শ্রেষ্ঠ নয় সমগ্রের খোঁজে

।। কবিতা আশ্রম পরিবারে সকলকে স্বাগত।।"কবিতা আশ্রম একটি গুরুত্বপূর্ণ পত্রিকা। এই পত্রিকা থেকে তরুণদের কবিতা আর কবিতা-ভাবনা কোন পথে চলেছে তার এক রকমের চিহ্ন পাওয়া যায়।"--কবি জয় গোস্বামী ।। "তথাকথিত শিবিরের ধারণাকে ধ্বংস করে দিয়ে কবিতা আশ্রম এই সময়ের বাংলা কবিতার প্রচ্ছদ হয়ে উঠেছে। নানা মাত্রার , মার্গের , স্রোতের , ঘরানার এমন নিরভিমান উদযাপনের শরিক না হয়ে কেউ পারবেন না , এটা আমার বিশ্বাস ।"--সুমন গুণ ।। "কবিতা আশ্রম চমৎকার ম্যাগাজিন ।কখনও লিখিনি , এবার লিখতে পেরে ভালো লাগছে"--কবি মৃদুল দাশগুপ্ত।।"আমি কবিতা আশ্রম পত্রিকা পাই এবং আগ্রহ দিয়ে পড়ি । যে সকল কবিতা ও গদ্য প্রকাশিত হয় সে-সবই অত্যন্ত ভালো লেখা এবং সু-সম্পাদিত,যা আমার খুবই ভালো লাগে । এছাড়াও কবিতা আশ্রম পত্রিকাকে কেন্দ্র করে বেশ কিছু তরুণ কবি ও গদ্যকার আগামীর জন্যে তৈরী হয়ে উঠছে । তরুণ কবি ও গদ্যকার-দের প্রশয় দেওয়ার ক্ষেত্রে কবিতা আশ্রম পত্রিকাটি খুবই উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রেখেছে ।"--কবি দেবদাস আচার্য।।"প্রকৃত কবিতাকে জহুরির চোখে খুঁজে আনছে কবিতা আশ্রম। প্রচারের আড়ালে থাকা তরুণ কবি প্রতিভাকে পাঠকের সামনে নিয়ে আসার এই প্রয়াসকে কুর্নিশ জানাই ।"--কবি অঞ্জলি দাশ।।"দূরে গেলে কিছু জিনিস আবছা দেখায় । আরও দূরে গেলে কিছু জিনিস স্পস্ট হয়ে ওঠে । কবিতা আশ্রমকে আমি স্পস্ট দেখতে পাচ্ছি। যেভাবে আত্মত্যাগের মধ্যে দিয়ে মাথা তুলে কাগজটিকে ক্রমশ আইকনিক তুলছে সেটা একটা দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে ।"--কবি সুবোধ সরকার।। “কবিতা আশ্রম প্রকৃত অর্থেই বাংলা কবিতার লাইট হাউস ।তরুণ কবিদের খোঁজে আমি তাই প্রতিটি সংখ্যা পড়ি”।–রাহুল পুরকায়স্থ ।।“অচেনা নতুন কবিদের দিকে এখন তাকিয়ে থাকি।‘কবিতা আশ্রম’ এই সব কবিকে সামনে নিয়ে আসছে।এ একটা প্রশংসনীয় উদ্যোগ। এই জাতীয় উদ্যোগ বাংলা কবিতার ক্ষেত্রটিকে প্রসারিত করছে”।–কবি কালীকৃষ্ণ গুহ ।।“কবিতা আশ্রম আমার প্রিয় পত্রিকা । পড়ে এবং লিখে তৃপ্তি পাই। সারা বাংলার তরুণদের খুঁজে আনছে কবিতা আশ্রম”।–কবি সমর রায়চৌধুরী ।। "সব চেয়ে ভালবাসি নিজেকে কারণ সে লোকটার ভেতরে কবিতার আবাস । সেই নিজেকে দেখার জন্যে এক টুকরো আয়না খুঁজছিলাম বহুদিন । কোথাও পাইনি । কে জানতো একটি আশ্রমের ভেতর সেই টুকরোটুকু আমার জন্য অপেক্ষা করছে।"--দিশারী মুখোপাধ্যায় ।।

 

 

বর্ষা সংখ্যা ১৪২৬

 

কবিতা আশ্রম ।। ১৪ জুলাই ২০১৯

সূচিপত্র

 

কবিতা

নভেরা হোসেন,কার্তিক ঢক ,নাগসেন,উৎপল বন্দ্যোপাধ্যায় ,জয়দেব বাউরী,তমাল বন্দ্যোপাধ্যায়,মাসুদার রহমান,নিত্যানন্দ দত্ত,শাশ্বত কর,প্রশান্ত দত্ত,পলাশ দে,পলাশ গোস্বামী,ইশিতা দে সরকার,মণিশঙ্কর বিশ্বাস,সৌমিত বসু,রাজশ্রী বন্দ্যোপাধ্যায়,কমলেশ কুমার,প্রবীর দাস,সৌমাল্য গড়াই,জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়,বঙ্কিম কুমার বর্মন,অঞ্জন দাস,সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায়,শ্যামাপদ মালাকার,প্রিয়ব্রত দত্ত

সাক্ষাৎকার

কবিতা মূর্ছনার দিকে চলে যাক–মলয় গোস্বামী

প্রবন্ধ

আমি অপেক্ষা করছিলাম–সুদীপ বসু

আগুনের গোলা , নীলকণ্ঠ পাখি–উত্তম দত্ত

ধারাবাহিক উপন্যাস

লোহার—মণিশঙ্কর

বই উৎসব

মন খারাপের গন্ধ আর নিরাময়–পাঠক  সেনগুপ্ত

পথের কবিতা

জড়িয়ে ধরে কাঁদব–জয়দীপ রায়

সবুজ ধারাবাহিক

সবুজ ধারাবাহিক

 

 

………………………………………………………………………………………………………………………………………………………..

কথা

এক পশলা বৃষ্টি শেষে , ঝিঁঝিঁদের ডাক যেন মহাপয়ার ! বিশ্বপ্রকৃতির টানে নেমে আসে কবিতাঘোর  । কবিতা তো কিছু না-পাওয়ার নেশা । একটা কবিতা শুরু থেকে শেষ যেন একটি জীবনকাল … মৃত্যু থেকে এসে মৃত্যুতে মিশে যায় । সবাই জানি এরকম । সবাই ভুলেও থাকি বেমালুম । না হলে যে ভয় ঘিরে ধরে ।  সত্যকে মোকাবিলা করার ভয় । আমরা বলি , ভয় থাকুক । ভয় জাগিয়ে রাখুক আমাদের । জীবন মিথ্যা বলেই শিল্প অধিক মিথ্যা হয়ে উঠতে চায় । এতদূর মিথ্যা যে তার চেয়ে সত্য যেন আর হয় না । দর্শন যখন এসব বলে , তখন বৃষ্টি নামে আবার … বীজ আকুল হয় … ভিজতে ভিজতে মানুষ হয়ে ওঠে অবোধ প্রাণী ।

……………………………………………………………………………………………………………………………………………………

নভেরা হোসেন

মুখোশ

 

শো শো বাতাস বইছে । সারাদিনের কড়া রোদের পর চারদিক থেকে ঝড়ো হাওয়া ছুটে এল। শাহবাগের রোড -লাইটগুলো জ্বলতে শুরু করেছে, পাবলিক লাইব্রেরিতে অনেক লোক, তাদের চোখে -মুখে আনন্দ চিহ্ন, মুখে উৎসবের রং মেখে ঘুরছে সবাই। তুমি কাউকে চিনতে পারছ না, সবার মুখে একই ধরণের মুখোশ, হলুদের মধ্যে কালো ডোরাকাটা, মাথায় ময়ুরের পালক আর সকলের কোমর থেকে নীচ অব্দি সজারুর কাঁটার মতো গাঁথা । একজন মুখোশওয়ালা তোমার পিছন পিছন ঘুরছে, তার পিছনে আরেকজন, তার পেছনে আরেকজন । পুরো এলাকা জুড়ে ঘন বর্ষণ শুরু হল, সকলের মুখের রং ধুয়ে যাচ্ছে, গা থেকে খসে পড়ছে সজারুর কাঁটা ।তুমি চোখ ঢেকে দৌড়ে চলে এলে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত অডিটোরিয়ামে । স্ক্রিনের পুরোটা জুড়ে পুরানো আমলের বেনারসি শাড়ি । তোমার হাত ধরে বসে আছে অশোকনগরের ছেলে । একটা মৃদু সুগন্ধ। তোমরা জলে ভাসছ, চারদিকে নীল -পদ্ম , আমাজান লিলি, শালুক । একটা নাচের ঘূর্ণন জলে, ফরাসি চিত্রকর লা  দু মালের পেইন্টিং শোভা পাচ্ছে জলের ফ্রেমে ।

 

কার্নিভোরাস

কেফসির ঠান্ডা ঘরে

স্তূপ কড়া চিকেনের সারি

তুমি সাঁতার  কাটছ চিকেনের সাগরে

নতুন নতুন ডিশ

কন্টিনেন্টালের স্বাদই আলাদা

একটু তেল , একটু ঝাল

যে বছর রিয়াদ থেকে ফিরলে

তখন ঢাকায় এতো ফুড -কোর্ট হয়নি

খাবার  বলতে চায়নিজ  সি চুয়ান , থাই

মোগলাই খাবার , দেশি মিষ্টি

কাঁচাগোল্লা , বালিশ মিষ্টি ,চিনিপাতা দই

চিকেনের সমুদ্র থেকে জেগে উঠে তুমি একদম বড় রাস্তায়

সেখানে হাজার হাজার দোকান

গরুর চাপ , চটপটি , ফুচকা , ফ্রেঞ্চ ফ্ৰাই

লোকজন পাগলের মতো খাচ্ছে

যেন এখনই না খেলে সব শেষ হয়ে যাবে

কেফসির বাকেট নিয়ে

একাই শেষ করছে একজন

এসবেও স্বাদ না মিটলে চাকমাদের কুড়া গুইদা , ফিশ  কেবাং

কালা চাঁদা, টেক চাঁদা খেতে সেন্টমার্টিন

তুমিও হয়ে উঠেছ কার্নিভোরাস

খেতে খেতে একসময় নিজের

লেজটাকেও খেয়ে ফেললে অকস্মাৎ

 

পপিক্ষেত

সারি সারি পপি ক্ষেত

তার মাঝ দিয়ে চলে গেছে সরু পথ

তোমার যাবার একটাই জায়গা

সেখানে সবাই যাচ্ছে

কেউ দেরিতে কেউ অতি দ্রুত

লম্বা পপির ডগায় লাল ফুল হাসছে

একটা কালো ছিটের ঘুঘু উড়ে বেড়াচ্ছে আকাশে

ঝকঝকে আকাশে উজ্জ্বল আলো

কৃষকরা ট্রাক্টর দিয়ে মই দিচ্ছে

দূরে উঁচু পাহাড় –

সেখানে গুঞ্জার ফুল মাথায় কপোত -কপোতী

চর্যাপদের কানহুপা নদীকূলে অপেক্ষমান

পপিক্ষেতে ভরে গেছে সমস্ত আকাশ

তুমিও উড়াল দিলে শূন্য খাঁচা ছেড়ে

 

কার্তিক ঢক্

মহা-জীবনের ঘোড়া

 

নদীটি শুকিয়ে যাবে বলে

দু’চোখে সারাদিন সমুদ্রকে ফেলেছে!

হয়তো, মহা-জীবনের ঘোড়ার পায়ের শব্দ

শুনেছে সে ঠান্ডা বালিয়াড়িতে …

 

এমনই এক আগুন যখন ছেঁকা দ্যায়

বুকের গভীরে –

থরথর কেঁপে ওঠে গাছ।

 

অথচ, প্রতিটি মৃত্যুই মেনে নিতে হয়

এর ভিতরে কোনও নাস্তিকতা নেই !

 

তবু আমার মাটির ভিতরে কম্পন

শাখা-প্রশাখাকে ফেলে যাওয়ার শব্দে

যে গোধূলি আসে, তাকে কী দুঃস্বপ্ন বলে !

যন্ত্রণা বলে ? শ্বাশত মৌনতা বলে…

 

 

 

নাগসেন

ভেবেছিলাম

 

ভেবেছিলাম জীবনটাকে উলটেপালটে দেখে নিয়ে

একদিন ঠিক চলে যাব

বানপ্রস্থে অথবা সন্ন্যাসে

তা আর হল কই

যতসব আস্তাকুঁড় থেকে উঠে আসা স্বজনেরা

পথ আটকে বলে কোথায় যাবি

তোর দেখার বাকী এখনও অনেক

ঘরে ফিরে গুছিয়ে রাখি লোটা ও কম্বল

 

ভেবেছিলাম জীবনটাকে উলটেপালটে দেখে নিয়ে

একদিন ঠিক চলে যাব

সবাই বলবে আহা রে চলে গেল অসময়ে

আর আমি স্বাতীনক্ষত্রের অপার সমুদ্র থেকে

সে সব দেখব একা এক পরাঙ্মুখ পীর

 

এসব হতে দিল না এক শয়তানী

এসব হতে দিল না এক অন্ধ জলপরী

 

উৎপল বন্দ্যোপাধ্যায়

 

পাতাফুটকি

 

পাতাফুটকি পাখিটির মতো নীচু ঝোপে থাকি

পাশে দিঘিজলে বিছানো বর্ণমালা

কবিতা হওয়ার আগেই ছিঁড়ে খায় হিংস্র করোটিয়া

শরতে কুচক্কুরে মেঘেরও অভাব নেই

তুই ভিজতে গেলেই রোদ উঠবে

 

দোয়েল তুই মগডালেই থাক

সামনে গ্রীষ্মে শুনব তোর সুরের মূর্ছনা

 

 

 

জয়দেব বাউরী

 

উপেক্ষাগুচ্ছ

 

আকুল দেহাতি সন্ধ্যা, তার উৎস, ক্ষীণতর স্রোত

দুহাতে কুড়োবে বলে আজ যদি খুঁজে খুঁজে মরো,

যদি স্মৃতিলালা ধরে পড়িমরি পথ, মুছে যাবে,

মুছে মুছে যাবে চোখ । কেননা, সমস্ত চিহ্ন, তুচ্ছ

 

তুচ্ছতার জন্মরেখা মিশে গেছে মাটিতে আকাশে

নিশ্চিহ্ন জ্বরের ঘোর আজ তবে কাকে ভালোবাসে!

 

না,আমার অর্থ নেই। ধোঁয়াশা টিলার শীর্ষে,তার

খাঁজে ভাঁজে ঘুরে মরা এক নিঃস্ব প্রজাতির মেঘ।

অরণ্যে রোদন লেগে যার, শিলা আর বজ্রগুলি

আমন মাটিতে গেঁথে ফেরেনি এখনো । মৃত আলো

 

জমে গিয়ে দিকশূন্যে এঁকে বেঁকে কোথায় হারানো।

তুমি যদি পাঠ করে পুনর্বার ফিরে আসো ; থামো –

তবে এই মুষ্টি ভিক্ষা, তবে এই মনযোগ থেকে

অনন্য একটি শ্রী  ফুটে উঠে নিমেষে মিলাবে ।

 

এই যে আদিম বৃক্ষে এতকাল মুখ গুঁজে আছি।

তার ধ্বনি কতদূর ছড়িয়েছে দেহাত শরীরে

অস্থির সবুজ কই, ভাবে অঙ্গ জ্বরজ্বর নীল ।

তাই এত শীতকাল, গোটানো ভ্রমণ, খামে ঘুম!

 

লতা গুল্মে ঢেকে যাই সেই মধু মর্মরের খোঁজে

আলোর নিষেধ নেই। আসতে পারে, নিজের গরজে।

 

যে লেখার জন্য এই পথ চেয়ে পথে পথে হাঁটা

উদাসীন রাত্রিতল, নিঃস্ব দুই হাত পেতে চোখ

অন্ধকারে নেমে গিয়ে কত দূর কত দূর একা।

দেহভিটে ক্ষয়ে আসে, লেখার বদলে মাটি, উই…

 

অন্তরীক্ষ, পাতালে যে দৃশ্যাতীত  অণু অণু অণু

উচ্ছন্ন খিদেই তাকে দৃশ্যমান, করে দিতে পারে !

মাটির আকাঙ্ক্ষা  ধ্বনি তলানির স্পর্শে  গিয়ে ধীরে

এসব শোনালো যেই, খিদেটির পূর্বদিক লাল!

 

এসো খিদে এসো খিদে নিখোঁজের দিকে চলো শিরা

লেখা তবে তথাগত, তপোবন, নীলাচলে গোরা!

 

 

 

 

 

তমাল বন্দ্যোপাধ্যায়

বন্দিশ

 

গোপন প্রযত্নে আছি। আছি এক ছায়াকণিকায়।

বিভিন্ন আলোয় নত, জলের অভ্যাসে চিরদিন…

জেনেছি তীর্যক ভাষা, বেদনার কাছে বসে থেকে,

সমস্ত শব্দের কাছে আমার রয়েছে কিছু ঋণ।

২.

নিজেকে রেখেছি যেন গোপনের কোন শবদেহ।

আর এই শমিবৃক্ষ, আর এই শ্মশানপুটুলি…

সবাই এড়িয়ে গেলে ভেঙে পড়া একান্তে নিজের

সমস্ত মৃত্যু ও রক্ত অস্ত্রের সম্মুখে বসে খুলি।

৩.

অদূর বাড়িটি চেনো? জানো, ওর ভিতরে-ভিতরে

রয়েছে কীসের স্মৃতি? … ভুলে যেতে কীভাবে বা পারি ?

নানান গোপন খুলে সে দাঁড়ায় প্রত্যেক স্মৃতিতে

বলে, এসো, দ্বার খোলা… ডেকেছে তোমার জ্যোৎস্নাবাড়ি…

 

৪.

বিভিন্ন ব্যাথার কাছে মুহূর্ত সাজিয়ে বসে থাকি।

হে মুগ্ধরাগিনীশব্দ! অপেক্ষাই আমার কাহিনি।

মুখর কান্নার নীচে যত শব্দ, যত লেখালেখি…

সে ক্ষত আজন্ম জ্বলে, তাকে কেন নেভাতে পারিনি!

৫.

তোমার কারণে আছি। এই অস্তি দ্বিধাভারানত।

তোমার ছায়ায় আজ যেরকম অতিথিসাধন,

আমার সামান্য নিয়ে ও পুরুষ! তোমার যে আলো —

তার এই নিম্ববৃক্ষ। তার এই নম্রবৃন্দাবন…

৬.

উঠেছি প্রত্যুষ দেখে, উঠেছি এ জলস্তন্যঘ্রাণে,

কেবল এ কুশাসন, ছড়ানো মৃত্যুর নিরুপায়

ডাকে সব বাঁধ ভেঙে। হে আচার্য, আমি পরাহত…

আর এই শস্যরোদ — দেখুন, কেমন ভেসে যায়…

৭.

আমাকে নির্দেশ দিন। আমি এই ধান্যপিপাসাকে

দেখেছি নিমেষমুক্ত। পিপাসার অপেক্ষাআলোক।

আমাকে বিশ্বাস দিন, হে আচার্য, আমি অন্ধপ্রায়।

 

— জলস্রোত থেমে গেছে। উঠে এস, প্রিয় উদ্দালক।

 

 

মাসুদার রহমান

 

ছাগল

 

এক ছাগলছানা আমার আঙুলে মুখ রেখে চুষতে থাকল

 

সে কী তার মায়ের স্তন ভেবে আমার আঙুল চুষছে!

 

আমিও ধীরে ধীরে মা-ছাগল হয়ে উঠছি। ডেকে উঠছি, ব্যা করে

 

তারপর সতর্ক, তাকাচ্ছি এদিক ওদিক

লোকজন শুনে ফেলল কী আমার মা-ছাগল হয়ে উঠবার ডাক

 

কাক তাড়ুয়া

 

গমখেতের কাকতারুয়া নড়ে উঠল হঠাৎ

দূর থেকে জিজ্ঞেস করল-

ভরা পূর্ণিমার রাতে বিজন মাঠের পথে কই যাও খোকা?

 

প্রশ্নের উত্তরে সব বলে গেলাম

উত্তর পাওয়ার পর আবার প্রশ্ন করল, আমি সব বলে গেলাম

 

শেষে সে বলল- খোকা, সাবধানে যেও। সামনে নদী, পারাপারে নৌকা নেই।
শীতকালে নদীতে খুব জল নেই যদিও

তবু কাপড় ভিজবে। ভাটিতেই বাঁধ… বাঁধ ধরে নদী পাড়ি দিও

 

ঘাটে এসে দেখি সত্যি পারাপার নেই, বাঁধ ধরে নদী পার হচ্ছি

 

ডাকবাক্স

 

অশত্থগাছের ডালে ডাকবাক্স, কেউ আর চিঠিও লেখে না!

এখন অভ্যস্ত কুরিয়ার ডাক। ফোন। নেটে।

 

এ গাঁয়ের দস্যি ছেলেটি জং-ধরা তালা ভেঙে ভেতরে না দেখলে

কেউ জানতেও পেত না- পরিত্যাক্ত ডাকবাক্সে

এক গোখরো সাপ ডিম ফুটে ছানাপোনা সহ বেশ সংসার পেতেছে

 

 

নিত্যানন্দ দত্ত

ভাঙন

 

নিবিড় শস্যের ভেতর হেঁটে যায় মাধুকরী হাওয়া …

জমিকে দ্বিখণ্ড করে অপরাধী আলপথ শুয়ে থাকে একা

ধানের শরীর থেকে জলজ সুঘ্রাণ উড়ে যায় কৃষকের গৃহে

 

চাষী বউয়ের শ্রান্ত দেহে গর্ভস্থ ভ্রুনের মতো সম্ভাবনা ঘুমায়,
ভাতের সুগন্ধ মেখে উনুনের পাশে তৃপ্ত বাসন ঘুমায়,
উঠোনের মাচায় যৌবনবতী লাউ… ঘুমায়

এইসব সুনিশ্চিত ঘুমের পাশে জেগে থাকে একলা কৃষক…

 

তার বিষণ্ণ চোখ অনন্ত শূন্যের দিকে চেয়ে দেখে
কীভাবে ধূসর মেঘের মতো ক্ষুধা গ্রাস করে আদিগন্ত ক্ষেত…

 

একাকি নৌকোকে অনিশ্চয় করে নদীটিও ভেসেছে সুদূর…

ওপারে শৈশব গন্ধ রেখে এপারের কিশোরী বধূটি শিশুকে হাওয়ার গল্প শোনায়

উঠোনে ছড়ানো শস্য খুঁটে খায় গৃহস্থ চড়ুই

দরোজার পাশে ক্ষুধার্ত ঘাস অস্থির হাওয়ায় কাঁপে …

 

বাঁশবনের বিজন ছায়ায় দোকান দিয়েছে এ বাড়ির নীরিহ পুরুষ

কাঠের উনুনে তার হৃদয় পুড়ে পুড়ে মরে…

বাঁশের বেঞ্চে বসে গ্রাম্য মানুষ তা দেখে, কাঁচের বয়ামে শুয়ে লুব্ধ বিস্কুট তা দেখে…

গাছের শেকড়ে নিরন্তর ঝাঁপ দেয় ক্ষুধাতুর জল

 

মাটির পায়ের থেকে এভাবেই অজান্তে সরে যায় মাটি…

 

 

শাশ্বত কর

সনাতন

অরণ্যে জমে আছে ভাষা।

জমে আছে মেঘ, মেঘলা প্রদেশ।

 

হলুদের পাতা ঝরে। মরা কথা খুচরো পয়সার মতো উড়ে উড়ে যায়,

কথার পচন শেষে সারটুকু জমা হয় শিকড়ের দেশে-

সেখানে গাছের আর নাম লেখা নেই।

 

আরও কিছু অভিমান দিতে পারো তুমি?

দিতে পারো অশ্রুজল, তুমুল দহন?

মেঘের আধারে ছুপে বিন্দু বিন্দু রস

যদি প্রাণ হতে চায়

এসময়ে বেঁচে থাকা শীর্ণ কোন ধানের চারায়,

দিতে পারো প্রত্যাঘাত? উষ্ণতম দিন?

 

আহা যুবতী ধানের শিষ! আহা প্রাজ্ঞ ধানের বীজ!

 

অরণ্যে জমে থাকা ভাষা

নবান্নের স্বপ্ন মেখে নামে

নেমে আসে মেঘে মেঘে গাঢ় অভিলাষ

চূর্ণ জলের ভিড়ে কথার জোছনায় ঢেউ ওঠে মানব সাগরে

 

বুকে ধরে সম্মিলিত ওম সুবাসিত ভাত আসে ক্ষুধার্ত থালে।

 

কবিতা

 

কতকাল মুখ ফিরে আছি।

সময়ের শুষ্ক পাতা

জমে আছে। হেমন্তদিন।

 

অনন্ত নাইয়ার কাছে সঁপে দিনু কাঙাল পরাণ

কে জানে কোথায় ডাঙা! ভাঙা তরী হাসনের গান।

 

সু্নির্মল চোখ তার তীব্রতম তারা

অথচ লোকাল ট্রেন মেঘ হয়ে বলে:

ভাল আছ? কতদিন দেখি না তোমায়!

কোথায় মজুরি পাও? কী বা কাজ করো আজকাল?

গাঙের চোখের জলে নেমে উঠে প্রশ্ন ভেসে যায়…

 

কতকাল মুখফিরে আছি

না হয় অশ্রুজল শুষে নিল উপেক্ষার কানা

তা বলে কি প্রেম আর দেবে না আমায়!

 

প্রশান্ত দত্ত

তোমার যুদ্ধ

 

ধরো তুমি যুদ্ধে নেমেছ। ধরো তুমি কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে পাণ্ডব পক্ষে। রণক্ষেত্রে সারি সারি রথ । পেছনে না প‍‌সন্দ হাজার চোখ। মহাকাব্যিক যুদ্ধে তোমার ভূমিকা একটু  সতী-সতী। সঞ্জয়ের দিব্যদৃষ্টির সম্মোহন। তবু গদা হাতে ভীমের আস্ফালন তোমার ভাল লাগছে না।  ধর্মপুত্র  যুধিষ্ঠিরের অশ্বথামা  হত ইতি …তোমায় উদ্দীপ্ত করতে ব্যর্থ। পিতামহ ভীষ্মের  আটান্ন দিনের শরশয্যা তোমার কাছে  ব্রেকিং নিউজ। তাই তোমার অ্যাটিটিউড পরিবর্তনশীল। কর্ণের রথের চাকা মাটিতে প্রবেশ তোমায় কোমায় নিয়ে যাবে। তাই স্মরণীয় যুদ্ধের মাঝপথে তুমি ঐতিহাসিক ভূমিকা নেবে। তোমার  পদযুগলের নিষ্ক্রমণ। স্মরণীয় যুদ্ধ ছেড়ে তুমি গোত্রহীন। তোমার স্টিয়ারিং  ১০ নং জনপথ ছাড়িয়ে গঙ্গামুখী…

 

 

 

পলাশ গোস্বামী

করুণাঘন: বন্ধন

সুজাতার মতো মেঘ, নাছোড়, বিকেলে ছায়া ফ্যালে;

বাঁধানো মাটির ধারি নিচু জানালা গল্পে মাতোয়ারা।

করুণার এই ছায়া-আলো মনে হয় পায়েসের বাটি হাতে

চাইছে সঞ্জীবনী মন্ত্র; গৃহস্থবায়না ছেড়ে দিয়ে

বাতাস লাবণ্যময়, তবু, সুজাতার মতো মেঘ,

মৃত স্নেহে আগলে রাখে মোহ মায়া বাঁধনের ছল…

 

 

কমলেশ কুমার

অভিমান

 

এ যেন বিদ্যুৎপৃষ্ট দীর্ঘ কঠিন পথ

নিরুদ্বেগ পড়ে আছে অনন্ত মহাকালের দিকে,

কালো ময়াল সাপের মতো পিচের রাস্তাটি

পুবে-পশ্চিমে পাক খেতে খেতে পৌঁছে গিয়েছে

চাঁদের কিনারে।

এই পথের পাশেই একদিন গড়ে উঠেছিল

সবুজ মাঠ, ধানখেত, মৃত নাবিকের

একচিলতে কাঁটাতারের সংসার,

এই পথের বাঁকেই একদিন সামবেদ থেকে

উঠে এসেছিল আমাদের যত ছেঁড়াখোঁড়া গান,

নোঙর ফেলেছিল কেউ গাঙুরের তীরে!

আজও বসন্ত এলে পথ যেন ফিরে পায়

এক অনির্দেশ গনগনে রোদের আঁচ

পাখপাখালিরা ডেকে ওঠে গাছেগাছে

ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া মহেঞ্জোদাড়ো সভ্যতা জুড়ে

রক্তের মতো শুধু জেগে থাকে

গোছা-গোছা শিমুল ফুল!

 

 

 

ঈশিতা দে সরকার

প্রেমিক

মায়ের ছাপা শাড়িটা পড়েছে কালজানি নদী।
চা পাতায় বন্ধ কারাখানার ধুলো।
আকাশ তবু বইয়ের বাইরে ভূগোল ;
সদ্য লিখতে শেখা পড়ুয়া হাতের তালুতে কিছু একটা আঁকছে…
এই কিছু একটা হ্যামিল্টনগঞ্জ ষ্টেশন।
একটা চড়ুইপাখি; একটা হারিয়ে যাওয়া খেলনার বাক্স।
ঢাকনায় পুরু ভাগশেষ; অপ্রকাশিত কবিতার মায়া..
একচালা ঘর; টিপের মত চায়ের দোকান; দুটো লাল সিমেন্টের থান;
আসবাব বলতে এটুকুই…
দূর পাল্লার ট্রেন এখানে নিঃশব্দে গদ্য লেখে।
ট্রেন ছেড়ে গেলে গদ্যে স্পষ্ট হয় ভুলে যাওয়া নামের প্রথম অক্ষর;
ভেসে যাওয়া রান্না ঘরের সাল – মাস।
লাল থানে শরীর ঢেলে দিই; নিঃস্ব দুপুরে শিরীর তুমুল হয়;
ষ্টেশন মাষ্টার ফ্যান চালিয়ে দিলে স্বেদবিন্দু
হাঁটা দেয় চুঁয়াপাড়া চা বাগানের দিকে।
বৃষ্টি নামার আগে পিঠ বুঝে নেবে ঝুড়ির উপস্থিতি।
জারুলের ডালে বসা দোতারার রেওয়াজ শুনছি;
“দিনে দিনে দিন চলে যায়; বেলা বেশি নাই “..
বিজয় সরকার স্নান সারতে বলছে।
স্নানের সাথে ধুয়ে যাচ্ছে গোপন ইস্তেহার।
এমন নিঝুম ইশারা কোন প্রেমিকের চোখে ছিল না..
স্টেশন হ্যামিল্টন গঞ্জ;
একা রাঁধছ; টিফিন তুলে দিচ্ছ হুইশেলে।
৩৪ নম্বর জাতীয় সড়কের ধার ঘেঁষে গোলামির ফাইল গোছাচ্ছি…
আমি…

পলাশ দে

ডাক

 

প্রাণ ধরো প্রাণ ধরে রাখো প্রাণ অস্থির

রাস্তা ঠেলে ফুটপাত সরিয়ে ঘুমে ভেঙে চোখ

স্বীকারে পৌঁছাব

 

বিস্ময় ফেরানোর দরকার নেই তার আগে

প্রয়োজন নেই আঘাতে আঘাতে পাখি খুলে

সেই জানলা খোঁজা … ডানায় হরবোলা আর

উদাসীনের সেই প্রথম

পরিযায়ী পরিযায়ী বলে দূরবীন ছুটবে এরপর

 

জান বাঁধো বাঁধো জান কবুল করো খোয়াব

 

একবেলা ভাত পাবে মীনচাষি

একঘুম সন্দেহ

পূর্ব পুরুষের মিলনে ফেটে যাওয়া মাটিতে

এক শিরিষ গাছ উপড়ে ইটভাটা তৈরি হবে

 

আকাশ ছোট হতে হতে গ্রাম ফুরোতে

ফুরোতে

খেলনাবাটি হারাতে হারাতে

ভয় লাগে, শিহরণ নেই কোথাও

এমনকি নিশিও কেমন বড় হয়ে গেছে

ডাকে না

 

 

প্রাপ্তবয়স্ক

 

 

সহ্য কী প্রাপ্তবয়স্ক হল দিলদার?

 

তবু, রাখি। পুকুর বুঁজিয়ে ফ্ল্যাট হয়ে যাওয়া গেরস্থালির তলায়

বৃক্ষ কেটে কেটে রাস্তা চওড়া পিচের দেহে

ফাঁকা গঙ্গাধারে গৌরনিতাই সংকীর্তন দলের হাসিকান্না

আর যখন বিকেল খতম হয়ে এসে আদর করে অন্ধকে?

সাইকেল নিজের বুকে তুলে নিয়ে যায় গোধূলির বাঁট

সেই একজন আকাশ আর মাটির মাঝখানে
খুঁজতে থাকে কোন বৃক্ষ অক্সিজেন দিচ্ছে তোমাকে

 

শ্বাস কী প্রাপ্তবয়স্ক হচ্ছে, দিলদার!

দম ধরে থাকি তবু

হেইয়ো হেইইইয়ো সুর একবার ঠিক পৌঁছে যাবে তোমার অবহেলায়

 

 

উপায়

 

তোমাকে বিশ্বাস করা ছাড়া উপায় নেই

ঘাম কখন শিল্প হয়ে উঠবে আচমকা দ্যাখা হলে

বৃষ্টিতে হেলান দিয়ে থাকি

আর তোমার দেহে কাশ্মীর ফুটে ফুটে ওঠে

কী যে কুয়াশা কীরকম আনচান কুচকাওয়াজ

জারুল ফুল চিৎকার করতে করতে পলাশ ছুঁয়ে ফেলছে

 

আস্বাদ করা ছাড়া তোমাকে উপায় নেই আমার

১৪৪ ধারাপাত ভেঙে পড়ে জন্মদিনে

একহাতে বসত অন্যহাতে আকাশ মুঠো করে চলি

 

কন্যার খোসা ছাড়িয়ে রাখি

পুত্রের বয়ঃসন্ধি রক্তদান শিবিরে ছুটে যাচ্ছে

মাবাবাপতাকা মাবাবাপতাকা

 

পাল্টামার ছাড়া উপায় নেই কোনও

 

 

ভোলামন

 

ভোলামনের নিরুদ্দেশ মনে আছে?

এক ধরনের শব্দ করত আর ঠোঁটের ভেতর পাখি ঢুকে যেত

আকাশ নামতে পারবে না বলে মেঘ বাজিয়ে বাজিয়ে

বুনো তেঁতুল গাছ ছুঁয়ে ঝরঝর

 

সেবার কি ভিজেছিলে তুমি! ভিজিয়েছিলে?

তিনফসলী মাটি ভেঙে রাস্তা ছুটল আত্মহননে

ভোলামনকে ঘিরে তখন ধর্নাপৃথিবী

 

তুমি রসকলি গাঁথছিলে

তুমি  কাঁপছিলে … চিরহরিৎ

 

লালশাকের ক্ষেতে মিশে গেল তোমার ভুখাপেটের বাচ্চা

সব রস মিলেমিশে কেমন নার্সিং হোম রমরমা

 

ভোলামনের চোখে শান্তি আর হাহাকার মনে আছে!

সেইসময় এমনকি সেই স্খলনের মুহূর্তেও

কাক ও কোকিল একসঙ্গে বাসা বাঁধছিল

মাথাপেটপাঁজরজঙ্ঘাকাঁটাতার

 

আর, ভোলামনের সহ্য … সহ্য

 

 

মণিশঙ্কর বিশ্বাস

প্রেমিকা

 

রাত্রি তার স্পর্শ করেছে আঙুল

যেন গাছ প্রণাম করেছে ঝুঁকে—

ভালোবেসে শাখা ছুঁয়েছে ধুলোকে

আর জ্যোৎস্নায় ভিজে গেছে চুল।

 

 

শিশমহল

 

যে কোনও লেখার আগে তোমাকেই মনে পড়ে।

 

দীর্ঘ এক পথ, যার একদিকে গোরস্থান—

অন্য দিকে মেঘলা আকাশ, অল্প কিছু চাঁদতারা —

তঞ্চকতার মতো ফুটে আছে ঘাসফুল, ব্যবহৃত বেলুন—

সরল মানুষ গ্রামদেশে, ব্যাবহার জানে না তাদের—

সারাদিন দৈত্যাকার মাকড়সা এক সূর্য, তাদের মাথার ’পরে—

সেও জানে কখন কোথায় চলে যেতে হবে—

ফলে এই রাত্রি— আঞ্চলিক মহাফেজখানা—

আমি তার একান্ত প্রহরী—

 

যেন বৃদ্ধ বটগাছ, মাথার ভিতর

নীল অসংখ্য জোনাকি

এলোমেলো

তীব্র গতিময় আর

আজও অমীমাংসিত

 

 

ফুলবনে

 

তোমাকে মনে না রেখে, তোমার প্রণয়টুকু

তুলে রাখি গানে—

যদি হই স্মৃতিভ্রষ্ট

তবুও সে রয়ে যাবে অন্য কোনওখানে।

 

দূরে স্থলপদ্মবনে, ঘাসের উপর

কলাপাতায় রাখা শেফালির মতো মেয়েটির পা’য়ে

একফোঁটা শিশিরের জল হয়ে—

 

নুপুরের নীল ব্যথাবেদনার সুখে

ফিরে যাব ঘাসের নীলাভ দেহে,

সুবাসিত স্তনে

ফিরে যাব বাতাসের বুকে

অথবা পাতার ’পরে ঝরা-শেফালির মনে।

 

তবু-তো সে রয়ে যাবে অন্য কোনও গানে।

 

 

 

 

 

 

সৌমিত বসু

তালু, যা ফেটে অগ্নি

তিনি আমাদের আগুন জ্বালতে শিখিয়েছিলেন

আমরা রাস্তার ডান দিক ধরে হাঁটলে তিনি বলতেন বাঁ দিকে সরে আসতে

তখন জঙ্গলের ভেতর বাস করত আমার মামাতো ভায়েরা

প্রতিবার দোলের দিন তারা রাস্তায় হাতি ছেড়ে দিত, আর

ফুলপাতার ভেতর দিয়ে যেতে যেতে আমাদের সারা গা রঙিন হয়ে উঠত

আমরা ভাবতাম, এই বুঝি ঈশ্বরের বাড়ির কাছাকাছি এসে পৌঁছালাম

এই বুঝি পথ পা হড়কে আবিস্কার করে ফেলল চেনা গলি।

 

ছোটবেলা থেকে আমরা তেমন লেখাপড়া শিখিনি, নামতাও শিখিনি

কাকের ডাক শুনে আমাদের অক্ষর চিনতে শেখা

জলপ্রপাতের ওপর বাঁশপাতা সাঁকো আমাদের ভূগোল বই

শুধু কুয়োর মধ্যে কোনও প্রাণী পড়ে গেলে আমরা স্মরণ করতাম

গর্ভের আঁধার

সেখানে তিনি আমাদের বিশ্রামের জন্যে পেতে রাখতেন শীতলপাটি

আমরা ঘুমিয়ে পড়লে কানের ভেতর ঢুকিয়ে দিতেন গরম আগুন

আর ভেতরে ভেতরে তৈরী হতে থাকত এক একটি একান্নবর্তী সিনেমা

যার কার্ণিশে পা রেখে আমাদের গাছ থেকে নামিয়ে নিয়ে যেতেন

আকাশফুঁড়ে জেগে ওঠা অপদেবতারা,

আমরাও কোলে চেপে পার হয়ে যেতাম দিগন্তবলয়।

 

আমরা রোজ না মরলেও মাঝে মাঝে মরে যাই

তিনি কখনও কখনও ঘাসের ওপর বসে আমাদের বেঁচে থাকার উপদেশ দিতেন।

 

 

রাজশ্রী বন্দ্যোপাধ্যায়

ঈশ্বরী

 

তোমার কপালের টিপে পৃথিবী বিশ্রাম নেয়৷ গেরুয়া উঠোন মন্দির হয়ে ওঠে, তোমার আসা যাওয়ার পথে, সুখ বেড়ে দিয়েছ, যন্ত্রণায় আবক্ষ ভরে নিয়েছ নিজের৷ তুমি স্বাতীর জল হয়ে ঝরে পড়েছ বিদ্ধস্ত শরীর ও মনে৷ যতবার আগুন লেগেছে, তুমি জাহ্নবী হয়ে উঠেছ ৷ পোড়া মাটি দিয়ে এক একটা বেদি বানিয়ে পুঁতে দিয়েছ সম্ভাবনার বীজ ৷ আক্ষেপের সুরগুলো আমায় স্পর্শ করার আগে তুমি তাদের গোধূলির বাঁকে রেখে আসো ৷ তোমার বুকের ভেতর থেকে একটা নদী বেড়িয়ে এসে আমাকে সভ্যতার গল্প শোনায় ৷ তোমার মুখের ভেতর থেকে বেড়িয়ে আসা অসংখ্য শ্লোক তোমাকে ঈশ্বরী করে তোলে ৷

 

 

প্রবীর দাস

বৃক্ষরোপণ

রবীন্দ্রনাথকে বুকে ধরে এ কথা সে কথা—
বুঝি বা আকাশে ভেঙেছে তখন ভয়ঙ্কর মেঘ
বিচিত্র ছাদ ফুটো হয় হয় আর কি
সিংহসদনের এপাশ ওপাশে তখনও কবিতা
এক একটি পঙক্তি জুড়ে গভীরতর কথা …

তারপর বৃষ্টিধারায় ধুয়ে গেল পদচিহ্ন যত
ফেসবুক প্রোফাইল খুঁজে সেইসব ছবি
যত দেখি তত বেশি ভিজে যাই, অনুভূতি সার—
মনে হয় শেষ হয়ে যাই প্রতিদিন
মনে হয় ফিরে ফিরে আসি ছোটো ছোটো দুঃখ ও সুখে
মনে হয় এসে গেল বৃক্ষরোপণের মাস …

কোত্থাও কোনও এক দিনে ফিরে আসা হবে ?
অনন্ত তেষ্টা নিয়ে সেইসব দুর্লভ প্রেমে !

 

 

 

 

 

 

সৌমাল্য গড়াই

জন্মান্তর

 

নক্ষত্রের দিকে তাকালে মনে হয়  অন্ধকার সমুদ্রে আটকে থাকা বাতিঘর —
পূর্বজন্মের আলো নিয়ে বসে আছে আকাশের সন্ধ্যাগৃহে।
ওইখানে বিদেহীরা হ্যারিকেনের আলোয় বিষণ্ণ হলুদ পৃথিবীকে দ্যাখে,
নিয়নের নীল আলোয় কেমন নিথর

 

পোকামাকড় আর আধখাওয়া খেজুরের মাঝখানে

মৃত মাতামহকে দেখতে পাই। বসে-বসে বাল্যকাল গণনা করে। ছড়া কাটে, জিন-পরীর গুজব ছড়ায়

হাওয়ার খোলস থেকে খুলে ফেলে দেহসর্প, বাস্তচোখ

 

কোনও কোনও গাছে, নুইয়ে পড়া ডালে, হেলে পড়া চাঁদের মধ্যে
মৃত মানুষের জ্যান্ত রূপ জেগে থাকে।
কথা বলে। যেমন রূপকথা হয়- নক্সী কাঁথা, ভাঙা প্রদীপ,
আলাদিন ও তাঁর অনুগত জিন নিয়ে ঈদের দিন মা সিমোই রাঁধে,
মনসার পূজায় মানত করে

সহস্রবার ডুবে যাওয়া সপ্তডিঙা নিয়ে বাবা বাণিজ্যে বেরোয়।
ফাটা পা, ছুরি বসানো রোদ, ঘামের যোগ্যতা দিয়ে মাটিকে
বর্ষামঙ্গল করে তোলে।

 

ঋতু মেনে মনসা কাঁটায় ফুল আসে। দিদির গর্ভফুল কাঁপিয়ে চলে যায় মৃত শিশুর হাসি, ট্রেনের হুইসেল….

 

আলোর প্রতারণা সহ্য করতে না পেরে মানুষ অন্ধকারের  দিকে পাশ ফিরে শোয়।
স্পন্দন স্তব্ধ হলে বুঝতে পারে-

নক্ষত্র মৃতযোনী, ভিতরে অজস্র জন্মান্তর জ্বলছে নিভছে…

 

 

জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়

ভুল

 

চলে যাবার কথা বললেই সংশয় কিছু ভুল হল?

কিছুই অপরিহার্য নয় বলে জমানো বক্তব্যের পর

সবকিছুই বাজারে মেলে মার্কা তাচ্ছিল্যের কাঁটা

ভুল হলে হোক এমন সিদ্ধান্তে সমস্যা মেটে না।

 

যাবার কথা উঠলেই গড় দূরত্বের স্বরলিপি বাজে।

কয়েকটি না মেলা হিসাব ন্যাকের হাতে কচুকাটা

ভাবলেই বধ্যভূমি জাগে অমোঘ ঘাতকের মুখ

কোনও বাধাই কম্পন মানে না। তবু—

লক্ষভ্রষ্ট ঘাতকের মুখে যতটা বিভ্রান্তি,ভুল পোজে

ফুলগুলি হুল নিয়ে জেগে যন্ত্রণায় সুখ তুলে আনে।

 

বঙ্কিমকুমার বর্মন

মা ও শূন্যতা পুরাণ

 

স্রোতহীন হাঁটু জলে মা সাজিয়েছে নৈঃশব্দ্যৈর নৈবেদ্য থালা

তাতে পূর্ণতা পেয়েছে একেকটি নির্জন অসমাপ্ত দুপুর

যেখানে ও তার ডালপালায় আমরা ঘুরে বেড়াই খেলাচ্ছলে

জলক্রীড়ারত কিছু কিশোর গল্পে আমরা দাপাদাপি করেছি খুব

মা শুধু বারবার আমাদের ডেকে গেছে গরম ভাতের উষ্ণ স্বাদে

 

কত দুপুর প্রেমে পড়েছে আমাদের বয়সের সাথে

কত সন্ধ্যা চুম্বনে গলে জল হয়ে গেছে চায়ের কাপে

সেখানে মায়ের ছিল অগোছালো ব‍্যাঙের সংসার

হাতের দশটি আঙুলে ছিল সহজ পাঠের প্রস্তাব গুলো

 

একেকটি আঙুলে জড়িয়ে গিয়েছে পুরোনো বইয়ের মলাট-গন্ধ

যেখানে আমারা রাতদুপুরে সাঁতার কেটেছি আঁকিবুকি কেটেছি

সেই প্রচ্ছদে হেঁটে গেছে মায়ের ক্ষয়ে যাওয়া স্বপ্নেরা

আর ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যায় একেকটি নদীর আয়ুজল

তারপর মা সমস্ত দিনের শেষে পাঠ করে শূন্যতার পুরাণ ।

 

অঞ্জন দাস

অপদস্থ গদ্য

 

চিঠির উজ্জ্বল ত্বকে মেঘেরা নকশাল হলে

তুমি রোজ অপদস্থ গদ্যে মাপো নদী গভীরতা

 

টেবিলের তীব্র তরবারি

হত্যাকারী কুসুম গন্ধ গাঁথো বাতাস পরিধি

দুরস্হ পাখিরা জানে যুবাজলাশয়, চৈত্র অবেলা

নিরাপদ গান খুলে দেখো আমার সীমানা

আমার জানালা চায় না আলো

ভেসে যাও ডুবন্ত নাবিক

 

 

বিভাগীয় পরামর্শে রাত থেমে গেলে

ফুলের দর্শন নামো প্রত্যেক বোঁটায় চৈত্র চিঠি

তুমি ও আমার প্রিয় রং

 

শ্যামাপদ মালাকার

শিকড়

সব গ্রন্থ ভষ্ম হয়- হৃদয় গ্রন্থ অবিনাশী বলে,
যবে সর্বত্র শব্দহীন অন্ধকার নেমে আসে
প্রাচীন ছায়াপথের মতো একএকটি পৃষ্ঠা-
ললাট, চিবুক নিয়ে বেরিয়ে আসে!
নিখুত ব্যবসায়ীর মতো দর হাঁকে নির্ভয়ে
কাপুরুষতার ভুল-ভ্রান্তি চটকাতে চটকাতে।

সমুদ্রের গলাটিপে পরীহরণের গল্পটা
শিকড় খোয়া অরণ্যের মতো বেরিয়ে আসে
অসহায়,করুণ! তবু, মর্মভেদী কটাক্ষ তার
বুনেচলে আজও মুক্তির পথসংকেত

অনাবৃষ্টি জেনেও হালপোষা কৃষকের মতো
মেঘ খুঁজে, পাগ বাঁধে, বন চুরির পর
যেভাবে মাটি আঁকড়ে পড়ে রয় তার শিকড়…

 

সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায়

বারান্দাপনা

 

 

তোমার সঙ্গে আমার যে সম্পর্ক, বারান্দার সঙ্গে বৃষ্টির…

যখন আসে অর্ধেক ভিজিয়ে দিয়ে যায়

বাকি অর্ধেক যে কে সেই – খটখটে শুকনো

 

ভিজে পায়ে বারান্দা ডিঙিয়ে ঘরে যায় কেউ

যদি তেমন দরকার পড়ে, ঘরে চাপা অন্ধকার

 

হাওয়া আর জলকণা ছল করে লোহাকে জড়ায়

মরচে লেগে ক্ষয়ে যাচ্ছে লোহা, রঙ মিস্ত্রি ভুলে গেছে

শেষ কবে প্রাইমার, শেষ কবে ওই গ্রীলে সুষমা লেগে ছিল

 

তোমার সঙ্গে আমার যে সম্পর্ক, বারান্দার সঙ্গে বৃষ্টির

একদিন বারান্দাপনা ছেড়ে সিঁড়ি ভেঙে ঘাসে নেবে যাব।

 

যদি ধর কোনও দিন অন্ধ হয়ে যাই

বারান্দায় বসে আছি আরামচেয়ারে

লিলুয়া পবন এসে এলোমেলো করে দিচ্ছে চুল

ঠিক যেন তোমার আঙুল।

হয়তো সত্যিই তুমি বেড়াতে এসেছ

বহুদিন পরে, পাশে বসে বলছ, বল তো কে?

 

তোমার গলায় স্বর ভুলে যেতে পারি?

দেহের চন্দন গন্ধ ভুলে যেতে পারি?

 

আমি বলব, কে টুটুল? কবে এলি দেশে?

হাত বাড়িয়ে স্পর্শ নেব তোমার হাতের

তুমি বলবে, না না… বলতে বলতে থেমে যাবে

বুঝে যাবে আমার বারান্দাপনা, আমার ছলনা।

 

প্রিয়ব্রত দত্ত

দহনবেলার গান

 

তোর শরীরের আনাচকানাচ

গভীর গিরিখাত!

উন্মাদ আমি হারিয়ে যাই

তীব্র হাহাকার…

 

এক মুহূর্তে ঝলসে ওঠে

দহনবেলার গান!

 

তীব্র খরা, টুকরো মেঘ

বিষম অন্ধকার।

 

রুক্ষ মরু, বালিয়াড়ি

কামুক শরীর শুষ্ক!

 

তোর শরীর ছিঁড়ে নামা এবার

উথাল-পাথাল বৃষ্টি।

সাক্ষাৎকার

“ছোট্ট একটা মায়া থাক লেখায়, যা কবিতার সব আভরণ, আবরণকে ছাড়িয়ে যাবে”

সত্তরের বলিষ্ঠ কবি মলয় গোস্বামী’র সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কবিতা আশ্রমের প্রতিনিধি তমাল বন্দ্যোপাধ্যায়

আজও এত বছর বয়সেও, এত লেখার পরেও আপনি নিয়মিত লেখেন। এই বয়সেও গান গান, ছবি আঁকেন প্রবল উদ্যমের সঙ্গে। এত লেখার, শিল্পযাপনের রসদ কোথা থেকে আসে? বয়সের কারণে একটুও ক্লান্তি কি গ্রাস করে না?

মলয় গোস্বামী: আসলে লেখার আনন্দই আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছে। আমি তো জানি, আমি আর কিছুই পারি না, কেবল লেখা ছাড়া, তাই লিখি। মনের আনন্দেই লিখি। এই যে আনন্দ, একটা লেখার আনন্দ, আনন্দের যে বিপুল শক্তি, এটাই তো আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছে। ‘মাথা ঘোরে, চারিদিকে কাকপক্ষি ওড়ে।’ এটা লিখলাম তো, লিখেও আমার আনন্দ হল। ধর, বাড়ি থেকে বলল বাজারে যেতে,  আমি বললাম, একটু লিখছি, লিখেই যাব। আর লিখতে লিখতে বাজারের সময় পেরিয়ে যাচ্ছে, বাড়িতে এই নিয়ে চেঁচামেচি। ঘরের সবাই বলছে, কী সব লেখো! আমি ওসব নিয়ে ভাবছিই না। আমার আনন্দ হচ্ছে একটা লেখা লিখতে। ভালো লাগছে এটা বলতে যে লিখলে একটা অদ্ভুত তৃপ্তি এসে আমাকে পূর্ণ করে দিচ্ছে। অনেক রাতে সবাই ঘুমোলে আমি টর্চ জ্বেলে লিখছি। লিখতে লিখতে ঘুমিয়ে পড়লাম হয়ত। আর সকালে জেগে উঠেই আমি গত রাত্রের লেখার খাতা খুলি। ‘রাত্রে যা কালো লিখি দিনে দেখি সাদা।’ দেখি, রাত্রে যা লিখলাম, সকালে, দিনের আলোর সামনে কেমন দেখাচ্ছে, একটু দেখি তো! এইটুকুই লেখার আনন্দ। এটুকুই আমাকে বাচিয়ে রেখেছে। সংসারে আমি ব্যর্থ, স্বামী হিসেবে ব্যর্থ, বাবা হিসেবে ব্যর্থ, তবু লেখার কাছে এলে আমি শিশুর মতো সহজ হতে পারি। কবিতা লিখে আমার অনেক টাকা হয়নি, বড় বাড়ি হয়নি, প্রতিষ্ঠা হয়নি, কিন্তু অনাবিল আনন্দ হয়েছে। এই শক্তিই আমাকে লেখায়।

এই যে এত ক্ষুধার্ত, অভিমানী জীবনে এত আনন্দ, এত স্বপ্ন কোথা থেকে আসে?

মলয় গোস্বামী: কোথা থেকে আসে জানি না। মনে হয় ভালবাসা থেকেই আসে। লিখি বলেই না এত মানুষ ভালবাসে আমাকে। আমি লেখার নীচে তারিখ দিয়ে রাখি। আর ভাবি, যখন আমি থাকব না, এই তারিখ ধরে ধরে আমাকে যারা ভালবাসে, তারা তো আমাকে মনে করতে পারবে। মাঝেমাঝে মনে হয়, বনগাঁতে থাকি, কত লোক আমাকে ভালবাসে, কেন বাসে? কবিতা লিখি বলেই তো! তাহলে, যদি কবিতা না লিখতে পারতাম, তবে কি এত মানুষ ভালবাসত? এটা যেই ভাবি, আমার ভেতরে বাঁশির সুর জেগে ওঠে। এই সুর, এই এত কাছের মানুষের ভালবাসা, এটাই আমাকে স্বপ্ন দেখায়। লিখতে বলে। আর ক্ষুধার্ত, অভিমানী জীবন… এসব নিয়ে আর কী বলি, এতটা বয়েস হয়ে গেল…আসলে, ওই যে বললাম, আনন্দ… আর হ্যাঁ, ছোটবেলাটা। যাঁদের ছোটবেলাটা ছোট, তারা চিরদিন ছোট মন নিয়েই বেঁচে থাকে, আমাদের ছোটবেলাটা তো বিশাল। তার ব্যপ্তি নিয়ে কত বলব… সেসব দিনের কথা বলে ফুরোবে না। তো এই ব্যপ্ত, বিরাট ছোটবেলাই মনে হয় আমাকে এমন অদ্ভুত শক্তি জোগায় আজও। কবিতা লেখার কাজ সবাই যতই সহজ ভাবুক, আসলে তুই যতই সহজ করে লিখবি বলে ভাবিস, পাঠকের কাছে তো ব্যাপারটা সহজ নয়। আর ওই যে অনেকে আছেন, বলেন, ‘না লিখে পারি না, তাই লিখি,’ আমি বলি, কে বাপু লিখতে বলেছে, না লিখে পারো না যখন, লিখো না। আসল কথাটা হল ওই যে বারবার বলছি আনন্দ। পড়ে আনন্দ, এমনকি নিজের লেখা পড়ে কবিরই যদি পাঠকের মতো আনন্দ হয়, তবেই না লিখে শান্তি। আর কী জানিস, একদিন, হঠাৎ শুনছি, কে বলল, ‘নিতাই ভাল নেই।’ তো আমার মাথায় ধাক্কা মারল। লিখলাম লাইনটা। পড়ে একজন বয়স্ক লোক, আমার চেনা, খোড়াতে খোড়াতে এসে বলল, মলয়, এ কী লিখেছ? যেদিকে তাকাই, মনে পড়ে, ‘নিতাই ভাল নেই’। আর কান্না পায়… মানে, বলছি, এই যে আমি সহজ কথাই লিখতে চেয়েছিলাম, কিন্তু পাঠক ভেবে নিল অন্য আঙ্গিকে। আর এই যে অফুরান ভালবাসার জোয়ার এক একটা লেখা লিখে, পড়িয়ে পেলাম, এরাই বাচিয়ে রাখল আমাকে।

আপনার সেই ব্যপ্ত ছোটবেলাটা কি বনগাঁতেই কেটেছিল?

মলয় গোস্বামী: না। আমার জন্ম তো নবদ্বীপে। ওখানেই বাবা-জ্যাঠাদের মদনগোপালের প্রতিষ্ঠা। নবদ্বীপের গা-লাগা উত্তর শ্রীরামপুর-এ জন্ম আমার। নবদ্বীপ বলছি, কিন্তু ভৌগলিক দিক থেকে ধরলে ওঁটা কিন্তু বর্ধমানে। বাবা তখন নবদ্বীপেই  থাকেন আর জ্যাঠা থাকেন দাদনহাট। বনগাঁ থেকে বাবার এক পরিচিত খবর দিলেন, ট্যাংরা কলোনিতে একটা রিফুউজি স্কুল আছে, বাবা পড়াবেন কিনা। বাবা রাজি হলেন। আমরা তখনও নবদ্বীপেই থাকছি। খুড়তুতো, পিসতুতো ভাইবোনেরা ছুটছি এদিক-সেদিক। বাবা ট্যাংরা থেকে গাড়াঁপোতা মাইনর স্কুলে যোগ দিলেন। পরে আমরা এলাম গোবরাপুরে। আমাদের মাটির নিজস্ব বাড়ি বানানো হল। তবে বাবা থিতু হলেন না। সেখান থেকে বাবা গেলেন বৈরামপুরে। আমাদেরও বাসা নিয়ে যেতে হল সেখানে। তারপর কালুপুর পাঁচপোতা হয়ে বাবা বনগাঁর ঘোষ ইনস্‌টিট্যুশনে এলে কলেজপাড়ায় ১০ টাকা ভাড়ায় আমাদের বাসা নেওয়া হল। মানে, বলছি, এই যে বাসাবদল, নতুন পরিবেশে নিজেকে রেখে দেখা, এ আমার পেছন ছাড়ল না। পরে আমিও তো কলকাতায়, মধ্যমগ্রামে, এমনকি বনগাঁতেও কত বাসা বদলেছি। পাখির মতো খড়কুটো মুখে করে এই যে বাসা বদলের দিনগুলো, সেসব অভিজ্ঞতা আমাকে পরে অনেক সমৃদ্ধ করেছে।

এই বাসাবদলের দিনগুলোর মধ্যেই একদিন কি লেখালেখি হঠাৎ করে আপনার গোছানো জামা-কাপড়, বইখাতার মধ্যে, স্বপ্নের মধ্যে হানা দিল?

মলয় গোস্বামী: গোছানো মানুষ আমি কবেই বা ছিলাম যে গোছানো এটা-সেটার মধ্যে লেখা হানা দেবে? আমি তো কবেই লিখেছি, ‘অচেনা জামা’র ভূমিকায়, ‘আমার জীবন সাজানো-গোছানো নয়। বলা যায় — সাজাতে পারিনি। … কত কবিতা রাগ ক’রে চলে গেছে! কত কবিতা নুঞ্জুখুঞ্জু হয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে রয়েছে। কত কবিতা অজ্ঞাতসারে হারিয়ে ফেলেছি।’ যাক সে কথা। গোবরাপুরে আমাদের বড় বাড়িতে, ভাইবোনেরা মিলেমিশে থাকি, সেখানে বাড়িতেই একটা আলাদা সাংস্কৃতিক পরিবেশ। বাবা কবিতা লেখেন, মার কবিতা ছাপা হচ্ছে দৈনিক বসুমতিতে। নানান পত্রপত্রিকা আসছে বাড়িতে। গান-বাজনা, বাঁশি বাজানো, এসব চলছে। পাড়ার ছোটদের নিয়ে কলেজপাড়ায় এসে আমি তখন নাটক লিখি আর নাটক করি, গান গাই। ছোট ছোট গল্প লিখি মজার আর আমার ভাই মৃণ্ময় সেগুলো কপি করে রাখে খাতায়। তবে কবিতা তখন লিখি না। একদিন চন্দ্রগ্রহণের দিন, বঙ্কিমচন্দ্রকে নিয়ে কবিতা লিখেছি, ‘হে বঙ্কিমচন্দ্র, তুমি কি আকাশের চন্দ্র…’ পড়ে বাবা  বললেন, তোমার আর কবিতা লিখতে হবে না। সে নিয়ে কী হাসাহাসি… ৭০ এর দশকে আমার গল্প লিখেই শুরু হয়েছিল। ৭২-এ, মনে আছে, বাদল সরকারের ‘এবং ইন্দ্রজিৎ’ নাটক করতে গিয়ে আমার জীবনবোধটাই পুরো পালটে গেল। পালটে গেল শিল্প সম্পর্কে সমস্ত ধারণা। তখন পাড়ায় পাড়ায় স্টেজে স্টেজে প্রচুর রবীন্দ্রসংগীত গাইছি, বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরের সেই সময়। কিন্তু ওই নাটকটা করতে গিয়ে আমার সমস্ত বিশ্বাস বদলে গেল। হঠাৎ করে যেন কবিতার দরজা আমার সামনে খুলে গেল। একটা নতুন আকাশ, যাকে নতুন করে বুঝতে পারছি। এরকমটা আগে হয়নি। পরে তো বাদল সরকারের সঙ্গে আলাপ করলাম, বলেও ছিলাম এসব। মানে সব ওলটপালট করে দিল আমার। আমি কেমন যেন আক্রান্ত হলাম।

আর আপনার প্রথম কবিতার বই, ‘সময়ের স্মৃতিতে ছুঁড়ি অলৌকিক জাল’? সেটার গল্প?

মলয় গোস্বামী: হ্যাঁ। সেটারও একটা গল্প আছে। ৭৯ সালে। আমি থাকি পিসতুতো দাদার বাসায়, চিড়িয়া মোড়ে। ২০ নম্বর দমদম রোড। দারা ছেলেমেয়েদের পড়াতে আসত পুলীন সাহা। ও শুনেছে আমি কবিতা লিখি, বলল, আপনার একটা বই করি? বই তো করব, তখন, আমার মনে আছে, হাত ভেঙেছে, হাসপাতালে শুয়ে ইথারের ঘোরে আমি প্রলাপ বকছি,আমার একটা কবিতার বই হলে হত… সেই ভাঙা হাত নিয়ে গোবরডাঙায় ভরতি হলাম বিএড পড়তে। তো, বই যে হবে, টাকা কই? পুলীন বলল, টাকা ও দেবে। টেমার লেনের সাহা পাবলিশার্স করবে বই। আমি চালচুলোহীন বাউন্ডুলে, বনগাঁয় এসে বিশ্বনাথ মৈত্রকে ধরলাম, আমার বইটার ব্যবস্থা করে দিন। তো এইভাবেই অগোছাল ভাবে সব হল আর কি!

আপনার কাব্যগ্রন্থগুলির নামকরণ এত মায়াময়, অথচ তাদের শীর্ণকায়, বিলুপ্ত দশা। এ কি একরকম আত্মহননের প্রবপণতা নয়?

 

মলয় গোস্বামী: আমি তো এরকমই। যারা আমায় কাছ থেকে ভালোবেসে দেখেছে, অবাস্তব অসংসারী বলে মৃদু স্নেহমাখানো ভর্ৎসনা করেছে, তাঁরা জানে আমি একেবারেই অগোছালো। অনেকে বলে আমার নাকি প্রতিভা আছে। আমি হেসে অবিশ্বাস করেছি। কারণ আমার সংসার তো তা বলে না! যাই হোক, যদি প্রতিভা থেকে থাকে তাহলে রবীন্দ্রনাথের ভাবনা অনুযায়ী বলতে চাই—প্রতিভার গৃহিনীপনা আমার নেই। মাঝে মাঝে ভাবি, এ জীবন ফুঃ!… তবে এই ষাটোত্তীর্ণ  বয়সে ওইসব শীর্ণ বিলুপ্তদশা কাব্যগ্রন্থগুলি দেখে চোখে জল আসে! মনে হয় আমার সন্তানকে ঠিকমতন খেতে দিতে পারিনি বলেই ওঁরা বিলুপ্ত দশায় চলে গেল! তবু তোরা বললি, এই-ই ভালো।

 

সেই প্রথম কবিতার বই থেকেইথেকে আপনার একটার পর একটা পরিবর্তন দেখছি আমরা। সে কবিতার ছন্দ, আঙ্গিক হোক, কী বইয়ের নাম। কিংবা ধরুন আপনার কবিতায় বারবার এসেছে ‘অলি’ নামে এক রহস্য।

মলয় গোস্বামী: হ্যাঁ। প্রথম বইতে ছিল দেবযানী বলে আমার মানসপ্রতিমা। পরে দেখি আমার এক বন্ধু লিখছে দেবযানী নিয়ে। আমি ঠিক করলাম আর লিখব না ওই নামের কাউকে নিয়ে। এই সময়, আমার শিক্ষক, গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, সাংবাদিক হীরক, আমার বন্ধুর বাবা, একদিন শুনি, হীরকের মা-কে ডাকছে ‘অলি’ বলে। কী ব্যাপার? এরকম নাম হয় নাকি? উনি বললেন, আসলে ওঁর নাম অঞ্জলী, কিন্তু ওই মাঝখানের ‘ঞ্জ’-টা কেমন বোঝা–বোঝা লাগে। আমি তো অবাক! এই তো আমার প্রিয় নাম। পরের বই থেকে তাই আমার দেবযানী বদলে গেল অলিতে। আসলে এসব বলছি মানে এটা বোঝাতে, যে আমি যা দেখেছি, যা বুঝেছি, সেটুকুই লিখেছি। জীবনের রস দিয়ে লিখেছি। বাবা বলতেন, কবিতায় মিথ্যে বলতে নেই। বলা যায় না। খারাপ কথা কবিতায় বলা যায় না। এই ব্যাপারটা প্রথম বই থেকেই আমার পরের সমস্ত বইগুলোতেই আমি মেনে চলেছি। চালের থেকে কাঁকড় বাছা কঠিন। ঠিক তার উলটো, কবিতা থেকে খারাপ শব্দ, খারাপ চিন্তা, খারাপ স্বপ্ন, মানে যা কিছু খারাপ, বাদ দেওয়া কিন্তু সহজ। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, জীবনের ফটোগ্রাফ তো সাহিত্য নয়। ফলে পুরো বাস্তবকে আমি কীভাবে কবিতায় রূপ দেব? পুরো বাস্তবটাই তো জীবন নয়। আজকাল জাদুবাস্তবতার কথা খুব শুনি। আমার গল্পে, কবিতায়, উপন্যাসে এরকম জাদুবাস্তবতার ব্যবহার আছে। সেখানে কুকুর কথা বলে, মানুষের সঙ্গে মানুষের ভাষায় কথা বলে। এটা জাদু? না। আমাদের পুরাণেই তো আছে এরকম কত উদাহরণ। আজ সবাই মার্কেজ, রুশদি লিখেছে বলে জাদুবাস্তব, জাদুবাস্তব বলে হা-হুতাশ করছে। কিন্তু রামায়ণ, মহাভারতে এরকম জাদুবাস্তবের উদাহরণ কত রয়েছে। বদলের কথা আর কত বলি। জীবনের সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে কাটালাম এতবছর। কতবার তো ভেবেছি, এই বনগাঁ ছেড়ে চলেই যাব। গেছিও তো। কিন্তু আবার কীসের টানে ফিরে এসেছি। একটা জীবন আমার পেটে গামছা বেঁধে কেবল লেখার পরে মানিসিক তৃপ্তি নিয়ে কেটে গেল।

কবিতারসেই তৃপ্তি কেমন? কেমন সেই কবিতা? কীভাবে দেখেন তাকে?

মলয় গোস্বামী: রহস্য নিয়ে আর কী বলব? আমি লিখছি, স্বপ্নের প্রজাপতি আর প্রজাপতির স্বপ্ন। এর মধ্যে কোনটা আসল? রূপের মধ্যে অরূপের খোঁজ। এটাই তো আসল। না? এটাই তো কবিতা। একটা গান, ধর, বড়ে গুলাম আলি গাইছেন মল্লার, কী মোটজার্ট-এর সোনাটা। সুর জানি না। কিন্তু শুনছি। সুরের মূর্ছনাটুকু থেকে যাচ্ছে। মনে হল, মনের মধ্যে বৃষ্টি পড়ছে। এটাই তো সব। মনের মধ্যে কে ডাকল। এই ডাকটাই আমাদের টানে। আমি হয়ত আমাদের মদনগোপালকে মাঝরাতে জেগে উঠে বলতে চাই, আমার সঙ্গে যাবি? কিন্তু লিখছি কী? না, আমি পাশবালিশকে জড়িয়ে ধরে বললাম, যাবি? এই তো কবিতার রহস্য। এখন, এই চল্লিশবছর লেখার পরে দেখি, সবেতেই কবিতা। মাকে বাড়ি ফিরে বললাম, মা ভাত দাও। বলেই মনে হল, আরে! মা তো নেই। তাহলে? লাইনটা তো কবিতা হয়ে গেল! আমি দেখেছি, সবাই ভেতরে ভেতরে একটা আঁকুপাঁকু নিয়ে লিখছে। এই আঁকুপাঁকু কীসের? নাম করার? নাহ্‌। সে আকাঙ্ক্ষা থাকলে কবিতা আসবে না। এত বছর পরে বুঝি, মনের আকাঙ্ক্ষারনিবৃত্তি না ঘটলে প্রকৃত কবিতা আসে না। এখন তো কেবল আনন্দ হয়। লিখলেই। ভালবাসার মানুষকে দেখলেই চোখে জল আসে। ভাল কিছু দেখলেই আনন্দ হয়। আর লেখার কথা? ধর, মনের ভেতরে কবিতা এখন জেগে উঠল, আর তুই তাকে ধরার চেষ্টা করছিস। এই তোর মস্ত ভুল হয়ে গেল। মনের ভেতরের রহস্যকে ধরার চেষ্টা করলে হবে না। আসল কবি সে-ই যে নিজে কবিতাকে ধরেনি, কবিতা যাকে ধরেছে।

আমার কবিতায় মাঝেমাঝেই সংলাপ এসে কেমন যেন করে ওঠে। আমি বাধা দিয়েও তাদেরকে ঠেকাতে পারি না। সঙ্গে রয়েছে আমার ছোট্ট বেলা থেকে টেনে নেওয়া সংগীতচর্চা এবং বাদ্যযন্ত্রচর্চা। এবং কবিতাতেও ঢুকে পরছে সংগীতের নানা ব্যঞ্জনা এবং ছন্দ। মিলিয়ে মিশিয়ে যেন ঘনঘোর। নাটক ও বাদ্যযন্ত্রের শৃঙ্খলা ও সংযম এসে কবিতাকে সাহায্য করতে আরম্ভ করে। এই শৃঙ্খলা ও সংযম থাকলে কবিতার রূপলোক বহুগুন শক্তি ধারণ করে। এবং আমরা তো এটা জেনেছি যে সমস্ত কলাকেই শেষ পর্যন্ত সংগীতের দিকে চলে যেতে হবে। বিষয়টিকে বুঝতে হবে। বলতে চাই—বাণী, বিষয় সব ছাড়িয়ে সংগীত একেবারে শেষে এক সৌন্দর্যময় অনুভবে গিয়ে পৌঁছায়। কবিতাকেও এইদিকে যেতে হবে। তাই লিখে ফেলি, “তবে বলো দেখা হলো পাতালযামিনী”। কবিতাকে যে আমি চেষ্টা করি এক সাঙ্গীতিক অনুভবের দিকে নিয়ে যেতে, যেখানে বিষয়বক্তব্য প্রয়োজনহীন হয়ে যাবে। পেরেছি কী পারিনি, তা অন্য ব্যাপার। হয়তো পারিনি। কিন্তু এই কবিতা-ভাবনা এসেছে আমার সংগীতচর্চার  কারণেই, আসলে দেখো, সংগীতে কিন্তু বুদ্ধি ও জ্ঞানের ব্যাপারটি নেই। শুধু অনুভূতি, অনুভব। মনে হয়েছে আমার, এই বিষয়টিই কবিতার পরম উদ্দেশ্য হওয়া উচিত। এখন মনে হয় কবিতা বিষয় ছেড়ে দিয়ে সম্পূর্ণ মূর্ছনার দিকে চলে যাক…। এই সমস্ত ভাবনাই এসেছে আবার সঙ্গীতচর্চার জন্যে। আর আমি যে নানারকম ছন্দে লিখে থাকি, এই ব্যাপারটিকে সাহায্য করেছে আমার বাদ্যযন্ত্রচর্চা।  কখনও কখনও আমি আমার একটি কবিতাকে পরে গল্পের রূপ দিয়েছি। কখনও কখনও আমার উপন্যাসের বীজকে ধরতে চেয়েছি একটি ছোটো কবিতায়। সমস্ত কলা একাকার হয়ে আমার কবিতায় প্রবেশ করেছে। আর কবিতাও তাদেরকে নিজের করে নিয়েছে। কী জানো, একজন শিল্পীর কাজ হল সবকিছুকে, এই চারপাশের এত খারাপ, এত ভণ্ডামি, তবু, শেষপর্যন্ত জীবনকে একটা সুন্দর জায়গায় নিয়ে যাওয়া। আমার এই বিশ্বাস থেকেই আমি গল্পে কোনও খারাপ চরিত্র রাখতে পারিনি। চেষ্টা করেছি, কিন্তু দেখলাম, সেই খারাপ লোকটাও শেষপর্যন্ত ভালই হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এটুকুই করে যেতে চাই।

একটা সময় কলকাতায় থেকেছেন। চাকরি করেছেন নামকরা কাগজের অফিসে। আজকাল আর কেন যান না সেখানে? কী সেই অভিমান?

মলয় গোস্বামী: হ্যাঁ। অভিমান-ই বলতে পারিস। কী জানিস, প্রকৃত নাগরিকদের মধ্যে গুণীর কদর আছে। কিন্তু কলকাতা শহরের বৌদ্ধিক মহল তো নিয়ন্ত্রণ করে বাইরে থেকে কলকাতায় গিয়ে বাস করা লকেরা। তারা গুণীর কদর জানে না। তাদের কেবল ভেতরের আঁকুপাঁকু। এখন বাইরে থেকে সেখানে গিয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার ব্যাপারে আমার একটু আপত্তি আছে। সেটা করতে গেলে অনেক আপোষ করতে হবে। সেসব আমার পোষায় না। নিজেকে ছোট করতে পারব না আর। তারচেয়েও বড় কথা কী, ওই যারা সব সমাজের বড় বড় পদ, সমাজের অনেক কিছু নিয়ন্ত্রণ করে, তাদের থেকে খারাপ লিখতে হবে তোকে। তাদের কাছে মাথা নিচু করে চলতে হবে। তা নাহলে তোকে তারা কেন মেনে নেবে যদি তুই তাদেরকেই ছাড়িয়ে যাস?

 

প্রায় চল্লিশ বছর কবিতাচর্চা করছেন। কবিতার ভাষা ও আঙ্গিকের কত-না বদল হল এর মধ্যে। এ-প্রসঙ্গে নিজেকে কোথায় রাখবেন আজ?

 

মলয় গোস্বামী: দেখবি মোটামুটি দশ বছর পরপর কবিতার ভাষা পালটে যাচ্ছে। আঙ্গিক কিন্তু এত দ্রুত পালটাচ্ছে না। আমার কবিতাতেও তাই দেখছি। তবে ইচ্ছাকৃতভাবে উদ্দেশ্যমূলকভাবে পরিবর্তন করলে কবিতার সৌন্দর্য ব্যহত হয়। সময়ই এই পালটাবার কাণ্ডারী। আমি এর মধ্যে নিজেকে কোথায় রাখব, এই ভেবে কখনও মাথা খারাপ করিনি। তবে মনে হয়েছে, এবং আমার কবিতাকে লক্ষ্য করে দেখেছি আমি অধিকাংশ কবিতাতেই একটা ছবি প্রবেশ করিয়ে দিই। চল্লিশ বছর আগেই আমি একথা বুঝতে পেরেছিলাম, ছবির ভাষা সর্বজনীন এবং অপরিবর্তনীয়। ধরা যাক – দা ভিঞ্চির ‘মোনালিসা’ আজও একই ভাষায় উপভোক্তাদের সামনে আসীন। অতএব ভাষা ও আঙ্গিক পালটালেও কবিতার মধ্যে উৎকীর্ণ ছবিটি কিন্তু জীবিত থাকবে। কতটা থাকবে কতটা পেরেছি বা পারিনি তা অন্য ব্যাপার।

এখন একা একা গান গাই। বাঁশি বাজাই। চাইলে কি অনুষ্ঠান করতে পারি না? গানের? বাঁশির? করি না কারণ, এখন এসব কেবল আমার নিজের আনন্দের। এই বাঁশির কথা আর কী বলি, একটা মেয়ে আমাকে খুব ভালবাসত। আমি তো বাঁশি বাজাই। বন্ধুরা বলে ওর কথা। আমি উদাসীন। মজা করে বলতাম, তোমার বাড়ি একটা বাঁশি পুঁতে দেব। মেয়েটা কেঁদেই ফেলল। বলল, ওই বাঁশিই আমাকে খেল।

এই যে বাঁশি পুঁতে দেব, এটাও তো একটা রহস্য। নাকি? পাঠক খুঁজবে। কেন বাঁশি পোঁতার কথা এল। পাশবালিশকে কেন বলছেন কবি, আমার সঙ্গে যাবে? এই সামান্য অবসর দিতেই হবে তোকে। সব আলগা করে দিলেও হবে না। আমি তো ছবিকে শরীর দিই মাত্র। চাই সহজ করে লিখতে। লিখলাম, ‘তুমি এসেছ, আমার আনন্দ।’ সত্যিই আনন্দ। পছন্দের কেউ এলে আমার আনন্দ হয়। জীবনে কবিতা লিখে আক্ষরিক অর্থে কিছুই হবে না তোর। আমারও হয়নি। এমনিতেই তো কবিতাই আমার শত্রু। আমার সংসার বলে। আত্মীয়রা বলেন। সংসার বলে, “তুমি কবিতা লিখে কী পেলে? কী দিলে ছাইভস্ম ছাড়া?” আমি তখন বিমূঢ় হয়ে যাই। সত্যিই তো আমি কিছু দিতে পারিনি স্ত্রীকে, সংসারকে, সন্তানকে! তেমন করে তো প্রকাশ্যে ভালবাসতেই পারিনি! মনেমনে তো খুব ভালবাসি। কিন্তু ভালবাসার প্রকাশ তো কিছু জাগতিক মাধ্যমেই করতে হবে। তখন বুঝি কবিতাই আমার শত্রু। তবু যখন কেউ ঘরে থাকে না, তখন আমার হাজার হাজার কবিতার গায়ে হাত বুলোই। বলি খুব নিচু স্বরে, “তোরা আমার শত্রু, কিন্তু তোদেরকে ফেলে দিতে পারি না, পুড়িয়ে দিতে পারি না কেন বলতে পারিস?”তবু, আমি জীবনে যা দেখিনি, তা নিয়ে আমি লিখিনি। বার্চ গাছ দেখিনি, তাই বার্চ গাছ আমার কবিতায় আসে না।

 

একজন কবিতাপ্রয়াসী তরুণের প্রতি আপনার বার্তা বা প্রত্যাশাকী?

 

মলয় গোস্বামী: হাঃ হাঃ। বার্তা?… আমি বার্তা পেলাম, কঠিন অংক এক কষতে দিলাম!… বার্তা দেওয়ার মূর্খামির মধ্যে আমি নেই।

তবে কবিতা প্রয়াসী তরুণেরা যদি কিছু না মনে করেন তাহলে দু-একটা কথা আমি বলতে পারি। নিজের মতন লেখাই ভাল। অশিক্ষিত পটুত্বের দিন নেই। ছন্দ জেনেই তবে তা পরিত্যাগ করা উচিত।

“ বাক্যং রসাত্মকং কাব্যং”- বলেছেন আমাদের দেশের ত্রয়োদশ শতাব্দীর বিশ্বনাথ। বুঝতে হবে বাক্যটি  রসপূর্ণতা পেলে তবেই তা কাব্য হবে। রসই আসল। কবিতা লিখতে হলে সংগীতশিল্পী হওয়ার প্রয়োজন নেই, তবে সংগীত সম্পর্কে বেশ গভীর ধারনা থাকা প্রয়োজন। বাক্যের ধ্বনিকেই ধরার প্রয়াস রেখে যেতে হবে। মস্তিষ্কের যন্ত্রপাতি দিয়ে কবিতা লেখার চেয়ে হৃদয়ের আলোয় অনুভবকে ধরা বেশি প্রয়োজন। এই যে বলছি—এও কিন্তু বার্তা নয়।

কবিতা প্রয়াসী তরুণদের কাছে আমার প্রতাশ্যা আপনাদের কবিতা পড়ে যেন কিছু সময়ের জন্যও নতুন আলোর সন্ধান আমি পাই। আমি বিশ্বাস করি আমাদের তরুণ কবিরাই কবিতার অন্য এক পৃথিবীর সন্ধান দেবেন, যা আজও আমরা পাইনি। তবে আপনাদের কাছে একটা অনুরোধ করব, আপনারা যেন কবিতার কাছে আপনাদের একাকিত্বকে গভীরভাবে নিবেদন করেন। এর মূল্য সুগভীর।

 

এখন কোন ধরণের লেখা লিখতে চান?

 

মলয় গোস্বামী: ওই যে বললাম, আনন্দের কথা। আর মায়াময় লেখা। এগুলোই লিখে যেতে চাই।এখন তো, এই বয়সে সারা পৃথিবীর মায়া এসে জোটে আমার কাছে। যেন কেউ আসে, মনে হয়। এই আসার ছবি মনের মধ্যে ফুটে ওঠে। আর কী জানিস, এত বছর পরে মনে হয়, পৃথিবীর বেশিরভাগ মানুষের মধ্যেই আজও ভাল-টুকু আছে। ভালবাসা আছে। মায়া আছে। আমি চাই কবিতাকে আবরণ, আভরণহীন করে তুলতে। আভরণগুলো না বেশি হয়ে গেলে, বা অতিরিক্ত হলে আসলের রহস্যটা নষ্ট হয়ে যায়। মানে, একটা মেয়েকে আমার ভাললাগত ওর গলার একটা তিলের জন্য। একদিন দেখি কেমন বড় বড় গয়না পড়ে এসেছে। আর ওই তিলটা ঢেকে গেছে গয়নায়। আমি বলি, ওই তিলটাই তো ভাল ছিল। কী দরকার ঢাকার? কবিরা কিন্তু কবিতাকে ওই গয়নায় মুড়ে ঝলমলে বানাতে চায়। এটা সহজ। আমি লিখেছিলাম, ‘ঊর্ণনাভের বুননঘরাণা।’ আমি সেই ঘরাণা চাই। চাই মায়া। একজীবনের মায়া। ছোট্ট একটা মায়া থাক লেখায়, যা কবিতার সব আভরণ, আবরণকে ছাড়িয়ে যাবে।

প্রবন্ধ

আকাশের আড়ালে আকাশ

‘আমি অপেক্ষা করছিলাম বইটা আপনাকে দিয়ে যাবো বলে’

সুদীপ বসু

 

 

 

আধুনিক মার্কিন সাহিত্যের অভিনব ঘরাণার ডাকসাইটে ঔপন্যাসিক পল অস্টারের প্রথম উপন্যাসটির (সিটি অফ গ্লাস) জন্ম হয়েছিল একটি নিরীহ নির্ভেজাল ফোনকল থেকে। তাও আবার ভুল নম্বরে। তাঁর ব্রুকলিন শহরের বাড়িতে। ১৯৮০-এর  বসন্তের এক শেষবিকেলে।

যিনি ফোন করেছিলেন তিনি খুব সাদামাঠাভাবে জিজ্ঞেস করলেন এটি পিঙ্কারটন এজেন্সির (একটি বিখ্যাত মার্কিন গোয়েন্দা এজেন্সি) অফিস কিনা। পল অস্টারও খুব স্বাভাবিকভাবে জবাবে বললেন ‘না’ এবং ফোন রেখে দিলেন। ডুবে গেলেন লেখার কাজে। পরের দিন বিকেলে ঠিক ওই সময়ে আবার ফোন। একই কন্ঠস্বর। একই ভুল নম্বরে। একই প্রশ্নঃ ‘পিঙ্কারটন এজেন্সির অফিস? এটা কি পিঙ্কারটন এজেন্সির অফিস?’ পলের দিক থেকে উত্তরও একই। কিন্তু ফোনটা রেখে দিয়ে তিনি যখন আবার লেখায় মন দিতে যাবেন হঠাৎ তাঁর মনে হল যদি আমি হ্যাঁ বলতাম! যদি বলতাম হ্যাঁ আমি পিঙ্কারটনেরই একজন দুঁদে গোয়েন্দা! যদি কেসটা হাতে নিতাম! তাহলে হয়তো জীবনের ঘটনাপরম্পরা আমূল পাল্টে যেত। সিদ্ধান্ত নিলেন এর পরেরবার ফোনটা এলে সুযোগ হাতছাড়া করবেন না।

কিন্তু ফোনটা আর কোনদিনই এল না। কেবল একটা স্থায়ী ছাপ রেখে গেল মনে। একটা সম্ভাবনা রেখে গেল। একবছর পর যখন অস্টার ‘সিটি অফ গ্লাস’ লিখতে বসলেন তদ্দিনে এই তুচ্ছাতিতুচ্ছ ঘটনাটা অন্য রূপ পেয়ে গেছে তাঁর মাথার ভিতরে। এবং একটা গল্পের চাকা ঘুরতে শুরু করেছে। গল্পটা এরকম – কুইন নামে একজন লোক একদিন একটি ফোনকল পেল। অচেনা কন্ঠস্বর পল অস্টারের খোঁজ করছে। প্রাইভেট ডিটেকটিভ পল অস্টার। বাস্তব ঘটনার মতোই কুইন (Quinn) বলল যে নম্বরটা ভুল। পরের রাতে-ও একই ফোন এল। একই জবাব দিল কুইন। কিন্তু তৃতীয় রাতে সে খেলাটা ধরে ফেলল। গম্ভীর গলায় পরিচয় দিল হ্যাঁ সে-ই পল অস্টার। আর এই বিন্দু থেকেই এই বিখ্যাত উপন্যাসটি তাজ্জব বাঁক নিল। উপন্যাস তো এগিয়ে চলল তার নিজের তাড়নায়, উন্মাদনায়, জটিল রহস্যময় পথে। এবং শেষও হ’ল একদিন। এরপর বেশ কিছু সময় কেটে গেছে। অস্টার তখন অন্য লেখার কাজে হাত দেওয়ার জন্য পড়াশুনায় তথ্যানুসন্ধানে ব্যস্ত। এমন সময় একদিন তাঁর কাছে হঠাৎ একটি ফোন এল, কুইনের খোঁজ করে। চমকে গেলেন অস্টার। কুইন তো তাঁর প্রথম উপন্যাসের চরিত্র। জিজ্ঞেস করলেন কুইন বানানটা বলুন তো। অর্থাৎ কোন কুইনকে চান Quinn না Queen? ফোনের কন্ঠস্বর স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিল সে কুইনকেই (Q-u-i-n-n) চায়। আকস্মিক ভয়ে-দ্বিধায় অপ্রস্তুত অস্টার ‘রং নাম্বার …. এখানে ও নামে  কেউ থাকে না’ বলে ফোন কেটে দিলেন। শিহরণ খেলে গেল তাঁর সারা শরীরে।

কেবল এই একটিই নয় এমন আশ্চর্য সমাপতন (নাকি দৈবঘটনাচক্র) তাঁর জীবনে অনেকবারই ঘটেছে। আরো বেশি ঘটেছে তাঁর চেনাপরিচিত বা বন্ধুদের জীবনে। সেসব চমকদার কাহিনী সবিস্তারে লিখে-ও রেখেছেন তিনি।

আর একটি গল্প (সত্যি ঘটনা) তাঁর এক বন্ধুকে জড়িয়ে। বলা ভাল, ওই বিশেষ বন্ধুত্বকে জড়িয়ে। বন্ধুটির নামের আদ্যাক্ষর ‘জে’। অস্টার লিখছেন তাঁর সারা জীবনের গাড়ি চালানোর ইতিহাসে মাত্র চারবার চাকা ফেঁসে গেছে (তা-ও আট-ন’ বছরের পরিসরে এবং তিনটি আলাদা আলাদা দেশে) এবং প্রত্যেকবারই গাড়িতে তাঁর সওয়ারি ছিলেন এই বন্ধু ‘জে’। প্রথমবার, তখন তাঁরা ছাত্র, বাবার স্টেশনওয়াগনটা নিয়ে দুজন বেরিয়েছিলেন ঘুরতে। শীত শেষ। কেবেক অঞ্চলে সবে পৌঁছেছেন। টায়ার গেল ফেঁসে। তবে সেবার সঙ্গে আপৎকালীন ব্যবস্থা থাকায় তেমন সমস্যা কিছু হয়নি। কিন্তু সত্যিকারের সমস্যা হ’ল ওইদিনই ঘন্টাখানেকের ভেতর দ্বিতীয় টায়ারটি ফেটে যাওয়ায়। সেই কুয়াশাচ্ছন্ন শৈত্যের ভেতর অপেক্ষা করতে হ’ল ঘন্টার পর ঘন্টা।

এর পর চার পাঁচ বছর কেটে গেল। অস্টার তখন প্রথমা স্ত্রী লিডিয়া ডেভিসের (ছোট গল্পের বিষ্ময় প্রতিভা) সঙ্গে ফ্রান্সে থাকেন। একটা বড় বাড়ির কেয়ারটেকারের কাজ নিয়ে অবিশ্বাস্য দারিদ্র্যের ভেতর দিন গুজরান করছেন। এমন সময় সেই পুরানো বন্ধু ‘জে’ এসে উঠলেন তাঁদের বাড়ি। সন্ধ্যে নাগাদ দুই বন্ধু বেরিয়েছেন গাড়ি নিয়ে। ফেরার পথে, ঘোর সন্ধেবেলা, মিশকালো শহরতলির রাস্তা ধরে চলতে চলতে আবার, আবার সশব্দে টায়ার বিস্ফোরণ। অবাক হলেও এই ঘটনাটিকে কাকতালীয় বলেই মেনে নিলেন অস্টার। কেবল একমাত্র ‘জে’-এর উপস্থিতিতে বারবার এই বিপত্তির সঙ্গে বন্ধুবিচ্ছেদের কোনও কষ্টকল্পিত সম্পর্ক আছে কিনা (একটা প্রচলিত কুসংস্কার) এমন সন্দেহের ছায়া একঝলকের জন্য খেলে গেল তাঁর মনে। শেষ ঘটনাটি ঘটল আরো চার বছর পর। তখন তিনি স্ত্রী লিডিয়া ও ছেলে ড্যানিয়েলের সঙ্গে নিউ ইয়র্কে থাকেন। ‘জে’ বেড়াতে এসেছিলেন। রাতের খাবার কিনতে ‘জে’-কে পাশে বসিয়ে গাড়ি স্টার্ট দিয়েছেন মাত্র। গাড়িটা তখনও বড় রাস্তায় ওঠেনি, সশব্দে টায়ার ফেঁসে গেল। পল অস্টার জানাচ্ছেন, নিছক সমাপতন কিনা কে জানে, এর পর থেকেই ‘জে’-এর  সঙ্গে তাঁর দেখাসাক্ষাৎ ক্ষীণতর হতে লাগল। একসময় দশ বছরেও একবারও দেখা হল না। একসময় কারোর ফোন নম্বর-ই আর কারোর মনে রইল না। মনে রাখার ইচ্ছেটুকু-ও রইল না।

এবার আরেকটি গল্প। সমাপতনের। ছোট্ট  কিন্তু আশ্চর্য। এ গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্রে অস্টারের এক প্রিয় বন্ধু ‘আর’। তাঁর মুখেই শোনা। বন্ধুটি একটি বিশেষ বইয়ের খোঁজ করছিলেন বেশ কিছুদিন ধরে। হানা দিচ্ছিলেন বিভিন্ন চেনাপরিচিতের বাড়িতে, লাইব্রেরিগুলিতে পাগলের মতো সংগ্রহ করছিলেন ক্যাটালগ। দিবারাত্র ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন এক বইয়ের দোকান থেকে অন্য আর এক বইয়ের দোকানে। বইটির অনুসন্ধান একসময় উন্মাদনার পর্যায় পৌঁছে যাচ্ছিল। ঠিক এই সময় ঘটনাটি ঘটল। সেদিন বিকেলবেলা বন্ধুটি গ্র্যান্ড সেন্ট্রাল স্টেশনের ভেতর দিয়ে শর্টকার্ট করে ভ্যান্ডারবিল্ট অ্যাভেনিউমুখী সিঁড়ির ধাপ বেয়ে উঠছিলেন হঠাৎ নজরে এল মার্বেলের রেলিঙে হেলান দিয়ে একটি মেয়ে ওই চরম ব্যস্ততার মধ্যেও দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মন দিয়ে একটা বই পড়ছে এবং কাকতালীয়ভাবে বইটি বন্ধু ‘আর’-এর খোঁজের বইটি থেকে আলাদা কিছু নয়। ‘আর’ এতটাই ঘাবড়ে গেলেন যে তিনি সরাসরি অচেনা মেয়েটিকে বলেই বসলেন ‘ম্যাডাম, যদি কিছু মনে না করেন, বিশ্বাস করুন, এই বইটাই আমি সব জায়গায় হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছি। ’

মেয়েটি কিন্তু ঘাবড়াল না। বলল ‘অসাধারণ বই। আমি এইমাত্র পড়া শেষ করলাম।’

বলতে পারেন এই বইটা কোথায় কিনতে পাবো? এ বইটা আমার জীবনের অনেক কিছু। বিশ্বাস করুন। ’ বন্ধুটি বললেন।

‘এই কপিটা তো আপনার জন্যেই।’ মেয়েটি বলল।

‘কিন্তু এটা তো আপনার কপি।’

‘ছিল। হ্যাঁ আমার কপি ছিল।’ মেয়েটি খুব শান্ত গলায় কেটে কেটে বলল। ‘কিন্তু এখন তো আমার পড়া শেষ হয়ে গেছে। আমি এতক্ষণ অপেক্ষা করছিলাম বইটা আপনাকে দিয়ে যাবো বলে।’

এবার অস্টারের নিজের জীবনের একটা তাজ্জব-করে-দেওয়া ঘটনা শোনাই। তাঁর শ্যালিকা তখন গিয়েছিলেন তাইওয়ান। চিনাভাষা শেখার লোভে। জীবিকা হিসেবে তিনি তাইপেই-এর অধিবাসীদের ইংরেজি শেখাতেন। তখন-ও অবশ্য অস্টারের বিয়ে হয়নি। তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী সিরি তখন কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। একদিন তাঁর শ্যালিকার সঙ্গে তাঁর এক মার্কিন বান্ধবীর কথাবার্তা হচ্ছিল। এই বান্ধবীটিও তাইপেই এসেছিলেন চিনাভাষা শিখতে। কথপোকথনটি এইরকমঃ

শ্যালিকা – ‘আমার বোন নিউ ইয়র্কে থাকে।’

বান্ধবী  – ‘আমারও।’

শ্যালিকা – ‘আমার বোন থাকে আপার ওয়েষ্ট সাইডে।’

বান্ধবীটি – ‘আমারও।’

শ্যালিকা – ‘আমার বোন থাকে আপার ওয়েস্ট সাইডের ৩০৯ নং রাস্তায়।’

বান্ধবী  – ‘বিশ্বাস করো। আমার বোন-ও ওখানেই থাকে।’

শ্যালিকা – ‘ও থাকে ৩০৯ নং রাস্তার ১০৯ নং বাড়িতে’।

বান্ধবী  – ‘আশ্চর্য আমার বোনও তো ও বাড়িতেও ….’

শ্যালিকা – ‘আমার বোন থাকে তিনতলায়।’

বান্ধবী  – (দীর্ঘশ্বাস ফেলে) ‘আমি জানি ব্যাপারটা পাগলামির দিকে চলে যাচ্ছে কিন্তু আমার বোন-ও ও বাড়ির তিনতলাতেই থাকে।’

অস্টার অবাক হয়েছেন এই ভেবে যে তাইপেই-তে যখন দুটি স্বল্পপরিচিতা মেয়ে নিজেদের বোনেদের নিয়ে অবাক আলোচনায় মগ্ন, তখন সম্পূর্ণ অজান্তে, পৃথিবীর অপর পারে, অন্তত দশ হাজার মাইল দূরে, একই শহরের, একই রাস্তার, একই গলির, একই বাড়ির, একই তলায় দুটি ভিন্ন ঘরে সেই দুই পরস্পরপরিচিতিবিহীনা বোন হয়তো ঘুমিয়ে কাদা। তাঁরা জানেনই না পৃথিবীর অপর প্রান্তে এই আশ্চর্য সমাপতন তাঁদের দুই দিদিকে কেমন বুরবাক বানিয়ে দিয়েছে।

লিডিয়ার সঙ্গে বিয়ে হয় ১৯৭৪-এ। ১৯৭৭-এ ছেলে ড্যানিয়েলের জন্ম। ১৯৭৮-এ লিডিয়ার সঙ্গে সব সম্পর্কের অবসান ঘটে। সে যা হোক যে ঘটনার কথা বলছি সেটার সময় আনুমানিক ১৯৮০। ছিন্ন সম্পর্ক কিন্তু দুজনেই থাকেন ব্রুকলিনে। কয়েকটা বাড়ির ফারাকে। ছেলে ড্যানিয়েল কখনো বাবার কাছে কখনো মা’র কাছে থাকে। একদিন ভোরবেলা অস্টার লিডিয়ার বাড়ির নীচে গিয়ে দাঁড়িয়েছেন ছেলে ড্যানিয়েলকে সেখান থেকে তুলে নিয়ে স্কুলে পৌঁছে দেবার জন্য। তাঁর স্পষ্ট মনে আছে সেই দৃশ্য। হঠাৎ দোতলার একটা জানলা খুলে গেল। দেখলেন লিডিয়া গরাদ দিয়ে মাথা গলিয়ে তাঁকে কিছু একটা কিনে আনবার আদেশ দিয়ে একটা মুদ্রা (ডাইম) ছুঁড়ে দিলেন ওপর থেকে। মুদ্রাটি হাওয়ায় পাক খেতে খেতে নীচের দিকে পড়তে পড়তে হঠাৎ গাছের ডালে ধাক্কা খেয়ে ছিটকে পড়ল মাটিতে আর অদৃশ্য হয়ে গেল। নীচু হ’য়ে গাছপালা শিকড়বাকড় ইটপাথর সরিয়ে অস্টার অনেক খুঁজলেন ডাইমটিকে, কিন্তু সে চিরতরেই হারিয়ে গিয়েছে। সেদিনই বিকেলবেলা এক বন্ধুকে সাথে নিয়ে শ্যে স্টেডিয়ামে মরশুমের প্রথম বেসবল টুর্ণামেন্ট দেখতে গেছেন অস্টার। বন্ধুটি গেছেন টিকিট কিনে আনতে। তিনি মাঠ থেকে একটু দূরে একটা জনহীন ফাঁকা জায়গায় দাঁড়িয়ে সবে একটা সিগারেট ধরিয়েছেন, হঠাৎ চোখে পড়ল অদূরেই পায়ের কাছে একটা মুদ্রা (ডাইম) পড়ে আছে। ডাইমটি কুড়িয়ে নিলেন অস্টার। পকেটে পুরলেন, এবং প্রায় অকারণেই কোনও যুক্তিবুদ্ধির রেয়াত না করেই একটা ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে গেলেন যে এটি সেই সাত সকালের হারিয়ে যাওয়া ডাইম, তাঁকে অনুসরণ করতে করতে এতদূর এসেছে।

এবারের গল্পটা যুদ্ধের। অন্তত যুদ্ধকেন্দ্রিক। দিশাহীন অস্ত্রচালনা মানুষের জীবনে যে বিপন্নতা ডেকে আনে তার হাত থেকে এক ব্যক্তিমানুষের অলৌকিক রেহাইয়ের গল্প – একবার নয় বারবার। সময়সারণি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ তিন চার মাস। পটভূমি যুগোশ্লাভিয়া। গল্পটা পল অস্টার শুনছেন এক বন্ধুর মুখ থেকে।

বন্ধুটির কাকা ছিলেন সার্বিয়ান সৈন্যবাহিনীর সদস্য, যাঁরা বীরবিক্রমে নাৎসি শক্তির বিরুদ্ধে লড়ছিলেন। একদিন ভোরবেলা জার্মান সৈন্যরা ঘেরাও করল তাঁদের আর সরাসরি চালান করে দিল সুদূর একটি পরিত্যক্ত খামারবাড়িতে। চারদিকে ধূধূ বরফের রাজত্ব আর মর্মান্তিক তুষার। তাঁরা নিজেদের ভেতর শলাপরামর্শ করে ঠিক করলেন পরিণতি যাই হোক তাঁরা একদিন খামারবাড়ির দরজা ভেঙে পালাবেন। একজন একজন করে, লটারিতে অস্টারের বন্ধুর কাকার নাম এল তিন নম্বরে।

কথামতো পরদিন সকালে প্রথমজন দরজা ভেঙে তুষারপ্রান্তরের ভেতর মরিয়া দৌড় লাগাল। হঠাৎ মেশিনগানের আওয়াজ উঠল। অলক্ষ্যে থাকা চৌকিদারদের বুলেট ছিন্নভিন্ন করে দিল প্রথমজনকে। তা সত্ত্বেও দ্বিতীয়জন পালাতে গেল। আবার মেশিনগানের দিগন্তকাঁপানো শব্দ। আবার বুলেট বৃষ্টি। দ্বিতীয়জনও মাঝরাস্তায় লুটিয়ে পড়ল। তৃতীয় ব্যক্তি হিসেবে বন্ধুটির কাকা অবধারিত মৃত্যুর মুখোমুখি খামারবাড়ি থেকে দৌড়ে বেরিয়ে এলেন। ছুটতে শুরু করলেন বরফঢাকা রাস্তা ধরে। হঠাৎ পায়ে অসহ্য যন্ত্রণা। তারপর সারা শরীর জুড়ে প্রচন্ড গরম একটা অনুভূতি। তারপর চরাচর অন্ধকার করে জ্ঞান হারানো।

যখন জ্ঞান ফিরল তখন টের পেলেন তিনি একটা কৃষকের গাড়ির ভেতর শুয়ে আছেন। গাড়িটা একটা ঘোড়া অথবা গাধা টেনে নিয়ে চলেছে। চোখ মেলে তাকিয়ে দেখতে পেলেন একটা মানুষের মাথার পিছনদিক। কয়েক মুহূর্ত সেদিকে তাকিয়েছেন কি তাকাননি হঠাৎ একটা জোরালো বিস্ফোরনের শব্দ হল আর মাথাটা ধড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে উড়ে গেল। হ্যাঁ উড়েই গেল। যেখানে পিছন দিক থেকে একটা গোটা মানুষকে দেখা যাচ্ছিল সেখানে দেখলেন একটা মুন্ডুহীন ধড় গাড়ির আসনে বসে আছে। গাড়িটা চলছে। বিস্ফোরণের শব্দ বাড়তে লাগল। আর কিছুক্ষণের মধ্যে শতশত মানুষের কোলাহলে চারদিক যেন ভরে গেল। জিপগাড়ি, যুদ্ধের ট্যাঙ্ক আর রুশ সৈন্যে যেন উপচে পড়ছে জায়গাটা। একজন রুশ কমান্ডার ঘোড়ার গাড়িটার কাছে এগিয়ে এসে বন্ধুটির কাকার রক্তাপ্লুত পা-টা দেখে আঁতকে উঠলেন। সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে অস্থায়ী হাসপাতালে পাঠিয়ে দিলেন। সেখানে সেই ঘুপশি ঘরে, আর্মিডাক্তার পা-টা পরীক্ষা করে জানালেন এক্ষুনি ওটি কেটে বাদ দিতে হবে। কাকা ভদ্রলোক চিৎকার করে উঠলেন, ‘পা কাটবেন না। আর যাই করুন দয়া করে আমার পা কাটবেন না।’ কিন্তু কে শোনে কার কথা। কয়েকজন মিলে তাঁকে বিছানায় চেপে ধরল আর রুশ ডাক্তার যন্ত্রপাতি নিয়ে তাঁর পায়ের চামড়াটা ছাড়াতে সবে উদ্যত হয়েছেন সেই মূহুর্তে কাছেই কোথাও আবার একটা প্রচন্ড বিস্ফোরণ হ’ল যার জেরে গোটা বাড়িটাই ছাদ থেকে ভেঙে পড়ে ধুলিস্যাৎ হ’য়ে গেল।

এবারে-ও মৃত্যু-ই অনিবার্য ছিল কিন্তু পল অস্টারের বন্ধুর সেই কাকা এবারও নিশ্চিন্তে জেগে উঠলেন একটা পরিচ্ছন্ন ঘরের শ্বেতশুভ্র বিছানায়, এক পরমাসুন্দরী নার্সের সাহচর্যে। মেয়েটি তাঁকে স্যুপ খাইয়ে দিচ্ছিল। আর তাঁর দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হাসি হাসছিল। পায়ে হাত দিয়ে তিনি দেখলেন তাঁর সেই বুলেটবিদ্ধ পা-টি অটুট রয়েছে। যন্ত্রণাও আর তেমন নেই। এত ঝঞ্ঝার পর এভাবে নিজেকে খুঁজে পেয়ে তিনি ভাবলেন হয়তো স্বর্গের-ই কোনও জাদুকক্ষে তাঁর পুনর্জাগরণ হয়েছে।

‘প্রিয় রবার্ট, তোমার ১৫-ই জুলাই এর (১৯৮৯) চিঠিটির উত্তরে এটুকুই শুধু বলার যে অন্যান্য লেখকদের মতোই আমি আমার লেখা নিয়ে মাঝে মাঝেই এমন চিঠি পাই।’ এই চিঠিটির-ই পরবর্তী অংশে অত্যন্ত কঠিন ভাষায়, জটিল বাক্যগঠনে, ফরাসী দার্শনিকদের উদ্ধৃতি ব্যবহার করে, নিজের প্রতি শীর্ষচুম্বী উচ্চধারণা ও আত্মতৃপ্তি প্রকাশের ভেতর দিয়ে পত্রলেখক সমসাময়িক উপন্যাস সম্বন্ধে তাঁর একটি কলেজপাঠ্য বই সম্পর্কে ওই জনৈক রবার্টের স্বাধীন চিন্তাভাবনার প্রভূত প্রশংসা করেছেন। এই চিঠিটির প্রাপকের নাম রবার্ট মরগ্যান, সিয়াটেল, ওয়াশিংটন। কিন্তু ওই ঠিকানায় কোনও রবার্ট মরগ্যানের হদিশ না পেয়ে চিঠিটি নিয়মানুযায়ী ফেরৎ আসে প্রেরকের ঠিকানায়, যেটি আশ্চর্যজনকভাবে পল অস্টারের বাড়ি। আশ্চর্যজনক এই কারণে বললাম, যে চিঠিটি পেয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা গালে হাত দিয়ে চিন্তা করেও অস্টার মনে করতে পারলেন না কবে কোন কালে তিনি এই চিঠি লিখেছিলেন। চিঠি খুলে বোঝা গেল যে এই চিঠিটা কখনোই তাঁর লেখা নয় কেননা ওই ভাষা বা ভঙ্গীমা তাঁর নয়। ওই বিষয়টা-ও তাঁর ক্ষেত্রে স্বাভাবিক নয় এবং সবচেয়ে বড় কথা হাতের লেখাটাই তাঁর নয়। তবে হ্যাঁ শাদা লম্বাটে খামের মাথায় বাঁদিকে বসানো প্রেরকের ঠিকানাটা তাঁর-ই, হাতে লেখা নয়, কাগজের ওপর টাইপ করে সেঁটে দেওয়া। বোঝা গেল কেউ একজন খামখেয়ালে-ই হোক বা মজা করেই কোনও মনগড়া রবার্ট মর্গ্যানের মনগড়া ঠিকানায় চিঠিটি পাঠিয়ে আসলে সেটা তাঁকেই পৌঁছে দিয়েছে। উদ্দেশ্য বোঝা গেল না, বিরক্তিরও উদ্রেক করল। কিন্তু এই চিঠিটি সারাজীবন কাছছাড়াও করতে পারলেন না অস্টার।

এমনই আজব ঘটনায় ভরা তাঁর জীবন। কখনো প্রত্যক্ষভাবে কখনো চোরাপথে তাঁর লেখাতেও ছায়া ফেলেছে তারা। আর তাঁর চিন্তার দুনিয়াকে করে তুলেছে অনন্য। অননুকরণীয়। কিন্তু ঘটনাগুলো আসলে কী দৈবযোগাযোগ নাকি নিয়তি নির্দেশ নাকি স্রেফ কাকতালীয় ব্যাপার স্যাপার।

সে যাই হোক, চমকদার তো বটেই। এবং বেশ মজাদার।

 

 

 

 

প্রবন্ধ

 

কবি জয়দেব বসুর সঙ্গে কিছুক্ষণ

উত্তম দত্ত

 

এক বসন্তের দুপুরে একজন কবিতা-পাগল বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে হাজির হয়েছিলাম যাদবপুরের কৃষ্ণচূড়া এপার্টমেন্টে। চার দশক আগেই জানতাম সুমিতাদি এখানেই থাকেন। অধ্যাপক সুমিতা চক্রবর্তী।  বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের আধুনিক কবিতা পড়াতেন। যেমন অসামান্য কণ্ঠস্বর তেমনি অলোকসামান্য বাচন-শৈলী। এ বঙ্গের এবং বহির্বঙ্গের সমস্ত কবির নাড়ি নক্ষত্রের খবর রাখেন এখনও।

 

ঘর ভর্তি বই আর বই। কথায় কথায় শঙ্খ ঘোষের কথা উঠল। আমার বন্ধুটির কাছে শঙ্খবাবু এক জীবন্ত ঈশ্বর।  তার হাবেভাবে সেটা অনুভব করে সুমিতাদি হঠাৎ কী এক দুর্বোধ্য কষ্টমাখা মুখ নিয়ে সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। তারপর একটু নীচু স্বরে কিন্তু খুব স্পষ্ট উচ্চারণে যা বললেন তা আমাদের কল্পনা-সীমার বাইরে ছিল : ‘ শঙ্খবাবু খুব ভালো মানুষ।  কিন্তু আমার একটা আক্ষেপ রয়ে গেল,  জানো!  আমার এখনও মনে হয়, উনি চেষ্টা করলে জয়দেবকে বাঁচিয়ে রাখতে পারতেন। কবি জয়দেব বসুর কথা বলছি। সে তো শঙ্খবাবুর খুব প্রিয় ছাত্র ছিল। ইচ্ছে করলে হয়ত তার যাপনকে আরেকটু নিয়ন্ত্রণ করতে পারতেন।’

 

এই অপ্রত্যাশিত কথা আমাকে নির্বাক করে দেয়। মনে মনে ভাবছিলাম, শঙ্খবাবুকে যতদূর জানি তাঁর লেখার মধ্যে দিয়ে, তাতে মনে হয়, প্রিয় ছাত্রছাত্রী ও তরুণ কবিদের প্রতি তাঁর ভালোবাসা আলোকিত আকাশের মতো। সেই আকাশ কাউকে বেঁধে রাখে না, বরং মুক্তি দেয় নিঃসীম আলোর মধ্যে। তিমিরবরণ সিংহ, ভাস্কর চক্রবর্তী এবং আরও অনেকের মতোই জয়দেব বসুও তাঁর স্নেহ ও ভালোবাসার কাছে সেই মুক্ত উড়ানের মন্ত্রই শুনতে পেয়েছিলেন।

 

আজ কবি জয়দেব বসুর জন্মদিন। কদিন আগে কবি সেবন্তী ঘোষ ফোন করে শিলিগুড়িতে আয়োজিত প্রয়াত কবির স্মরণসভায় আহ্বান জানিয়েছিলেন। যেতে পারিনি ব্যক্তিগত ব্যস্ততায়। কিন্তু জয়দেব বসুকে নিয়ে এই মুহূর্তে কিছু লিখতে গিয়ে হঠাৎ সুমিতাদির ওই কথাটি মনে পড়ল।

 

রক্তকরবী নামে একটি কবিতা পড়ে জয়দেবের প্রতি তীব্র আকর্ষণ বোধ করেছিলাম একদিন। সেই কবিতায় জয়দেব লিখেছিলেন :

 

“পেরিয়ে গেছি মেঝেনদের দেশ

পেরিয়ে গেছি কুষ্ঠে খসা গ্রাম,

জানো কি তুমি অনেকে এখানেও

ফিসফিসিয়ে বলে তোমার নাম।”

 

রক্তকরবীর নন্দিনী এক আশ্চর্য ধ্রুবতারা। হতাশা আর ঘন তমসার মধ্যে এক অলৌকিক আলোর বার্তা, এক প্রাণদায়ী প্রেম ও সৌন্দর্যের নিশান নিয়ে আসে ঈশানীপাড়ার নন্দিনী। আজীবন বামপন্থী আদর্শে বিশ্বাসী (শুনেছি পার্টি তাঁকে ছাঁটাই করেছিল ‘দেশ’ পত্রিকায় কবিতা লেখার অপরাধে, কিন্তু তিনি নিজে কখনও বামপন্থী সংগ্রামী আদর্শ থেকে বিচ্যুত  হননি, অথবা সুবিধেবাদী কবি ও লেখকদের মতো রাতারাতি জামা পালটে অন্য দলে যোগদান করেননি) জয়দেব তাঁর চারপাশের মলিন ও অন্ধকার রন্ধ্রে রন্ধ্রে খুঁজে বেড়িয়েছেন নন্দিনীকে:

 

“পুরাণে বলে, লোককথায় বলে

আসবে তুমি কখনো কোনোদিন

মুছিয়ে দেবে গেরস্থালি চোখ

অনামিকায় ফোটাবে আশ্বিন।”

 

এসব কবিতা পড়লে এক অপার্থিব প্রসন্নতায় ভরে ওঠে মন প্রাণ আত্মার ঘরবাড়ি। সবচেয়ে চমকে গেছিলাম এই অংশটিতে পৌঁছে :

 

“মস্ত এক পাঁচিল পার হয়ে

পরের পর দরজা ঠেলে ঠেলে

খুঁজে পেলাম তোমাকে নন্দিনী

নিখোঁজ এই পাগলিদের সেলে।”

 

এই মুহূর্তে লিখছি আর ভাবছি, আমি সারা জীবন চেষ্টা করলেও এমন একটি কবিতা লিখতে পারব না। ভালোবাসার মানুষকেও কখনও কখনও ঈর্ষা করতে ইচ্ছে করে।  ভাই জয়দেব, আমি আপনাকে ভয়ংকর ঈর্ষা করছি। সমস্ত ঈর্ষার পরপার থেকে আপনি আমাকে ক্ষমা করে দিন। কিন্তু এই ভাবনা ও যন্ত্রণা থেকে আমি কিছুতেই মুক্ত হতে পারছি না।কেন আমি এভাবে, এত অনায়াসে, জীবনকে লিখতে পারি না শব্দে ও কথা-প্রতিমায়? আপনি তো আমার চাইতে বয়সে ছোটো ছিলেন!

 

আমার অনুজ কবি শ্রীজাত বড় চমৎকার ভাষায় লিখেছেন আপনার কথা :

 

“তোমার নামে রাস্তা না হয় না হোক।

রাস্তা তুমি দেখিয়ে গেছ নিজেই।

আজ যারা সেই দুঃসাহসের বাহক

তোমার নামে বৃষ্টিতে কাকভিজে।”

 

আর একটি স্তবক আরও সুন্দর :

 

“তোমার নামে ছুটি না দেয় না দিক

লেখা সবাই ঠিকই বুঝে নেবে।

বুকের নীচে পথ গিয়েছে বাঁ দিক…

সব মিছিলই মিশেছে জয়দেবে।”

 

মিছিলের কথায় মনে পড়ল তাঁর ‘ভ্রমণ কাহিনী’র উৎসর্গপত্রটির কথা : ” হে পার্টি, আমার ঈশ্বর, তোমার চর্যাগানে এখনও মীড়ের কাজ তেমনই কোমল। প্রায় ততদূর ভালো মানব-সমাজ তুমি এনে দিতে পারো। কে না জানে পৃথিবীর অসুখ এখন।”

 

এসব পড়লে বোঝা যায়, কী নিঃসীম ভালোবাসা আর স্বপ্ন নিয়ে তিনি রাজনীতির আগুন-ঝরা পথে স্বেচ্ছায় ঝাঁপ দিয়েছিলেন।

 

রুস্তম নামের একটি কবিতায় তিনি এঁকেছেন সেই অগ্নিময় পথের প্রতিকূলতার কথা :

 

“ইয়ে লাল পার্টিকা হারামিপন ভি হামার না পসন্দ। একবার ইন লোগোঁকো চান্স দে দিয়া তো সমঝ লো বরবাদি হি বরবাদি।… হামারি মহল্লে মে সাব, আপন তো ইয়ে লাল ঝান্ডেকা চুদুর বুদুর একদম তোড়ে দিয়েছি। সালা কমনিস দেখো ঔর মারো।”

 

কিন্তু একসময় তিনি দেখলেন, পার্টি ক্রমশ আদর্শভ্রষ্ট হচ্ছে। স্বার্থপর আর ধান্দাবাজ মাতব্বর মানুষে ছেয়ে যাচ্ছে দলীয় অফিস। কমরেডরা দিনকে রাত আর রাতকে দিন করছেন নিপুণ দক্ষতায়। সেই দুঃসময়ে জয়দেব লিখেছেন :

 

“বিপ্লবীরা ক্রমশ মন্ত্রী হবে আর মন্ত্রীরা মন্ত্রীই হতে চাইবে বারবার।” ( কবিতা ২০০৬— ১২)

 

‘দুঃসময়ের নোটবই’তে তিনি লিখেছেন পার্টির এই অবক্ষয়ের কথা :

 

“পার্টি তোমাকে প্রশ্ন করার অধিকার দিয়েছিল, আর, তুমি স্বেচ্ছায় পার্টিকে দিয়েছিলে প্রশ্নাতীত থাকার অধিকার।”

 

কিন্তু সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের মতো যাঁরা দল ছেড়ে অন্য দলের সঙ্গে গোপনে বা প্রকাশ্যে আঁতাত করেন তিনি তাঁদেরও সমর্থন করেননি। কিছু মানুষ ভুল করতে পারে, কিন্তু পার্টির আদর্শ তো মিথ্যে ছিল না। স্বপ্নটা তো মিথ্যে ছিল না। স্বভাবতই জয়দেব আকণ্ঠ ঘৃণা ছুড়ে দিয়েছেন সেইসব স্বার্থান্বেষী দলত্যাগীদের প্রতি :

 

“রাজার সঙ্গে আঁতাত করেন যিনি

আমাদের সেই গুহকের প্রতি ঘেন্না।”

 

“রাজার পড়োশি হতে চান যিনি আজ

আমাদের সেই দালালের প্রতি ঘেন্না।”

(মুখুজ্জের প্রতি)

 

স্বপ্নভঙ্গ হয়েছিল তাঁর স্বাভাবিকভাবেই। ব্যক্তিগত ডায়েরিতে তিনি গভীর আক্ষেপের সুরে লিখেছেন :

 

“পশ্চিমবঙ্গে পার্টির নেতৃত্ব চলে গেছে কিছু ভীতু, অশিক্ষিত, হামবড়া মধ্যবিত্তের বাচ্চার হাতে।”

 

কিন্তু পার্টির দুর্নীতির বিরুদ্ধে মুখ খোলা যাবে না। লোকাল কমিটির দাদারা এক একজন স্বঘোষিত ঈশ্বর।  জয়দেব সখেদে লিখেছেন সেই তেতো অভিজ্ঞতার কথা :

 

“এল সি বলেছে একা কোনো কাজ নয়

হঠকারীরাই কেবল ওসব করে।

এল সি বলেছে আমাদের আগে মানো

রাজ্য কমিটি যা বলেছে সেটা পরে।”

 

তাহলে কি পার্টির কোনও অন্যায়ের প্রতিবাদ করা যাবে না? একজন শিক্ষিত সংবেদনশীল কবি ও অধ্যাপক কি একজন অর্ধশিক্ষিত ক্যাডারের মতো সবকিছু মেনে নেবেন মুখ বুজে,  বিনা প্রশ্নে, বিনা বিতর্কে? জয়দেব জানিয়েছেন সেই দুর্বিষহ অভিজ্ঞতার কথা:

 

“এল সি বলেছে আমাদের আগে বলো

একা একা কোনো প্রতিবাদ করা মানা;

জানিয়ে দেখেছি ফল যা হয়েছে তার,

শুধু আমি কেন, অন্যেরও সেটা জানা।”

 

এরপর কি তাহলে ঠুঁটো জগন্নাথ হয়ে বসে থাকতে হবে? পার্টি অফিসে বসে অলস বরাহের মতো হাই তুলতে হবে নির্বিকার :

 

“ঘরে বসে থাকি, বই পড়ি, টি ভি দেখি

এল সি-তে গেলে আলগোছে তুলি হাই;

যদি দেখি কোনো আক্রান্তের মুখ…

এল সি বলেছে….. বাপরে, এড়িয়ে যাই।”

 

(আমার লোকাল কমিটি)

 

জয়দেব সহিষ্ণু বরাহ অবতার হতে পারেননি।

 

কী ভয়ংকর মানসিক অস্থিরতা তাঁকে সেইসময় কুরে কুরে খেয়েছিল, তা বোঝা যায় সেই সময়ে লেখা তাঁর একের পর এক কবিতা ও দিনিলিপি থেকে:

 

” তোমাকে তাড়িয়ে দেবে? দিতে পারে। তুমি সেই লোক,

চোখ বুজে থাকে না যে, স্বজন বন্ধুর কাছে বিপজ্জনক। ”

 

” লেনিন নিষিদ্ধ রক্তে? ক্লীবতারই কাছে আজ ঋণ?

অস্বীকার করো পার্থ, কথা দাও তুমিই লেনিন।”

 

(আমার ভগবদগীতা)

 

“আমাকে ঘিরে গজিয়ে উঠেছে অসাধারণ সব সমস্যা। অর্থাৎ ‘দেশ’ পত্রিকায় লিখব কিনা, পার্টিতে আর কদ্দিন আছি, কে আমার প্রোমোটার —শঙ্খবাবু না সুনীল গাঙ্গুলি? সোমবার আমায় এ মেয়ের সঙ্গে তো মঙ্গলবার ভিন্ন মেয়ের সঙ্গে!”

 

(নিজেকে দেখুন/ ভবিষ্যৎ)

 

‘মায়াকোভস্কির শেষ সাত দিন’ নামের একটি তীব্র ও শানিত কবিতায় জয়দেব অত্যন্ত দুঃসাহসিক ভাষায় উগরে দিয়েছেন পার্টির ঘুণধরা অবক্ষয়ের কথা :

 

“কে জানে কতদিন আমি বাস করছি বিছানাভর্তি ছারপোকার সঙ্গে, আর স্বপ্নে দেখছি হতাশাব্যঞ্জক, ভীতিকর কয়েকটা শব্দ। দেখেছি পার্টিলাইন শব্দটা কেটে দিয়ে লেখা হচ্ছে জমায়েত আর মহামিছিল। গঠনতন্ত্র কেটে দিয়ে প্যানেল এবং পাল্টা প্যানেল, যোগ্যতা কেটে দিয়ে সিনিয়রিটি, মতাদর্শ কেটে দিয়ে কালেকশন। আর বিপ্লব শব্দটা — কতদিন দেখি না — কতদিন?”

 

তরুণ কবিদের প্রতি তাঁর ছিল পর্যাপ্ত ভালোবাসা, সাগ্রহ মনোযোগ।  সেই মনোযোগ ও ভালোবাসা থেকেই কখনও কখনও তিনি সতর্ক করে দেওয়ার ভঙ্গিতে লিখেছেন:

 

“সারাক্ষণ এর পিছনে ওর পিছনে কাঠি না দিয়ে লেখো, ইডিয়ট, লেখো। শতাব্দী শেষ হয়ে আসছে, যদি পারো এই ফাঁকে আরো কয়েকটি কবিতা সংযোজন করে যাও মানুষের স্মৃতির পাতায়। কয়েকটি কবিতামাত্র।” (ডায়েরি  থেকে)

 

“কবিতা লেখার দুবছর পোস্টার সেঁটে নেওয়া ভালো/ কায়িক শ্রমের ফলে বিষয় মজবুত হয়…. এবং সমান ভালো / রান্না শেখা, জল তোলা, মানুষের কাছাকাছি থাকা…./

আমি অভিজ্ঞতা থেকে এই পরামর্শ দিয়ে যেতে পারি।/ মারকুটে কাব্য করো, বুদ্ধিমান রকবাজ কবিতা বানাও,/ পাঠকের পাকস্থলী সেরকম দুর্বল হলে মুখ বুজে সহ্য করো সব, / সহ্য করো উপেক্ষার শীতঝড়, নেতাদের উপদেশবাণী/ দাঁতে দাঁত চেপে থাকো, সহৃদয় বুদ্ধিমান হও, তবু / তরল কোরো না সেই কথামৃত, মার্ক্স পড়ো, সাংখ্যও পড়ো/ ঝান্ডা-কবিদের মতো সরিয়ে রেখো না পাশে হিমেনেথ।”

 

(জনগণতান্ত্রিক কবিতার ইস্তেহার: এক)

 

তরুণ কবিদের প্রতি তাঁর নিবিড় ভালোবাসার বড় চমৎকার প্রকাশ ঘটেছে একটি লেখায়:

 

“তরুণ কবিরা শুনি/ অনেকেই অতিবিপ্লবী

কেউ কেউ দাড়ি রাখে। কেউ যায়/ খালাসিটোলায় বাকিসব করে রব এখানে সেখানে। তবু তারা/ নিয়মিত জ্যান্ত কবিতা লিখে থাকে।… / এসো ঐ কবিদের ছুঁয়ে দেখি/ অনুভূতিদেশ।”

 

প্রজন্মের ব্যবধান ভেঙে তিনি তরুণ কবিদের উষ্মাকেও ভালোবেসে লিখেছেন:

 

“যখন আমায় নিঃশেষিত ভাবো

তখন আমি উড়াল দিই হাওয়ায়

যখন আমায় দ্বীপান্তরী ভাবো,

আমি তখন তোমার ঘরের দাওয়ায়।”

 

জয়দেব বসু একটি জ্বলন্ত আগুনের গোলা। তাকে দুহাতে বেশিক্ষণ ধরে রাখা কঠিন। কিন্তু এই জয়দেবই আবার এক নরম নীলকণ্ঠ পাখি। সেই পাখির পালক যখন  নির্জন মধ্যরাতে ঝরে পড়ে সুদূর আকাশ থেকে তখন আমাদের প্রাণ স্নিগ্ধ হয়ে ওঠে, আত্মায় শোনা যায় মধুমক্ষিকার গুঞ্জন। নরকে বসন্ত আসে সেই আশাবরী রাগে :

 

* ” খাওয়া হয়নি শালিধানের চিঁড়ে

খাওয়া হয়নি সোনামুগের ডাল,

দেখা হয়নি পুণ্যিপুকুর ব্রত

স্বপ্নে আমার বউ আসেনি কাল।” (বাসনা)

 

* “লেখা আমার মা,

আমায় ছেড়ে যেন তুমি কোথাও যেও না।

….লেখা আমার মা,

আঁচল দিয়ে আগলে রেখো, কোথাও যেও না।”

 

* “তুমি দেবী চৌধুরানি, আমি ব্রজেশ্বর

আমি তোমার আশকারাতে চন্ডাল বর্বর।”

 

* “তুমি আমার গোসলপানি, আমি কানের দুল

তুমি আমার বেগুন দিয়া ইলশা মাছের ঝুল।”

 

(২১ শে ফেব্রুয়ারি বা ১৯ শে মার্চ: তোমাকে)

 

কী চমৎকার ছন্দের হাত। কী গদ্য কী পদ্যছন্দে, কী অনায়াস সঞ্চরণ! ভাষা বিষয়ে নেই কোনও ট্যাবু, নেই শুচিবায়ুতা। এমন শক্তি ও ভালোবাসা,  এমন কাঠিন্য ও কোমলতা, এমন ঋজুতা ও নমনীয়তার অবিশ্বাস্য সমন্বয় সাম্প্রতিক বাংলা কবিতায় খুব বেশি দেখেছি কি?

 

প্রতিদিন কত কবিতা পড়ি আমরা। আলোচনাও করি যথাসাধ্য। কিন্তু এরকম একজন তাজা ও জ্যান্ত কবিকে নিয়ে যতটা আলোচনা ও আলোকপাত প্রয়োজন ছিল, তা হয়েছে কি?

 

যেখানেই থাকো, ভাই জয়দেব,  আমার আজ ও আগামীর সবটুকু ভালোবাসা তোমাকে দিলাম।

 

© উত্তম দত্ত

(বই কথা কও: ১)

 

কবি : জয়দেব বসু

জন্ম: ১২ মে ১৯৬২

চলে যাওয়া : ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১২

অধ্যাপনা করতেন দমদম মতিঝিল কলেজে

পড়াশোনা করেছেন : শান্তিনিকেতন,  প্রেসিডেন্সি কলেজ ও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে।  বিষয় : বাংলা ভাষা ও সাহিত্য

বাবা: পরিতোষ বসু ( নড়াইল/ সিঙ্গিয়া)

মা : বেলা বসু ( টাঙ্গাইল/ সাজাইনপুর)

স্ত্রী : কবি সেবন্তী ঘোষ

ছেলে : মৌর্য বসু (জুরা)

 

কয়েকটি বই :

মেঘদূত ( দীর্ঘ কবিতা)

ভবিষ্যৎ

জীর্ণপাতা ঝরার বেলায়

ভ্রমণকাহিনী

উত্তরযুগ

লুপ্ত নাশপাতির গন্ধ

সাইকোপ্যাথ

জয়দেব বসুর কবিতা

জয়দেব বসুর শ্রেষ্ঠ কবিতা

ধারাবাহিক

লোহার

মণিশঙ্কর

অনুকথা

(এগারো)

এখনই যে এভাবে বর্ষা শুরু হবে তা কেউ ভাবেনি। গতরাত থেকেই মেঘের হাঁকডাক শুরু। আর কাকভোর থেকে অঝোর। ফলত লোহারপাড়াটা গৃহপালিত শুয়োর-মুরগীর সঙ্গে খোঁয়াড়বন্দি। এখন, এই সন্ধ্যার গোড়ায় এসে টান পড়েছে অঝোরে। তবে নুনগুড়ির বিরাম নেই। তার সঙ্গে মিশেছে একটা মেছো বকের একটানা সুর– জল দে মাছ খাবো, জল দে মাছ খাব। এসুর পোয়াতি মেঘের ভারকে বাড়িয়ে দিচ্ছে বেশ কয়েকগুন। তারমধ্যে কয়েকটা চড়ুই চালসাঙার বাসা ছেড়ে নেমেছে উঠোনে। চিড়িক-চাড়িক করে খাবার খুঁটছে। গরবি মাথার উপর কাপড়ের খুটটা তুলে দিয়ে উঠোনের একধারে এসে দাঁড়াল। খুলে দিল মুরগীখোঁয়াড়টার মুখ। অমনি গোটাপাঁচেক ছোটোবড়ো মুরগী আর দু’টো মোরগ কুঁককুঁক করতে করতে বেরিয়ে এল। একটা মোরগ ডানা ঝাপটে আড়মোড়ার ভাঙল। সঙ্গে গলা ফুলিয়ে ছাড়ল ডাক– কুঁক-কুঁক-কুঁকড়ুচ্চু।

একভাবে ডেকে উঠল অন্য মোরগটাও। সঙ্গে সঙ্গে সাড়া দিল সারাপাড়া। মুখর হয়ে উঠল চারিদিক। গরবি কিছু ধান ছড়িয়ে দিল ভিজে উঠোনে। ডাকল, “আয়-আয়, খা। চাট্টি খাঁইয়ে ল্যা দেখি। আজ সুকাল থাকে ত একটি দানাও যায় নাই তুদের মুয়ে।” জনককে বলল, “হ্যাঁ গ, বরাগুলাকেঅ একটুকুন খুলে দুব নাকি?”

জনক দাওয়ায় বসে আছে। চুপচাপ। আনমনে তাকিয়ে আছে ভিজে উঠোনটার দিকে। মুখে তার অদ্ভুত প্রশান্তি ছিড়িয়ে। তাই মৃদুগলায় বলল, “নাঃ, ই সঞ্ঝ্যাবেলাতে আর উয়াদেরকে ছাইড়ে কী করবি! রাতে মাড়েভাতে ধরে দিলেই হবেক্।”

তারপর আবার আচ্ছন্নের মতো ডুবে গেল নিজের ভাবনায়। আজ আষাঢ় মাসের পাঁচ। আর দু’দিন পরেই অম্বুবাচী। লোহাররা বলে আম্বাবতী। তার বাপের আমল পর্যন্তও এই দিনটা ছিল তাদের কাছে এক বিরাট পরবের দিন– আষাঢ়ি পরব। পয়লা আষাঢ় থেকেই পাড়ায় শুরু হয়ে যেত তার প্রস্তুতির ব্যস্ততা। বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠমাস গলার জমিতে গরুর গাড়িভর্তি গোবরসার চালানো আর বীজতলা জতরানোতে ব্যস্ত থাকত সকলেই। তারপর রোহিণীর দিনে ছড়াত বীজ।

রোহিণীর কথা মনে উঁকি দিতেই তার বাপের কথা মনে পড়ল জনকের। যেমনটা ইদানীং হয়। সকলের অজান্তে। চাষবাসের এমন অভিজ্ঞতা ক’জনের থাকে! গ্রীষ্মকালে আকাশের রঙ দেখে বলে দিতে পারত সেবছর বর্ষার বাত কেমন হবে। আর জ্যৈষ্ঠমাসের বারো তারিখ এলেই সুর ক’রে ছড়াকাটত,

“রোহিণীর বিচেতে(বীজে) লোকে খায় দুধেভাতে

ম্যাঘের বাতে লাগালে বীচ হয় ঘাসেপাতে

আর ডাহাতে বীচ লাগালে ভাই হয় রে হায় হায়

চাষীর ত্খন মাথায় হাত কী করবেক্ তায়।”

কিন্তু এখন আর চাষীদের কাছে এসবের কোনও অর্থ নেই। রোহিণীতে বীজ ছড়ানোর ঝুঁকি কেউ নেয় না। বর্ষা নামলে ধান ভিজিয়ে অঙ্কুরিত বীজ আছাড়ে দেয় কাদাভরা বীজতলায়। জমিতে উগল-পাখনা দিয়ে ঘাসপাত বা মাটিকেও পচাচ্ছে না কেউ। একদিনে ঘেঁটেঘুটে পুতে দিচ্ছে ধানের গুছি। তারপর দমেমস্ত ইউরিয়া-ডিওপি। অমনি আষাঢ়ি মেঘের মতো দু’দিনেই হেরিয়ে আসছে ধানের গোছা। কিন্তু জনক ঠিক করেছে অত খরচ সে করবে না। সেকথা বলেও দিয়েছে নিমাই মড়লকে, “দ্যাখ মড়ল, চাষ কইত্তে বলচ বটে। কিন্তুক্ আমি আমার পারা কইরে চাষ করব। তখন কিছু বইলতে পাবে নাই কিন্তুক্।”

নিমাই মড়ল বুঝতে পারেনি জনকের কথা। সংশয় প্রকাশ করে বলেছিল, “তুর পারা কইরে মানে? তুঁই আবার লোতুন কইরে জমি জতরাবি নাকি রে ব?”

“না, লোতুন কইরে ক্যানে হবেক্! যেমন কইরে বাপ-ঠাকুদ্দাদারা করিচে তেমন করেই করব। উগলাব, পাখনা দুব, তাবাদে যাঁইয়ে ক্ষেত কাদাইঁয়ে গুছি পুতব। তাগাদা দিলে কিন্তুক্ আমার দ্বারা হবেক্ নাই। আগেভাগেই বইলে রাখচি।”

“হঁ রে ব, হঁ। আমরাও সেসোব জানি। কিন্তুক্ চাষারা কি আর সাদে উসোব করে নাই ভাবিস্! তু শালা ছুটুলোকদের যা মিজাজ হঁইচে! হুঁ-কত্তেই ত ইস্টাইক ডাকে বসিস্। দায়ে পড়েই উসোব বাদ দিতে হঁইচে। ত, তুঁই যখন সেসোব কইত্তে খুঁজচিস তখন ত স্যা ভাল কথাই বটে রে ব। মাটি ত আর শুদু মাটিই লয় রে! মা-টিঅ বটে। ত তাখে যতন-আত্তি না কইল্লে চলবেক্ ক্যানে! শুদুমুদু আমি তুর পঁদে তাড়া মাইতে যাব কি লাইচতে!”

জনক কিন্তু আসল কথাটা চেপে গিয়েছিল। রাতের স্বপ্নের কথা শুধু নিমাই মড়ল কেন, গরবিকেও বলেনি। কিন্তু মন তো কেঁদেছে। দেউয়ী বলে কথা! সে যদি স্বপ্নে এসে এমন হাউমাউ করে কাঁদে তাহলে মানুষের দেহ ধরে নিজেকে ঠিক রাখে কেমন করে! আর ওই ক্ষতবিক্ষত স্তনজোড়া! ভেদকিফোটা যোনি– সে-ও তো দেউয়ীরই। সেসব দেখিয়েই তো দেউয়ী কেঁদে বলেছিল, “হ্যাঁ রে জনকা, তুর বাপ ত নাইলে আমাকে ভুলে দিন বদলানতে মাতলেক্। আর তুঁই! তুঁই থাকতেও আমার অমন দশা হবেক্ বাপ্! দেউ নাইলে তুদেরকে লিজের রাজ্য থাকে খেদেই দিঁইচে, তাই বলে কি আমি কখনু তুদেরকে লিজের ছাঁয়ের থাকে কিছু কম করিচি?”

জনক বুঝতে পারেনি দেউয়ীর ইঙ্গিত। ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বলেছিল, “ক্যানে মা, আমি কী করিচি?”

“না, তুঁই আর কী করবি বাপ্! করিচে আমার কুপালে! কিন্তুক্ উ জমিজিরাত যে আমার যোনিই বটে রে, ইকুথা ক্যামন কইরে ভুলে গেলি বল দেখি?”

“ভুলি নাই মা, একদিনকেও ভুলি নাই। কিন্তুক্–”

“কিন্তুক্ আবার কী বটে রে? কিন্তুক্ আবার কী বটে, আঁ! উ বিষ দিঁইয়ে আমার গুটা গতরকে যে ভেদকিফুটা কইরে দিলি বাপ্! আমি যে আর উ বিষের জ্বলন সইতে লাচ্চি রে!”

“বিষ! ই তুমি কী বইলচ গ মা!”

“ঠিকেই বলচি বাপ্! বিষ ছাড়া উ আর কী বটে। ফলন ফলন কইরেই মল্লি। কিন্তুক্ উয়াতে যে আমার কী হছে তা একটি বারের লাগে ভাবলি নাই বাপ্!”

“তা লিঁইয়ে আমরা কী করব, তুমিয়েই বল ক্যানে! জমিজিরাত কি আর আমাদের রইচে গ! যাদের চাষ তারা যদি হড়হড়াঁইয়ে ঢালে উসোব ত আমাদের আর কী করার থাকে! কামিন-মুনিস ছাড়া ত আর কিছুয়েই লই!”

“না, লোস্। তবু তুরাই ত ঢালিস্! হ্যাঁ রে, তুদের অত অভর প্যাট! মায়ের দেহিকে অমন কইরে বিষের জ্বালায় জ্বলাতে আছে রে বাপ্! এক কালকূট গলায় ধরিছিলেক্ দেউ। ত তার জ্বলনকেও হার মানায় ছিলেক্ আমার বুকের দুধ। আর ই বিষ যে তার থাকেও জ্বালা ধরানঅ বটে রে! আমাকে তুঁই বাঁচা বাপ্ আমার। আমাকে তুঁই বাঁচা। আমি তুখে দু’হাত ভরে ধান দুব রে।”

হাউমাউ করে কেঁদে ফেলেছিল দেউয়ী। আর তখনই তড়াক করে ঘুম ভেঙে গিয়েছিল জনকের। প্রথমটা ধাঁদুমাদু লেগেছিল তার। কিছুই বুঝতে পারেনি। তারপরই শুনতে পেয়েছিল, কে যেন ডুকরে কাঁদছে। তাদের উঠোনেই তো! জনক বিছানা ছেড়ে বেরিয়েছিল বাইরে। কিন্তু রাতের আঁধারচিরে জোনাকির আঁকিবুকি ছাড়া আর কিছু দেখতে পায়নি। ডুকরানো কান্না ছাড়া শুনতেও পায়নি কিছু। এমনকি রাতচোরা পাখির বুককাঁপানো কুব শব্দটাও থমকে ছিল শ্যামপুকুরের পারে।

সে রাতের পর থেকে জনক যেখানেই যাচ্ছে সেখানেই নেপথ্য আবহের মতো শুনতে পাচ্ছে ওই মুখচাপা কান্না। ওই হায় হায়, আর আবছায়ায় দেখতে পাচ্ছে, ভেদকিফুটা একটা নারীদেহ। কিন্তু স্বপ্নে শোনা সে কান্না কাউকে বলতে পারেনি। যেমন বলতে পারেনি নিমাই মোড়লকেও। শুধু নিজের সিদ্ধান্ত জানিয়ে ফিরেছিল ঘরে।

বলেছিল বটে, সঙ্গে চিন্তাও বেড়েছিল। ওভাবে চাষ করতে গেলে যে সময় লাগবে তাতে লেবারে পোষাবে না। তাছাড়া ওসব বিষ না দিলে কী আর ফলন হবে! গোবরকুড় তো ফাঁকা। আগের পারা না আছে গাইগরু আর না আছে তাদের গোবর। তবু এই ক’দিনে জনক আর গরবি শূন্য মাঠে মাঠে গোবর কুড়িয়েছে। কিন্তু তা কতটুকুই বা! তাই ভেবেছে এ বছরটা অন্তত ও বিষ ঢালতেই হবে মাঠে। তাতে দেউয়ী স্বপ্নে এসে যতই তাকে জ্বালাক না কেন!

যদিও এসব ভাবনা সবসময় জনককে অস্থির করে রাখছে। তবে তা তাকে ততখানি জব্দ করতে পারেনি। সব থেকে বেশি কাবু করেছে পঞ্চায়েতের খবরটা। কানাঘুষায় সে যা শুনেছে তাতে চিন্তার কথাই। ভেতরে ভেতরে নাকি সকলকে তার সঙ্গে চাষ করতে মানা করেছে সুভাষ মান। তাতে কেলিয়াও খানিকটা আশ্বাস পেয়েছে। যদিও জনকের বিশ্বাস তার কথা পাড়ার লোক কেউ ফেলে দেবে না। বিপদে-আপদে সে তো তাদের পাশে সবসময় থেকেছে। তাহলে!

এই তাহলেতে এসে জনক থমকে দিল তার ভাবনার গতি। দাওয়া থেকে নেমে দাঁড়াল। চলে এল কারু লোহারের ঘরের সামনে। হাঁক পাড়ল, “কারু ঘরে রইচিস রে?”

“হঁ-হঁ, ক্যা বটিস? জনকা না ক্যা রে?”

“হঁ, আমিয়েই বটি। একটুকুন বেরাঁইয়ে আয় ক্যানে! তুর সঙে দু’টা কথা ছিলেক্।”

বেরিয়ে এল কারু। বলল, “বল, কী বলবি?”

প্রথম জিজ্ঞাসাতেই খটকা লাগল জনকের। ঘরের দাওয়ায় ডাকা নেই। বসতে বলা নেই। সরাসরি কারণ জানতে চাওয়া! তাও এমন গলায়! এমনটা তো হওয়ার কথা নয়! তবে কি! জনক মনে মনে নিজেকে প্রস্তুত করল আসল ধাক্কাটা খাওয়ার। বলল, “তুরা ত সোবেই শুনেচিস। ইবছর নিমাই মড়লের আইদরি চাষটা আমিয়েই লিলম।”

“হঁ। স্যা শুনেচি বৈকি!”

“ত, তুরা সোব খাটবি ত আমার সঙে?”

“বাকিদের কথা বাকিরা লিজরাই বইলবেক্, আমি ত আর সুবায়ের ঠিকা লিঁইয়ে বইসে নাই! তবে আমি তুর সঙে খাইটতে লাইরব, ইকুথা সাফ জানাই দিলম। আমি গতান্যাতে ঢুকে গেইচি।”

“ক্যানে? লারবি ক্যানে? অতদিন ত নিমাই মড়লের ক্ষেতেই মুনিস খাটে আসেচিস! থালে ই বছর কী হলেক রে ব?” ভ্রূ-কুঁচকে জানতে চাইল জনক। কারু প্রশ্ন এড়িয়ে গিয়ে বলল, “শুন্ জনকা, অ্যাত জবাব তুখে আমি দিতে লাইরব। তবে জানতে খুঁজলি তাথেই কথাটা তুখে জানাই দিলম। পরে আবার আমাকে ক্যানে দোষ দিস! তার থাকে আগেভাগে বলে দিয়াই ভাল।”

“সে নাইলে ভাল। কিন্তুক্ আজকে আমার বেলায় না বলে দিলি! ক্যানে? আমি কি তুরদেরকে কেলিয়ার থাকে কিছু কম দুব? ইটা ত ভাল কথা লয় ব!”

“ক্যানে, ভাল লয়টা ক্যানে শুনি? তুঁই যা করবি তা সোবেই ভাল, আর আমরা কিছু কইল্লে পদেই সেইট্যা খারাপ বটে! তুঁই আমাদের কাখে মাইনেচিস, য্যা আজকে তুর মানের কুথা বইলতে আইচিস?”

স্পষ্টতই অসন্তোষের ইঙ্গিত পেল জনক। অমনি দুম করে জ্বলে উঠল তার মাথা। হেঁকে উঠল সে-ও, “ব্যাশ, করিস নাই কাজ। তুঁই ইকা কাজ না কইল্লে আমার চাষের গুছি উঠবেক্ নাই, স্যাকথা ভাবিস নাই।”

“হঁ-হঁ, আমরাও দেখে লুব কী কইরে চাষ করিস তুঁই। শালা জাতভাইয়ের প্যাটে লাত মাইত্তে তুর একফঁটা মনে বাজে নাই! শুধু আমি ক্যানে গুটা নুয়ারপাড়ায় কেউ মুত্তে যাবেক নাই তুর ক্ষ্যাতে। ই কথাটা ভাল কইরে শুনে রাখ।”

এর উত্তরে জনক আর কিছু বলল না। বোঁ করে ঘুরে চলে এল কারুর উঠোন ছেড়ে। দাঁড়াল গুইরামের বাদাড়গোড়ায়। হাঁক দিল, “দাদা রইচিস্ রে? অ্যা দাদা!”

“হঁ রে! ক্যানে, কী হঁইচে কী?”

“একবার আমার ঘরকে আয় ত। আর শুন বড়কিকেও লিঁইয়ে আয়। আমি বালি বৌকেও আসতে বলচি।”

“ইবাবা! বিপারটা কী বটে সেইট্যা বলবি ত আগে!”

“তুঁই আয় না ঘরকে। তাবাদে বলচি সোব।”

আর দাঁড়াল না জনক। একেবারে বালিকে ডাক দিয়ে ফিরে এল ঘরে। বসল দাওয়ায়। তার দুমদাম পা ফেলায় ভিড়কে গেল চড়ুইগুলো। ফুড়ুৎ-ফাড়ুৎ করে উড়ে গেল চালসাঙার বাসার দিকে। গরবি ভ্রূ-কুঁচকে বলল, “কী হলেক্ গ আবার? অমন কইরে–”

কিন্তু তার জিজ্ঞাসা শেষ হওয়ার সুযোগ পেল না। তার আগেই গুইরাম আর পার্বতী এসে দাঁড়াল জনকের সামনে। গুইরাম বলল, “বল, কী বলবি?”

এল বালিও। জনক সকলকে বলল, “দাওয়াতে উঠে আয়।”

সকলেই দেখল আকাশের জলভরা মেঘ থমথম করছে জনকের মুখের রেখায়। তবু দাওয়ায় বসল একে একে। জনক বলল, “তুরা সুবাই ত জানিস্, মড়লের চাষটা আমিই লিঁইচি। অখন তুরা বল, আমার সঙে মাঠে নামবি? না সোব গতান্যাতেই জেবন কালি করবি?”

“তুর সঙে মাঠে নামব আবার কী রে? আমরা যে বাউনকত্তাদিগকে গতান্যা–”

“হঁ-হঁ, স্যা আমিঅ জানি। উ লিঁইয়ে তুখে ভাবতে হবেক্ নাই। গতান্যা থাকে জনম লেখে দিস্ নাই তুঁই উয়াদেরকে। আর আমি তুদেরকে কামিন-মুনিস খাটতেও বলি নাই। ঘরের সুবাই মেলে চাষ করব। ভাগ যা পাব, তা সুবাই সুমন ভাগাভাগি কইরে লুব। ইবারে বল, কী বলচিস্?”

“দ্যাখ ছুটুকত্তা, আমি কনকালেই গতান্যা খাটি নাই।” আগবাড়িয়ে বালিই মুখ খুলল। বলল, “য্যা ডাকে, তার মাঠকেই ছুটি। থালে তাদের মাঠ আর তুমার মাঠ। আমার কাছে একেই হলেক্।”

জনক বলল, “থালে তুঁই থাকচিস্ আমার সঙে! আর গুইয়াদাদা? তুরা কী করবি?”

“সেই ত রে ব! ই য মহা আতন্তরে ফেল্লি। এখ্যানবুড়িকে সাক্ষিমানে বাউনকত্তাকে কুথা দিঁইচি–”

“কুথা দিঁইচি ত কী হঁইচে।” খেঁকিয়ে উঠল পার্বতী। বলল, “ছুটুকত্তা ত কিছু মন্দ বলে নাই। আর কেউ হলে আঁকাড় কইরে লিজের হাতেই রাখথক্ চাষ। আর উ যাচে আমাদেরকে ঢুকাতে খুঁজচে। শুন, ছুটুকত্তা, তুমার দাদাতে যা বইলচে বলুক্ ক্যানে, আমি তুমার সঙেই নামব মাঠে।”

“ই ত শালা আচ্ছা ঝঞ্ঝাটে পড়া গেলেক্! অ্যাখন ঘর রাখি না বার রাখি! ত, হ্যাঁ রে, বলি, মড়লের মাঠে আগে যারা ছিলেক্ তারা কী বইলচে?”

“তারাতে কী বইলচে না বইলচে, স্যা লিঁইয়ে তুখে মাথা ঘামাতে হবেক্ নাই। তুঁই আপনার তুরটা বল।” মুখের রেখারা এঁকেবেঁকে উঠল জনকের। গুইরাম তবুও কোনও সিদ্ধান্ত জানাতে পারল না। জনকই বলল, “ব্যাশ, তুখে এখনেই কিছু বলার দুরকার নাই। দু’দিন ভাবে ল্যা। তাবাদে আমাকে বলবি। অ্যাখন যা। আমার আর ভাললাগে নাই চাঁদি!”

আর কথা বাড়াতে দিল না জনক। কথা বাড়াল না বাকিরাও। একে একে উঠে গেল সেখান থেকে। গরবি জনকের কাছে এসে বলল, “কী হঁইচে বল দেখি? অ্যাখনেই কত ভাল ছিলে আবার এখনেই–”

অমনি জনকের কানে ভেসে এল আদ্যিকালের কান্না– চাষ চাষ কর দেউয়ী চাষ বড় জঞ্জাল… দুমড়েমুচড়ে গেল তার মুখের রেখারা। চোখ তুলে চাইল গরবির দিকে। গরবি দেখল, রাঙাজবার মতো লাল হয়ে উঠেছে চোখজোড়া। অমনি তার নিজের বুকটা টনটন করে এল। জনক বিড়বিড় করল, “শালারা সোব এক হঁইচে! এক হঁইচে জনকা নুয়ার বিরুদ্ধে! আমিঅ জনকা নুয়ার, কালিন্দী নুয়ারের ব্যাটা। জান দুব তবু মান দুব নাই। ই জঞ্জালে যদি আমিঅ সুনা ফলাঁই না দেখাঁইচি ত আমি একবাপের ব্যাটা লই। শালারা পাটি মারাচ্চে। হুঃ, পাটি!”

গরবি বুঝল সবই। তাই আর কথা বাড়াল না। কথা বাড়াল না জনকও। পুঁটিকে নিজের দিকে টেনে নিয়ে তাকাল আকাশটার দিকে। দেখল, সারা আকশে জলভরা মেঘ ধীরে ধীরে লাল হয়ে উঠছে। সেই লালের ঘনত্ব ফুঁড়ে ভেসে উঠছে একটা মুখ। তার ঢেউ খেলানো ঝাঁকড়া চুল ছড়িয়ে পড়ছে আকাশজুড়ে। তবু ঢাকা দিতে পারছে না লালের বন্যা। জনক মনে মনে বিড়বিড় করল, “বাপ্ হ্যা, আমিঅ জানি, ই শালার জঞ্জালেই বটে। তবু ইয়াকে না যোতলে ই প্যাটের খুল্যা যে মানবেক্ নাই বাপ্! আজ থাকে তুর লাল আর আমার লাল আলেদা করে দিলম বাপ্। জমি আমি জতরাবোই।”

কিন্তু তার মনের এসব খবর গরবি পেল না। কোনও সান্ত্বনাও দিতে পারল না জনককে। শুধু এই আষাঢ়ি মেঘের মতোই ভারী হয়ে এল তার চোখজোড়া। হঠাৎ জনক বলল, “ছুটুবৌ, আম্বাবতীর আর মাত্তর দু’দিন রইচে। আর ত ঘরে হেঁড়্যা পাতা যাবেক্ নাই। স্যা নাইলে আমি সাঁওতাল পাড়াতে যাঁইয়ে লিঁইয়ে আসব। তুঁই বাকি জুগাড়জান্তি কর। আমি আম্বাবতীর দিনকে আষাঢ়িতে বাবা কালকুদরার থানে হাল-ফালের পূজা দুব। রাতজাগাব বাবাকে। মাটিমু করাব কদালকে। তবে নামব মাঠে। দেখি ক্যা বড় হয়– দেউয়ের শাপ-শাপান্তি, না আমার বাপ-ঠাকুদ্দাদার পাথরগলান রক্ত– পাটির পঁদধরা হারামিগুলান, না বাবা কালকুদরার বর!”

জনকের সব কথা যে গরবি বুঝল এমনটা নয়। তবু বলল, “বাবা কালকুদরার পূজা ত আর এমনি এমনি হবেক্ নাই। বরা বলি দিতে হবেক্। তাবাদে ধর ক্যানে, আমাদের কেউয়েই ত আর উয়ার পূজা করে নাই গ। দিঁইয়ে পদে যদি ই লিঁইয়েও কোনু গোল বাঁদে পাড়াতে?”

“বাঁদাক গোল। আমি নুয়ারের বাচ্চা নুয়ার। আর কেউ লই, লই আমি আর কেউ। আমার জাতে পাথর গলাঁই লুয়া বার করেছিলেক্। আর তাদের রক্ত হঁইয়ে লিজেকে বিকাঁই দুব হাঁ সুভাষ মানের পঁদে! পাটির পঁদে! কিছুতেই লয়। ই আমার জাতধম্ম বটে। হঁ-হঁ, বটে আমার জাতধম্ম। আমি বরাও বলি দুব আর গায়েন গাঁইয়ে রাতঅ জাগাব বাবাকে। দেখি কন শালা আমার কীট্যা কইরে ল্যায়!”

জেদ চাগাড় দিল জনকের মাথায়। চোখজোড়া কুচলাফলের মতো রাঙা হয়ে উঠল। সারাশরীরের রক্ত বনবন করে ছুটতে লাগল মাথার দিকে। তারই দপদপ শব্দে জনকের কানে জেগে উঠল শয়ে শয়ে পা ফেলার শব্দ। তেড়ে আসা হৈ-হৈ রৈ-রৈ। দুমদাম লাঠির শব্দ আর একটা লোকের আর্তনাদ। সেই সঙ্গে মিলিত শ্লোগান– বন্দে-মা-ত-রম– ইন-ক্যা-লাপ  জিন্দা-বা-দ!

জনক মনে মনে আবার বিড়বিড় করল, “বাপ্! পাশে থাকিস্ বাপ্! আমি তুর নাম ডুবাব নাই। তবে আজ থাকে রাস্তা আলেদা। তুর রাস্তা তুর আর আমার রাস্তা আমার।”

অমনি আকাশ চিরে দিল নীলচে ঝিলিকে। ধামসার বোলের মতো গুড়গুড় করে উঠল মেঘ। কারা যেন ফূর্তিতে নেচে উঠল সারা আকাশজুড়ে। অট্টহাসির সঙ্গে গেয়ে উঠল– “চাষ চাষ করিস্ দেউয়ী চাষ বড় জঞ্জাল…”

হঠাৎ মেঘবতী সন্ধ্যাটা আবার জমাট বেঁধে এল। এমন সময় সাগরা তার বেঢপ শরীর নিয়ে নাচতে নাচতে উঠোনে ঢুকল। সঙ্গে হেঁড়ে গলায় হাঁকল পাল্লার গান,

“বলে সাঙাত আমার লোক ভাল

এমন মনে

তার এমন ক্যা দাগা দিল

মাইরি এমন মনে…

হে-হে-হে– কী হইলেক হ্যা সাঙাত? মু’খ্যানা অমন হাঁড়িপানা কইরে বইসে রইচে ক্যানে? আস-আস। দু’সাঙ্গাতে একটুকুন ভিজে লিই।”

তার চিৎকারে ছিঁড়ে গেল জনকের ভাবনার তার। ফিকে হয়ে এল চোখের সামনের অন্ধকার। তার বদলে গরবিই বলল, “অ্যাঃ, সাগর সাঙাত, ই পুয়ানি বাদলানিতে অমন কইরে ভিজ নাই হ্যা। শরীলখারাপ ধরাবে নাকি?”

“হে-হে-হে– ইটা ত তুমার ঠিক কথা হলেক্ নাই সাঙাতান, ইটা তুমার ঠিক কথা হলেক্ নাই গ। অমন বাদলানিতে মন পানাবেক্ নাই ত আর কখন পানাবেক্? আস-আস ত, তুমিঅ একটুকুন ভিজে লিবে আমার সঙে।”

তারপর আবার গাইল,

“বলে ই লিশা লয় স্যা লিশা

নিদয় মাজে

নিদয় মাজে বাজিচে ধামসা হ্যা

আমার নিদয় মাঝে…”

ঘুরেফিরে নাচতে লাগল সাগরা। নাচ থামিয়ে হাঁকল, “জয় বাবা কালভৈরব, জয় বাবা বোঙা ঠাকুর, বাবা কালকুদরা হ্যা– জয় মা মনসা–”

ফুর্তির তোড়ে সাগরা সব ঠাকুরের নামে জয়ধ্বনি দিতে শুরু করল। হঠাৎ বংশী লাফিয়ে দাওয়া থেকে উঠোনে নামল। দৌড় লাগাল বাইরের দিকে। দাওয়ার এককোনা থেকে ভাবি ঘড়ঘড়ে গলায় চেঁচিয়ে উঠল, “বলি অ্যা ছঁড়া, ই ভরসঞ্ঝ্যা বেলায় তুঁই আবার কুথাকে বেরালি। বলি হ্যাঁ-লো গরবি, কুথাকে গেলেক্ ছঁড়া?”

“আমি কী কইরে জানব! সারাদিনটি আজ বাঁদাগরুর পারা থাইকতে হঁইয়েচে ঘরে। অ্যাখন কি আর সে বাগ মানবেক্!”

থমথমে মুখে চুপ করে গেল গরবি। চুপ করে থাকল জনকও। তার পাশে বসে পুঁটি তারই গামছার খুটটা নিয়ে নাড়াচাড়া করতে লাগল। সাগরাও নাচ থামিয়ে উঠে এল দাওয়ায়। বসল পাছাপেতে। খানিক্ষণ জনকের মুখের দিকে চেয়ে থেকে বলল, “অ্যা সাঙাত, মু’টি তুমার ই রকম পারা লাইগচে ক্যানে হ্যা?”

একটু অপেক্ষা করে আবার বলল, “তুমি কী ভাইবচ আমি জানি সাঙাত। তুমি ভাইবচ ত, ই শালা উদামাদা লোক! তুমার মনপুড়ুনির আমি আর কী বুজব! এয়েই ভাবচ ত? ভাইব নাই সাঙাত। কিচ্ছু ভাইব নাই। আমি যতই উদামাদা হই, সোবকুথাই কানে ঢুকে আমারঅ।”

আবার থামল সাগরা। মুখ থেকে মুছে নিল জল। একটা ঢোক গিলল। ধরা গলায় বলল, “আমি য্যা সোব শুনেচি সাঙাত! সোবাই বলাবলি কইচ্চে, ক্যামন কইরে তুর সাঙাত গুছি পুতে আমরাও দেখে লুব। আমিঅ শুনাই দিঁইচি, হঁ-হঁ, সোব দেখে লিবে ক্যামন সুনা ফলে আমার সাঙাতের হাতে। ভাল করি নাই? বল, অ্যা সাঙাত, ভাল করি নাই আমি?”

“হঁ।” ঝটকরে সাগরার একটা হাত নিজের হাতে টেনে নিল জনক। আবেগভরা গলায় বলল, “ভাল করিচ সাঙাত। খুবেই ভাল করিচ।”

চমকে উঠে মুখ তুলল সাগরা। তার কুচলাফলের মতো চোখজোড়া আচমকাই টলটল করে এল। টলটল করে এল জনকের চোখজোড়াও। এইসময় খোঁয়াড়ে ঢুকে আজকের মতো শেষ ডাক ছাড়ল মোরগটি– কুঁক কুঁক কুকড়ুচ্চু–

 

অনুকথা

(বারো)

কয়েকদিনের মধ্যেই লোহারপাড়াটা প্রায় ফাঁকা। বেশিরভাগই চলে গেছে পুবখাটতে। পুব বলতে এ অঞ্চলের লোকরা বর্ধমান জেলার পূর্ব দিককে বোঝে। বৃষ্টি হোক বা না হোক, দামোদর নদের ক্যানেলের জন্য ওখানে চাষ বন্ধ হয় না সহজে। তাই কৃষিশ্রমিকেরও প্রয়োজন হয়। একবার গিয়ে পড়লে কাজের অভাব হয় না। পাওনাগণ্ডাও দেয়থোয় এখানের চেয়ে অনেক বেশি। তাই বাঁকুড়া-পুরুলিয়া জেলার অধিকাংস খেটেখাওয়া মানুষরা চলে যায় পুবে। বিশেষকরে যে বছর বর্ষার মেঘে টান পড়ে। তাছাড়া যাওয়া মানে তো বোচকাবুচকি, ছানাপনা সব সঙ্গে বেঁধে যাওয়া। সাধকরে কে আর ঘরছাড়া হয়ে পড়ে থাকতে চায় বিভুঁইয়ে! কিন্তু পেট যে বড়ো বালাই!

এবছর বৃষ্টির বাত দেখে তাই যারই সুযোগ আছে সেই ছুটেছে পুবে। এমনকি মনসামেলার তাসগুলোও নিশ্চুপ। ধুলোগায়ে পড়ে আছে কুলুঙ্গিতে। শুধু কয়েকটা ঘরে রয়েছে মানুষের সাড়া– হা-হুতাশ। যাদের হাড়ে বয়েসের জঙ ধরেছে। যাদের মাথার উপরে জোয়ান ছেলের ছায়া নেই। আর আছে ওই তিনটি ঘর, যারা স্বপ্ন দেখেছিল, চাষটা অন্যভাবে করার। করে দেখানোর। কিন্তু ভাবলে কী হবে! দেবতায় সেধেছে বাদ। অবশ্য আরও কয়েকটা ঘর পাড়া ছাড়েনি। কেলিয়া, কারু আরও জনাকতক। হাতে কাজ নেই। পেটে পড়ছে টান। তবু অদ্ভুত তৃপ্তিতে তাদের মনের জ্বালায় পড়ছে প্রলেপ। এর শেষ তারা দেখতে চায়। দেখতে চায়, শুধু দামড়ার মতো জেদ নিয়ে কী করে কী করে জনকা!

এদিকে আষাঢ়মাস প্রায় শেষ হতে গেল। এখনও জল লাগেনি মাঠে। মাঝে মাঝে ঝিরিঝিরি পুষ্পবৃষ্টির মতো ঝরছে ঠিক কথাই কিন্তু তাতে শুধু মাঠের আগাছা বাড়ছে। আর বাড়ছে জনকের উঠোনে দুশ্চিন্তার ছায়া। বাড়ছে গুইরামের তেজ। মেজাজ হারিয়ে বলছে, “ল্যা ক্যালা, ইবারে সমবছরটা কী খাব খাই!”

জনক কোনও আশ্বাস দিতে পারছে না। দীর্ঘশ্বাসের সঙ্গে বলছে, “অ্যাখনি তুঁই অমন কইরে ভাঙে পড়চিস্ ক্যানে বল দেখিনি? দাঁড়া ক্যানে, আর দু’ট্যা দিন দেখে লিই।”

“দু’ট্যা দু’ট্যা কইরে য্যা গুটা মাসটাই শ্যাষ হঁইয়ে গেলেক্ রে ব! ই শালা আচ্ছা আকালে পড়া গেলেক্ বাপ্! উঃ, ই চাঁদির দেবতা অমন কইরে মাইল্লেক্ রে ব আমাদেরকে!”

“অ্যা দাদা, অমন করিস্ নাই ত তুঁই।”

“কচ্চি কি আর সাদ কইরে রে! শালা মাঠের বীচ য্যা সোব বীচতলাতেই থুবড়াঁই গেলেক্! ইয়ার পদে জল লাগালেই বা আর কীট্যা হবেক্ শুনি!”

এসব হা-হুতাশের উত্তরে কী যে বলা যায় ভেবে পাচ্ছে না জনক। যদিও চাষ না লাগানোর জন্য লোহারপাড়ার পাড়াকামড়ে থাকা লোকগুলোর কারোর হাতেই কাজ নেই। সুতরাং মুখুজ্জেদের গতন্যা মুনিস থেকেও যে কোনওই সুবিধা করতে পারত না সেকথাও গুইরামের মাথায় থাকছে না। তার কেবলই মনে হচ্ছে, তবে কি গঁড়ার সাঙালি বৌকে বিয়ালি করে চালানোর ফল এটা! কিন্তু আহ্লাদীর মুখপানে তাকালেও তো সেচিন্তা বেশিক্ষণ স্থায়ী হচ্ছে না তার মনে। এমন লক্ষ্মীমন্ত মুখ! তবে!

এই তবেতে এসেই তার সমস্ত চিন্তাশক্তি মুখথুবড়ে পড়ছে। মুখথুবড়ে পড়ছে জনকের এক-একটা চেষ্টা। তবু সে হাল ছাড়তে নারাজ। সেই চেষ্টারই ফলস্বরূপ আজ ঠিক করেছে ব্যাঙের বিয়ে দিয়ে জলদেবীর কাছে জোড়ামোরগ মারত করবে। তারই তোড়জোড় চলছে তার ঘরে। আহ্লাদীর উপর ভার পড়েছে সবটা করার। একে তো সে এয়োতি। তার উপর এখনও তার কোল ভরেনি। এমনি মেয়েই তো লাগে মা ষষ্ঠীর মানতে! তাই আহ্লাদী পাঁকেভরা শ্যামপুকুরের হাঁটুজলে একট ডুব দিয়ে চলে এল জনকের ঘরে। হাসিমুখে বলল, “কই গ খুড়ি, বল আমাকে কী কইত্তে হবেক্?”

গরবি দাওয়ায় বসে কাঁঠালপাতার খালা বানাচ্ছিল। বলল, “আসে গেইচিস্! আয় মা, আয়। আমার কাছটিতে থির হঁইয়ে বোস দেখি।”

আহ্লাদী ভিজে কাপড়ে দাওয়ায় উঠল। ভাবির দিকে তাকাল। বলল, “ভাল রইচ, অ্যা দিদিম্যা?”

উত্তরে ভাবি কিছু বলল না। শুধু মাড়ি বের করে হাসল একটুখানি। আহ্লাদী পুঁটির গাল টিপতে গিয়ে বলতে গেল, “আর তুঁই–”

“হাঁ-হাঁ-হাঁ– কী কচ্চিস্ কী?” তার আগেই হাঁ-হাঁ করে উঠল গরবি। বলল, “উয়াকে তুঁই ছুঁস নাই মা। উ অ্যাখনঅতক্ক বাসি কাপড়েই রইচে।”

“অ! ত, আমাকে কী কইত্তে হবেক্ বল ইবার‍্যা?”

“করবি আবার কী! ল্যা, বাকি খালাগুলান হাতে হাতে কইরে ল্যা দেখি। আমি তখনকে দু’ট্যা দুব্বাঘাস তুলে আনি যাঁইয়ে।”

“দুব্বাঘাস ত আমি বাদাড়ের ধার থাকে তুলে আনলম গ! হাঁই ভাল ক্যানে।”

“আনিচিস্! ব্যাশ করিচিস্ মা। ভাল করিচিস্। সাদে কি তুর কাকাতে বলে লো–”

গরবি কথাটা শেষ করল না। তাতেই আহ্লাদীর মুখের আদলে খেলে গেল হালকা লালিমা। হাতের দুব্বাগুলো একটা কাঁঠালপাতার খালায় রাখল পরিপাটি করে। বলল, “কাকা আমার কী বলে গ খুড়ি?”

“উম্! বিটির আমার লিজের বাহবা শুনতে গাদে ভাললাগে, লায়!”

“ধুর, তুমি য্যা কী বল নাই খুড়ি! আমি কি তার লাগে বল্লম নাকি! আমি ত–” কথাটা শেষ করতে পারল না আহ্লাদী। একরাশ লজ্জা এসে আটকে দিল তার গলা। গরবি তাকাল তার আনত মুখের দিকে। মুচকি হাসল। বলল, “ তুঁই ত কী? বল তুঁই ত কী বটে? আমিঅ নাইলে শুনি তুর মনের কুথাটা।”

“জানি না যাও!” ঘাড়ে একটা ঝাঁকুনি দিল আহ্লাদী। ছেলেমানুষের মতো ফুলে উঠল তার মুখ। তাতেই ফিক কয়রে হেসে ফেলল গরবি। আরেকবার খোঁচা দিয়ে বলল, “তুঁই ত লিজের কুথা কখনু শুনতে খুঁজিস্ নাই, এই ত?”

“হুঁ।” হঠাৎ আহ্লাদী আনমনা হয়ে পড়ল। আর তা দেখে গরবিও গুটিয়ে নিল নিজের হাসি। সেই যে বিয়ে হয়ে এসেছে, তখন থেকে এই অভাগা মেয়েটার প্রতি তার স্নেহের মাত্রাটা যেন একটু বেশিই। বিশেষ করে আহ্লাদীর স্বভাবের জন্য তাকে তার নিজের মেয়েই মনে হয়। সবসময় হাসিমুখ। সামান্য কারণে ওই হাসিতে টান পড়লে গরবি তা সইতে পারে না। তাই আহ্লাদীর চিবুক তুলে ধরল। বলল, “ই বাবা, অমনি বিটির আমার মান হঁইয়ে গেলেক্!”

“মান হবেক্ ক্যানে! আমি কি আর ছুটুটি বটি নাকি!”

“লোস্? ছুটুটি লোস্? থালে কত ডাগরটি হঁইচিস্ বল ক্যানে আমাকে!”

“আমি জানি না যাও।” আবার একটা ঝাঁকুনি দিল আহ্লাদী। অমনি গরবির মুখের রঙ ফিরে এল। মনে মনে বলল, “ছেল্যামানুষ আর কাখে বলিচে!” কিন্তু মুখে সেকথা উচ্চারণ করল না। নিজের আঙ্গুলের ডোগাগুলো ছোঁয়াল আহ্লাদীর চিবুকে। তাতে চুমু খেয়ে বলল, “অ্যানেক ডাগরটি হঁইচিস্ মা! অ্যানেক বড় হঁইচিস্। ঘরবর লিঁইয়ে ঘরকন্না কচ্চিস্! বড়টি না হইলে কি আর ঘরবর হয় রে মা! যেমন সারা জনমটি এমনি বড়টি হঁইয়েই সুবাইকে লিঁইয়ে তুঁই কালকাটাতে পারিস্! অবিশ্যি, ইবারে তুঁই তা পারবিঅ। গঁড়া ত আমাদের ছেল্যা মন্দ লয়। তবু ডর লাগে রে মা।”

একটা দীর্ঘশ্বাস ভারী করে তুলল আশপাশের বাতাসকে। সেভারটুকু নিয়ে গরবি উঠে গেল ভেতরে। ভার চেপে বসল আহ্লাদীর মনেও। সত্যিকারের গম্ভীর্য তার মুখের নিটোলকে শক্ত করে তুলল। এসের থেকে এই একটি আশীর্বাদ সে যে কতবার কত লোকের মুখ থেকে কত রকমভাবে শুনেছে তার কোনও হিসেব নেই। যদিও আহ্লাদী জানে গরবির মনে তার মঙ্গলচিন্তা ছাড়া আর কিছু নেই। তবু!

এই তবুতে এসেই আহ্লাদীর ভালো লাগাটুকুও হোঁচট খেল। মনে পড়ল ফেলে আসা জীবনের কথা। মনে করিয়ে দিল, সে আর পাঁচজনের মতো স্বাভাবিক বৌ নয়। দয়ার বৌ। দয়ার ঘরকন্না তার। তাছাড়া গঁড়ার কথাও তো বলে সকলে। কেন বলে! সেকি গঁড়াকে খারাপ ভাবে! আজ পর্যন্ত গঁড়ার সঙ্গে তার তো তেমন কোনও বিবাদ হয়নি। সে-ও তো গঁড়াকে ভালোটি বাসতেই চায়। দিতে চায় তার মনের সবটুকু মাধুর্য। কিন্তু সবসময় যে পারে, তা নয়। কোথায় যে একটা তালকাটা খচখচানি এক একসময় আড়ষ্ট করে দেয় তার ভালো লাগার পেলবতাকে তা সে নিজেই বোঝে না। তাই বলে কি সে গঁড়াকে তার সবটুকু দেয়নি! আজও দেয় না! নাকি কালই আর দেবে না! তাহলে?

এই তাহলেরও কোনও উত্তর খুঁজে পেল না আহ্লাদী। চেষ্টাও করল না। শুধু মনটা ভারী হয়ে রইল আষাঢ়ি মেঘের মতো। বাবামায়ের কথা মনে পড়ল। মনে পড়ল কন্যামারা গাঁয়ের বাঁধের কথা। তার পাড়ে বুড়ো মহুয়াগাছটার কথা।

“উ কী লো, আহ্লাদী! অমন চুপ কইরে কী ভাইবচিস্ তুঁই?”

ভাবনার মাঝে হঠাৎ নিজের নাম শুনে চমকে উঠল আহ্লাদী। তাকাল মুখ তুলে। দেখল বিকাশের মা বালি। তার ভাবনার ফাঁকে কখন যে এসে দাঁড়িয়েছে তার সুমুখটিতে সে তা টেরই পায়নি। এখন তার দিকেই বালিকে সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে দেখে একটা অস্বস্তি ঘিরে ধরতে চাইল আহ্লাদীকে। সেটাকে আস্কারা না দিয়ে চটজলদি সামলে নিল থমমারা রেখাদের। চোখচুরিয়ে বলল, “কই, কিছুয়েই ভাবি নাই ত। এই খালাগুলা একটুকুন কইরে লিচ্ছিলম।”

“ক্যা বটে ক্যা রে আহ্লাদী?” ভিতর থেকে জানতে চাইলে গরবি। আর আহ্লাদীও যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। গলাতুলে বলল, “মেজ খুড়ি আইচে গ।”

“অ! ত উয়াকে বসতে বইলে তুঁই একটুকুন ভিতরবেগে আয় দেখনি। এই হলুদগুলা লিঁইয়ে যা।” বলল বটে। কিন্তু আহ্লাদী ওঠার আগেই বেরিয়ে এল গরবি। বলল, “হাঁই ল্যা, ইগুলান বাটে লিঁইয়ে আয়।”

“হলুদঅ লাইগবেক্?” ছেলেমানুষের মতো জানতে চাইল আহ্লাদী। তাতেই খিলখিলিয়ে উঠল গরবি। বালির দিকে তাকিয়ে বলল, “আমাদের আহ্লাদী কী বলে দ্যাখ লো মেজকি?”

“ই বাবা! বিটির আমার অত দিগে খিয়াল আর ই খিয়ালটি নাই? বিয়া দিতে গেলে গায়ে হলুদ দিতে হবেক্ নাই? ক্যানে, তুর বিয়াতে কি তুর গায়ে হলুদ দ্যায় নাই আমাদের বিয়ান? হি-হি-হি!”

রাঙা হয়ে উঠল আহ্লাদীর গাল। বলল, “ধুর, তা দিবেক্ নাই ক্যানে! কিন্তুক্ ব্যাঙের বিয়াতেও গায়েহলুদ হবেক্!”

“হঁ লো হঁ, গায়েহলুদ হবেক্, সিঁদুর দান হবেক্, বিটির হাতে লুয়া পড়বেক্। সোবেই হবেক্। তবে যাই বল গরবি, বিটির আমাদের আক্কেল রইচে। ক্যামন সোন্দর পারা খালাগুলান করিচে দ্যাখ ক্যানে!”

বালির প্রশংসায় আহ্লাদী তাকাল গরবির দিকে। ফিক করে হেসেও ফেলল একটুখানি। গরবি প্রশ্রয়মেশানো ধমক দিয়ে বলল, “হঁ-হঁ, ল্যা, হঁইচে! আর ভাবড়া দ্যাখাতে হবেক্ নাই তুখে। যা হলুদ ক’টা বাঁটে লিঁইয়ে আয়।”

আহ্লাদী আর কিছু বলল না। ভালো লাগার অনুভূতিটুকু গায়ে জড়িয়ে উঠে গেল সেখান থেকে। এইসময় ঘরে ঢুকল ফোকলামাড়ির বুড়ি। বলল, “বলি, কই লো সোব! জুগাড়জান্তি কদ্দুর কল্লি?”

“আস গ আস। এই য এক এক কইরে কচ্চি সোব জুগাড়।”

“অ, হয় নাই অ্যাখনঅ! উবাবা, উটি ক্যা বটে লো? আমার সতীন নাকি?”

শিলনড়ার কাছে আহ্লাদীকে হলুদ বাঁটতে দেখে জিজ্ঞাসা করল বুড়ি। বিয়ের দিন সেই যে ঠাট্টা করে তাকে সতীন বলেছিল, আর তা ছাড়েনি। এখন সেই ঠাট্টার রেশটুকু ধরেই গুনগুনিয়ে উঠল পাল্লার গানে,

“বলে আয় দেখে যা পাড়ালি

হলুদ-ত্যালে

মাইরি হলুদ-ত্যালে খেলছে সাঙালি লো

হলুদ-ত্যালে…”

অমনি প্রমাদগুনল গরবি। ভাবল, এই বুঝি খেঁকিয়ে ওঠে বুড়ি, “বলি, ই তুদের ক্যামন পারা আক্কেল লো গরবি, আঁ? সাঙালি বৌকে দিঁইয়ে ব্যাঙবিয়ার কাজ করাচ্চিস্? বলি, জাত-ধম্মের মাথা খাঁইচিস্ সোব, নাকি? হায়াপিত বলে কিছু নাই তুদের?”

কিন্তু বুড়ি সেদিকে গেল না। গুনগুনানি থামিয়ে আপনমনেই বিড়বিড় করল, “তাথেই ত আমিঅ বলি, ছঁড়াদের ই কাজটা ভাল হলেক্ নাই!”

“কাদের কুথা বইলচ গ তুমি? কার কন কাজটা ঠিক হলেক্ নাই?”

“বলে আপন ভালয় জগৎ আল করবি কী তা বল/ সুবার কুথা ভাবলে পরে পাবি পাকা ফল।” দাওয়ার একধারে বসতে বসতে শোলোক কাটল বুড়ি। কিন্তু তাতেও তার মনের ভাব পরিষ্কার হল না। বরং আশংকার ঘোর জমে বসল আষাঢ়ি গুমোটে। সেই গুমোট নিয়েই গরবি তাকাল বালির দিকে। বোঝার চেষ্টা করল ইঙ্গিত। বুড়ি অবশ্য আপন মনেই বলতে শুরু করল, “এই য তুদের ব্যাঙের বিয়া দিয়া লিঁইয়ে পাড়াতে যা হলেক্ স্যাকুথাই বলচি লো, স্যাকুথাই বলচি আমি। আর কিছু লয়।”

“ক্যানে, ইসোব লিঁইয়ে আবার কার পঁদে আগুন লাগলেক্? অ্যাখন নাইলে আমরা যা করি তা সোবেই পাড়াতে দোষের হয়।” আর ধৈর্য ধরতে পারল না গরবি। না চাইতেও গলায় একটুখনি ঝাঁজ এসেই গেল। বুড়িও বলল, “সেইকুথাই ত আমিঅ বলচি লো। ত, তুঁই য্যা আমাকেই কামড়াতে আসচিস্! বলে, লোকের ভাল মাগতে নাই/ বরঞ্চ কাল দড়ার পঁদ চুষিগা যাই। বের‍্যা, ধুর হঁইয়ে যা।”

“না, কামড়াতে যাব ক্যানে!” বুড়ির গলায় অসন্তোষের ইঙ্গিত পেয়ে নিজেকে সামলে নিল গরবি। বলল, “তুমি বইল্লে বলেই জানতে খুঁজলম। নাইলে আমার কী দায় পড়িচে বল কারু পঁদে কামড়াকামড়ি কইত্তে!”

“অ, তাই বল ক্যানে! তবে শুন্, তুদের ইসোবের লাগে পাড়ায় য্যা দমতক কুথা হচ্ছে লো। আমিঅ শুনাই দিঁইয়ে আসিচি সোবকে, তুরা কেউ যা আর নাই যা, আমি আপনার যাব। যদি জল হয়েই ত স্যা কি উয়ারা ইকাই লিবেক্! বল বটে কিনা? আমার বাপু পষ্ট কুথার কষ্ট নাই।”

তা বুড়ির কষ্ট থাক বা না থাক গরবি এতক্ষণে একটুখানি আশ্বস্ত হল। তাই গোল এড়াতে চেয়ে বলল, “ভালই ত করিচ।” তারপরই আহ্লাদীকে তাড়া দিল, “অ্যা আহ্লাদী, তুর হলেক্? উ ক’টা হলুদ বাঁটতে কতক্ষণ লাইগচে, কতক্ষণ?”

“হঁ, এই য হঁইয়ে গেইচে।”

“ত, লিঁইয়ে আয় তাগাদা কইরে। দিঁইয়ে খালাগুলানে ধান-দুব্বা, গোবুর সোব সাজাঁই ল্যা।”

“হঁ-হঁ, এই য যেছি।” বাটাহলুদ নিয়ে কাছে এসে বসল আহ্লাদী। রাখল একটা খালায়। একে একে সামগ্রীগুলি সাজাল ডালায়। এইসময় পার্বতি এসে জিজ্ঞাসা করল, “কই লো গরবি, ছুটুকত্তা ঘুল্লেক্, না ঘুরে নাই অখনঅ?”

“না, অখনঅ ঘুরে নাই ত। সেই য উয়ারা দু’সাঙাত মেলে গেইচে বরকন্যা ধইত্তে, ত গেইচেই। ঘুরার নামগন্ধতক্ক নাই। উঃ, আমি আর লাচ্চি সোবদিগ দেখতে।” দুমদাম পা ফেলে উঠে গেল গরবি। পার্বতী সুর টেনে বলল, “স্যা কী লো, অখনঅ ঘুরে নাই? ই বাবা! অতটি বেলা হলেক্!”

“হঁ-হঁ, আসে গেইচি লাও। আর ভাইবতে হবেক্ নাই তুমাদেরকে।” হঠাৎ আগুড়ের কাছে হৈ-হৈ করে উঠল সাগরা। ঢুকল উঠোনে। তার নিজের হাতে একটি সোনা ব্যাঙ আর জনকের হাত একটি। সঙ্গে এসেছে গুইরাম আর গঁড়াও। সাগরা দাওয়ার কাছে এসে বলল, “বাবা রি, সাঙাতান, তুমাকে কী বইলব! দু’সাঙাতে মেলে ডুবা হেঁচে হেঁচে লবজান হঁইয়ে গেলম গ। সোব শালারা মাঠে বিষ দিঁইয়ে দিঁইয়ে কি আর সাপ-ব্যাঙ কিছু রাখিচে!”

“পাঁইচ ত!” সাগরার কথায় গরবির মনের মেঘ সরে গেল খানিকটা। একচিলতে হাসি এনে বলল, “থালেই হবেক্। লাও ত ইবারে তাগাদা কর সোব।”

সাগরা দাওয়ায় পাছাপেতে বসে বলল, “ই বাবা, পাব নাই মানে! আমার সাঙাত কি আর যেমন তেমন লোক বটে নাকি! না কী বল হ্যা সাঙাত?”

এর উত্তরে জনক কিছুই বলল না ঠিকই কিন্তু খেঁকিয়ে উঠল গুইরাম, “হঁ-হঁ ল্যা, তুখে আর ফপরদালালি মারাতে হবেক্ নাই। খিদাতে শালা আমার প্যাটের খুল্যা জ্বলে যেছে! যা করবি, তাগাদা কইরে কর ক্যালা।”

তাড়া খেয়ে গরবি জলভরা ঘটি তুলে নিল হাতে। জলের ধারার সঙ্গে দিল হ্লুধ্বনি। এগিয়ে এল দাওয়ার উপর। অমনি সমবেত হ্লুধ্বনিতে সজাগ হয়ে উঠল লোহারপাড়ার ঝোপঝাড়। শুরু হল ব্যাঙের বিয়ে। তেল, হলুদ, সিঁদুর একে একে সব দেওয়া হল ব্যাঙ দু’টির গায়ে। দু’টিকে নিয়ে সকলে এগিয়ে গেল শ্যামপুকুরের দিকে। সেখানে এসে গলায় গামছা দিল জনক। ঘাটপুজো করল সবটুকু ভক্তি দিয়ে। আহ্লাদী পাশ থেকে এগিয়ে দিল এক একটি সামগ্রী। এমনকি স্ত্রী ব্যাঙের সামনের পায়ে পরিয়ে দেওয়া হল একটি ছোট্ট লোহার বেড়ি। শেষে ব্যাঙ দু’টিকে পুকুরের জলে ছেড়ে দিতেই তারা বাঁইবুঁই করে দু’দিকে দু’টি সাঁতরে এগিয়ে চলল। জনক জোড়হাত বুকে ধরে বিড়বিড় করল, “হ্যা মা জলবুড়ি! জল দাও মা, জল দাও। আমি তুমাকে জুড়ামোরগ বলি দুব মা। বুকফাড়ে রক্ত দুব তুমাকে। একবার মু’তুলে ভাল গ মা আমার।”

তারপর একআঁজলা জল তুলে ছিঁটিয়ে নিল নিজের মাথায়। তার দেখাদেখি বাকি সকলেও হাতজোড় করে কাতর প্রার্থনা জানাল জলবুড়ির উদ্দেশ্যে। শুধু বালির কোলে বসে থাকা পুঁটি এসবের কিছুই বুঝল না। জুলজুলে চোখে তাকিয়ে থাকল সকলের দিকে।

 

 

বই উৎসব

;
ব্যর্থ এই সমস্ত লাইনের অবুঝ তরঙ্গ
পাঠক সেনগুপ্ত

 

 

মাঝেমাঝে এরকম হয়, “কোথাও কিছু নেই শুধু খিদে জেগে আছে,/ কোথাও কিছু নেই শুধু তার জাগরণ আছে,/ কোথাও গন্তব্য নেই তবুও ঠিকানা লেখা বাড়ি,”… আর দিগন্তের দিকে তাকিয়ে মনে হয়, ‘আগে কখনও এরুকমভাবে মেঘ ঘনায়নি’। তখন, ‘চা দোকানে বসে আছে কয়েকজন উদ্বিগ্নের মুখ’ আর এরকম সব দৃশ্যের কাছে সহসা আমাদের পতন হয়েছে। স্মৃতি জুড়ে কেবল মেদুর অতীতের ঘনঘটা। অথচ আমরা দিব্যি জানি, এখনও মেঘের অপেক্ষা করে দাঁড়িয়ে আছে পাহাড়, এখনও আমার দেশ চলেছে তার দেওয়ালভর্তি ধর্ষণের দাগ মোছার হাস্যকর প্রচেষ্টা চালাতে চালাতে, এখনও ‘ভাঙা ছাদ প্রাইমারি স্কুলের ভিতর/ চলেছে আমার দেশ অপুষ্টির ক্ষুধায়’। তবু, একবুক ‘আরব্যরজনী’ (সপ্তর্ষি প্রকাশন, কলকাতা, ১০০ টাকা) সাজিয়ে কবি সাম্যব্রত জোয়ারদার আমাদের স্বপ্নের দেশে টেনে আনছেন বারবার। আমরাও ভাবি সেই দেশের কথা। সেই মায়াভরা স্টেশনগুলো… যেখানে নামা হয় না বহুকাল। মনে মনে ভাবি, যাব। আর ভাবি, ‘চারদিক নিশ্চয়ই পালটে গেছে এতদিনে।’ কেবল ভেতরের ‘চিতাকাঠের ধিকিধিকি আগুনে’ চারদিকের এত এত নেই নেই হাহাকার পেরিয়ে আসতে আসতে দেখি সন্ধ্যা ঘনিয়ে এল। আর কত সহ্য করা যায়? আর কত দেখা যায় এসব স্খলন? আর কতক্ষণ শোনা যায় এইসব কান্না? সে কোন অতীত থেকে এসব দুর্ভিক্ষ, তল্পিবাহকদের আস্ফালন দেখতে দেখতে কবির মতো আমারও একবার বলতে ইচ্ছে করে, এবার থামাও, ‘নইলে রাতের ঘুম কেড়ে নেবো’। অবশ্য এসব পলিথিন মোড়া রক্তের শহররাস্তা পেরিয়ে, ‘ছন্দ ও মহেন্দ্রলাল দত্তের ছাতা এড়িয়ে’, এক অতিকায় বিশৃঙ্খলা পেরিয়ে কবির একান্ত ইচ্ছের মতো, আমাদেরও আসলে এই ইচ্ছেই বেঁচে থাকে যে, আমরাও বাকি জীবনটা ‘হত্যে দিয়ে পড়ে থাকতে চাই বাংলা লিরিকের কাছে।’ শিকড়ের ভাষায় সামান্য কয়েক ফোঁটা লবণক্ষমতা অনুবাদ করতে ইচ্ছে করে পদাবলী কীর্তনের মাধ্যমে। মনে হয়, নিজেকেই ডেকে বলি, ‘মনে করো আমাদের দূরের স্টেশনগুলো, তাদের অদ্ভুত মুখের লোকজন। বাক্স-প্যাঁটরা।’ মনে করো, আজীবনের না-লিখতে পারা ‘ব্যর্থ এই সমস্ত লাইনের অবুঝ তরঙ্গ।’

 

‘পোড়া দাগ মুছে দিতে দিতে যে হাতখানা/ গভীর দুঃখ ছুঁয়ে দিল/ তার হাতেও কান্না ফোঁটা।’ কখনও তাকে দেখার অবকাশ হল না তবুও। একটা জীবন কেবল ‘একটা আলোক বিন্দু থেকে আর এক আলোময় বিন্দু’ ছুঁয়ে সাফল্যের দিকে ছুটতে চেয়েছে। ‘গমন প্রতিগমনের মাঝখানে আমাদের যাবতীয়’ বিস্ময়, কান্না আর বেওয়ারিশ শব্দের ঋণ নিয়ে জন্মঘোর কেটে যাচ্ছে। আর সেই ‘জন্মের প্রবাহিত ঋণ’(একুশ শতক, কলকাতা, ১০০ টাকা) যেন শোধ করতে বসে কবি রবীন বসু দেখেন সমস্ত রাগ এসে জমা হচ্ছে তাঁর ব্রহ্মতালুতে। জঙ্গলের পাশে গিয়ে দাঁড়াতেই এক তীব্র অন্ধকার এসে গ্রাস করছে তাঁর গ্রামকবির জীবনবোধকে। তাঁর কবিতার ‘গাঁয়ের আঁশ’, মুখোশহীন সহজ উচ্চারণ আবহমান কাল ‘জলের কিনার ধরে হেঁটে হেঁটে বালিয়াড়ি ঝাউগাছ/ নোনাডাঙা পেরিয়ে অব্যর্থ লক্ষ্যের দিকে’ এগিয়ে চলল।

 

আমাদের বিপজ্জনক রাস্তা কতটা থাকা-না-থাকার মতো ‘সুখের গল্পের পাশে গলা নামিয়ে বলছে দৃষ্টিহীন ছবি’-র কাহিনি, ‘কীভাবে তোমাকে ধুয়ে ধুয়ে প্রকট হচ্ছে’ আস্ত একটা নাতিশীতোষ্ণ জীবন, সেসবের খবর কে রাখে? চলতে চলতে পেছন ফিরলে দেখব সব মুছে যাচ্ছে, আর অদূরে ‘ভাত বেড়ে ডাকছে নশ্বর’ (চর্যাপদ, দুর্গাপুর, ১০০ টাকা) এক অপেক্ষার আকাশ। মনে পড়ল, সত্যিই তো, ভেবে দেখিনি, ‘অপেক্ষাও তো একদিন দাবিদাওয়া নিয়ে দাঁড়াতে পারে’ আমাদের সমস্ত জীবনের মাঝখানে। তঝন এই সমুদ্র সিম্ফনি, এই নেই-বিশ্বাসের জীবন, আনাচে-কানাচে ঘোরাঘুরি করা জোনাকির দল, চাইছি না, তবু ‘একটা সম্পূর্ণ মৃত্যুর দিকে। গান গাইছে আনন্দ হরফ…’ সেইসব হরফ নিয়ে কবি অরণ্যা সরকার স্বপ্নের শস্যগোলায় সাজিয়ে রেখেছেন কত ‘ফলবতী যোনি’, নিবেদন করেছেন, ‘এই নাও প্রসন্নরূপ’। তাঁর কামনাপায়েস রাঁধা প্রহসন নিয়ে নিজেকে চেনার বিকল্প আয়েসে দেখলাম, পড়তে পড়তে ‘কী শূন্য, কী পাথর’… রয়ে গেছে। ‘সঙ্গে কিছু মায়া…’

 

ভাষা তো বটেই, ‘প্রত্যেকের একটা নিজস্ব উপভাষা থাকে, শুধু বোঝা আর বোঝানোর মানুষ পাওয়া যায় না বলে আমরা অনুসন্ধানের নামে সংরক্ষণে রেখে দি।’ আহা, এমন উপলব্ধির গভীরতা নিয়ে আমাদের পথচলতির ফাঁকে, ‘ব্যস্তানুপাতিক সাত্ত্বিক জীবনে পৌনঃপুনিক প্রেম চেয়ে’ এক ‘ডেলি প্যাসেঞ্জারের অন্য জানালা’ (পূর্ণ প্রতিমা, কলকাতা, ১০০ টাকা) থেকে উকি দিচ্ছেন কবি ঈশিতা মাঝি। তাঁর প্রাণপণ চেপে রাখা মনখারাপ, প্রাক্তন প্রেমিকের জন্য চেপে রাখা অমলিন ভালবাসার ‘ফাঁকা বাড়ির একলা দুপুর’ কবে যেন ‘বাধ্যতামূলক অবৈধতা হয়েই থেকে গেছে’। চলমান শরীর ছোঁয়ার প্রেমসমাজের কাছে মাথা নত করতে না চাওয়ার জেদ, লক্ষ্মী সেজে থাকা মা-এর কাছে দাঁড়িয়ে ‘ভালো আছো’ জিজ্ঞাসা করতে পারার অবাক নিয়ে তাঁর কবিতা আমাদের অ-বসন্তে কেন মৃত চিঠির দেহাবশেষ মনে হয়। সমস্ত ব্যর্থতার কাছে এসে দাড়ানোর পরেও ‘নিজের মধ্যে ক্লিওপেট্রাকে দেখতে’ পাওয়ার দরজা পেরিয়ে কবির প্রথম বইটির সম্ভাবনা অনেক শিরোনামহীন যাপনের দেশে ‘মুহূর্তের কাছে ঋণ’ রেখে গেলেন কবি। শেষ বিকেলের সব গল্প শেষ হলে, আমাদেরও ‘ফিরতে হবে কবিতা-তেই…’ এই অপেক্ষা সাজালাম।

 

কবিতার অব্যবহৃত ও ব্যবহারকারী, চর্চাকারীদের কাছে চির-উপেক্ষিত এক প্রয়োজনীয় ব্যবহার নিয়ে মনঃচিকিৎসক, শুদ্ধেন্দু চক্রবর্তীর গবেষণা-বিষয় মনোরোগে কবিতাকে পথ্য হিসেবে ব্যবহার। নিজে কবি হওয়ার দরুণ সাধারণ্যে এই পথ্যপ্রয়োগের আদিগন্ত নিয়ে মনখারাপের এক-একটা জানালার কাছে আমাদের নিয়ে যাচ্ছেন তিনি। আত্মহত্যার ভাষার কাছে এসে নত আমাদের সামান্য এই কবিজন্মের, বিষাদজন্মের সাদাপাতার আঁকিবুকি তাঁর সমীক্ষার ক্ষেত্র থেকে ক্রমে কীভাবে যেন এই অলীক গ্রন্থের সমাহার নিয়ে এল। এল হাতের লেখার শরীর ছুঁয়ে যাওয়ার মনস্তত্ত্ব, বাংলা কবিতার আবহমানতার সঙ্গে জুড়ে থাকা বিষাদের কবিতার ভাষা, মনখারাপের গন্ধ… এসব। আর পড়তে পড়তে আমরাও কবিতার কাছে নত মানুষেরা তাঁর ‘ষষ্ঠাংশবৃত্তি’ (আদম, নদীয়া, ১৫০ টাকা)-তে সামিল হতে পারব বলে এসে দাঁড়িয়েছি কত না বিস্মৃতির কবিতার কাছে। জেনেছি, কোন কবিতা হতে পারে মনোরোগীর পথ্য, কোন কবিতাই বা বর্জন করুক বিষাদের সন্তানেরা। বিষাদের প্রবাদপ্রতীম কবি জীবনানন্দ থেকে প্রিয়শীতকালের অপেক্ষায় থাকা ভাস্কর, কত মানুষের একাকীত্বের রাতে, বিষাদভোরের অসহায় প্রহরের সঙ্গী রবীন্দ্রনাথের ‘আজি বিজন ঘরে নিশীথ রাতে’-র সুরমূর্ছণা, বা গীতিময়তার রহস্য নিয়ে তাঁর উচ্চারণ আপনাকে ভাবাবেই। ভাবাবে সংগীত নিয়ে যত চিকিৎসার উৎসাহ, তার অনেকটাই কেন কবিতাকে নিয়ে নেই, এই প্রশ্নও। সাম্প্রতিক কয়েকজন তরুণ কবির আত্মহত্যার উল্লেখ, তাঁদের কবিতার মনঃবিশ্লেষণ, সম্ভাবনার নানান দিক নিয়ে তাঁর সন্ধানী আলোকপ্রয়াস একটি গম্ভীর আলোচ্যকে কেমন কবিতার মতো সুখপাঠ্য করেছে। তাঁর এই গবেষণা চিকিৎসার ক্ষেত্রে ‘অনাথ ঔষধ’ কবিতার প্রয়োগ-সম্ভাবনার দরজা খুলে দেবে। সেদিন কবিতার কাছেই সব বিষাদের ছেলেমেয়ে এসে দাঁড়িয়ে নির্ভয়ে বলতে পারবে, ‘জানি বন্ধু জানি তোমার আছে তো হাতখানি…’ সেই হাত বাড়ানোর পথ আপনিই দেখাবেন, শুদ্ধেন্দু।

 

 

পথের কবিতা

 

কল্প-বৃষ্টি

জয়দীপ রায়

হঠাৎ চলে আসতে হল বৃষ্টি ছেড়ে। ভেজা রাস্তা ছেড়ে। ভেজা মন ছেড়ে। ঘরের জানলাগুলো একবার দেখে নিস না শকুন্তলা, বন্ধ করেছি কিনা। জানলার বাইরে কাঁঠালপাতায় বৃষ্টিফোঁটা লেগে থাকে যেন মানুষের চান করে আসার পর নরম পিঠে জলকণা। জানলা বন্ধ থাকলে একবার খুলে দেখে নিস লাল্টুদের কাঁঠালগাছটা।
হোয়াটস্ অ্যাপে খবর পেলাম কাল থেকে দু’দিন দক্ষিণবঙ্গ জুড়ে ভারী বৃষ্টিরাত হবে। ঘুমের মধ্যে টেরও পাবি না দাস, কত বৃষ্টি হয়ে গেল রাতভর। ব্যথার ওষুধে বৃষ্টির শব্দ কেমন যেন ঘোলা হয়ে যায়। শুধু শরীর টের পায়। আর উপশম হয়। ব্যথা কমে যায়। যদি সত্যিই দু’রাত ধরে বৃষ্টিতে ভেজা হাওয়ায় তোর শরীর ধুয়ে যায়, দেখবি আর কোনও ব্যথা নেই। এক্সরে প্লেটের চিড়টাও দেখিস রাতে রাতে জুড়ে গেছে।
এদেশে বনগাঁর মতো বৃষ্টি হয় না। পুরুলিয়ার মতোও হয় না। এখানে বনগাঁর মতো কোনও শহর নেই যেখানে হঠাৎ বৃষ্টিতে পালিয়ে গেলে মাত্র দু কিলোমিটারেই চলে আসে ভেজা তাজা সবজিক্ষেত। এখানে কাঁঠাল নেই, তাই  কাঁঠালপাতায় লুকানো নরনারীর বৃষ্টিভেজা পিঠও নেই। এখানে বর্ষার ইছামতি নেই। ছোড়দিদের বাড়ির গেটের পাশের ফুল ফুটে থাকা হাস্নুহানা গাছ নেই। ছাতা নেই, বর্ষাতি নেই, বৃষ্টির মধ্যে রিকশার সিটে গায়ে গায়ে বসে, ত্রিপলের পর্দাটা টেনে দেওয়া নেই।
শর্টফিল্মটা আমরা কিন্তু করবই, রীতু। এই বর্ষাতেই। ভিজতে ভিজতে চলে যাব কোথাও। মাসাঞ্জোর বা মেঘাতাবুরু। বাংরিপোশির বুড়িবালামের তীরেও যাওয়া যেতে পারে। দাসের হাড়ও ততদিনে শক্তপোক্ত হয়ে যাবে। তবে একটা মদ খাওয়ার সিন রাখিস কিন্তু। অরণ্যের দিনরাত্রির মত। তারপর আমরা সারারাত ধরে জঙ্গলের রাস্তায় হেঁটে যাব শর্মিলার গাড়ির হেডলাইটের সামনে পড়ে যেতে। টুকাইকে বলিস আমরা যখন বুড়িবালামের পাড়ে বসে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে কাঁদব, তখনই যেন ড্রোনটা ওড়ায়। ক্লোজ আপে ঝিরঝিরে বৃষ্টির মধ্যেও আমাদের চোখের জল দেখিয়ে ড্রোনটা আস্তে আস্তে উপরের দিকে উড়ে যেতে থাকবে। বৃষ্টি উপর থেকে আমাদের পরে ফুলের মত ঝরবে। আমরা ধীরে ধীরে ছোট হয়ে যাব। আরও ছোট। আর ড্রোনটা আমাদের সব মনখারাপ, কান্না আর অন্ধকার নিয়ে বৃষ্টির ওপারে চলে যাবে। ড্রোন আর ভোকাট্টা ঘুড়ির মত ফিরে না আসলেও, টুকাইয়ের মোবাইলে সব সেভ করে দিয়ে যাবে।
এইভাবে বৃষ্টির কথা ভাবতে ভাবতে এদেশেও বৃষ্টি আসবে, দেখিস মাম্মা। ততদিনে তোর পরীক্ষাও শেষ হয়ে যাবে। তুই একছুট্টে আমার কাছে চলে আসিস। আমি তোকে সজ্জনগড়ের জঙ্গল দেখাতে নিয়ে যাব। আমিও দেখিনি যে। এদেশের পাহাড় ততদিনে সবুজ হয়ে উঠবে বেশ। পাহাড়ি রাস্তার বাঁকে বাঁকে আদিবাসী বাচ্চারা সীতাফল বিক্রি করবে। আতা। আমরা ওদের কাছ থেকে গাছের ঠিকানা জেনে নিয়ে জঙ্গলে ঢুকে যাব। বর্ষার জঙ্গলে। গিয়েই হারিয়ে যাব। তোদের কড়া প্রিন্সিপাল ম্যামও আর আমাদের খুঁজে পাবে না।

 

 

সবুজ ধারাবাহিক ৭

বুনো ঝোপঝাড়

গাছবন্ধু

টেপারি

বৈজ্ঞানিক নাম: Physalis minima
ইংরেজি নাম: Cape gooseberry, Native gooseberry, Wild cape gooseberry, Pygmy groundcherry
অন্যান্য বাংলা নাম: রসভরি, বনটেপারি, ট্যাঁপারি, ফুটকি, ফুটকা, ফসকা বেগুন

আমাদের বিলেন মাঠের আলগুলো তখনও দু-মানুষ-স্বচ্ছল হাঁটাপথ, তখনও দু-আলের মাঝে মহাদেবের মতো চিৎ হয়ে শুয়ে-শুয়ে তারা-গোনা জলপথেরা ছিল স্বচ্ছ, তখনও গিলে খায়নি তাদের কোনও অজগর-পাইপ, তখনও ওই জলপথে ভাসিয়েছিস কত কাগুজে নৌকো অজানার উদ্দেশে, পালে তার নাম লেখা। মণ্ডলদের জমি পেরিয়ে দাসেদের জমি পেরিয়ে বালাদের জমি পেরিয়ে কোথায় যে চলে যেত নৌকোগুলো! তখনও বৈশাখের খড়খড়ে রোদে তোকে দেখেছি পাকাধানের ভিতর, যেন মালক্ষ্মী কানাধানের বোলগুচ্ছে হাত বুলিয়ে করলেন চক্ষুষ্মান! ধানকাটার মরশুমে কাস্তেরা সুর তোলে মধুর। মাঠের-পর-মাঠ ফাঁকা হয়ে আসে। সারাটা মাঠের ভিতর অজস্র ধানের জালি। যেন এ মাঠ নয়, অনন্ত আশ্রমপুর! তারই ভিতর মাথা ভর্তি ঝাকড়া ঘাস নিয়ে আলগুলো শুয়ে। শুয়ে শুকনো জলপথ। তার ভিতর ও বাইরে বুনো ঝোপঝাড়। আর সেই ঝাড়ের ভিতর হাঁটু-সমান বুনোগাছ থেকে টপাটপ কয়েকটি সবুজ ফল মুঠোয় নিয়ে বলতিস, “বলতো কী?” অপুষ্ট মেঘের মতো আমার চাউনি দেখে হেসে বলেছিলি, “এও চিনিসনে? এ তো ট্যাঁপারি!” দুধেধানের মতো বাতাসে হাসি উড়িয়ে আরও বলেছিলি, “ট্যাপা ট্যাপা ফল। তাই ট্যাঁপারি! তুই ট্যাপা আমি টেপি, হয়ে গেল ট্যাপাটেপি। হয়ে গেল ট্যাপারি!” “আমি টেপা?” রেগেছিলাম খুব। “হয়ে যাবি যখন এই এতটা হবি!” হাত দিয়ে বুঝি তুই আকাশকে বোঝাতে চাস। আমি আকাশ দেখি, দেখি ধান-শূন্য মাঠে ধুসর বাদামি নাড়ার ভিতর আল টপকে ঘরে ফেরা গোরুগাড়ি বোঝাই গোধূলি। এভাবে একদিন গোধূলি-রং ধুয়েমুছে আমাদের মাঠে ঘন রাত নামে আচমকা। আর কখনও বুঝি-বা ভোর হয়নি সেখানে। আর কখনও পা রাখিনি সেখানে। তোর আকাশ-ছোঁয়া হাতটা আকাশ-ই ছুঁয়ে ফেলল একদিন। ট্যাপাটেপি-র মাটির পুতুল ভেঙে চলে গেলি পুতুল নাচের দেশে। একদিন শুনলাম সেই আকাশ-ই বুকে নিয়ে গেছে তোকে! তোর ছোট্ট মেয়ে দুটো আকাশ ছুঁয়ে-ছুঁয়ে দেখে কি আজও ধানখেতের ভিতর?
সব পালটে গেছে এখন—নদী-বাঁওড়-জমিজমা-নরনারী। গোপালনগর হরিপদ ইনস্টিটিউশনের মাঠে ক্রিকেট ম্যাচ, ছেলে খেলছে, আর আমি ঘুরে-ঘুরে দেখছি আশেপাশে। পাশে ইংরেজ আমলের ছাত্রাবাস। দেখি তার মাথাটা ভীম-পা দিয়ে চেপে ধরেছে দেয়ালে জন্মানো বিশাল এক নিমগাছ। তার শিকড়বাকড় দেয়ালে প্রাচীন লিপির মতো ছড়ানো। নিমের পাশে অশ্বত্থ। সেও চেপে ধরেছে বাহু। যেন মহাভারতের যুদ্ধ এখানেই। একতলা ঘরটার কড়িবরগা ভেঙে পড়েছে কোথাও-কোথাও। পৃথিবীর সভ্যতা এভাবেই বুঝি ভেঙে পড়ে। পাখিদের ঠোঁটে ঠোঁটে শুধু গান নয়, বিদ্রোহের বীজ ছড়িয়ে পড়ে এভাবেই। প্রকৃতির সঙ্গে পাঞ্জা?
বাচ্চারা খেলছে। ওপাশের স্কুলটায় বিভূতিচরণ পড়েছিল একদিন। ছাত্রাবাস ছুঁয়ে আমতলা টপকে বাটকেমারির ওই চাষের মাঠে দাঁড়িয়েছিলেন একদিন। ছাত্রাবাসের পুরোনো শরীর ছুঁয়ে জেগে ওঠে আমার এ-জীবনের বিভূতি-অনুভব! এখানেই বিভূতি-অরণ্য। আর কী আশ্চর্য, তারই নীচে অজস্র বনটেপারি! লিচুর মতো অজস্র সবুজ ফল ঝুলে আছে গাছে গাছে। পাকলে বাদামি। হাওয়ায় হাওয়ায় খুলে যায় পাকা ফলগুলোর কাগুজে আবরণ। উড়ে যায় বীজ। ছড়ায় জীবন। প্রকৃতির কী অদ্ভুত খেলা! এটাই নাকি ‘বেলুন মেকানিজম’। সোলানেসি পরিবারভুক্ত বেগুনফুলের মতো ফুলগুলো একদিন ছুঁয়ে-ছুঁয়ে দেখেছিলি খুব, একদিন কোরসে জমিয়েছিলি অনেক কাঁচাফল, একদিন নুন মাখিয়ে মুখে পুরে বলেছিলি, “উফ্‌, খেয়ে দেখ, একেবারে বুনোটমেটো!” Physalis minima, Physalis philadelphica, Physalis peruviana, Physalis heterophylla—মেক্সিকো প্রদেশের এই ঝোপঝাড়গুলো সব-ই প্রায় একই রকম। কবে যে তারা এখানে এসে আপন হয়ে গেছে! ওদেশে স্যালাডের মতো করে কাঁচাফল খায়। আবার দেখা যায় বেদনানাশক হিসেবে গোটা গাছের ব্যবহার। এ যে এক একবর্ষজীবী ভেষজ উদ্ভিদ—গুণাগুণ ঢের।
মাঠে বাচ্চাদের খেলা চলছে। ‘আউট আউট’ চিৎকার ভেসে আসে। কে আউট? আমি? তুই? আমি তো তাকিয়ে রসভরির দিকে। আমি তো তাকিয়ে পাশের পটলখেতের দিকে। বৃদ্ধ বোধহয় এই শেষ বিকেলে নাতনিকে নিয়ে মাচাপটল ভাঙতে এসেছেন। মেয়েটা আচমকা আমার দিকে ফিরতেই মনে হল তুই! তুই আকাশ ছুঁয়ে এসে পড়লি এতদিন পরে! ধুস, তাই হয় নাকি! এইসব বড়ই ক্লিশে মনে হওয়া। তার চেয়ে বরং ভাবি তোর নাম লেখা কাগুজে নৌকোর পেছন-পেছন এত বছর হেঁটে এসে খুঁজে পেয়েছি আজ রং রস ভরা এই রসভরির দেশ!

Close Menu