আবহমান বাংলা ভাষা

দৈনিক

১ আষাঢ় ১৪২৭

ছবি: চন্দন মিশ্র

ভজন দত্ত

অক্ষর আত্মা

অক্ষরের আত্মা ধরে টানি, জল উঠে আসে, 

অন্তরের আগুন নেভে না।

 

অক্ষরের হাতে লাঠি ধরিয়ে বলি, ‘ওঠো, হাঁটো’

 

জীবনলাঠির বাড়িতে অজানা অক্ষর গুরু

হৃদয়ের ক্ষতে এসে বসে। 

 

আলোদৃষ্টিতে দেখি এ-জীবন সৎশিষ্য হয়ে

        কোনও নির্দিষ্ট পথ ধরে হাঁটল না…

 

দেবাশিস বিশ্বাস

ঐরাবতের কাহিনী

ছাগল-১

 

এক যুবকের ছাগল হারিয়ে গেছে।

‘ছাগল, ছাগল’— ব’লে আকাশ ফাটিয়ে তুলেছে।

 যুবক গাছকে বলছে ছাগল,

পাখিকে বলছে ছাগল, গরুকে বলছে ছাগল।

 

এক যুবকের ছাগল হারিয়ে গেছে

তাই সে পৃথিবীকেই গালি দিচ্ছে বারবার 

 

যে পথে যায়নি যুবক সেই পথে

 ফেরত এসেছে ছাগল

যুবক আত্মহারা হয়ে ছাগলের দু’টো চোখ

 উপড়ে নেয়

 

 

ছাগল-২

 

অন্ধত্ব সরু সুতোর উৎসব।

ছাগলের পেটে সেই সুতার বাণ্ডিল।

 মুলো শাক, রাঙা আলু, ভেন্ডির বীজ।

ছাগল উদার হয়েই খেয়েছিল এসব।

পৃথিবীর মূলতম স্বেত।

 

 

 

 

ছাগল-৩

 

ভুল করেই যুবক কচু গাছ খুঁটি করেছে।

 যুবক ভেবেছিল ছাগল, ছাগলই তো।

কচু পাতা খেয়েই মরুক।

মিউকাস চিঁড়ে যাক জ্বলুনিতে।

ছাগল ছাগলের মতো খবরের কাগজ খুঁজে চলে।

সে অনুভব করে গাছ সংরক্ষণ।

 তাই খবরের কাগজের হেডলাইন—

উপহেডলাইন খেয়ে খেয়ে শেষে

 শিশুদের কাঁচা হাতে আঁকা সবুজ মোম রঙ খায়।

তারপর যুবক যায়নি যে পথে,

সেই পথে ছাগল ফেরত আসে।

 

 

ছাগল-৪

 

তিলক্ষেতে শুঁয়োপোকার বাসা।

 যৌনমিলনের জন্য প্রচুর পাতা খেতে হয়।

 যুবকের ছাগল তিলপাতা খায় না।

সে তিলের গোঁড়ায় ছড়ানো কী যে ঘাস খায়।

 দু-একটা প্রজাপতি থাকে। শিঙে বসে।

ছাগলটি অপলক চাবাতে চাবাতে কখন

উদাস হয়ে পড়ে, যেন তার জলের প্রয়োজন।

 বৃষ্টি পড়ুক এমনই তার চাওয়া। যুবক

ছাগলের গলার দড়ি টেনে নিয়ে যাচ্ছে চূড়ায়    

 

অনুপম দত্ত

নিরাময়

অ্যাডেনিয়ামে দুটো নতুন পাতা 

এখনও ফুলের দিন দূরে

ফুল ছুঁয়ে পাখি উড়ে যাবে 

সে-সবও দেখব কোনো দিন

এখন তো সংবৃত আছ দূর দেশে

মুকুলেও তৃষ্ণা জেগে আছে

ঘুম ভেঙে রোজ দেখি, ন্যাড়া জলছাদে

ডেকে যায় কর্কশ কাক 

এসব নিয়েই বেঁচে থাকা

আকাশের মতো একা

এখনও ফুলের দিন দূরে

কেবলই জানতে ইচ্ছে করে

আমার  সমস্ত নিরাময়ের পাশে

তুমি অসুখ হয়ে এসে বসবে কিনা

 

 

মোস্তফা হামেদী

মর্ম

ছোট্ট রূহটা ঘুমায়

 

শাকের আঁটির মতো শুয়ে আছে

কচি পাতাগুলো নড়ছে

 

বহুদূর পথ ঘুরে এসেছে এই

দুনিয়াবাজারে

আমার কোলের কিনারায়

 

তার ঈষদুষ্ণ শরীর

আনকোরা ইশারা

খেলে যাচ্ছে তন্ত্রে

 

পাশে শুয়ে দেখি

নরম ডাঁটার মতো আঙুল

টিপে দেখে আলো

বায়ুর চলাচল বুঝে নেয়

 

কান্না—চিরাচরিত ভাষা

যৎসামান্য আবেগ

বুনে চলে রাত্রিভর

 

নীরব কোনো নদীর কূলে

এক উর্বর পিতার বুক

নরম শস্যের লাস্যে মুখর

 

 

বারো পর্বের ধারাবাহিক

পাগলাঝোরা

জয়ন্ত দে

পর্ব-১

আড্ডা

নিছক আড্ডা কি শেষ হয়ে যাচ্ছে? নিছক বললাম কেন? মাঝেমাঝে যে-কোনও আড্ডায় বসে মনে হয়, এ-আড্ডা নিছক নয়। ‘ছক’-এর আড্ডা। 

এখানে অকপট হওয়া বারণ। অকপট হলে পরে ক্যাশ কিংবা খিল্লি হতে হবে। 

আবার প্রশংসা করলে কেউ-না-কেউ টিপে দেয়, এত প্রশংসা করিস না। ফিসফিস করে সে কানের সামনে বসে মনে করিয়ে দেয়, আমি একটা ‘হনু’। আবার কেউ বলে, ‘ওর সর্বনাশ করে দিলি, এত গ্যাস, সহ্য হবে?’

এমনিতে আমি চুপ করে থাকি। সবার সঙ্গে সহজ হতে পারি না। আবার যেখানে সহজ হই সেখানে তরল হয়ে যাই। তাই কথা বলতে ভয় করে, মনে হয়, আমি বুঝি ব্যালেন্স হারাচ্ছি।

চেনা অনেক, কিন্তু বন্ধু হাতে গোনা। আড্ডা আরও কম। পাড়ার-আড্ডায় বছরের পর বছর টিভি কী বলল…। তাদের মাঝে কথার নটেগাছটি ফুরিয়ে গেলেও সেখানেই চুপ করে বসে থাকি। গ্লাসের টুংটাং শুনি। কফি হাউসে মাঝেমধ্যে যাই, কোথাও যাওয়ার নেই বলে। 

আসলে বুঝি, কথার মাঝে হারাতে চাই, যেখানে আড্ডার সুতো মাঝআকাশে ভোঁকাট্টা হতে পারে, যেখানে আড্ডার রাস্তা এতোলবেতোল হতে পারে। যেখানে আড্ডা শেষ, মানে শেষ। তারপর নিজ নিকেতনে। কিছু শিখি বা না-শিখি, কিছু বা না-পাই। যে কুড়াবে সে কুড়াক, যে ছুঁড়বে সে ছুঁড়ুক, যে ফেলবে সে ফেলুক। কিন্তু কোনও ছক নেই, নিছক! হতাশ, ক্লান্তি বা অপমান বয়ে আনতে হবে না আলটাকরায়। বা কারো জন্য কেউ আলাদা চেয়ার এগিয়ে দেবে না। আড্ডায় কোনও রিং মাস্টার থাকবে না। সব কিছু আপনগতিতে। পাগলাঝোরা! যে যেদিকে পারুক বয়ে যাক। বন্ধু-র হাত সেখানে না থাক, কিন্তু বন্ধুর চাটও সেখানে যেন না পাই। চেনা হলে ভাল, না হলেও ক্ষতিই বা কী? না মানে যেমন না। আড্ডার শেষ মানে, শেষ। তারপর কোনও ছক নেই। নিছকই আড্ডা চাই।

নাহলে চারদিক বড় কুয়ো-কুয়ো মনে হয়। কুয়াশায় বাঁচি বা না- বাঁচি, ধোঁয়াশায় থাকব না।

মাঝে মাঝে বলতে ইচ্ছে করে,

ছাই ঘেঁটে দেখে নিও পাপ ছিল কি না!

বিগত দিনগুলি পড়ুন