কাকচান
বাসে এককোণ খুঁজে আনমন গুনগুন বাজে পদ্য
মোছে লালচোখ তাড়া ফাইলের মিছিলের ভিড়ে মিশছে
ভিজে সপসপ পারফিউমের সেই পুরনো গানের ম্লানসুর
পাড়া চুপচাপ বাজে ডোরবেল গান গেয়ে ওঠে রিংটোন
ভিজে রায়চক নদী উত্তাল সেই দুপুর থেকেই ভিজছি
তুই থাকলে হতি ঝর্ণা ভেসে উথালপাথাল নৌকো
সিঁড়ি বেয়ে ওঠে এক ক্লিশে প্রেম ভাঙে ঝনঝন স্বপ্ন…
মানিক রায়
ভুল শব্দে পুড়ে যায়
এভাবেও কী সমস্যার সমাধান ঘটা সম্ভব !
চেয়েছিলাম একটু অন্যরকম ভাবে
শব্দের অসীম শক্তি
বুঝলাম আজ কিছুক্ষণ আগে
আর অনুভব করতে লাগলাম, ভুল শব্দে পুড়ে যায় ভালবাসা ।
কার্তিক নাথ
দরজাটা খুলে রাখা ভালো
দরজাটা খুলে রাখা ভালো,
অনেকটা আলো আসে,
বাহির কীভাবে আসে মনের ভেতর !
এত অন্ধকার !
ভীষণ অসহ্য লাগে, দমবন্ধ হয়ে আসে শুধু
নিজেকে জাগাব বলে
দরজার কাছে গিয়ে বসি
সবুজ পাতার ফাঁকে কীভাবে ডাকছে ওই
বদ্রিকা পাখিটি
হরিমাধবের গোয়ালের আলো এল
দরজাটা খুলে রাখা ভালো
উন্মুক্ত দুয়ারে এল আকাশের খেলা
দরজাটা খুলে রাখো,খুলে রাখো,
সরে যায় বেলা
তন্ময় ভট্টাচার্য
শীতকাল
সে-কোন যুগের লোক, ধোঁকা খেয়ে ঘরবন্দি মাস
ভয়ের মুখটি সেই থেকে আর আসেনি আলোয়
হয়তো এসেছে, মুখে ঝিরিঝিরি পাতার ছোঁয়াচ
সেরে যাও ভালোয়-ভালোয়
সেরেও আবার জেদ, আরোগ্য পেয়েছে যার স্বাদ
সহজে ছাড়িয়ে নিলে আবার ভয়ের উপক্রম
আঁকড়ে রয়েছ, ভীতু লোক
হাত থেকে খসে যাচ্ছে আগেকার সমস্ত নরম
হিংস্র শীতের দিন; দখল, দখল চাই ওর
সারাক্ষণ আমাকে ভাবুক
বোধশূন্য, জ্ঞানশূন্য, হ্যাঁ-তে হ্যাঁ ও বিরহে পাথর
আমার মনের কথা নকল করবে তার মুখ
এভাবে হতেও পারে; হয়…
ও লোক, ভীতুর ডিম, টের পাও ঝরার সময়
প্রগতি বৈরাগী
বিষমঙ্গল
মধুমাস গত হলে মুছে যায় রমণী রোদ্দুর
বিকেল ঘনালে আসি, আছড়ে পাথরে ভাঙি
আবেগের পেয়ালা পিরিচ, টুকরো ঝিকিয়ে ওঠে
উথলায় ধুকপুক পূর্বতন হিরন্ময় পাপ
জ্বলতে জ্বলতে দিন নিভে আসে
আমি তাতে যত্ন হাতে আগুন লাগাই
ঘুরে ফিরে নাচি, গাই বেদেনীর প্রাচীনপুকার
বিষসিদ্ধ ফল রাখি জিভের তলায়
গোড়ালির নীচে মুখ, কী সুখে ঘুমায়
স্নিগ্ধপ্রাণ, প্রেমশব, মথিতকুসুম
ক্ষুরচিহ্ন শির ডোবে ধূলার শয্যায়
শিরদাঁড়া ভেঙে যায় তালের আঘাতে
কী লোহিত, অকপট, ফেনা ওঠে…ফেনা ওঠে
অচিরে পিছল । তবু তার অশ্রু, তাপ
একমাত্র পরমাদ, পাঁজরের আলপথে
কুঁদে রাখা আধোতৃপ্ত সাধ
প্রণয়ে ছোপানো নখ ধুয়ে আসি
ধুয়ে আসি গুপ্তকথা আলতা অধিক
হা-হা করে আয়ুরেখা, পাটিপত্র
হা-হা করে বিষহরি ভাসানের গান
সুবীর সরকার
শোকযাত্রার প্রতিবেদন
জাহাজের ডেকে দাঁড়িয়ে ভাসিয়ে দিই হলুদ
গাদাফুল
পান করি গরম কফি।
ঝাঁক ঝাঁক তাঁবু নামছে খেলার মাঠে
দিনদুপুরে হেঁটে যায় ব্রাউন সাহেবের
ঘোড়া
স্তব্ধতা ঝুঁকে পড়ে নিস্তব্ধতার ওপর
‘গোপন করবার মত আমার কিছুই
নেই’
বদলে ফেলছি রিংটোন ও বিছানার
চাদর
দু’দন্ড দাঁড়িয়ে পড়ি চুম্বনদৃশ্যের সামনে
কোথাও দুলে উঠছে সুপুরিবন
তোমার শান্ত দুচোখে সুনামির
সতর্কতা
প্রবল মেঘের ডাক শুনে বিবাহের গানে
মিশে যাই
‘শীতবিকেল মানেই তোমার একটানা উল
বুনে চলা’
হাসির গল্পের কাছে কিভাবে যাই বলো!
এইমাত্র পোড়োবাড়ির দিকে পদযাত্রা শুরু
করলেন ম্যাজিসিয়ান
ডার্কনেস ও চকলেটের কি ভীষণ
সুসম্পর্ক!
দীর্ঘ ভ্রমণের আগে অদ্ভূত সব দৃশ্য ও দৃশ্যান্তর।
রিমি দে
মেঘ
যদি জবা বলো তবে দুই হাতে মাখব পাগল
ডাল পাতা খুলে রেখে খুঁটে খাব হাড়ের শ্রাবণ
দহনে হেটেছে মুথা ঘাস মন এক বিকট শরীর
ছেড়া তার ফাটল দিয়েছে সার সার নদী ও আগল
এই আমি কেটে ফেলি ফালা ফালা গোলাপি আমিকে
আকন্ঠ জলের নিচে ডুবে ডুবে অদৃশ্য ছড়াই
টুকরো টুকরো হয়ে ধরে ফেলি শীতল নিবিড়
নিজেকে চিনিনি বলে রক্ত ঢালি ফ্যাকাশে মজ্জায়
আগুন হাতের থেকে ধ্বসে যাই নিজের কাটায়
শাদা মাংস খেলব বলে ঢেলে দেই নৃশংস মরণ!
গৌতম গুহ রায়
বৈশাখে লেখা
রোদ্দুর নয়, আকাশ জুড়ে অভ্রমাখা নিষিদ্ধ কবন্ধ পশুরা ভাসছে
মেঘ নয়, ছেয়ে যাচ্ছে ক্ষমতালোলুপ চুম্বকবিশ্বের সূর্যাস্ত
চারদিকে ঝোড়ো বাতাস হঠাৎ কেমন তেতে উঠলো।
রোদ্দুরের ছেঁড়া দরজা ঠেলে ঢুকে পড়ছে লুকোনো পশুলোম
জমাট মেঘেদের ভিড়ে খিল খিল করে হাসছেন তিনি।
হাতের ত্রিশূলে গেঁথে নেওয়া শেষ প্রাণীটির পায়ে স্বস্তিকা চিহ্ন আঁকা
লেখা আছে, ভগ্ন হওয়ার আগে সেখানে ছিল ফুরফুরে বাতাস,
রামধনুর মতো সাতরঙের আকাশ থেকে নেমে আসা পাখি,
জল থেকে ঝিলিক দেয় রূপালী শস্য
নগর তান্ত্রিকের ভয়ার্ত নাচের আগে এইসব।
আমাদের ফেলে আসা নন্দনপুরের মতো
কালো দিঘির জল ফেপে ওঠে সেই নাচের তালে তালে
সবকিছু কেমন পাল্টে যাচ্ছে। ভেঙে পড়ছে প্রিয়তম বাসা ও শ্মশান
মাথা তুলছে অদ্ভুত এক অতিপ্রকৃত প্রাসাদ, বরফের ফুলে সাজানো
তার ছাদে দাঁড়িয়ে একজন একটার পর একটা তীর ছুড়ছে, উপরের দিকে
আকাশ চিঁড়ে চলে যাচ্ছে সেগুলো, ভাসমান পশুদেহের খসে পড়া মাংসের দিকে
তবুও আড়াল থেকে কোথাও বৃষ্টির প্রার্থণা নিয়ে একজন উড়িয়ে দেয়
মুঠোতে ধরে রাখা জলকণা,
দিগন্তে ভেসে ওঠে সবুজ মেঘের সোনালী আলো,
প্রত্যেকের ব্যক্তিগত বৈশাখ
মনিরুজ্জামান মিন্টু
মা
মায়ের মুখ ফেলে এ শহরে এসেছি বহুকাল,
মুখস্থ বিদ্যায় আমি এখনও তার পাঠশালায় ভর্তি হই
শিশুতোষ মন… নামতা পাঠ…ভুল বানান…
মায়ের মুখ থেকে শেখা প্রথম বর্ণমালা।
প্রতিরাতে বাবা আমার সময়ে-সংগীতে
নদী আর সূর্যের বয়স হিসাব কষেন,
আমি বালুচরে প্রতিউত্তরে তাদের পত্রখানি রচনা করি।
আর মরা নদীতে স্বপ্নের রন্ধনকালে মা-আমার
রঙ বে-রঙের প্রদীপ জ্বেলে,
নিঃশব্দ ছায়াপথ দেখায়…
উপাসনা সরকার
বাবা
ওই আলমারিটা খুলিনি বহুদিন
যে মানুষ নেই
অথচ হাতের ছাপ সুস্পষ্ট,
সেই দূরত্ব পার হওয়া কঠিন।
এত নরম ভাঁজে কাপড় নাকি শরীর
কতদিন ছুঁয়ে দেখিনি,
বারো বছরে বড় হতে হতে বুড়ো হয়ে গেছি
নিজেকে বুঝিয়েছি,ভ্যাপসা গন্ধে মাথা ব্যথা হয়
ছাদ হারানোর পর আমরা মিথ্যেবাদী হয়ে যাই।
নিজের মুখোমুখি হতে আর ইচ্ছে করে না!
শুভ্রা রায় দত্ত
ডাক হরকরা
দূরত্বের কাছে তার প্রিয় ক্লান্ত মুখ
ঘুম ভেঙে ঘুমের ভিতর
স্বপ্ন দেখলে ? তাকে ?
এখন প্রভাত কাল,তীক্ষ্ণ চিবুক
বসে আছে, জল ভেবে আষ্টেপৃষ্টে দহন জ্বালাকে
দুই হাতে ছুঁয়ে আছে,যেন রমণীয়
রাতভোর জানু পেতে অঞ্জলি স্তব হয়ে ফোটে
অধিকার বোধ নেই, চিঠিতে লিখিও
তুমি তাকে, সোনামন…ভালো আছি, দূরে, সন্নিকটে
আম্রপালী
রূপান্তর
জোৎস্না দেখার সময় কই , ঘর তো শুধু আলো জ্বেলে রাখে । ভূতের মতো ফিরছে যারা , নির্বাচিত ছিলো না। মুখ জুড়ে শুধু গাধার মাথা। বলতে ইচ্ছুক কথাগুলো চিরকাল বই থেকে বেরোতে পারেনি । চারিদিকে গমক্ষেত আর স্যাটিরিয়াসিসের রাজত্ব । রেসিপ্রোকালের এবাকাস চুপচাপ ঢুকেছে মাথায় , উকুনের মতো । এভাবেই গোনা শুরু করে স্কোয়ার কিউবের জানালা খুলে পাশের বাড়ির তামাশা খুঁজি । বই এর চারিদিকে খোলা শরীরে নারীর চামড়া ,একটু পরেই কঙ্কালের মিমিক্রি শুরু হবে । সভায় কোনো কবিতা নেই, গল্প নেই । মৃতদেহরা ভালোবাসার কথা বলে না…
কুমারেশ তেওয়ারী
রায়বেঁশে
ঝরে পড়া আলোর নিচে যেই পেতেছি মাথা
শরীর জুড়ে উঠলো ফুটে পদ্মরঙের ফুল
শিরার ভেতর লালন বাজে উঠোন জুড়ে ধুম
নাচের ভেতর বাক পরে নেয় বৈখরি উদ্ভাস
সন্ধ্যেবেলা তারার নাচন ভার্চুয়ালের ঘোড়া
দেখছি সবই গ্লাস-পানিয়ে সহস্রতার অণু
একের সঙ্গে অপরজনাই থাকছে বেঁধে বেঁধে
কাচের গেলাস ঠুনকো বড়ো কখন যে যায় ভেঙে
ঘড়ির ভেতর আরেক ঘড়ি সময় প্রহেলিকা
সৃষ্টিতত্ত্বে আলাপ রাখেন ছিন্নমস্তা কালী
ছুটতে ছুটতে থামছে ঘোড়া খাদের কিনার ঘেঁষে
ঠিক পিছনে ফেরার লড়াই, হাত ধরে রাইবেঁশে?
চাণক্য বাড়ৈ
তন্ত্রশাস্ত্র ঘেঁটে
উত্তর গোলার্ধ ছুঁয়ে উড়ে আসে কুয়াশা-কুণ্ডলী— পৃথিবীর প্রত্ন-প্রান্তরে নামে উষ্ণ শীতরাত— অবদমন-বনে ঘুমিয়ে ছিল যে আগুন-বাসনা, ঘর্ষণে ঘর্ষণে উসকে উঠবে বলে সে খোঁজে বিপরীত কাঠ…
পাথর-যুগের বিকিরিত আভায় যারা নিয়েছিল বিবিধ পুরাণের পাঠ— সভ্যতার উদ্ভিন্ন কসরত নিয়ে তারাই শোনাল শেষে প্রাগৈতিহাসিক ধ্যানের আখ্যান…
সমিধ নীরবে গায় ‘শরীর এক সুসুপ্ত চিতা’— অন্ধের উপাধি পেয়ে ডুমুরের ডালে নাচে তান্ত্রিক পেঁচা— আর ভেল্কির থলে ছিঁড়ে বেরোল যে বেঢপ বেড়াল আমিষের থালা নিয়ে তাকে ডাকে কামাখ্যা-বালিকা…
তমাল বন্দ্যোপাধ্যায়
বৃন্দাবনী সারঙ
আলাপ
বলো হে উন্মাদ আলো, বলো, কার আকাশীচূড়ায়
বলো, কোন প্রাকারের অতিশয় নিবিড় মোহনা
তোমাকে রেখেছে ধীর, ক্লান্ত সব বিশেষের দেশে…
দিয়েছে জলের কাছে বসন্তবাসনার প্রিয় নাম…
২.
প্রত্যেক কান্নার নীচে পড়ে থাকে অশ্রুকণাটুকু।
প্রতিটি শব্দের পাশে অপেক্ষায় থাকা নীরবতা
জলের সামান্য নিয়ে ভরেছিল আপনার ক্ষত…
অদূরে যমুনা স্থির। আদিশোভাটির কাছে নত।
৩.
এবার সাজাও যত অভিমানী জননীপ্রয়াস।
যেন এ যমুনাশব্দে আঁখিতারকার কাছে এসে
বিষণ্ণ কদম্বমূলে থেমে যায় প্রিয় কোলাহল।
সাজাও তাহার রাত্রি, ব্রহ্মশব্দ, সমস্ত অতল…
অর্ঘ্য মণ্ডল
পারলৌকিক
জীবন লৌকিক গতি। অগত্যাই প্রকটিত হয়ে
এসেছ প্রসন্নকাল—তাকে বিপর্যয়ে মহীয়সী
নদীর রাক্ষসী তীরে নিকটস্থ ঘূর্ণিবেদনার
অবিকল মুখাকার, অবিকল নিরন্তর ক্রীড়া
বিপরীতার্থের মতো শব্দপার্শ্বে ঘনিষ্ঠ বিদ্বেষী
লীলারুচি ভর করে এ সহগলগন-প্রক্রিয়ায়
ইতিহাস ডাকে আর ভবিষ্যৎ ডাকে—আয়, আয়
শাহেদ কায়েস
প্রেম ও প্রতিভা
সমুদ্রের দিকে তাকালেই আমার
প্রেম ও প্রতিভার কথা মনে পড়ে
বৃক্ষ আমাকে হাওয়ার কথা বলে
আর হাওয়া বলে ঘুড়ির কথা…
হাওয়াকামী ঘুড়ি উড়তে উড়তে
একদিন বৃক্ষের ডালে বাঁধে বাসা
শাখার ফাঁকে সমুদ্র কথা বলে
আহ প্রতিভা! প্রেমে লবণের স্বাদ
কল্লোল বন্দ্যোপাধ্যায়
স্বপ্ন
আজীবন সাপ আর মই; আজীবন ডুবজল থই
স্বপ্নটি থেমে আছে গ্রাম্য পথের এক শান্ত বাঁকে-
কুলিপথ, স্নিগ্ধ ঝিঙে মাচা নির্জন বাঁধের পাশে
সামান্য প্রান্তর . .
বাবলার কাঁটা ঘেরা ঢেঁড়সের খেতে অবেলায়
জল দিতে যাওয়া
জীবনে কিছু না হওয়ার মতো সুখ কেউ আর
পেতে চায় আজ
যদি পৃথিবী নিছক এক গ্রাম
সে গ্রামে কি জ্যোৎস্না পড়ে না?
তনুশ্রী নদীটি রয়েছে উঠে গেছে তারও ডাকঘর
কেউ চিঠি পাঠায় না আর
তবু ধূসর সবুজ করে দিতে কে তাকে পাঠালো
এই নির্মম গ্রহে …
গৌতম রায়
মহার্ঘ্য পুটলি
মা ইদানিং প্রায়ই সর্দি কাশিতে ভোগেন
কাফ সিরাপে কাজ হয় না আর
উপশমের ইনহেলার ভেস্টিবিউল চওড়া করলে
একটু স্বস্তি পান
আর্থারাইটিস একটি সচল পৃথিবীকে
কেমন বিছানা বন্দি করে দিচ্ছে
মা ছাড়া আর কেইবা বেশি বোঝেন ?
ভালো নয় জেনেও রোজ রোজ ওয়াইসোলন নিতে হয়
ছোট ছোট পায়ে বেরিয়ে এসে
স্থূলকোণে খোঁজ নেন সবার
শুভেচ্ছার অণু পরমাণুগুলি ছুটে এসে
নিরাপদ পর্যটন যাত্রার
ঝরায় হিরণ্যজল
আমরা সাজাই লাগেজ
অতিযত্নে পরিচিতি পত্রের সাথে
ঐ মহার্ঘ্য পুটলিও রাখি বুক পকেটে
পীযূষকান্তি বিশ্বাস
পোষা পাখি উড়ে যাবে
সজনী কাল উড়ে যাবে এই সকল চিন্তায়
নীলিমা বরাবর ঐ ভাঁজ
কপালের উপর এবড়ে থেবড়ো
কপোলের উপর মেঘ জমে থাকা আমি বুঝিনি
বোধ নিয়ে অধীর ব্যাকুলতায় নীল হয়ে ওঠে আকাশ
হাই ভোল্টেজ তারের উপর পাখিদের উপস্থাপনায়
বিদ্যুতরেখায় তাকে উন্মুক্ত করে দেখি
দাগ আচ্ছে হে
দূর থেকে দূর নিয়ে এই সমস্তই দেখা
আরাবল্লী রিজের উপর ঘনয়ামান রেখার দুর্বোধ্যতা
কল্পিত দৃশ্যের বন্ধুর ভিরানায়
কাচ্চে ধাগায় –
তাতে এঁকে রাখি নীলপাহাড়ীর করীব
কাঠ থেকে সরে আসা খোদাই
দেহ থেকে সরে আসা গতিজাড্য
বুকের উপর থেকে নেমে যাওয়া ভূবনের ভার
এই তো স্বচ্ছতা
এই বিকেলের আলোয় সোনালী পঙক্তিমালার এই তো দর্শন
যখন আলো হয়ে ফুটতে চাইছে নভোময় নীল
সজনী – আমার পুষে রাখা বিষয়বস্তু
প্রিয় সেইসব পাখিরা
অসীম সম্ভবনাময় এই সাদাকালো পাখি
শিশুর সরলতা নিয়ে একদিন
পোষা পাখি উড়ে যাবে
ইন্দ্রনীল সেনগুপ্ত
হঠাৎ উন্মাদ হাওয়া
হঠাৎ উন্মাদ হাওয়া
খুলে দিল জানালা
দু’চোখে অনেক বৃষ্টি
ঝাপসা করেছে দৃষ্টি
তবুও অদূরে যেন
গাছ ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে আছ তুমি
একট বনষ্পতি
আকাশ ছুঁয়েছে মাথা
শেকড় ছুঁয়েছে পা
স্বপ্ননীল
লালমাটিয়া
ও লালমাটিয়া-
তুমিও ফোট বৌ কথাকও ডাকে।
বাহারি খোঁপায় রেখো মেঠোফুলের নাম
সিলসিলাইয়া হেঁটে যাও ধামসা গানের তালে
শালের বনের ধারে নদীতে মাছ নামে ছুঁয়ে ফেলো তাকে
যে তোমায় লালমাটিয়া বলে ডাকে।
যে তোমার কোঁচড়ে দুহাত ভরে রাখে স্বপ্ন
যে তোমার ফরাস ফরাস চোখে
এঁকেদেয় এই লালমাটিয়ার মাঠ
এঁকেদেয় এই লালমাটিয়ার মেঘ
এঁকেদেয় এই লালমাটিয়ার গান
তোমার লালমাটিয়া নামে তুমি ফসল হয়ে ওঠো।
কিন্তু সে একদিন এসে দেখলো
লালমাটিয়া
তুমি ঘুমিয়ে পড়েছো ভীষণ
ফরাস ফুলে ছেয়ে গেছে বুক
তুমি কী ভীষণ ভালোবাসা হয়ে গেছো আজ
যার জন্য ঘুমিয়ে..চোখ খোলো.. দ্যাখো.. সে এসেছে
“লালমাটিয়া… লালমাটিয়া…এখনো ঘুমিয়ে আছো?
এখনো ঘুমিয়ে আছো তুমি?এই লালমাটিয়া…
একবার ফোটো তুমি সেই বৌ কথাকও ডাকে!”
স্বপ্না বন্দ্যোপাধ্যায়
একার কাছে লেখা
১
ঘাড় মুচড়ে টেনে আনলাম তাকে
কী সরল সে! একদম এক বিন্দু
থেকে আরেক বিন্দুর মতো সরাসরি
একেবারে ভিতর অবধি দেখা যায়
একটুও বাড়তি ঝুঁকতে হয় না
২
নিঃশব্দ দাঁড়িয়েছে আড়াআড়ি হয়ে
লন্ঠন জ্বলা রাত হাতধরা গরমের গায়ে
এভাবেই দাঁড়ায় আর চিবুক দেয়
আদরের ঠোঁটে
৩
বড্ড চুমু পাচ্ছে ঠোঁট বিশ্বাস করো
শ্বাসের কুয়ো থেকে উঠে আসছে
জ্বরের ঘন বেগনি তবক
লালা চাইছে ছটফটানির পালক
চুমু চুমু… দু’টো ঠোঁটের ভেতর
কেউ ঠোঁট এঁকে যাচ্ছে
এ ঠোঁট খোলস ছাড়তে চাইছে
আর এক ঠোঁটের ধ্বনিতে
এসব সময় শরীর শোক হয়ে ওঠে
৪
একা আরো একা একা একা হতে ইচ্ছে করে
একার কাঁধের ওপর শিশুর মতো
দু’ পা ঝুলিয়ে বসতে ইচ্ছে করে খুব
একাগ্রামে বিছন বিছিয়ে একটানা
ঘুমে ডুবুরি হতে ইচ্ছে করে
তখন সূর্জ নীল হয় ছায়ার পেটে
রেখায় আঁকিবুঁকিতে চোখ ভরে থাকে
নিশীথ ষড়ঙ্গী
দুঃসহ
অতীত, তবুও বিষ,তাম্রপাত্রে রাখা সুধারও অধিক।
জ্বালাটি অম্লান আর তাকে ফেলে থাকাও কঠিন—
হে অনন্ত নক্ষত্রবীথি,তুমি তাকে স্থান দেবে তোমার আলোয়!
অসহ্য, পুড়েছে স্বপ্নকাল,
ঠোঁটের তণ্ডুলকণা, সেও নিষিদ্ধ আজ, নিষিদ্ধজাগর।
তবুসে তো একমাত্র, একটিই সেতার
বেজেছিলো একটি রাতের মতো একা
তিলমাত্র কুণ্ঠা নেই
সাঁতার জাগিয়েছে জল, একটানা, যেদিকে তাকাও-
অনতি অতীত নয়, তারও আগে, তারও বেশ আগে
খেলা যখন ছিলো তোমার সনে,তখনও
একটু একটু করে
মিশেছিল নীল, ডুবন্ত সাদায়…
একফালি মেঘ আজ, হঠাৎ পড়েছে এসে
চোখের পাতায়…
রণবীর দত্ত
স্নেহাশীষ ও সত্য দেবনাথ
যাত্রার কথা ভেবেই ঢেউ উঠেছিল একদিন
অনেক অলিগলি পার হয়ে ঠোঁটের বিস্বাদ কাটিয়েছি
চরম বন্ধুতা আমাকে দিয়েছিল স্নেহাশীষ ভট্টাচার্য ও সত্য দেবনাথ
কিছুকাল হল ওঁরা মহাপ্রশান্তির কথা ভেবে গভীর অন্ধকারে
চুল্লির মধ্যে ঢুকে গেল একেবারে শেষ ঘুমে—
আমাদের নৈকট্যের তরল মুহূর্ত আনত পরাগ হাসি—
মাথা নিচু করে কীভাবে যে পালিয়ে এলাম দুবারেই
ওঃ কী যে ওঁদের থাবা! আমার মতো মর্কুটে হাঘর
শুধু ধুলোর চেয়ারে বসে ছাইপাঁশ কবিতা লিখেছি
আর একেকটি রাত্তির অপেক্ষা করে আমার নরকের ফেরেস্তা খোঁজায়
ঝুপ করে সন্ধ্যা নামার পর চরাচর জুড়ে দুটি নক্ষত্র খুঁজব
আর চিরকালের মতো তোমাদের পায়ের পাতায় আমার স্পর্শ ও চুম্বন
শিবাশিস চট্টোপাধ্যায়
ভূগোল
গরুর চামড়া দিয়ে ঢোল হয়। সেই ঢোলে বোল ওঠে।
গুণী, তুমি তোমার ঢোল বাজাও, আমি আমার। ঢোল ফেটে যায় আর তখন ভূগোল তৈরি হয়। আমরা ভূগোল পড়ি। ভূগোল ভুলে যাই।
গরুর চামড়া থেকে ভূগোল পর্যন্ত যে আঁকাবাঁকা পথ সেই পথে কোনো গোধুলী নেই। না থাক। তবু নিয়ম করে তোমার আমার দেখা হয়। আমরা উভয় উভয়কে অভিশাপ দেই। কিন্তু কেউ কারো চোখের দিকে তাকাতে পারি না।
ফলে আমরা আবার ভূগোল ভাঙতে শুরু করি। ভাঙতে ভাঙতে সেই মৃত গরুটিকে খুঁজে পাই। ধুস পঁচা, দুর্গন্ধময় গরু হাম্বা করে না।
ভূগোল আর গরুর মধ্যে আমরা গোল পাকিয়ে ফেলি। বুঝতে পারি না ভূগোল ভাল ছিল না গরু!
অমিত দে
প্রত্নপথ
রাতের চিৎকারে পাতা নুয়ে পড়ে
আমাদের অর্বাচীন সুখ দেখেছে কালপুরুষ
কলসপত্রীর মতো সময় লিখে রাখে অন্ধকার
আজকাল জেগে থাকাও দুর্বোধ্য বিস্তার,
স্পর্শগুলো ছাই হয়েছে যে-স্তরে
ততটুকু নিঃশ্বাস বায়ুই শেষ প্রত্নপথ
হলুদ আটচালায় মলিন হয়ে আছি
পুরনো মূর্তির মন্ত্রে
অক্ষরমালা থেকে উদাসীন তরঙ্গ
মাঝে মাঝে ছুঁয়ে যায়
আমি বিবশ হয়েছি আলোকের কাছে—
সেইসব দিনগুলিকে নাক্ষত্রিক তিথি বলে
ভ্রম হয়
মধুসূদন দরিপা
ফণী
পাশের মুখুজ্যেদের বাড়িতে
একটি রক্তকরবী গাছ আছে
তার সাথে দেখা হয়
কথা হয় রোজ
কিশোর নন্দিনী রঞ্জন
বিশু পাগল কিংবা রাজাকে নিয়ে
যেদিন ‘ফণী’ এলো রাজার মতো !
শুনলাম :
“নন্দিনী । রাজা, এইবার সময় হল ।
রাজা । কিসের সময় ?
নন্দিনী । আমার সমস্ত শক্তি দিয়ে তোমার সঙ্গে আমার লড়াই ।
রাজা । আমার সঙ্গে লড়াই করবে তুমি ? তোমাকে
যে এই মুহূর্তেই মেরে ফেলতে পারি ।
নন্দিনী । তারপর থেকে মুহূর্তে মুহূর্তে আমার সেই মরা তোমাকে মারবে । আমার অস্ত্র নেই, আমার অস্ত্র মৃত্যু।”
চমকে ওঠে জীবন । অতটুকু প্রাণ !
এতো শক্তি !
আর সামান্য ‘ফণী’ ভয়ে
স্বেচ্ছা নির্বাসনে আজ দেশ !
মনে পড়ে যায় বিনয় মজুমদার :
‘পিঁপড়ের এত সরু পায়ে হাড় আছে, মাংসপেশী আছে ।’
ঘরের সমস্ত জানালা খুলে দিই
অভিমন্যু মাহাত
মা
মায়ের মত রাগ তোমার চোখেই দেখেছি। যার শেষ কখনো আছে? হলুদ একপাতা জুড়ে শীতভূমির কাল। মাটির ঘরে লাল মোরগ বাঁধা। সেখানেই দীর্ঘ বসবাস যত রাগ আর কিশলয়তার ছায়া। একটি বলের সঙ্গে ৬৪ বছর পার করে এল মা। মুঠোয় বাঁধা বাবার ছৌ-ঝুমুরের তাল। একটি কনুই থেকে ঝড় আসে। তবু ধুলো শেষ হয় না। ধুলো মাখা পায়ে ক্রমাগত জল- ডাঙায় হেঁটে বেড়ায়। প্রথমী মাহাতর পর, হে প্রিয়, তোমাকেই ‘মা’ ডাক দিয়েছি। এই কুলাঙ্গারকে তুমি ছেলের স্বীকৃতি দিলে না। যে ঝুমুর গানে মা দরজা খোলে, আজ তার কি হল?
অর্ঘ্য দত্ত
ফেরা
এভাবেই একদিন আলবাট্রস গুটিয়ে নেয় পাখা
সমুদ্র ভ্রমণ শেষে। ঘোর কেটে গেলে
বেড়া দেয়া ঘরে ফেরে চাতক শ্রমণ…
আবার নতুন করে ভালো লাগে
কচুরিপানায় ঢাকা কুহকিনী ঝিল
মেঠো পথ, বকফুল, ঝরে পড়া হলুদ পালক
এই ভালো। কিছুদিন তীরে এসে বসো
নতুন সাগর আঁকো। মূর্তি গড়ো। স্বপ্নে থাক নতুন উড়ান…
আসলে কি ঘোর কাটে?
কাকে খোঁজা কে জেনেছে ঠিক!
দু’পাখা আদরে রেখে জলের হৃদয়ে ভেসে থাকা
অতল ইশারা সেজে ডাক দেয় মায়াবী ঝিনুক
যতই গভীরে যাও, তোমার ওড়ার ছায়া বাসি হয়ে গেলে
অনিবার্য ফিরে আসা, যেখানে লুকানো ছিল ডিম
পড়ে থাকে পড়ে থাক, রঙচটা ঝিনুকের শূন্য ধূ ধূ বুক…
এলা বসু
বলা বারণ
ঠিক কতদিন ধরে,
শুধু আপনার সঙ্গে
ছায়ার মতন থাকব বলে
যুদ্ধ চালাচ্ছি জানেন ?
কোনো ধারণা আছে আপনার ?
এই অবধি বলে ,
হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে
চোখের জল আঁটকে
উঠে দাঁড়াল লহমা ।
শাড়ীর আঁচল সামলে নিয়ে ,
আস্তে আস্তে রাতের জানলার পাশে, শান্ত হয়ে দাঁড়াল।
আসলে আকাশ তখন তার চোখে পড়ছেনা আর
তারারা আঁচলে খেলা করবে বলে,
ঝাঁপ দেবার অপেক্ষায়
যদি সে একবারটি …
খোলা পিঠে পাবে কি সেই
আজন্ম অপেক্ষার শিহরণ ?
পারমিতা ভট্টাচার্য
কুন্তী
গর্ভে সূর্যশাবক,
দৌড়ে পেরোচ্ছি পথ,নদীতীর, নাবালিকা পায়ে ―
এমন সাহস নেই,রোদ্দুরের কাছে বলবো “নত হও”,
অমনি রোদ্দুর
ভূর্জপাতায় মুড়ে যাবতীয় কামনাবিলাস
এ জন্মের মত রেখে, বুক পেতে দেবে…
সে আশা স্বপ্নেও করিনি ; শুধু
প্রজাপতি ধরেছি দুপুরে
পুড়ে গেছে আশরীর মন―
কর্ণ আসারও আগে, ধানশীষে-নাড়িচেরা কত
মৃত ভ্রূণ ছড়িয়ে দিয়েছি,
সমস্ত পাণ্ডুর ঘর জুড়ে !
বঙ্কিম লেট
রোজ রোজ ফাঁসি
ভোর হচ্ছে
রাতের নিঃশ্বাস পড়ে করবীর ডালে
দাড়ি কাটো
দিনের প্রথম বিভা ঠোঁট রাখবে গালে
স্নান করো
সাবান আর শ্যাম্পু দিয়ে রগড়ে ধুয়ে ফেলো
(ঝরনা খোলো
অনন্তে ভাসিয়ে দাও) ভাঙা স্বপ্নগুলো
জামা পরো
ডিপ ফ্রিজে তুলে রাখো অ্যালার্মে চমকানো
ভেঙে যাওয়া
অর্ধেক সঙ্গম , আর তোমাকে হাতড়ানো
শাবকের
ভোরের ঘাসের মতো দিনভর ফোঁপানি
লেশ বাঁধো
যাও । যাও । ফ্রিজে সব ঠাণ্ডা থাকে জানি
ভোর হচ্ছে
ভাতরাঙা ফিকে ভোর। পাঁচটা দশে ট্রেন
চলো চলো
যতই খুলে পড়ুক হৃৎপিণ্ডের চেন
জানালায়
কালপুরুষ ডাকেনি কি , মুছে দিয়ে হাসি—
“মঞ্চ রেডি…
স্নান করো , জিন্দা লাশ—আজ তোর ফাঁসি?”
ভাস্কর সুতার
প্রত্যাশা
তোমাকে ছাড়া আমি বাঁচব না—এই যে, মিথ্যাকে চুবিয়ে চুবিয়ে
জলে যে অন্ধকার নিয়ে এলে, আর সেই গাছকে আমি জানি পিপুল…
সকালে যে বক লাঙলের পিছনে ছিল, তাকেও প্রস্তুতি বলে…
আর মৃত্যুকে বলছ অভিশাপ
ক্ষয়ে যাওয়াকে তুমি, আমার স্থাপনাভাব
সঞ্জয় হালদার
তালপুকুর মাঠ
কাঁচা সবুজে মুখ ডুবিয়ে মানিকচাচার ছোটোপুকুরে হেলেনাদের আসাদ উৎসবে আগমনী গান… তালপুকুর মাঠের বুক চিরে সরু রাস্তার মুখে বীণাপিসিদের বাড়ি। আরও একটু দূরে বিমল, নীলিমাদের… সুবোধমাস্টারের সন্ধের ভূগোল পড়া ভুলে যেতে সাহায্য করতো হ্যারিকেনের মায়াআলোয় বীণাপিসির অদ্ভুত আর্তিতে গেয়ে ওঠা রবিবাবুর গান ‘আহা আজি এ বসন্তে, এতো ফুল ফোটে…’ বাঁশের খয়েরী রঙের জানালার মলিন কাপড় সরিয়ে বীণাপিসির ভারী সুন্দর বিনুনী করা চুল বুকের জামায় যেখানে গোলাপফুলের কুঁড়ি প্রিন্ট থাকতো সেখানেই মুখ লুকোনো দেখে, গোটা পৃথিবীটাকেই কেমন রহস্যময় মনে হতো…
মাঝখানে পনেরো বছর পর…বহুদিন যাওয়া হয়ে ওঠেনি ও পথে… আজ তালপুকুর মাঠে রাসমেলা, আমার সাত বছরের মেয়ে হারমোনিয়ামকে সুর শেখায়, ‘সখীর হৃদয় কুসুম কোমল…’ বিকেলের নতুন আলোয় চেনা গেল না কিছুই, পুকুর মজেছে। বড়ো মাঠ, বিমল, নীলিমারা কেউ নেই, কোথাও… বীণাপিসিদের ঈষৎ বদলে যাওয়া বাড়িটার পাশ দিয়ে যেতেই কানে এলো, কে যেন ভারী গলায় গাইছে, ‘মেরা কুছ সামান তুমহারে পাস্ পড়া হে…’
মহম্মদ সামিম
বিশ্বাস
বিশ্বাস আসলে এক অদৃশ্য সরলরেখা
যার দু’প্রান্তরে বেঁচে থাকে দুটি পৃথক অস্তিত্ব
ম্রিয়মাণ এই পৃথিবীতে এত অনাস্থাভাজন
এত বিদ্বেষ, একে অপরের প্রতি ঈর্ষাপরায়ণতা
এই সরলরেখার চারপাশে এত বৃক্ষনিধন
কাতর পাখির বাসাবদল আর হাহাকার
এসবই আসলে পরজন্ম ধ্বংসের গুপ্তবীজ…
প্রতিদিন যারা ভাতের থালায় বিষ ঢালে
রক্তবমি দিয়ে নির্মাণ করে ক্ষতের দূর্গ,
মায়ের আঁচলে ঢাকে ক্ষুধার প্রদেশ আর
ঋণী কৃষকের লাশ আগলে বসে থাকে,
তাদের হাতেই মুক্ত হবে একদিন
এই পৃথিবীর হৃত প্রশ্বাস
সরলরেখাবদ্ধ হয়ে সেদিন বেঁচে থাকব আমরা
গাছে গাছে ঝুলে থাকবে অন্নজল,
পাখিদের বিশ্বাস…
শান্তনু পাত্র
শয়ন
যতবার তোমাকে দেখে আপ্লুত হয়েছি
শিরায় শিরায়
অবিকল বুদ্ধপূর্ণিমা।
২
অনুভব থেকে মুছে দিলে, কুণ্ডলী
অন্তিম শ্বাস বুকে নিয়ে
ফুলের দিকে ছুটে যায়, আত্মা-পুরুষ
আহত ভূমির উপর, সঙ্গিনী
গুমরে গুমরে কাঁদে।
৩
আমি যতবার আসি
হাতির দাঁতের মতো
অন্তহীন সৌন্দর্যের পিঠে
মাহুতের ভয় শুয়ে থাকে।
রজতকান্তি সিংহচৌধুরী
সফর
বাতাসে উড়ছে মহুয়া ফুলের গন্ধ
শালজঙ্গল রোজ রোজ আরো সবুজে
ঢাকছে,এখনও তোমার দরজা বন্ধ
বনমল্লিকা টোকা দিয়ে গেল তবু যে।
জগতে যখন নানা জাগতিক ঝামেলা
ঘৃণা, হিংসায় মন্থন করে পৃথিবী
একটি উটনি ছেড়ে এল তার কাফেলা
বুকের ছায়ায় আশ্রয় তাকে কে দিবি?
এ মরু ধূসর, মরীচিকা দিকপ্রান্তে
এই কথাটাই বুঝি বরাবর জানতে?
মরূদ্যানের মৌ-টলমল শাখাতে
আঙুর ঝরছে জিভে-টাকরায় চাখাতে।
অমৃতাভ দে
আলো
গাছের সমস্ত পাতা ঝরে গেছে
ক্লাসরুম থেকে অঞ্জনার বয়ে চলা দেখি
বইয়ের পাতায় আল মাহমুদের কবিতা দুলে দুলে পড়ছে সর্দারের নতুন প্রজন্ম
উস্কো খুস্কো চুল-এতোয়া মুন্ডা যেন
মহাশ্বেতার কাহিনি পড়েছে ও
জানে উলগুলানের কথা
শিখেছে বাঁচার লড়াই
এই বসন্তে ওদের বাড়ির উঠোনে পলাশ ঝরে পড়ে
সুখ এসে নীরবে দাঁড়ায়।
কানে কানে বলে যায়- ফাগুনের গান করো
ও বোঝে পাখির ভাষা, চেনে ঘাস ফড়িঙের রং
জানে কিভাবে সাঁতরে পার হতে হয় উত্তাল নদী
শহরের দিদিমণি,দ্যাখো তোমার জন্য ও একটা কবিতার খাতা বানিয়েছে
তুমি ওর জন্য রেখে যেও একমুঠো রোদ্দুর
বকুলের গন্ধ মাখা একবুক আলো।
অমিত সাহা
দুঃখী প্রেম
দুঃখসমগ্রের আছে জানি
আকাশের উঠোনের ধান ।
পাখি এসে খেয়ে গেল কিছু,
রেখে গেল বিকল্প উড়ান !
গাছের পায়ের কাছে ঝুঁকে
সন্ধ্যালোক অজানাই লাগে ।
পেঁচার বিস্ময় নিয়ে দেখি
নদীটি তারার জন্য জাগে !
জাগে …
জাগে…
রাত্রি ক্রমে গাঢ়…
দুঃখী প্রেম, বাঁক নিতে পারো !
কনক মণ্ডল
গান কুড়ুনি
তুমি কি গান করনি এ বর্ষার দিনে
দু’হাত রেখে বলনি আয় বৃষ্টি আয়!
বর্ষাতরু ভিজে গেছে কোমল হাতে
পৃথিবী তরুণী মেয়ে খুঁজে ফেরে কাঠ।
আজ সকালের রান্না উদ্বৃত্ত নেই
দ্বিপ্রহর নষ্ট হলে তুমিই যাবে
হাঁড়িতে চাল চড়াতে। রাতের আহার
শেষ হলে মৃদু মৃদু বাতাস বয়।
তুমি গান করবে না এমন বাতাসে?
দু’বাহু রেখে বলবে না – মন্দ মন্দ বহে!