দৈনিক কবিতা আশ্রম, ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭
আবহমান বাংলা ভাষা
দৈনিক
১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭
ঝড়
আলোকচিত্র: বন্যা লোহার
অমৃতাভ দে
ঝড়
ঝড়ের কাছে আমার পরাজয়
ঝড়ের কাছে আমরা নত হই
ধ্বংস দেখে আঁতকে ওঠে বুক
ঝড়ের মুখে স্থবির হয়ে রই।
ঝড়ের মুখে তোমরা বেঁচে থাকো
আমার বুকে আগুন-পোড়া ছাই
ঝড়ের সাথে লড়াই হবে খুব
তলিয়ে যাবই নদীর মোহনায়।
ঝড়ের কাছে তোমরা শেখো বাঁচা
ঝড়ের কাছে আমরা নত হই
ধ্বংস দেখে আঁতকে উঠি যেই
পরস্পরের আঙুল ছুঁয়ে রই।
ঝড়ের কাছে আমার পরাজয়
ঝড়ের শেষে তোমরা বাঁধো ঘর
আজ সারারাত লিখেই যাব গান
পাতায় পাতায় তোমার কলস্বর…
রুমা তপাদার
প্রকৃতি চাবুক হলে
জীবন মৃত্যুর মাঝখানে প্রকৃতি চাবুক হলে, ঝড় হয়।
আগুন পরশ রাখে সুদৃঢ় বাতাসে
নিশুতি রাতের কোলে আলো সব অহর্নিশ
মহাকাল হেসে ওঠে
সমুদ্র পাতাল থেকে মিশে যেতে চায় শূন্যময়
মহাশূন্য নীচে নেমে আসে
পিঁড়ি উল্টো পেতে বসতে দিই
এসো এসো বসো, পবন
ব্রহ্মতালু ভার হয়ে আসে ত্রিবেণীর স্রোতের মতন
স্নান সারা হয়ে যায় স্নাত রূপ শূন্যতা নির্বাক
প্রকৃতির মেয়েলি রোষেরা বৃষ্টি হয়ে শান্ত স্থির
কেন্দ্রের জমাট লাভা মনে রাখে, গোড়ামি কতটা চৌচির…
জয়দেব বাউরী
স্বপ্নদোষ
খিদের সমুদ্রে কোনও ঘূর্ণাবর্ত নেই আপাতত।
উপগ্রহ চিত্রে শুধু জলের উপরে ভাঙে জল…
টিলার কাঠামো চোখে শান্তিঘুম, ঢেকে রাখা ক্ষত।
তন্ত্রের পেশিরা বাড়ে। শীত শীত। আলোর দখল!
নামেনি গভীরে তাপ, মাত্রা তার বাড়েনি ততটা
উপরে ওঠেনি বায়ু, আসেওনি আশপাশ থেকে!
চোখের অতলে দিন, পথ থেকে পথে ফুটিফাটা…
ঘড়ির কাঁটারা চলে অবিরাম তাল ঠুকে ঠুকে!
খিদের ভেতরে ক্ষোভ নিচের স্রোতের চাপে যদি,
ভারী এক বিস্ফোরণে উড়ে যেত উচ্চতাকে ছুঁয়ে…
এঁকেবেঁকে ঘুরে এলে ক্ষেপে যেত তামাম জলধি
আর্দ্রতা, কলম ছেড়ে মিশে যেত এমন বিষয়ে!
তাহলে তো ভেঙে গিয়ে উড়ে যেত মাথার ছাউনি!
কাঠামো নতুন হতো? স্বপ্নদোষ! স্বপ্নদোষ, জানি।
আলোকচিত্র: বন্যা লোহার
অমিত সাহা
ঈশ্বরচিহ্ন
নিরাপদে মশারির মধ্যে আছি,
ঘুম নেই…ঘুম নেই…
গোটা সাতেক জোনাকি ঘরের ভেতর
অন্ধকারে ওড়ে…
ওদের অন্যান্য দিন আমি বের করে দিই
ফ্যানে কাটা পড়বে… টিকটিকি খেয়ে নেবে- এই ভয়ে।
আজ বাইরেটাও যে নিরাপদ নয়!
তাই বের করতে গিয়েও মন কেঁপে উঠল।
শুধু ফ্যানটা বন্ধ করলাম…
রাত তিনটে বাজে… চোখে ভাসছে, মৃত পাখিদের চোখ
আর গাছ আঁকড়ে ঝুলে থাকা ছেলেটির মুখ!
ওই সাতটি জোনাকি কত কিছু বলে দিচ্ছে
আলোর ভাষায়!
কয়েকশো বছরের কয়েক লক্ষ বয়স্ক যুবক
যারা বুকে নিয়েছে বুলেট, তাদের ডাকনাম গাছ,
আমি শুধু,
বৃক্ষ সামান্যের পাশে গোপনে ঈশ্বরচিহ্ন দেখি!
বাইরের ঝড় থেমে গেছে…
কতখানি বাতাসের বেগ বাড়লে তাকে ঝড় বলে?
বুকের ভেতরে বায়ু কমে এলে
তাকেও ঝড়ই বলে…
রাখাল বালক জানে, বাঁশিরা জানে কি?
অমিতকুমার বিশ্বাস
ঝড়
ছবি: চন্দন মিশ্র
ঝড় এলে টিনের ঘরে সিঁটিয়ে থাকতাম তিনভাই। বড়দা বলত, ‘মটকার চরকাটা কি ঘুরতিচে, ভাই?’ মেজদা বলত, ‘রঞ্জনকাকার বানানো না? খাশ ফরিদপুরির! না-ঘুরে কি আর পারে?’
বিস্তারিত আকাশটা কেউটের কুণ্ডলীর মতো কালো হয়ে এলে গোয়ালে ধলির দড়িগাছা খুলে দিত মা। তারপর দাওয়ায় দা-খান রেখে এক নাগাড়ে শাঁখ বাজাতে থাকত। পাড়া-জুড়ে তখন ঝড়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কেবলই শাঁখের আওয়াজ। ‘শাঁখ কেন মা?’ আমি বলি। মা বলে, ‘ভূতির উৎপাত থামাতি, বাবা। তেনারাই তো ঝড় আনেন।’
‘এখন তেনারা কোথায়, মা?’ মা দক্ষিণ-পশ্চিম দিক দেখিয়ে বলত, ‘ওইইই…ওই খানে!’
আলসের বিলের ওইদিকটা কালুপুর। সেখানে প্রকাণ্ড এক বটগাছ দাঁড়িয়ে। ভূত নিশ্চয়ই বটের ঝুঁটি থেকে মেঘেদের ঘাড়ে চেপে ঝড় তুলেছে বেদম। তাই শাঁখ বাজিয়ে-বাজিয়ে মা বুঝি তেনাদের তাড়াতেই ব্যস্ত।
টিনের ঘরের শিশুটি কল্পনাশক্তি হারিয়ে এখন কোঠাবাড়িতে পা দোলায় কেবল। পায়ের নীচে কত যুক্তিতক্কো। ঝড় আসে, ঝড় যায়। মায়ের শাঁখ আর বাজে না এখন। আকাশেও ভূত নাচে না। ভূতগুলো সব অকালে ঝরে গেছে নিশ্চয়ই।
মাকে বললাম সেকথা। মা বলল, ‘কোঠাবাড়িতে কি আর ভূত আসে, বাবা?’
সকল ঝড়কে হারিয়ে এক রাতে ঝড় এল ভীষণ। পরদা সরিয়ে কাচের জানলায় চোখ রাখি। জানলার ওপাশে ছায়ার ভিতর ছায়াগাছগুলো কার চাবুক খেয়ে নাকে খত দিতে-দিতে উঠে দাঁড়ায় যেন, আর তারই ফাঁকে হাজার হাজার হাতি শুঁড় তুলে হুঙ্কার জুড়ে দেয়।
কাচের গায়ে দু-একফোঁটা জলবিন্দু, দু-একটি সদ্য খুন-হয়ে-যাওয়া কচিপাতা। এই কাচে কত যে পাখি ভ্রমবশত ধাক্কায় মরেছে অকালে। তবু ঘরের শোভার কথা ভেবে, চোখের আরামের কথা ভেবে কোঠাবাড়ির অসমাপ্ত জানলায় আরও ক’টা নতুন কাচ লাগিয়েছি। আবার সেই চোখ দিয়ে পাখি দেখেছি কত, মুগ্ধও হয়েছি ঢের-বার। এইসব দ্বিচারিতা নিয়ে কখনও উদ্বিগ্ন হয়নি তোমার মতো, বরং খেয়েছি-দেয়েছি, সঙ্গমও করেছি পেটপুরে। কাচের কোঠাবাড়ি থেকে ক্ষুধার আমেজ নিতে-নিতে ক্ষুধার্ত লোকেদের কথা ভেবে গেছি শুধু। এখন জানলার এপাশে দাঁড়িয়ে ঝড়ের আমেজ নিচ্ছি তুমুল। অথচ উড়ে-যাওয়া টিনের চালের বাকিটুকু জুড়ে রাখতে বাবার সঙ্গে আড়ায় ঝুলে আছে কনক, যেন ওই বিশাল ঝড়ের রাতে সার্কাসতাঁবুতলে নেমে পৃথিবীর বাবুবিবিদের ট্রাপিজ খেলা দেখাচ্ছে ওঁরা। তবে কি ওঁরা হাতিদের খেয়ালই করেনি? নাকি কনকের মা শাঁখ বাজিয়ে-বাজিয়ে এখন ভূতপ্রেত তাড়াতেই ব্যস্ত? ওঁদের পাড়ায় বুঝি শাঁখ বাজে আজও? ওঁদের ওপাশেও কি বিল-বাঁওড়-প্রাচীন বট?
মা কোঠাবাড়ির সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে এসেছে হঠাৎ! আমি বলি, ‘তোমার না হাঁটুতে ব্যথা? ডাক্তারের কথাটা অন্তত শোনো!’ মা শুধু উদ্বিগ্ন মুখে বলে, ‘ঘরে এত হাতি কেন, বাবা?’ চমকে বলি, ‘সে কি?’
দেখি সিঁড়িতে মা নেই আর। দেখি কোঠাবাড়িও নেই।
দেখি ঝড়ের আমেজ নিতে-নিতে আমি এক প্রাগৈতিহাসিক জলজঙ্গলপদে হারিয়ে গেছি একা!
নির্মল হালদার
পৃথিবী গ্রহের পুরুলিয়া
পর্ব-২৮
একটি কাকও ডাকছে না। গাঁয়ে যে কটা গাছ ছিল কাটা গেছে অনেক আগেই। এখন পড়ে আছে একটা জোড় গাছ। আরেকটা বট। ই দুটাও কাটা পড়তো কিন্তু রক্ষা পেয়ে গেছে দু-চারজন বুড়াবুড়িদের জন্য। উয়ারা বছর ভর দুটা গাছে জল দেয়। তা বাদে মাড়পানি খায়। ত আজ গাছ দুটাতে পাতাও লড়ছে নাই। পরশু ছিল শনিবার, খবর এলো, রাজস্থান থেকে ফিরছিল দিবাকর তপন আর নন্দলাল। এক্সিডেন্টে মারা গেছে।লকডাউনের কারণে ওরা আটকে পড়েছিল। ঘরে ফেরার সময় গাড়ির সঙ্গে গাড়ির ধাক্কাতে এক্সিডেন্ট। দুর্ঘটনাস্থলেই ওরা মারা যায়। মৃতদেহ এখনও গ্রামে এসে পৌঁছয়নি।
সারা গ্রাম থমথম করছে। কুকুর গুলা কুলিতে কুলিতে না ঘুরে শুয়ে আছে রাস্তায়। তারাও জেনে গেছে, গাঁয়ের তিন তিনটা জুয়ান ছেলা নেই আর। জগদীশ রাজোয়াড় বলছিল, দেখলি তো তরা বাহারে কাম করতে যাওয়ার ফল। তার কথার সঙ্গে কথা জুড়লো আরেক মুরুব্বি ধনপতি মাহাত: মা-বাপ গুলা দেখুক। ব্যাটা বড় হলেই,যা যা রোজগার করবি যা। বাহারে মুঠা মুঠা টাকা। যা আনতে যা। তখন সুচাঁদ বাউরি বলে, ঠিকেই বললে খুড়া। ব্যাটা বড় হলেই, খেদায় দিছে।তার সাথে ফোড়ন কাটে, বিজয় গঁরাই—খেদায় দিছে নাই, ঝ্যাটায় বার করাছে। কারণটা হলো, দমে টাকা ঢুকবেক। বছর তিরিশের যুবক রাজেশ মাহাত থাকতে না পেরে বলে, লকের হয়েছে শোক আর তুমরা করছো ঠাট্টা। এখন ইসব আলোচনা না করে, পাশে ডাঁড়াবে যাও ন। পাশ থেকে কে একজন বলে, নাই বাবা আমি নাই যাতে পারব। শুধু কাঁদনা কী দেখা যায়! রাজেশ তখন বেশ জোর গলায় বলে, তকে কে যাতে বলছে, ঐ বুড়া গিলাকে বলছি। উয়ারা যা-তা বকেই যাছে। দুটা গাড়ি ঢুকলো গাঁয়ে। আর তখনই কান্নার আওয়াজ উঠল আবার। ইনিয়ে বিনিয়ে কান্না। যেন বা রাস্তার ধূলাও কাঁদতে কাঁদতে আর উড়বে না কোথাও কোন দিন। আস্তে আস্তে ভিড় জমছে এখানে ওখানে। ফিসফিসানি। চাপা স্বরেও কথা হচ্ছে। গাড়ি থেকে নামলেন, মনে হচ্ছে কোন নেতা। তার সঙ্গী সাথীরা। আরেকটা গাড়ি থেকে পুলিশ। নেতা মন্ত্রীরা মৃত যুবকদের ঘরে ঢুকতেই, একই সঙ্গে পরিবারের সবাই বলে, তুমরা ক্যানে আলে, হামদের ব্যাটাকে নাই আনতে পারলে যখন, তুমরা ক্যানে আলে? বলতে বলতে কান্না আর কান্না। মনে হচ্ছে, আকাশ যেন ফেটে যাবে এবার। মাটি যেন ফেটে যাবে এবার। গাঁয়ের ছেলেছোকরার দলও এসে গেছে। নেতা-মন্ত্রীদের দেখতে। যিনি বড় নেতা শাদা পোশাকে শাদা শাদা সেজেছে খুব, তিনি বলেন, আমরা সান্ত্বনা দিতে আসি নাই—এসেছি কথা বলতে। তোমাদের পাশে দাঁড়াতে। ছোট এক নেতা বলেন, আমাদের সরকার আপনাদের আর্থিক সাহায্য করবেন। আপনারা চিন্তা করবেন না। তখন আগুনে ঘি পড়ার অবস্থা হয়ে উঠলো: ছেলেছোকরারা বলে উঠলো, টাকা লিয়ে কি হবেক, ছেলেটা ফিরায় দিতে পারবে? অন্য একজন বলে, তুমরা কী পারতে নাই, রাজস্থান থেকে গাড়ি করে আনতে? তাইলে ছেলা তিনটা মরতো নাই। এক বুড়ো ছেলে ছোকরাদের সঙ্গে গলা মিলিয়ে বলে, সভেই পারত যদি ভোট হত। তাইলে উড়াকলে উড়ায় লিয়ে আসত। ভোট লিতে ভোটে জিততে, সবাইকে মন্ডা মিঠাই খাওয়ায় লিয়ে আসত। এমন শোকের আবহাওয়ায় দু-তিনজন হেসে ওঠে। সেই হাসি ছিঁড়ে যায় মৃত যুবকদের মায়েদের কান্নায়। এবং একজন মা বলে, কাঁদতে কাঁদতে বলে, আরো ভোট! লিতে আলেই ঝাঁটাব। বাবারাও জোরালো কণ্ঠে বলে, ঢাঁড়াব। হামদের ব্যাটাদের বাঁচাতে পারলো নাই, তাদের দিব ভোট! সভকে ঢাঁড়াব। সম্মিলিত কোলাহলে নেতা-মন্ত্রীদের মুখ কালো হয়ে গেছে। আরো কালো হয়ে গেল যখন দীপক মাহাত বলে, সরকার অন্যায় করেছে অন্যায়—হামরা গাঁয়ের সবাই ভোট আর দিব নাই। সরকার অন্যায় করেছে। সরকারের বিরুদ্ধে এই হামদের ঘোষণা। তার সঙ্গে গলা মেলায় নারী-পুরুষ ছেলে ছোকরা বুড়োরাও।
নেতা মন্ত্রীদের গাড়ি চলে যায়। ভিড় ভাঙতে শুরু করে। কান্না জুড়ে দেয় এক শিশু কন্যা। তুলসী থানে মাথা ঠুকতে থাকে আত্মীয় স্বজন।
বট গাছের শুকনো পাতা এসে পড়ে কান্নার মাঝে।
৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭