দৈনিক কবিতা আশ্রম, ১৮ আষাঢ় ১৪২৭
আবহমান বাংলা ভাষা
দৈনিক
১৮ আষাঢ় ১৪২৭
Pixabay থেকে সংগৃহীত
অশোক তরু
পদ-পঞ্চদশী
কবিতা-শরীর থেকে ঝরে গেল সকল উপমা
শরীর গোপন নয় গোপনীয়তা একটা ছল
জন্ম মাত্র খুলে যায় পাঁচটা জানালা একসাথে
উন্মুক্ত জানালা, সব ঢুকে পড়ে ঘরের ভেতর
তছনছ খেলা চলে আছড়ে আছড়ে পড়ে ঢেউ
প্রকাশের ভাষাটুকু ফেটে পড়ে যন্ত্রণা কাতর
যেটুকু প্রকাশ পায় জন্মবোবা মানুষের ভাষা
প্রেমের উক্তির ভাষা কেন যেন নারীঅঙ্গসুখী
খোলস ছাড়িয়ে দেখি রম্ভাদীপ্ত রতিসুখসারি
চুয়া জলে ভর্তি ফের শেষ নেই হেসে ওঠে, রতি
একটা শরীরে যতদিন প্রেম আর কাম থাকে…
চোখের বিস্ময় মনের শরীরে এসে ধরা দেয়
নীহারিকা স্পাতনীল আগুনের শিখা জ্বলে ওঠে
যেভাবে দেখি না কেন আদিম নগ্নতা চিরশ্লীল
আকাঙ্ক্ষার আবরণে কালপুরুষের চোখে জল
শায়ক মুখোপাধ্যায়
এই শহর
এই শহরে কোনওভাবেই থাকতে পারবে না,
এই শহর তোমার জন্য নয়।
বাইরের সবুজ ছেড়ে, খোলা আকাশ ফেলে দিয়ে,
এই শহর ভীষণরকমের ধুলোবালিময়।
কোনও পরিচিত প্রিয় মুখের দেখা নেই।
বন্ধু-বান্ধব চোখের বাইরে, অনেকদূরে আত্মীয়স্বজন।
এই শহর তোমার জন্য নয়,
এই শহরে কোনওভাবেই আর টিকবে না তোমার মন।
সুকৃতি
সাপের প্রেমিক
কে জানে, আমার রক্তে কোন অসুরের
নুন আর দেবতার লালার মিশেল করে ভর!
সব ঘোর ভেঙে যায়, সুরহীন তালের আঘাতে
বারান্দা অবধি এসে দাঁড়িয়ে পড়েছে একা থম।
মন তাই পারদ বলের মতো ভারি,
মন তাই আতশ কাচের মতো প্রেমের ভিখারি।
যদিও আপেল জানে তার প্রতি কোনও
মোহ নেই, প্রেম নেই, ভালবাসা নেই…
এমন সময় যদি বিছানায় উঠে আসে জ্বর,
শীতের বিরুদ্ধে তবে খেতে হয় পুরোটা আপেল!
ফলে দূরে, দূরে থাকো ভালরা সবাই…
আমি আজও সেই এক বুনোটে আদম।
এমন বসন্ত দিনে কোকিলের ডাক শুধু নয়
আপেলের ঘোরে আরও ছুঁয়েছি পালক
তাদের ঘ্রাণের আলো মেখেছি শরীরে
তবু, আমি, আজও সেই সাপের প্রেমিক, শয়তান…
মন্দিরা এষ
প্রতিভাস
জঙ্গলে বা সমুদ্রে হারিয়ে যাওয়া কেউ বা কেউ না হতে গিয়ে, ক্যামেরার লেন্স বদলেছি বহুবার।
আস্তিনে মুছে দিয়ে ঘর, পকেটে আলুথালু জানালা গুঁজে হন্তদন্ত আমি, ঠায় দাঁড়িয়ে রই…
তোমরা জাহাজের গল্প বলতে বলতে যখন আমার সামনে দিয়ে কোনও বাস হয়ে যাও, আমি তখনও ঠায় দাঁড়িয়ে।
পায়ের বৃদ্ধাঙুলে আকাশ গুলতে গুলতে ভাবি একটা তালগাছ হই; প্রবল ঝড়ের কথা ভেবে হলেও একটা ধনেশ আশ্রয় খুঁজুক বুকে।
যেসব ভাঙা পুল ধরে রেললাইন পার হয় ট্রেন কোলে করে—ভাবি, বিকাল হলে নদীকে নিয়ে তাদের কাছে যাই; সন্ধ্যা-অব্দি রেডিও শুনতে শুনতে তাস পেটাই।
আমার মায়ের শিশির রোগ। তোমাদের কারও রোদ জানা থাকলে জানিও; আর নয়তো মায়েতে-ছায়েতে মাথায় কিছুটা শিশির লেগে থাক।
এখানে অসময়ে বৃষ্টি ঝরছে তো ঝরছেই, এমন যে নদীও ছাতা মাথায়।
হাত ভিজল, আঙুল কাঁপছে থরথর অথচ কড়কড়ে শুকনো চোখদ্বয়।
আর আমি এখনও ঠায় দাঁড়িয়ে…
আলসের বিল
অমিতকুমার বিশ্বাস
পর্ব-৫
ঢেঁকি
আটের দশকের গ্রামকথা। আমাদের বাঁশঝাড়ের নৈর্ঋত কোণে গোবিন্দদের ভিটেবাড়ি। মাঝে ইটের পথ যদিও। গোরুরগাড়ির চাকায় সে-পথের দু-ধার বসে গিয়ে মাঝখানটায় ঢিবি-মতো হয়ে গেছে। পথটা সামনেই শেষ। পাড়ার দু-একটা সাইকেল-রিকশাভ্যান আর গোবিন্দদের গোরুরগাড়ি ছাড়া এ-পথে তেমন কিছুই চলে না তখন। ঢিবিটা তাই দুব্বোঘাসে ছেয়ে থাকে আবছর। ওই নৈর্ঋত কোণের বুনোছায়াতলে— পথপাশে— খড়ে-ছাওয়া একটা ঢেঁকিশাল ছিল গোবিন্দদের। ছিল সেথা মাটির মেঝে, পাটখড়ির বেড়া। বেড়ার ফাঁক দিয়ে রোদ এসে ভাসিয়ে যায় ছোট্ট ঘরখানি। ঢেউ ওঠে। তালে-তালে পাড় দিলে বাবলাকাঠের প্রাচীন ঢেঁকিটা জিওলকাঠের চাপানের দু-কাঁধে দু-হাত রেখে মাথাটা তোলে আর নামায়। মাথার মনাইটা গড়ের ভিতর পড়ে আর ওঠে, ওঠে আর পড়ে— আর এই প্রতিটি ওঠা-নামার সময় ঢেঁকি বলে, ‘ঢেঁকি, তুই কার? ঢেউ, তুই কার?’ এই ডাকে পাড়া মেতে ওঠে সারাটা পৌষ ধরে।
সাদা থানে থুত্থুড়ে গোবিন্দর ঠাকুমাকে দেখেছি আমি। আমার ঠাকুমারই বয়সী। ছয়ের দশকে পানাগড় রিফিউজি ক্যাম্প থেকে এসে ঢেঁকিশাল গড়ে তোলে এখানে। বাংলাদেশে দুজনের শ্বশুরবাড়িই পাশাপাশি। নতুন বউরা সই পাতায় এসে। তারপর তো যৌবন চলে যায়, পিষে যায় দেশভাগের মনাইতলে। লোহার চুরনের নীচে চূর্ণ-বিচূর্ণ হতে থাকে উদ্বাস্তু জীবন। গড়ের ভিতর কাতারে কাতারে মানুষ। চলকে চাইরে বেরোলে ঘাড় ধরে গড়ের ভিতর ছুঁড়ে দেয় কারা?
ঠাকুরমা ঢেঁকিতে পাড় দেয়, ধান ভানে, গান গায়, ঢেঁকিও গায়, ‘ঢেঁকি, তুই কার? ঢেউ, তুই কার?’ গোবিন্দর ঠাকুরমা গড় থেকে ধান সরায়, দেশভাগের গল্প করে, ক্যাম্পের গল্প করে। একের-পর-এক সন্তান অনাহারে, রোগভোগে মরে যায়। কথা ওঠে, কান্নাও ওঠে। ‘ঢেঁকি, তুই কার? ঢেউ, তুই কার?’ আলসের বিলে জল বাড়ে। ডুবে যায় বিলপাড়। ঢেউ ওঠে। পাড়া খালি হয়ে যায়। পাড়াজন আশ্রয় নেয় দূরের ট্যাঁকে। জল সরে গেলে ঢেউ সরে গেলে ফিরে আসে ঘরে। আবার জীবন শুরু হয়। গল্প শুরু হয়। ঠাকুরমা আবার ঢেঁকিতে পাড় দেয়। কথার পিঠে কথা ওঠে— অভাবের কথা ওঠে, খিদের কথা ওঠে— আর ঢেঁকি কেবলই গেয়ে যায়, ‘ঢেঁকি, তুই কার? ঢেউ, তুই কার?’ আলসের বিল থেকে বাতাস বয়। জিওলকাঠের চাপান থেকে কচি ডাল বেরোয়।
একদিন ঠাকুরমা পেটে হাত দিয়ে শুয়ে পড়ে, বলে, ‘পেট শুলোয়’। আর-একদিন ঢেঁকির উপরই ঢলে পড়ে। ‘ও রাঙা বউ?’ সই শুধোয়। ঠাকুমার মুখে ফেনা। ভাব খারাপ দেখে চিৎকার করে, ‘ওলো কিডা কুথায় আছিস রে তুরা!’ ঠাকুরমাকে হাসপাতালে নেওয়া হলে দু-দিন থাকে, তারপর স্থির-চোখে তাকিয়ে থাকে হাসপাতালের দেয়ালে। দেয়ালে কে যেন লিখে রেখেছিল, ‘ঢেঁকি, তুই কার? ঢেউ, তুই কার?’ অভাবে ঠাকুরদা ঠাকুরমাকে ডোমের হাতে লিখে দিয়ে ঘরে ফিরে এলে ঠাকুরমার সই ঢেঁকির মতো আছড়ে পড়ে। অসহায় ঠাকুরদা মাথায় হাত দিয়ে পড়ে যায় মাটিতে। ফোঁপায়। রিফিউজি পাড়া থেকে টাকা তোলে সই। ঠাকুরমা ঘরে ফেরে। পায়ে নতুন আলতা পরে গোটা পাড়ার কাঁধে চড়ে চলে যায় চিরতরে। পেছনে ঢেঁকির মতো পাছাড় খায় সই, ‘ঢেঁকি, তুই কার? ঢেউ, তুই কার?’
ঠাকুরমা যায়, আমার মা আসে। ঢেঁকিতে ধান ভানার দিনকাল চলে গেছে ততদিনে। কেবলই পিঠেপুলির জন্য চাল কোটা হয়। তাই পৌষ এলেই ঢেঁকিশাল জমে ওঠে। ঢেঁকি থেকে গান ওঠে, ‘ঢেঁকি, তুই কার? ঢেউ, তুই কার?’ বছরের বাকিটা সময় ঢেঁকি পড়ে থাকে একা। আড়ার দড়িতে ঝুলে থেকে মনাই। জিওলের চাপান থেকে কচি ডাল বেরোয়, পাতা গজায়। খসে-পড়া পাটখড়ির বেড়া ভেদ করে বাইরে মুখ বাড়ায় ডালগুলো। বর্ষায় মেঝের মাটি ফুলে ওঠে। মেঠোইঁদুর ঘরে ঢোকে। গর্ত খোঁড়ে। ইঁদুরের পেছনে সাপ ঢোকে। কেউ ঢেঁকিটার খোঁজ নেয় না। সে অপেক্ষা করে কবে পৌষ আসবে।
পৌষ আসে। লেপেপুঁছে নতুন বেড়া আর চালে সেজে ওঠে ঢেঁকিশাল। নতুন বউ আসে। পুরোনো বউ আসে। পাড়ার কাকিমা-জেঠিমা আসে। অবিবাহিত মেয়েরা আসে। গল্প হয়। জীবনের নানান স্বাদের গল্প।
বড়মাসির বড়মেয়ে শিখাদি কাঁঠালিয়া থেকে আমাদের বাড়ি বেড়াতে আসে। এক পৌষদিন মা শিখাদিকে সঙ্গে করে ঢেঁকিশালে ঢোকে। দিদি ঢেঁকিতে পাড় দেয়। মা গড় সামলায়। এমন সময় ঢেঁকিশালে বুধো ঢোকে। কালুপুরের সুঠাম কালো যুবক বুধো বিশ্বাস। কালুপুর থেকে খালিপায়ে আলসের বিল হেঁটে বিলপাড়ের এই আত্মীয় বাড়ি হাজির। ঢেঁকি বলে, ‘ঢেঁকি, তুই কার? ঢেউ, তুই কার?’ এর কিছুদিন পর শিখাদি আলসের বিল পার হয়ে কালুপুর চলে যায়। আর আসে না। মা কাঁদে। মাসি কাঁদে। এদিকে পৌষ যায়। ঢেঁকিশাল আবার পড়ে থাকে।
গোবিন্দর ঠাকুরমা চলে যাবার পর ঢেঁকিশাল পড়েই থাকে— ভেঙে পড়ে, উঠে যায়। ঢেঁকিটা পড়ে থাকে উঠোনের একপাশে। ঝড়জলে মনাই খসে পড়ে। গোবিন্দ-গৌরাঙ্গ কুড়োল দিয়ে ফালি ফালি করে। শব্দ হয়, ‘ঢেঁকি, তুই কার? ঢেউ, তুই কার?’ ঢেঁকি এবার উনুনে যাবে, তারপর স্বর্গে।
গভীর জ্যোৎস্নারাতে ছাদে এসে দাঁড়ালে দেখি আকাশ থেকে ঢেঁকিটা নেমে আসে গোবিন্দদের বাড়ি। পাড়া ছেয়ে যায় গাছপালায়। গোরুরগাড়ির চাকায় পথের দু-ধার বসে যায়। দুব্বোঘাসে ভরে যায় পথ। জ্যোৎস্নার সঙ্গে খেলা করে বেড়াল। এমনকি ছায়ার লেজ পাড়িয়ে ধরে আচমকা। ঢেঁকিপাড়ের শব্দ হয়, ‘ঢেঁকি, তুই কার? ঢেউ, তুই কার?’ সারারাত দুই সই মিলে গল্প করে খুব। আলসের বিল থেকে হুহু বাতাস আসে।