দৈনিক কবিতা আশ্রম, ১৭ আষাঢ় ১৪২৭
আবহমান বাংলা ভাষা
দৈনিক
১৭ আষাঢ় ১৪২৭
Jean-Michel Basquiat
গিরীশ গৈরিক
মৃত্যুলিপি
একজন কবি তার কবিতায় চিতার কাঠ জ্বালাতেই
হঠাৎ অনুভব হল চিতার কাঠ যেন তার শরীরের হাড়।
চিতার কাঠ যখন কবিতায় দাউ দাউ করে জ্বলছে
তখন কবিও পুড়ে যাচ্ছে,
টগবগ করে ফুটছে রক্ত ও মাংস
সেই থেকে পৃথিবীর সকল কবির
রক্ত ও মাংস থেকে পোড়া গন্ধ।
অথচ আমার রক্ত ও মাংসে পোড়া কোনও গন্ধ নেই-
যদিও আমি গল্পের নামে কবিতা লিখি—
কবিতার নামে গল্প।
একদিন আমার একটি কবিতার মাঝে
এক রমণীকে হত্যা করেছিলাম
সেই থেকে ওই রমণী আমার স্বপ্নঘরে এসে বসে থাকে
এবং তার হত্যার বিচার চায় আর
আমায় অভিশাপ দিয়ে বলে-
‘একজন খুনি কীভাবে কবি হতে পারে’।
তারপর-কচুপাতায় আমার চোখের জল
জমে জমে নদী হয়ে যায়
আর আমি হয়ে যাই সকল মৃতকবিতার ডোম।
চন্দ্রাণী গোস্বামী
নিরুদ্দেশের বিজ্ঞাপন
সন্ধান চাই বিজ্ঞাপনে যেসব নিরুদ্দিষ্ট মুখ
তাদের নিয়ে আর যাই হোক, আমার
গান মনে আসে না।
তাদের কর্ণিকা জুড়ে স্মৃতির আদিম জঙ্গল ;
গানের খাতার বুকে নিরীহ ছত্রাকের মতো
যেমন বহু গান জমে কান্নার ইয়ার দোস্ত…
তাদের জন্য গানের সব পর্যায়-ই ভেজা।
আমারও তো ফেলে আসা সব প্রেম পর্যায়ে
ভেসে থাকে ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি-কাল
এটুকুই তো নিরুদ্দেশের বিজ্ঞাপন
তুমি ফিরে এলে না-হয় বাকি গানটুকু…
রিম্পা নাথ
গড়িয়ে যাওয়ার সমীকরণ
চোখের নীচে আর একটা চোখ থাকে
অনবরত কুয়াশা তৈরী হয়, নীল রঙের
উলঙ্গরা দৌড়ায়, আমি দাঁড়িয়ে দেখি
নাভির গর্তে লুকিয়ে আছে উষ্ণপোকা
খুঁচিয়ে লাল, গড়িয়ে যাওয়ার সমীকরণ
মাথার ভিতর রক্ত, রক্তের ভিতর মাথা
আসলে গর্ভবতী নারীর কোনও পেট হয় না
খোলস ছেড়ে গমন রপ্ত করতে
একটা দেবতার প্রয়োজন
দেবতা তো মন্দির-মসজিদে থাকে না !
রাজেশ্বরী ষড়ংগী
বিষাদ স্বাক্ষর
প্রলুব্ধ বাতাস এসে দাঁড়িয়েছে কুঞ্জের বাঁকে।
মায়াদিন জানে মাটি তো বিষাদশূন্য
ক্ষত কিছু পুঁতে রাখে দেহ। অনুসরণের দায়,
ছুঁয়ে দেখি জমে আছে স্তূপের পালক
স্থিতি ও গুঞ্জনের পাশে
একা একা নাভিশূন্য জলে
পাখিটি দাঁড়ায়, পাখি উড়ে যায়-
পাখিদের বিষাদ স্বাক্ষর।
আলসের বিল
অমিতকুমার বিশ্বাস
পর্ব-৪
লেখক
লেখক নই আমি, বরং গড়পড়তা গদ্যপ্রয়াসী বলা যায়। বাজারে মাছ টিপে টিপে দেখি, আঁশের নীচে নখখুর চালাই সংগোপনে, ছেঁড়া নোট গুঁজে দিই ফিটফাটের ভিতর, উড়ে এসে ফিরে এসে বউকে বলি ‘হুররে’! লেখক নই আমি, বরং গদ্যপ্রয়াসী। লেখক ভয়ংকর ভারী শব্দ, শুনলেই মাথায় বিস্ফোরণ হয়। মহাবিস্ফোরণের পর ভরহীন শক্তিকণারা অনন্ত পথ ছোটে— তাপ দেয়, আলো দেয়, ব্রহ্মনাদ দেয়। ব্রহ্মাণ্ডের তড়িৎচুম্বকীয় ক্ষেত্রে গঙ্গা নাচে। নাচতে-নাচতে উড়ে যায় তাঁর আবরণবস্ত্রখানি। চোখ নামায় দেবতারা। কিন্তু রক্তমাংসের মহাভিষ চেয়ে থাকে ফ্যালফ্যালিয়ে। অগত্যা ব্রহ্মাণ্ডে পুনঃবিস্ফোরণ! এদিকে বশিষ্ঠ-বিষ্ফোরণে অষ্টবসুও খান খান। তাপ পরিমিত হলে ভরহীন কথা কিংবা কণাদের শ্রমজীবী পা ভারী হয়ে আসে। এইসব অশরীরী কণা তখন শরীর পায়। এই কবিকল্প লিখতে গেলে কামান্ধ হস্তির একটু থমকানো প্রয়োজন। চপলতা লঘু করে দেয় বোধ, তখন বধির হয়ে আসে স্পর্শ। তাই হস্তিনীমোহ ভুলে বৃক্ষছায়ায় দাঁড়িয়ে বিড়বিড় করা প্রয়োজন কিছুক্ষণ। এভাবে ঘুম আসে, স্বপ্ন আসে, ধ্যান আসে। এভাবে হস্তি থেকে সিংহ, সিংহ থেকে হরিণ, হরিণ থেকে খরগোশ, এমনকি খরগোশ থেকে সে কিনা ফড়িং হয়ে যায়। তারপর ফড়িং উড়তে-উড়তে আবার সেই ভরহীণ কণা। আলোককণা। লেখক হবার জন্য শুদ্ধ ঝাঁপ দেওয়া প্রয়োজন ছিল আমার। ব্যর্থ হবার জন্যও তো একটা লম্বা ঝাঁপ চাই। লেখক নই, গদ্যপ্রয়াসী আমি— তাও কিনা ‘অর্ধেক’! শূন্যমেধা থেকে যখন আলসের বিলের দিকে চেয়ে থাকি, শ্বেতভালুকের রোমের মতো নরম ঘাস শুয়ে থাকে চৌদিকে, তার উপর কুমারী বাতাস বয়ে যায় অবিশ্রান্ত। সেই হাওয়ার সেই নারীর আঙুল ছুঁয়ে যায় এ-বুক। দোতারা বেজে ওঠে। বাজনায় মাথাটা তখন লেখায় লেখায় ঝনঝন করে খালি। চোতমাসের বিলে হাঁটুজলে ছাবাল-গাবালদের দেখাদেখি গাবানে নামি। পেড়ির ভিতর হাত চালাই, পা চালাই। আঙুলের ফাঁকে চ্যাং-মাছ বাঁধে। ফসকে যায়। আবার গাবাই। এইসব লিখতে গেলে চ্যাঙের মতোই পিছলে যায় সবই। কামান্ধ হাতিটা ছোটে অরণ্যপথ বরাবর। তারপর সে কী দাঁতালযুদ্ধ! শেষে জয় কিংবা পরাজয়। মাত্র তেরো সেকেন্ডের তৃপ্তি। রেতপাত। রক্তপাত। আর তারই জন্য কিনা ব্রহ্মাণ্ডে উন্মাদ কণাস্রোত! রেতপাতের পর নিজের ভিতর হঠাৎ-ই তৈরি হয় ঋষিসুলভ বোধ। এই সময় নিজের মুখটা আয়নার দেখতে ইচ্ছে করে খুব। মুখটা তখন বড্ড করুণ লাগে, অসহায় লাগে। ঠিক তখনই লিখে রাখা দরকার এই অভিব্যক্তি। সিনেমার চ্যাপলিন স্নানকালে ঝাঁপ দিতে গিয়ে ভ্রমের সঙ্গে ধাক্কা খেয়েছিল সেবার। হাঁটুর মালাইচাকি খুলে যাবার উপক্রম। সেটা যে নামেই ছিল ‘তালপুকুর’! সিনেমার এ দৃশ্য ধ্রুপদী। আজকাল স্কুলে স্কুলে হাঁটুজল ঢুঁকে যায়। জেলকুঠুরি-সদৃশ আবাসনে বাচ্চারা কাঁদলে লজেন্স এগিয়ে দেয় কর্তৃপক্ষ, তবু আদর দেয় না কেউ। বাবা-মা বুঝে যান, যন্ত্রসভ্যতায় মানানসই গড়ে উঠতে গেলে কতটা পেট্রল ঢালতে হয় স্কুটিতে। হাঁটুজলে সন্তানকে ঢুকিয়ে বাইরে অপেক্ষা করেন তারা। হাঁটুজলে ঝাঁপ দিতে গিয়ে তাদের মালাইচাকিতে লাগে চার্লি-সিনেমার মতো। তারপর ভেলোরে রিপ্লেসমেন্ট। সবাই একই শেখে, একই জামা পরে, পারলে চুল-দাঁড়ি-গোঁফও এক। বাংলাদেশ থেকে সেবার চোরাই পথে বনগ্রামে আসা ছেলেটা জাল পাসপোর্ট নিয়ে স্পেনে ধরা পড়ে তিনমাস জেল খায়! সেখানেও হাঁটুজল। একই পোশাক, একই গান, একই চুলের ছাঁট। সেখানেও স্যারেরা-ম্যামেরা আসেন সময়মতো, নামডাকেন—ওয়ান, টু, থ্রি…। সেখানেও ঝাঁপ দিতে গিয়ে হাঁটু ভেঙে ‘দ’ হয়ে যায় তারা! আমি লেখক নই। আমি মরা মাছ টেপা কা-পুরুষ। সংসার আমায় টানে। লেখা আমায় টানে। আমি কোথাও ঝাঁপাতে পারি না। ছিঁড়ে যাই, ছিঁড়ে যাই ক্রমশ! শরীর ভরশূন্য হয়। তখন দমকা হাওয়াও লাগে না উড়তে। শেষে নিজেকে নিজেই ধরেবেঁধে ডেনড্রাইট দিয়ে জুড়ে ঘরে নিয়ে আসি। ঘরের উপর বৃষ্টি নামে। ছাদ ফুটো ফুটো হয়ে সে-বৃষ্টি মেঝেতে এসে পড়ে। গায়ে লাগে। বৃষ্টি নয়, এ তো সূচ! এ-শরীর ছ্যাঁদা-চালুনি হয়ে যায় মুহূর্তেই। শরীর থেকে রক্ত নয়, বরং জল বেরোয় জলঝাঁঝরির মতো। তারপর পাইপ বেয়ে নর্দমায়। রক্তহীন শরীরটা দাঁড়িয়ে থাকে তবু। পেছনের বাল্বের আলো শরীর ভেদ করে দেয়ালে পড়ে। ছানিপড়া দেয়ালে কত কী লেখা— কত শোক, কত শপথ! এ দেয়াল না দিনলিপি? আলোছায়ায় স্পষ্ট পড়া যায় না কিছুই। দেয়ালে শরীর-ভেদ-করা আলোকবিন্দুগুলো প্যাস্টেল-রং দিয়ে ভরাট করি। এই তো আমার লেখা— একদম রঙে ফেলা, ছকে ফেলা। এইসব দপ্তরে জমা দিয়ে দু-হাঁটু চেপে অপেক্ষায় থাকি বারান্দায়। দেখি বউ আমায় দেখেই খিলখিলিয়ে হাসে। আমার অসহ্য লাগে। মনে হয় আবার ছিঁড়ে কুটিকুটি হয়ে যাব। কিন্তু কী আশ্চর্য, হঠাৎ আমারও হাসি পায় বেদম! আমিও খিলখিলিয়ে হাসি। দেখি বারান্দার দেয়াল-টিভি থেকে চার্লি চ্যাপলিন আলসের বিলে ঝাঁপ দিল এবার। দুজনের হাসি কিছুতেই থামে না আর!