দৈনিক কবিতা আশ্রম, ১৫ আষাঢ় ১৪২৭
আবহমান বাংলা ভাষা
দৈনিক
১৫ আষাঢ় ১৪২৭
মলয় গোস্বামী
যদি
টগরের পাপড়ির মতো যদি বাঁচা যেত।
উঠোন থাকত পরিষ্কার। দূরে মেদুর আমগাছটির
নীচে পোঁতা গাছটির গায়ে হেলান দেওয়া রয়েছে
সাইকেলখানি। কে যে এতে চাপে!
চেপে যায় কাছাকাছি কোথায়, তা জানি না!
মাঝে মাঝে সাইকেলে চাপতে ইচ্ছে করে খুব।
দূরের এক ছায়ায় ফুটে থাকে টগরফুল।
ওপরে বাসা বাঁধে মেঘেরা ।
অবিশ্বাস্য, কিন্তু এরকমই হয়।
এইরকম অবিশ্বাস্যভাবে বেঁচে-থাকা খুব ভালো।
একদিন চকচকে হাঁড়ির গায়ে ফুটে উঠবে মায়ের মুখ।
প্রশান্ত দত্ত
বাঁচা
প্রতিটি বাঁচা বেঁচে থাকে
মৃত্যুকে আলগোছে ছুঁয়ে
অপার বিস্ময়ে
বেঁচে থাকে হাতে হাত ধরে
ভর আর ভার হয়ে
বাঁচার ভেতর আছে
ভালবাসার টুকরো টুকরো কণার মোট পরিমাণ
মৃতের নিজের বলতে কিছু নেই
তার আছে শুধু
কয়েকশো গ্রাম ছাইয়ের ওজন
শিকদার ওয়ালিউজ্জামান
ধনুক ও তীর
তির ছুঁড়লে কোথায় যায়?
কত দূরত্ব আঁকা হয়ে যায় মায়ার ছলনায়
দশদিকের পারঙ্গম পাখি
সুর
তোলে
ভোরের
স্রোতে!
মগজে লাটিম ঘোরে
ইচ্ছে ওড়ে;
ছাইরঙা ঘুড়ি ওড়ে
বজরংবলী বোধের নিরেট অবকাশে…
দিন শেষে ভুল হয়ে যায় দিনের পরিধি
আলো এলে অন্ধকার লুকোয়
কীভাবে রাত্রি শুষে নেয় আলোর অহংকার?
লাটিম ঘোরে, মগজ ওড়ে
আমরা ভুলে থাকি
দু’টি ধনুকের
পূর্ণবৃত্ত হিসাব।
কাকলি মান্না
দোতারা
যে সুর রাতের স্তর ভেঙে ছুঁয়ে গেছিল জলের গভীর
ছড়িয়ে থাকা নীলে বিষ লেগেছিল
নীরবতা মুছে ফেলা সময়
এখন সুর দোতারা ছুঁতে চাইছে
দোতারা চাইছে আঙুল
আঙুলের ক্ষয় চাইছে শুশ্রূষা
শব্দ উঠছে ক্ষীণ যন্ত্রণার তরঙ্গ বেয়ে
আলসের বিল
অমিতকুমার বিশ্বাস
পর্ব-২
জন্ম
আমফানের পরের রাতে ছাদে এসেছিলাম একা। দেখি বিদ্যুতের বিস্তারিত জাল ছিঁড়ে সভ্যতা ফিরে পেয়েছে প্রাগৈতিহাসিক অন্ধকার। দেখি আকাশ-জুড়ে গোয়াল-ভাঙা মোষের পাল গাদাগাদি করে আছে। দেখি পালান থেকে ঝরে পড়ছে মৃদুমন্দ দুধ। আলসের বিলের থকথকে কালোর ভিতর ওদের ভয়ার্ত প্রশ্বাস এসে লাগে হঠাৎ। কালো তখন আরও বিকট, আরও প্রেতময়। বিলে অর্বুদ-কোটি ঝিঁঝিপোকার উল্লাস ও আর্তনাদে মনেই হয় না এই দুর্ভেদ্য আঁধারের পাশে মানুষ এসে দাঁড়িয়েছিল একদিন। গতকাল কত কী যে পাটখড়ির মতো মটমট করে ভেঙেছে খালি! ভেঙেছে ফুলো মানুষের অহংকার। ভেঙেছে ব্যাঙের মৌনতাও। কোথায় ছিল ব্যাঙগুলো এতদিন এই জলহারা খরখরে বিলে? কেনই-বা তাদের এই দীর্ঘ মৌনতা? দীর্ঘকাল যৌনসুখহীনতার পরেও ব্যাঙের এই গাম্ভীর্য আমায় মুগ্ধ করে, শান্ত করে। তবে হঠাৎ বৃষ্টি এলেই ঋষিসুলভ স্খলন! অন্ধকারের ভিতর তখন স্পষ্ট ঘৃতাচীর জোনাকশরীর। অরণিদ্বয়ের সে কী তীব্র ঘর্ষণ! অরণির ’পর চলকে পড়ে শেষে ব্যাসদেবের বীর্যরস। যজ্ঞাধারে আগুন আগুন আগুন! শুরু হয় মন্ত্রপাঠ। সৃষ্টি হয় জীবন ও মহাকাব্য। মহাবিস্ফোরণের পরই চৌদিকে এমন বিচিত্র শব্দের সমাহার শ্রুত হয়েছিল নিশ্চয়ই। তারপর ধীরে-ধীরে তাপ বিকরণ। তারপরই তো ভর-সঞ্চয়ী কণার জন্মকথা। এই তো বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের ভণিতাপর্ব। আমি সেই হাজার কোটি বছর আগের ঘর্ষণ শুনতে পাচ্ছি। সৃষ্টি শুনতে পাচ্ছি। মন্ত্র শুনতে পাচ্ছি। আমি শুনতে পাচ্ছি জন্ম ও মৃত্যুর গান। ব্রহ্মাণ্ডের শক্তিকণাই আমার পিতা, আমার মাতা। একদিন এমনই উল্লাসে তারা এই পৃথিবীতে চলে এল। এমনই উল্লাসে কণাগুলো জুড়ে গেল অন্ধকার গর্ভে। গর্ভে তাদের সঙ্গে যুক্ত হল ভরহীন প্রাণ-কণা। তারপর আমি এলাম। এইসব কণার সমষ্টি আমি, এইসব কামের সমষ্টি আমি, এইসব উল্লাসের সমষ্টি আমি, এইসব ব্যথার সমষ্টি আমি, ভান ও মিথ্যের সমষ্টি আমি। একদিন প্রাণ-কণা ঝরে যাবে টুক করে। তখন কোনও ঝড় উঠবে না জানি। পাখিরাও কাঁদবে না একটুও। কেবল আলসেরবিলের উপর দমকা হাওয়া বয়ে যাবে কিছুক্ষণ। তারপর আমি ফের পূর্বের জড়কণায় হারিয়ে যাব। কোথা দিয়ে আসে এই ভরহীন প্রাণ-কণা, কোথায়ই-বা উড়ে যায়? হয়তো এই ঝিঁঝিরাতে ব্যাঙেদের উল্লাসের ভিতর, এই নিকষ কালোর ভিতর প্রেতবোধের মতো লুকিয়ে আছে তারা অবিকল এক পুনর্জন্মের জন্য। এই-ই তো মহাবিস্ফোরণ, এই-ই তো মুছে যাওয়ার সরল ইতিহাস, এই-ই তো আবার এক সুদীর্ঘ অপেক্ষা— বিস্ফোরণের, পুনর্জন্মের। এই বুঝি ‘দেহিনোহস্মিন্ যথা দেহে কৌমারং যৌবনং জরা।/ তথা দেহান্তরপ্রাপ্তির্ধীরস্তত্র ন মুহ্যতি।।’ (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা, সাংখ্য-যোগ, শ্লোক: ১৩)