অজিত বাইরী
বর্ম
ঘনঘোর বর্ষার ভেতর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছ,
পিঠের উপর মস্ত বোঝা;
ঐ বোঝা তুমি নামাতে পারো না।
মাঝে মাঝে মুখ বের করে দেখে নাও
পৃথিবীর ঋতু বদল,
অলোকসামান্য রোদ্দুর পড়েছে তৃণে।
ঐ বর্ম, ঐ আত্মরতির খোলস
বয়ে বেড়াতে ভাল লাগে আজীবন ?
রাজেশ্বরী ষড়ংগী
ময়ূরাক্ষী
ট্রাম ট্রেন অটোরিক্সা লজেন্স কাটলেট
চিবোতে চিবোতে এসে ফুরিয়েছে দিন
এমনই আলিঙ্গনবিদ্ধ –
তারায় তারায় মিশে ভেসে যায় চোখ
বেজে ওঠে সুর
জীবনকে না বুঝেই…
ফেরার চিহ্ন না রেখে
পাঁজরের দীর্ঘশ্বাসে নেমে আসে
ঝড় ভর্তি ছায়া
এখানে আচমন করি এসো
জোৎস্নাপীড়িত ময়ূরাক্ষীর স্রোতে
এসো পুনর্জন্মে মুছে যাওয়া প্রেম
এখানে আচমন করি এসো
এসো হে অশ্রুবিন্দু,
বেত্রাঘাতে মরে যাওয়া পাখির জীবন
আমরা তাঁবুর নিচে রাত পেতে শুই
কখনও ভাগ করে নাওনি অন্যের জীবন;
ধরিত্রীর ত্রিভূজ উঁচু ডাঙায়
তুমি শুধু, তুমি শুধু শামুক ।
গৌতম হাজরা
মেঘ
চাঁদের শরীর বেয়ে নেমে আসে অভিমানী মেঘ।
সস্নেহে স্পর্শ করি তাকে। বুঝতে চেষ্টা করি
কোথায় তার ব্যথা, জমা জলে এতো কেন
কান্না জমে ওঠে।
চিত্রপট পালটে যায় দ্রুত। ঝুলবারান্দা বেয়ে
নেমে আসে চাঁদ। আকাশের মেঘরঙে উঠে আসে
গার্হস্থ্য জীবন। তুলির আঁচড়ে মাপি অভিমান কেন ?
সময় ফুরিয়ে আসে ক্রমে। চরাচর গন্ধে ভেসে যায়।
অভিমানী মেঘ তখন সীমানা পেরিয়ে
আকাশেই আকাশ জাগায় !
নিশীথ ষড়ঙ্গী
মা
কাছাকাছি গ্রাম এলে
জোড়াবট অশথের সবুজ অবুঝে
আম জাম ডুমুরের স্পর্শে স্পর্শে
তোমার উৎসুকমুখ ঘন হয়ে আসে।
যেন ভারি বর্ষা শেষ হলে
মাঠময় ঠান্ডাহাওয়ায় জুড়িয়ে এসেছে চোখ,
হালকা শাড়ির আভা,ধীর দুটি পায়ের পাতায়,
শান্ত দুই পংক্তি যেন ফুটে ওঠে আশ্চর্য বিভায়…
প্রণাম কোথায় যায় ? কতোদূর মগ্ন
হেঁটে গেলে
প্রণম্য অগ্নির কাছে শেষবার তোমাকে দেখার সেই
অমোঘ স্মৃতির পাশে পৌঁছে যেতে পারি!
কতোটা উতল বাঁধো আঁচলের নিবিড় গ্রন্থিতে,যাকে স্বপ্নে
দেখো কতোবার, অস্বীকার করেছি ভ্রান্তিতে…
কাছাকাছি গ্রাম এলে, ক্ষমা-অবয়ব,
দূর থেকে স্পষ্ট দেখতে পাই…
দেবগুরু বন্দ্যোপাধ্যায়
স্নান
এইমাত্র স্নান থেকে উঠে এলে
ফোঁটা ফোঁটা জলবিন্দু পিঠে যেন মন্ত্রের কোলাজ
পালকে লিখেছিলাম শেকড়ে জলের আনাগোনা
তবু লাঙলের ধারাপাতে লিখেছিল চাষি
তুমি তো পথের ঢেউ , তুমি তো জলের প্রতিবেশী।
চিনেছি স্নানের গন্ধ,
আকাশের মতো করে নদীকে বেঁধেছি !
তোমার ভেজানো বুকে যুবক কামড় দেয়
জারুল ভেজানো এক বিকেলের রোদ ।
এইমাত্র স্নান থেকে উঠে এলে তুমি—
যেখানে রেখেছ চোখ , সেখানেই চাষযোগ্য ভূমি।
অনুপ মণ্ডল
একদিন
অস্পষ্ট পায়ের ছাপ,আমি অন্তর্লীন ঘুরে দাঁড়াই
চোখ খুলে তাকায় তুলো বীজের রোমহর্ষতা
সান্ধ্য পুরুষের সম্ভোগের মতো কিছুটা পথ এবড়ো খেবড়ো
বিনতি কোণ বরাবর হলুদ হয়ে আসছে সমকালীন হাড়
ঘরের মটকায় ঝরা পাতার বেসামাল
এখনও টুপিয়ে নামছে আগুন ও বাতাস
ভালবাসা পুড়তে থাকলে
বাসি মাংসের মতো একরকম অশালীন গন্ধ বের হয়
শ্লেট পাথরে লিখে রাখি সেই সব মেঘদূত-কাব্য
আগামী বর্ষা ঋতুর জন্য
আমাকে চেনো কি ? চিনে রাখো আমাকে
আমি সেই পর্নমোচী গাছ
অভিমন্যু মাহাত
চক্রব্যূহ
সুতরাং তুমি আমায় নির্বাসন দাও,
ঢেউকণিকার রাত দাবি করিনি।
দেওয়াল হাতড়ে হাতড়ে নিজস্ব এপিটাফে আসি
লেখার মতো বেআব্রু দাম্পত্য আর নুনভাত নেই।
তুমি ছিলে, হাহাকারে স্পর্শ করি নুড়িপাড়ায়
নিষেধ অগ্রাহ্য করে বাঁটা হলুদের প্রবণতা খুঁজি।
আর কতদিন প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বেঁচে থাকবো?
সুতরাং তুমি আমায় নির্বাসন দাও,
জড়ুলচিহ্ন দাবি করিনি।
নষ্ট জলের ঘোর ধ্বনিত হচ্ছে,
ওলটপালোট বিকেল আসছে।
এই চোখ পোড়াবো বলে অনাত্মীয়তা খুঁজি,
সকলের সাথে আড়ি।
আদ্র বাতাসে বুকের ভেতর পাতাল ঝরছে,
দিকে দিকে চক্রব্যূহ…..
প্রতারক
আমার অনুরোধ আর তোমার অনুরোধ আজকাল ত্রিশূলে চাপে। কত বাক বিতণ্ডা। হয়তো তোমার আগের ‘হাহাকার টান’ বেঁচে নেই। কোনদিনই ছিল না… জেনেছি। আমার অনুরোধ, প্রত্যাশা ছিটকে যায়… গড়াগড়ি খায় ধুলো রাস্তায়। বাতাসে জ্বলে তোমার হুঙ্কার। যতটা আমি ভালোবাসি পুরুল্যায়, ঠিক ততটা পারি না কৃষ্ণনগরে। কোন গান বাজে না ছেঁড়া মাদুরে। ঢাকা দিতে হয় আরও একটা দুঃখী কাঁথা। আমার উত্তেজনায় তুমি সাড়া দাও না। শরীর দেব, মন দেব না বলে দরজা খুলে চলে যেতে চাও। তুমি অনশন পণে আর কতদিন? তুমি চলে গেলে আমাদের গ্রামে বৃষ্টি হবে না। তুমি নতুন পুরুষকে খুঁজে, যাবে সঙ্গতে। আমি যাব ছৌ আখড়ায়। অতীতের খুনি আমি। মারাংবুরু শুনে গেলেন, ম্লান হয়ে থাকলেন। ছৌয়ের তালে তোমায় রুষ্ট করতে পারিনি, আমিই প্রতারক।
তমাল লাহা
চক্রব্যূহে, উদাসীন
সময়ের বহু পূর্বে কেউ কেউ চক্রব্যূহে ঢুকে পড়ে মৃত্যু খুঁজে নেয়।
নিষ্ক্রমণ পথ তাকে শেখায়নি কেউ।
ভবিতব্য চোখ বেঁধে তাকে শুধু বধ্যকেন্দ্র চিনিয়ে দিয়েছে।
তারপরে একা যুদ্ধ, প্রতিদিন একা একা আপ্রাণ বাঁচার প্রয়াস।
অথচ সে ,তার সেই নির্দ্ধারিত আয়ুষ্কাল জানে,
প্রতিরাত্রে নিজেকে নিজের সঙ্গে মুখোমুখি বসায় হতাশ,
ওল্টায় অভিমানি তাস।
একদিন বিলকুল সব রং মিলেমিশে যায়,
তিনটি তাসের গায়ে জেগে ওঠে তিনখানি অপার্থিব ছায়া,
ধীরে ধীরে নিভে যায় তাঁবুর প্রদীপ।
অকস্মাৎ মধ্যরাত্রে সূর্য এসে মহামৌনে দাঁড়ায় শিয়রে,
দু’চোখে তুলসি রেখে চুপিচুপি বলে,যুদ্ধ শেষ ।
তারপরে নিচু হয়ে তুলে নেয় কোলে,
শ্লথ পায়ে উদাসীন বিন্দু হয়ে মুছে যায় দূরে
আবছায়া দিগন্তের গূঢ় অন্ধকারে।
বিশ্বজিৎ মহাত
জাহান্নম
উটের কুঁজে যে তৃষ্ণা বিশ্বাসী হয়েছে
আহত কবির ক্ষতে জন্মে যেন
নরকের ভোর
কত মরু হ্রদ হয় জানে না তোমার জিহ্বামূল ?
তৃষার্ত চুল্লির দেহে অধঃপতনের মৃত পথ
ধাক্কা দিয়ে বেজে ওঠে দেবীর ঘুঙুরে।
মরু ও জীবৎকাল বিশ্বাসের জলাশয়ে ঘোরে
উটের চুমুক দেখে এক’পা এগোয় কবি
কোনও পাপহীন জাহান্নমে
গৌতম গুহ রায়
বেহুলা
ঝড় থেমে গেলে ভেজা মাটি ঢেকে যাওয়া গুল্মের নিচে
একটা নিস্তেজ সাপ করুণ ভাবে গাছেদের দিকে তাকিয়ে দেখে
গাছেদের মগডালে সেই নিষিদ্ধ ফল
রসে পুষ্ঠ হয়ে কিভাবে ফেটে যাওয়া বীজ ছিটকে বেড়িয়ে যায়
অপর এক গুহার দিকে ।
মদে ভেজা রুটি ও তীব্র ক্ষার বালুতে মাখামাখি রোদ
থেমে থাকে সীমান্তের রেখায় ।শষ্যক্ষেত জ্বলছিলো,
আর তুমি আগুন অগ্রাহ্য করে ছুটছিলে
হাতে নিয়ে রক্ত আপেল,
নদীর উর্ধমুখি স্রোতের কাছে ।
পোড়া মাটির নীচে কুঁকড়ে যাওয়া হাড় ও মাংসের তীব্র গন্ধ
ঝর থেমে গেলে ঝড়ে যাওয়া হলুদ ও সবুজ পাতাদের ভেতর থেকে
মৃদু স্বরে কেউ বলে ওঠে,
“যেওনা লক্ষিন্ধর,
বেহুলার দেহ এখানেই কাম-ছলে ভষ্ম হয়ে আছে’ ।
শুভম চক্রবর্তী
প্রোষিতভর্তৃকা
সময় সুযোগ আর
ঝোপ বুঝে কোপ মারবো বলে
হাইমেন বিষয়ে আমি আজও কোনো কবিতা লিখিনি
বন্ধুরা বাতিল বলে, বলে তুই— অশ্বারোহী ; মূঢ়
অভিসন্ধিতার জল অনর্থক গর্ভপাতে ভরা
তাতেই তাথৈ নৃত্য, ডুবোজল, অন্তরীক্ষ, খরা
সমস্ত লেলিয়ে আসে
বাজে ঘন্টা কুকুরবিতানে…
হাইমেন বিষয়ে আমি আজও কেন কবিতা লিখিনি
অনিশ্চয়তা ওড়ে ডানার সন্ধানে
শ্যামাপদ মালাকার
খুন
ক’দিন হল- একটা কাজ পেয়েছি,
ও-গ্রামের ম্যাডামের বিকলাঙ্গ ছেলেটিকে—গানে – পল্পে ছুটি পর্যন্ত বাঁচিয়ে রাখতে হয়।
তিল-সময় উপায় নেই ফাঁকির- –
দারোয়ানের কড়াদৃষ্টি ওর মাইনেতে যোগ হয়!
ম্যাডাম চৌকাঠে পা রাখলেই ছুটি- –
মেঠোপথে ফিরি তবু শঙ্খ-সন্ধ্যের হাতে পড়ি।
বৃদ্ধা মা’এর সেবা করতেই গাঁ’য়ের অল্পরাতই নিঃসাড় হাঁকে!
তারপর, তারপর- তোমাকে ভাবার জন্য
পড়ার বাহানায় বসি- –
উড়ন্ত চিলের ডানার মতো- –
যখন একজোড়া ভ্রুযুগ আঁকি,- – অনেকটা রাত হয়ে যায়!
বারান্দায় ঘুমিয়ে মা’ স্বপ্ন দেখে,-“পড়ায় খুব মন- সূর্য উঠবে!”
প্রতিরাত মা’কে হত্যার ক্ষমতা যে দেয়- তোমাকে আঁচড় কাটার সাহসটুকুও
সে আমায়…
তোমায় পাওয়ার ইচ্ছে
শাণিত খাড়া হয়ে- ‘ওর’ হাড়-দেহ শুঁকছে
এর পরেও কি ‘ওদের’ মতো বলবে-
“লোপাট হয়ে যাক সব লালরঙ-
নিখোঁজ হয়ে যাক পাগলীটা!”।
সুবীর সরকার
শীত
১
শীত একটা বিরক্তিকর ঋতু।ওড়নায় মুখ ঢেকে জিপ
চালাচ্ছেন ফরেস্ট গার্ড
দলা পাকানো কুয়াশায় কিছু বিপদজনক
মানুষ
শেষ রাতে ডেকে ওঠা মোরগ
ট্রিগারে আঙুল রাখতে ভুলে
যাই
২
সেভাবে কিছুই করবার থাকে না আর
হু হু হাওয়ায় রাত জাগি
সড়কপথে ভাঙা ক্যামেরা
লণ্ঠন হাতে সংযোগসেতুর সামনে দাঁড়িয়ে
থাকা
অমিতরূপ চক্রবর্তী
চাঁদ
জলে টুকরো টুকরো হয়ে ভেসে যাচ্ছে মা
অনেকটা চাঁদের মতো , হয়তো বা চাঁদ , কলঙ্কখোদিত
আমার হাড়ের অলিগলি জুড়ে সরীসৃপের মতো কুয়াশার ঢল
বর্ণহীন এক চাদরে মুখ ঢেকে দেওয়াল ঘড়ির টিকটিক
একা একা ঢুকে যাচ্ছে কৃষ্ণগহ্বরে
আমি অদৃশ্য শেকল ধরে ঝুলে এগোতে এগোতে দেখি
টুকরো টুকরো মা অথবা চাঁদ জলে ভেসে যেতে যেতে
একটি নকল মেঘের পিছনে ঢাকা পড়ে গেল
সৌভিক বন্দ্যোপাধ্যায়
জুনিপার–জন্ম থেকে
সামনের ফ্ল্যাট থেকে ভেসে আসে
এঞ্জেলিনা জোলির মত ঠোঁট
কে থাকে ? কত নম্বর ফ্ল্যাট ?
বহুতলে সকলই অজানা
কেই বা কার চেনা এখানে
পিঁপড়ে-কলোনিতে বেড়ে ওঠে মুখোশ-কারখানা
ভুল বাড়িতে ঢুকে গুমখুন হয়ে গেছে চিঠি
উড়ন্ত লিফলেটে লেখা আছে –
একদিন দেখা হয়েছিল ….
এর চেয়ে , পাহাড়ে পাহাড়ে প্রতিধ্বনি হয়েথাকা ভালো
ইরাবতী, বল
এখনো ক্যামাক স্ট্রিটে দাঁড়িয়ে রয়েছো নাকি সন্ধে ছটায়
অফিসফেরতা কোনও শহরের বাঁকে
বেজে ওঠে মোবাইল ফোন –
“ভালো থেকো, আর দেখা হবে না কখনো…”
বহুতলে আলো জ্বলে, ছায়া সরে দেয়ালে দেয়ালে
কারা থাকে ? যারা থাকে, তাদেরও কি ভালোবাসা ছিল ?
দেরাদুন থেকে ছুটে চলা চিরছুটি আমি
মুসৌরি পাহাড়ে গিয়ে জুনিপার গাছ হয়ে থাকি
এ জন্ম আকাশের কাছাকাছি রোদের মন্ত্র হোক
পূর্ব্বজন্ম আমি রিজেক্ট করেছি।
রিমি দে
অলিখিত পান্ডুলিপি
১
গানগুলি কেবল মরুভূমি শুষে নেবার কথা বলছিল
কিছু না বলতে বলতে কিছু না ভাবতে ভাবতে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা
অতিক্রম করে বিষন্নতা আর উন্মাদনার
বিয়োগফল ছড়িয়ে রেখে এসেছি শাদা
শাদা একটি জমজমাট রংচটা গল্প হতে পারত
জমে উঠতে পারিনা বলে রক্তপাত শাসন করে
চোখ রাঙায় অবিরাম ভরদুপুর
ঝাঁঝালো গল্পের কথা মনে পড়ে
আমি রানা রায়চৌধুরীর শৌনককে খুঁজি
ধারণাকে খুঁজি হাপিত্যেশ হয়ে মরুভূমির ভিতর
সুড়সুড়ি আর ছায়ার ঝোলার ভিতর হাতড়াতে হাতড়াতে
শূনাতার গান পাই পাপড়ির আড়ালে
গানগুলি আসলে কানে কানে মৃত্যুর কথা বলে যায় নিভৃতে !!
২
মরুভূমি আপডেট করা হল
বালির মর্মর থেকে এখনো
ঝরে পড়ে কিছু অমীমাংসিত শিশির
টুপ্ টাপ শব্দে …
ইন্দ্রনীল সেনগুপ্ত
আক্রান্ত পালক
আক্রান্ত করো পালক, জ্বালাও ধিকিধিকি-
কেউ কি অভ্রান্ত হতে পারি? পারি কি?
যতই জ্বালাও আগুন, পোড়াও শরীর,
সন্তাপও পুড়ে যায়, যে মৃত্যু আসে
তাও স্থির একবগ্যা প্রহরীর মতো।
পাবে না কোথাও তাকে, মন গেছে অভিমানে,
গেছে নির্বাসনে, এলোমেলো স্মৃতি খেলা করে;
বইমেলায় বাইবেল বিলি করে কারা,
ফেরাই না কাউকে, বাড়িতে নিয়ে
আসি ঝুলি বোঝাই। পড়িনাএকটিও লেখা।
জীবন বাইবেল, ঝুলি ভরা জীবনের
লেখাপড়া; শিক্ষা নিই না কোন, বারবার
একই ভুল! শয়তানের প্রহরী বেঁচে থাকি।
ভাবি এভাবেই কাটবে সময়।
মৃত্যু বসে আছে। বসে আছে শেষদিন। পুড়ে
গেছে বিবেক, বাদ বিবাদ। ঢেউ একটা ঘোড়া।
তার পিঠে চড়ে রপ্ত করা গেছে ওঠানামা;
যদিও পালকে আগুন,তপ্ত শরীর বার্বিকিউ!
দিন শেষ হয়ে গিয়ে আকাশের মেঘে লাল
লাল আলো- চিতাকে মনে করালো।
স্নেহাশিস মুখোপাধ্যায়
পৌষপ্রান্তিক
গালে আবীর দিয়ো না
আবীরে বড়ো আরাম
বুকে জখম লাগে
চোখে শিথিল বিশ্রাম।
গালে আবীর দাও
আমি কাঙাল হই
তোমার পাশের খোলা আকাশ
আমার আপন কই
গালে আবীর দিয়ো না
আবীরে বড়ো আরাম
চোখে জখম লাগে
বুকে শিথিল বিশ্রাম।
প্রণব বসুরায়
বনমালি-নিকেতন
গন্ডির সামান্য দূরের খেত থেকে
তুলে আনি কমলার বন, পাইন গাছের সারি
সরু পথের পিঠ দেখি এখান থেকেই, উঁচু-নীচু
নেমে গেছে দিগন্তের দিকে, কুয়াশা-আড়ালে
জাফরাণি শামিয়ানায় সাজানো বাসর থেকে
বধূ চলে যায় কার হাত ধরে, কেন যায়
সেকথা জানার হক বাঁশিওলা পায় না কখনও
প্রেত লেগে কমলা ও পাইনের স্তুপ নড়ে ওঠে
সরে যায়… সরে সরে যায়
আমাদের ‘বনমালি-নিকেতন’-এ তালা চমকায়—
নিলয় গোস্বামী
প্রহর
নিভে গেছে বহুদিন হলো…
প্রথম দৃশ্যের চোখ,
চেনা শহরের অজুহাত-
মশগুলে জমিয়ে রাখে আলো।
প্রহর পুড়িয়ে গেছে লীল বাতাসের ঢেউ
অক্ষর ছিঁড়ে ফেলেছে পৌষালী পিয়ানো
আমনের খোলা মাঠ
আবির রাঙিয়ে গেছে হেমন্তসেনা কেউ।
আড়ালে জমানো সুর
মরে যায় অবিরাম
বিষাদীগ্রন্থ প্রণয় বেলার চিরকুট হতে রাজি
স্বপ্নরা তবুও হেঁটে যাক বহু দূর।
দেবার্ঘ সেন
স্ফুলিঙ্গ
তোমার প্রস্রাবের থেকে নুন ছেঁকে
দূরাবস্থা মেখেছে ভাত,
আমি তবু বিশ্বাস, রেখেছি সাগরিকায়।
প্রতারকের অম্লান বুকে, থিতু হয়েছে
উদম ভাস্কর্য কিছু। আমি তাকে হন্যে হয়ে
খুঁজে, হেরে গেছি খিদের কাছে।
চাদর মুড়ি দিয়ে কারা যেন মশাল হাতে
ছুটছিল এধার ওধার। গাছের আড়ালে
বেঁচে গেছি বলে, গাছকেই বাপ বলে ডেকেছি।
এখন এ তল্লাটে সব শিক্ষিতের বসবাস।
তাই বাপটা কাটা পড়েছে, রুখতে পারিনি।
সুনেন্দু পাত্র
জলের বাড়ি
জলে মুখ ভেসে যায়, নির্বিকার ছায়াহীন গৃহপথে।
অদূরে ধানক্ষেত। জলের সম্ভার শুধু আকৃষ্টহীন চেয়ে থাকা।
কোথাও কি তবে বাতাসের শব্দ ভারী হয়ে আসে ?
কোথাও কি বিবর্ণ হয়ে ওঠে মায়ের কারুকার্য ভরা মুখ ?
তবে এ আকাশে কোনো পাখি নেই। বৃষ্টির সোঁ সোঁ
অভিমানও নেই।
শুধু নিবিড় নিস্তব্ধ বয়ে চলা এক আলোর স্রোত।
অজস্র বলিরেখায় সমৃদ্ধ মায়ের আবছা তৈলচিত্র।
এখানে আমরা গাছ দিয়ে মেঘ গড়ি।
মেঘের তলায় রোপণ করি অজস্র প্রস্তরযুগীয় গাছ
তোমার বাগান থেকে যদি মেঘগুলি সরিয়ে ফেলি
বলো, তুমি কি আরেকবার তৈলচিত্রের পাশে এসে দাঁড়াবে না ?
অয়ন মণ্ডল
শ্রদ্ধাকে লেখা শেষ কবিতা
বিকালের রোদ লুটোপুটি খাচ্ছে বারান্দায়। কাল সূর্য ওঠার পর নিমপাতার মতো দুঃখ খুলে যাবে। আমাকে এখন কেউ আগের মতো চিনতে পারে না। চুমু খাওয়ার শক্তি হারাচ্ছে শরীর।
কার্নিশে কার্নিশে ডালিয়া চন্দ্রমল্লিকা। মা হারানো বালকের মতো মেঝে জুড়ে শীতলপাটির শীতলতা। দূর দেশের পাখি মরুভূমির গল্প শোনায়
ভুলে গেছি কিশোরী সকাল, পাশাপাশি হাঁটার টক ঝাল মিষ্টি অভিজ্ঞতা। ও মেয়ের এখনও বিয়ে হয়নি। মানসিক হাসপাতালের মতো মনমরা তার প্রেম…কেউ বলে ডাকনাম ‘শ্রদ্ধা’!
এরপরেও ফিরে আসে ফিঙে ফিঙে রাত। স্বপ্নে হতে থাকে লাগাতার সঙ্গম। কোনো সমাধান নেই… ছেলেটা লোক চিনতো না ঠিক
কুড়িবছর পর কেউ কী বলবেন, কবিতা লেখা ভদ্রলোক এখনও বিকালের রোদের জন্য অপেক্ষা করেন… পায়জামা ও বলিরেখা মুখে!
অঞ্জন দাস
অক্ষর–চাষী
কাছে এসো। আরও কাছে। ঘনিষ্ঠ দূরত্বে এসো তুমি।
বায়বীয় ম্লান হাওয়া। পাশে বসো। হাত রাখো কাঁধে।
আমি তো প্রেমিক পুরুষ। ফলতো যা যা হয়ে থাকে জানো !
এলোকেশী। মোহগন্ধ। কামনা জেগে থাকে অবিরত।
সহজেই প্রেম হয়। ভাড়া করা বিছানা-চাদর। হোটেলের রুম।
সে আমাকে বেশ চেনে।শরীর ভ্রমণ শেষে ভারাটে-প্রেমিক।
প্রজাপতি উড়ে যায়। অসভ্য রাতজাগা, যুগল-মিলনে।
শরীরে চিহ্ন থাক। চাদরে অশ্রু-ঘাম। ঘুমের বিছানা।
প্রেম নয়। পরকীয়া। শব্দ-বিছানা জুড়ে, বীজ পুঁতে রাখি।
আমি তো কবিতা লিখি।ভাষার রক্ষিতা। সামান্য অক্ষর-চাষী।
অনিমেষ চক্রবর্তী
আবাহন
এই শেষ, তর্কাতর্কি মুলতুবি রেখে ভাত বেড়েছি
এই শেষ, রেগেমেগে আসন পেতে জল গড়ালাম।
চিরন্তন রোমন্থনে মৃদুমন্দ সুরারোপ কে করে কাঙ্গাল?
বলো, অপারগ অপেক্ষাতে – দোষারোপে কে রাঁধে প্রেম?
কে করে কাটাকুটি, শল্কপত্র দু – হাতে ছাড়িয়ে?
এসো প্রেম, এসো ক্ষয়, এসো নতজানু হয়ে বেঁচে থাকি।
দুই হাতে, রেখাহীন তালু দিয়ে চেপে ধরি …
সেসব অতীত
সেইসব দখল
অলস যতিচিহ্ন যত।
দু-তাতে উড়াই সব অহঙ্কার, গরিমার যেটুকু ভাঁড়ার।
জমানো ক্ষুধা,
লুকানো পাপ – তাপ
সাজানো দুধেল বসন দিয়ে
এসো প্রেম, চার হাত বাড়িয়ে চলো নামি।
কুমারেশ তেওয়ারী
মুদ্রা বিভ্রম
কতোটা অশান্ত হলে মন, জ্বলে বিরহপ্রদীপ
প্রচণ্ড উন্নত এক শিখা হয়ে , জ্বলে যায় দাউদাউ
কামনার ছিঁড়ে যাওয়া পোশাক-আশাক
তখন কীভাবে বলো নেমে যেতে হয় নদীর গভীরে
কীভাবে মাছের কাছে বলতে হয় শান্ত স্বরে,
খাও সব ছিঁড়ে-খুঁড়ে খাও, চামড়ার মরা কোষ
ভুল কক্ষপথে হাঁটা খাও, সব শরীরের রং
এজীবনে শেখা কি হবে না আর অঞ্জলি মুদ্রার
সকলই গ্রহণ মুদ্রা বাড়িয়েছে চোরা ঘুর্ণিটান
এসেছি জলের কাছে ঋতুচক্র মেনে
যদি তুলে নিতে পারি কিছু শুদ্ধকাম স্নান
চন্দন দাস
প্রান্তিক মানুষেরা যে কথা বলতে পারে না
১.
এখন সমস্ত উৎকন্ঠা’য় বিষ ঢেলে দিলাম
আস্তে আস্তে কচলে উঠুক শ্রীচরনেষু বিষাদ
এরপর পালাবার উপায় থাকবে’না যখন
সন্ন্যাসী চোখে জোনাকি রাত পুঁতে দেবো।
২.
অপেক্ষা করো আত্মহত্যা মূলক গৌর-প্রবচন
তোমার সারা শরীরে এখন ঝালরক্ত বইছে
পৃথিবীর ইতিহাসে ধ্যানমগ্ন সব খড়কুটো বিকেল
আলো নিভে আসা পূর্বমুহুর্ত ব্যর্থতা চায়’না।
৩.
করতলে তামাক ঘসতে ঘসতে নেশায় বুঁদ
ক্ষতচিহ্নগুলো আত্মজনেষু দুঃচিন্তানগরী
সনাতনী কুকুর ধাওয়া করতে করতে যখন
পৌঁছে যাবে নক্ষত্রকাল, তুমিও তখন একান্ত
ঘুমিয়ে থাকো প্রেতাত্মা মাখা বিষাদ জড়িয়ে !
৪.
ইতিমধ্যে জেনে ফেলেছি সম্পর্কের রসায়ন
সমস্ত সম্পর্কে বিশ্বাস থাকা জরুরী নয়
দেবদারু বনে ঘুরে ঘুরে এক ফকির বিকেলে
পাখি হতে শিখে গেছি, আকাশ বড় উদাসী!
রবীন বসু
বিকল্প হরিণগন্ধ
বিড়াললাফ দিয়ে সূর্য এইমাত্র উঠে পড়ল কার্নিশে
ওতপাতা ভণ্ডামি ইতিউতি চায়
বেআব্রু শরম ফাকতার ওড়াউড়ি গলিঘুঁজি খোঁজে
আমাদের যাবতীয় পরিহাস সযত্ন প্রিয়তা পায়।
মনখারাপের চলাচল বিলম্ব প্রতিভাস আঁকে
এক কোণ থেকে আর এক কোণ
লাফ মারে বিড়াল চতুর জটিল বাঁকে
প্রত্যাশা চেটে নেয় অমসৃণ হাত প্রাণপণ।
সখ্যতা শত্রুতার সাথে মেলামেশা করে রেলইয়ার্ডে
বিস্তর ফাঁক আছে মধ্যবর্তী লাইনে
মাঠভাঙা হাওয়া মশারির উলটো পারে
বিকল্প হরিণগন্ধ নিয়ে মৃগনাভি রয়েছে লালনে।
বিধান শীল
উল্কা
তোমাকে দেখলে গুরু গুরু মেঘ ডাকত আকাশের ভেতর
ঘাসের উপর ফড়িংগুলো লাফালাফি করতো মাঠে মাঠে
হলুদ রোদ মেখে প্রজাপতি কথা খুঁজে বেড়াতো ফুলের বনে
নীরব বাতাসের ভেতর ঘন ঘন আসা-যাওয়া করতো ধুকপুকানি শব্দ ।
তোমাকে দেখলে কর্পূরের মতো নিমেষে উবে যেত সব অসুখ
দুঃখগুলো হঠাৎ মালা ছিঁড়ে বায়ু শূন্য পথে হাবুডুবু খেতো একান্তে
এক কোটি স্বপ্ন দু’বিঘা জমিতে চাষ করতাম গোপনে
ফসলের ঘ্রাণে থালা ভর্তি আনন্দ ঝরতো দু’চোখে ।
গোধূলি মেখে মুখোমুখি দাঁড়াই নি কোন বিকেল
দুর্বল জোয়ার অগুনতি ঢেউ শুধু ভিজিয়েছে বালুকারাশি ।
তুমি কোনদিন আমার প্রেমিকা ছিলে না
ভালোবাসি বলি নি কখনো ; তুমিও বলো নি
ভালোবাসি বলা জটিল অঙ্কের মতো
যে কোন পরিস্থিতিতে ভয়াবহ , একটা শহর ধ্বংসের মতো
কিংবা গলায় আটকে থাকা মাছের কাঁটার মতো বিপজ্জনক
অজস্র আলো কপালে সাজিয়ে নক্ষত্র হতে পারি নি
ধানকলে শস্য পিষতে-পিষতে উঠোনে একলা এসে দাঁড়ায় অন্ধকার রাত ।
আমি দেখি ,
তীব্র গতিতে উজ্জ্বল পোশাক জড়িয়ে মহাশূন্যে থেকে ছিটকে পড়ছে অজস্র উল্কা ।
সোনালী মিত্র
মহৌষধ
একটি প্রেম ভুলতে চাইলে আর একটি তুমুল প্রেমে পড়া অত্যান্ত আবশ্যিক
এই দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ প্রেম মহৌষধের মতো, শুরুতে কিঞ্চিৎ তেতো
অতঃপর রোগ নিরাময়ের অবিকল্প সঞ্জীবনী।
ভাঙাবুক নিয়ে আসা সুপ্রিয়া সামন্ত’কে বোঝাতে চাইলাম,
ভালবাসা মানে আসলে নিজেকেই ভালোরাখা
পিপাসার্ত পৃথিবী ভালবাসার দিকে খুলে রাখে তার যাবতীয় জল পরাগ
প্রেম অব্যর্থ ওষুধ, ঠোঁট রাখলেই মন আরোগ্য-নিকেতন।
নেশায় পাওয়া মেয়েটি নিভৃতে দেখালো বুকের গুঁড়ো গুঁড়ো বরফকুচি,
দেখালো, অসমাপ্ত রেণু সম্ভোগ
সুপ্রিয়া সামন্ত, সেই নির্বোধ রোগীনী,
প্রদত্ত দাবাইয়ের দিকে খুলে রাখলেন যন্ত্রণাসঙ্গীত
শ্বাসের বিনিময়ে বাজী ধরেন জীবন এবং মৃত্যু।
ঈশ্বর অবশ্য জানতেন,সুপ্রিয়া সামন্ত প্রকৃতই প্রেমিকা ছিলো
ভালবাসায় ব্যর্থ মানুষেরা পাগলাগারদ ছুঁয়ে ভাসিয়ে রাখেন
স্মৃতি ও প্রলাপ।
অর্ঘ্য দত্ত
অবুঝ
গাছেরা অবুঝ হয় ? ফাঁকা ঘাট অথবা পুকুর ?
রোদেরও কি শীত করে, কান্না পায়, বুক ধুকপুক ?
সন্ধ্যাবেলা একা লাগে, রেলগাড়ি দূরে চলে গেলে?
ওদের বেগুনি ব্যথা গোপন শিকড়ে লেখা থাকে !
গাছের করুণ বুকে কোনোদিন ছোঁয়াইনি ঠোঁট
পুকুরের অন্ধ চোখে কোনোদিনও রাখিনি এ চোখ
তবুও দিয়েছে ওরা আলো জল ধুলোরঙ ছায়া
আমি নই বাজিগর আমার তো একটাই মুখ
সে কথা জেনেছি বলে ঢেকে রাখি কুশের দহন
কথা ছিল তুমি হবে গাছ, ঘাট, আলোর পুকুর
আনন্দী, উড়ান দেবে, স্নান ছায়া স্বপ্নরঙা খুন
তবুও অবুঝ এতো ! ধৈর্যহীন শর্তহীন ঢেউ…
চারিদিকে আগুন, আগুন।
ভেসে যায় পুড়ে যায় লক্ষ্মীমন্ত আমার উঠোন…
কমলেশ কুমার
অভিশ্রুতি
আমার শরীর জুড়ে জেগে আছে চিতা
হেরে গেছে কান্নাও, অসমাপ্ত ছাই
কিছুই ঘটেনি, তবু ইতিহাস জানে
সেতুহীন নদী যেন আমাকে পোড়ায়
কতই রোদেলা দিন আকাশের গায়ে
খেলা ছিল, মায়ামেঘ, জন্মহীন ভয়
অকূলপাথার আজ চেয়ে আছে যেন
তুমিও সন্ধ্যাগামী মায়াবী সময়…
তুমিও সজনেফুল, ফাগুন বাতাস
এলোচুল কবিতাও, স্পর্শহীন একা
এ বাঁচায় নানাবিধ বিবাগীর দাগ
পৃথিবী আগলে রেখো আমার প্রেমিকা
রজতকান্তি সিংহচৌধুরী
গাছেরা কবিতা
গাছেরা কবিতা
পৃথিবী যা লিখে চলে
আকাশের কোলে
মানুষ সে-গাছ কাটে
কাগজ বানায়
শূন্যতায় শুধু ভরে তোলে।
নারী বিষয়ক
নারীকে তোমরা পাখি যদি ভাবো ঠিক
ডানা কেটে তার নিয়ো না
নারীকে তোমরা নদী যদি ভাবো, ধিক্
স্রোতে বেড়া বেঁধে দিয়ো না।
ভালোবাসা
কখনও শরীর দিয়ে
ক্বচিৎ আত্মায়
বিরলে সর্বশক্তিতে
ভালোবাসা যায়
কারু কারু প্রেম
আজন্ম নজরবন্দি মনের গুহায়।
তোমাকে
আমার সমস্ত বই
তোমাকে দেবই
আর দেব সমস্ত কবিতা
আমার সমস্ত জুঁই
যার গায়ে লেগে আছে তোমার চুমুই
এখনও তোমারই প্রতীক্ষিতা।
রৌদ্রতাপ
রাত্রি চলে যায়, হায়, স্বপ্ন ভেঙে যায়
রাত্রির দেবিকা আজ তোমাকে বিদায়
পরি-র চরণস্পন্দ বুকের সোপানে
মাথা কুটে মরে শুধু রৌদ্রতপ্ত শানে।
কার্তিক নাথ
সন্ধ্যায়
আমি কোন দিকে যেতে চাইছি ?
শেষে পথের মধ্যে হারাই
এত হত্যার দিন ছড়ানো !
হায়, এ কোন কুরুক্ষেত্র ?
এত লালন করেছে হিংসা,
শত দুর্যধনের প্রান্তর !
আমি ফিরে যাই এই সন্ধ্যায়
শুধু ভালবাসাটুকু রেখে দাও
পথে মুঠো মুঠো কিছু ছিটিয়ো
যেন জ্যোৎস্না মাখানো রাস্তা !
নদী শুয়ে আছে একা আঁধারে
এত ঈর্ষা বয়েছে নীরবে !
এই ঘোলা জল তার কান্না,
আমি ফিরে যাই পথপ্রান্তে
রণবীর দত্ত
বন্ধন দৃঢ়
ওড়ার কৌশল বুঝে নিয়েছি অনেকদিন আগে, কল্পস্নান
ভবঘুরে আগাপাশতলা ঘোরমোহ কাঁটছে বিচুলি
দুই স্বপ্নগ্রাম আয়াশ ও আঁখিরা কত যে গিয়েছি
লেট আর কোনহি পদবী আমার সঙ্গে মেলে না একেবারে
মুড়ি মোটাভাত নারায়নীর চানাচুর দুপুর খেয়েছি
মাজার দরগা মন্দির দিকে দিকে টলটলে জলের পুকুর
ভুবনখালির এই ছবি পাতা আছে আমার পায়ের কাছে
একটু একটু চাপ দিই নির্ভূল বন্ধনদৃঢ় দিগন্তের উড়ান
ওড়ার কৌশল বুঝে নিয়েছি অনেকদিন আগে, কল্পস্নান
অমিত সাহা
পাখি-প্রেম
প্রকৃত সিদ্ধান্ত কিন্তু জিজ্ঞাসা-সাপেক্ষ !
কাচের জানলায় আছে বিন্দু বিন্দু বৃষ্টির নিঝুম
কলহান্তরিতা নায়িকার মতো…
অথচ আকাশ চেয়েছিল বিকেলটা বৃষ্টিহীন হোক।
বিকেল চেয়েছে রোজ, একটা চিন্তাশূন্য পাখি,
দিনান্তে পাখির ঠোঁটে অগ্নিসম্ভবা খড়কুটো থাকে…
গাছফেরৎ পাখিটির হয়ে ওঠেনি নিশ্চিন্তে ওড়া !
সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে গিয়ে, সংকেত উড়িয়ে দিচ্ছে ডানা…
ব্যাধের মতন কারও পাখি-প্রেম তো পায় না !
বিভাস রায় চৌধুরী
জয়দেব বাউরী
অনুবাদ কবিতা
এই পৃথিবীতে আমরা দু’দণ্ডের জন্যে চমৎকার ছিলাম
ওসেন ভুয়ং
অনুবাদ—বঙ্কিম লেট
i
বলো, সে-সব খিদে ছাড়া আর কিছুই ছিল না।
কেননা, খিদে তাই-ই যা শরীরকে না দিলে, শরীর জানে,
শরীর থাকতে পারে না।
আরও একটা যুদ্ধে চাঁছা-ছোলা
এই সোনালি রঙের সূর্যরশ্মিই
আমার হাতকে তোমার বুকে
গেঁথে রাখে
আলপিনের মতো
i
তুমি, ডুবে যাচ্ছ
আমার আলিঙ্গনে—
থাকো
তুমি, তোমার শরীরকে ঠেলছ
স্রোতস্বিনীর ভিতর
ঠিক পর মুহূর্তেই
একলা হয়ে যাওয়ার জন্যে—
থাকো
i
আমি তোমাকে বলব , কীভাবে ক্ষমা পাওয়ার মত যথেষ্ট দোষ আমরা করেছিলাম।
কীভাবে একদিন রাতে আমার বাবা আমার মাকে ঝাপটা মেরে
ঘূর্ণিকরাতটা রান্নাশালের টেবিলে নিয়ে গেল; তারপর স্নানঘরে গিয়ে
নতজানু হয়ে বসেছিল যতক্ষণ-না আমরা দেয়াল ভেদ করে তার বোবা কান্না শুনেছিলাম।
চূড়ান্তমুহূর্তে আমি বুঝেছিলাম একটা মানুষ প্রায় আত্মসমর্পণের প্রাণী।
i
বলো আত্মসমর্পণ ।বলো শ্বেতপাথর । স্প্রিঙের ছুরি ।মাধবীলতা । স্বর্ণচাঁপা।
বলো শরৎ ।তোমার চোখ সবুজ হলেও , বলো, শরৎ। চড়া রোদ হলেও ,বলো সৌন্দর্য ।
বলো এর জন্যে তুমি খুনও করতে পারো। ভোর না হওয়া ভোর
তোমার গলায় দলা পাকিয়ে উঠছে।
তোমার নীচে আমার কাতরানি সেই চড়ুইটির মতো যে পতনে চমকে গেছে , মূর্ছা গেছে ।
i
গোধূলি : আমাদের ছায়ার মাঝে মধু’র ছুরি, শুকিয়ে যাচ্ছে ।
i
আমি পালাতে চাইছিলাম—তাই এক অপরিচিতের গাড়ির দরজা খুললাম । লোকটা ডিভোর্সি । সে তখনও বেঁচে ছিল ।সে মুখে হাত চাপা দিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিল (তার হাতদুটোর স্বাদ মরচের মতো)। তার চাবির গোছায় লাগানো গোলাপি ব্রেস্ট ক্যান্সার রিবন পাক খেয়ে গাড়ি স্টার্ট করে দিল। আমরা এখনও বেঁচে আছি এটা প্রমাণ করার জন্যে একে অপরকে স্পর্শ করিনি ?
আমি আগেও একবার এই এখানে এসেছিলাম।চাঁদ দূরে দপদপ করছিল , চাঁদ আমার ঘাড়ের বিন্দু বিন্দু ঘামে বন্দী । আমি ভাঙা জানালা দিয়ে কুয়াশাকে ছাপিয়ে ঢুকতে দিয়েছিলাম
আর আমার ছোবল-দাঁত ঢেকে ফেলতে দিয়েছিলাম।আমি যখন চলে এলাম ,বলেরো গাড়িটা তখনও বসেই ছিল , যেন চারণ ভূমিতে একটা বোবা ষাঁড় ,ওর চোখ দুটো শহরতলির বাড়িগুলোর দেয়ালে পড়া আমার ছায়াকে ঝলসে দিচ্ছিল । বাড়ি ঢুকে একটা টর্চের মতো বিছানায় আছড়ে পড়লাম ,আর দেখলাম আলোর শিখাগুলো আমার মায়ের বাড়িটিকে কুটকুট করে খেয়েই যাচ্ছিল যতক্ষণ-না ভোরের আকাশ দেখা দিল। সে আকাশ বিশাল এবং বিনিদ্র লাল। বলতে পারি ,আমি কীভাবে ওই আকাশ হ’তে চেয়েছিলাম—কীভাবে একসঙ্গে উড়ান এবং পতনকে ধরতে চেয়েছিলাম।
i
বলো তথাস্তু । বলো সংশোধন হোক।
যাইহোক
বলো, হ্যাঁ ।বলো , হ্যাঁ ।
i
শাওয়ারের তলায় , ঠাণ্ডা জলে ঘেমে আমিসাবান রগড়েই যাচ্ছিলাম…
রগড়েই যাচ্ছিলাম ।
i
পূর্ব জন্মে ,তুমি বলতে পারো,
দুটি মানুষ ভালোবেসেছিল
কারণ , যখন তারা ব্রীজের উপর পিকাপ ভ্যানটি চালাত
তখন তাদের ডানা যথা সময়ে গজিয়ে যেত ।
কোনও কোনও দিন ওই ভ্যানের ভিতরে আমি থাকি
কোনও কোনও দিন অপেক্ষা করতে থাকি
i
এমন কিছু দেরী হয়নি । আমাদের মাথায় ডাঁশের জ্যোতিশ্চক্র
আর গ্রীষ্ম এইমাত্র এসেছে ,সে এখনই কোনও পোড়াক্ষত রাখতে পারবে না।
আমার জামার ভিতর তোমার একটা হাত
যেন রেডিওর ভিতর শোঁ-শোঁ গোলযোগ তুমুল বাড়ছে।
তোমার আরেকটা হাত তোমার বাবার রিভলভারটিকে
আকাশের দিকে তাক করছে ।
একটার পর একটা নক্ষত্র ধরা পড়ছে রিভলভারের লক্ষ্যবিন্দুতে ।
অর্থাৎ, আমি ভয় করব না যদি ইতিমধ্যে আমরা এখানে এসে পড়েছি ।
ইতিমধ্যেই শরীর যা নিতে পারে তার চাইতে বেশি পেয়েছি ।
মানে, একটা শরীরের পাশে আরেকটা শরীর অবশ্যই একটা শস্যক্ষেত হবে
যে ক্ষেত টিকটিক করা ধ্বনিতে ভ’রে থাকবে।
মানে, তোমার নাম শুধু ঘড়ির ধ্বনি
যে ঘড়ি আরেকটি মুহূর্তের জন্যে পিছিয়ে রাখা হচ্ছে,
আর আরেকটি সকাল তোমার মায়ের সামনের বারান্দায়
দেখে ফেলছে আমাদের পোশাক-আশাক
যে পোশাক আমরা ঝরিয়ে রেখেছি
এক সপ্তাহের বাসি
লিলি ফুলের মতো
**
কবি-পরিচিতি : জন্ম ১৪ অক্টোবর ১৯৮৮, ভিয়েতনামের সাইগন-এ (বর্তমানে হো চি মিন সিটি)। দু’বছর বয়সে শরণার্থী হিসাবে আমেরিকায় আসেন। ইংরেজি ভাষার এই তরুণ কবি ইতিমধ্যেই দশটির বেশি পুরষ্কার ও সম্মান লাভ করেছেন। এখন পর্যন্ত রচনা করেছেন তিনটি কাব্যগ্রন্থ :Burnings(2010),No(2013) ,এবং Night Sky With Exit Wounds
ধারাবাহিক রচনা
ভাঙা দিনের ঢেলা
মলয় গোস্বামী
চাকরি কোথায় ? চাকরি কোথায় ? প্রেমিকা লাথি মারে
১৯৭৮ সালে, হঠাৎ একদিন, একটি বিষয় নিয়ে ভাবতে ব’সে বুকের মধ্যে বজ্রপাত হলো। যেন ভেঙে চুরমার হয়ে গেল আমার শিল্পজীবন। মনে হলো জীবন থেকে ধমনী-কাটা রক্তের ধারার মতন সমস্ত গানবাজনা-ছবি আঁকা-নাট্যাভিনয়-কবিতাগল্প-উপন্যাস-ম্যাজিক-দুরন্ত প্রেম সব চুঁইয়ে চুঁইয়ে বের হয়ে যাচ্ছে। আমার মন খোলস-ছাড়া সাপের মতন বিবশ।
আমি হঠাৎই ভাবতে বসলাম, আমার ছোট ভাই মৃন্ময়, প্রাণাপেক্ষা প্রিয়, মা-র কথা অনুযায়ী আমি আর ও বেদের আঠালি, সেই ছোট ভাই মৃন্ময় একদিনের নোটিশে বনগাঁ ছেড়ে দিল্লি চলে গিয়েছিল ‘ফেনার ইণ্ডিয়া’ নামে একটি ইন্দো-ব্রিটিশ কোম্পানিতে চাকরি করতে! ‘ফেনার ইণ্ডিয়া’ মোটর গাড়ির ফ্যান-বেল্ট তৈরি করত। আমাদের বাড়ির পাশেই থাকেন জীবন দত্ত। তিনি রাজধানী এক্সপ্রেসের চাকুরিয়া। প্যান্ট্রিকারের। দিল্লি যান, আবার পরের ট্রেনেই চলে আসেন। সেই জীবন দা একদিন আমাদের বাড়ি এসে হঠাৎ মৃন্ময়কে বললেন, তুমি যাবে দিল্লিতে ? একটা চাকরি হতে পারে। একজনকে বলেছি। মৃন্ময় উঠোনে দাঁড়িয়ে ছিলো। সে সঙ্গে সঙ্গে বলল, হ্যাঁ জীবন দা আমি যাবো। জীবন দা বললেন, কাল সকালে আমি যাবো। তোমাকে নিয়ে যাবো। মৃন্ময় অবলীলায় সামান্য কিছু জামাপ্যান্ট নিয়ে, পরের দিন সকালেই জীবন দা-র সঙ্গে চলে গেল সেই সুদূর দিল্লি। মা-র চোখ ছলছল করেছিল। তার তো ছোট ছেলে। বাবাও বেশি কথা বলেনি। বাবা স্কুলের শিক্ষক। যে টাকা হাতে পেত সেই টাকায় সংসার চালানোর অর্থ ফুটো নৌকাতে সাগর পাড়ি। বাবা হয়তো ভেবেছিল—যাক। মৃন্ময়ের একটা হিল্লে হোক। জীবন দা মৃন্ময়কে রাজধানী এক্সপ্রেসের প্যান্ট্রিকারের, মানে ট্রেনের হেঁসেলের মধ্যে লুকিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। দিল্লি পৌঁছে প্রথমে কয়েকদিন মৃন্ময় স্টেশনেই রাত কাটিয়েছে। যখন সে চাকরির উদ্দেশে রাজধানী এক্সপ্রেসে ওঠে, তখন তার পকেটে ছিল শত-খানেক টাকা।
পাড়ার লোকেরা, কেউ কেউ এসে বলতে লাগল—মৃন্ময় ঠিকই করেছে। এত বড় পরিবার শুধু একজনের আয়ে চলে নাকি! মৃন্ময় ছোট হলেও বাস্তববাদী। জানি অনেকের ঘৃণা আমার দিকে এগিয়েছে। কিন্তু সমস্ত শিল্পকে ছেড়ে আমি না-জানা এক সমুদ্রে ঝাঁপ দেব, তেমন বুকের পাটা, মৃন্ময়ের মতো, আমার ছিল না।
কিন্তু সেইদিন, বুকের মধ্যে বজ্রপাতের দিন, আমি মৃন্ময়ের বিষয় নিয়ে ভেবে, বাবার সাংঘাতিক খাটুনির কথা ভেবে, তিনটি বোনের ভবিষ্যতের কথা ভেবে নিজেকে অমানুষ বলে মনে করেছিলাম। ভাবলাম সব ছেড়ে টাকা ইনকাম করবই। বোনদের বিয়ে দিতে হবে। বাবাকে সাহায্য করতে হবে। দুটো টিউশনি, আর একটা গানের টিউশনি করেছি ইতিমধ্যে। টাকা ঠিকমতন না-পেয়ে ছেড়েও দিয়েছি। কোলকাতার কয়েকটি দৈনিক ও সাপ্তাহিক পত্রিকায় মাঝে-মধ্যে লেখার ফলে, মানি অর্ডারে সামান্য কিছু আসে। এইরকম পেয়ে সমাজের মধ্যে বুক ফুলিয়ে ঘোরা যায় না। আবার এর মধ্যে বেশ কয়েকটি প্রেমে পড়েছি। কয়েকটি প্রেম তো আমাকে দূরে যেতে দেবেই না। বেশ পাগল-পাগল অবস্থা।
জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে। বাবা সন্ধ্যার পর বাড়ি ফিরে, জামা-কাপড় পাল্টে, প্রায়ই দুটি হাঁটুর ওপর দিয়ে দু’হাত ঝুলিয়ে বিষণ্ণ মুখে বাজারের অগ্নিমূল্যের কথা মা-কে জানায়। মা হয়তো তখন রুটি বেলছে। আমি ঘর থেকে বেরনোর সময় এই দৃশ্য কখনও কখনও চুপ করে দেখে ফেলেছি। বাবা বলছে, স্কুল থেকে আর তো বেশি পাওয়া যাবে না। দোকানও বলে দিয়েছে… দিতে পারবে না ! হয়তো আমি তখন দেখছি, মা বাবার কথা শুনতে-শুনতে বেলন-চাকির দিকে না-তাকিয়ে রুটি বেলে চলেছে। আর কী আশ্চর্য! রুটি কিন্তু একটুও বেঁকে যাচ্ছে না! একেবারে গোল হচ্ছে। পৃথিবীর মতনই গোল। সত্যি কথা বলছি, আমি এরকমটি মনে করছি। তারপর নিজের মুখেই নিজে অদৃশ্য চড় মেরে বাইরে চলে গেলাম।
এই যে সংসার আর শিল্পের টানাপোড়েন আমার মন ও শরীর খারাপ করে দিতে থাকল। মৃন্ময়ের দিল্লি যাওয়ার সিদ্ধান্ত আমাকে চোখে আঙুল দিয়ে বুঝিয়ে দিতে থাকল—তুমি নৃশংস! তুমি মা বাবা ভাই বোনদের দায়িত্ব নিতে অক্ষম। ইচ্ছা-অক্ষম। অথচ মৃন্ময় তো গেল সংসারের জন্যেই। কিন্তু সে-ও এর পূর্বে প্রকাশ করেছে ‘হর্ষবর্ধন’ নামের একটি হাস্যরসের সাহিত্য পত্রিকা। খুবই সমাদৃতও হয়েছে পত্রিকার সংখ্যাগুলি। প্রমথনাথ বিশী, কুমারেশ ঘোষ, আশাপূর্ণা দেবী ভূয়সী প্রশংসা করে উৎসাহিত করেছেন তাকে। একাধিক চিঠি দিয়েছেন। রবীন্দ্রসদনের উল্টোদিকের ময়দানে অনুষ্ঠিত বইমেলায় মৃন্ময় একা ফেরি করে প্রচুর সংখ্যা বিক্রি করে করে ফিরে আসত আমাদের রক্তস্বাক্ষর পাবলিকেশনের স্টলে। রাত্রে আমি আর ও ফিরতাম সিঁথির মাসী-বাড়িতে। পত্রিকা বিক্রির টাকায় মাসীমার জন্যে কাপড় কিনছে। তাহলে মৃন্ময়ও তো শিল্পী। হাসির গল্পে তার শক্তি ঈর্ষনীয়। সে-ও তো চেয়েছিল পরিপূর্ণ লেখক-সম্পাদক হতে। তবু তো সে সংসারের হাল ধরার জন্যেই প্রায় সেকেণ্ডের সিদ্ধান্তে, চলে গেল দিল্লি! আমি কেন যেতে পারলাম না! প্রেমের সম্পর্কগুলির জন্যেই কি আমি জায়গা ছেড়ে নড়তে পারিনি! না যশের আকাঙ্ক্ষা ?
তখন, কেমন যেন মাথা নীচু করে ভাত খেতে বসতাম। পোস্তর দাম ছিল খুবই কম। সেই পোস্ত আর আলু দিয়ে বেশ তরল করে রান্না করত মা। একবার বলে ফেলেছিলাম, “মা, এইরকম ট্যালটেলে পোস্ত ভাল লাগে না। এরকম রান্না করো কেন?”
মা কিছুক্ষণ আমার দিকে শান্ত হয়ে তাকিয়ে বলেছিল—“এত বড় সংসার চালাতে এরকম ঝোল না হলে ভাত কটা গিলবে কী দিয়ে? তোর বাবার তো সেই বাঁধা গোরুর টাটা ঘাস।” তারপর থেকে খাওয়া নিয়ে মনে হয় কিছু বলিনি।
সিদ্ধান্ত নিলাম—চাকরি অবশ্যই দরকার। ৭৯ সালে বি এড-এ অ্যাডমিশন নিলাম। বি এড পাশ করলে শিক্ষকতার চাকরিটি পাওয়া যাবে।
একদিন রাগ করে দুটো প্রিয় বাঁশের বাঁশি বাড়ির পেছনের দেওয়ালে বাড়ি মেরে ভেঙে চূর্ণবিচূর্ণ করে দিলাম। তারা সরু সরু ফালি হয়ে এদিক-ওদিক ছিটকে পড়ল। বেশ কিছু বন্ধুবান্ধব চাকরি পেয়ে ছিটকে পড়ল এদিক-ওদিক। পরে লক্ষ্য করেছি বহুবার আমার কবিতায় ভাঙা বাঁশি বারবার প্রবেশ করে আমাকে কাঁদিয়েছে।
চাকরি পাচ্ছি না। হাত খরচের জন্যে মাঝে মাঝে অন্যদের প্র্যাকটিক্যাল খাতা এঁকে দিচ্ছি। পয়সা নেওয়ার সময় মাথা নীচু করছি। বুঝতে পারছি লেখালেখির চাকরি ছাড়া কোনও চাকরিই আমি করার জন্যে তৈরী নই। তবু মাথার শিক্ষকতাকে রেখে ১৯৭৯ সালে গোবরডাঙ্গা বি এড কলেজে ভর্তি হয়ে গেলাম। তখন আমার প্রথম কবিতার বই প্রকাশিত হয়ে গেছে। তার পূর্বেই লিখে ফেলেছি সত্যিকারের চিৎকৃত কবিতা:
দরবার কক্ষের ওপরে তাকাও
ঠুন্ ঠুন্ কাচের ঝাড়ে মোমের বদলে বোসে খিক্ খিক্ হাসছে সাপ
সিঁড়িতে কিছু টুপি, সারি সারি রক্তাক্ত সিরিঞ্জ ঢোঁক গিলছে অনন্ত পিপাসায়
লুকাতে লুকাতে তো দেয়ালে পিঠ লাগিয়ে দিয়েছি একদম
নিজস্ব প্রাসাদে এভাবে নিজেকে
ঘিয়ের দোকানের সামনের লেজ গোটানো লাল কুকুরটার মতন মনে হয়
আবার তার ঠিক পরেই লিখে ফেলেছি এইরকম:
চওড়া ফণা ছোবল মারে নাভিমূলে রাত্রিবেলা
বিকারে জমে বিষ টুপ্ টাপ্ ল্যাবরেটরির ডিস্ট্রিলেশন
ভিতর তখন ছলাক্ ছলাক্ তীব্র আয়োডিনের খেলা
উদ্ধত স্তন হলুদ নীবির দেবযানী গো এ কোন পেষণ !
এই বি এড পড়াকালীন সময়ে একটি কবিতা পাঠের অনুষ্ঠানে আমার কবিতা ও গান শুনে আনন্দবাজার পত্রিকার প্রথিতযশা সাংবাদিক সুদেব রায়চৌধুরী আমাকে কাছে ডেকে অনেক কথা বললেন। বুঝতে পারলাম তিনি আমাকে বেশ পছন্দ করেছেন। আমার যে একটা চাকুরির দরকার তা-ও বুঝেছেন। মনে আছে, তিনি সাংবাদিক ড: পার্থ চট্টোপাধ্যায়কে, তাঁর কার্ডের পেছনে, একটা অনুপত্রের মতন লিখে দিলেন। যাতে তিনি আমার একটি ব্যবস্থা করে দেন। যতদূর সম্ভব মনে পড়েছে পার্থ চট্টোপাধ্যায় অনুকূলচন্দ্র স্ট্রিটে ইত্যাদি প্রকাশনীর পরিবর্তন পত্রিকায় রয়েছেন। আমি সুদেব চৌধুরীর কার্ডটি সযত্নে আমার ডায়েরির মধ্যে রেখে দিয়েছিলাম। পরে পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে পরিচয় হলেও চাকরির জন্যে কখনও বলিনি। বলতে পারিনি আর কী। চাকরির জন্যে কীরকম শরীর ও বাকভঙ্গিমা প্রয়োজন তা আমি জানতাম না। আমার এইরকম ভাবনা শুনে আমার দু’এক বছরের বড় বন্ধু স্বপন দাস, যে আমার প্রথম কাব্যগ্রন্থটির প্রচ্ছদ এঁকে দিয়েছিলেন, বলল, না জানলে তো চলবে না। জানতে হবে। —আসলে সে তখনই পশ্চিমবঙ্গ বিদ্যুৎ দপ্তরে চাকরি জোগাড় করে ফেলেছে।
(ক্রমশ)
ধারাবাহিক রচনা
আকাশের আড়ালে আকাশ
সুদীপ বসু
‘ডেড-সোল্স-এর দ্বিতীয় খন্ড পড়লাম। অত্যন্ত কাঁচা লেখা।’
মস্কো। ১৮৪২। প্রকাশিত হ’ল ঊনবিংশ শতকের দুনিয়া কাঁপানো উপন্যাস ‘ডেড সোল্স’। ভ্যাসিলিয়েভিচ লেখক নিকোলাই গোগোল। মিখাইল ইভানোভিচ চিচিকোভ, একজন মাঝবয়সী মধ্যবিত্ত লোক ‘এন’ নামাঙ্কিত শহরে এসেছে একটি বিশেষ উদ্দেশ্যে। রুশদেশে তখন ভূমিদাসপ্রথা রমরমিয়ে চলছে। (১৮৬১ সালে লোপ পায়)। এই জমিক্রীতদাস প্রথায় মানুষের মালিক তখন মানুষ। দরিদ্র নিরন্ন প্রজাদের প্রভু ধনী কৃষকরা, জমিদাররা। কার দখলে কতজন ভূমিদাস রয়েছে, এই দিয়ে তাদের ঐশ্বর্য্য ও সামাজিক গুরুত্ব মাপা হয়। ভূমিদাসদের কেনা যায়, বেচা যায়, বন্ধকও দেওয়া যায়। সেনশাস বা জনগণনায় নির্ধারিত হয় কোন সামন্তপ্রভুর তাঁবে কতজন ভূমিদাস রয়েছে। এর জন্য তাদের সরকারকে মাথাপিছু কর-ও দিতে হয়। কিন্তু সেনশাসের তো কোনো ঠিকঠিকানা নেই। হয় বহু বছর বাদে বাদে, অনিয়মিতভাবে। ইতিমধ্যে অনেক ভূমিদাসের মৃত্যু ঘটে। কিন্তু পরবর্তী সেনশাস অবধি তাদের জন্য কর গুণে যেতে হয় জমিদারদের। এককথায় এটাই চিরকেলে প্রথা।
চিচিকোভ এসেছে এই মৃত প্রজাদের আত্মাকে কিনে নিতে। অর্থাৎ ‘মৃত আত্মার’ খরিদ্দার সে। টাকা দিলে জমিদাররা তো সানন্দেই মৃত আত্মা বিক্রী করে দেবে। কেননা এতে অর্থ-ও মিলবে আবার অনর্থক করের হাত থেকে রেহাইও পাওয়া যাবে। মিখাইল ইভানোভিচ চিচিকোভের স্বপ্ন সে একদিন বিপুল সংখ্যক মৃত আত্মার মালিক হবে। মরে হেজে যাওয়া ভূমিদাসদের ভূতের প্রভু। তবে এটা কোনো নিপাট নিরীহ স্বপ্নবিলাস নয়। চিচিকোভ আগে ছিল সরকারী কর্মচারী, দুর্নীতির দায়ে তার চাকরী চলে যায়। চিচিকোভ ভেবে নিয়েছিল এই প্রজাদের কাগজেকলমে বন্ধক রেখে সে প্রচুর টাকা ঋণ নেবে। তার বেশ কিছুটা বিনিয়োগ করে বাকিটা ইচ্ছেমত খরচ করবে। এই কারণে সে এইসত্যটা বেমালুম চেপে গিয়েছিল, যে এই ‘প্রজারা’ আসলে মৃত।
সংক্ষেপে এই-ই ছিল ‘ডেড সোল্স’-এর ভিত্তিভূমি। আধাবাস্তবতা আধাকল্পনা। তবে আলেকজান্ডার পুশকিনের মুখে শোনা একটি ছোট্ট কাহিনী ছিল এই রচনার চাবিকাঠি। লেখার শেষদিকে অবশ্য নিজের শহরে ফিরে আসে চিচিকোভ। চারশতাধিক মৃত প্রজার আত্মা তখন তার ঝুলিতে। প্রথমে সম্বর্ধিত হলেও পরে তার ফাঁকিবাজি চাউর হয়ে যায়। রটে যায় যে তার প্রজারা সকলেই মৃত। এছাড়াও গভর্ণরের মেয়ের সঙ্গে একটা সম্পর্ক নিয়েও তোলপাড় ওঠে। শেষমেষ শহর ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয় সে।
এখানে এই ফাঁকে বলে নেওয়া যাক এই উপন্যাসের যে সংস্করণ বাজারে পাওয়া যায় তা আদতে এর প্রথম খন্ড। বেশ কিছু এডিশনের সঙ্গে পরিশিষ্ট হিসেবে দ্বিতীয় খন্ডের প্রথম পাঁচটি অধ্যায় জুড়ে দেওয়া হয় – যেটি আসলে দ্বিতীয় খন্ডের প্রথম ও বাতিল হয়ে যাওয়া খসড়া। তীব্র অসন্তোষে গোগোল নিজের হাতে এই অংশটি ছেঁটে দেন। তাঁর পরিকল্পনা ছিল দান্তের ‘ডিভাইন কমেডি’-র মতো তিন ভাগে ‘ডেড সোল্স’ সম্পূর্ণ করবার –উপন্যাসটিকে একটি মহাকাব্যের রূপ দেওয়ার। কিন্তু কাল হল ১৮৪২-এ আলাদাভাবে প্রথম খন্ডটি প্রকাশ পেয়ে যাওয়ায়।
প্রকাশ পাওয়া মাত্র তোলপাড় উঠল পাঠক ও বিদগ্ধমহলে। সমালোচকদের মধ্যেও। এই তীব্র প্রতিক্রিয়ার সিংহভাগই প্রশংসা, অকুন্ঠ প্রশংসা। অনেকে বললেন ঊনবিংশ শতকের রুশ সাহিত্যের সেরা রত্ন এই রচনা। রুশ সমাজব্যবস্থার একই সঙ্গে মেধাদীপ্ত, বাস্তব, পরাবাস্তব, বিশ্লেষণাত্মক, ব্যাঙ্গাত্মক, স্পষ্ট ও রহস্যময় প্রতিবেদন নিকোলাই গোগোলের এই কালজয়ী সৃষ্টি। প্রতিক্রিয়াশীলদের বাঁকা কথায় আর প্রগতিশীলদের প্রবল পিঠচাপড়ানোয় সরগরম হ’য়ে উঠল রাশিয়ার আপাতশীতল সাহিত্যতীর্থ। যাঁদের মতামতের ওপর গোগোল একান্তভাবে নির্ভর করতেন তাঁরা প্রাণ খুলে সার্টিফিকেট দিলেন লেখাটির পক্ষে।
উপন্যাসের দ্বিতীয় খন্ডের জন্য উন্মুখ হয়ে রইলেন পাঠকরা। রাতারাতি গোগোলকে দেশের সেরা লেখকের আসনে বসানো হ’ল। তাঁর থেকে প্রত্যাশাও বহুগুণ বেড়ে গেল।
স্বাভাবিক ভাবেই গোগোল এতটা আশা করেননি। ওই বিপুল প্রশংসা, বাহবা, আলোচনা – সমালোচনার তীব্র তুফানের ভেতর পড়ে তাঁর মাথা গেল ঘুরে। নিজেকে সর্বকালের সেরা রুশ লেখক বলে ভাবতে লাগলেন। ভাবতে লাগলেন তিনি রুশ সাহিত্যের নবযুগের মসীহা। দ্বিধাদীর্ণ হৃদয়ে, উদ্বেগে, সংকোচে, অনিশ্চয়তায় হাত দিলেন দ্বিতীয় খন্ডের কাজে। কিন্তু যত লেখেন ততই অসন্তুষ্টি যেন ভর করে বসে তাঁর ঘাড়ে। শুধুমাত্র লেখার খাতিরেই তিনি ইউরোপ চষে বেড়ালেন। বিশেষ করে জার্মানি আর ইতালি। লেখেন, ছিঁড়ে ফেলেন, লেখেন, খারিজ করে দেন। স্বপ্নের লেখাটিকে, পাঠক সমালোচকের প্রত্যাশার লেখাটিকে যেন ছুঁতেই পারেন না কিছুতেই। দ্বিতীয় খন্ডে চিচিকোভকে নিয়ে গেলেন অন্য একটি শহরে, অন্য একটি ধান্ধায়। ধুরন্ধর চিচিকোভ আবার শুরু করল গভীর কারসাজি। সে অলস জমিদার তেনতেত্নিকোভের সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধল। ঘটনাক্রমে হতদরিদ্র ক্লোবিয়েভের থেকে জমি কেনার সময় তার এক ধনী আত্মীয়ার উইল নকল করতে গিয়ে ধরা পড়ে গেল। এত অবধি পৌঁছে মন ঘুরে গেল গোগোলের। পছন্দ হ’ল না। বাতিল করে দিলেন খসড়া পান্ডুলিপি। এগোলেন নতুন পথে। কিছুদিন বাদে সেটিকেও পরিত্যাগ করলেন। একধরণের উন্মাদনা গ্রাস করল তাঁকে। পথ থেকে পথে খুঁজে বেড়াতে লাগলেন তিনি। কী হবে সেই স্বপ্নের খসড়া?‘ডেড সোল্স’-এর দুনম্বর অংশ। স্বেচ্ছায় ক্রমাগত ধ্বংস করতে লাগলেন নিজের শরীর। ঘুমহীন রাত, নিরন্ন দিন। হাড়ভাঙা মাত্রাতিরিক্ত পরিশ্রম। মেধার অত্যাধিক চর্চা। অবশেষে পথ হারালেন গোগোল।
********* ***
মস্কো সহর। সাল ১৮৫২। ফেব্রুয়ারীর এক শীতসন্ধ্যা। প্রথম খন্ড প্রকাশ পাওয়ার পর দীর্ঘ দশ বছর কেটে গেছে। স্থান গোগোলেরই প্রাণের বন্ধু কাউন্ট তলস্তয়ের (লেখক নন) বাড়ির বসার ঘর। সেখানে সেদিন কী ঘটছে তা জানতে আমরা বরং সরাসরি চলে যাই ও বাড়ির গৃহভৃত্য তেরো বছরের কিশোর সিমিয়নের বয়ানের কাছে। সেদিন খুব ঠান্ডা পড়েছিল। ফায়ার প্লেসের কাছেই বসেছিলেন গোগোল। সিমিয়নকে বললেন একটা নির্দিষ্ট ফোল্ডার এনে দিতে। ফোল্ডারটি হাতে পাওয়ার পর গোগোল তার ভেতর থেকে ফিতে দিয়ে বাঁধা পাঁচশোরও বেশি কাগজের বান্ডিল বের করলেন। তারপর ফায়ার প্লেসের দরজাটা খুলে বান্ডিলটা ছুঁড়ে দিলেন আগুনে। সিমিয়ন ভয়ে চিৎকার করে উঠল ‘প্রভু! কী করছেনটা কী।’‘চুপ করো’, গোগোল ধমক দিলেন,‘এটা তোমার বিষয় নয়।’তারপর একটু থেমে গলা নীচু করে বললেন ‘তুমি বরং এদের জন্যে প্রার্থনা করো সেমিয়ন’। কিন্তু বান্ডিলবাঁধা কাগজগুলো পুড়ল না। গোগোল বান্ডিলটা বের করে আনলেন ফায়ার প্লেসের ভেতর থেকে।তারপর ফিতে খুলে একেকবারে কয়েকটা করে কাগজ হাতে নিয়ে সযত্নে মোমবাতির আলোয় পুড়িয়ে দিলেন। সব পোড়ানো হ’য়ে গেলে তিনি নিজের শরীরটাকে আক্ষেপে হতাশায় ছুঁড়ে দিলেন বিছানায় আর ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলেন।
এই বান্ডিলবাঁধা পাতাগুলির ভিতরেই ছিল ‘ডেড সোল্স’-এর সম্ভবত সম্পূর্ণ এবং শেষ পান্ডুলিপির খসড়া।
কিন্তু এই বিপুল ধ্বংসের মূলে কি ছিল শুধুই লেখকের উচ্চাকাঙ্খা আর আত্মগরিমা? ক্রমবর্ধমান অসন্তুষ্টি আর ব্যর্থতার আতঙ্ক? ইতিহাসের সাক্ষ্য অবশ্য অন্য পথে গেছে। তা হলো প্রবল অন্তর্দ্বন্দ্ব – ঈশ্বরের আর দুশমনের, ভালোর আর মন্দের, পবিত্র-অপবিত্রের। অন্তর্দ্বন্দ্ব গোগোলের হৃদয়ের প্রান্তরে। মাতভে কনস্টান্তিনোস্কি নামক একজন আর্চবিশপের অন্ধভক্ত ছিলেন গোগোল। এই আর্চবিশপ তাঁকে বারবার অনুরোধ করতেন সাহিত্যের পথ ছেড়ে আসতে। কেননা সাহিত্য অশুভর লীলাক্ষেত্র। শয়তানের মুক্তাঞ্চল। সাহিত্যে অসাধু দুশ্চরিত্রের ভিড়, অনেক ক্ষেত্রেই তারাই নায়ক। তারাই শাসন করে চারপাশ (যেমন ‘ডেড সোল্স’-এর চিচিকোভ)। সাহিত্য মানুষের মনের গহন অন্ধকারকে মহিমান্বিত করে। ধর্মের পথ-ই একমাত্র নৈতিকতার পথ, আলোর পথ, চরিত্র গঠনের সর্বোত্তম রাস্তা। আর কে না জানে গুরুদেবের অনুরোধে আদেশের সুর বড় হয়ে বেজে ওঠে। গোগোল যে অন্তর্দ্বন্দ্বে দীর্ণ হয়ে যাচ্ছিলেন তা আসলে ধর্মীয় নৈতিকতা বনাম সাহিত্যের সংঘাত। কনস্টান্তিনোস্কি-র মতে শিল্পসাহিত্যের ক্ষেত্র আসলে দুর্নীতি আর অশুদ্ধির আখড়া। আর একথা তো সত্যি হাজার চেষ্টা সত্ত্বেও গোগোল চিচিকোভকে ক্রমাগত অধঃপতনের হাত থেকে ফিরিয়ে আনতে পারছিলেন না। তিনি নিজেই টের পাচ্ছিলেন তাঁর লেখায় দুবৃত্তরা, দাগী অপরাধীরা, ধান্ধাবাজ মধ্যবিত্ত সামন্তপ্রভু আর তাদের দালালরা যে পরম মমতার ছোঁয়ায় ফুটে ওঠে সৎ বিবেকবান সত্যনিষ্ঠ চরিত্ররা ততটা স্পষ্ট হন না। আর সেই কারণেই নাকি এই সিদ্ধান্ত। এই চরমতম কঠোর সিদ্ধান্ত। গোটা পান্ডুলিপিটাকে লেলিহান অগ্নিগ্রাসে নিক্ষেপ করা।
প্রখ্যাত রুশ কবি মারিনা স্বেতায়েভা তাই একবার লিখেছিলেন ‘ফায়ারপ্লেসের ধারে গোগোলের ওই আধঘন্টার কান্ডকারখানা ন্যায়ের স্বার্থে অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অনেক বেশি কার্যকর হয়েছিল – তলস্তয়ের বহুবছরের ধর্মপ্রচারের চেয়ে’।
উচ্চাকাঙ্খা আর অন্তর্দ্বন্দ্ব – এদুটি কারণের বাইরেও অবশ্য আরো দুচার কথা শোনা যায়। একটি গোষ্ঠীর মতে – এই মতটি রুশদেশে বেশি প্রচলিত – লেখকের মুহূর্তের ভুলে ওই কান্ডটি ঘটেছিল। উপন্যাসটির পান্ডুলিপির একাধিক খসড়া ছিল। অন্য একটি খসড়াকে পুড়িয়ে ফেলতে গিয়ে ভুল করে এইটিকে আগুনে দিয়েছিলেন।
আর একটি মত বলে লেখাটি আদৌ দগ্ধ হয়নি। ওটি চুরি গিয়েছিল। ওটিকে গোপনে সরিয়ে ফেলা হয় যা ছিল প্রতিক্রিয়াশীল স্লাভোফাইল-দের কাজ। এই জারপন্থী, রক্ষণশীল, ধর্মান্ধ, গোঁড়া গোষ্ঠীটির নৈতিক ও রাজনৈতিক আদর্শ গোগোলকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। তারা প্রকাশ্যেই ঘোষণা করত গোগোলের আন্তরিক বিশ্বাসকে, মতাদর্শকে কলঙ্কিত করছে তাঁর এই উপন্যাসের ক্রুরকুটিল চক্রান্তজটিল চরিত্ররা।
তৃতীয় একটি মত প্রচলিত আছে। সেটি অবশ্য খুবই সোজাসাপটা, সরাসরি এবং আপাত এলেবেলে। তা হ’ল, আগুনের ঘটনাটা আদৌ ঘটেনি। ওটি নিতান্তই মনগড়া, বানানো। নিজের গুরুত্বকে বাড়ানোর জন্য এবং ইতিহাসে জায়গা পাওয়ার লোভে বালকভৃত্য সিমিয়নের কান্ড এটি। সেই বলে বেড়াত এই কল্পকাহিনী।
দ্বিতীয় খন্ডের যে পাঁচটি অধ্যায়ের কথা আগে বলেছি, (বলা বাহুল্য সেগুলি বাতিল কোনো অসম্পূর্ণ খসড়ার অংশ) ঘটনাচক্রে তলস্তয়ের হাতে এসে পড়ে ১৮৫৭ সালে। ২৮শে আগষ্ট, ১৮৫৭, তলস্তয় ডায়েরিতে লিখছেন “..‘ডেড সোল্স’-এর দ্বিতীয় খন্ড পড়লাম। অত্যন্ত কাঁচা লেখা।” সৌভাগ্যক্রমে গোগোলকে অবশ্য এই মতামতের মুখোমুখি হতে হয়নি।
*********
অত্যাধিক উচ্চাশায়, শিল্প বনাম নৈতিকতার যুদ্ধে ছিন্নভিন্ন হতে হতে সর্বশেষ পান্ডুলিপিটিও ধ্বংস করলেন লেখক। শরীর দ্রুত ভেঙে পড়তে লাগল। দেখা গেল মনোবিকলন। বুঝে গেলেন তাঁর স্বপ্নের প্রকল্পটি আর হয়তো সম্পূর্ণ করা গেল না এ জীবনে। অধিকাংশ সময়ে স্বেচ্ছায় ঘরবন্দি থাকতেন গোগোল।
অগ্নিসংযোগের ঠিক দশদিনের মাথায় শিরায় রক্তের তোলপাড় স্তব্ধ হ’য়ে গেল ‘দা নোজ’ ‘দা ওভারকোট’ ‘ডায়েরি অফ অ্যা ম্যাড ম্যান’ প্রভৃতি কালজয়ী গল্পের স্রষ্টা রুশসমাজব্যবস্থাকে ব্যঙ্গে বিদ্রূপে তছনছ করে দেওয়ার কারিগর এই ডাকসাইটে লেখকের। সমস্ত সংঘর্ষ টানাপোড়েন আর বিতর্কের উর্দ্ধে চলে গেল তাঁর তুচ্ছ মরশরীর। মাত্র তেতাল্লিশ বছর বয়সে। ৪-ই মার্চ ১৮৫২-তে। মস্কো শহরে।
গল্প
কামরাঙা
সায়ন্তন ঠাকুর
১
দুটো গাছে ঝেঁপে ফল এসেছে এবার। বর্ষার জল পেয়ে লকলক করে বেড়ে উঠেছে নতুন পাতা। ঘন সবুজ পাতার আড়ালে বোঁটায় ঝুলে আছে একসঙ্গে তিন চারটে করে কামরাঙা। আস্তে আস্তে হলুদ হয়ে আসছে তাদের গায়ের রঙ। কচি সবুজ রঙাও আছে কিছু।আরও কিছুদিন পর হলুদ হবে তারা। টক মিষ্টি স্বাদ হবে। রাতের বেলা পাকা কামরাঙার লোভে উড়ে আসে বাদুড়ের দল। পরদিন সকাল বেলায় আধখাওয়া ফলগুলো পড়ে থাকে গাছের তলায়। উঠোনে গাছদুটোর পাশেই বদন শেখেরঘর। মাটির দাওয়া। খোড়ো চালে মিষ্টি কুমড়ো লতা।ছোট ছোট সবুজ প্যাঁচানো আঁকশি দিয়ে চালের কঞ্চি আঁকড়ে ধরে বড় হয়ে উঠেছে। খড় পচে জায়গায় জায়গায় কঞ্চি বেরিয়ে এসেছে। সেইসব ফাঁক দিয়ে চুঁইয়ে চুঁইয়ে বৃষ্টির জল এসে ঢোকে ঘরে। থকথকে কাদা হয়ে যায় মাটির মেঝে। আজকাল বদন একটা হাঁড়ি কি কড়াই পেতে রাখে। তার ভেতরেই টপ টপ শব্দে জমতে থাকে জল। কিছুক্ষণের মধ্যেই ভরে যায়। ঘরে থাকলে দিনমানে সেই জল ফেলে আবার ফাঁকা হাঁড়ি পেতে দেয় বদন। আর বাড়ি না থাকলে উপচে জলে ভেসে যায় ঘর। কাঁথা তেলচিটে তোষক বালিশ ভিজে ফুলে ওঠে। ক’দিন পর সাদা সাদা নরম তুলোর মতো কীসব যেন গজিয়ে ওঠে সেখানে। ভ্যাপসা এক দমচাপা বাতাস ঘুরে বেড়ায় ঘরের ভেতর। ওই বাতাসে বদনের হাঁপের টান বাড়ে। কাশতে কাশতে গলা ছিঁড়ে খানিক রক্তও উঠে আসে। রাতের বেলা ওই কাশির শব্দ শুনে পাখা ঝাপটে পালায় উঠোনের কামরাঙা গাছের ডালে ঝুলে থাকা বাদুড়ের দল। ঘরের ওপর পাক খেয়ে উড়ে বেড়ায়। তারপর শব্দ থেমে গেলে আবার ফিরে আসে। আগে লাঠি নিয়ে তেড়ে যেত বদন। কামরাঙা খেতে খুব ভালবাসত তার আট বছরের ছেলে,তমিজ। মাঠের কাজ সেরে ফিরে বিকেলে গাছে উঠে বা আঁকশি দিয়ে পেড়ে দিত,বেছে বেছে হলুদ রঙা গুলোই পাড়ত বদন। দাওয়ায় বসে একটু লবণ মাখিয়ে চুষে চুষে খেত তমিজ। শ্রাবণ মাসের সেসব বিকেলে থেমে যেত বৃষ্টি। বাড়ির পিছনে জলাজমি,আতা গাছ,ফণিমনসা,বিছুটির ঝোঁপ পার হয়ে আদিগন্ত মাঠ। সে মাঠ সবুজ হয়ে আছে কচি ধানের রঙে। তারও পরে সিঁদুরে লাল আকাশ। গোটা দিনের শেষে ছাইরঙা মেঘ সরে গিয়ে পশ্চিম দিকে খুলে দিয়েছে যেন এক অলৌকিক রঙের বাক্স। বর্ষণক্ষান্ত বাতাস শিশুর মতো ছুটে বেড়াচ্ছে চারপাশে। দোলা লেগে উঠোনের আরেক পাশে ঝরঝর করে খসে পড়ছে পাকা বেগুনি জাম। দৌড়ে গিয়ে কুড়িয়ে আনছে তমিজ। দুহাতের কচি মুঠি খুলে রিনরিনে গলায় বলে উঠছে,
–আব্বু,জাম খাবা ?
কোলে নিয়ে উঠোনে বাঁশের বেড়ার পাশে গিয়ে দাঁড়াত বদন। আকাশ ধোয়া রঙে ভেসে যেত দুজন মানুষের শরীর। খেতে ধানের দিকে আঙুল তুলে তমিজ জিগ্যেস করত
–খেতি লিয়ে যাবা আব্বু একদিন ?
–খানিক বড় হ বাপ! লিয়ে যাব তুকে
–আকাশে ওগুলান কী অঙ আব্বু ?
কী বলবে ভেবে পায় না বদন। ওই রঙ কোথা থেকে আসে আবার কোথায় যেন মিলিয়ে যায়। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলে
–আল্লার অঙ রে। অক্তসন্দে। এমুন অঙ ধরলে ম্যাঘের গায়,আর বিষ্টি হবে না।
কী বোঝে আটবছরের বালক কে জানে। একমুখ হেসে বলে
–ইদ কবে আব্বু ? লতুন জামা কিনে দেবা না ? গোস্ত খাওয়াবা না ?
–দিব তো! গোস্ত লিয়ে আসব,তুর জামা…—হা হা করে হেসে ওঠে বদন।
–অসগোল্লা কিনে দিবা ?
অন্যমনস্ক হয়ে যায় বদন হঠাত। ছেলেটা রসগোল্লা খেতে ভারী ভালবাসে। এবার পরাণ চৌধুরীর জমিতে রত্না চাষ করছে বদন। বর্ষাও বেশ ভালো। লকলক করে বেড়ে উঠছে ধান। কালো মাথার মাজরা পোকার হাত থেকে বাঁচাতে কার্বোফুরানও ছিটিয়েছে। আরও মাস তিন পর কপাল ভালো থাকলে পয়সা পাবে বদন। ছেলেটার নতুন জামা,খড় ছাইতে হবে চালায়,বউএর একটা শাড়ি,মজিদপুরের মেলায় কাঠের চাকি বেলনা,দম দেওয়া খেলনা গাড়ি…কত ছবি একের পর এক ভেসে যেতে থাকে,সংসারী গেরস্ত মানুষের ছবি।
–আব্বু, দেবা কিনে অসগোল্লা ?
তমিজের ডাকে সম্বিত ফেরে বদনের।একটু হেসে বলে
–তুর কামরাঙা দাওয়ায় পড়ে আছে,খাবি লায় ?
রসগোল্লার কথা ভুলে টোকো কামরাঙার টানে বাপের কোল থেকে দাওয়ায় ছুটে যায় তমিজ। মাটি থেকে তুলে চুষতে থাকে। খেতের দিক থেকে ধেয়ে আসে বাতাস। আকাশ থেকে খসে পড়া রঙ মিশে যায় তার শরীরে। একটা পুরনো বিকেল গড়িয়ে যেতে থাকে সন্ধের দিকে। তার নীচে মাটির দাওয়ায় রচিত হয় কবেকার এক ছবি।
আজকাল বদন আর ছুটে যায় না রাতবিরেতে বাদুড় তাড়াতে। খাক ওরা। ছড়িয়ে ছিটিয়ে উঠোনময় পড়ে থাকে বাদুড়ে খাওয়া কামরাঙা। বেগুনি হয়ে থাকে জামগাছের তলার মাটি। ডেঁয়ো পিঁপড়ের দলে সারি বেঁধে খেতে আসে জামের মিষ্টি রস। বেড়া ভেঙে পার্থেনিয়ামের ঝোঁপে ঢেকে গেছে সারা উঠোন।ছোটফিঙা গাঁয়ের একপ্রান্তে বদন শেখের এই বাড়ি। দূর থেকে দেখলে মনে হয় আগাছা ঢাকা একটুকরো সবুজ ভূখণ্ড। কখনও সখনও গাঁয়ের ছেলেরা জাম কি দুটো কামরাঙা পাড়তে আসে। জিগ্যেস করে
–ও চাচা,দুটো জাম লিব ?
ঘরের ভেতর থেকে ভাঙা ঘরঘরে গলায় জবাব দেয় বদন
–যা যা লিয়ে যা,সব লিয়ে যা।
কাজকর্মও তেমন নাই বদনের। গত অঘ্রাণ মাসে ধানি জমি বাড়ি বেচে দিয়ে কলকাতায় ছেলের কাছে চলে গিয়েছে বুড়ো পরাণ চৌধুরী। সেই জমি যে কিনেছে তাকে চোখেও দেখেনি ছোটফিঙা গাঁয়ের লোক। যাওয়ার আগে বুড়ো চৌধুরী বদন কে বলে গেছিল
–বদন,তুর বাপ,তার বাপ আমার জমিরই সব চাষা ছেল। তুরা হলি আমাদের চাষা। তুর কুনও চিন্তা লায়, বলিছি তুর কুথা। তুই ই চাষ করবি,যেমন পয়সা পেতিস,পাবি।
–কিন্তু কত্তা, যদি লতুন মালিক চাষ না করি
–তু কি পাগল হছিস বদন ? ধানি জমি,তিন ফসলা জমি কিনে ফেলা রাখবে কুন বুকা ?!
কিছু বলে না বদন। চুপ করে বসে থাকে চৌধুরী বাড়ির পুরনো লাল মেঝের ওপর। সামনে একটা বড় হাতলওয়ালা ইজি চেয়ারে পরাণ চৌধুরী। সাদা ধপধপে ধুতি। গায়ে একটা স্যান্ডো গেঞ্জি। পাকা গমের মতো গায়ের রঙ। আশি বছর বয়সেও মাথায় একরাশ চুল। কলাইএর থালায় একরাশ মুড়ি,কাঁচা পেয়াঁজ,লঙ্কা আর দুটো গরম বেগুনী দিয়ে যায় চৌধুরীদের কাজের মেয়ে। পাশে একঘটি জল। জলের ছিটে মেরে মুড়ি খেতে থাকে বদন। কিছুক্ষণ পর পরাণ চৌধুরী নিজের মনেই যেন বলে ওঠে
–চিন্তা করিস লাই বদন। জমি হল মা লক্ষ্মী। তার দয়ায় তুর ভাতির অভাব হবি না,দেখিস।
–ভাতির চিন্তা করি লাই কত্তা, জমিতে ধান না বুনলি,শীতের মুখে সর্ষে না বুনলি,হাওর হয়ি পড়ে থাকবি যি আপুনার নক্কী। ওই মুর চিন্তা।
চুপ করে থাকে পরাণ চৌধুরী। একটা পুরনো ফ্যান শব্দ তুলে ঘুরে যেতে থাকে মাথার ওপর। কবেকার খোপ কাটা লাল মেঝের ওপর মুড়ি চিবোয় বদন শেখ। দেওয়ালে দশভূজা দুর্গার ছবি। এ বাড়িরই নাটমন্দির। ছোটফিঙার চৌধুরী বাড়ির দুশো বছরের পুরনো দুর্গাপুজো। বিক্রি হয়ে যাচ্ছে সব। কলকাতার কোন এক লোক নাকি কিনেছে সব। ফসলি জমি,বাস্তুভিটে সব। পরাণ চৌধুরীর দাদুর বাবা ইঁট পুঁতেছিল এই ভিটের। জমিতে লাঙল দিতে ডেকেছিল বদনের বুড়ো দাদু তার বাপকে।
–আমারই কি যাতি মন চাইছি রে বদনা–ভাঙা ভাঙা শোনায় গলার স্বর।
খাওয়া থামিয়ে বদন বলে–যাছিন কেনে বাবু ? বুড়ো কত্তার ভিটে,জমি বেচে কেউ যায় !
মাথা নীচু করে বসে থাকে পরাণ চৌধুরী। পুরনো বাড়ির দালানে কোথা থেকে বয়ে যায় বাতাস। হাহাকারময় সে বাতাসে কাদের যেন সব দীর্ঘশ্বাস মিশে থাকে।
–যেতে হয় রে,বদন! ব্যাটা বড় হলি তার কথা বাপকে শুনতি হয়। সে এই ভিটে,ওই ফসলি জমি,দুর্গাদালান, চারপুরুষের পুজো কিছুই বুঝে না, আজকালকার পোলা, মুই-তু,তুই-মু এই আপনি কোপনির সংসার। তুর ব্যাটা তমিজ বড় হলি
কথা শেষ হয় না পরাণ চৌধুরীর। হঠাৎ যেন মনে পড়ে যায় সবকিছু। গেল চোত মাসে সেই রক্তক্ষয়ী দাঙ্গা,শ্মশানে বুড়ো শিব মন্দিরের চাতালে গোরুর মাংসরেখে যায় কারা,ক’দিন ধরেই চাপা উত্তেজনা,তারপর একদিন অচেনা কতগুলো লোক রাতের অন্ধকারে ম্যাটাডোর ভর্তি করে ঢুকে পড়েছিল, খোলা তরবারি,জয় শ্রীরাম ধ্বনি…বদনের বউ, দুটো মাই কাটা দেহটা পড়ে ছিল আলের ধারে, বদন সন্ধে থেকে আটকে ছিল সেদিন রাস্তায়, পুলিশ কাউকে ঢুকতে দেয়নি গাঁয়ে,ধানের বীজ কিনতে বারাসাত গেছিল,পরাণ চৌধুরীর জমির ধানের বীজ,ফিরে পরদিন নালার ধারে তমিজের ছোট্ট দেহটা খুঁজে পায়, নাভির নীচ থেকে কাটা,পা দুটো আলাদা পড়ে ছিল নালার জলে, আলের ধারে বউ,রক্তমাখা দুটো শরীর।
চুপ করে যায় পরাণ চৌধুরী। স্থির চোখে তাকিয়ে থাকে বদনের দিকে। গপগপ করে মুড়ি খেয়েচলেবদন। জলে ভেজা মুড়ি, গরম বেগুনী আর সবুজ কাঁচা লঙ্কা। দেওয়াল থেকে তাকিয়ে থাকেন পুরনো দেবী মূর্তি। খিদে বড় বালাই।
২
তেমন কোনও কাজ নেই এখন বদনের।সারাদিন নিজের ঘরেই থাকে। বর্ষার জঙ্গলে ঢেকে গেছে একফালি উঠোন। আগাছা,ফণী মনসার ঝোঁপ,বুনো কচুর বড় বড় গাছ ঘিরে ধরেছে বাড়িটা। বাঁশের বেড়া ভেঙে গজিয়ে উঠেছে ঘাসের দল। পাশের জলা জমিটা যেন গ্রাস করতে শুরু করেছে এই বাড়িটাকেও। অনেক ছেলেবেলায় বদন দেখেছে ওই জমিতে নঈম চাচার ঘর ছিল। কোথায় যেন চলে যায় চাচা বউ নিয়ে একদিন। ছেলেপিলে কেউ ছিল না। কেনই বা চলে গিয়েছিল, কী হয়েছিল সেসব জানে না বদন। কতই বা বয়েস ছিল তখন তার,বড়জোর সাত কি আট বছর হবে। আবছা এক স্মৃতি। শুধু মনে আছে, মঈন চাচার একটা কালো দুধের গোরু আর বাছুর ছিল, উঠোনে বাঁধা থাকত। গলায় একটা ঘণ্টাও ছিল বোধহয়। সেই কবেকার টুংটাং শব্দটা এখনও মনে আছে। গোরুটা বদনের বাবাকে দিয়ে গিয়েছিল চাচা। মাঠে চরাতে নিয়ে যেত বদন। উঠোনের একপাশে একটা চালার নীচে ঘর করে দিয়েছিল বাবা। রাতে সেখানেই থাকত।মাঝে মাঝেই গলা তুলে ডেকে উঠতো। ভারী মন আনচান করা সে ডাক। হাঁ করে বড় বড় দুটো অপলক চোখ মেলে তাকিয়ে থাকত তার পুরনো ভিটের দিকে। আজকাল বদন যেন ওই ডাকটা শুনতে পায়।
একেকদিন পরাণ চৌধুরীর জমির আলে গিয়ে বসে থাকে। আশপাশের সমস্ত জমি জুড়ে কচি ধানের শিষ বাতাসে মাথা দোলায়, শ্রাবণের মেঘ ভাঙা আকাশের নীচে একটুকরো সবুজ জলের মতো টলটল করে। শুধু চৌধুরীদের জমি বিনা আবাদে পড়ে থাকে। বুনো ঘাস ছেয়ে গেছে তার শরীরে। ঝিরঝির বৃষ্টি নামে। বাতাসের দোলায় এলোমেলো জলকণারা ছুটে বেড়ায় চারধারে। চুপ করে আলের ওপর বসে থাকে বদন। এমন বৃষ্টির দিনে কতবার একহাঁটু জল কাদা মেখে সরু সরু ধানের চারা পুঁতেছে সে।ওই আলের ওপর ছাতা মাথায় দিয়ে বাড়ি থেকে পান্তা ভাত,রসুন পেঁয়াজমাখা আলুসেদ্ধ অয়ালুমিনিয়ামের ডেকচি করে নিয়ে এসেছে বউ। কচি ধানের বীজতলা আর পান্তা ভাতের গন্ধ মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। ভরা শ্রাবণের বাতাস তার সাক্ষী। আলের ওপর বসে একদৃষ্টে চেয়ে থাকে জমিটার দিকে বদন। স্পষ্ট শুনতে পায় কী এক গোঙানির শব্দ। কে যেন ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে আপনমনে কেঁদে চলেছে। কেউ কোথাও নেই, দিকচক্রবাল রেখার ওপর অস্পষ্ট বৃষ্টির পর্দা,মাইলের পর মাইল সবুজ রঙা খেতের ওপর পাক খাচ্ছে ঘোলা অস্থিরমতি মেঘের দল। এলোমেলো বাতাস বইছে পূব দিক থেকে। দূরে পুকুরের জলে ঘাই মেরে আরও গভীরে পালিয়ে যাচ্ছে মাছের দল। চৌধুরীদের জমি পড়ে আছে বন্ধ্যা। ওই জমির হলুদ ধানের ছড়া কত কোজাগরী পূর্ণিমার রাতে নাটমন্দিরের লক্ষ্মীর পট আলো করে রেখেছিল একদিন। সালংকারা দেবী আলের ওপর দিয়ে লাল আলতা মাখা পায়ে হেঁটে গেছেন কতবার। আরও ঘন হয় বৃষ্টি। কাক ভেজা বদনের শরীরের পাশ দিয়ে নিঃশব্দে বুকে হেঁটে আগাছা ভরা জমির দিকে নেমে যায় একটা চন্দ্রবোড়া সাপ। হাহাকারময় বাতাসের গতি তীব্র হয় আরও।
ঘরে চাল থাকলে দুপুরের দিকে একটু ভাত ফুটিয়ে নেয় বদন। উঠোনের বুনো কচু সেদ্ধ আর ভাত। ক’দিন পর চাল শেষ হলে ফুরনের কাজে বেরোয়। কোনও সম্পন্ন গেরস্ত বাড়ির আগাছা পরিস্কার করে দেয়। কারোর নারকোল গাছ কামিয়ে দেয়। গোয়াল ধুয়ে মুছে তকতকে করে দেয়। আবার কোনওদিন ভাগের পুকুরে জাল ফেলে। ক’টা টাকা পায়। চাল কেনে। একশো কি দুশো গ্রাম সর্ষের তেল। এক বাণ্ডিল লাল সুতোর বিড়ি। আবার ক’দিন চলে যায়।কাজের সময় মন পড়ে থাকে ওই মাঠের পানে। হালে বলদ জুতে মইএর ওপর দিয়ে চরকি কাটা। হালের ফলা একহাত ভিতরে ঢুকে বের করে আনে নরম ভুষভুষে মাটি। আহ! কী গন্ধ সেই মাটির। চোখ বন্ধ করলে সেই এখনও পায় সেই মাটির সুবাস। আগে যখন মাঠ থেকে ফিরে পুকুরে গোসল করে আছরের নামাজে বসত, পশ্চিমে অস্ত সূর্যের দিকে মুখ করে কৃপাময় আল্লাহর কথা স্মরণ করতো,তখন ওই নরম মাটির গন্ধ যেন উঠে আসতো চারপাশে। খিদের অন্ন জোগায় সে মানুষের। আল্লাহ-এর কাজ। নরম এক মায়াবী আলোয় ভরে যেত বদন শেখের উঠোন। সে আলো গায়ে মেখে খেলা করে বেড়াতো আটবছরের তমিজ। চাল বসিয়ে আনাজ কুটতো বিবি। নিরাপদ গেরস্থালির ছায়ায় ঢাকা ছিল সে সব দিন। ভোজবাজির মতো কোন এক অদৃশ্য জাদুগরের ইশারার শূন্যে মিলিয়ে গেছে তারা। রেখে গেছে শুধু বদনকে।
আজ ডেকে পাঠিয়েছে ভটচায বাড়ি থেকে। ভটচাযদের ছোট মেয়ের বিয়ে। তিন হপ্তা বাকি আর। শ্রাবণের শেষ তারিখে সন্ধের লগ্নে বিয়ে। বাঁশের ভাড়া বাঁধা শুরু হয়ে গেছে। বাগান,বাড়ি সব পরিস্কার করতে ডাক পড়েছে বদনের। মেজকত্তা হারাণ ভটচায বাড়ির মুখে দাঁড়িয়ে তদারকি করছে কাজকর্মের। বদনকে দেখতে পেয়ে মুখ তুলে ভারী গলায় বলে
–বদনা,ভালো করে পোস্কার কর দিনি। আগাছা সব তুলে ফেল। মেয়ের বিয়ে বলে কতা। কলকাতা থেকে বরযাত্রী আসবে। সব ঝকঝকে করে তোল দিনি!
–হ্যাঁ কত্তা।
–দুফুরে এখানেই খেয়ে লিস তুই,চাট্টি ভাত। সব শ্যাষ করি সেই বিকালে ঘর যাস খন।
–আপুনি যেমন কইবেন কত্তা।
ভালোই ঘাস জমেছে বাগানে। হেঁসো দিয়ে ঘাস নিড়োতে শুরু করে বদন। কাঠপিঁপড়ের বাসা ঘাসের ফাঁকে। ভালোই জ্বলুনি কামড়ে। দাগড়া দাগড়া লালচে দাগ উঠে যায় যেখানে হুল বসায়। মাঝখানে মেজকত্তা এসে ফের বলে
–বদন, নারকোল গাছ ক’খানাও কামিয়ে দিস বাবা।
–জ্বী কত্তা! –ঘাড় নাড়ে বদন।
কাজ করতে করতে দুপুর গড়িয়ে যায়। আজ বৃষ্টি নেই। বেশ ক’দিন পর আকাশ আলো করে আবার রোদ্দুর উঠেছে। বর্ষা শেষের আকাশে কে যেন ঘন নীল রঙ গুলে দিয়েছে। উঁচু উঁচু নারকোল গাছের পাতায় পিছলে যাচ্ছে চকচকে রোদ্দুর। ভটচাযদের পুরনো বাড়ি দরদালান ঝলমল করছে সেই আলোয়। অনেকদিনের ভিটে। বাগানে সুপুরি,জামরুল,বাতাবি লেবুর গাছ। গন্ধরাজ লেবুরফুলে ভরে আছে ছোট ঝাঁকালো গাছটা। স্থলপদ্ম গাছের ডালে বসে আপনমনে ডেকে চলেছে পাখিটা—চোখ গেল! চোখ গেল! কেউ কোথাও নেই। যারা কাজ করছিল,তারাও বোধহয় খেতে গেছে। বদনকেও ডেকে গেছে দুবার। বিড়িটা শেষ করেই যাবে বদন। কী এক নিঝুম দুপুর। গাছ গাছালির ছায়ায় রোদ্দুরের তেজ তেমন বোঝা যাচ্ছে না। মাঝে মাঝে পাতায় পাতায় শরশর করে বয়ে যাচ্ছে বাতাস। অনেক দূরে আকাশের গায়ে কালো ফুটকির মতো ভেসে যাচ্ছে কোনও একাকী চিল। লেবু ফুলের গন্ধে ম ম করছে সারা বাগান। একটা কাঠবেড়ালি দৌড়ে পার হয়ে মিলিয়ে গেল ঘাসের আড়ালে। ঝেঁকে ফল এসেছে জামরুল গাছে। গাছের তলায় পড়ে আছে কত জামরুল। হয়তো এ বাড়ির কেউ খায় না। জোলো সস্তা ফল। তমিজ খেতে খুব ভালবাসতো। জামরুল গাছের কাছে গিয়ে দাঁড়ায় বদন। নীচু হয়ে কুড়িয়ে নেয় দুটো ফল। বাতাসে পাক খেয়ে একটা কচি জামরুল পাতা নেমে আসে বদনের শরীরে।
–জামরুল খাবা ?!—মেয়েলি গলার স্বর শুনে চমকে ওঠে বদন। পিছন ফিরে তাকিয়ে দ্যাখে হারাণ ভটচাযের বড় মেয়ে রাণী দাঁড়িয়ে আছে। বিধবা মেয়ে। বিয়ের পরপরই স্বামী মরেছিল। সেই থেকে বাপের ভিটেয় থাকে। সাদা থান পরনে। একরাশ ঘন কালো চুল। ঢলঢলে শরীর। সোমত্থ বিধবা। পঁচিশ ছাব্বিশ বছর বয়স হবে।
একটু হেসে বদন জিগ্যেস করে—মেলা ফল ইসিছে ইবার। তুমরা খাও না ?
–মরণদশা,জামরুল কেউ খায় নাকি ? জোলো ফল! পাকপাখালি খেয়ে যায়!–কৌতুকের হাসি খেলা করে রাণীর চোখে মুখে। টসটসে দুটো ঠোঁট। দাত দিয়ে নীচের ঠোঁট কামড়ে ধরে ফের জিগ্যেস করে
–তুমি একা একা কী করে বেড়াও মিঞা ?
–আল্লাহর দয়ায় একটা মিনিষ্যির প্যাট চলে যায় মা! চাষবাস তো আর হল না।
–চৌধুরীদের জমি ত্যামনি পড়ে আছে,লয় ?
–হ্যাঁ মা, কেউ লাই,বেবাক ঘাসে লষ্ট হয়ি যাচ্ছি জমিন।
–তুমাকেও তো দেখাশোনার কেউ লাই, অসুখ বিসুখ হলে কী করো তখুন ?
মলিন হাসি চকিতে ফুটে ওঠে বদনের মুখে। নীচু গলায় বলে
–চলি যায় মা! কুনওমতে চলি যায়।
–বিয়া করলি না কেন ফের ?
–বিয়া ? আর দরকার লাই মা বিয়ার। একা মনিষ্যি বেশ আছি। শুধু হারাণ কত্তার জমিনটা চাষ করতি পারলি…
কথা শেষ হয় না বদনের। বড় বড় দুটো চোখে কী এক বিদ্যুত ভাসিয়ে, তরল হিসহিসে গলায় রাণী জিগ্যেস করে
–আর শরীল ?
ভরা দুপুরে মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে থাকে বদন। এলোচুলে হাত খোঁপা বাঁধতে বাঁধতে ফের বলে রাণী
–আমাকে একদিন কামরাঙা খাওয়াবা বদন মিঞা ? মিষ্টি মিষ্টি টক টক…লবণ দিয়া মেখে খাব।
৩
ভটচায বাড়ির ফুরনের কাজের টাকা শেষ হয়ে গেল ক’দিনেই। ঘরে চালও বাড়ন্ত। উপায়ন্তর না দেখে গাছের কামরাঙাগুলো একদিন পেড়ে বস্তা করে পাঠানপুরের বড় বাজারে এসে বসে বদন। ছোটফিঙা থেকে পুকুরের মাছ নিয়ে প্রতিদিন আসে কাশেম মোল্লা । নিজের ম্যাটাডোর করেই আসে। সেই ম্যাটাডোর চেপেই এসেছে বদন। ঘণ্টা খানেকের পথ। যদি বিক্রি করে কটা টাকা পাওয়া যায়। সেদিনও আকাশে মেঘ নেই। কড়া রোদ্দুরে ভেসে যাচ্ছে চারপাশ। বড় রাস্তার ধারেই বাজার। অটো,বাস,হলুদ ট্যাক্সি অবিরল বয়ে যাচ্ছে রাস্তায়। শহরের বাবুরা ব্যাগ হাতে বাজারে আসছে। থলি থেকে উঁকি দিচ্ছে সপ্তাহান্তের বাজার। সবুজ পুঁই লতা, লাল শাকের আঁটি। হলদে সবজে কামরাঙা নিয়ে চট পেতে রাস্তার ধারেই বসে আছে বদন। সাজোয়ান চেহারা। চওড়া কাঁধ। পরনে একটা চেক কাটা ময়লা লুঙ্গি আর স্যান্ডো গেঞ্জি। একমুখ দাড়ি। রুখু একমাথা কোঁকড়া চুল। রোদ্দুরের তেজ থেকে ছায়া দিচ্ছে তাকে একটা মস্ত কদম গাছ। মাঝে মাঝেই কোথা থেকে উড়ে আসা বাতাসে ঝরে পড়ছে কদমফুলের রেণু। বদনের শরীরে লেগে যাচ্ছে সেই কুসুমরেণু। সাতটা কামরাঙা দশ টাকা। অনেকেই কিনছে। শুকনো লঙ্কা ফোড়ন দিয়ে ভাতের পাতে কামরাঙার চাটনি খাবে হয়তো। রাস্তার ওপারে মা সারদা মিষ্টান্ন ভাণ্ডার। কড়াইএ গরম রসগোল্লা চেপেছে। রাস্তা পার করে শ্রাবণের বাতাসে মিশে যাচ্ছে গরম রসগোল্লার গন্ধ। অনেকদিন আগে তমিজ খেতে চেয়েছিল তার বাপ বদনের কাছে।
——০——
ধারাবাহিক উপন্যাস
লোহার
মণিশঙ্কর
৫
অনুকথা
(ছয়)
ব্যস, ওই রাত্রিটুকু। পরের দিন থেকে আবার ঝরঝরে আকাশে সূর্যের সহাস্য দাপট। যদিও ওই বৃষ্টিতে দিন দুয়েক জুড়িয়েছিল ডাং-ডহরের বুক কিন্তু তারপর তো পেরিয়ে গেছে আরো সাতটাদিন। মাটি তাপ জড়ো করতে করতে আবার আগের অবস্থায়। সেই ঝলসানো রোদ। সেই ডাঙার বুক থেকে লকলকিয়ে উঠে যাচ্ছে চেরা জিভ। হাঁসফাস করছে প্রতিটি জীবের প্রাণ। পুকুর-ডোবাগুলোর মধ্যে যেটাতে সামান্য জল টিকে আছে তাতে গতর ডুবিয়ে রেখেছে ঘেয়ো কুকুরের দল। মহুয়া কিংবা বাবলাগাছের পাতলা ছায়ায় গা এলিয়ে জাবর কাটতে দেখা যাচ্ছে দু’একটা গোবাদি পশুকে।
উপায় নেই শুধু জনকের মতো এই বাংলার হাজার হাজার মানুষের। ভোটের আর মাত্র সাতদিন বাকি। এখন বাঁউড়ি-মকরেও এত চাঁয়ড় দেখা যায় না গ্রাম-বাংলার কুলিতে। যেন কোনও শোক নেই, তাপ নেই; পরবপাল-হাসি-কান্না নেই, পেটের দায় নেই, এমনকি প্রম-ভালোবাসারাও থমকে গেছে ওই একটিমাত্র হুল্লোড়ের হুযুগে। গ্রামের আকাশ-বাতাস মুখরিত করে সব সময় ধ্বনিত হচ্ছে, “ভোট ভোট ভোট দিন– ভোট দেবেন কোনখানে–”
অবশ্য সব সময় যে মিটিংমিছিল হচ্ছে তা নয়। তার বাইরেও থাকে বেশ কিছু কাজ। সব দলের কাছেই তার গুরুত্ব অনেক বেশি। তার জন্য গড়া হয় স্কোয়ার্ড। তবে এবারের পঞ্চায়েত নির্বাচনের মতো এমন দর্পের হুংকার কোনোবার শোনা যায়নি। না বিরোধী পক্ষের আর না সরকার পক্ষের।
আগামীকাল বাঁকুড়া জেলায় এই নির্বাচনের মতো রাজ্যস্তরের শেষ জমায়েত আছে জেলা সদরে। তার জন্য লোকভর্তি করার তাগিদ সব নেতাদের ঘাড়ে। এ তো শুধু জমায়েত নয়। বহর দেখিয়ে বিরোধীদের একটা বার্তা দেওয়াও বটে। শালগড়া গ্রাম পঞ্চায়েতও এ বিষয়ে পিছিয়ে নেই। প্রতিটি গ্রামের প্রতিটি পাড়া থেকে ডাকা হয়েছে এক-একজন করে প্রতিনিধি। পঞ্চায়েত অফিসের গা লাগোয়া পার্টি অফিসে জমায়েত হয়েছে সব। মধুপুর গ্রামের লোহার পাড়ার প্রতিনিধি স্বরূপ এসেছে জনক। সঙ্গে তার ছায়াসঙ্গী সাগরাও। সেরাতে ঝগড়ার পর কেলিয়ার সঙ্গে মুখোমুখি আর কোনো সংঘাত ঘটেনি। যদিও জনকের মানসিক উদ্যোগে এখন অনেকটাই ভাটা পড়েছে। তবু পার্টির কাজে গর্ববোধ করার এতদিনের অভ্যাসকে সে একেবারে ঝেড়ে ফেলতে পারেনি। তাই অন্যান্য দিনের মতো আজকের মিটিং-এ তার উপস্থিতি।
বিকেল চারটে দেওয়া ছিল মিটিং-এর সময়। সেইমতো জমা হয়েছে ভিড়। কিন্তু ব্লকসভাপতি হরিসাধন দুবে এখনও এসে পৌঁছাননি। তাই মিটিং শুরু হতে পারেনি। জনকের পাশে বসে সাগরা অনেক্ষণ থেকেই উসখুস করছিল। কিন্তু জনক তাতে কোনো সাড়া দেয়নি। তাই সাগরা বলেই ফেলল, “অ্যা সাঙ্গাৎ, মিটিন কখন হবেক্ হ্যা? ই য্যা শালা বসে বসে পঁদে শিকড় গজাঁই গেলেক্!”
তবু জনক সাড়া দিল না। সাগরা তার দিকে হামদো মুখে কিছুক্ষণ চেয়ে রইল। শেষমেশ তাকে একটা ঠেলা মারল। বলল, “অ্যা সাঙ্গাৎ, ঘুমাঁই গেলে নাকি হ্যা?”
“ক্যানে, কী হলেক্ কী? থির হঁইয়ে চুপ দিঁইয়ে বোস দেখি!”
“নাঃ, শুদুমুদু আর বইসে থাইকতে লাচ্চি। দাও দেখি, একটা বিড়ি দাও। দু’টা টান মাইরে লিই ততক্ষণকে।”
“অখন আর তুখে বিড়ি ফুকতে হবেক্ নাই। অখনি মিটিন আরম্ব হঁইয়ে যাবেক্।”
“ফুকব নাই বইলচ? থাইলে থাক। ফুকব নাই।”
আবার চুপ করে গেল সাগরা। মুখখানা ফুলিয়ে বসে থাকল কিছুক্ষণ। তারপরই আবার থলথলে শরীরটাকে এদিক ওদিক হেলদোল করল। জনক পাশে বসে সাগরার প্রতিটি নড়চড়া বুঝল কিন্তু মুখে কিছুই বলল না। সাগরাও আর থাকতে পারল না। আলতো করে ডাকল, “সাঙ্গাৎ! অ্যা সাঙ্গাৎ!”
“বল ক্যানে!”
“বলচি একটা কুথা বইলব তুমাকে?” এতক্ষণ যে কথাটা সাগরার পেটে ঘুলিয়ে বেড়াচ্ছিল সেটা বলার জন্য উন্মুখ হয়ে তাকাল জনকের দিকে। জনকও অস্ফুটে উচ্চারণ করল, “হুঁ।”
“বলচি, আজকে ত দুবেবাবুঅ আইসচে। ত সেই কুথাটা একবার পাইড়ে দেখবে নাকি উয়ার কাছে?”
“কন কুথাটা?”
“উঃ সাঙ্গাৎ, তুমি গাইদে ভুলকা বট। অই য্যা হ্যা, কেলিয়া শালার কুথাটা!”
“কেলিয়ার কন্ কুথাটা পাইড়ব?”
“অই য্যা হ্যা, রেতের বেলায়– গোণ্ডুগুল– সেই য হ্যা–” ফিসফিস করল সাগরা। জনকও একইভাবে ফিসফিসাল, “বের্যা শালা! উ কুথাটা আবার ইখ্যানে কী বইলব! আমি কি উ শালাকে ডরাই নাকি?”
“হঁ, তাও বটে। তবে–” আরও কিছু যোগ করতে যাচ্ছিল সাগরা কিন্তু তার আগেই জমা ভিড়টা চঞ্চল হয়ে উঠল। জনক দেখল সুভাষ মান হরিসাধন দুবেকে সঙ্গে নিয়ে সেখানে ঢুকছে। হরিসাধন দুবে হাত নেড়ে ভিড়টাকে বসতে বললেন। তারপর এসে বসলেন লালটুকটুকে চেয়ারে। সুভাষ মান তার পাশের চেয়ারটি দখল করে হরিসাধনের কানে কানে কিছু ফিসফিস করল। তারপর চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। সকলের উদ্দেশ্যেই বলল, “আজকে তুদেরকে যার লাইগে ডাকা সেই কুথাতেই সুজাসুজি চলে আসচি। আজ আমাদের মাঝে উপস্থিত আছেন আমাদের বলক সভাপতি কমরেড হরিসাধন দুবে মহাশয়।”
কথা থামিয়ে হরিসাধনের দিকে তাকাল সুভাষ মান। মথা ঝুঁকিয়ে তাকে সম্ভাষণ জানাল। আবার বলতে শুরু করল, “তিনি তো বলবেনেই। তবে তার আগে আমি কতকগুলান কুথা তুদের সবাইকে বলে দিই। দ্যাখ, আগেও বলিচি। আবার বলচি, ভোটের আর মাত্তর সাতটা দিন বাকি। ইয়ার মধ্যেই আমাদেরকে যা করার কইত্তে হবেক্। মনে থাকে যেমন, একটা ভোটও আমাদের ছাপ ছাড়া আর কোনু দিগে যেমন না যায়। তার লাইগে যা করার তা তুদেরকে নিশ্চয় আর আলাদা কইরে শিখাঁই দিতে হবেক্ নাই! য্যা যাই বলুক্ ক্যানে, তুদের কোনু ভাবনা নাই। আমরা তুদের পাশে সোব সোময়েই ছিলম, আছিঅ।”
সুভাষ মান আবার কথা থামিয়ে ঘাড় ঘুরাল। তাতে ঘাড় হেলিয়ে সম্মতি জানালেন হরিসাধন দুবে। সুভাষ মানও তার কথাতে ফিরে বলল, “তবে তার আগে কালকে বাঁকুড়ায় য্যা সভা আছে সেইটাকে সাকশ্যাস কইত্তেই হবেক্। সুবাই নিজের নিজের গাঁয়ের নিজের নিজের পাড়ার দায়িত্ব ল্যা। ঘরে যেমন একটা লোকও না থাকে। ছেল্যা-বুড়্যা– মেইয়্যা-মরদ আদি কইরে সুবায়েরেই কালকে যাওয়া চাই।”
“ই বাবা! ই কী কুথা বলচেন গ বাবু! সুবাই গেলে ঘরটাকে ক্যা দেখবেক্?” সুভাষ মানের কথা শেষ হওয়ার আগেই শালতোড়া গ্রামের ডোমপাড়ার দায়িত্বে থাকা মদনা ডোম সংশয় প্রকাশ করল। সঙ্গে সঙ্গে তাকে খেঁকিয়ে উঠল রবি বাগদী। বলল, “উঁ– তুর ঘরে কী অমন রাজরাজড়ার ধনটা রইচে রে ব, আঁ?”
“ধন না থাক, তবু ত উটা ঘর বটে নাকি! তুঁই আর কী জানবি! অখন শালা গায়ে লতুন রঙ লাগাঁইচিস্। উ দিগে আমাদের গাঁয়ে বলে হরদম বাবুদের মিটিন চলচে।”
“হাঁ ভাল্ মদনা, মু সামলাঁই কুথা বলবি বইলে দিলম!”
“নাইলে কী কইরবি রে শালা? আমিঅ–”
“এই তুরা কী শুরু কল্লি কী?” মদনার হুংকার ভাষা পাওয়ার আগেই ধমকে উঠল সুভাষ মান। বলল, “এই রবিয়্যা, তুঁই চুপ দিঁইয়ে বোস দেখি। আমি যখন কুথা বলচি তখন তুর অত ফপরদালালি ক্যানে? বোস্ বলচি!”
“যা বাবা! আমি ত ভালর লাগেই–”
“স্যা আমিও জানি। তুঁই বোস্ দেখি আগে। হঁ, য্যা কুথা বলছিলম–” রবি বাগদী বেজার মুখে বসে পড়লে সুভাষ মান ফিরে এল তার আগের কথায়। বলল, “শুন্, নিজেদের মধ্যে যদি তুরা ইরকম একটুকুতেই গোন্ডুগুল লাইগে যাস্ থাইলে কী কইরে কী হবেক্ বল দেখি! সামনে আমাদের বিরাট লড়াই, ই কুথা ভুলে যাস্ নাই। অতদিন ধইরে য্যা লড়াই কইরে নিজেদের অধিকার তুরা আজ অর্জন করিচিস্ অখন অত সহজেই তাকে ভাঙে দিলে চলবেক্! বরং অখন আরও বেশি কইরে আমাদেরকে একত্রিত হতে হবেক্। ই হলেক্ যাঁইয়ে শমিক-কিষকের মিলিত ক্ষমতা। শোষিত মানুষের শোষনমুক্তির লড়াই। তবে হঁ, মদনা কিছু মন্দ বলে নাই। ঘরটাকে একদম ফাঁকা রাইখে যাওয়া ঠিক হবেক্ নাই। থাইলে এক কাজ কর, এক একটা ঘর থাকে অন্তত দু’জনা কইরে লোক যাতেই হবেক্। কী রে ব, ইবারে ঠিক আছে ত?”
এর উত্তরে কেউ কিছু বলল না। তাকেই সম্মতি ধরে নিল সুভাষ মান। বলল, “ব্যাশ, থাইলে তাই হোক। ইবারে আমাদের বলক সভাপতি কমরেড হরিসাধন দুবে মহাশয় তুদেরকে ক’টা কুথা বলবেন। আসুন দুবেবাবু।”
সুভাষ মান নিজের চেয়ারে বসে পড়লে হরিসাধন দুবে উঠে দাঁড়ালেন। গলাটা একটু পরিষ্কার করে জলদগম্ভীর গলায় বললেন, “কমরেড!”
সম্বোধনটা শুনেই জনকের সারা শরীরে কাঁটা দিয়ে এল। সাগরাও নড়েচড়ে বসল। হরিসাধন দুবে সকলের মুখের দিকে চোখ বুলালেন। তারপর বললেন, “আমাদের এই জনসভাতে উপস্থিত থাকবেন মুখ্যমন্ত্রী স্বয়ং। তাছাড়া রাজ্যস্তরের অন্যান্য নেতারা তো থাকবেনই। তোমরা সকলেই জানো, আমাদের মুখ্যমন্ত্রী সারা রাজ্যে কাজের জোয়ার আনার যে পরিকল্পনা নিয়েছেন তাতে বাধা সৃষ্টি করে রাজ্যটাকে পিছিয়ে দিতে চাইছে বিরোধীরা। আমি বেশি কথা বলবো না। আজ আমাকে আরও তিন জায়গায় মিটিং করতে হবে। তবু বলি, বিরোধীদের এর যোগ্য জবাব আমাদের দিতেই হবে। আর সেই জন্য কালকের জনসভাকে যেকোনও মূল্যে সফল করে তুলতেই হবে।”
দুবেবাবু তার ডানহাতের মুঠো উপরের দিকে তুললেন। তাতে কাজও হল। পিঠ বাঁকিয়ে বসে থাকা লোকগুলোর মেরুদণ্ড টানটান হয়ে এল। দুবেবাবু একটু থামলেন। সাদা পাঞ্জাবির পকেট থেকে নিখুঁত পাটকরা সাদা রুমাল বের করলেন। সেটাকে নিজের কপালে বুলিয়ে আবার শুরু করলেন, “কমরেড! তবে একটা কথা, কালকের জনসভা হবে একটি ঐতিহাসিকসভা। সে জন্য আমরা যারা গান-বাজনা করতে পারি তারা তাদের সব বাদ্যযন্ত্র– ঢোল-ধামসা-মাদল, যার যা আছে তাই নিয়ে যাবো কালকের সভায়। যারা দলের সঙ্গে পুরোন দিন থেকেই আছো তারা জানো, আগে কীভাবে দলের সভা মুখরিত হয়ে উঠত শ্রমীক-কৃষকের শোষণমুক্তির গানে। কালকের দিনটা অন্তত আমাদের সেই আগের দিনগুলোকে স্মরণ করাতে হবে।”
দুবেবাবু আবার থামলেন। রুমালটা আলতো করে নিজের কপালের উপর দিয়ে চালিয়ে নিলেন। বললেন, “কমরেড! আমি দেখতে পাচ্ছি, সে সব দিন দেখেছে এমন মানুষ আমাদের মধ্যে আজ উপস্থিত রয়েছে।”
কথা থামিয়ে সরাসরি দৃষ্টি ফেললেন জনকের উপর। অমনি জনকের মেরুদণ্ড বরাবর একটা শিরশিরে অনুভূতি বয়ে গেল। দুবেবাবু একটু মিষ্টি হেসে বললেন, “যদিও তোমরা অনেকেই সেসব দিনের সাক্ষি। তবু যার বাঁধানো গান তখন প্রতিটি শ্রমজীবী মানুষের রক্তে মুক্তির বান ছুটিয়ে দিত, রাতের ঘুম ছুটিয়ে দিয়েছিল শোষক শ্রেণির, তার ছেলে আজ আমাদের মধ্যে উপস্থিত। হ্যাঁ কমরেড! আমি জনক লোহারের কথাই বলছি। সেই মহান শহীদ কালিন্দী লোহারের সুযোগ্য ছেলে জনক লোহার। আসুন, আমরা সকলে তার জন্য একবার হাততালি দিই।”
অমনি চড়বড় শব্দে ভরে গেল ঘরটা। সুভাষ মানও চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। যোগদিল সকলের সঙ্গে। তার মধ্যে একজন উঠে দাঁড়িয়ে শ্লোগান দিল, “কমরেট জনক নুয়ার জিন্দাবাদ।”
“জিন্দাবাদ জিন্দাবাদ।” সকলের মিলিত কণ্ঠে গমগম করে উঠল ঘরটা। লোকটি আবার বলল, “শহীদ কালিন্দী নুয়ার তোমাকে আমরা ভুলি নাই ভুলব নাই।”
“ভুলি নাই ভুলব নাই।”
“ইন-ক্যা-লা-প–”
“জি-ন্দা-বা-দ।”
মুহুর্মুহু শ্লোগানে কেঁপে উঠল বদ্ধ ঘরের বাতাস। সাগরার থলথলে মাংসে অযথাই হিল্লোল উঠল। আমড়া আঁটির মতো চোখগুলো ঠিকরে বেরিয়ে আসতে চাইল বাইরে। ভ্যাবাচ্যাকা খাওয়া মুখে এদিক ওদিক তাকাতে লাগল। হঠাৎ ছেলেমানুষের মতো হুঁকহুঁক করে কেঁদেও উঠল। কিন্তু তার এ কান্নাকে কেউই আমল দিল না। সবার দৃষ্টি এখন জনকের দিকে। জনকের মনেও যে শিহরণ না জাগল তা নয়। তবে তার শরীরী ভাষায় তা প্রকাশ পেতে দিল না। শুধু চোখ দু’টো জ্বালা করে এল তার। কিছুতেই বুঝতে পারল না, এতদিন পর হঠাৎ দুবেবাবু তার বাপের কথা তুললেন কেন! কেনই বা আজকের মিটিং-এর মূল আকর্ষণ করে তুললেন তাকে!
কিন্তু তার মনের খবর হরিসাধন কিছুই টের পেলেন না। তৃপ্তমুখে হাসলেন একচিলতে। তারপর দু’হাত তুলে সকলকে থামার ইঙ্গিত দিলেন। হাসিটুকু ধরে রেখে বললেন, “সুতরাং আমরা নিশ্চয় আশা করবো কমরেড জনক লোহার তার বাবার মতোই কালকের সভামঞ্চে কিছু না কিছু করবে। তা শুনে বিরোধীদের রাতের ঘুম উড়ে যাবে। যাইহোক, আমি আমার বক্তব্য আর বাড়াচ্ছি না। আমাকে এক্ষুণি চলে যেতে হবে। ইনক্লাব জিন্দাবাদ, শ্রমিক-কৃষকের মিলিত শক্তি জিন্দাবাদ।”
আর কাউকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে এগিয়ে গেলেন দরজার দিকে। সকলেই উঠে দাঁড়াল। পিছু নিল তার। সুভাষ মান জনককে চোখের ইঙ্গিতে বসতে বলল। তারপর হরিসাধনকে নিয়ে বেরিয়ে গেল বাইরে। গাড়িতে বসতে বসতে হরিসাধন সুভাষ মানের দিকে তাকালেন। বললেন, “দেখুন আশাকরি আজকের ডোজটা কাজে লাগবে। তা সে গেল কোথায়?”
“উয়াকে ভিতরে বসতে বলে আলম। আমিও একটুকুন কথা বলে লিই।”
“ঠিক আছে। তাহলে তাই করুন। আর দেখুন কাল যত বেশি সংখ্যক লোক নিয়ে যাওয়া যায়। সকলকে বলে দিন ভিইকেল সকাল ন’টা-দশটা নাগাদ চলে আসবে।”
“ঠিক আছে।” সুভাষ মান ঘাড় হেলিয়ে সম্মতি জানাল। সঙ্গে সঙ্গে জয়ধ্বনি উঠল হরিসাধন দুবের নামে। দুবেবাবু হাত নাড়তে নাড়তে এগিয়ে গেলেন। সুভাষ মান সকলের উদ্দেশ্যে বলল, “সুবাই শুনলি ত? সকাল ন’টার মধ্যেই গাড়ি লাইগে যাবেক্ ইখ্যানে। তার আগেই সোব নিজের নিজের গাঁ থাইকে মিছিল কইরে চলে আসবি। আর বাদ্যি-বাজনা যা–”
“কী যে বলেন বাবু! অখন আর বাদ্যি-বাজনা কুথাতে পাবেন?” হাসিমুখেই বলল একজন। সুভাষ মান তার কথাকে ততটা পাত্তা দিল না। একজন সাঁওতালকে বলল, “কী রে তুদের নাচের টীম রেডি আছে ত? নাকি তুরাও উ পাট চুকাঁই দিঁইচিস্?”
“না-না বাবু! আমাদের সোব রেডি।”
“ঠিক আছে। থাইলে কালকে সুবাই চলে আসবি। আমি আবার জনকার সঙে একটুকুন কুথা বলে দেখি যদি উ কিছু কইত্তে পারে!”
সুভাষ মান আর দাঁড়াল না। এগিয়ে গেল পার্টি অফিসের দরজার দিকে। রবি বাগদীও তার সঙ্গ নিল। অমনি তাকে খেঁকিয়ে উঠল সুভাষ মান, “তুঁই আবার কুথাকে যাচ্চিস্?”
“না– মানেকুথা–
“যা, অখন ঘরকে যা। কাল ঠিক সোময়ে চলে আসবি।”
রবি আর এগোবার সাহস পেল না। পা বাড়াল রাস্তার দিকে। সুভাষ মান স্বগতোক্তি করল, “সোব শালা একবার লায় পালে হয়। শুদুই কি আর লোকে বলে, বাঁদর আর ছুটুলোক লায় পালে মাথাতেই হাগতে খুঁজে! কী রে জনকা, অখনও তুঁই ভুঁয়েই বসে আছিস! আয় আয়, ই চিয়ারটাতে বোস। দিঁইয়ে শুনলি ত দুবেবাবু কী বলে গেলন?”
নিজে একটা চেয়ারে বসে পড়ল সুভাষ মান। পকেট থেকে সিগারেট বের করে একটা গুঁজে নিল ঠোঁটে। লাইটার জ্বালিয়ে তার মুখে আগুন দিল। জনক মেঝে ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। কিন্তু চেয়ারে বসল না। আজকের অতিখাতির তার ঠিক হজম হচ্ছে না। যদিও এতক্ষণ সাগরা তার পাশে গলগল করে যাচ্ছিল। সাঙ্গাতের এত বড়ো সম্মানে তার গায়ে ফুর্তি ধরছে না। কিন্তু জনক তারও কোনো জবাব দেয়নি। এখন আবার সুভাষ মানের খাতির দেখে তার বুকে জ্বালা ভাবটা ফিরে এল। মুখ বাঁকিয়ে বলে ফেলল, “আমি আর পাটির ক্যা বটি বাবু! অখন ত আর লোকের অভাব নাই!”
“অ, থাইলে আমার পারা কুথাগুলা তুর কানকেও গেছে?” একগাল ধোঁয়া ছেড়ে বলল সুভাষ মান। আর অবাক হল জনক। সুভাষ মানের ইঙ্গিতটা কোন্ দিকে যাচ্ছে সেটা ধরতে পারল না। জিজ্ঞাসু মুখে তাকাল তার দিকে। সুভাষ মান একটু মিচকি হাসল। বলল, “তুঁই কী ভাইবেছিলি, আমি কিছুই বুঝতে লাচ্চি? এই ক’দিনে তুর মতিগতির কোনু খবর আমরা পাই নাই? শুন্ জনকা, অতদিন ধরে পাটি কচ্চিস্ আর ইটুকু বুঝলি নাই, ই সোব শালা রটাচ্চে উ গয়লারা? শালারা য্যা অখন দিদিকে লিঁইয়ে গাদে লাচন-কুঁদন লাগাঁইচে রে ব। স্যা খবর কি রাখিস্?”
তবু জনক কিছু বলল না। একইভাবে দাঁড়িয়ে থাকল চুপচাপ। সুভাষ মান সিগারেটে আরেকটা টান দিল। ভনিতা ছেড়ে সরাসরি বলল, “শুন্ থাইলে তুখে খুলেই বলি। পুঞ্চায়েতের কাজটা তুরেই হবেক্। তবে অখনঅ ভ্যাকেন্সি আসে নাই। বুঝলি নাই? আলে আমি নিজে তুখে জানাব। খবর য্যা একটা রটিচে স্যাটা আমিও শুনিচি। তবে তুঁই য্যা স্যাটাতে বিশ্বাস করে আমাদেরকেই ভুল বুজবি সেইটা ভাবি নাই। বুঝলি কিছু?”
এবার জনকের মুখের রেখারা কিছুটা নরম হয়ে এল। গলার রুক্ষতা মুছে বলল, “বাবু, আমি পেথমে বিশ্বেস করি নাই। তাবাদে যখন সুবাই বলতে লাগালেক্, তখন–”
“সুবাই যখন বলতে লাগালেক্ তখন তুঁই আমাকে একবার সোজাসুজি শিধালি নাই ক্যানে?”
“আজ্ঞ্যা স্যা দিনকে ত– তাবাদে আমি ভাইবেছিলম–”
“কী ভাইবেছিলি? আমি তুর প্যাটে লাত মাচ্চি? অরে, আমি কি আর না জানি, তুঁই পাটির লাইগে কী করিস্ না করিস্! যাকগুয়া, যা হঁইচে হঁইচে। উসোব আর মনে রাখিস্ নাই। তবে একটা ব্যাপার লিঁইয়ে আমার খুবেই ভাবনা হচ্ছে বুঝলি?”
সুভাষ মান তীক্ষ্ণ চোখে তাকাল জনকের চোখের দিকে। সহানুভূতি প্রকাশ করে বলল, “স্যা দিনকে বল্লি নাই, তুঁই মুখুজ্যাদের গতান্যা মুনিসে জবাবা দিঁইয়ে দিঁইচিস্, সেই কুথাটাই বলচি। অখন সমবছরটা তুরা খাবিটা কী?”
“হঁ, সেই লাগেই ত রেতে ঘুম হচ্চে নাই বাবু।”
“শুন্, তুদের পাড়ার কেলিয়া পুঞ্চায়েতে একটা অভিযোগ করিচে তুর নামে। আমি বলি কী, তুঁই বরং নিমাই মড়লের আইদরি চাষটাই কর।”
“হঁ, মড়লের সঙে স্যা রকমেই কুথা হঁইচে আমার। তবে–”
“কী? কেলিয়া? ধুর, উ শালা কী কইরবেক্ রে! দাঁড়া একবার ভোটটা পেরাঁই যাতে দ্যা, তাবাদে শালাকে দেখচি। তুঁই কোনু ভাবনা করিস্ নাই ত। আমরা ত তুর সঙেই রইচি। কী বুঝলি?”
“ঠিক আছে বাবু! আপনি যখন বইলচেন, তখন তাই করি।”
“হঁ, তাই কর। আর কালকে দ্যাখ্ যদি তুর বাপের গায়েন সভামঞ্চে গাইতে পারিস্ ত।”
“আচ্ছা বাবু।” ঘাড় হেলাল জনক। সুভাষ মান সিগারেটে শেষ টান দিয়ে বাকিটুকু ছুঁড়ে ফেলল জানালা দিয়ে। তারপর লম্বা করে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বলল, “ব্যাশ, থাইলে আজকে আয়। কালকে সকাল সকাল চলে আসবি। আর শুন্, তুদের গাঁয়ের শান্তি মুখুজ্জ্যাও ত গাদে বাড়াবাড়ি লাগাঁইচে রে। শালাকে এতবার উদম ক্যালানি খাওয়া করালম তাও ধ্যাজ নাই রে ব! এক কাজ কর দেখি, আজ রেতের বেলায় একটা সাদা থান উয়ার দুয়ারে ফেলে দিঁইয়ে আয়। তাও যদি না শুদরায় থাইলে– বুঝলি নাই– মানেকুথা–”
কথা শেষ না করে চোখ নাচাল সুভাষ মান। কিছু একটা ইঙ্গিত করল। জনক ঘাড় হেলিয়ে পা বাড়াল বাইরের দিকে। বলল, “আচ্ছা বাবু! আয় সাগরা।”
কিন্তু সাগরার ঘোর তখনও কাটেনি। হাঁ করে তাকিয়ে থাকল সুভাষ মানের দিকে। সুভাষ মানের ভ্রূ কুঁচকে এল। জানতে চায়ল, “কী রে, কিছু বলবি নাকি?”
“আঁ! কই না ত!”
হঠাৎ যেন সাগরা আকাশ থেকে পড়ল। হামদো মুখের হাঁ-টা চট করে বন্ধ করল। তাকাল দরজার দিকে। দেখল, জনক প্রায় বাইরে বেরিয়েই পড়েছে। অমনি বলল, “দাঁড়াও হ্যা সাঙ্গাৎ! আমিঅ যেছি।”
লদপদে শরীরটাকে নিয়ে দৌড়ে গেল দরজার দিকে। অমনি কোথা থেকে এক ঝলক ঠাণ্ডা হাওয়া ঢুকল জানালা দিয়ে। লাগল সুভাষ মানের মুখে। আরামের আবেশে তার চোখজোড়া বন্ধ হয়ে এল। আর জনকের মনে ভেসে উঠল তার বাপ্ কালিন্দী লোহারের লৌহমুখ।
অনুকথা
(সাত)
কুল্লাডির পুকুরটাতে জল প্রায় নেই বললেই চলে। পাঁক উঁকি দিচ্ছে জায়গায় জায়গায়। তাতেই গা ডুবিয়ে পড়ে রয়েছে একটা কুকুর। জিভ বের করে হাঁপাচ্ছে আর জুলজুলে চোখে তাকিয়ে আছে পাড়ের দিকে। সেখানেই একটা অর্জুনগাছের গোড়ায় চুপচাপ বসে আছে জনক। চুপচাপ ঠিক নয়। ভাবছে। ভাবছে লোহারদের কথা। তার বাপ কালিন্দীর কথা। তার মা ভাবির কথা। কিন্তু কী! তা কিছুতেই মাথায় খেলছে না। শুধু মুখগুলো একের পর এক জলছবির মতো ঘেটে যাচ্ছে চোখের সামনে। সেই ঘেটে যাওয়া আবছায়া নিয়েই তাকাল সামনের দিকে। ভাবনার স্রোতে টান পড়ল এখানেই। ধৈর্যে ধরল ফাটল। বিড়বিড় করল, “শালা, আসার কনু নামগন্ধ নাই যে রে ব! মল্লেক্ নাকি!”
উঠে দাঁড়াল জনক। হাত দিয়ে রোদ আড় করে তাকাল শালগড়া থেকে বেরিয়ে আসা পথটার দিকে। এই জৈষ্ঠ্য শেষেও আগুনশিখা লকলক করছে চেরা জিভের মতো। কোনোদিকে বিন্দুমাত্র সবুজের ছোঁয়া নেই। কিছুটা দূরে গয়লাদের শ্মশান। তার নীরবতা জমাট করে রেখেছে যে ঝোপঝাড়েরা তারাও নিথর। খাঁ-খাঁ করছে উঁচুনিচু জমিজিরেতের শুকন বুক। খাঁ-খাঁ করছে জনকের বুকের ভিতরটাও। ফাটল দেখা দিতে চাইছে তার জেদে। বদলে কান্নার দলাটা গুমরে উঠছে ভিতরে। কিন্তু সে কাঁদবে না। কিছুতেই না। আবার জেদটা ঘন হয় এল জনকের মাথায়। গলা দিয়ে আর্তনাদের মতো বেরিয়ে এল, “শালার জাতের ভসেরভূত খেদে ছাড়ব আজকে। তাবাদে যা হয় হবেক্! কালিন্দ্যা নুয়ারের বীচ বটি আমি। অত সহজে হার মানব নাই। ইয়ার শ্যাষ দেখে তবে দম লুব। উঃ, অত করেও শালাদের কারুর মন পালম নাই রে ব!”
কিন্তু পুকুর পাড়ের কোনো দিক থেকেই তার আর্তনাদের কোনও জবাব এল না। কে দেবে জবাব! তার এই অবস্থায় কার কী এসে যায়! পঞ্চায়েতের ভোট শেষ। বেশিরভাগই আছে বামেদের দখলে। চারিদিকের এত যে চেঁচামেচি, মহানগরের পথে পথে নাগরিক সমাজের মিছিল-মিটিং, টিভি পর্দায় গলা ফাটাচ্ছে নেতা-বুদ্ধিজীবীরা। কিন্তু কই, তার ফল কী হয়েছে! ভোটে তার প্রভাব কোথায়! যদিও বিরোধীরা বারবার অভিযোগ তুলছে বুথ দখলের– নির্বাচনী সন্ত্রাসের। কিন্তু তাতেই বা কী! ভোটের ফলাফল ‘আমাদের’ অহংকারের পালে লাগিয়েছে হাওয়া। তার প্রকাশ ঘটছে ছোটোবড়ো নেতাদের শরীরী ভাষায়। শুধু জঙ্গলমহলে একটা বড়োরকমের ধাক্কা খেয়েছে বামেরা। কিন্তু তাতেই বা কী! গ্রীষ্মশেষের এই উত্তাপের মতো তপ্ত হয়ে রয়েছে বাম-ডান সবারই মন।
উত্তাপে দগ্ধ হচ্ছে জনকের মনও। যদিও সে অতশত বোঝে না। তাদের সমাজের বাকিদের মতোই ভাতকাপড়ের জীবন-যাপন তার। তাতেই আবদ্ধ চাওয়া-পাওয়ার হিসেব। সেই হিসেব মেটাতেই এই ভরদুপুরে অপেক্ষা করছে জনমানবহীন এ তপ্ত প্রান্তরে। কিন্তু কই! যার জন্য অপেক্ষা তার টিকিটির তো দেখা নেই!
জনক আবার বসতে গেল পাছা পেতে। ঠিক এই সময় কানে বাজল ভুটভুট শব্দ। অমনি তার শিরদাঁড়া বেয়ে বয়ে গেল ঠাণ্ডা শিহরণ। টান ধরল শরীরের চামড়ায়। ওই টান নিয়েই সোজা হল সে। দেখল, একটা মোটরবাইক মেটে পথটা বেয়ে এগিয়ে আসছে। মাথায় পাগবাঁধা গামছাটা খুলল জনক। বাঁধল কোমরে। নেমে এল পুকুর পাড় থেকে। কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়াল পথটার মাঝ বরাবর। আবার তাকাল মোটরবাইকটার দিকে। দু’জন মানুষ বসে আছে। সুভাষ মান চালাচ্ছে। কিন্তু পিছনের জন কে! চোখকুঁচকে চেনার চেষ্টা করল জনক। ততক্ষণে বাইকটা অনেকখানি এগিয়ে এসেছে। এবার জনক চিনতে পারল। পাশের গাঁয়ের আশুতোষ সিংহ। রাজপুত রক্তের তেজ দেখায় যাকেতাকে। কখনও কখনও সুভাষ মানের দেহরক্ষীর কাজে লাগে। জনকের কষের একদিক বেঁকে এল। বিড়বিড় করল আপন মনে, “অ, আজকাল থাইলে আর ইকা কুথাও বেরাতে লাইচ্চে! ডর! ত, অতই যদি ডর, থাইলে লোকের পঁদে লাগতে যাওয়ার–”
কিন্তু বিড়বিড়ানিটা শেষ হওয়ার সুযোগ পেল না। তার আগে বাইকটা এসে দাঁড়াল ঠিক তার সামনেটিতে। যেন ভূত দেখেছে এমন ভাবেই চমকে উঠল সুভাষ মান। মেজাজ হারিয়ে ফেলল সঙ্গে সঙ্গে। হাঁক পাড়ল, “কী রে ব, পথটার মাঝখ্যানটাতে দাঁড়াঁইচিস্ কী লাইচতে?”
“আপনার সঙে ক’টা কুথা রইচে আজ্ঞ্যা।”
“তার লাইগে ই চাঁদিফাটা রোদে পথ আঁটকাঁইয়ে দাঁড়াবি! ক্যানে পাটি অপিসকে যাইতে লারিচিস্?”
“পাটি অপিসে যাঁইয়ে ইসোব কুথা বইল্লে কি আপনার মান থাইকথক্ বাবু?” জনকের কষ দু’টো আবার বেঁকে এল একটুখানি। গলার বিদ্রূপকে ঠেকাতে পারল না। সুভাষ মান তার উত্তরে কিছু বলার আগেই বাইক থেকে নেমে দাঁড়াল আশু। জনক আড়চোখে দেখল তাকে। কিন্তু গেরাহ্য করল না। সুভাষ মানকেই বলল, “না বাবু, অ্যানেক পাটি হলেক্, আর লয়। ইবারে যা কুথা স্যা শুদু তুমার সঙে আমার। একদম মুখ্যামুখি।”
“বটে রে জনক্যা!” সুভাষ মানের পরিবর্তে এগিয়ে এল আশু। বলল, “তুর য্যা দমে বাড় বাড়িচে দেখচি রে ব! কার সঙে ক্যামন কইরে কুথা বইলতে হয় স্যাটাও ভুলে মারিচিস্?”
আশুর একথাকেও পাত্তা দিল না জনক। সুভাষ মানের চোখে চোখ ফেলে বলল, “যার সঙে যেমন কইরে কুথা বলার দরকার বটে তেমনটি কইরেই বলচি আমি। ত তুঁই আবার মাঝখ্যানে ফপরদালালি মাইত্তে আসচিস্ ক্যানে?”
“এই শালা, মু সামলাঁইয়ে কুথা বলবি বলে দিলম। জানিস্ কার সঙে তুঁই কুথা বলচিস্?”
“হঁ-হঁ, জানি। তুঁইঅ ভুলে যাস্ নাই তুঁই কার সঙে কুথা বলচিস্! তুর উ ফাঁকা গাঙানিতে জনকা নুয়ার ডরায় নাই বুজলি?”
“বটে রে শালা! যত বড় মু লয় ততবড় কুথা!” আশু ডান হাতটা তুলল সজোরে। কিন্তু সেটা নেমে আসার আগেই সুভাষ মান মৃদু ধমকের সঙ্গে বলল, “এই আশু! তুঁই থাম।”
“আমাকে থাইমতে বলচেন আপনি! আমাকে! আর উ শালা য্যা–” অবাক হল আশু। এমনটা তো আগে কখনও ঘটেনি! যখনই সুভাষ মানের দিকে কেউ আঙ্গুল তুলেছে তখনই সে আগ বাড়িয়ে সে-আঙ্গুল ভেঙে দিয়েছে। কিন্তু সুভাষ মান তো কখনও তাকে বাধা দেয়নি! তাহলে!
এই তাহলেতে এসে থমকে গেল আশুর কথা। জনক অবশ্য তাকে কোনো পাত্তাই দিল না। সরাসরি তাকাল সুভাষ মানের চোখের দিকে। সুভাষ মানও যে জনককে আজকে দেখছে তা নয়। তার শরীরের শক্তির সঙ্গে সে ভালোই পরিচিত। তাই আশুকেই বলল, “সোব সোময়ে ঝুটঝামিলা ভাল লাগে নাই।” তারপর তাকাল জনকের দিকে। বলল, “বল রে ব, বল। কী বলতে খুঁজচিস্ তুঁই?”
“আমার প্যাটে লাত মাইরে রব্যাকে কাজে লিলেন ক্যানে?”
“কী!” ঝপ করে থতমত খেয়ে গেল সুভাষ মান। ঠিক কী যে বলবে তাই খুঁজে পেল না। কিন্তু পোড় খাওয়া খেলোয়াড় সে। তড়িঘড়ি সে ভাবটাকে চাপা দিয়ে বলল, “স্যা কৈফিয়তটা কি তুখে দিতে হবেক্ নাকি রে ব? তুঁই কী অমন লাটের বাঁট বটিস্, আঁ?”
“লাটের বাঁট আপনিঅ অমন কিছু লন। আমি শুদু লিজের কানে শুইনতে খুঁজচি, যদি উয়াকেই লিবেন থাইলে আমাকে কুথা দিঁইছিলেন ক্যানে?”
“কুথা! তুখে?” আবার কথা হারিয়ে ফেলল সুভাষ মান। কোনো উত্তরই খুঁজে পেল না জনকের প্রশ্নের। বদলে খ্যাঁক-খ্যাঁক করে হাসল। এলোমেলোভাবেই বলল, “ই বাবা, আমার কী দায় পড়িচে রে কুথা দিয়ার? তুঁই শালাই ত আমার পঁদে পঁদে ঘুরে বুলছিলি! শালা ছুটুলোক থাইলে আর কাখে বলিচে!”
“মু সামলাঁই কুথা বইলবেন বইলে দিলম।” ঝট করে লৌহরক্ত ছলকে উঠল জনকের ধমনিতে। হাতখানা মুঠো হয়ে এল। দাউ দাউ করে জ্বলে উঠল বুকের জ্বালাটা। বলল, “নাইলে বাবু বইলে আজকে আর খাতির কইরব নাই।”
কিন্তু গরিব মানুষের এতবড়ো হুংকার সহ্য করার মতো নমনীয়তা কোনোকালে তৈরি হয়নি– না সুভাষ মানের, না আশু সিংহের আর না তাদের মতো মানুষের। তার উপর সুভাষ মানরা একসময় ছিল এ অঞ্চলের জমিদার। সেই সুবাদে এখনও বাবু সম্বোধন পেয়ে থাকে আম-মানুষের। সুতরাং যাদেরকে মানুষের মর্যদাই দেওয়া হয়নি কখনও তাদের আবার নিজেদের কথা কী! তারা তো শুধু হুকুম তামিল করবে। খেতে-খামারে মুনিস-কামিন খাটবে। বাবুদের বাড়ির অনুষ্টানাদিতে এঁঠোকাটা তুলবে। ফেলে যাওয়া খাবার খুঁটে খাবে। মিছিলে মিছিলে শ্লোগান তুলবে। প্রয়োজনে লাঠি ধরবে। বোমা বাঁধবে। ইঙ্গিত অনুযায়ী ছুঁড়ে মারবে সে সব। কিন্তু জনক এ আজ কী করে বসল! সে যে মানুষের দাবি নিয়ে পথ আগলেছে বিজয়ীদের! এতবড়ো অপরাধ কি ক্ষমা করা যায়! তাই আশু দিগ্বিদিক জ্ঞান হারিয়ে ফেলল। দৌড়ে এল জনকের কাছে। তার বুকে সজোরে একটা ধাক্কা দিল। বলল, “নাইলে কী করবি রে ব তুঁই, আঁ?”
“হাঁ ভাল, গায়ে হাত লাগাস্ নাই বলে দিলম।”
“লাগাব। ব্যাশ কইরব। একশবার লাবাগ। দেখি তুঁই আমার ক’খি ছিঁড়ে লিস্। শালা পায়ের জুতার মাথাতে উঠবার সাদ লাগিচে, লায়!” আবার একটা ধাক্কা দিল জনকের বুকে। অমনি জনকের মাথায় ছলকে উঠল পাথরগলানো রক্ত। সে-ও একটা ধাক্কা মারল আশুর বুকে। তাতেই আশু চিত হয়ে পড়ল শুঁকনো মাটিতে। জনক দাঁতে দাঁত ঘঁষে বলল, “থাইলে ল্যা। দ্যাখ কিছু কইত্তে পারি না লারি।” চেপে বসল আশুর বুকের উপর। দু’হাতে চেপে ধরল তার গলাটা। বলল, “শালা, মরদাঙ্গী মারাচ্চিস্ আমার সঙে, আঁ! জনকা নুয়ারের সঙে! জানিস্ নাই কার রক্ত বইচে আমার বুকে! আজ শালাকে মারেই ফেলব। দেখি তুর কন বাপ আইসে বাঁচায় তুখে।”
মুহূর্তের মধ্যে ঘটনাটা ঘটে যাওয়ায় হকচকিয়ে গেল সুভাষ মান। কিন্তু পরক্ষণেই সম্বিৎ ফিরে পেল। দৌড়ে গেল জনকের কাছে। তার চুলের মুঠি ধরে বলল, “ছাড়, ছাড় শালা! মইরে যাবেক্ যে রে!”
“মরুক! একবারেই মরে যাক শালা হারামির বাচ্চা!”
ততক্ষণে আশুর মুখ দিয়ে গোঙানি বেরিয়ে এসেছে। সুভাষ মান চুলের মুঠি ছেড়ে ঝাপটে ধরল জনককে। টান দিল গায়ের সমস্ত শক্ত লাগিয়ে। কিন্তু একবিন্দু নড়াতে পারল না। শক্তিতে পারা যাবে না বুঝে ছেড়ে দিল। এদিক ওদিক তাকিয়ে তুনে নিল একটা মাটির ঢেলা। সেটা সজোরে মারল জনকের মাথায়। সঙ্গে সঙ্গে ঢেলাটা গুঁড়ো হয়ে গেল। জনকও ছেড়ে ফেলল আশুর গলা। একঝটকায় উঠে দাঁড়াল আশু। কাশতে কাশতে জামার তলায় হাত দিল। তলপেটের কাছে গুঁজেরাখা যন্ত্রটা বের করে আনল। নলটা ঠেসে ধরল জনকের কপালে। বলল, “শালা, দুব– দুব ন’টাই শ্যাষ কইরে! দুব?”
“ছাড়, উয়াকে ছাড়ে দ্যা। অখন খুনখারাপি ভাল কাজ হবেক্ নাই।” সুভাষ চেপে ধরল আশুর হাতখানা। আশু গোঁয়াড়ের মতো মাথা ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে বলল, “না ছাড়ব নাই। শালাকে আজ যমের ঘরকে পাঠাঁই তবে দম লুব। শালা কামার্যা, এত বাড় বাড় তুর! আমার গায়ে হাত তুল্লি! জাতে রোজপুত আমি। বল, দুব চালাঁইয়ে?”
“আঃ, আশু!” বেশ জোরের সঙ্গেই ধমকে উঠল সুভাষ মান। তাতে কাজও হল। আশু সরিয়ে নিল যন্ত্রটা। হাঁপাতে হাঁপাতে সেটাকে ঢুকিয়ে রাখল জামার তলায়– তলপেটে। কটমট করে তাকাল জনকের দিকে। জনক আর কিছু বলল না। কিছু করারও চেষ্টা করল না। মাথা নামিয়ে বসে থাকল চুপচাপ। শুধু বুকটা কামারশালার হাপরের মতো ওঠানামা করতে থাকল। সুভাষ মান বলল, “কাজটা তুঁই ভাল কইল্লি নাই জনকা। আমিঅ দেখে লুব তুঁই কী কইরে নিমাই মড়লের চাষ করিস্! শালাকে যদি ভাতে না মারিচি ত আমি রোজপুতের ছাঁ লই রে শালা! চলে আয় আশু।”
গজরাতে গজরাতে বাইক চালিয়ে এগিয়ে গেল তারা। জনক এবার মাথা ঝুঁকিয়েই ঘাড় ঘোরাল। তাকাল তাদের দিকে। হালকা হাসির একটা রেখা খেলা করে গেল তার কষে। এই সময় পুকুরটার কাদাজল ছেড়ে উঠে এল কুকুরটা। হাউ হাউ করে তেড়ে গেল ঝোপের দিকে। কিন্তু কিছু না পেয়ে ফিরে এল জনকের কাছে। তার কোমরটা শুঁকতে শুঁকতে কুঁই-কুঁই শব্দ করল। সেই শব্দকে ভাসিয়ে নিয়ে গেল গ্রীষ্মশেষের তপ্ত বাতাস।
পথের কবিতা
দেহি পদপল্লবমুদারম্
জয়দীপ রায়
জয়দেব মেলায় এবারও খুব ঠান্ডা ছিল। আমাদের গাঙ্গেয় অঞ্চলে শীত কমে গেলেও আমি জানতাম জয়দেবে সেই কাঁপুনি থাকবে। টুকাই বাড়ি থেকে বেরনোর সময় শুধু ক্যামেরার ব্যাগটা নিয়ে বেরোচ্ছিল। তাড়া মেরে বললাম, সারা রাতের কেস। অজয়ের পাড়ের কনকনে হাওয়া। ইনার পর। জ্যাকেট নে।
দুর্গাপুর থেকে বাপনকে নিয়ে জয়দেবের পার্কিংয়ে পৌঁছলাম রাত সাড়ে দশটা। রাণা অবাক। রাত সাড়ে দশটাতেও মেলা দেখা শুরু করা যায় !
এপার থেকে নদীর উপর দিয়ে হেঁটে পার হয়ে মেলায় যেতে হয়। চওড়া জলহীন অজয়ের নদীখাত। এপার থেকে দূরের মেলার একটা গভীর আওয়াজ ভেসে আসে। সমস্ত শব্দ একসাথে মিশে সে এক দূরের যতিহীন কোলাহল। এই আওয়াজটাই টানে মানুষকে। এই আওয়াজ থেকে প্রতিটা সুরকে আলাদা আলাদা করে শোনার জন্যই মানুষ তড়ি-ঘড়ি নদী পার হয়। শনশনে হাওয়ার মধ্যে খেয়াল করতে ভুলে যায় নদীতে জল আছে কিনা।
জয়দেব মেলায় মানুষ একবার ঢুকে গেলেই হারিয়ে যায়। একের পর এক আখড়ায় ঢুঁ মেরে দেখে নেয় কোথায় খুঁজে পাওয়া যায় নিজেকে। করকরে স্বরের পদাবলী কীর্তনীয়ার মঞ্চ পেরিয়ে যায়। গরম জিলিপির কড়াইয়ের পাশ দিয়ে বাঁদিকে ঘুরে দেখতে পায় একটা আগুন ঘিরে দুজন সাধু আর কিছু অনুচর বসে রয়েছে। হাতে হাতে কল্কে ঘুরছে। লে বেটা, আগন্তুকের দিকে কল্কে এগিয়ে দেয় জটাধারী। যে মানুষের এখানেও হারানো প্রাপ্তি হয় না সে বেদম বিষম খায়। টলতে টলতে বেরিয়ে গিয়ে ভিড়ের টানে ঢুকে পড়ে এক পদাবলী কীর্তনের আখড়ায়। নেচে নেচে যে গায়িকা অসাধারণ পালা করে চলেছেন, তাঁকে যার রাধা মনে হয়, সেই হারানো মানুষটি অবশেষে নিজেকে মেলার ভীড়ে খুঁজে পান। বসার প্রস্তুতি নেন।
যতবার জয়দেবে এসেছি, দেখেছি সারারাত গায়ে গা মানুষ স্রোতে হেঁটে যাচ্ছে। আর কি যেন একটা খুঁজছে। প্যান্ডেল হপিংয়ের জমানায় আখড়া হপিং করে যাচ্ছে। একের পর এক আখড়ায় ঢুকছে আর বেরিয়ে আসছে। সেই বাউল পাচ্ছে না, যে রকম আর কখনও পায়নি। সেই কীর্তন শুনছে না যেমনটি আর কখনও শোনেনি। সারারাত আমিও মানুষের স্রোতে হেঁটে যাই। আর খুঁজতে থাকি এই এত মানুষ কি খুঁজে যায়! সারারাত ধরে আখড়ায় আখড়ায় বাউলরা নেচে নেচে গান করে চলে, মঞ্চ থেকে মঞ্চ ভরে ওঠে সেরা পার ফরমেন্স এর কীর্তনে নৌকাবিলাস বা রাধার মানভঞ্জনে। যে যেখানে আটকে যায়, বসে পড়ে। যার সন্তুষ্টি কম, সে আবার স্রোতে ভাসিয়ে দেয় নিজেকে। অজয়ের পাড়ে সারা রাতের মানুষের স্রোতে।
একটা আখড়ায় ঢুকে দেখি গান নেই কোনও, কিন্তু গামলায় গরম খিচুড়ি রয়েছে। আখড়ার লোকজন ধুলোর মধ্যেই শালপাতা পেতে দিল। বড় শালপাতার পাতা। গরম খিচুড়ি আর আলুর ঝোল। চাটনিও। শরীর যাবতীয় শক্তি সঞ্চয় করে নিল। সারা রাত হেঁটে যাবার, দাঁড়িয়ে থাকার এনার্জি। বাইরে বেরিয়ে সিগারেট ধরানো হল। কোনও কোনও আখড়া থেকে অসাধারণ সুরেলা আওয়াজ ভেসে আসে। ভেতরে ঢুকলে দেখা যায় দর্শক শ্রোতা সব মুড়ি দিয়ে ঘুমোচ্ছে আর ক্যাসেটে গান বাজছে। একটা আখড়ায় এক অখ্যাত বাউলের গান থামিয়ে দিয়ে ঘোষণা হল, আমাদের মধ্যে এসে গেছেন সেই দূরদর্শন ও বেতারের শিল্পী যিনি সারা দুনিয়া ঘুরে গান গেয়ে বেড়ান। ঘোষণা শেষে সস্তার বাউল যখন মাইক ফিরে পেলেন, কি দাপট তার দোতারার! যেন জীবনের সেরা গানটি তিনি এবার করবেন নেমে যাবার আগে।
হঠাৎ দেখি টুকাই নেই। খোঁজা শুরু করার আগেই ফোন। জয়দীপ দা, সামনে চলে এসো। পেইছি। শ্মশান ছাড়িয়ে তিন চারটে আখড়ার পর ডান দিকের গলি। চললাম। মাইকের আওয়াজটা এদিকে একটু কম। আওয়াজের মারামারিটাও কম। একটা মাইকে অসাধারণ এক কন্ঠ ভেসে আসছে। ক্লাসিক্যাল ভয়ে সে পদাবলী কীর্তন। পৌঁছলাম সেখানে। এত অপূর্ব গাইছে যে প্রথমে ভাবলাম রেকর্ড বাজছে। সামনে গিয়ে দেখি চারজন যুবকের একটাদল। মূলগায়েন সেজে গুজে সামনে বজ্রাসনে বসে। বাঁদিকে খোল। পিছনে একজন সিন্হেসাইজার আর একজন কাঁসা। পিছনের দুজনই গান ধরেছে। এ ছাড়ছে ও ধরছে। কাওয়ালির মতো। কম বয়সী ছেলে দুজনই। মন্ত্রমুগ্ধের মতো জায়গা খুঁজে বসে পড়লাম আমরা। টুকাই শুধু বলে উঠলো, কি এ! মরে যাবো নাকি জয়দীপ দা ?
বেঁচে গেলাম আমরা। বেঁচে থেকেই মরে গেলাম বা মরে গিয়ে বেঁচে উঠলাম আমরা চারযু বক। শেষরাতে অজয়ের পাড়ে এক অগ্নিকুন্ড খুঁজে পেলাম আমরা। দোয়ারকিতেই বুঁদ হয়ে গিয়ে রাত শেষ করলাম জয়দেবে।
মেলা শেষ করে যখন উঠে দাঁড়ালাম, রাত চারটে বাজে। না কি ভোর! মানুষজন অজয়ের জমে থাকা জলে নেমে গেছে। চান করতে। কাল ভোরে মকর সংক্রান্তি ছিল। কিছু পুণ্য আজও নিশ্চয় থেকে থাকবে। কিছু রেওয়াজ। আমরা যুগ-যুগান্ত ধরে চলে আসা অবগাহন দেখতে দেখতে মাটির বাঁধের রাস্তা ধরে ঘরমুখী। একজন নদী থেকে এক বোতল জল ধরলো। আমরা গিয়ে বোতলের সামনে হাত পাতলাম। আঁজলা করে জল নিয়ে মাথায় দিলাম। মুখেও মাখলাম।
-কোথায় বাড়ি দাদার ? জলবাহককে জিজ্ঞেস করি।
-পুরুলিয়ায়।
-জল নিলেন কেন?
-আর পরেরবার আইসতে পারি কিনা ঠিক আছে!
-কত বছর আসছেন?
-বাসের ভাড়া যখন পাঁচ টাকা ছিল তখন থিকে।
-তা, কত বছর হবে?
-কত বছর তো বইলতে পারবো না। তবে তখন দুর্গাপুরটেশন থিকে বাসভাড়া পাঁচ টাকা ছিল। এখন পঁয়তিরিশ টাকা।
-কি দেখলেন মেলায়?
-কত্তকি! কেউ গাইছে, কেউ নাইচছে। কেউ লাভ কইরছে, কেউ লোসকান। কত মানুষ কাঁইদছে, হাইসছে। ভরে গেল ভেতরটা। জানেন তো, বাবার সাথে প্রথম এইসেছিলাম। তাইর পর থিকে নাআইসলে মইনটা সারা বছর খারাপ থাকে। কি যেন একটা পাইনি মইনে হয়।
রসিকের পঁয়ত্রিশ টাকার বাসে হর্ণ দিল। লোকটা আমাদের ছেড়ে বাসে গিয়ে উঠলো। আমাদেরকে কানায় কানায় ভরে দিয়ে পিছনে ছেড়ে আসা মেলাপ্রাঙ্গন, ভুলে যাওয়া নদী সব আস্তে আস্তে দিনের আলোয় ভরে যেতে লাগলো। যেখানে যত পৃষ্টা তখনও সাদা ছিল, সব জায়গায় লেখা হতে থাকলো, দেহি পদপল্লবমুদারম্। কবি জয়দেব খানিক পরে অজয়ে স্নান সেরে দুটো খেতে বসবেন।