দৈনিক কবিতা আশ্রম, ১১ আষাঢ় ১৪২৭
আবহমান বাংলা ভাষা
দৈনিক
১১ আষাঢ় ১৪২৭
ছবি: PIXABAY থেকে সংগৃহীত
রণবীর দত্ত
প্রেমিকার একটা হাত
প্রেমিকার একটি হাত
যদি কোনওদিন ফিরে আসে
সে কি ফুল হয়ে বাতাসের
ধাক্কায় লীন হয়ে যাবে?
সমস্ত পাখিকুল প্রেমিক হয়ে
গোপনে চুমু দিতে জানে
পিপাসায় আর্দ্র হয়ে
পিপাসার কাছে বসে থাকে?
মোহতাপে জর্জরিত
পুরানো বাড়ির ভিতর বন্দী জেগে আছি
রাত নামলে জ্যোৎস্না আসে
তীব্র গন্ধ ছড়ায় মনে
প্রেমিকার একটি হাত
যদি কোনওদিন ফিরে আসে
রোগগ্রস্ত পশুর মতো
ধীরে ধীরে বুকের মধ্যে মুখ লুকাবো
এবং বনভোজনের আয়োজন করে
দুই চোখ অন্ধ করব নিজে
ভাঙা হাঁসের ডিমের খোসা হয়ে
মিশে যাব দিগন্তের মাটিতে
ও যেন অন্তত বুঝতে পারে প্রেমের মধ্যে কোনও ফাঁকি
ছিল না।
প্রসূন ঘোষাল
খিদে
আমি যেটা এক্ষুনি ভাবছি পথ চলতে চলতে
আর দু’চার পা এগোলেই মূর্তি গড়তে পারব না।
এই ভাঙা ভাঙা রোদ্দুরে গাছের পাতায়
জল দেখলে মনে কবিতার খিদে পায়—
বটফলের প্রেমে পাখিরা যখন সাড়া দিতে আসে
তখন খিদে দ্বিগুণ বেড়ে যায়—
কবিতার খিদে সকাল থেকে তাড়া করে।
পথ হাঁটতে হাঁটতে খিদে চেপে রাখতে নেই
বরং সাদা মেঘের দেহে
ডাল-ভাত মাখা শুরু করে দাও।
গন্ধরাজ লেবুর মতো দু’একটা শব্দ মিশিয়ে দিতে
পারলে গোটা পাতে সুগন্ধ ছাড়বে
তুমি ভাবতে ভাবতে—
কখন যে ফুল, ফল ধরে যাবে
তুমি বেমালুম হাঁ হয়ে যাবে নিজে দেখে—
মনে মনে তুমি তো নদী চেয়েছিলে।
খিদে অনেকক্ষণ ছিল, আর তুমি দু’চার পা
এগোনোর কথা ভাবছ—
বাড়ি নিয়ে কী ফিরবে?
অনিন্দ্যকেতন গোস্বামী
একটি তোপধ্বনি কথা
কেউ শস্যবীজ হয়ে শুয়ে আছে মাঠে,
কেউ শব্দে ঘিরে দেয় শিশু মনোকল্প,
কারুর মাথার ঘাম কালো পিচে হাঁটে।
এটাও তো দেশপ্রেম। যা শতাংশে অল্প…
তবে কি পরীক্ষা দেবে রাম ও রহিমে
চাষা জেলে কামার বা ভ্যান টানা কৃশ-
হাওয়ায় ছড়িয়ে দেব প্রশ্ন রাতে দিনে
দেশপ্রেমে চাখা হবে পাদোদক বিষও…
বহুবার পথ বোঝে আবেগ বাসনা
গাণিতিক অঙ্ক লিখে দেশপ্রেম ফোটে…
কত মৃত্যু ধুলো হলে ধান হয় বোনা
সীমান্তে মরলে শুধু তোপধ্বনি ওঠে।
রক্ত ওঠে ঘাম ঝরে কাব্য থাকে দেনা
সরল মরণে কোনও বাহবা থাকে না…
বাবুল আনোয়ার
এত অসহায় মানুষের মুখ
এত মৃত্যু আগে দেখেনি কেউ
এ রকম বিপন্ন সময় বিদীর্ণ
হাহাকারে নুয়ে পড়েনি পৃথিবী
মৃত্যুর মিছিলে মানুষের আর্তনাদ
মৃত্যুর কফিনে জীবনের আহাজারি
এর আগে শোনেনি কেউ।
এত বেদনার সিক্ত জলে কেউ
ঢাকেনি মুখ
এত বিহ্বলতা মৃত্তিকার বুকে
এত নির্লিপ্ততা সাগরের জলে
এত উদাসীনতা মেঘের চোখে
দেখেনি কেউ।
পরিচিত পথ ঘাট অনিচ্ছায়
এ রকম দখলে নেয়নি নির্জন বিমূর্ত প্রহর
এত কম্পিত শিহরন সবুজের মাঠে
বাতাসে হেলান দেয়া বিলাপ
শোনেনি কেউ
এরকম পদ্মা, গঙ্গা, ফোরাত
অথবা আমাজন এত নিস্তরঙ্গ জলে
প্রবাহিত হয়নি কখনও
ঢাকা, কোলকাতা, দিল্লি, রিয়াদ,
লন্ডন, নিউইয়র্ক অথবা প্যারিস
একই আকাশের নিচে এত ম্রিয়মাণতায়
দাঁড়িয়ে থাকেনি কোনও শহর
এ রকম র্স্পশহীন ঠোঁটের কাছে ঠোঁট
পায়ের কাছে পা
বিমুখ বাসনার রাত
আসেনি কখনও
এত অসহায় মা
পাগলাঝোরা
জয়ন্ত দে
পর্ব-১০
মাস্ক
নাড়ুগোপালের জন্য মাস্ক কিনতে বেরিয়েছিল ক্ষেন্তিপিসি। সারা জীবন উনি আমাকে দেখলেই ক্ষেপণাস্ত্র ছোঁড়েন। ভাবলাম ট্রাম্প যখন কাত, তখন পিসির তূণে কী তির থাকবে? আমি খপরের কাগজে কাজ করি, তাই পিসির ধারণা আমার কাছে অরিজিনাল খপর থাকে। আমাকে দেখেই অরিজিনাল খপরের আশায় শুরু করল পিসি।
বলল, হ্যাঁ রে বাপ, ওজোন স্তরের কতটা মেরামত হল বল দিকি? গঙ্গার জল কতটা কিলিয়ার, এবার পান করা যাবে? ক্যাঙারুরা স্পোর্টস কম্পিটিশন, পেঙ্গুইনরা নাকি মর্নিং ওয়াক করছে? ময়ূরেরা দল বেঁধে শহর দেখছে, হরিণশাবক মনুষ্যপাড়ায়, গির অরণ্যের সিংহ ইস্কুলে শুনছি? সত্যি না কি?
শুনছি ফিরি রেশন নিতে মেয়েরা, মদের লাইনে ব্যাটাছেলেরা, তাই ?
বুলির ভাতার এসে নাকি বলেছে, আমি মদ খাচ্ছি, তার রেভিনিউতে তোর সরকার পিছনের কাপড় সামলাচ্ছে? হ্যাঁ রে বাপ, আমাদের তো মুখে, আর সরকার কি পিছনেও মাস্ক পরছে? সত্যি নাকি?
পিসির কথায় আমি যখন মাথা চুলকোচ্ছি, তখন পিসি আবার বলল,
—আমি কিন্তু কাজের কাজটি সেরে রেখেছি। ওই যে, যেদিন মড়ামানুষ এক লক্ষ টপকাল, তোরা মোমবাতি জ্বালিয়ে, প্রদীপ দেখিয়ে, বাজি পুড়িয়ে মোচ্ছব করলি, সেদিনই বোনপো ঘন্টেকে বললাম, তোর হাতের মোমবাতিটা আমার মুখে এট্টু ঘুরিয়ে দে বাপ, ভালমন্দ কিছু হলে তো মুখে আগুন দেয়ার চান্স পাবি নে।
পিসি হাসল, হাত উলটে ফিসফিস করল।
—এই দ্যাখ, গলায় ঘি মাখিয়ে একটা চন্দন কাঠের টুকরো রেখেছি। মুখাগ্নি, ঘি, চন্দন— কাজ আমার কমপ্লিট। অবাগীর সগ্গ।
পিসি বলল,
—যাই রে, আমার নাড়ুগোপালকে তুলসী পাতার রস দিয়ে হাত-বাঁশি-নাড়ু ধুইয়ে মুছিয়ে দিচ্ছি, এখন একটা মাস্ক পেলে ভাল হত। হ্যাঁ রে বাপ, সামনে পিছনে তো মাস্ক, পেটে পেটে কী পচছে কে জানে, ট্যাংকি বার্স্ট করবে না তো?
আমি যাই দুঃখু নেই, দেবতাকে তো বাঁচাতে হবে, নইলে নাতিপুতিগুলো দানবকেই দেবতা ভাববে?
তোরা তো সুযোগ পেলেই আবার ইতিহাস বদলে দিস!