আবহমান বাংলা ভাষা

দৈনিক

১ শ্রাবণ ১৪২৭

ছবি: সংগৃহীত

নির্মল হালদার

কবিতা

একটা পাখি মরলে

একশো আকাশ মরে যায়।

একটা মাছ মরলে

থমকে দাঁড়ায় নদী।

একটা নদী মরলে

শুকিয়ে যায় সমুদ্র।

একটা গাছ মরলে

কমে যায় বৃষ্টির ফোঁটা।

 

মাটি কমে গেলে,

মানুষ ক্ষয় হয়ে যায়।

 

 

শ্রীজাতা কংসবণিক

মায়া

বেদনার ফল আর কত খেতে দেবে!

বড় বেশি খিদে , তাই, লোভ বেড়ে গেছে 

এদেশে শান্তির গায়ে চাক চাক ক্ষত

রক্ত মাখা ভ্রূণ শিশু নদীতে মিশেছে। 

 

যে-সব মায়েরা তার শিশুটিকে নিজে

মেরে ফেলে ঝেড়ে নেয় দেহজ শরীর

যে-সব পিতারা শুধু লালসার জিভে 

খেয়ে নেয় বীর্যজাত রক্ত মাংস ক্ষীর, 

 

হন্তারক উচ্চাসনে অঙ্গুলি হেলিয়ে

আমাকে নির্দেশ করে, টাকা পণ্য ভোট  

চারিপাশে বহুমুখ ঘিরে ঘিরে নাচে 

ঝিম তালে বয়ে যায় অনির্দিষ্ট স্রোত। 

 

এ টান আগুন না কি লাভার তরল 

বুঝে নিতে নেশা হয়, পালাব কোথায়!

সভ্যতার শেষ দিকে ঘন নিম্নচাপ

জানি না কোথার হাওয়া কোনদিকে যায়!

 

বুঝেছি অনেক ক্ষয় অনেক বিষাদ 

ঝরে যাবে বৃষ্টিজল দীর্ঘ হবে ছায়া

সহবাস শিখে যাক বৃক্ষ এবং জড়  

সন্ধেরাতে জেগে ওঠে অলিখিত মায়া।

 

শিমুল সালাহ্উদ্দিন

রনি ভাইয়ের ছাদ

রনি ভাইয়ের ছাদে মোদের হঠাৎ মোলাকাত  

আচম্বিতে তাহার বুকে লাগল আমার হাত

তাকাল সে আমার চোখে কেমন জানি ঘোর

ঘোরের ভেতর জোর থাকে কি মনের ভেতর জোর

 

জোর ছিল না প্রবাল ঠোঁটে আলতো ছিল ঠোঁট

আগ্রাসী তার হস্ত তখন বুকপশমে নখরাঘাত চোট

উহু আহা উম্ম ফুটেছে তখন তাহার ওষ্ঠ এবং নাসায়

মাঝে মধ্যে মুখ তুলে সে চোখেও আমার তাকায়

 

তাকায় ভীষণ গভীর এত ডুবেই মরি চোখে

কিন্তু ডোবার জায়গা ভিন্ন জানায় এবার মুখে

দুই দশকের কবি আমি ভিন্ন আমার আরাধ্য

ছন্দ তখন তাল খুঁজে পায় ডিলিট করে, গদ্য

 

তালে তালে তবলা বাজে তখন দুইটি দেহে

ঢেউ উঠেছে প্রবল তোড়ে কামে এবং স্নেহে

কামগন্ধা ইথারমালায় রনি ভাইয়ের ছাদ

মোদের ডাকে ইস্কাটনে ভোরকে করে রাত

 

বিশ্বজিৎ দাস

আনন্দশোক

প্রিয় সম্বন্ধগুলো ছিঁড়ে যাচ্ছে

সকাল সন্তানের মতো যন্ত্রণায়

 

সেই জল কি দেহ?

 

ছিঁড়ে যাচ্ছে মাংস শরীর

জ্যোৎস্নার একলায়…

 

এভাবে কত কাঁটা এল

সাজিয়ে দেবে আনন্দশোক

 

ব্যথা কি কোনো ছায়ামাত্র?

শ্মশানের আকাশ আমার বড় প্রিয়…

বারো পর্বের ধারাবাহিক

ঈশ্বরফুল

বিভাস রায়চৌধুরী

পর্ব-৭

ওই আর কী

কবি সুশীল পাঁজা সত্তরের কবি। কফি হাউসে তাঁকে দেখেছি অনেক বার। এখনও মাঝে মাঝে দেখা হয়। ভাঙাচোরা শরীর নিয়ে ঘুরে বেড়ান। আমাকে বললেন, তাঁর কবিতা সংগ্রহ প্রকাশিত হবে। বললাম, এ তো খুশির খবর। 

একটু নীরব থেকে বললেন, “ওই আর কী।”

সুশীল পাঁজা অদ্ভুত এক কবি। কৃষক-মজুরের শোষণমুক্তির লড়াইয়ের বাম আদর্শে বিশ্বাস করেন। নিজেও ছিলেন জুট মিলের কর্মী। মিল লক‌আউটের কষ্টের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা আছে। সৎ, আদর্শবান, আত্মমর্যাদাজ্ঞান সম্পন্ন সুশীল পাঁজার মতো বামপন্থী কবি আমি দেখিনি, যিনি মানুষের কষ্টের পাশে দাঁড়াতে সারা বাংলা ছুটে বেরিয়েছেন। এবং নেতা বা বিশিষ্ট ব্যক্তি হিসেবে নয়, সাধারণ ব্যথিত মানুষ হয়ে। আদিবাসী গ্রামে যেমন, দূর বন্যার্ত জেলায় তেমন। বারাসতে বন্ধুর লাশের, বর্ধমানে কুখ্যাত হত্যা উৎসবের নিকটে তিনি ছুটে গিয়েছেন। সরকারি বামেদের হাতে মরিচঝাঁপির নিঃস্ব মানুষেরা অত্যাচারিত হলে তিনি প্রতিবাদ করেছেন, লাঞ্ছিত হয়েছেন। এ সব কিছু স্পষ্ট প্রতিবেদনের মতো এসেছে তাঁর কবিতায়। কখনো বদলাননি তিনি। নন্দীগ্রাম পরবর্তী আন্দোলনেও সাধারণ হয়ে সাধারণের মধ্যে মিশে অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছেন। সুশীল পাঁজার কবিতা একজন প্রতিবাদী জেদি মাটির মানুষের কবিতা। লিখেছেন, “আমার কবিতা, তুচ্ছ কবিতা, প্রথার বিরুদ্ধে”।

তাঁর কবিতা সংগ্রহ ধরে রাখছে প্রায় চার দশকের পশ্চিমবঙ্গের  একটি বিচিত্র রাজনৈতিক সময়কে। সাধারণ মানুষের যে ব্যথা, যে ক্রোধ, যে অসহায়তা, যে অপমান আত্মার মতো লেগে থাকল এইসব কবিতায়, তার তুল্য পবিত্র কবিতা আর কী আছে? তিনি কবি। তিনি বুদ্ধিজীবী সাজেননি। কবি সুশীল পাঁজাকে প্রণাম।

কয়েক মাস তাঁর সঙ্গে দেখা হয় না। সংবেদনশীল এই কবি কেমন আছেন জানি না। তাঁর কবিতা সংগ্রহ কি প্রকাশিত হতে পেরেছে এই দুঃসময়ে? খুব মনে পড়ছে মানুষটাকে। তাঁর একটা কবিতা পড়াই। —

কবি তো মানুষ সে কিছু বলে যেতে চায়

কবির জীবন-যাপন নিয়ে সর্বনেশে খেলা করে এ দেশের

ফ্যাক্টরী মালিক

কবির বয়েস বেড়েছে কোন চাকরী-বাকরী জোটেনি আর

  কবি তো মানুষ সে কিছু বলে যেতে চায়…

   কবির ঘর সংসারে আছেন বৃদ্ধা মা

    বৃদ্ধা মায়ের ভাবনা কবির শরীরে

     ডাক্তার কবিরাজ আশা দিয়েছে ছেড়ে

       কবির দুঃখ শোক আরো বেড়েছে

তিন বৎসর হয়ে গেলো মিল লক-আউট

   আটকে রেখেছে মালিক চলতি বেতন, প্রভিডেন্টফাণ্ড

দু বছরের বকেয়া পুজো বোনাস

এ সংবাদ কংগ্রেস জানে কমিউনিস্ট জানে

’৮৯ এ জেনে গেছে মার্চ সরকার!

সবচেয়ে ভালো জানে যতসব ধান্দাবাজ মধ্যবিত্ত ইউনিয়ন লিডার

কবির ঘর সংসারের মতো বিষাদ শোক নিয়ে বেঁচে আছে

আরো কয়েক লক্ষ বন্ধ কলকারখানার শ্রমিক…

কবির ঘর সংসারে আছে আর দুই মেয়ে

আজ স্কুলে যায়নি…রং ওঠা পোশাকের জন্য অঙ্ক দিদিমণি কাল খুব বকেছে

কবির স্ত্রী সকালে অনেক বুঝিয়েছে

ছাত্রীর ঘরের খবর… দেশের আর্থ সামাজিক কাঠামো অঙ্ক দিদিমনিরা

কতটুকু জানে?

অসুস্থ শরীরে কবি একা একা ঘরে থাকে অন্ধকার ঘরে

বাহিরে ভাঙা দেয়াল জুড়ে নীল অপরাজিতা শুধু বাতাসে দোলে

কবি তো মানুষ… সে কিছু বলে যেতে চায়…

প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থগুলির নাম

…………………………………

১ প্রেসিডেন্সি জেলে রক্তাক্ত দেহে অনির্বাণ

২ জন্ম‌ই আমার পরাধীন ভারতবর্ষে

৩ অসত্য ব্যাখ্যা দিও না মন্ত্রী

৪ বুলেট প্রুফ নয় সুশীলের তুচ্ছ ফটোগ্রাফ

৫ প্রৌঢ়া নারীর সঙ্গে মিছিলে আমি

ছবিতে উপস্থিত কবি সুশীল পাঁজা

বিগত দিনগুলি পড়ুন