দৈনিক কবিতা আশ্রম, ১৪ আষাঢ় ১৪২৭
আবহমান বাংলা ভাষা
দৈনিক
১৪ আষাঢ় ১৪২৭
ছবি: ক্যামি পিসারো
তন্ময় সরকার
কবিতা
এভাবেই নিজেকে গোটাতে থাকব আমৃত্যু।
পাতাঝরার সময় এলে
শুকনো রিক্ত সব ডাল মেলে দিয়ে দাঁড়াব
যিশু খ্রিষ্টের মতো।
এই বছর
এই জন্ম
শুধু পাতাঝরার আশঙ্কাতেই কাটল।
বসন্তে আর গাছ হব না।
নতুন পাতার আগমনী গাইব না আর।
দখিনা বাতাসে সব ডালপালা গুটিয়ে নেব
এ জন্মের মতো।
শিকড় ফিরিয়ে নেব মাটির গভীর থেকে।
বনস্পতি নয়।
এবার শামুক হব হাওয়ার উত্তরে।
রবিন বণিক
অক্ষরের ছায়া
লেখার উপর দীর্ঘ হচ্ছে ছায়া। ছায়া কোনও সমীকরণ নয়। একটি পথ ভুলে যাওয়া পিঁপড়ে ছায়ায় খুঁজে নিচ্ছে সন্তানের গন্ধ। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে দেখে নিল ছায়ার মাতৃত্ত্ব। সামনের পা দুটো খানিকটা ঘষে নিয়ে চেখে নিল প্রেম। পিঁপড়ে জানে অক্ষরে লেগে থাকে মঙ্গলকাব্যের স্বাদ। আর চিহ্ন, সে যে ঋতুর প্ল্যাটফর্ম। সে আর কিছু না ভেবে এগোতে লাগল। কিন্তু ছায়া থেকে সরতে পারল না কিছুতেই। আবার সেই ছায়া ও অক্ষর, অক্ষর ও ছায়া। হয়তো বুঝতে পেরেছে অক্ষরের আধুনিকতা, অক্ষরের উচ্চতা। উল্টোদিক থেকে আসা একটি পিঁপড়েকে দাঁড় করিয়ে সে যেন কানে কানে কিছু একটা বলল। উল্টোদিকের পিঁপড়েটা তৎক্ষণাৎ চেটে নিল মেঘের পা। ওরা বিশ্বাস করে ছায়ার কোনও সমীকরণ হতে পারে না। ওরা বিশ্বাস করে অক্ষরের ছায়ায় লুকিয়ে থাকে জেব্রার চোখ। অবশেষ খুঁজে খুঁজে লেখার উপসংহারে রেখে দিল ছায়ার সংলাপ। একদিন অক্ষরের ছায়ায় একে একে প্রণয়ের পোশাক খুলে রেখে চলে যায় পিঁপড়ের দল।
সৌম্য সালেক
মধুগ্রামের মেয়ে
সেই সিক্ত শ্যামাঙ্গীর কথা ভেবে আর কত ব্যথা পাব
আর কত পোড়াব হৃদয়- স্মরণে-সজ্জায় নিশিদিন
মধুগ্রামের সেই বিকেলের শোভা মহৎ শিল্পের মতো
রেঙে আছে হৃদয়ের পটে
ছোট নদী, সাঁকো পারাপার, একটুখানি দৃষ্টি বিনিময়
তার হাতে ছিল ভেজা বকুলের মালা
বাহুর কিনারে ফুল মধুমাসি
ফুলের দখিনা-শ্বাসে খসেছিল মাথার বসন
মধুর সুবাসে তার জমেছিল ফাল্গুনী
এমন কোমল আর দেখিনি কখনও কোথাও
আমার স্বপ্নসার তীর্থ-ভোলার মতো
আজও ফিরে তার পিছে-
উজানী ঢলের মতো কূলপ্লাবী…
পৃথিবীর চক্রপথে যদি কভু দেখা পাই:
হৃদয়ের অবিরাম আশ্বাসে সাড়া দেয়
আজও এই দেহযান
আজও একা চুপিসারে বসে থাকি নদীতীরে
ব্যথাহত বিজন সন্ধ্যায়…
পবন বর্মন
প্রেম ও ঈশ্বর
খাঁটি দাম কুঁকড়ে থাক ছুটির মাঝে,
কেউ ডাকছে, নদীর আড়াল সরিয়ে।
বহুদিন পর, বাদলের পাশে চোখ গুঁজে দেখি
কয়েকটা সুর ছোঁয়ার দাঁতনে ভিজে গেছে
আর কয়েকটা এঁটো উল্লাস,
মুগ্ধ লাটিমের সুতোয় উড়ছে ।
অথচ উঁচু হয়ে আছে মায়ের কোল, বুকের ভিতর!
তবু এক তলে ঘষেমেজে রাখি, প্রিয়তমার প্রথম রাত
মনের জঠরে প্রিয়তম মন ফাঁক করে বড়ো করে প্রেম,
‘মা’ মমতায় মন ফাঁক করে তুলে রাখে ‘প্রেম ও ঈশ্বর’!
আলসের বিল
অমিতকুমার বিশ্বাস
পর্ব-১
দুই মহলা বাড়ি
দুই মহলা বাড়ি আমাদের। উপরেতেই আমার বসবাস। নীচে বাবা-মা ও বিপুলা পৃথিবী। মাথার উপরে অনন্ত আকাশ। সারাদিন দরজা বন্ধ করে পেঁচা হয়ে থাকি। জানলাগুলোর কপাট খুলে ইট-সুরকির গাঁথুনি দিয়েছি। দিনের এই অন্ধকার বড়ই বিরক্তিকর— ঘৃণা ও বিদ্রুপে ভরা। সন্ধে নামলে ছাদে যাই। ফিটফাট হাঁটি। দেখি দক্ষিণে নকশিকাঁথার মতো অন্ধকার নেমে আসে আলসেরবিল-জুড়ে। কাঁথার ভিতর পাখিফেরার গান, অফুরান লোককথা। চোখ যায় খোকাদের ভিটেয়, বুকে নামে বাঘাতেঁতুলের মায়া। সভ্যতার প্রয়োজনে তেঁতুলকায়া শেষ হল সেই কবেই! শেষ হল ‘মুখোমুখি বসিবার’ মেঘশিরীষও। ওটা আমাদের ছিল। পাড়ার রিফুউজিরা সভ্য হয়ে উঠলে বলে, ‘দূর হঠাও শিরীষের বেয়াদবি!’ সেই থেকে সন্ধে নামলেই ওদের আত্মার কান্না শুনতে পাই। একে একে এভাবে পাড়ার সব গাছজোড় ভাঙা হল। সেই যে প্রেম চলে গেল পাড়া ছেড়ে, আর এল না। আমি ছাদে হাঁটি। চাঁদ দেখি। উড়ন্ত বৃষ্টিমেঘের আড়ালে হৃদয়ের ফুলসজ্জা দেখি। দেখি সারারাত। সারারাত জুড়ে চলে সইকথা। ভোরে কেবল অঝোরে বৃষ্টি ঝরে নকশিকাঁথার ভিতর। আমি হাঁটি। ছাদের এপাশ-ওপাশ করি। দেখি ছাদে ঝুঁকে-পড়া চালতেগাছটায় ফুল ধরেছে বেশ। চোখ বন্ধ করলেই গাছ থেকে তপবনের ঘ্রাণ নেমে আসে খুব। নিজেকে নবতাপস মনে হয় তখন। তখনই সহসা ধ্যান করি। যোগ করি। শীর্ষাসনে থাকি বেশ কিছুক্ষণ। তারপর দু-হাত ছাদে রেখে দাঁড়াই। হাতের উপর হাঁটি। আমার পায়ের নীচে তখন অনন্ত ছায়াপথ। সেই পথের চুম্বকত্বে ছাদ স্পর্শ-করে-থাকা আমার হাত-দুটো শূন্যে ভাসতে থাকে। আমি সেই ছায়াপথেই হাঁটি। হাঁটতে-হাঁটতে নেপচুন-প্লুটোদের পাড়াতেও ঘুরে আসি। সীমান্তকলোনিতে ওরা সিঁটিয়ে থাকে অচেনা আততায়ীয় ভয়ে। সূর্য বলে, ‘ভয় নাই, ঈশ্বর পাহারায়!’ ঈশ্বরের মাথায় ঊষাফ্যান বনবনিয়ে ঘোরে, আমি দেখেছি। ঈশ্বরের হাতে লাঠি, কোমরে আড়বাঁশি, মাথায় জ্যোতির্বলয়— তাও দেখেছি। ঈশ্বর লাঠি রেখে বাঁশি ধরেন। বাজান। গোরুরপাল হাম্বা ছেড়ে তখন শান্ত হয়। যমুনা কেঁদে ওঠে যমের মৃত-মুখের দু-পাশে দু-হাত রেখে। হাত-দুটো তাঁর পদ্মপাপড়ি যেন। বাঁশিসুরে সে-পাপড়ি শুকোয় না কখনও। আমি হাঁটি। আমার পা ছায়াপথে। আমি হাত দিয়ে মেঘ সরাই। পরদার মতো মেঘ সরিয়ে-সরিয়ে আমাদের রিফিউজি পাড়াটা দেখি। আলসেরবিল দেখি। বিলটাকে খেয়ে ফেলছে মানুষ, খেয়ে ফেলেছে পাড়ার অরণ্যভূমি। পাড়ার ঘড়বাড়িগুলো পোকার মতো গিজগিজে এখন। ইলেকট্রিক-তারে ঝুলে থাকে এ-পাড়া। আগে ঝুলত না, আগে ভাসত খুব। বড় বড় পুকুরপাড়ে ভাসত, বিলপাড়ে ভাসত, উঠোনজুড়ে ভাসত, বুকের ভিতর ভাসত। এখন গোটা পাড়াটাই একটা ইলেকট্রিক বাল্ব যেন, যার এপাশ থেকে ওপাশে ল-অ-ম্-ব্-আ-আ-আ এক ফিলামেন্ট জ্বলে থাকে সারারাত। লোডশেডিং থাকলে পাড়ার উপর দিয়ে দু-হাতে মেঘ সরিয়ে-সরিয়ে হাঁটি। শ্রীলাদের বাড়িটা চোখে পড়ে। ঠিক তখনই আকাশ থেকে ঝুপ করে নেমে পড়তে চায় এ-শরীর। শ্রীলা একবার বলেছিল কানে কানে, ওঁদের ভিটের নীচে ম্যাগনেট পুতে রেখেছিল কারা। তাই নাকি পাড়ার সকলেই ওঁদের বাড়ির দিকে ছুটে যায়। একবার দুজনে ওঁদের ভিটে খুঁড়তে শুরু করি। খুঁড়তে-খুঁড়তে জলস্তর উঠে আসে, কিন্তু ম্যাগনেট আর মেলে না কিছুতেই। সে তবু বলেই যায়, ‘আছে।’ শেষে একটুকরো ম্যাগনেট পেতেই লাফিয়ে ওঠে শ্রীলা। আমি বলি, ‘দুর বোকা, ওটা ট্রানজিস্টারের। কেউ ভিটেতে ছুঁড়ে ফেলেছে নিশ্চয়ই।’ ‘এত নীচে? নিশ্চয়ই পাতালপুরের কাছাকাছি পৌঁছে গেছি আমরা! এ তাদেরই ব্যবহৃত ট্রানজিস্টার।’ সে আরও খুঁড়তে বলে, আমি রাগে উঠে যাই। সে আমার হাত থেকে শাবল-ট্যাঙারি নিয়ে খুঁড়তে থাকে। খুঁড়তে-খুঁড়তে কোথায় যে যায় কে জানে! আমি আজকাল আমাদের এই দোমহলা থেকে কিছুই টের পাইনে। এভাবে মাটির কাছে বসবাস করা মানুষদের সঙ্গে আমার একটা দূরত্ব তৈরি হয়ে যায়। একমহলা আর দোমহলার মাঝে যে ব্যাপক ফারাক— এটা বুঝতে-বুঝতে সভ্যতা থুত্থুড়ে বুড়ো হয়ে যাবে একদিন। একরাতে কলিংবেলের শব্দ শুনি হঠাৎ! দ্রুত নীচে নামি, দেখি বাবা বারান্দায় পায়চারি করছেন, আর মা চেয়ারে ’পর ঘুমে ঢলে। বললাম, ‘কী ব্যাপার, কোনও বিপদ-আপদ?’ কিন্তু কেউই আমাকে গ্রাহ্য করলেন না। দেখি পেন্ডুলামের মতো বাবার বারান্দায় পায়চারি। ঘড়িতে টিকটিক টিকটিক। মা চেয়ারে আরও হেলে পড়েছেন, মনে হচ্ছে এক্ষুনি পড়ে যাবেন। আমি এগিয়ে যাই। আমার শরীর ভেদ করে হেঁটে যান বাবা। আমি ডাকি, ‘বাবা, ও বাবা!’ বাবার সাড়া নেই কোনও। মা-ও কখন যে চেয়ার ছেড়ে উঠে গেছেন টের পাইনি। পাড়ায় কিছু হল কি তবে? গেট খুলে পাড়ায় ছুটে গেলে পাড়ার লোকজনও মুখের উপর দরজা বন্ধ করে দেয়। আমি ঘরে ফিরে আসি মনের দুঃখে। বউ বলে, ‘কী গো, শরীর খারাপ? বুক ধড়ফড় করছে? যাও, একটু ছাদে হাঁটাহাঁটি করো, সেরে যাবে।’ অগত্যা ছাদেই ফিরে আসি সে-রাতে। তারপর থেকেই শীর্ষাসন, তারপর থেকেই দু-হাতে হাঁটার অভ্যেস রাত-জুড়ে।