দৈনিক কবিতা আশ্রম, ১৩ আষাঢ় ১৪২৭
আবহমান বাংলা ভাষা
দৈনিক
১৩ আষাঢ় ১৪২৭
ছবি: চন্দন মিশ্র
অমিত সরকার
সম্পর্ক
অন্য কাউকে নয়, তোমাকেই বলছি শোনো। আমি এইমাত্র নেমে এলাম অন্ধকার সম্পর্কের ভেতরে। কালো খনিসুড়ঙ্গের মধ্যে গতকাল হঠাৎই ফেটে গিয়েছিল আষাঢ়স্য প্রথম দিবসের মেঘ। হিংস্র বৃষ্টিরা দলবেঁধে বেরিয়ে এসেছিল পঙ্গু জন্তুদের লালা থেকে। আমার সামনে কোনও দরজা নেই, জানলা নেই, শুধু ঢালু জঙ্গল থেকে শোনা যাচ্ছে তীব্র ডাইনোসরদের শীৎকার। সেই ক্ষত বন্ধ করতে আজ আমি নেমে এসেছি হরিণদের ভেতরে। সেই ক্ষত উন্মোচন করতে আমি আজ নেমে এসেছি কচি বৈষ্ণবীদের অলকাতিলকায়। এখন আমার সামনে শুধু দুলক্ষ বছর ধরে বয়ে চলা গর্ভভার। সৌরঝড়ের ক্রমশ ফুলে ওঠা। ভবিষ্যৎ অক্ষরদের দিকে ঈশ্বরের চোখের মত তাকিয়ে রয়েছে হেলমেটে লাগানো হলুদ আলো। চারপাশ ক্রমশ চেপে ধরছে মধ্যবিত্ত জল। বেলজারের মধ্যে থেকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে সিলভিয়া প্ল্যাথ। দূর থেকে ভেসে আসছে খোলামুখ বার্নারের সোঁসোঁ আওয়াজ। গুঁড়িয়ে যাচ্ছে আমার সমস্ত পাথর-ডায়েরি আর ট্যালিসম্যান। ডাকিনীবিদ্যা ভুলে তুমি কি এইমাত্র হেসে উঠলে একতারায়, গৌড় মলহারে? দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে অক্সিজেন আর আমি ছটফট করছি আঁখিপাতে। কফিকাপ থেকে উঁকি মারছে তেকোনা পাখনা আর বলির আরতি। এইবার চার্চের গং ঘোষণা করবে জিরো আওয়ার আর আমাকে হত্যা করবে তোমার চোখের স্ট্রিকনিন।
কেননা একমাত্র আমাকেই তুমি একদিন প্রকৃত ভালবেসেছিলে…।
বিকাশ এস জয়নাবাদ
ঘরে ফেরা
এখনও ট্রাক জুড়ে আচার মাখানো শুখা রুটি
ছিন্নভিন্ন মতিছন্ন
পথ সাজানো পাথরকে চুম্বন করছে।
পাথর কাটা হাত টুকরো টুকরো হাত
নিজেকে বাঁচাতে না পেরে
এখনও ঘরে ফেরার স্বপ্ন দেখছে।
ছোট্ট একটা ঘর ছোট্ট এক বৃত্ত মাটি
শক্ত সমর্থ দুটো পা ফাটা চটি
তাতেই স্বপ্ন আঁকা সোনালি পথ বেয়ে বাড়ি ফেরা
হয়নি
তোমার,
শুয়ে আছে রেলপথ জুড়ে।
সৌরভ মাহান্তী
প্রথম প্রেমিকাকে
তোমাকেই আজন্ম প্রণাম করেছি,
হে নিস্তব্ধতা
তোমার পা ছুঁয়ে গড়িয়েছে কত বিষাদসিন্ধু
চোখের পাতায় জমেছে কত ঘৃণা
গ্রীষ্মদিনের দহনবেলায় তুমিই কি সেই মেয়ে
যাকে আমি,
বানের জলে ভাসতে দিইনি
শুকনো লতাপাতা দিয়ে
নাছোড় রাখালের জন্যে
একটা উইঢিবি গড়ে দেবে বলে…
রাজীব মৌলিক
ভাসান
অবাধ্য শিশুর মতো পাশ ফিরে শুয়ে
বিরহ লুকানো সহজ না
এই চোখ বুঝে নিতে জানে
প্রতিটি চোখের কোণে কাজলের রং
ভাসানের পর অবশিষ্ট থাকা প্রিয় বদনাম
কাছে গেলে খুলে দাও নিজস্ব গয়না
অথচ শরীর জুড়ে বিদেশি এলাচ
এভাবে আতর মেখে শরীর ছুঁয়ো না
জানো তো, প্রেমের চেয়ে সংসার ঢের গুণ ত্যাগী
পাগলাঝোরা
জয়ন্ত দে
পর্ব-১২
ধনপতির চর
অমর মিত্র-র লেখা অসংখ্য উপন্যাসের মধ্যে কোনটি বেশি পছন্দের? অধিকাংশের তালিকায় যখন ‘ধ্রুবপুত্র’ প্রথম স্থানে থাকে, তখন আমার পছন্দ কিন্তু ‘আগুনের গাড়ি’।
কিন্তু ‘ধনপতির চর’ পড়ার পর মনে হল একটি ক্লাসিক লেখা পড়লাম। যার আবেদন বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে চিরকালীন সম্পর্ক স্থাপনের পথে।
‘ধনপতির চর’ লেখকের তৈরি করা এক নিজস্ব ভুবন। এই চরের জেগে ওঠা, তার ছ’মাসের জীবনের সে অর্থে কোনও বাস্তবতা নেই। কিন্তু পুরো উপন্যাসে এই চর জেগে উঠেছে সত্য হয়ে।
হাজার বছরের এক প্রাচীন কাছিম হার্মাদ পেদরুই এই চরকে পিঠে নিয়ে ঘুমিয়ে আছে। তারই বংশধর ধনপতি এখন এই চরের মালিক।
‘আছিল চর এক, ধনপতি কহে
চারিদিক দিয়া তার বড় গাং বহে।’
এখানে ছ’মাসের জীবন। আশ্বিনের শেষ থেকে চৈত্রের আরম্ভ। এই ছ’মাসের জীবনে মূল ভূখণ্ড থেকে ধনপতির চরে মাছ ধরতে আসে জেলেরা। তারা মাছ ধরবে, মাছ শুকোবে।
এক শীতের অসংখ্য জীবন নিয়ে এই কাহিনি গড়ে ওঠে। জেলেরা আসে মাছ ধরতে আর অভাবী মেয়েরা আসে ভাতের খোঁজে। তারা এই জেলেদের সঙ্গে ছ’মাসের সংসার গড়ে, যা চৈত্র-বাতাস এসে ভেঙে দেয়।
‘গন্ধতেল গন্ধ সাবান, লও মেয়ে হাতে,
অঙ্গে সুগন্ধ এলে, দেখা হবে রাতে’।
আবার ছ’মাস অপেক্ষার পর আগামী বছর। আবার জেলেরা আসবে, আবার মেয়েরা আসবে, যদি না হারিয়ে গিয়ে থাকে, যদি বেঁচেবর্তে থাকে।
ধনপতি সর্দার এ বছর লাঠি ধরেছেন, তবু তিনি সোন্দর। তাঁর শরীরে হার্মাদ ফিরিঙ্গি পেদ্রর রক্ত। চরে এসেছে ঘোড়াদল থানার কনস্টেবল মঙ্গল মিদ্দে। সে-ই এখানকার গরমেন। আর তার সঙ্গী পুরুল্যার ব্যবসায়ী দশরথ সিং। ব্যবসায়ী কী বেচে? গরম জামা বেচে, আলোয়ান বেচে। আর কী বেচে? সোনো, পাউডার, আলতা সিঁদুর, ঠোঁটের রং, নখের রং। না, সেই ব্যবসায়ী আরও অন্যকিছুর ব্যবসা করে। তার নাম মেয়েমানুষ। সে বাতাসিকে পেতে চায়। কিন্তু বাতাসি যে এই ছ’মাসের জন্য গণেশ জেলের সঙ্গে ঘর বেঁধেছে। ব্যবসায়ী তাকে পুলিশ দেখায়, জেনে যাওয়া ধর্মের ভয়। যত রকম ভয় আছে তাতে সে আষ্টেপৃষ্ঠে বাতাসিকে বেঁধে ফেলতে চায়। কাহিনি শুরু হয় ছ’মাসের জন্য জেগে ওঠা চর দখলের সঙ্গে সঙ্গে দশরথ সিংয়ের বাতাসিকে দখল করা আখ্যানে। সে জেলেনিকে গন্ধতেল সাবান মাখাতে চায়। বেচা কেনা করতে চায়।
‘মৎস্যগন্ধা নারী ছিল একজনা
কীভাবে হইল শুনো, তার বেচাকেনা’।
এই মেয়েরা ছ’মাসের বউ, ছ’মাসের বিবি। বাদবাকি ছ’মাস জেলেরা তাদের কথা ভুলে যায়। জেলেরা তখন নিজ নিজ ঘরে বউ ছেলেপুলের কাছে ফিরে যায়। আর অভাবী মেয়েমানুষেরা ছড়িয়ে পড়ে নানা জায়গায়। কিন্তু তাদের মন রয়ে যায় ছ’মাসের সংসারে। ভাবে, এই ছ’মাসকে যদি বারোমাস করা যেত! এখানে ছ’মাসের জীবন কাটিয়ে জেলেরা চলে যাক তাদের সত্যিকারের ঘর সংসারে। আর এরা এখানে থাকবে, ভাববে তাদের সোয়ামি মরদরা অন্য কোথাও কাজে গেছে। তারা ছেলেপুলে ঘর সংসার, গোরু বাগান নিয়ে থাকবে। কিন্তু এ এক অলীক স্বপ্ন। যা ধনপতির চরে হবে না। এই চরের নিয়মকানুনই আলাদা। কিন্তু ব্যাপারী সে নিয়মের ধার ধারে না। সে সব মেয়েমানুষ কিনে নেবে। পণ্য মেয়েমানুষ!
‘কনস্টেবল আসিবে ফিরে, হবে লেনাদেনা
কিনে বেচা, বিচে কেনা, এই রূপ জানা।’
এই কেনাবেচা ব্যাপারী থেকেই সংঘাত। যমুনা, কুন্তী, ধনপতি — জড়িয়ে পড়ে পুরো চর। ইনকুয়ারি করতে আসে মালাকার। সে আর এক গরমেন। সে-ও মাংসলোভী। ব্যাপারী আর গরমেন্টেরা সব জোট হয়।
‘ডলারে কারবার হবে, ডলারে পেমেন
ডলারে লাভ বেশি, জানো তো গরমেন’।
ওদিকে ধনপতি থেকে কামাখ্যা ঘুরে আসা কুন্তী হয়েছে ধনেশ্বরী। সে চায় চরকে বাঁচাতে। বারোমাসে ব্যবস্থা করতে। বিডিও অনিকেত সেন শোনেন পেদরুর কথা। চৈত্র আসে। চর ছেড়ে জেলেনৌকা ভাসে ঘোড়াদলের দিকে। সব মেয়েদের মুখঢাকা ঘোমটায়। কাউকে চেনার জো নেই।
‘ধনপতি ধনপতি, এক সওদাগর,
ঘোড়াদলে এসে কহে হাতখানি ধর।
দুই হাতে ধরে তারে বিবি ধনেশ্বরী
পিছে দ্যাখো হাসি মুখে বাতাসি ঈশ্বরী’।
কিন্তু চতুর্থ পর্বে আর মেয়ে মানুষ নয়, পণ্য হয় জমি। চরে ধনপতিকে ঘরে রেখে লড়ে যায় ধনেশ্বরী কুন্তী। মেয়েরা কোমরে ছুরি গোঁজে। ওদিকে ব্যাপারীর রং পালটে বহুজাতিক কোম্পানি গ্রিনউডে মিশে যায়। নগ্ন জেলেনিরা নেমে আসে গাঙের জলে। ঘুমন্ত কাছিম পেদ্রুকে জাগাতে হবে। কাছিমের পিঠে করে এই চর ভাসিয়ে নিয়ে চলে যাবে অন্য কোথায়, অন্য কোনওখানে। আর গরমেন এসে দেখবে শুধু জল, আর জল।
অনবদ্য এই উপন্যাসে অজস্র লোককাহিনি ছড়ানো। এই মায়া আর ঘোরের উপন্যাসে আপনিও ভেসে থাকবেন।
এই উপন্যাসে যা নেই, যা অলীক তা সত্য, যা সত্য তা ভেসে যায় কল্পনার খোঁজে। একদিন তা অলীক হয়ে যাবে। লোকমুখে ঘুরবে। হাওয়ায় উড়বে। জলস্তম্ভ হয়ে আছড়ে পড়বে। ভাসিয়ে দেবে ভূখণ্ড থেকে ভূণ্ড।
‘গাং উথাল গাং পাতাল কেডা ভেসে যায়
পেরুর বিবিরা , ধনপতি ভাসায়।’
ধনপতির চরে ধনেশ্বরী বাতাসি যমুনারা আর শুধু মেয়েমানুষ নয় …
‘অঘঘানের জোসনা নিশি চর ডুবে যায়
ধনপতি প্রভু আমার একেলা ঘুমায়।’