দৈনিক কবিতা আশ্রম, ২০ আষাঢ় ১৪২৭
আবহমান বাংলা ভাষা
দৈনিক
২০ আষাঢ় ১৪২৭
পিক্সাবে থেকে সংগৃহীত
রজতকান্তি সিংহচৌধুরী
রং বাহার
খেজুর পাকার
বুক ভেসে যায়
কমলা রঙের
স্থির বন্যায়
তাই দেখে দেখে
জাম ওঠে পেকে
কৃষ্ণ চুচুকে
দুলে ওঠে সুখে
আজ বর্ষার
ছায়া চরাচরে
রঙের বাহার
আননে অধরে
সংকেতস্থান
দূর বনপথ
ধারাজলে স্নান
সিক্ত শপথ।
কনক মণ্ডল
বিপ্রলম্ভের কবিতা
জোনাকি জ্বালিয়ে দীপ ঘরে আসে গোপনে গোপনে
এই দীপাধার কেন শরমে বাড়িয়ে দেয় হাত।
কলঙ্ক বিধুর চর্ম বৃষ্টির নিকট ক্ষমাপ্রার্থী
কণ্ঠিত উদ্বেল পাখি শিখিয়েছে বজ্রপাত।
যে বজ্র গোপনে মারে মরমিয়া চাবুক আঘাত
তাকে বক্ষ ক’রে ঘুরি নদী-বন-সমুদ্র-পাহাড়।
ধ্বনি ওঠে নাভি জুড়ে, ধ্বনি বয় কপোতাক্ষে
কেমন মানুষ আমি বুঝি না হৃদয় কারবার!
রুমকী রুসা
আচমকা একদিন
আচমকা একদিন শেষ হবে সব,
আচমকা শেষ হবে তোমার আমার চলার পথ।
আচমকা সব মুহূর্তরা এলোমেলো উড়ে যাবে
কোলাহল থেকে বেশ দূরে,
সেখানে মেঘ কোনওদিন ছুঁয়ে দেখবেই না আলো।
পাখির ঠোঁটের মতো বুনে রাখা সুর
তোমার বুকে ব্যথা নিয়ে দোল খাবে,
পরিতাপের নগ্ন শরীরে আঁধার রাত্রির শোক
আঁকা শুরু হবে।
তোমার মনে পড়েই যাবে,
যেতে যেতে আমিও
কতটা ভালোবেসেছিলাম তোমাকে।
তবু এসব ভাবার আগে
তোমাকে নিয়ে বেশ বাঁচতে ইচ্ছে হবে,
ভালোবাসতে ইচ্ছে হবে,
ইচ্ছেদের জড়িয়ে ধরে পায়ে পায়ে হাঁটতে ইচ্ছে হবে।
তোমার জন্যই আচমকা আমার বুকের ভেতর
অভিমানের একটা বিশাল গর্ত হবে।
মুস্তাক মুর্শেদ
অপার্থিব আলো
যখন করাল অন্ধকারে তোমার চোখ সয়ে গ্যাছে,
রাতচরা পাখির মতো ঝিলিক দেওয়া আলোয় তুমি
চমকে চমকে উঠছ, বিকট থকথকে কালোর
পূজারী শয়তান ইবলিশের মতো তুমিও বলে উঠছো-
‘অন্ধকার স্থায়ী হোক’,
তখন ঐ দ্যাখো আষাঢ়ের জল থই থই জমিতেবোধিপ্রাপ্ত সিদ্ধার্থের মতো রমজান শেখ বীজ বুনছে, দয়াল মদিনা ধান নয় সে যেন বাতাসে ছড়িয়ে দিচ্ছে কবেকার লুম্বিনী নগরীর মায়াময় অপার্থিব আলো, যেভাবে তার নিকষ কালো ছিটেবেড়ার ঘরেচাঁদের কণা হয়ে,অভাবের লম্ফ জ্বেলে আলো ছড়ায় তার মা হারা আদরের দুলালী চাঁদনী আর অদূরে ঐ ধানী জমির পাশ-আলের উপর বসেঅনন্তের বেদনা নিয়ে আগাছা নয়,রাজমণি হেমব্রম আসলে সাফ করছেতার ডাগর শরীরের দিকে লোলুপ দৃষ্টি দেওয়া,পচে যাওয়া সমাজের কিছু অবাঞ্ছিত নিড়ানি অথচ তার চিকন কালো দৃঢ় মুখে লেগে আছে সেই বৃষ্টিস্নাত লাজুক রোদ যা শ্রাবণ শেষ হওয়ার আগেই উছলে পড়বে- উচ্ছল, তন্বী ধানচারাদের গায়ে…
আলসের বিল
অমিতকুমার বিশ্বাস
পর্ব-৭
সেলাইঘর
আমাদের পড়শি-খুড়ো নীরদবিহারী শিকদারের ছোটমেয়ে ছোট্টদি। তাঁর কোলেপিঠেই আমাদের বড় হওয়া। একটা টিনচালার সেলাইঘর ছিল তাঁদের, ছোট্টদি আর ঊষাদি দিনরাত ব্লাউজ বানাত সেখানে। দুটো পা-চালিত মেশিনে সারাদিন খটখট শব্দ। বিকেলের দিকে পাড়ার মহিলারা সামান্য অবসর পেলে এই ঘরে এসে বসে। কাজের ফাঁকে চলে গল্পগুজব। পাড়া-বেপাড়ার নানান গল্প। কেউ কেউ এটাকে বলে, অল ইন্ডিয়া রেডিও সেন্টার। পাড়ার একমাত্র এই বাড়িতেই একটা খবরের কাগজ আসে তখন। বিকেলে মহিলারা সেগুলো নেড়েচেড়ে দেখার সুযোগ পায়। খবর যতটা পড়ে তার চেয়ে অবাক হত বেশি, যেন পৃথিবীতে এই প্রথম এইরকম একটা ঘটনা ঘটেছে!
আমি ছিলাম দিদিদের নেওটা। ঠিক পাশের বাড়ি সেটা। তার উপর বাড়িটা আম-জাম-তেঁতুল গাছে ভরা। ফলের ঋতু চলে গেলেও মাটির জালায় তুলে রাখা তেঁতুল পাওয়া যেত রোজই। প্রকাণ্ড তেঁতুলগাছটা ছিল ওই ঘরের উপরই। তার ছায়া ছিল শ্রাবণমেঘের মতো গম্ভীর। সেদিকে দিনের বেলা তাকালেও মনে কেমন এক অজানা ভয় জাগত। যাইহোক, বিকেলবেলাটা জিভে গল্প আর তেঁতুল দিয়েই কেটে যেত সকলের।
পাড়ায় হঠাৎ-ই একটা খুন হল। জানা গেল দুই বন্ধু মিলে তাদেরই এক বন্ধু ভোলা-কে খুন করার পর তার লাশ গুম করে রেখেছিল আঠারো মাস। বৃষ্টিভরা রাতে তেঁতুলতলার নীচ দিয়ে স্বপনদাকে বেঁধে নিয়ে গেল পুলিশ। মূল চাঁই তারক-কেও ধরল সেই রাতে। পরদিন নরকঙ্কাল বেরোল তাঁতিবুড়ির বাড়ির পেছনের জঙ্গলের গর্ত থেকে। ভয়ে থমথমে গোটা পাড়া! আঁধার নামলেই মনে হয় ভোলার কঙ্কাল হেঁটে বেড়ায় এপাড়া-ওপাড়া। অথচ সে কবেই মারা গেছে! তাকে নিয়ে ভূতের নানান গল্প ছড়িয়ে পড়ল পাড়া-জুড়ে। এই দেড় বছরে কে কে ভোলার ছায়া দেখেছে, এমনকি কথাও বলেছে অন্ধকারে, তারপর হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে তার শরীর—এসব কানে এল! সেলাইঘরেও সে-গল্প বারবার চলতে থাকে। বই নয়, গল্প মুখস্থ হতে থাকল আমার। সেই খুনের খবরটা আবার ছাপা হয়েছিল কাগজে। সেই প্রথমবার আমাদের পাড়ার নাম দেখলাম ছাপার অক্ষরে, দৈনিক খবরের কাগজে। কত ইচ্ছে ছিল আমাদের পাড়ারও নাম দেখব। তবে এভাবে? ভাবিনি কখনও। মহিলামহল দু-ভাগ হয়ে গেল। অভিযুক্তদের পরিবারের মেয়ে-বউরা আসা বন্ধ করল অন্যদের টিটকারির জন্য। এদিকে ওই চারলাইনের খবর পড়ার জন্য হামলে পড়ল পাড়ার সকলেই। এখন কেবল খুন নিয়েই গল্প। কীভাবে খুনটা হল, কীভাবে ধরা হল, ভোলা কি নিজে এসে জানিয়ে দিল তার খুনিদের, কেনই-বা খুন হল, কী হবে এখন খুনিদের? হাজার প্রশ্ন। শপথ নিয়েও খুন-বিষয়ক গল্প বন্ধ করা গেল না কিছুতেই। রোজকার ঘরোয়া গল্প লোপাট! এদিকে ঘোর বিপদ হল আমার। সন্ধেয় বাড়িতে কেউ না থাকলেই ছুটে আসতে হত ছোট্টদির কাছে। সন্ধের পর তো আর তেঁতুল খাওয়া ঠিক না, তাই একবাটি চালভাজা দিয়ে বসিয়ে রাখত আমায়। আমি চাল চিবোতাম আর কেবল ভাবতাম, আজ যেন কেউ খুনের কথাটা না তোলে, কারণ সন্ধের পরও কেউ কেউ থেকে যেত আসরে। দিদিরা কাজ করত, গল্পও চলত সমান্তরালে। এমনিতেই এই তেঁতুলগাছটার দিকে সন্ধের পর তাকালেই মনে হত অনেকগুলো কঙ্কাল ঝুলে আছে ডালে। বিলের আপা থেকে নাকি রাতে উঠে আসে তেনারা। তার উপর আর-একটা এসে জুটল!
খুনখারাপি এই প্রথম নয় আমাদের পাড়ায়। কিন্তু একেবারে সাধারণ তিনটি উঠতি যুবকদের মধ্যে হঠাৎ এই অপরাধে জুড়ে যাওয়া কেমন যেন আমাদের পাড়ার ভূতের আতঙ্কের থেকেও অদ্ভুত ঠেকেছে সকলের কাছে। বিলের মাঠে প্রায়ই খুনখারাপি হত, গোয়ালা আর চাঁড়ালদের গ্যাং-ওয়ার হত, বিষ খেয়ে পড়ে থাকত উপেক্ষিত প্রেমিক। বড়রা বলত, ওদের অতৃপ্ত আত্মা দিনে বিলের আপায় থাকে, আর রাতে এই তেঁতুলগাছে। একবার শিকদারদের আপায় একটা লাশ পাওয়া গেল, পকেটে তার আগেররাতের বিশ্বকর্মা সিনেমা হলের টিকিট, প্রসেনজিতের সিনেমা। আর তারপর আপার জলে মুখ ডুবিয়ে। এইসব খুনখারাপির ঘটনা মনে ভীষণ প্রভাব ফেলত। হত্যা ভিতরে ভিতরে অসহায় করে তুলত আমাদের, হিংস্র করে তুলত, বইবিমুখ করে তুলত। উদ্বাস্তুজীবনের অভাব, জাতিবিদ্বেষ, আর মানুষের লোভের আঁচ এসে পড়ত পাড়ায়। এটাই ছিল দেশভাগের পর বনগ্রাম শহরের পেছনদিকটা, খড়মাটিতে বাঁশ-ঢোকানো কাঠামো। স্বাধীনতার পর খুনের বধ্যভূমি ছিল আলসের বিল। খুন করে পালিয়ে যাবার পথ ছিল এটাই। দূর দূর থেকে ভাড়াটিয়া খুনিরা সামান্য আয়ের জন্য শহরে ঢোকে এই পথে, কাজ শেষ হলে চলে যায়। আমরা আঁচ পাই। চুপ থাকি অনেকের মতো। বাংলাদেশে পাচারের জন্যও জিনিসপত্র আসে, চলে যায়। টাকা, বারুদ আর রক্তের গন্ধ ছড়িয়ে থাকে তখন। বিএসএফ টহল দিতে আসে গভীর রাতে। বিচালিপালার নীচে ঢুকে যায় জাপানি ভিসিপি-ভিসিআর। অথচ সকাল হলেই আলসের বিল সব অন্ধকার মুছে দিয়ে ফসলের গান গায়। বাতাস বয় পাকা ধানের উপর। হারাধনদা গোরুরগাড়িতে আমাদের মতো পোলাপানদের চাপিয়ে সোজা নিয়ে যায় আপার ধারে। পেছনে শুকনো বিলের বুকে চাকার আকাবাঁকা দাগ পড়ে থাকে নাড়ার ভিতর। দিনের বেলাতেও বিলের মাঝে জঙ্গলে ঘেরা আপাপুকুর দেখে গা কাঁপে। ঝিঁঝিডাকে তালা লাগে কানে। আমরা ভূত-খ্যাদানো মন্ত্র ধরি:
ভূত আমার পুত
পেতনি আমার ঝি,
রাম-লক্ষ্মণ সাথে আছে
করবে আমার কী?
মন্ত্রে ভূত যায় কি না জানি না, তবে ভয় যায়। হারাধনদার গাড়িতে ততসময় ধান বোঝাই হয়ে গেছে। আমরা শিকদারপল্লির দিকে যাই। বিল পেরিয়ে তখন যশোর রোডের উপর দিয়ে গোরুরগাড়ি চলতে থাকে। ডেগু, গোবিন্দ আর আমি তখন ধানবোঝাই গাড়ির মাথায়। যেন হাতির পিঠে চড়ে জমিদারি দেখতে যাচ্ছি। খিদেপেটেও যে কী আনন্দ আমাদের! এভাবে বিলের মোহিনী রূপ আর রক্তকথা পাশাপাশি চলে। আমরা এভাবেই বেড়ে উঠি, বই আর বোমার গন্ধে।
এক রাতে পাড়ায় হামলা হয়। ভোলা-খুনের অন্যতম অভিযুক্ত পাশের বাড়ির তারক। শ’খানি লোক মুখ ঢেকে তারকের উঠোনে হাজির। হাতে দা-চাকু-বোমা-পেটো। দরজায় ধাক্কাধাক্কি। খুনের বদলা খুন!তারকের ভাই তাপস আমার সহপাঠী, বন্ধু। দৌড়ে এল আমাদের উঠোনে। দা চাইল। কচাকচ খুন করবে একশো লোককে! বন্ধুকে দা দিতে পারিনি। বরং পালিয়ে যেতে বলেছি চোরের মতো। তাপস হাউ হাউ করতে করতে কোথায় যে হারিয়ে গেল সেই রাতে! গোটা পাড়া একটা খুনের অপেক্ষায় জেগে রইলাম।
না, খুন হয়নি। তারক পেছনের দরজা দিয়ে নিরুদ্দেশ! বহু যুগ পর তাকে দেখেছি যদিও, কয়েক মুহূর্তের জন্য। ফাঁসি হয়নি। যাবজ্জীবনও হয়নি। সাক্ষী নেই। অগত্যা খুনি নয় সে আর।
পাড়ার এই ঘটনাটা মিটল, কিংবা মিটল না। মহিলামহল আর আগের মতো জমে উঠল না কখনও। তারপর তো একদিন চিরকুমারী ছোট্টদি অকালে চলে গেল সবাইকে কাঁদিয়ে। কে যেন বলল, চারজন আত্মীয় চারটে দিক ধরুন। আমি একটা দিক ধরলাম, মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল, যে আজ ধরবে, সেই তাঁর আত্মীয়! বলেই কেঁদে ফেললাম। সামনের দৃশ্যটা ঝাপসা হয়ে এল। যখন চৌদিক পরিষ্কার হয়, দেখি নটেগাছটা থুড়ি তেঁতুলগাছটা চিরতরে মুড়িয়ে গেছে!