গদ্য
ভাষার মৃত্যু ঘন্টার ধ্বনি
গৌতম গুহ রায়
…
“একটা ভাষা যদি তার পরিচয় থেকে বাদ চলে যায় তা হলে কী ক্ষতি হয় মানুষের ? একজন বাঙালি যদি সারাটা দিন কোনো বাংলা অক্ষর না লিখে, না দেখে, না শুনে কাটিয়ে দিতে পারেন – কী ক্ষতি হয় তাঁর ?
এমন কোনো ক্ষতি হয় না, যা দেখা যায় ।
‘এমন কোনো ক্ষতি হয় না, যা দেখা যায় –’
মেফিস্টোফেলাস এই কথা বলেই ফাউস্টের আত্মাতা নিয়ে নিয়েছিল ।”
এই কথাগুলো দেবেশ রায় লিখেছেন ‘দ্যোতনা’র ভাষা আলোচনায় । তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, যেটি বাস্তবিক সত্য, একজন বাংলাভাষী মানুষ যদি সারাদিনের শেষে হিসাব করেন, তিনি সেই দিনটিতে সারা দিনে একটিও অক্ষর বাংলায় লিখেছেন কী না; দেখেবেন, লেখেননি, সারাদিনে একটিও বাংলা হরফ লিখেননি, কিন্তু পাতার পর পাতা লিখেছেন । আবার অনেকেই আছেন যিনি সারা দিনে একটিও বাংলা অক্ষর লিখেননি, পড়েনওনি । কারণ তিনি যে কাজ করেন, আদালতে, সরকারী দপ্তরে, সর্বত্র ইংরাজিতে লেখেন, পড়েন, সই করেন। নব্য শিক্ষিতদের অনেকেই তার উত্তর প্রজন্ম যাতে ইংরাজিতে পটু হয় তাই বাসায় বাংলা কথা বলা পরিহার করার নির্দেশ জারী করেছেন। বাংলার ‘গৃহস্থ’ ব্যবহার সেখানে কাজের মেয়ে বা বৃদ্ধ বাবা মা ঠাকুমায় আটকে আছে, আগামী একদিন তাও ভোকাট্টা হয়ে যাবে। তবে মাতৃভাষার কি তেমন প্রয়োজন? “আগে আমার ধারণা ছিল, মাতৃভাষা ছাড়া বুঝি প্রেমের কথা বলা যাবে না । রাস্তাঘাটে বাসে-ট্রামে চলাফেরা করতে করতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের আশে পাশে ঘুরতে-ঘুরতে সে ভুল আমার বহুদিন ভেঙে গেছে। আগে ধারণা ছিল, মাতৃভাষা ছাড়া বুঝি মৃত্যুতে চোখের জল ফেলা যায় না । সে ভুলও আমার ভেঙে গেছে ।” (দেবেশ রায়/আত্মাহীন, মাতৃভাষাহীন)
গোটা বিশ্বেই আজ সবচেয়ে বড় আতঙ্ক এই মেফিস্টোফেলিসের রক্তবীজেরা । মানুষকে আত্মাহীন, চেতনাহীন, দেশহীন করার বিশ্বব্যাপী যে কর্মযজ্ঞ চলছে তাতে শুধু সে শেকড়চ্যূত হচ্ছে তাই নয় হারিয়ে যাচ্ছে তার ‘মাতৃভাষা’টাও। মাতৃভাষা বাদ দিয়ে সংস্কৃতি বিবর্জিত শিক্ষাগ্রহণ করতে গিয়ে বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর শিশুদের অবস্থা শেকড়চ্যূত গাছের মতো। এই প্রবণতায় বিপন্ন হচ্ছে তার মাতৃভাষা, লুপ্ত হচ্ছে তার জনগোষ্ঠীর নিজস্ব সংস্কৃতি।
মাতৃভাষার অধিকার মানুষের জন্মগত। সংস্কৃতির অন্যতম উপাদান ও বাহন হচ্ছে মানুষের ভাষা, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে একটি জনগোষ্ঠীর জাতীয় পরিচয় ও অধিকার। এখানেই আঘাত হানা হচ্ছে, বিশ্বসাম্রাজ্যবাদের এক মুখ্য এজেন্ডা এটি। কিছুদিন আগে ‘গার্ডিয়ান’ পত্রিকায় প্রকাশিত এক তথ্যে জানা যাচ্ছে যে, আগামী একশো বছরে প্রায় ৩০০০ ভাষা পৃথিবী থেকে লুপ্ত হয়ে যবে । গত শতাব্দীর শেষ পর্বে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘সামার ইন্সটিটিউট অব লিঙ্গুইস্টিক্স’এর এক সমীক্ষায় প্রকাশ, বিশ্বে তখন ৫১টি ভাষা ছিল যার সর্বশেষ মাত্র একজন জীবিত, লুপ্ত হয়েছে। একশো জনের কম লোক জানেন এমন ভাষা আছে প্রায় ৫০০টি। এক হাজার জন বলতে পারেন এমন ভাষার সংখ্যা এখন ১৫০০। ১০,০০০ জনের কম সংখ্যক মানুষ কথা বলতে পারে এমন ভাষার সংখ্যা এখন ৩,০০০টির মতো। বিশ্বের ৯৬% ভাষা বলেন মাত্র ৪% মানুষ। ২০০০ থেকে ২০০৮ সালের মধ্যে নেওয়া সমীক্ষার উপর প্রকাশিত জাতিসঙ্ঘের বিপন্ন ভাষার মানচিত্রে ( Atlas of Endangered Language) ১৯৯টি অতি বিপন্ন ভাষার পরিচিতি প্রকাশ করেছিল। সে সব ভাষা ব্যবহারকারীর সংখ্যা একশ’র কম। এর মধ্যে আবার বিপন্নতম ভাষার সংখ্যা ১৮ (এই সমীক্ষার পর এদের দুটি ভাষাজন প্রয়াত হয়ে ভাষাটি জনলুপ্তির হিসাবে লুপ্ত হয়েছে) এই হিসাব দেখাচ্ছে এক দশকেই কতটা ক্ষয় হয়েছে ভাষা জনের সংখ্যায় । এই ১৮টি ভাষার প্রত্যেকটির ব্যবহারকারির সংখ্যা একজন করে। এই ভাষাগুলো হল, আপাইওকা (ব্রাজিল), বিকিয়া(ক্যামেরুণ), চানা(আর্জেন্টিনা), ডাম্পাল (ইন্দোনেশিয়া), দিয়াহই ( ব্রাজিল), কাইজানা (ব্রাজিল, সম্প্রতি মারা গেছেন), লাওয়া ( পাপুয়া নিঊগিনি), প্যাটুইন (আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র), পাজেহ (তাইয়য়ান), পেমোনো ( ভেনেজুয়ালা), তাজে (ইন্দোনেশিয়া), তাওশিরো ( পেরু), তিনিগুয়া (কম্বোডিয়া), তলোয়া (ক্যালির্ফোনিয়া), ভোলো ( অষ্ট্রেলিয়া), উইনতু-নোমলাকি ( ক্যালিফোর্নিয়া), ইয়াখান ( চিলি), ইয়ারভি ( পাপুয়া নিউগিনি)। এই উল্লেখিত ১৮টি ভাষার অনেকগুলো ইতিমধ্যেই লুপ্ত হয়ে গেছে।
ভারতবর্ষের বঙ্গোপসাগরস্থিত দ্বীপ আন্দামানের বো ভাষা ব্যবহারকারীর সংখ্যা আজ শূণ্য । তিন দশক ধরে একাই প্রতিনিধিত্ব করে ৮৫ বছর বয়সে সিনিয়ার বো ভাষা ব্যবহারকারিণী মহিলার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে লুপ্ত হয় ভাষাটি। আলাস্কার মেরু অঞ্চলের ইয়ক ভাষার শেষ প্রতিনিধি মেরি স্মিথ ১৮ জানুয়ারি ২০০৮এ প্রয়াত হন, ভাষাটিও লুপ্ত হয়। একটি ভাষার মৃত্যু মানে অভিধান থেকে তার অবলুপ্তি মাত্র নয়, সেই ভাষাটির মধ্যে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে থাকা একটি সমাজের সংস্কৃতির ইতিহাস এবং সমাজের আহরিত মূল্যবান জ্ঞান লুপ্ত হয়ে যার এর সঙ্গে সঙ্গে।
এঙ্গুলি ওয়া থিয়ংগ ও আলোচনা প্রসঙ্গে লিখেছেন যে ‘ভাষা যেহেতু যোগাযোগের শ্রেষ্ঠ মাধ্যম, সুতরাং ভাষার মাধ্যমেই মানুষের কল্পনাকে উপনিবেশে নিয়ে আসা সবচেয়ে সহজ । আফ্রিকার নিজস্ব ভাষাকে গোড়াতেই এমনভাবে লুট ও বিস্মৃত করা হয়েছে যে আফ্রিকাবাসীদের এখন ভাব প্রকাশের জন্য তাকিয়ে থাকতে হয় ইংরাজি, ফরাসি বা পর্তুগিজ ভাষার দিকে । বলা যায় আফ্রিকার উপর ইউরোপের ভাষা আধিপত্য সম্পূর্ণ হয়েছে। এ শুধু আফ্রকার ক্ষেত্রেই ঘটেছে তাই নয়, গোটা ল্যাটিন আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া এর উদাহরণ । আমাদের দেশেও আমাদের নিজস্ব ভাষা সংস্কৃতি এতো সমৃদ্ধ তবুও ঔপনিবেশিক শাসক তার ভাষার আদলে গড়ে নিয়েছে আমার ভাষা-সংস্কৃতিকেও । আমাদের লোকনাটক, লোককথা ক্রমশঃ প্রান্তিক হয়ে পরেছে । যে সাম্রাজ্যবাদী শাসকেরা শাসনকে নিরঙ্কুশ করার জন্য ভাষাকে নিয়ন্ত্রণমুঠিতে নিয়ে আসতে চায়, ভাষার মাধ্যমে মানুষের সৃষ্টিশীলতাকে পরাধীন করার ফলে শেকড়ের মানুষ তার নিজস্ব মনন থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় । তার ফলে তার কল্পনা ক্রমশ ইংরেজি, ফরাসি বা স্প্যানীশ, পর্তুগিজ ভাষাপ্রকোষ্টে বন্দি হয়ে যায় । ‘পাশ্চাত্য বা ইউরোপ-আমেরিকার সঙ্গে এশিয়া-আফ্রিকার গত চারশো বছরের দ্বন্দ্বের ইতিহাস সমৃদ্ধ হয়ে আছে আরও অনেক কিছুর সঙ্গে কল্পনা ও আত্মানুভূতির চরম বিকৃতি, যা এশিয়া আফ্রিকার সমস্ত উৎপাদন, বন্টন ও সম্পদের ওপর চূরান্ত নিয়ন্ত্রণের ফলে ঘটাতে পেরেছে ওরা’। ভারতের ভাষা কমিশনের ভূমিকা নিয়ে সরব হয়েছিলেন প্রখ্যাত কবি ও অধ্যাপক বুদ্ধদেব বসু । তিনি লিখেছিলেন যে ভাষা- কেবলমাত্র একটি উপায় বা বাহন রূপে দেখাবারও অপচেষ্টা করা হয়েছে। ফলে, এমন একটি ধারণা সৃষ্টি হতে পারে যে, যে-কোনও ভাষা দিয়েই, অর্থাৎ পরভাষার সাহায্যেও আমাদের যাবতীয় কাজকর্ম নির্বাহ হতে পারে। তাঁর প্রতিবাদের মূল যায়গাটা এখানেই, পরভাষা দিয়ে সমস্ত কাজ সাধিত হলেও, সাহিত্যসৃষ্টি সম্ভব নয়, কবিতায়, গানে, সৃজনে মাতৃভাষা আবশ্যিক । শাসকের ভাষা অনেক সময়ই জন-এর ভাষা হয়নি, মানুষ তাদের সৃজনশীলতার প্রকাশ ঘটিয়েছে মাতৃভাষাতেই । যেমন ল্যাটিন ভাষা নিয়ন্ত্রণের যুগে ইটালিতে অভেলিতের মুখের ভাষায় ‘ডিভাইন কমেডি’ রচিত হয়েছে। উনিশ শতকে ফরাসি ভাষা কর্তৃত্বকে উপেক্ষা করে রুশ ভাষায় সাহিত্য রচিত হয়েছে। ভারতবর্ষেও মোগল আমলে ফারসি, কিংবা ব্রিটিশ আমলে ইংরাজি শাসকের অনুগ্রহের ছাতার তলে থাকলেও বাইরে থাকা বাংলায়, তামিল তেলেগু বা লোকভাষায় সাহিত্য ও কথা রচিত হয়েছে । কিন্তু আজকের সময়ে গ্লোবালাইজেশানের কালে ভাষার বিপন্নতা ক্রমশ বাড়ছে । কাজের ভাষা না হলে বিলুপ্তির অবধারিত খাঁদে গড়িয়ে পড়বেই বিপন্ন ছোট ছোট ভাষাগুলো।
উদাহরণ হিসাবে আমরা উত্তরের হিমালয় সন্নিহিত বাংলার দিকে তাকাতে পারি। হিমালয় সন্নিহিত বাংলায় এই ভাষা বিপন্নতার চেহারাটা এই সামগ্রিক চিত্র থেকে বিচ্ছিন্ন কিছু নয়। Anthropological Survey Of India’র তথ্যানুযায়ী ভারতীয় উপমহাদেশে ৩২৫টি ভাষাগোষ্ঠী ১২ টি পৃথক ভাষা পরিবারে বিভক্ত, যাদের নিয়ে আবার তৈরি হয়েছে বৃহৎ ভাষা-পরিবার। ভারতীয় উপমহাদেশে চারটি বৃহৎ ভাষা পরিবার রয়েছে, ভারতীয় আর্য, দ্রাবিড়ীয়, অস্ট্রিক ও ভোট-চিনীয় । এই চারটি ভাষাগোষ্ঠীরই উপস্থিতি রয়েছে হিমালয় সন্নিহিত এই বাংলায় । আমারা দেখতে পাই যে ভারতবর্ষের সংবিধানের ২৯(২) এবং ৩৫০ (ক) ও (খ) ধারায় ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক ভাষা মূলত আদিবাসীদের সমাজের মাতৃভাষাগুলোকে উপযুক্ত মর্যাদা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে । সংবিধানের ভিত্তি যে মৌলিক অধিকার সেখানে ২৯নং ধারায় লেখা আছে, “Any section of the citizens residing in the territory of India or any part therof having a distinct language, script or culture of its own shall have the right to conserve the same”। কিন্তু বাস্তবের চেহারাটা অনেকটাই ভিন্ন। ভারতবর্ষে কোনও নির্দিষ্ট ভাষানীতি নেই বা ‘ভারতের ভাষানীতি’ বলে কোনো দস্তাবেজ তৈরি হয়নি । ১৯৯২-তে আমরা যে সংশোধিত শিক্ষা নীতি পাই সেখানে উল্লেখ আছে যে অল্প-সংখ্যক গোষ্ঠীর সদস্যদের নিজস্ব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চালানোর এবং নিজেদের ভাষা ও সংস্কৃতির সংরক্ষণের বিশেষ অধিকার থাকবে। হিমালয় সন্নিহিত বাংলায় চিত্রটা ভাষা-আধিপত্যের এক চূরান্ত রূপ নিয়েছে স্বাধীনত্তোর সময় থেকেই । নব্বয়ের সময়েও এই অঞ্চলের পাঁচটি জেলায় ১৫টি সংবিধান স্বীকৃত তপশিলি ভাষা ছাড়াও ৩৯টি অ-তপশিলি ভাষার অস্তিত্ব ছিল। ভৌগলিক অবস্থানজনিত কারণে এই অঞ্চলে নানা প্রান্তের মানুষ এসেছেন, মহা প্রব্রজনের এই স্রোত এখানের জন বৈচিত্র ও ভাষা বৈচিত্র তৈরি করেছে। কিন্তু উপযুক্ত যত্নের অভাবে ও বৃহৎ ভাষাগোষ্ঠীর আগ্রাসী আচরণে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ভাষাগোষ্ঠীগুলো বিপন্ন হয়নি শুধু, অধিকাংশে লুপ্তির পথে আজ। ১৮৭৬ বা সেই সময় থেকে চা শিল্পের কারণে এই অঞ্চলে ছোটনাগপুর, উড়িষ্যা, অন্ধ্র প্রভৃতি অঞ্চল থেকে মানুষেরা শ্রমিক হয়ে আসেন । এদের একটা বড় অংশের মাতৃভাষা আজ তাদের দৈনন্দিন ব্যবহারের ভাষা নয়, লিখবার পড়বার ভাষা নয়। বিরাট একটা জনতা তার মাতৃভাষা থেকে চ্যূত হয়ে গেছেন গত ৫০ বছরে। এই অঞ্চলে ‘কুরুখ’ ভাষার সংখ্যা ১৯৮০তেও ছিলো ১৩%, বিগত জনগননায় তা নেমে এসেছে ২% এর কাছে। হিন্দী এই অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষা নয়, এমনকি যে ভাষিক গোষ্ঠীর তারা প্রতিনিধি সেটাও হিন্দীর থেকে ভিন্ন । কিন্তু এই অঞ্চলে প্রাথমিক থেকে স্নাতক পর্যন্ত হিন্দীর প্রসার, রাষ্টের উদ্যোগে, পাশাপাশি এই ভাষাগুলো চর্চা ও ব্যবহার কমে যাওয়া এই ক্ষুদ্র ভাষিক গোষ্ঠীগুলোকে লুপ্ত হওয়ার পথে নিয়ে যাচ্ছে। আগে উল্লেখ করা হয়েছে যে ক্ষুদ্র ভাষিক গোষ্ঠীর লুপ্ত হওয়ার অন্যতম কারণ সেই ভাষিক গোষ্ঠীর উচ্চ স্থরে থাকা ভাষার প্রতি আকর্ষণ বা ঝোঁক । এই ঝোঁক এবং সরকারের সুনির্দিষ্ট ভাষানীতির অনুপস্থিতি, পাশাপাশি বৃহৎ ভাষাগোষ্ঠীর আগ্রাসী ভূমিকায় আজ বিপন্ন এই অঞ্চলের মোঙ্গোলিয় গোষ্টির বা ভোট-বর্মী/ ভোট-চিনিয় ভাষাগোষ্ঠীর মেচ, রাভা, গারো, লেপচা, ডুকপা, টোটো, এবং অ-মঙ্গোলীয় বা অস্ট্রিক, দ্রাবিড় প্রভৃতি ভাষাগোষ্ঠী থেকে আসা সাঁওতালি, কুরুখ, মুন্ডা বা মুন্ডারি, খরিয়া প্রভৃতি ভাষা । নিজের মাতৃভাষায় আজ এদের অধিকাংশ মানুষই কথা বলেন না আর । উদাহরণ তুলে আনলে চমকে যেতে হয়, যা নিয়ে স্বতন্ত্র আলোচনার অবকাশ আছে, এই পরিসরে তা সম্ভব নয় । তবুও হিমালয় ও সন্নিহিত অঞ্চলের দুটো ভাষাগোষ্ঠীর উদাহরণ নিলে দেখা যাবে ভাষা আগ্রাসনের চেহারাটা কতটা গভীর । লেপচা এই এলাকার প্রাচীনতম জনগোষ্ঠী, ১৯৭১এর হিসাবে দেখা যায় যে এই জনগোষ্ঠীর মধ্যে মাত্র ১৫.৩২% লেপচা ভাষা লিখতে পড়তে জানেন । ব্রহ্মপুত্র ও সন্নিহিত পাহাড়ি অঞ্চলের জনজাতি গারো, ডুয়ার্স অঞ্চলেও তাদের আবাস আছে । গারোদের ২৬.৪০% তাদের মাতৃভাষা হিসাবে গারোভাষা উল্লেখ করেছিলেন সেই জনগননায় । তরাই ডুয়ার্সে চলে আসা সাঁওতালিদের মধ্যে ৪৭.০৬% তাদের মাতৃভাষা হিসাবে অন্য ভাষার উল্লেখ করেছিলেন। এই তথ্য নিছক তথ্য নয় একটা সংস্কৃতির মৃত্যু ঘণ্টার ধ্বনি।
|
|