শ্রেষ্ঠ নয় সমগ্রের খোঁজে

।। কবিতা আশ্রম পরিবারে সকলকে স্বাগত।।"কবিতা আশ্রম একটি গুরুত্বপূর্ণ পত্রিকা। এই পত্রিকা থেকে তরুণদের কবিতা আর কবিতা-ভাবনা কোন পথে চলেছে তার এক রকমের চিহ্ন পাওয়া যায়।"--কবি জয় গোস্বামী ।। "তথাকথিত শিবিরের ধারণাকে ধ্বংস করে দিয়ে কবিতা আশ্রম এই সময়ের বাংলা কবিতার প্রচ্ছদ হয়ে উঠেছে। নানা মাত্রার , মার্গের , স্রোতের , ঘরানার এমন নিরভিমান উদযাপনের শরিক না হয়ে কেউ পারবেন না , এটা আমার বিশ্বাস ।"--সুমন গুণ ।। "কবিতা আশ্রম চমৎকার ম্যাগাজিন ।কখনও লিখিনি , এবার লিখতে পেরে ভালো লাগছে"--কবি মৃদুল দাশগুপ্ত।।"আমি কবিতা আশ্রম পত্রিকা পাই এবং আগ্রহ দিয়ে পড়ি । যে সকল কবিতা ও গদ্য প্রকাশিত হয় সে-সবই অত্যন্ত ভালো লেখা এবং সু-সম্পাদিত,যা আমার খুবই ভালো লাগে । এছাড়াও কবিতা আশ্রম পত্রিকাকে কেন্দ্র করে বেশ কিছু তরুণ কবি ও গদ্যকার আগামীর জন্যে তৈরী হয়ে উঠছে । তরুণ কবি ও গদ্যকার-দের প্রশয় দেওয়ার ক্ষেত্রে কবিতা আশ্রম পত্রিকাটি খুবই উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রেখেছে ।"--কবি দেবদাস আচার্য।।"প্রকৃত কবিতাকে জহুরির চোখে খুঁজে আনছে কবিতা আশ্রম। প্রচারের আড়ালে থাকা তরুণ কবি প্রতিভাকে পাঠকের সামনে নিয়ে আসার এই প্রয়াসকে কুর্নিশ জানাই ।"--কবি অঞ্জলি দাশ।।"দূরে গেলে কিছু জিনিস আবছা দেখায় । আরও দূরে গেলে কিছু জিনিস স্পস্ট হয়ে ওঠে । কবিতা আশ্রমকে আমি স্পস্ট দেখতে পাচ্ছি। যেভাবে আত্মত্যাগের মধ্যে দিয়ে মাথা তুলে কাগজটিকে ক্রমশ আইকনিক তুলছে সেটা একটা দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে ।"--কবি সুবোধ সরকার।। “কবিতা আশ্রম প্রকৃত অর্থেই বাংলা কবিতার লাইট হাউস ।তরুণ কবিদের খোঁজে আমি তাই প্রতিটি সংখ্যা পড়ি”।–রাহুল পুরকায়স্থ ।।“অচেনা নতুন কবিদের দিকে এখন তাকিয়ে থাকি।‘কবিতা আশ্রম’ এই সব কবিকে সামনে নিয়ে আসছে।এ একটা প্রশংসনীয় উদ্যোগ। এই জাতীয় উদ্যোগ বাংলা কবিতার ক্ষেত্রটিকে প্রসারিত করছে”।–কবি কালীকৃষ্ণ গুহ ।।“কবিতা আশ্রম আমার প্রিয় পত্রিকা । পড়ে এবং লিখে তৃপ্তি পাই। সারা বাংলার তরুণদের খুঁজে আনছে কবিতা আশ্রম”।–কবি সমর রায়চৌধুরী ।। "সব চেয়ে ভালবাসি নিজেকে কারণ সে লোকটার ভেতরে কবিতার আবাস । সেই নিজেকে দেখার জন্যে এক টুকরো আয়না খুঁজছিলাম বহুদিন । কোথাও পাইনি । কে জানতো একটি আশ্রমের ভেতর সেই টুকরোটুকু আমার জন্য অপেক্ষা করছে।"--দিশারী মুখোপাধ্যায় ।।

মহাবোধি আলোর ঠোঁটে বিঁধে আছে যে অনন্তজ্যোৎস্না ও শূন্যতা

পাঠক সেনগুপ্ত

৬ জুন ২০১৯

       সোনাঝুরির লাল কাঁকড়ের রাস্তার পাশ দিয়ে এক-সমুদ্র সফেন-শব্দ হেঁটে চলে গেলে যতটা নীরবতা, তার চেয়ে একটু বেশি আকুলি-বিকুলি যাপন নিয়ে কবি অমিত সাহার লেখাসমুদ্র ‘পাহাড়িয়া পাথরে’ লেখা কবিতাগুচ্ছ ‘শূন্যতার আরও কাছে আসি’ (কবিতা আশ্রম, বনগাঁ, ১৫০ টাকা) কিছু ‘সরল সান্ত্বনাহাসি’ আর আবহমানের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে সন্তর্পণে এসে দাঁড়িয়েছেন পাঠকের সামনে। তাঁর লেখা-পথের প্রতিটি পাথরে পড়ে আছে কবিতা-কণা। তাঁর আপাত-সফল জীবনের আড়ালে থাকা নানা সংগ্রাম নিয়ে কত কথা শোনা-র জীবনে তবু অমিত স্বীকার করেন, ‘অভিমানী হওয়ার কোনো গুণ আমার ছিল না।’ আজীবনের সহজ পথের ‘প্রতিম্বিম্বের প্রতিশ্রুতি’ তাঁর চলার পথে সশব্দে হেঁটে চলে। আর কবি দেখেন, শুকতারার সামনে মেঘের সামিয়ানা টাঙানো রয়েছে কেমন। এইসব মন-কেমনের লিপি, এইসব আমার-তোমার-আমাদের ‘খুচরো স্মৃতির চৌরাশিয়া আবহ’ চেয়ে আছে সমস্ত কবিতা-বইটির পাতায়-পাতায়। নিজের প্রতিটি অণুভবের কাছে, নিজের সামান্য গদ্য-বহতার স্বপ্নচারিতা নিয়ে অমিত এক ‘শব্দ-নেশাগ্রস্ত কবি’, যে ‘সোনাঝুরির শেকড়ে কান পেতে/ ব্রহ্মনাদ শোনে।’ আর দেখে কীরকম ‘পাতাদের প্রচ্ছদে ঘুমিয়ে পড়েছে ক্লোরোফিল’। এই মুগ্ধ ভাষাসংশ্লেষ তাঁকে শিখিয়েছে আসলে ‘প্রতিটি কবিজন্মই প্রতিকূল যাপনে অভ্যস্ত।’ আমাদের কেবল সেই প্রতিকূলতার কাছে দাঁড়ানো বাকি। তবু আমাদের সংশয় নিয়ে ক্লান্ত, আঘাতে-আঘাতে দীর্ণ অমিতকেও ভাবিয়েছে সেই প্রশ্ন। ‘তবে কি কবিতা মিথ্যা? সত্য শুধু শরীরের ঘাম?/ … মাথা নীচু বসে থাকি, শব্দে-শব্দে শব্দ-হীনতায়/ অগুনতি তারার মতো শূন্যতার আরও কাছে আসি।’ অমিতের শুরুর দিকের অন্বেষণ আর কবিতার নুড়ি-কাঁকড়ের শব্দে লেখা কবিতামালা নিয়ে ‘পুরোনো চিঠির মতো গাছভর্তি মায়াময় মেঘ’ সমস্ত বই-এর এখানে-ওখানে ছড়িয়ে রয়েছে। রয়েছে এক অমোঘ উচ্চারণ-ও। ‘প্রকৃতি মিথ্যুক নয়’। আর সেই বিশ্বাসের কাছে, শূন্যতার কাছে এসে অমিত এসব সাফল্য-ব্যর্থতার হিসেবের গোলমালে কেবল বলে যাচ্ছেন, ‘এসো ব্যর্থ নিয়ে বাঁচি, সফলেই পৃথিবীর ভয়’। আপনার এই ডাকে আমরাও সামিল হলাম।

অমিত সাহা

       তোমাকে না পাওয়ার ক্ষতগুলোয়’ লেগে থাকা মাছরাঙার পালকটিও আজ রঙিন। তাহলে আর আর আমাদের মনখারাপ করে কী লাভ? তবু, মনে হয়, দেখি। মনে হয়, কখনও তুমি কেঁদে উঠলে পাশে দাঁড়াই। তুমি কি টের পাও আমার এই এসে দাঁড়ানো? আর আমি যে ‘ঘুম আসছে না — এই লাইনটা কিছুতেই লিখতে পারছি না।/ লিখছি আর কাটছি। যতবার যতরকম ভাবে লিখি/ মনে হয় মরা লাইন।’ তাকিয়ে তাকিয়ে দেখি, ‘চাঁদ থুতু ফেলছে…’ আর ‘জ্যোৎস্না বিঁধে আছে। পাখির ডানায়’। আর এইসব হৃদয়সংবাদী নানান কথামুখরের রাত্রে ‘ফোন খুলেই তুমি লিখছ — ঘুমোওনি!’ এরকম সব স্বপ্নছবি, এরকম সব অস্তরাগ, ঝিঁঝিদের গান, জাতকের গল্প নিয়ে আমাদের বিভ্রমের জীবনে এসে চুপিচুপি দাঁড়ালেন কবি বঙ্কিম লেট। তাঁর ‘কুর্চিফুলের ফিনকি লিলির ফোয়ারা লাল ভ্রমরের ঘূর্ণিঝাঁক’ দেখতে-দেখতে মনে হবে, সেই প্রেমের কথা, কল্পনায় যে এলে দেখতে পেতাম, ‘নাভি জুড়ে ফুটে আছে জারবেরা ফুল’। এসব কল্পনার রাত্রে আকাশমুখরতার দিকে তাকিয়ে দেখা স্বপ্ন মনে পড়ে। মনে পড়ে তুমি ‘জলপাই কাঠের সিড়ি ভেঙে/ নীচে নেমে আসবে একদিন/ পর্দা সরাবে, জানালা খুলবে/ দেখবে আরেকটি জলপাই গাছে/ হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে কবেকার বাতাস’। এই কবেকার বাতাসের খোঁজে বঙ্কিমের কবিতা বই, ‘জ্যোৎস্না বিঁধে আছে’ (কবিতা আশ্রম, বনগাঁ, ১৫০ টাকা) শব্দে-শব্দে, পাতায়-পাতায় কী ভীষণ পরিপূর্ণ তাঁর আন্তর্জাতিকতা বোধের শব্দপ্রকাশে। বঙ্কিমের কবিতায় কেবল ‘থোকায় থোকায় ফুল নয়’, রয়েছে ‘আমাদের নিত্যঅশ্রু/ আনন্দের ফল্গুধারা’। তাঁর কবিতার মাঠে পুড়ছে আজীবনের ছায়াময়ূর। আর শব্দ নিয়ে খেলতে-খেলতে বঙ্কিম শুনতে পাচ্ছেন, ‘সব শব্দ শব্দ নয়’। নৈঃশব্দের সাজানো পাবকপুষ্প সাজিয়ে এই এসে দাঁড়ানোকে  আসুন, হে পাঠক, আমরাও কোনও মেষপালকের প্রিয় গান শোনাই।

বঙ্কিম লেট

       ‘বিষণ্ণ লেখার গায়ে’ কত স্পন্দন তুলে নেওয়ার অপেক্ষায় বহুযুগ কেটে গেল আমাদের। কেটে গেল সমস্ত রিপুকে সযত্নে লালন করার অভ্যেসে। সামান্য জন্মের এই জমে ওঠা মাৎসর্য রাধাচূড়া রাগ এক বৈশাখবিকেলের পর নিজের আরো আরো আরো অনুকূলে খুঁজতে বসে জয়দেব বাউরী কেবল চেয়েছেন কুসুম ভোরের আলোপথ। আর চেয়েছেন, ‘ঘুম এসে তোমাকে জাগাক’ (কবিতা আশ্রম, বনগাঁ, ১৫০ টাকা)। চেয়েছেন আমাদের এই ছদ্মঘোর থেকে জাগরণের সীমা পর্যন্ত ‘এ উল্লাস, উন্মাদনা, রক্ত-পথ, অন্ধকার ডাক…’ সব যেন মিথ্যে হয়, মৃত্যুর চিরঘুমের কাছে এসে আমাদের সামান্য একপলকের  বেঁচে থাকার সৌরভ জাগিয়ে তুলুক আমাদের বিস্ময়বোধকে। ‘সমস্ত জন্মের সব দিক থেকে’ খুলে নিতে থাকা বন্ধন, সামনের অন্তহীন পথ, ধূসর আকাশ, পৃথিবীর সমস্ত বিপন্ন মানুষের কলরব, এসমস্তের গভীরে জয়দেব অবিরাম টের পান, গতির সমূহ দোলা। এই দোলচালের কাছে প্রতিপ্রশ্নে জর্জর কবিতার কাছে নত হতে থাকা এক আর্তি নিয়ে আমাদের সামনে এসেছে তাঁর কবিতা। সেখানে কবি চাইছেন, ‘সত্য ভেঙে ভেঙে আরো গূঢ়তম সত্যকে’ দেখতে। নিজের কাছেই জানতে চেয়েছেন, ‘নিজেকে তুলেছো শূন্যে? দিয়েছো কি সজোরে আছাড়?/ ভেঙেছে দুয়ার তাতে? খুলে খুলে গিয়েছে প্রাচীর?’ এ কীসের প্রাচীর, যার সমূহ ধ্বংসসম্ভাবনার পরে ‘মাটিও আকাশ পাবে সমতলে এলে জমিজমা’? তবে কি এই সেই আজন্ম জলের ঋণ, ভেসে গেলে দেখব, ‘ওখানেই জন্মান্তর, স্থির এক আলোর সুষমা’? কিন্তু তাকে ছোঁয়া শক্ত। ‘ময়াল অস্তিত্ব তার। চলাচল, গতি’ কোনোকিছুই টের পাওয়া যায় না সহজে। আর এই প্রশ্নে-প্রশ্নে দিকভ্রান্ত কবি হঠাৎ এক ভোরে দেখেছেন, ‘সুন্দর কীভাবে যেন চুপিচুপি এসে বসে’ তাঁর লেখার পাশে। শুরুর সেই সংশয় কেটে গেছে আজ। প্রশ্নের বদলে এখন ‘অভিভূত চোখ তার’। সমস্ত রকম রঙ নিয়ে জয়দেব এখন ‘সষ্টাঙ্গ মাটির কাছে প্রশ্নাতীত নির্জন’। এখন তাঁর ‘পাখিচুপ নির্জনতা’র চর্চা দেখছে অনন্ত প্রকৃতি, আর তিনি দেখছেন এক ‘ধ্রুবতারা আলো’ ক্রমশ নেমে আসছে তাঁর কবিতার কাছে। তবু ব্যর্থতাকে জড়িয়ে বাঁচতে হয় কবিকে। ‘প্রকৃত কবির লেখা কবির মৃত্যুর পর, মুখে অগ্নি জ্বেলে দিয়ে ফিরে যায় বাড়ি’। আর এত এত শব্দের দেশে কবির ভেতরের কান্না, ‘কবিতা মরে যায়’। আমরা পড়তে পড়তে তো দেখছি ক্রমশ একটি কবিতা-বই কেমন মাথার মধ্যে বেড়ে উঠছে সমস্ত সংশয়, প্রশ্ন, প্রতিপ্রশ্ন কাটিয়ে। তবু আদ্যপান্ত কবি জয়দেবের সংশয় রয়েই গেল। ‘তোমরা যে যা-ই বলো, আমি ঘুমদেশ থেকে জানি/ নির্জনে দাঁড়ানো এক শালগাছ ছাড়া কিছু নই।’ আপনি সেই শালগাছ হয়েই থাকুন। আমরা কবিতার ছায়ায় অপরজিতার কুঁড়ি ফুটতে দেখব বলে অপেক্ষায় রইলাম।

 
জয়দেব বাউরী

সাদা পাতার ওপর কেঁপে উঠেছে মায়াতরবারী

সুদীপ বসু

৬ জুন ২০১৯

  Being aware of…displacement is the rust on the razor that threatens the throat. It is an unnecessary insult’. –  Maya Angelou

 

            সভ্যতার প্রবাহকে যদি একটা অভিধান হিসাবে দেখা যায় তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সব শব্দ মুছে গেলেও অন্তত গোটা তিনেক শব্দ চিরস্থায়ী জলছাপ হ’য়ে বসে গেছে। তারা হ’ল উৎখাত, উদ্বাস্তু ও শরণার্থী। মানুষের উচ্চাকাঙ্খা আর উচ্চাশার সঙ্গে, ক্ষমতা দখলের অন্ধ বিক্রমের সঙ্গে একেবারে লীন হ’য়ে আছে অন্য মানুষকে তার হকের ভিটেমাটি থেকে সবলে উচ্ছেদ করে দেওয়ার উগ্র বাসনা, স্থায়ী ঠিকানাওয়ালা মানুষকে পলক-না-ফেলতে ঠিকানা চিহ্নহীন করে দেওয়ার অন্ধ আতুর লোভ। মানুষের সঙ্গে মানুষের আদিমতম সম্পর্কের একটা বাহ্যিক রূপ যদি হয় যুদ্ধ, তবে দ্বিতীয়টি হ’ল এই উৎপাটন ও শরণার্থী শিবিরের বাস্তবতা। বড় আহ্লাদে মাথার ওপর যে চাল গড়েছি আমরা, চারপাশে অহঙ্কারের চারটে দেওয়াল তুলেছি, চকখড়ি দিয়ে আমার জমির আমার জেলার আমার রাজ্যের আমার দেশের বর্ডার এঁকেছি এতদিন, যদি হঠাৎ একদিন কোনো অপ্রত্যাশিত ওয়ারেন্ট এসে নিমেষে সেসব নস্যাৎ করে দেয় তবে ‘আশ্রয়’ শব্দটি তার সমস্ত ভার ও ভরসা হারিয়ে সময়ের বিদূষক হ’য়ে ওঠে। শব্দের বাফুন হ’য়ে যায়। ঘটিবাটি নিয়ে রাতারাতি সড়কে নেমে আসা গৃহহারা মানুষের চোখে তখন ‘আশ্রয়’ এক আশ্চর্য ঠাট্টা হয়ে যায় বইকি।

            ‘আশ্রয় এক আশ্চর্য ঠাট্টা’– নয়ের দশকের একেবারে গোড়ার দিকে কাব্যের মাদকতায় পাঠকমন আচ্ছন্ন করে রেখেছিল যাঁর ‘কার্ণিশে বিষন্ন মেঘ’ বইটি, সেই নিভৃতচারী কবি দেবাশিস চন্দের দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থের এই নাম এমনভাবেই সমসময়কে বিদ্ধ করে। স্বভূমি থেকে উৎখাত হওয়ার বেদনা আর আর হারানো মাতৃদেশের জন্য স্মৃতিমেদুরতা লীন হ’য়ে থাকে তাঁর কবিতায়। কিছুদিন আগে একটি অন্তর্জাল পত্রিকায় (আবহমান ডিসেম্বর ২০১৮) তিনি লিখেছিলেন – ‘স্নেহ ভালোবাসা এক পরবাসী চাঁদ / অকাল অমাবস্যা দিগন্তে তুমি শরণার্থী / একের পর এক সীমানা পেরিয়ে চলেছো / এক টুকরো মাটির খোঁজে, অন্ন তো অলীক’(পরবাস)। প্যাঁচপয়জার নেই, রাখঢাক নেই, ইনিয়ে-বিনিয়ে বলা নেই, এই নতুন বইয়ে তিনি সরাসরি জানান – ‘ভিটেমাটি বলে তোমার আর রইল না কিছু, শূন্য চৌকাঠ / আশ্বিনে পুজোর বাজনা বেজে উঠলে ঘুরে বেড়াও, পথে পথে / আর তো বাড়ি ফেরার উপায় নেই।’ অথবা ‘উদ্বাস্তু তুমি, এতদিনেও ভিটেমাটি ছেড়ে বেরিয়ে পড়তে হল / ভদ্রতার মুখোশ আঁটা পরিবারের লোকেরা লুট করে নিল সর্বস্ব’ (উদ্বাস্তু)।‘সান্তার অপেক্ষায়’ লেখাটিতে বলছেন –‘… সেই ছোট্ট শহরও আজ কতদূরে সরে গেছে / ঘষা কাচের মতো ঝাপসা হ’য়ে আসছে সব … / অপরাহ্নের আলোয় ভেসে ওঠে শুধু লোভী ক্রুর কিছু মুখ, / দুঃখ হয় বলতে সান্তা, তারা আমারই ঘনিষ্ঠ স্বজন।’

            এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যাঁরা তাঁকে ভিটেছাড়া করেছে, কেড়ে নিয়েছে বাপপিতামহের চষা জমি, মাথার ওপরের আকাশ, প্রবল বেদনার ভেতরেও কিন্তু কবি তাঁদের সঙ্গে মানবিক সম্পর্ক অস্বীকার করেননি। বারবার তিনি তাদের আত্মীয়তা মেনে নিয়েছে। হতে পারে লোভদীর্ণ কিন্তু পরিবারের একজন তো বটেই, হতে পারে লালসাকূটিল তবু ঘনিষ্ঠ স্বজন তো বটেই। এখানেই এই কবির স্বকীয়তা। শব্দ আর বাক্যরীতি নিয়ে প্রাণহীন সার্কাস নয়, সোজাসাপটা তাঁর বলার ভঙ্গিমা। তাঁর ভাষা কবিতার আত্মাকে বড় মমতায় ছুঁয়ে থাকে। বিপুল বিপন্নতার মধ্যেও তিনি মায়াময় –‘ঘর বলে আর তোমার কিছু রইল না / আশ্রয় এক আশ্চর্য ঠাট্টা, সঙ্গী ধ্রুবতারা / …বিষাদ রাত্রির মৌন অন্ধকারে তুমি একা’(আশ্রয় এক আশ্চর্য ঠাট্টা)। দিকভ্রান্ত ক্রোধ নেই, একধরণের ঠান্ডা অভিমান আছে তাঁর লেখায়। আর হয়তো সে কারণেই ছিন্নমূল মানুষের যন্ত্রণাকে তিনি আরো গভীর দার্শনিক ডাইমেনশন দিতে পেরেছেন। লিখছেন –‘অতএব তুমি যেখানেই যাও … / আদতে যাবে না কোথাও / থেকে যাবে এখানে, এই ঘরে …’(ঠাকুমা)। মানুষ একই পরিসরে থেকে যায়, বাহ্যিকভাবে তার স্থানাঙ্ক বদল হয় শুধু।’

             কিন্তু দুনিয়া জুড়ে চলা এই উচ্ছেদযজ্ঞ তো আর কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটা একটা সুবৃহৎ ট্র্যাজেডির সামান্য ভগ্নাংশ। আর সেই ট্র্যাজেডি হ’ল বছরের পর বছর ধরে দেশে দেশে শোষণমূলক ব্যবস্থা কায়েম করা আর সমাজের প্রান্তবর্তী মানুষদের চুরমার হ’য়ে যাওয়া পাঁজর পিষে দিয়ে ‘সভ্যতা’ আর ‘উন্নয়নের’ রথের চাকা চালিয়ে নিয়ে যাওয়া।  বিশ্বব্যাপী মার্কেট ক্যাপিটালের আগ্রাসী রমরমার এই যুগে মানবসম্পর্কগুলি যে প্রায় তলানিতে পৌঁছেছে কবি দেবাশিস চন্দ তার বেদনাবিদ্ধ ছবি আঁকেন ‘বাড়ি বদল’ কবিতাটিতে –‘সম্পর্ক বলে কিছু হয় না, সবই অলীক / সম্পর্ক এখন ক্রমশ নেমে যাওয়া এক খাদ।’যেখানেই নিপীড়ন, বলপ্রয়োগ, অবদমন সেখানেই সাদা পাতার ওপর কেঁপে উঠেছে তাঁর মায়াতরবারী। বেদনা এক অতি ব্যক্তিগত অনুভূতি কিন্তু তা যখন শিল্পরূপ পায় তখন তা সমগ্রের শোক হ’য়ে ওঠে। দেবাশিস চন্দের কবিতায় ব্যক্তি সমগ্রে আর মুহূর্ত চিরন্তনে রূপান্তরিত হয়। মায়াবীর মতো যাদুবলে তিনি ফুটিয়ে তোলেন এক দুনিয়া যেখানে ‘স্মৃতির গোপন কুলুঙ্গিতে ঝলসায় ঘাতকের গোপন ছুরি।’

            মনে পড়ে প্যালেস্তানিয় কবি মাহমুদ দরবিশের সেই অবিস্মরণীয় পংক্তি –  ‘আমরা সেই দেশের দিকে হেঁটে যাই / যা আমাদের মাংসের নয় / যার বাদাম গাছগুলোতে খুঁজে পাবে না / আমাদের অস্থি হাড়গোড় / আমরা সেই দেশের দিকে হেঁটে যাই / যে আমাদের জন্য ঝুলিয়ে রাখে না কোনো বিশেষ সূর্য। / … আমাদের আছে এক দেশ / অদৃশ্যকে দেখে যাওয়া শুধু।’

যোগেন চৌধুরীর প্রচ্ছদ নজর কাড়ে ।

আশ্রয় এক আশ্চর্য ঠাট্টা♣  দেবাশিস চন্দ ♣ আদম  ♣১২৫ টাকা

Close Menu