শ্রেষ্ঠ নয় সমগ্রের খোঁজে

।। কবিতা আশ্রম পরিবারে সকলকে স্বাগত।।"কবিতা আশ্রম একটি গুরুত্বপূর্ণ পত্রিকা। এই পত্রিকা থেকে তরুণদের কবিতা আর কবিতা-ভাবনা কোন পথে চলেছে তার এক রকমের চিহ্ন পাওয়া যায়।"--কবি জয় গোস্বামী ।। "তথাকথিত শিবিরের ধারণাকে ধ্বংস করে দিয়ে কবিতা আশ্রম এই সময়ের বাংলা কবিতার প্রচ্ছদ হয়ে উঠেছে। নানা মাত্রার , মার্গের , স্রোতের , ঘরানার এমন নিরভিমান উদযাপনের শরিক না হয়ে কেউ পারবেন না , এটা আমার বিশ্বাস ।"--সুমন গুণ ।। "কবিতা আশ্রম চমৎকার ম্যাগাজিন ।কখনও লিখিনি , এবার লিখতে পেরে ভালো লাগছে"--কবি মৃদুল দাশগুপ্ত।।"আমি কবিতা আশ্রম পত্রিকা পাই এবং আগ্রহ দিয়ে পড়ি । যে সকল কবিতা ও গদ্য প্রকাশিত হয় সে-সবই অত্যন্ত ভালো লেখা এবং সু-সম্পাদিত,যা আমার খুবই ভালো লাগে । এছাড়াও কবিতা আশ্রম পত্রিকাকে কেন্দ্র করে বেশ কিছু তরুণ কবি ও গদ্যকার আগামীর জন্যে তৈরী হয়ে উঠছে । তরুণ কবি ও গদ্যকার-দের প্রশয় দেওয়ার ক্ষেত্রে কবিতা আশ্রম পত্রিকাটি খুবই উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রেখেছে ।"--কবি দেবদাস আচার্য।।"প্রকৃত কবিতাকে জহুরির চোখে খুঁজে আনছে কবিতা আশ্রম। প্রচারের আড়ালে থাকা তরুণ কবি প্রতিভাকে পাঠকের সামনে নিয়ে আসার এই প্রয়াসকে কুর্নিশ জানাই ।"--কবি অঞ্জলি দাশ।।"দূরে গেলে কিছু জিনিস আবছা দেখায় । আরও দূরে গেলে কিছু জিনিস স্পস্ট হয়ে ওঠে । কবিতা আশ্রমকে আমি স্পস্ট দেখতে পাচ্ছি। যেভাবে আত্মত্যাগের মধ্যে দিয়ে মাথা তুলে কাগজটিকে ক্রমশ আইকনিক তুলছে সেটা একটা দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে ।"--কবি সুবোধ সরকার।। “কবিতা আশ্রম প্রকৃত অর্থেই বাংলা কবিতার লাইট হাউস ।তরুণ কবিদের খোঁজে আমি তাই প্রতিটি সংখ্যা পড়ি”।–রাহুল পুরকায়স্থ ।।“অচেনা নতুন কবিদের দিকে এখন তাকিয়ে থাকি।‘কবিতা আশ্রম’ এই সব কবিকে সামনে নিয়ে আসছে।এ একটা প্রশংসনীয় উদ্যোগ। এই জাতীয় উদ্যোগ বাংলা কবিতার ক্ষেত্রটিকে প্রসারিত করছে”।–কবি কালীকৃষ্ণ গুহ ।।“কবিতা আশ্রম আমার প্রিয় পত্রিকা । পড়ে এবং লিখে তৃপ্তি পাই। সারা বাংলার তরুণদের খুঁজে আনছে কবিতা আশ্রম”।–কবি সমর রায়চৌধুরী ।। "সব চেয়ে ভালবাসি নিজেকে কারণ সে লোকটার ভেতরে কবিতার আবাস । সেই নিজেকে দেখার জন্যে এক টুকরো আয়না খুঁজছিলাম বহুদিন । কোথাও পাইনি । কে জানতো একটি আশ্রমের ভেতর সেই টুকরোটুকু আমার জন্য অপেক্ষা করছে।"--দিশারী মুখোপাধ্যায় ।।

মেঘবতী

সন্মাত্রানন্দ

 

 

প্রথম অনুবাক   

জ্যোৎস্নার জোয়ারে ধোওয়া টিলাপাহাড়ের নৈশ নিস্তব্ধতার ভিতর মেধাবী স্বপ্নের মতো জেগে আছে একটি নদী। সে কিছুটা তির্যকবাহিনী; আলো ও ছায়ার ভিতর সে কতোটা জল, কতোটা জ্যোৎস্না তার সুসঙ্গত পরিমাপ করতে চায়নি চাঁদ এইসব নক্ষত্রের রাতে। হয়ত আকাশগঙ্গার পারে এমন কোনো আলোর নদী আছে, পৃথিবীর এই নদী সেই অপার্থিব স্রোতস্বিনীর বোন। তীরে অন্ধকার ঝোপঝাড়, পরিত্যক্ত কোনো মন্দির, রাতের কুহক ভেঙে ভেঙে ডেকে ওঠা কোনো সতর্ক তক্ষক, উজ্জ্বল মসৃণ সরীসৃপের মতো নিরালম্ব বালুচর আর বুকফাটা দীর্ঘশ্বাসের মতো রিক্তশস্য ক্ষেত-মাঠ, জলা-জমি জুড়ে অবসিত হেমন্তের ফুরোনো পাতার রসহীন স্তূপের ভিতর দিয়ে গড়িয়ে চলেছে ছিন্ন বিচ্ছিন্ন স্বপ্নসম্ভব উপত্যকায় এই যে তন্দ্রামদির এক নদী।

এবং সঙ্গতভাবেই এখানে অন্ধকারের নিগূঢ় পরামর্শের মতো একটি প্রতর্ক ঘনিয়ে উঠছে; নদীটির কি কোনো নাম আছে, অথবা নাম নেই তার?  যদি এই স্বপ্ন কেবল একজন কেউ দেখছে এমন হত, অর্থাৎ এ-স্বপ্ন যদি শুধু কারো ব্যক্তিগত স্বপ্নই হত, তাহলে অবশ্য এই নদীটির নামকরণের কোনো সদর্থ থাকত না। কিন্তু যেহেতু স্বপ্নটিকে অন্যের কাছে বর্ণনা করা যাচ্ছে, ব্যাখ্যা করা যাচ্ছে—অতএব নদীটি নামহীন হতে পারে না। হ্যাঁ, নদীটিকে চিহ্নিত করার একটি অভিধা আছে বৈকি। নদীটির নাম, ধরা যাক, চিন্ময়ী।

চিন্ময়ীর স্রোত এখন অরব হয়ে আছে। ঘুমিয়ে পড়েছে তার স্রোতোবিদ্যুৎ। অথবা, এ ঘুম নয়। ঘুম আর জাগরের মাঝখানে যে-অনতিস্পষ্ট বিষাদ, চিন্ময়ী সেই অপরিসর বিধুরতার ভিতর না-জেগে, না-ঘুমিয়ে টিলাপাহাড়ের মাঝখানে ছড়িয়ে পড়ে আছে। ফলত সুযোগ নিচ্ছে রতিকুশল বাতাস। আধোঘুমন্ত নদীশরীরের উপর সে ছড়িয়ে দিচ্ছে স্পর্শের মায়া। আসন্ন তন্দ্রার ভিতর চমকে চমকে জেগে উঠছে চিন্ময়ী—প্রিয় পুরুষের স্পর্শ সে আযৌবন জানে, বহু যুগ আগে তার কৌমার্য ভেঙেছে। সে জানে, এই পরিচিত স্পর্শ তাকে টেনে নিয়ে যেতে চাইছে আবার কোনো পৌনঃপুনিক আবর্তের ভিতর। সেখানে সে যেতে চায়, অথচ চায় না। কেননা, সে-বিশদ অভিজ্ঞতা তার পক্ষে নূতন কিছু নয়। সুতরাং তার দ্বিধা-অস্থির নিঃশ্বাস বুদ্বুদ হয়ে জলতলে ফাটল। বাতাসের দিকে  পাশ ফিরে শুয়েছে সে এবার চিন্ময়ী।

এই দৃশ্যে উত্তেজিত বোধ করছে একটি রাতপাখি। দিনের আলোর দৃষ্টিরোধী অনড় আড়াল রাতের পাখিটিকে অন্ধ করে দেয়। বিভাবরীর স্পষ্ট অন্ধকারে সে বেরিয়ে আসে গাছের সংগুপ্ত কোটর থেকে। নদীটির কাছে উড়ে এসে ভাঙা মন্দিরের চূড়ায় সে বসল। নদী ও বাতাসের রতিক্রিয়া সে নিষ্পলক দেখছে। অবশেষে এরকম আচম্বিত দৃশ্যের নিষ্পত্তি করতে না-পেরে সে রুচিবায়ুগ্রস্ত ভূতের মতো প্রগাঢ় নিষেধক শব্দ তুলে উড়ে গেল চিন্ময়ীর ওপারে।

যৌন উত্তেজনার মতো দুয়েকটি মাছ নদীগর্ভ হতে লাফ দিল। বাতাস এখন চিন্ময়ীকে উথালপাতাল করে দিচ্ছে। নদী জেগে উঠছে। তার অলৌকিক স্রোত আধোস্ফুট শীৎকারধ্বনিতে বালুকাভূমি ভিজিয়ে দিয়ে যাচ্ছে। বনঝোপের ভিতর দিয়ে ঋজুরেখ জোনাকি চরবান্ধিয়া গ্রামের দিকে উড়ে গেল।

মিলন শেষ হয়ে আসছে। চিন্ময়ীর গাল ভেসে যাচ্ছে আনন্দবিষাদে। আরম্ভের তৃপ্তিতে, অশেষের বেদনায়। সেই অশ্রুরেখা চাঁদের ঘোরলাগা দীপ্তিতে চিকচিক করে উঠছে।

বাতাস এবং নদী ধীরে ধীরে ঘুমিয়ে পড়ল অতঃপর রতিশ্রমে। এখন চরাচরে শব্দ নাই।

নিষুপ্ত চিন্ময়ী জানে না, কী হচ্ছে তার শরীরের ভিতরে ও বাহিরদেশে। উরুসন্ধি কাঁপছে তার। সে জানে না।

সে জানে না, এখন তার গর্ভ থেকে ধীরে ধীরে জেগে উঠবে একটি ছায়াশরীর। একটি বিচিত্র অবয়ব। জল ভেঙে সেই অবয়ব উঠে আসবে ঘাটলার দিকে। নারী, কিন্তু নারী নয়। মেঘের মতো তার গায়ের রঙ। শরীরের নিম্নাংশ মাছের মতো রুপালি আঁশে ঢাকা। যোনি, নাভি, স্তন, বাহুলতা কোনো অনুপমা প্রাকৃত রমণীর। কিন্তু সে-নারীর মুখ মকরের।

তীরে উঠে এসে সেই মকরমুখী আধোজাগর জ্যোৎস্নায় চুল শুকোবে। গায়ের রুপালি আঁশ থেকে জল ঝেড়ে নেবে। তার মুখবিবরে সহসা জ্বলে উঠবে আগুনের শিখা। তারপর নদীতীরে জড়ো করে রাখা পাটকাঠি তুলে নিয়ে মুখের ভাপে সে জাগিয়ে তুলবে মশাল। এবং সে সেই জ্বলন্ত মশাল হাতে নিয়ে হেতমপুরের মাঠের দিকে যাবে।

মাঠের মাঝখানে যেখানে ফসল কাটা হয়ে গেছে, কৃষকরমণীরা যেখানে স্তূপাকারে ফেলে গেছে কাটা ধানের শুষ্ক নাড়া, যেখানে রাতের ওস জমে জমে অশ্রুর আলেখ্য রচনা করতে চেয়েছে, সেইখানে মেয়েটি এসে দাঁড়াবে। অন্য তিন দিক থেকে তারই মতন দেখতে তিনজন মকরমুখী নারী এসে দাঁড়াবে সেখানে আচম্বিতে। প্রত্যেকের হাতেই প্রজ্জ্বলন্ত মশাল। অথচ মানুষের মাথার খুলির মতো ফটফটে ধবল জ্যোৎস্নাতেও তাদের শরীরের ছায়া পড়বে না কোথাও। তাদের মকরমুখের চোখ থেকে আগুনের হলকা বেরিয়ে আসবে।

হাতের মশাল তুলে বৃত্তাকারে দাঁড়িয়ে তারা উত্তরবাহিনী বাতাসে কাকে যেন সঙ্কেত পাঠাবে। চোখে চোখে কথা হবে মকরমুখীদের। তারপর বাকি তিনজন যেদিক থেকে এসেছিল, সেইদিকে ধীর পায়ে হেঁটে চলে যাবে। একাকিনী মাঝমাঠে দাঁড়িয়ে থাকবে সেই নদীগর্ভোত্থিতা রূপসী আনতগ্রীব।

মুখ তার মকরের মতো হয়ে গেছে, তবু এ-মুখ এমন ছিল না। একদিন স্থলপদ্মের মতো ফুটে উঠেছিল প্রথম কৈশোরে। পাখির ছড়ানো ডানার মতো ভ্রুযুগে রচিত হয়েছিল অনঙ্গধনুক। আয়ত কাজল দুই চোখে ঝিকিয়ে উঠেছিল কটাক্ষের বিদ্যুৎ। শিরিষফুলের মতো সূক্ষ্ম নাসায় কুরচিফুলের নাকছাবি হৃদয়াবেগে থরোথরো কম্পিত অধরোষ্ঠে ছড়িয়ে দিয়েছিল অনুরাগের প্রথম আলো। এখন সেখানে মুখ নেই মানুষের, অথবা নারীর। সেই মুখপদ্ম শুকিয়ে গেছে, তার শুকনো পাপড়ি সব মকরের মতো দন্তুর, বীভৎস হয়ে গেছে।

মকরমুখী ঘুরে দাঁড়াবে এবার। হাতের মশাল নিভিয়ে কালমেঘের ঝোপের পাশ দিয়ে গ্রামের শ্মশান পেরিয়ে যাবে সে। তার পায়ের নীচে মড়মড় শব্দে ভাঙবে মৃত প্রেমিকদের বুকের হাড়। তারপর গন্ধরাজ নেবুর জঙ্গল পেরিয়ে চোরকাঁটাদের দলিত করে সে এসে দাঁড়াবে সেই ঘরগুলোর সামনে।

গ্রামের প্রান্তে ছোটো ছোটো কতগুলো জীর্ণ কুটির। এইখানে আমতলায় একটি মৌনবাক কুটিরে একটি মানুষ থাকে। মানুষটিকে একদিন মকরমুখী চিনত। বহু যুগ আগে, বহু জন্ম আগে। এখন এইখানে সেই মানুষটি থাকে। চাঁদের আলোয় স্তম্ভিত, মুগ্ধ চকোরের মতো এইসব কুটিরগুলিতে তারই মতন আরও কয়েকজন মানুষ এখানে বসবাস করে।

তারা সমাজের কেউ না। সমাজের মধ্যে জন্মেছিল, কিন্তু সমাজ তাদের মধ্যে জন্মায়নি। যৌবনের আরম্ভেই ঘর ছেড়ে, গ্রাম ছেড়ে, দেশ ছেড়ে তারা চলে এসেছে। কী যেন তারা খোঁজে দিবারাত্র। তাকে তারা বলে ‘মুক্তি’। সাধারণত, মানুষ জীবনকে ভালোবাসে। কিন্তু কুটিরবাসী এইসব গৃহত্যাগী মানুষেরা ভালোবাসে মৃত্যুকে। অমোঘ অবধারিতভাবে জীবনের সব কিছু অবসান হয়ে যাবে জেনে এইসব মানুষ নিজেদের জন্য জমিয়ে রাখতে চায় না কিছুই। শরীর না, সৌন্দর্য না, চিন্তা না, মননের বৈভব না। কোথাও যেন একটা প্রকাণ্ড আগুন জ্বলছে। এরা সেই আগুনে আহুতি দিচ্ছে শরীর, রূপ, চিন্তা, বিভব। দিচ্ছে তো দিচ্ছেই—যতদিন না সব শেষ হয়ে যায়। এই দিয়ে যাওয়াকে এরা বলে ‘সেবা’।

তাই এরা রোজদিন সকালে, দুপুরে চরবান্ধিয়া গ্রামে যায়। সেখানে দরিদ্র মানুষের সেবা করে। অসুস্থ রোগীর পরিচর্যা করে। চরবান্ধিয়াতে বিদ্যালয় খুলে ছাত্র পড়ায়। মৃত্যুপথযাত্রীর মুখে জল দেয়। মৃত মানুষের সৎকার করে। মৃতের সৎকার মৃতরা ছাড়া কে আর করবে?

তবু এরা সমাজে থাকে না। দিন শেষ হলে এরা গ্রামের একপাশে নিজেদের সঙ্গোপন কুটিরগুলিতে ফিরে আসে। যেহেতু রূপ নশ্বর, তাই সেকথা মনে রাখবার জন্যে এরা কেশ মুণ্ডন করে। যেহেতু শরীর একদিন মাটি হয়ে যাবে, তাই সেকথা মনে রাখবার জন্যে এরা কাপড় মাটির গৈরিকে রাঙিয়ে গায়ে দেয়। এই মানুষেরা এরকম অদ্ভুত জীবন যাপন করে বলে এদেরকে বলে ‘সন্ন্যাসী’।

মকরমুখী বহু জন্ম আগে যাকে চিনত, এই জন্মে তার নাম কশ্চিৎ। কশ্চিৎ গ্রামের উপান্তে এইসব সারি সারি নির্বাক কুটিরগুলির একটিতে থাকে। কশ্চিতের কোনো বন্ধু নেই। স্মৃতি আছে। ফিরে যাওয়ার পথ নেই। ফিরে যেতে সে চায়ও না।

কশ্চিতের কোনো কথা মনে নেই আর? নাকি আছে? সে অনেকটা দেখেছে। অনেকটা দেখা বাকি তার। সব দেখা শেষ হয়ে গেলে মকরমুখীর ছুটি হয়ে যাবে। তাকে ফিরে যেতে হবে অন্য কশ্চিতদের জন্য। অন্য কশ্চিতেরা তার অপেক্ষায় আছে। যে কেউ। কশ্চিৎ মানেই তো তাই। কশ্চিৎ মানে যেকোনো একজন। সকলেই তাই নিরুপায়ভাবে কখনও-না-কখনও কশ্চিৎ।

কশ্চিতকে কি মকরমুখী ডাকবে তবে? তাকে জাগাবে? মনে করাবে পুরোনো অনেক কথা? কী কী তার দেখা হয়ে গেছে, কী কী তার দেখতে বাকি আছে, জানাবে কি মকরমুখী গূঢ়ার্থ-সঙ্কেতে? না-জানালে কশ্চিতের পথ এই চরবান্ধিয়া গ্রামের ধারে থমকে যাবে যে!

পথ তো কখনও থমকে থাকে না। পায়ের নীচে থাকে বলে তাকে বলে ‘পন্থা’। কিন্তু ‘যাওয়া’ না থাকলে ‘থাকা’-ও থাকে না। অতএব, পথ কোথাও নেই। পথ চলে। মাঠ পেরিয়ে, ঘাট পেরিয়ে, চরবান্ধিয়া পেরিয়ে, চিন্ময়ী পেরিয়ে, যৌবন পেরিয়ে, জরা পেরিয়ে, জাগর পেরিয়ে, স্বপ্ন পেরিয়ে, সুষুপ্তি পেরিয়ে, মৃত্যু পেরিয়ে, জন্ম পেরিয়ে পথ কখনও সামনে গেল না। পথ পড়ে রইল পায়ের নীচেই। পথ কি তাহলে চলে?

পায়ের তলাটাকে জানলে মানুষ সত্যকে জেনে যেত। তা না-করে মানুষ মাথার তালুটাকে জানতে যায়। মাথার তালুতে কিছু নেই। যা আছে, তা পায়ের তলাতেই। কশ্চিৎ এখন মাথার তালুকে জানতে লেগেছে।

মাথার তালুর ভিতরে শিরা-উপশিরার জঙ্গল, রক্তের কল্লোলস্রোত। সেই রক্তলসিকার ফোয়ারাটা পেরোতে পারলেই একটা হাড়ের গুহা। গুহার ভিতরে বাদুড়ের ডানার মতো অবিমিশ্র অন্ধকার। মানুষের মাথার তালুর ভিতরে নিরেট অন্ধকার ছাড়া কিছু নেই। মহা-অন্ধকারের মধ্যে পাকিয়ে বসে আছে শতমুখী এক স্নায়ুর অজগর। ওই অন্ধকার বস্তুপিণ্ডটাকে জানতে চাইছে এখন কশ্চিৎ। সব কশ্চিতেরাই জানতে চায় একে কোনো একসময়। মানুষের ইতিহাস যতো বছরের প্রাচীন, ততো বছর ধরে অভিজ্ঞতা আর চিন্তাকে শ্রেণিবদ্ধ করার ভানে শেষাবধি  আরও ঘুলিয়ে দিয়েছেন কণাদ, ডিমোক্রিটাস, সফোক্লিস, চাণক্য, কপিল ও কৌটিল্যরা। সেই ঘুলিয়ে দেওয়া ব্যাপারটার নিষ্পত্তি করতে গিয়ে বুদ্ধিমাত্রনির্ভর মেধাজীবীরা রাস্তার ধারে যেসব বদহজমের বমি উদগীরণ করে রেখেছে, অথবা যে-সব উচ্ছিষ্ট ছড়িয়ে রেখে গেছে মাথার গলিঘুঁজির আস্তাকুড়ের উপর, তাকে পুনর্বার পরান্নভোজী কাকের মতন বেমালুম গিলে  ফেলার চেষ্টা করছে কশ্চিৎ। সেখানে কোনো আলো নেই, আভাও নেই, প্রেম নেই, বাতাসও নেই। মানুষের মস্তিষ্ক আছে  বলেই সে নির্বোধ। এর থেকে চোখ ঘুরিয়ে কবে কশ্চিৎ পায়ের পাতার দিকে তাকাবে?

অথচ সে একদিন নিজের পায়ের পাতাকেই প্রণাম করেছিল। সে বহু শতাব্দী আগে। সেই উত্তুঙ্গ পর্বতশ্রেণী, পাহাড়ের ফাটল দিয়ে এসে পড়া সকালবেলার আলো…সেই বনানীর অবগুণ্ঠন…সেই নদীঘাট, নীলাকাশ। সেই পরিত্যক্ত মন্দিরের আড়ালে অযত্নবর্ধিত জঙ্গলের ভিতর পাতার শয্যায় শুয়ে প্রথম প্রগাঢ় ভালোবাসায় সে বলেছিল, ‘তোমাকে দেখব, মেঘবতী!’ যেন সদ্যোজাত শিশুর প্রথম উল্লাপন ছিল সেই উচ্চারণে, গর্ভের অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আলোর পাপড়িকে মুঠো করে ধরার প্রয়াস। মেঘবতী তাকে প্রথম চলতে শিখিয়েছিল জীবনের উপত্যকার উপর দিয়ে টলোমলো পায়ে। সে সমস্ত ভুলে গেল কেন কশ্চিৎ?

তাকে সবই খুলে দেখানো ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প পন্থা নেই। দেখে চলা ছাড়া অন্য নিয়তি নেই কশ্চিতের। সব দেখা হলে দুজন দুদিকে ফিরে যাবে। কশ্চিৎ আসলে কখনও চলে না। মেঘবতীই শুধু অস্থির, অবিরত চঞ্চলা। মেঘবতী তার গতিশীল মুকুর। সেই মুকুরে ছায়া পড়ছে কশ্চিতের। আয়না চলতে থাকলে মনে হয় প্রতিবিম্বও বুঝি চলছে। দেখতে দেখতে কশ্চিৎ নিজেকে মেঘবতীর গায়ে প্রতিবিম্বিত দেখে নিজের ছায়াকেই ‘নিজ’ বলে ভুল করে। সব দেখা  না-হলে এই ভুল ভাঙে না। ইতোমধ্যে ভুলের ভিতর এই চলার ভানই কশ্চিতের জীবন, জন্ম-জন্মান্তর।

মকরমুখী ঘরের বারান্দায় উঠে এল। চাঁদের আলো বাঁকাভাবে বারান্দার উপর হেলে পড়েছে। কাঠের খুঁটির ছায়া কবিতার যতিচিহ্নের মতো এই জ্যোৎস্নাকাব্যকে শাসন করছে। প্রদীপ্ত জোনাকি একটি অর্জুন গাছের গুঁড়ির উপর থেকে কুটিরের চালের দিকে উড়ে এল। জরাপাণ্ডুর রসালবৃক্ষটিকে জড়িয়ে ধরে প্রগলভা অতিমুক্তলতা বলছে, হে পিতামহ! গল্প বলো।

মকরমুখীর হাঁটু অবশ হয়ে আসছে। দীর্ঘক্ষণ জলের বাইরে থাকলে তার এমন হয়। গায়ের থেকে শুকিয়ে আসছে স্মৃতির সলিল। চিন্ময়ীর জলের ভিতর সে ছিল এতদিন। সবুজ পাতালের শেওলা তার নাভিতে লেগে আছে। চাঁদের আলোতে ওই শেওলাগুলো মরে আসছে। আর কিছুক্ষণ এভাবে থাকলে মকরমুখী আর জলের জগতে ফিরে যেতে পারবে না। সহসা রাতের বাতাস লেগে মকরমুখী শিউরে উঠল। রক্তমাংসের শরীর নয় তার। তার শরীর স্মৃতির আঁশ দিয়ে বোনা। স্মৃতিরা বেশিক্ষণ প্রত্যক্ষগোচর পৃথিবীর অত্যাচারের ভিতর থাকলে সজীব থাকে না। আর বেশিক্ষণ থাকা যাবে না এভাবে। স্মৃতিশল্ক ঝরে পড়ে যাবে গা থেকে। তখন হেতমপুরের মাঠ পেরিয়ে ঢালু পাড় দিয়ে নেমে চিন্ময়ীর ভিতর সে ডুব দেবে কী করে?

মরিয়া হয়ে সে কুটিরের দরজার সামনে এসে দাঁড়াল। কশ্চিতের স্বপ্নের ভিতরে, বস্তুত তার মস্তিষ্কের ভিতরে ঢুকে নাড়া দিয়ে যেতে হবে একখুনি। যাতে কশ্চিৎ স্বপ্নের ভিতর অবধারিতভাবে নাড়া খায়। মাথার তালুর রস এক ঢোকে গিলে ফেলে পাকস্থলীর ভিতর চালান করে দিয়ে যাতে সে তার পায়ের পাতার দিকে তাকায়।

পাংশুবর্ণের দরজাটা বন্ধ আছে। দরজার ওদিকে ঘুম। নিশ্চেতনা। ওই নিশ্চেতনার ভিতর দরজা-জানালা এঁটে কশ্চিৎ ঘুমোচ্ছে। ঘুমঘরের মাঝখানে নীল আলোর একটা ভাস্বর শিখা। এমন একটা ইশারা পাঠাতে হবে, যাতে সেই ইশারাবাতাসে নীলাভ শিখাটি থরথর করে কেঁপে ওঠে। কাল সকালে নীল আলোটা যখন মোরগঝুঁটি ফুলের মতো লাল হয়ে উঠবে, তখনও আজ রাতের এই অমোঘ কাঁপুনির কথা মনে পড়ে যাবে কশ্চিতের।

কী যেন অমানুষী চিন্তায় মকরমুখী তলিয়ে গেল হঠাৎ। হয়ত তারও মন আছে, আছে কিছু স্মৃতি ও বিষাদ। সেখানে আনন্দ বিমর্ষতা হয়ত-বা খেলা করে আলো ও ছায়ার মতো। আবার হাওয়া দিচ্ছে, থিরথির করে কেঁপে উঠছে শিরিষের শাখা ও মকরমুখীর শরীর। আর সে নিজেকে ধরে রাখতে পারছে না।

মকরমুখী দরজায় করাঘাত করল। অস্ফুট স্বরে সে ডাক দিল, ‘কশ্চিৎ, কশ্চিৎ, শুনতে পাচ্ছ?’

কিছুক্ষণ কোনো কথা নেই। ঘরের ভিতর শুধু নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ।

মকরমুখী আবার ডাকল, ‘কশ্চিৎ! শুনতে পাচ্ছ?’

কুটিরের ভিতর থেকে ঘুমজড়ানো দুমড়োনো কণ্ঠস্বর ভেসে এল এবার— ‘কে-এ?’

বড় ক্লান্ত, বড় বিমর্ষ সে-স্বর। যেন কথাটা বলেই কশ্চিৎ আবার পাশ ফিরে ঘুমিয়ে পড়বে।

মকরমুখী উত্তেজিত স্বরে বলে উঠল, ‘আমাকে চিনতে পারছ না, কশ্চিৎ? আমি মেঘবতী। তোমার মেঘবতী!’

আর কোনো শব্দ নেই। তবু সন্দেহের অতীত নিশ্চয়তায় মকরমুখী এবার অনুভব করল, কশ্চিৎ তার উত্তর শুনতে পেয়েছে। মাথার খুলির ভিতর নীল চেতনার শিখা তার ইশারাবিদ্যুতে দপ করে কেঁপে উঠেছে। আর কিছু করার নেই।

তবু সে আরো একবার বড়ো কোমল স্বরে বলল, ‘কশ্চিৎ! আমি কথা রেখেছি। আমি তোমার মেঘবতী! মনে করিয়ে দিয়ে গেলাম তোমাকে। মাথার খুলির অন্ধকার না-খুঁড়ে এবার পায়ের ধুলোর দিকে তাকাও।’

মকরমুখী—সেই শতাব্দীপারের বিকৃতদেহা নারী—না-মানুষ, না-মীন—তারপরই কুটিরের দাওয়া থেকে দ্রুতপায়ে নেমে এল আমগাছের নীচে। অতঃপর বিভূতিভূষিত জ্যোৎস্নায় শরীর বিলিয়ে অর্জুনগাছের অলৌকিক ছায়া-অন্ধকারের ভিতর দিয়ে মাঠপারের পথে হারিয়ে গেল।

 

দ্বিতীয় অনুবাক    

হলুদ আলোর তির কাঠের জানালার ফাট দিয়ে এসে চোখের কোমলে আঘাত করতেই ঘুম গলে গলে জাগরণ ফুটল। ধাতস্থ হতে কয়েক মুহূর্ত শুধু; তারপর মনে হল সেলফের পুরোনো বইগুলোর থেকে বেরিয়ে একটা রুপালি সিলভারফিশ বইপোকা যেন নাক, কান বা চোখের নীলাভ মণির সূক্ষ্ম ছিদ্র গলে মাথার ভেতরে সেঁধিয়ে গেছে কশ্চিতের। অনির্বচনীয় দাঁড়া দিয়ে মগজের স্নায়ুকোষগুলিকে পোকাটা টিপে টিপে দেখছে নাকি? তা না-হলে মাথায় এত যন্ত্রণা হচ্ছে কেন?

বইগুলো ঝাড়পোঁছ করা দরকার মনে হল তার এবং এ-প্রসঙ্গে এ-মুহূর্তে সে ভুলে গেল যে, যেহেতু সে সেলফ-সাজানোর জন্য বইবিলাস করে না; বই তার রক্তের তার ধাতের অসুখের সঙ্গে প্রতিদিন যুদ্ধ করবার আয়ুধ, অতএব নিত্যব্যবহৃত বইতে ধুলা-জমার ও সেই ধুলামলিন গলিঘুঁজি বেয়ে বইপোকাদের যাতায়াত, রমণ ও জন্মমৃত্যুর সম্ভাবনা প্রায় শূন্য। এবং সে আরও ভুলে গেল, কোনো গ্রন্থকীটই আকারে এত সূক্ষ্ম নয় যে শরীরের অপরিসর ছিদ্র দিয়ে চিন্তার দুর্গম দুর্গে ঢুকে পড়তে পারে। যদি এই অসম্ভাবনাগুলিকে ঘুম থেকে উঠে আলুথালুদশাতেও সে পরীক্ষা করে দেখতে পারত, তাহলে হয়ত-বা তার শিরঃপীড়ার অন্যতর কারণ খুঁজে পেত। হয়ত ঘুম গাঢ় হয়নি তার রাতে, হয়ত দুঃস্বপ্নের পাখি এসে মনকেবিনের কাঁচের জানালায় অতর্কিত ডানায় ঝাপটা মেরেছে, হয়ত সে কয়েক মুহূর্তের জন্য জেগে উঠে আবার ঘুমের চোরাবালির মধ্যে অস্বাস্থ্যকরভাবে তলিয়ে গেছে।

সেসব বিকল্প কারণগুলিকে মাথায় না এনে, বিছানার কুঁচকে যাওয়া চাদরের উপর উঠে বসল কশ্চিৎ। খাট থেকে হাত বাড়িয়ে জানালার কাঠের পাল্লা খুলতেই একটা মলিন অপরাধবোধ মনের উপর চেপে বসতে লাগল। জানালার ওদিকের নীচু হয়ে থাকা বাঁশঝাড়ের বউদের সবুজ পাতার ঘোমটার উপর এসে পড়া নির্লজ্জ রোদ জানান দিচ্ছে, সে প্রাতরুত্থানের বিধিবদ্ধ সময়ের থেকে অনেক দেরি করে ফেলেছে। একজন আশ্রমিকের সূর্য ওঠার আধঘণ্টা আগে ঘুম থেকে উঠে আশ্রমের প্রার্থনাগৃহে গিয়ে নতজানু হয়ে বসার কথা। সে আজ সেখানে যায়নি এবং অন্যান্যরা গিয়েছেন। অর্থাৎ প্রার্থনাগৃহে তার জন্য নির্দিষ্ট স্থানটি আজ ভোরে শূন্য ছিল এবং নিশ্চয়ই প্রার্থনার ফাঁকে অন্যরা আড়চোখে তার উপস্থিতির এই সুস্পষ্ট অভাব দেখে নিয়েছেন। এর ফলে কোনো  তিরস্কারবাক্য কশ্চিতের জন্য অপেক্ষা করছে না যদিও, তবু এর পর যখনই অন্যদের সঙ্গে দেখা হবে, তখনই তাঁদের চাহনির মধ্যে অকথিত একটা অস্বস্তিকর জিজ্ঞাসা আজ সারাদিন কশ্চিতকে কুণ্ঠিত করে তুলবে—এই সব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে সে সংলগ্ন স্নানঘরের দিকে অপ্রসন্ন মুখে হেঁটে গেল।

সব সেরে খাওয়ার ঘরে এসে দেখল কশ্চিৎ, সেই গোলঘরটায় ইতোমধ্যেই অন্যান্য সন্ন্যাসীরা এসে গেছেন, তাঁদের খেতে দেওয়া হয়েছে। কশ্চিতের খেতে বসার নির্দিষ্ট পরিসরটি শূন্য থাকা সত্ত্বেও ছোটো কাঠের টেবিলের উপর তার প্রাতরাশ কেউ ঢেকে রেখে গেছেন। রোগা শালিকের কুণ্ঠায় এদিক ওদিক দেখে খেতে বসল সে। কেউ কথা বলছেন না আপাতত। খেতে খেতে মুখ তুলে দেখছিল কশ্চিৎ উল্টোদিকে বসে থাকা বৃদ্ধ সাধুটি চায়ের পেয়ালায় বিলম্বিত চুমুক দিতে দিতে তার দিকে বারবার তাকাচ্ছেন। চোখে তাঁর স্নেহমায়া কৌতূহল ও জিজ্ঞাসার আড়ালে মুখ লুকিয়ে আছে। কিছুক্ষণ পর তিনি মুখ খুললেন –

‘কাল রাত্রে ঘুমোতে যেতে দেরি হয়েছিল নাকি তোমার?’

‘হ্যাঁ, তা একটু দেরি…মানে…’

‘পড়ছিলে?’

‘হ্যাঁ, পড়ছিলাম।’

‘কতো রাত হল?’

‘একটা।’

‘রাত একটা? আচ্ছা! এত রাত অবধি পড়লে শরীর ঠিক থাকবে না তো! কী পড়ছিলে?’

‘মাণ্ডুক্যকারিকা। বৈতথ্য-প্রকরণ।’

‘যেখানে জগৎ-কে স্বপ্নকল্পিত বলা হয়েছে, না? অনেক দিন আগে পড়েছিলাম।’

‘হ্যাঁ, স্বপ্নকল্পিত। বা আরও একটু এগিয়ে জগতের জন্মই হয়নি কখনও। জগৎ অজাত।’

‘যুক্তি দিয়ে বলা আছে? যুক্তি আছে কোনো? নাকি, মেনে নিতে হবে?’ সামান্য উত্তপ্ত কণ্ঠস্বর।

‘না, না, অকাট্য যুক্তি সব। আমি বিপরীত যুক্তি খাড়া করার চেষ্টাই করছিলাম। কিন্তু পারলাম না। তাতেই রাত হল।’

বৃদ্ধ সাধু চকিতে চায়ে চুমুক দিতে দিতে সকৌতুকে কশ্চিতকে অনিশ্চিতভাবে লক্ষ করছিলেন। বেশ অস্বস্তিকর চাহনি। কিছু বলছেন না, অথচ অনেক কথা বলছেন। কেমন একটা বালকসুলভ অভিমান তাঁর যুক্তিবোধের প্রাকারের গায়ে মাথা কুটছে। অথচ অভিমানটা তিনি দ্রুত লুকিয়ে ফেলছেন তাঁর বাইফোকাল চশমার অর্ধচন্দ্রাকৃতি কাঁচে। আবার মুখ খুললেন—

‘যুক্তি দিয়ে প্রমাণ করা গেলেই কি তা সব সময় সত্য হয়ে যায়? যদি প্রতিযুক্তি দিয়ে খণ্ডন না-করা যায়, তা হলেই কি এই জগৎ-ছাড়া তত্ত্বটা মেনে নিতে হবে? আর যদি মেনে নিই, তাহলে আমাদের এই কাজকর্ম বা সেবাপূজার আর কোনো অর্থ থাকবে? এগুলোও তা হলে স্বপ্ন?’

‘হ্যাঁ, স্বপ্ন। স্বপ্ন ভাঙার স্বপ্ন। সত্যের আভাসযুক্ত স্বপ্ন।’

‘স্বার্থশূন্যতা, সেবা, প্রেম—সব স্বপ্ন?’

‘হ্যাঁ, স্বপ্ন।’

‘ঈশ্বর?’

‘শেষ স্বপ্ন।’

‘মুশকিলে ফেললে। এতে আমাদের কাজের ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। প্রতিযুক্তি দিয়ে কাটা যায় না বলেই কি তা সত্য নাকি? এই চারিদিকের জগতটা দেখছি যে! দেখছি, অনুভব করছি, ব্যবহার করছি।’

‘দেখলেই কি তা সত্যি হয়? অন্ধকারে মাটির উপর পড়ে থাকা দড়িকে সাপ দেখি। মরুভূমিতে মরীচিকায় টলটলে জলের হ্রদ দেখা যায়। তাতে নারকেলগাছের ছায়া কাঁপে। দেখছি বলেই তো আর সেগুলো সত্যি নয়।’

‘সেগুলো তো ভ্রম। কেউ একজনে দেখে। সবাই মিলে ভ্রমে পড়ে দেখে না।জগতটা সবাই মিলে দেখছে যে!’

‘মরীচিকা একই সঙ্গে একই জায়গা থেকে অনেকে দেখতে পারে। একটা দেশের বেশিরভাগ লোক বহু বছর ধরে একটা দূষিত রাজনৈতিক শক্তিকে দেশের পক্ষে কল্যাণকর বলে মনে করে। পরে বোঝে, সেটা সমষ্টিগত ভুল ছিল। ভুল সবসময় মানুষ একা একা করে না।’

পাঁউরুটিতে কামড় দিয়ে আরেকজন সন্ন্যাসী এবার এলোমেলো আলোচনার পর্দাটা তুলে ধরে ভেতরে এলেন। বললেন, ‘দ্যাখো কশ্চিৎ, জগতটা আমাদের কতো কাজে লাগে বলো দেখি! এ সত্যি না হয়েই যায় না।’

‘হ্যাঁ, আপনার কথাটা এইরকম:ডিম যখন দিচ্ছে আর সেই ডিম যেহেতু আমরা খাচ্ছি, তখন মুরগীটা আর মিথ্যা কী করে হবে? কিন্তু আসল কথা হচ্ছে, এই মুরগী-ডিম-ডিমখাদক-খাওয়ার ইচ্ছা এই পুরো চেইনটাই কল্পিত।’

এইখানে একটা উত্তপ্ত বিবাদ ঘনিয়ে উঠছে, খাওয়ার ঘরের আকাশে মেঘ ঘনাচ্ছে দেখে বৃদ্ধ সাধুটি আবার ঢুকলেন তর্কের ভিতর। চা শেষ হয়ে গেছে যদিও, তবু টেবিলের উপর দুই হাতে ভর রেখে বললেন, ‘বেশ, ঠিক আছে। না হয় মেনেই নিলাম তোমার মত। কিন্তু এই সব কাজকর্ম, সেবাকার্য, ঈশ্বরের ভজন-পূজন-ধ্যান-প্রার্থনা এগুলো সব যদি স্বপ্নই হয়, তাহলে তাতে তোমার মনোযোগ, নিষ্ঠা থাকবে কীভাবে?’

‘মাণ্ডুক্যকারিকার মত’ থেকে সহসাই ‘তোমার মত’-এর দিকে সরে আসাটা চোখ এড়ালো না। বলতেই পারত কশ্চিৎ, ‘স্বপ্ন না ভাঙলে সেটাকে স্বপ্ন বলে বোঝা যায় না এবং আমার এখনও স্বপ্ন ভাঙেনি, কাজেই সেবাপূজায় নিষ্ঠার অভাব থাকলে ব্যক্তিগত আলস্য ছাড়া অন্য কিছু তার কারণ হতেই পারে না; মাণ্ডুক্যকারিকা তো নয়ই’। এই ভাবনাটাকেই শব্দ দিয়ে সাজাতে যাচ্ছিল সে, কিন্তু বুড়ো সাধুটি তার আর সময় দিলেন না।

বললেন, ‘না, বলছিলাম, সব নিষ্ঠা তোমার গিয়ে পড়েছে ওই বই পড়ায়। আর সেই জন্যেই তো রাত জেগে ভোরে উঠতে পারছ না। প্রার্থনায় আসতে পারছ না। এই আর কি!’

সকালটা চিরতার জলের মতই তিতো হয়ে গেল। কী আর করা! আপাতত খাওয়া শেষ হয়ে গেছে, অতএব ঘরের দিকে যাওয়া যাক। গোলঘর থেকে বেরিয়ে লাল ধুলোর রাস্তাটা কলাবাগানের ভিতর দিয়ে পুকুরের পাড় ধরে গেছে। আমলকীর জঙ্গল বাতাসে কাঁপছে। পুকুরের পাড়ে বাঁশঝাড়ের গা ঘেঁষে আর্দ্র আবহাওয়ায় জন্মানো বেগুনী ফুলগুলো ফুটে আছে। ওদের দিকে তাকিয়ে কশ্চিতের মনে হল, এই সব স্বপ্নফুলের দল কোনো দর্শন জানে না। পূজাও না। সেবাও না। অথচ, তাদের ভালোবাসতে ইচ্ছে হচ্ছে কেন?

যদি তারা স্বপ্ন হয়, যদি সত্যি না হয়, তাহলে তাদের ত্যাগ করাই উচিত। তারও আগে ত্যাগ করা দরকার এই চোখ দুটো, মাথার ঘিলুর ভিতর কিংবা তার মনের সাতরঙা রঙমহলে যে-সৌন্দর্যবোধ আছে, যে-প্রেমের বাসর আছে, সবার আগে সেটা পুড়িয়ে ফেলা দরকার। কিন্তু সে তা পারছে কই? কোনোদিন পেরেছে? অথচ তা পারাই তো উচিত ছিল।

ঘরে ফিরে এসে কী একটা বই পড়তে পড়তে বইয়ের পাতা থেকে চোখ তুলে জানালা দিয়ে অবিমিশ্র কালমেঘের জঙ্গলের দিকে আধোমনস্ক চেয়ে থেকে থেকে অনেক আগে পড়া একটা কবিতার লাইন গমনাগমনশীল ভ্রমরের মতন মনের চোরকুঠুড়িতে বারবার ফিরে ফিরে আসতে লাগল, ‘জ্যোৎস্নায়,–তবু সে দেখিল কোন ভূত? ঘুম কেন ভেঙে গেল তার?…’

মানুষ নিজের মতকে ভালোবাসে। তার বিপরীত মত সে সহ্য করতে পারে না। যুক্তি দিয়ে প্রমাণ করলেও বিরুদ্ধ মত সে নিতে পারে না। মানুষ বিধিবদ্ধ জীবন ভালোবাসে। রুটিন করে একসঙ্গে খেয়ে, ঘুমিয়ে, কাজ করে, প্রার্থনা করে সে কী সুখ পায়? সে কি সুখ পায়? সুখ নয়, নিরাপত্তা পায় হয়ত। সেই নিরাপত্তা দেয় তাকে সঙ্ঘ বা সমাজ। ফলত, এমন কোনো দার্শনিক মত যদি থাকে, যাতে করে এই বিধিবদ্ধ, সঙ্ঘবদ্ধ জীবন বা রুটিনড লাইফ  বিপন্ন হয়ে যেতে পারে, বানচাল হয়ে যেতে পারে এমন হয়, তাহলে সে সেই মতের বিরুদ্ধে উঠে দাঁড়ায়। তখন সে সরে যায় অপ্রেমের আশ্রয়ে, যেমনটা আজ সকালে খাওয়ার ঘরে হল।

তা হোক; কিন্তু এটা নির্ণয় করা ভীষণ জরুরি এখন, কেন এই যান্ত্রিক জীবনকে মানুষ আঁকড়ে ধরেছে? এই আশ্রমের বাইরেও যে-সমাজজীবনটা ছড়িয়ে ছিটিয়ে চারিদিকে ব্যপ্ত হয়ে আছে সেখানেও এই প্রশ্নটা অক্ষুণ্ণ থেকে যাচ্ছে। প্রশ্নটার গা থেকে একটা পালকও খসাতে পারেনি কোনো সমাজ। পড়াশোনা-ডিগ্রিলাভ-বিবাহ-লিবিডো-সন্তান-চাকরি-পরিচিতি-বিত্তোপার্জন-বার্ধক্য-মরে যাওয়া এই যে একটা সুনিরূপিত ভণ্ড ছক, যার মধ্যে কাঁচের বয়ামে পোকার মতো মানুষ আটকে পড়েছে, অথচ কোনো মুমুক্ষা নেই, কোনো ছটপটানি যেন নেই তার…কেন? কেন? কেন?

হয়ত সে কোনো নির্জন দুপুরের নিষিদ্ধ কোনো ঘুলঘুলি দিয়ে দেখতে পেয়েছে, ছকটা ভাঙলে কী হতে পারে। একটা গভীর বিপন্নতার সমুদ্র আছে ওদিকে, যার মধ্যে সে ফেঁসে যাবে, যদি এই ছক ভেঙে একবার বেরিয়ে আসে। সম্পর্কগুলো অসংজ্ঞায়িত হয়ে যাবে, এলোমেলো হয়ে যাবে তার জীবনের আঁশ ও পালক, বস্তুগুলো ত্রিমাত্রিক আকারে থাকবে না আর, সময়ের প্রথাগত ভূত-সাম্প্রতিক-সম্ভাবীর রৈখিক চলন বানচাল হয়ে যাবে, আহৃত জ্ঞান খোলামকুচির মতো মনে হবে, যীশাস-সক্রেটিস-বুদ্ধ-কাফকাকে মনে হবে কয়েকজন শস্যলোভী সংসক্ত কৃষকের মতন সাধারণ মানুষ, রাষ্ট্রকে মনে হবে একটা অনির্বচনীয় গোলবৈঠকে বসে থাকা ধান্দাবাজদের সুদীর্ঘ কালব্যাপী অভিসন্ধি, সততাকে মনে হবে সমাজদাসত্ব, সাহিত্যশিল্পকে মনে হবে বিনোদন-চাটুকারিতা ও বুদ্ধিবাণিজ্যের রঙচটা মুখোশ, নিজের স্ত্রীকে মনে হবে গণিকা এবং সন্তানকে অতর্কিত কামনার ফসল—এর পর আর সে বাঁচবে কীভাবে? সেই বিপন্নতার থেকে এই ছকবাঁধা জীবন ভালো না? প্রেম নেই, আনন্দ নেই, তবু নিরাপত্তা তো আছে! আছে না? নাকি, নিরাপত্তার ধারণা আছে শুধু? নিরাপত্তাও আসলে নেই এখানে? কে জানে!

তবু একটা বিষাদের সুর এই কাঁচের বয়ামটার ভিতর নীল ধোঁয়ার মতো ঘুরেফিরে বেড়ায়। কিংবা ওই বিষণ্ণ ভ্রমরটার মতই। নীল সেই পতঙ্গটা বারবার করে গুনগুনায়:প্রেম নেই, আনন্দ নেই, আমি একা, আমার কেউ নেই, অর্থহীন তাৎপর্যহীন বেঁচে থাকা এই।

কিন্তু কশ্চিৎ নিজেও কি এই ছকের বাইরে? ছকবন্দী মানুষদের এক্কাদোক্কা খেলা থেকে তাকে নিতান্ত এলেবেলে বলে বাদ দেওয়া হয়েছে নাকি? এটা ঠিক, একপ্রকার ছক সে ছেড়ে দিয়েছে স্বেচ্ছায়। বিবাহ করেনি। সন্তান-উৎপাদন করেনি। চাকরি করেনি। পরিচিতির রোশনাই থেকে খসে গেছে। তথাকথিত ‘কাজের মানুষ’ সে নয়। কিন্তু সেই ছকটা ছেড়ে অন্য আরেক ধরনের ছকে বাঁধা পড়েছে তো। এই যে ব্রহ্মচর্য, সন্ন্যাস, লাল কাপড়, সাদা কাপড়, স্বাধ্যায়-সাধনা-সেবা, ঠিক সময়ে ঘুমিয়ে পড়ে ঠিক সময়ে ঘুম থেকে উঠে পড়া এবং আরও বহু কিছু ঠিকঠাকভাবে করে ফেলা—এটা ছক নয়? এই বিকল্প ছকের ভিতর সহজ কথা আড়ে আড়ে বলতে হয়, প্রেমকে, আনন্দকে চোরা তাসের মতো হাতের পাঞ্জায় লুকিয়ে ফেলতে হয়, তা না হলে রঙ মিলন্তির খেলা জমেই না। ফলত বিষাদ নিষাদের মতো অপেক্ষা করে অবচেতনার কারাকক্ষে। আর সেজন্যেই কি ঘুম ভেঙে গেছিল তার কাল রাত্রে?

কিন্তু এই কারণেই যে তার ঘুম ভেঙে গেছে, অন্য কোনো কারণে নয়—এমনটা আনতাবড়ি ধরে নেওয়া ঠিক  হবে? অনুমিতিশীলিত হবে? অন্য কারণ থাকতে পারে তার ঘুম ভাঙার। সেটা না-খুঁজে বের করলেই বা কার কী? হঠাৎ এই প্রশ্নটা জরুরি হয়ে উঠছে কেন যে!

একটা ত্বরিত কাঠবিড়ালি হঠাৎ গুলঞ্চের গাছ থেকে জানালার রেলিঙের কাছে ঝটিতি লাফিয়ে নেমে এসে সামনের দুটি হাত বিনীতভাবে তুলে রহস্যমদির চোখে বলছে:খুঁজে বের করো, জনাব! খুঁজে বের করো।

কিন্তু খুঁজে বের করা বেশ কঠিন। ঘুম কেন ভেঙে গেল, তার উত্তর পেতে হলে কশ্চিতকে পেছনের দিকে হাঁটতে হবে। স্মৃতির ভিতর দিয়ে, অনেক ঘুমের টিলা, ঘুমের খাদ পেরোতে হবে। সবুজ জোনাকি জ্বলা অনেক বাতাবি নেবুর জঙ্গল পার হতে হবে। তারপর স্বপ্নের নীলাভ দেশ, যেখানে কালকাসুন্দার পাতা আঙুল নেড়ে নেড়ে বলবে, এসো, এসো। কতো হীরের পাহাড়, ক্ষীরের নদী। রূপকথার দেশ। অনেক নির্ঘুম শ্বেতপাথরের প্রাসাদ। রাক্ষসীর এঁটো ছড়ানো হরিতকী বনের পথ। অনেক ইকড়ি-মিকড়ি-চাম-চিকড়ি। হা-বু, হা-বু, হা-বু! অহমন্নাদো অহমন্নাদো অহমন্নাদঃ। অহগং শ্লোককৃৎ। অহগং শ্লোককৃৎ। তারপর… ভালা আইয়ে বুরা যা, চৈত্র মাইয়া পেরেত যা, দূর যা, দূর যা, দূর যা রে…

যে-লোক মাণ্ডুক্যকারিকা পড়ে ঘুমোতে যায়, তার স্বপ্নটা এমন আউলাইয়া যায় কেন?

আউলাইতে আউলাইতে অনেকটা মাঠ পেরিয়ে একটা নির্জন ঘর। একটা লোক খাটের উপর অনিবার্যভাবে শুয়ে আছে। অনিবার্য, কেননা এখানে এরই যেন শুয়ে থাকার কথা অবধারিতভাবে। যেহেতু বামকাতে শুয়ে আছে, তাই লোকটার মাথাটা ঘোরানো—কশ্চিৎ নিদ্রিত ব্যক্তির মুখ দেখতে পাচ্ছে না। ঘরের ভিতর একটা উজ্জ্বল নীল রঙের শিখা জ্বলছে যেন একটা দুর্মূল্য স্যাফায়ার। অথবা যেন সমুদ্যত শঙ্খচূড়ের স্থির চোখের মণি এক। অথচ আশ্চর্য এই, শিখাটি কোনো দীপাধারে নেই। একটি নিরাধার আলোকশিখা। বাতাস নেই। শিখা অতএব কাঁপছে না। স্থির, নিষ্কম্প। খাটের উপর ঘুমন্ত মানুষটির নিঃশ্বাসের শব্দ ছাড়া ঘরে অন্যবিধ শব্দ নেই। ঘরের দেওয়ালগুলো কেমন হাড়ের মতন কঠিন, নির্দয়।

নীলশিখাটির দিকে তাকিয়ে আছে যেন কশ্চিৎ। অনেকক্ষণ। তার মন নিস্তরঙ্গ হয়ে আসছে। এইবার নির্জ্ঞানের ভিতর ডুবে যাবে।

হঠাৎ কী একটা আচম্বিত বাতাস ধেয়ে এল ঘরের মধ্যে। এক আদিম সর্পিণীর বিষাক্ত নিঃশ্বাস। সেই নিঃশ্বাসে নীল শিখাটি ভীরু অপ্সরার মতো কেঁপে উঠল। কে যেন ঘরের ফ্যাকাসে দরজার ওদিকে দাঁড়িয়ে তার নাম ধরে ডাকছে। কশ্চিৎ…কশ্চিৎ! আমি এসেছি, কথা রেখেছি…আরও কী সব তন্দ্রাজড়িত স্বরে বলে যাচ্ছে সেই কণ্ঠস্বর, ভালো বোঝা যাচ্ছে না।

খাটের উপর নিদ্রিত মানুষটির যেন সাড় ফিরছে। সে এইবার বামদিক থেকে ডানদিকে পাশ ফিরল। নীল আলোর অস্পষ্ট আভা নিদ্রাকাতর লোকটির মুখের উপর পড়েছে।

এ কী! সভয়ে দুই পা পিছিয়ে গেল কশ্চিৎ। এ কে খাটের উপর শুয়ে আছে? অবিকল…অবিকল এ যে তারই মুখ!

স্বপ্নের স্মৃতিচারণার ভিতর শিউরে কেঁপে উঠল কশ্চিৎ। আর তখনই চরবান্ধিয়া গ্রামের থেকে মাইলখানেক দূরের রেললাইন দিয়ে একটা ট্রেন স্মৃতির জংশন পেরিয়ে চলে যাচ্ছে। বহুদূর থেকে আকস্মিক সেই ট্রেনের শব্দ এমন একটা মানসিক অভিঘাত তুলল যে, এতক্ষণের স্বপ্নস্মৃতি সহসাই অসাবধানে হাত লেগে ক্ষণভঙ্গুর কাঁচের গেলাসের মতো মাটিতে পড়ে দু-টুকরো হয়ে গেল।

স্মৃতিঘোর থেকে ফিরে এসে আবিষ্ট চোখ তুলে চারিপাশে তাকাল। একটু আগে যে-স্বপ্নটার কথা ভাবছিল, সেই স্বপ্নে দেখা ঘরটা যেন অবিকল এই ঘরটা। শুধু খাট ছাড়া অন্য আসবাবগুলো স্বপ্নে ছিল না। বইগুলোও ছিল না। স্বপ্নের সে-ঘরের দেওয়ালগুলো হাড়ের তৈরি কেন যে!

কিন্তু স্বপ্নের সেই ঘর আর জাগ্রতের এই ঘর—এক তো নয়। স্বপ্নে মানুষের মন অসামান্য কবি হয়ে যায়। অথবা সার্থক চিত্রী কিংবা সুদক্ষ সিনেমাটোগ্রাফার। জাগ্রতের থেকে উপাদান নিয়ে সে তখন স্বকীয় বিন্যাসে ইচ্ছেমতো দৃশ্যকাব্য রচনা করে স্বপ্নে। আপাতভাবে এলোমেলো মনে হলেও আসলে সেই ইচ্ছেগুলোর পেছনে অবচেতনের নিগূঢ় পরামর্শ আছে। যেমন বুনুয়েলের অ্যান আনদুলুশিয়ান ডগ। স্বপ্নের মন এক আশ্চর্য নাবিক; বুনুয়েলতর বুনুয়েল সে। কিংবা দালিতর দালি।

এক্ষেত্রে অবচেতনের নিগূঢ় পরামর্শটা কী, বুঝতে পারছে না কশ্চিৎ। আর সময়ও দিতে পারবে না। ঘড়ির কাঁটা তাকে বলছে, চরবান্ধিয়া যেতে হবে। সেখানে গ্রামের ছেলেমেয়েদের জন্য আশ্রমপরিচালিত একটি বিদ্যালয় আছে।

সাদা কাগজের উপর হলুদ প্যাস্টেলে আঁকা একটা দুপুর অ্যাসবেসটসের ছাউনির উপর ঝরে পড়ছে। উঠানে কয়েকটা আতাগাছ। অদূরে জামের বন। ছোটো ছোটো অনেকগুলো ঘর ছেলেমেয়েদের কলকাকলিতে মুখর। কশ্চিৎ তার অফিসে বসে ছিল। এখান থেকে দেখা যায়, একটি শ্রেণিকক্ষে একজন তরুণ শিক্ষক ফুলশার্টের হাতা গুটিয়ে ছেলেমেয়েদের দিকে পেছন ফিরে ব্ল্যাকবোর্ডে চক টেনে কী যেন লিখছেন। ওঁর নাম শশাঙ্ক ঘোষ। এই গ্রামেরই ছেলে। বুদ্ধিমান, কিন্তু মুখচোরা।

দুপুরবেলা টিফিন হয়ে গেছে। ছেলেমেয়েগুলো আতাগাছের তলায় কিচিরমিচির করে খেলছে। কশ্চিৎ বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখছিল। ওদিকের পেয়ারা গাছের নীচে একটা বাচ্চা ছেলের কী কারণে যেন গোঁসা হয়েছে, সে খেলবে না। চলে যাচ্ছে। ওর থেকে একটু বড় একটি মেয়ে ছেলেটার কনুই ধরে টানছে।

‘আয় না, আয়! চল না, খেলবি, ভা-ই!’

‘না।’

‘না, কেন? তোকে আমি আমার স্কুলব্যাগের ভেতর কী কী আছে, সব দেখিয়েছি না? পেয়ারাকাঠের গুলতি দেখিয়েছি, আমচাঁছার ঝিনুক দেখিয়েছি, হারুর দোকানের স্টিকার দেখিয়েছি, বড় বউ ছোটো বউ পুতুল দেখিয়েছি, স-অ-ব দেখিয়েছি। এখন তুই খেলবি না কেন?’

‘সব দেখাওনি।’

মেয়েটা ঝাঁঝিয়ে উঠে বলল, ‘ন্যাকাচণ্ডী! কী দেখাইনিটা কী তোকে?’

‘পায়রাগাছির ফকির তোমাকে যে-হাড়ের মালাটা দিয়েছিল, সেটা তো দেখাওনি। আরও একটা কথা শেখাওনি।’

‘কী কথা?’

‘ব্যাঙলতা!’ — ছেলেটা সুন্দর করে ভেংচি কাটল।

‘বল না, বল না, কী কথা?’

‘তোমার রাঙাজ্যাঠামশাই গেলবার পুজোতে তোমাকে কেমন করে গান বাঁধতে হয় শিখিয়েছিলেন না? তুমি বলেছিলে, আমাকেও শেখাবে। কই? শেখাওনি তো!’

‘ধ্যাত্তেরিকা আব্বুলিশ! বলছি তো, শেখাব। তবে এখন না। আগে তুই আমার সঙ্গে খেল।’

‘এখন নয় কেন?’

‘এখন শেখালে তুই আর খেলবি না। ভাইনা ভালা, ভাইনা ভালা, খেল না, খেল। খেলবি না?’

‘আজ তোমার সঙ্গে খেললে কাল শেখাবে তো?’

‘শেখাবো, শেখাবো, শেখাবো। এখন ধদ্দেখি আমাকে। ধর, ধর।’

মেয়েটি ছুটে কিছুটা দূরে চলে গেল। খালি বলছে, ‘ধর, ধর।’

ছেলেটা ছুটে গেল তাকে ধরতে। ছোঁয়াছুঁয়ি খেলা। কতোরকম খেলাই যে ছোটোরা খেলতে পারে। যতো আড়ি, ততো ভাব।

বিকেল নেমে এলে স্কুল ছুটি হয়ে গেল। স্কুল থেকে বেরিয়ে ঘরে ফিরল না কশ্চিৎ। এদিক ওদিক ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে গ্রামের শ্মশানে এসে দাঁড়াল। এখানে ওখানে জল ভরা আধভাঙা কলসি, পোড়া কাঠ, সাদা ছাই, কোনো কোনো মানুষের লীলাবশেষ। সেই পোড়া কাঠের উপর একটা দোয়েলপাখি বসে ক্বীচ্‌ ক্বীচ্‌ করে ডাকছে। একটু পরে উত্তরদিকে উড়ে গেল। শ্মশানের প্রান্তদেশ থেকে শুরু হওয়া ধুলামলিন রাস্তাটা ধরে কালমেঘের ঝোপের পাশ দিয়ে কশ্চিৎ হাঁটছে। হাঁটতে হাঁটতে পড়ল হেতমপুরের শস্যরিক্ত বুকফাটা মাঠে। আলপথ দিয়ে চলেছে।  কতগুলো পোড়া পাটকাঠি। তাতে আগুন ধরিয়ে মশাল বানিয়ে রাতে হয়ত এ-পাড়া ও-পাড়া যায় বাগদী বউ ঝিয়েরা। সেসব মশালের পোড়া টুকরো পড়ে আছে খড়নাড়ার গাদার উপর।

আলপথ দিয়ে মাঠ পার হয়ে নদী। এ নদীর নাম কশ্চিতের বড়ো ভাল লাগে। চিন্ময়ী। চিন্ময়ীর পাড়ে ঘাসের আস্তরের উপর এসে বসল। বিকেলের নদী নিরালা বান্ধবীর মতো শুয়ে আছে। ডুবে যাবার আগে কপালের সিঁদুর চিন্ময়ীর জলে ধুয়ে নিচ্ছে সন্ধ্যাসবিতা। চিন্ময়ীর ওই পারে বঊপুকুর গ্রামের অস্পষ্ট আভাস দেখা যায়—মেঠো ঘর, তালগাছ, বাঁশের বন, হাটখোলা, খড়ের গাদা। ধানভাঙার কলের ‘ডুবুক ডুবুক’ আওয়াজ ভেসে আসে। ওইদিকে একটা কঙ্কালসার খেজুরগাছের মাথায় সাঁঝতারা উঠেছে।

এইসব বড় ভালোবাসে কশ্চিৎ। এইসব ছবি, মানুষ, হাটমাঠের গল্প, শিশিরভেজা গ্রামীন প্রেমোপাখ্যান। ছেড়ে যাওয়ার ও ফিরে আসার দ্বিমুখী টান তাকে ছিন্নভিন্ন করে। চলে যেতেই ইচ্ছে করে এসব দৃশ্যমায়া ছেড়ে। নাম ছেড়ে রূপ ছেড়ে নামরূপাতীতের রাজ্যে। রাজ্য নয়, স্বরাজ্যসিদ্ধি। যেখানে ত্রিজগৎ শূন্য। সমস্ত কল্পনার অতীত সেই নির্বিকল্প সত্য। সেই তো তার স্বরূপ। সমস্ত খোসা ছাড়িয়ে চিন্ময়ীর জলে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে সে লীন হতে চায় শাঁসে—আপন স্বরূপে।

কিন্তু তার মনের আরেকটা অংশ সেই ফেলে দেওয়া খোসাগুলোকে নদীজল থেকে তুলে এনে সেগুলো সাজিয়ে কথাকাব্যের মালা গাঁথতে চায়। বারবার করে মনের সেই অংশটাকে বোঝাতে চায় কশ্চিৎ। পারে না। বারবার অবুঝ বালকের মতো মন বলে:

‘কেমন করে গান বাঁধতে হয়, তুমি বলেছিলে, আমাকে শেখাবে। কই? শেখালে না তো? না, আমি খেলব না। খেলব না, খেলব না মোটেই।’

বারবার করে তার মনে হয়, কে যেন তার খুব নিজের কেউ আছে। কিন্তু কে সে, খুঁজে পায় না। কেউ একজন, যাকে তার খুব নিবিড় করে পাওয়ার কথা। বিচার করে সে, বৈরাগ্য অবলম্বন করে, তবু এই প্রেমার্ত হৃদয় সংশোধিত হয় না, সন্ধ্যার মেঘমালার ভিতর দিয়ে শষ্পতৃণ মুখে করে উড়ে যায় কল্পরাগ মেখে অচিনপূরের অজানিত কোন গান্ধর্বীর সন্ধানে।

আবার তখনই সব ছক ভেঙ্গে রাজ্য পরিত্যাগ করে জীবনের অসঙ্গ সত্তার দিকে চলে যাওয়া সেই উদাসী রাজপুত্রের কথা মনে পড়ে। সমস্ত কল্পনার থেকে অনেক উপরে মন উঠে যায় তখনই ঊর্ধ্বচারী নির্ভয় মহাবিহঙ্গের মতো।

আবার নেমে আসে রূপের জগতে। বেদনামায়ার খেলাঘরে।

এ মনকে নিয়ে সে তো আর পারে না! বড় নাছোড় মন তার।

দুটো পা ঘাসের উপর ছড়িয়ে অসহায়ের মতো বসল কশ্চিৎ। পায়ের পাতায় রাজ্যের ধুলো লেগে আছে। শুধু চরবান্ধিয়া গ্রামের আর হেতমপুরের মাঠপথের ধুলোখড়? জীবনে যতো পথ সে পেরিয়ে এসেছে আজন্ম, সেই সব পথের ধুলোরা কি লেগে নেই তার পায়ের পাতায়? কথা বলছে না তারা অনুচ্চারিত শব্দে? শুধু এ জন্মের ধুলো? জন্মান্তরের ধুলো নয়?

Pages ( 17 of 20 ): « Previous1 ... 1516 17 181920Next »
Close Menu