সকল গ্রামের নাম বাংলাদেশ

এই তো আমার কাজ
বিভাস রায়চৌধুরী
প্রকাশক: কবিতা আশ্রম
মূল্য: ৩০০/-
ঈশিতা দে সরকার
“বিশ্বাস ছড়াতে হবে দেশভাগ বলে কোনো কিছু হয়নি কখনো।
দেশভাগ হয়নি কোনোদিন।
কুকুর বিড়ালের মতো তাড়া খেয়ে আসেনি মানুষ।
ভালো থাকতে বেড়াতে এসেছিল
সুখ পেয়ে আর ফিরে যায়নি।
কোনো দেশ ভাগ হয়নি ; রিফিউজি শিবিরে কেঁদে কেঁদে মরেনি কোনো শিশু।
দুধের বদলে কোনোদিন ছিল না পিটুলিগোলা জল….”
দেশভাগ। পেন্সিলের দেশভাগ। ইতিহাস বইয়ের দেশভাগ। শিল্প সংস্কৃতির দেশ ভাগ। মুখে মুখে শোনা মানুষের কথায় দেশভাগ। ঋত্বিকের চিৎকারের দেশভাগ। কোনো রকম যুক্তি তর্কহীন কেবল ‘গ্যাদগ্যাদে’ আবেগে আমার দেশভাগ।
আবেগ চড়া হলে বাক্য বিন্যাস ছড়িয়ে পড়ে। শব্দরা কাঠামোর ধারেকাছে আসে না।
‘এই তো আমার কাজ’ পড়ে ভাদ্রের ছায়ার কাছে মাথা গুঁজে আছি। প্রতিটা কবিতায় একেকটা আটচালা ঘর। ঘরামি শান্তিজল রেখে গেছে। সমস্ত রাগ দুঃখ ক্ষোভের পর। ‘কলোনিপাড়া’ ও ‘এই তো আমার কাজ ‘ কবিতায় এসে দেখছি। কেবল দেখছি। দেখার সাথে জড়িয়ে যাচ্ছে মৃদু জল।
বিভাস রায়চৌধুরীর দেশভাগ প্রসঙ্গে লেখা এমনটাই।
‘ঠিক করে নিতে হবে বাঙাল উচ্চারণ, বাঙাল ভাষা ‘—এই বাড়া ভাতে বাঙাল বিভাসের আঙুল পরমান্ন রাঁধে।রিফিউজি পরিবারের মানুষটি অনেকক্ষণ ধরে সেই পরমান্নের ঘ্রাণ নেয়। এই তো কবির কাজ।
কবি তা করে আসছেন।
‘আমাকে মনে করিয়ে দিতে হবে না’
‘ট্রাম্পের শরণার্থী-তাঁবু ছিঁড়ে হাজার হাজার কচি গলার চিৎকারে যে মিশিয়ে দিতে ভুলবে না তার গলাটিও…’।
আমার এক বন্ধু প্রায়ই বলে সে বিশ্বাস করে এই সময়টা আসলে রিফিউজিদের।
মনে পড়ে যায়….
মনে পড়ে যায়, দিদার উনুনের পাড়ে বসে ফেলে আসা দেশ-এর গল্প বলতে বলতে আঁচলের খুঁট দিয়ে চোখ মোছার দৃশ্য। মনে পড়ে
সাত ছেলেমেয়েকে নিয়ে সহায়-সম্বলহীন হয়ে একটা মাত্র পেন্সিলের দাগকে টপকে এসে কিভাবে যোদ্ধা হয়ে গেল শেষমেশ।
হ্যাঁ। সব রিফিউজি যোদ্ধা।
যুদ্ধ করে করে রোজ এগিয়েছে।
গুলিয়ে যাচ্ছে।
কোথা থেকে কোথায় এসে পড়ছি।
এই বইয়ে পাগলপারা সেই এলিমেন্ট আছে।
আর্তি আছে।
যন্ত্রণা আছে।
বাঙালের জেদ আছে —
সবটা মিলিয়ে বলতে পারা আছে
‘সীমান্ত মানি না…
সকল গ্রামের নাম বাংলাদেশ…. ‘
জানি আমার মতো অনেকেই এই লাইন দুটো বারবার উচ্চারণ করছেন ও করবেন।
চোখ মুছে নিয়ে ‘এই তো আমার কাজ ‘।
আজকের দিনে এই কাব্যগ্রন্থের প্রাসঙ্গিকতা আরও বাড়ছে।