কুমুদরঞ্জন মল্লিক

(জন্ম: পয়লা মার্চ ১৮৮৩–মৃত্যু: ১৪ ডিসেম্বর ১৯৭০)
সাজুবিবি
কবির গ্রামের পাশ দিয়েই বয়ে গিয়েছে অজয় ও কুনুর নদী। কোগ্রাম (কুমুদগ্রাম) আর নদীই হল কবির মূখ্য প্রেরণা। কবিতায় নির্জন পল্লীজীবনের সহজ-সরল রূপ তথা নিসর্গ প্রেম চমৎকার ভাবে ফুটে ওঠে।
কবি নিজের সম্পর্কে বলতে গিয়ে ‘আমার বাড়ি’ কবিতায় বলেছেন―
“বাড়ি আমার ভাঙন ধরা অজয় নদীর বাঁকে
জল যেখানে সোহাগ ভরে স্থলকে ঘিরে রাখে।”
কবির সঙ্গে নদ-নদীর যোগ আজন্মকাল। যার ফলস্বরূপ মন ছুঁয়ে যাওয়া এমন চরণ আমরা উপহার পাই। তাঁর কবিতায় সহজ-সরল পল্লীরূপের বর্ণনা, আপামর বাঙালি পাঠকের হৃদয় খুব সহজেই জয় করে নেয়। গ্রাম-বাংলার স্নিগ্ধ আন্তরিকতা কুমুদরঞ্জনের কবিতায় অন্যমাত্রার সুর বহন করে চলে।
কোন এক ভাগ্যবতী অজয় নদের তীরে একটি বকুল গাছ শ্রীপাঠ কোগ্রামে লোচনদাসের আখড়ার নিকট রোপণ করে যান। প্রায় পাঁচশত বৎসর ধরে বকুলগাছটি নিজেকে বাঁচিয়ে রাখে স্ব-মহিমায়। বকুলতলায় চলত আড্ডার আসর। মাঝি-কৃষকেরা দুপুর হলেই ভাতঘুম দিতে চলে আসত। শাস্ত্রকথা, সংকীর্তন প্রভৃতির জন্য ব্যবহৃত হত এই বকুলতলা। তারপর একদিন ক্ষেপে গেল অজয়। সর্বগ্রাসী ভাঙন গাছটিকে নিজ বক্ষে নিয়ে চলে গেল দূরে…..বহুদূরে। কবি স্মৃতিকাতরতায় রচনা করলেন ‘বকুলতরু’―
“পাঁচশো বছর হেথায় ছিলে প্রাচীন বকুল গাছ,
অজয় নদের ভাঙনেতে পড়লে ভেঙে আজ।
কালো ছিলে নিবিড় শ্যামল লোহার মত দৃঢ়
ফুলের রাজা প্রফুল্ল মুখ লাখো পাখীর গৃহ।”
বকুলগাছকে ঘিরে পল্লীজীবনের স্মৃতি বেদনায় ভরিয়ে দেয় কবিহৃদয়। কবিতাটির শেষ পংক্তি চমৎকার―
“মিত্র ও দৌহিত্র তোমার ভুলতে তোমায় নারি,
আমায় করো তোমার প্রেমের উত্তরাধিকারী।”
কবি কুমুদরঞ্জন মল্লিক পল্লীবাংলার যে রূপ অঙ্কন করে গেছেন, তার সার্থক উত্তরাধিকারী কবি জসীমউদ্দীন।
আমাদের পল্লী-গ্রামের মায়েদের সাথে আমগাছের নিবিড় সম্পর্ক চিরকালের। আর যদি সে মা দুখিনী হয়, আমগাছটিই যেন তার শেষ সম্বল হয়ে ওঠে। চিরচেনা বাংলার এই আমগাছকে বেদনায় রাঙিয়ে তোলেন কুমুদরঞ্জন―
“দুখিনীর ছিল শুধু একটি আমের গাছ
নিজ দুয়ারের কাছে তার,
বছর বছর তাতে গাছ ভরা আম হ’ত
ছেলেরা কুড়াত অনিবার।”
এক সময় গাছটির উপর পড়ল লালসা কবলিত রক্তবর্ণ চক্ষু। দুখিনী মা গাছটাকে বাঁচাতে অপারগ হলেও স্মৃতিতে রোপণ করলেন হাজার হাজার মিঠা আমের উদ্যান।
কবি কুমুদরঞ্জন মল্লিকের উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থগুলি হল― শতদল (১৯০৬) বনতুলসী (১৯১১) উজানী (১৯১১) একতারা (১৯১৪) বিথী (১৯১৫) চুন ও কালি (১৯১৮) বীণা (১৯১৬) বনমল্লিকা (১৯১৮) রজনীগন্ধা (১৯২১) নূপুর (১৯২২) অজয় (১৯২৭) তূণীর (১৯২৮) স্বর্ণসন্ধ্যা (১৯৪৮) ইত্যাদি। অবিভক্ত বাংলার বর্তমানের পশ্চিমবঙ্গের পূর্ববর্ধমান জেলার কোগ্রামে কবির জন্ম। পৈত্রিক নিবাস বৈষ্ণবতীর্থ শ্রীখন্ড গ্রাম। পিতা পূর্ণচন্দ্র মল্লিক ছিলেন কাশ্মীর রাজসরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। মাতা সুরেশকুমারী দেবী। ১৯০১ সালে এন্ট্রান্স, ১৯০৩-এ রিপন কলেজ থেকে এফ এ এবং ১৯০৫-এ বঙ্গবাসী কলেজ থেকে বিএ পাস ও ‘বঙ্কিমচন্দ্র সুবর্ণপদ’ প্রাপ্তি। পরবর্তীতে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ‘জগতারিণী স্বর্ণপদক’ দেন। ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দে ভারত সরকার কর্তৃক ‘পদ্মশ্রী’ উপাধিতে ভূষিত হন। বর্ধমান জেলার মাথরুন নবীনচন্দ্র বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক রূপে তার কর্মজীবন শুরু। প্রসঙ্গত উল্লেখনীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ওই স্কুলে তার ছাত্র ছিলেন। ‘আদর্শ শিক্ষক’ কবিতায় কবি বলেন―
“রাগিয়া কহে গুরু সড়াতে হবে মাটি
তবে ত পাকা ‘ভিত’ বসানো যাবে খাঁটি।”
সর্বশেষে রবীন্দ্রনাথের কথা দিয়ে বলা যায়― “কুমুদরঞ্জনের কবিতা পড়লে বাংলার গ্রামের তুলসীমঞ্চ, সন্ধ্যাপ্রদীপ, মঙ্গল শঙ্খের কথা মনে পড়ে।”
|
|