আবহমান বাংলা ভাষা

দৈনিক

২১ আষাঢ় ১৪২৭

Anselm Kiefer

স্বপন চক্রবর্তী

ব্যক্তিগত কবিতা

রং ছড়িয়ে ভেজা মেঘ খাদে নেমে যায়

সব কুড়িয়ে নিয়ে ফেরা হয় না

কিছু কিছু নেয় হাওয়া, জল ও মাটি

প্রকাশ্যে নয় গোপনে ভাল লাগাও ফেলে যেতে হয়

পাপোষে মাটি ঘষে

            ঘরে ঢুকে পড়ে ক্লান্ত জোড়া চটি।

 

 

২

আমাদের যে ছায়া গড়িয়েছিল ঢালু ঘাসের জাজিমে

সেই গড়ান বেয়ে হামা টেনে সন্ধ্যা উঠে আসে

এক সময় তুমি সেই সান্দ্র অন্ধকারে।

                    তোমাকে চেনা যায় না

আমাদের খুঁটিনাটির সেই ছিল শেষ আলোচনা।

 

 

 

তারিক-উল ইসলাম

চিহ্ন

সূর্যডোবা আকাশটাতে উল্টানো ঠোঁট সন্ধে আছে

চিহ্ন আছে চোখের কাছে, কাজল-ভ্রু নদীর কাছে

জলের স্রোতে হঠাৎ করে উল্টোমুখী মাছের কাছে

গাছের কাছে, থমকে যাওয়া উড়াল পাখির ডানায় 

কিছু গন্ধ আছে, ছন্দ আছে, দ্বিধা এবং দ্বন্দ্ব আছে।

 

নিকেল ওঠা আংটিতে মুখ, সুখ-অসুখের ধন্ধ আছে

চায়ের কাপে শায়ের আছে, হঠাৎ যাবার কষ্ট আছে

পায়ের কাছে ঘাস ফড়িঙের লুটিয়ে পড়া শব্দ আছে

জব্দ দিনের সারাবেলা ফুল ফোটানোর গল্প আছে

নিরেট নিপাট চুলের ভাঁজে টিপের প্রদীপ আলো আছে।

 

আমির হামজা আমির খাঁ আর রবিশঙ্কর সুরধ্বনি

সেতার জুড়ে একলা রাত্রি অন্ধকারের কান্না আছে

কালো স্লেটে আনত চক- বলতে চাওয়ার বিষাদ আছে

নিষাদ-খরাদাহ আছে, পোড়া দাগের চিহ্ন আছে

কালো-আলো দুঃখ আছে, দুঃখ আছে, দুঃখ আছে।

 

 

পৌষালী চক্রবর্তী

মৃদঙ্গে ডেকো না

তারপরও এইসব মায়াপাখি-শিসে

বসন্ত জন্মায়। মনে হয়

    অজন্মার দেশও ধান্যসম্ভবা।

 

 

পুরনো সাপের খোলস, গত ধান মাড়াই

এসব চিহ্ন ধরে প্রত্নখননে আসি

কুয়োতলে কবেকার শানের বাঁধাই। 

 

জমাট শ্যাওলার স্তর অলিপিকাহন

দড়ির আলাপ ছুঁয়ে গঙ্গাস্নান

সেরেছিল সতী নিদর্শন। 

 

 

ভাবীকাল থেকে আসি, দেখে নিচ্ছি

গেরস্থের শঙ্খচূর্ণ হাত উঠে আসছে 

প্রজাপতি কল্কাকাটা।

 

শাঁখারির প্রলোভন এড়াই

তোমাদের মৃদঙ্গ মাতনে কোনওদিন

                আমাকে ডেকো না।

 

সুপ্রভাত দত্ত

হাত পাখা

পৃথিবীর সব শব্দার্থ লুকানো রয়েছে  

টিম টিম করা প্রতিটি মায়ের ভিতর…

এক একটা ঘাম সন্তানের কপাল থেকে

ঠিক মিশে যায় মায়ের হৃদয়…

তারপর পৃথিবীটাও ক্লান্ত হয়ে পড়ে

মায়ের হাত পাখার ঘূর্ণনের কাছে

 

বারো পর্বের ধারাবাহিক

আলসের বিল

অমিতকুমার বিশ্বাস

পর্ব-৮

প্রলাপসংগ্রহ

এই তো তোমাদের উঠোনেই দাঁড়িয়ে আমি, আর তুমি তর্জনী বাঁকিয়ে দেখালে আমার ফিরতি পথ। বাঁয়ে তোমার মা, নাকি বুলুপিসি, চশমাটা মুছে আবার পরে নিলেন ধীরে? তোমার চোখের পাতা বন্ধ এবার। কম্পিত ঠোঁটও নিবিড় অন্ধ। পুরোটাই যেন এক অলৌকিক স্থিরচিত্র। ধীরে-ধীরে ফেড-আউট সব। 

উঠোন নাকি আলসের বিল, যেথা হবু-মন্ত্রী নেমেছিল হাঁটুকাদায়— হাতে ‘ওয়াটার অব ইন্ডিয়া’, শেয়াল আর শিশির নামলেই যেথা দুলুখ্যাপা শুয়ে থাকত তিরিশ কোটি ভারতবাসীর মানচিত্র সেজে? তার উন্মুক্ত শিশ্নটা মহাকাশের দিকেই তাক করা বুঝি। আকাশে সদ্য ঘুমভাঙা চাঁদ ও তারামণ্ডল। দুলুখ্যাপার মাঝে-মাঝেই ইচ্ছে হয় গ্রেনেডটা ছুঁড়ে ধ্বংসে করবে সমস্ত চন্দ্রালোক। তবু সে শান্ত। বরং এসব জিনিস ভালোই বোঝেন রাষ্ট্রনায়কেরা। পশ্চিম থেকে কিছু ঠাঁটানো কুকুর আবু-ঘ্রাইব শুঁকে চলে আসে আলসের বিলে। হামানদিস্তায় পিষে দেয় পাকাধানের আঁচল-জড়ানো হেমন্তরোদ। তারপর স্কুল-কলেজে খাস বিলেতি বিজয়-সংগীত, —মোড়ে মোড়ে, এমনকি কালীপুজোর রাতেও। আমিও গাইছি সে-গান। বিলপাড়ার নেড়িগুলোকে বিষবিস্কুট খাইয়ে নিশ্চিন্তে পুষেছি অ্যালসেসিয়ান। তুমিও কিনলে আমায়— কিনলে আমার খণ্ডকোশ ও লকলকে জিভ। এমনকি সময়ে-অসময়ে জড়িয়েও ধরছ অমায়িক। বিলের মাঝখানে সদ্য গজিয়ে-ওঠা ভেড়ির টঙে চড়ে পোশাক-আশাক ছুঁড়ে বলছ, ‘এ জীবন তো মিছেয় ভরা। চলো, আজ চাঁদের কাছে অন্তত একবারটি সত্য হই দুজনে। তবে সাবধান, তেইশ মিনিট পর ব্ল্যাক-উইডো মাকড়ষা হয়ে তেড়ে আসব, উপড়ে নেব তোমার অহংকার! পারলে তার একটু আগে পালিয়ে যেয়ো।’ বিলের কাঁকড়ামাটি মেখে সহসা আপার গাছগুলোর কাছে, মরাখালের কাছে ক্ষমা চাইতে-চাইতে তোমাকে সেই প্রথমবার বনদেবী মনে হল। তোমার যৌনকেশ থেকে নেমে এল বিশাল ঝুড়ি আর পৌরাণিক ছায়া। ভাবলাম, তোমায় সম্ভোগ করি একবার। ভাবলাম, জেব্রার মতো তুমি সহসা বুকে উঠে বলবে, এইবার জিভটা ছুঁড়ে দাও পাতালদ্বার পর্যন্ত আর শুষে নাও সকল পুলকিত পাখিকথন! তা হল না, কারণ টঙ থেকে পালিয়ে এখনও এই উঠোনে থমকে আছি আমি। আমার পা-দুটো থেকে জন্ম নিচ্ছে অসংখ্য শেকড়-বাকড় আর তা গেঁথে যাচ্ছে উঠোনের নরম মাটিতে। আমার জুতো আমার সামনেই হাঁটতে-হাঁটতে হেঁটে বেড়াচ্ছে অন্য পায়ে। বাবার জুতোটাও এমনই একদিন হারিয়ে গেল অন্ধকারে। অথচ জুতোটা তাঁর দরকার খুব সেই বরফ-পড়া-রাতে— দু-পাশে লাশের ঢিবি, তার ঠিক মাঝে, এক প্রেতান্ধ-অন্ধকারে। বাবা হেঁটে চলেছেন ১৯৬৫’র পাকিস্তান সীমান্ত বরাবর। আর কিছুটা পেরোলেই লাহোর। এই মৃত্যু মৃত্যু খেলায় ভিতর, এই গভীর দেশপ্রেমের ভিতর মাটিতে পড়ে থাকা এক ক্ষুধার্তের পেটে হারিয়ে যায় বাবার সেপাই-জুতো। সেখানে কত না-খেতে পাওয়া মানুষের পেট ফুলে আছে মহাজাগতিক কালো-গর্তের মতো। ক্ষুধার্ত সেইসব পেটে ঢুকে আছে জীবিত কিংবা মৃত গ্রেনেড। সেই রাক্ষুসে পেটই কি খেয়ে নিল বাবার জুতো অবশেষে? বাবা জুতো খুঁজে চলেছেন উন্মাদের মতো। একে তুমি গালগল্প বলতে পারো। দুটো পয়সার জন্য বাবাকে ওরা কুকুর বানাতে চেয়েছিল— লিখে ফেসবুক ভেজাতে পারো জবর। এককালে নিজের দেশে তাড়া-খাওয়া এই লোকগুলো কিন্তু আজও জানতে পারেনি তাঁদের দোষটা আসলে কী ছিল! বিলেতি কুকুরের ল্যাম্পপোস্ট-হিসিতেই ভাগ হয়ে যায় আস্ত উঠোন। তারকাঁটার ফাঁদে আটকে থাকে উদ্‌বাস্তু চাঁদ নাকি এক ক্ষুধার্ত কুকুর? যার নিপাট ধর্ম ছিল ক্ষুধা, যে পারাপার চেয়েছিল সামান্য এক বাসী রুটির জন্য— আর সে-ই কিনা নিজের পাড়াতেই ফেঁসে গেল ক্রমশ পেঁচানো এক তারজালিতে! ওপাশের টাওয়ার থেকে ছোবল ওৎ পেতে আছে। এপাশের টাওয়ার থেকেও সুদক্ষ থাবা। ক্ষুধা ছেড়ে কেঁদে বাঁচার জন্য কুকুরটার কী বিকট এক আর্তনাদ তখন! এই বুঝি পৃথিবীটাও কেঁদে ফেলে অকস্মাৎ! কিন্তু কোনও রাষ্ট্রই যে কাঁদতে পারে একফোঁটা! রাষ্ট্রযন্ত্রের চোখ নেই, কান নেই, নাক নেই, ত্বক নেই। রাষ্ট্র পালিয়েও যায় না মুন্নি মুণ্ডার হাত ধরে। বরং বলে, ‘যা ছুড়ি পালিয়ে যা, এখন থেকে এই কয়লাবন বাবুদের নামেই হল!’ এখন তুমি যদি সেই রুটি-সন্ধানীটিকে প্রেমিক ভেবে সকল সীমান্ত-ছোবল উপেক্ষা করে বাঁচাবার জন্য নেমে পড়ো, তাহলেও তুমি পাবে কয়েক টুকরো কান্না! যন্ত্র এমনই—অন্ধ ও নির্বিকার। অতিমারীকালে একে-অপরের প্রতি যখন আদর বাড়িয়ে দেবার কথা ছিল হরদম, ঠিক তখনই ম্যাকবেথ হেসে ওঠে অন্ধকারে, আর প্রিয় ব্যাঙ্কো ঘোড়া থেকে পড়ে যায় অতর্কিতে! এই-ই তো উন্নত মানবসভ্যতা। ঠিক এই মুহূর্তে তোমার করণীয় কী— এ নিয়ে ভাবতে-ভাবতেই আবার ফেড-আউট।

পা থেকে জন্মানো শেকড়-বাকড় ছিঁড়ে আমার শরীর ক্রমশ ফাটলে তলিয়ে যেতে-যেতে দেখি বাবা তখনও খুঁজে চলেছেন হারানো জুতোজোড়া। দেখি কাঁকসা উদ্‌বাস্তু ক্যাম্পে রেশনের লাইনে দাঁড়ানো ঠাকুরদার পিঠে আচমকা পড়ল এসে পুলিশকা ডাণ্ডা। ক্যাম্প না কি ভিনরাজ্যে মজুরী খাটতে যাওয়া আমার বড়ভাই? দুর, সে তো মহারাষ্ট্রের এক জলহীন শহর ছেড়ে বহুকাল আগেই স্টিয়ারিং ধরেছে তাঁর মনিবের! তবু ডাণ্ডা থেমে থাকে না কখনও। গরিবের পিঠে ডাণ্ডা পড়লে পরে রাষ্ট্র বুঝি খুশিই হয় বরং। আড়াই টাকা নিয়ে পালাতে গিয়ে ধরা খায় সে, তারপর তো উদোম ক্যালানী! প্রবাদেই আছে, ঝি ঠেঙিয়ে বউ সামলানো। এখানে ‘ঝি’ অর্থে আর নিজের মেয়ে নেই বহুকাল! তো এই ঝি-রাখা প্রতিটি বাড়িই এখন এক-একটি পূর্ণ রাষ্ট্র! সেখানেও রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রী-ক্যাবিনেট— একা কিংবা কয়েকজন। সেখানেও যন্ত্র ও যন্ত্রণা। দেবতার এও নাকি এক অবতার! দেবতার জন্ম ও মৃত্যু নেই, দেবতা আগুনে পোড়ে না জলেও ডোবে না। ক্ষুধার্ত মানুষ তবু জোঙালের গোরুর মতো মাথা নিচু করে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকে চুপচাপ। ঠিক তখনই তুমি দেশপ্রেমের নামে সারাদিন ভার্চুয়াল গালি পাড়ছ চৌদিকে আর আমারই মতো  নেড়িদের বিষবিস্কুট খাইয়ে পুষছ খাস বিলেতিকুকুর? মৃত্যুর আগে কার জুতো চিবিয়ে খেয়েছিল তারা? কাদের সাদা ডিনামাইট? পুলিশের কুকুরটা কুঁই কুঁই করে শুঁকে গেল মৃতদের যোনি। জিভ দিয়ে চেটেও দিল কিছুক্ষণ। সভ্যতার অতলে তলিয়ে যেতে-যেতে এইসব আমি দেখছি নির্বিকারে। কামড়ে-কামড়ে দগদগে ঘা বানিয়ে ফেলল যারা, তাদের জন্য বাগিয়ে দিচ্ছ লেমনজুস, — এগিয়ে দিচ্ছ এলএমজি, সিঙারা টু সাথী চানাচুর, মিস শেফালী? ফাটলের মধ্যে ক্রমশ হারিয়ে যেতে-যেতে তোমাকে আর-একবার কল্পনা করলাম। চুমুর সময় তোমার চোখ দুটো ক্রমশ বন্ধ যেন, প্রশ্বাসের ঘ্রাণ বেশ ভারী। সহসা জিভটা বাড়িয়ে দিলে ইশারায়। বনদেবীর মতো অনন্ত অচঞ্চল মুখ তোমার। অর্ধমুদিত চোখে সম্মতি, কিংবা অনন্ত গোধূলির গোপনীয়তা। একে সম্ভোগ করা যায় না, একে ধর্ষণ করা যায় না— বরং একে ভক্তিভরে প্রণাম করতে হয় অবশেষে। ওই যোনিকেশের মতো তোমার গোটা শরীরটা ধীরে-ধীরে উদ্ভিদ-জাতীয় হয়ে যায় আর আমি মানুষ থেকে ক্রমশ কুমির হয়ে নিজেকেই জলে টেনে আনি পরিপূর্ণ আত্মহনন-উল্লাসে। 

থমকানো সময়ের মতো স্থবির প্রেমে সচেতন হয়ে উঠেছ সহসা। ছলচাতুরীর দেশে এখনও একপাশে বসে হুঁকো টানছে বাইনখুড়ো, এখনও ফসলের উপর নুইয়ে পড়ছে হেমন্তচুম্বন। যে-পথ অজানা সাগর পারাপারে মেতেছিল একদিন, আজ তার পিঠে মৃত নগরীর হাহাকার। এখন কোথায় থাকো তুমি? কোন পুরুষের হাতে লুকিয়ে রাখো সাধের লাল তিল কিংবা কৃষ্ণ-জপমালা? মৃত্যু ও মরীচিকায় লিখেছি যে সরু পথ, তার থেকেও বেরিয়ে আসে কৃষ্ণচূড়া। অথচ তুমি ভালবাসো পাহাড়ি ক্যালেন্ডুলা। তাই তোমার আঁচড়ে অন্যকোথাও নেমে এল সূর্যাস্তের ক্যানভাস। আলোটা নিভে গেলে তুমি জানো এই পৃথিবীটা এখন দু-ভাগ হয়ে যায় আচমকা। আঁধারই ভাল বেশ। আঁধারের নীচে একটু শীত-শীত লাগে আমার। গাঢ় শীত নেমে এলে ঘুমিয়ে পড়ি চুপচাপ। ঝিঁঝি ডাকে। বাতাস ডাকে। চাঁদ ঝুঁকে এসে ডেকে যায় একবার। তুমিও ডাকো তোমার সন্তানদের। বলো— আয়, গল্পের নীচে ঘুমিয়ে পড় তোরাও! ওই মরুবোধ থেকে সোজা নেমে এলে দেখবে পাখিদের খুশির মতো এখানে চাঁদ উঠেছে একা। দেখবে পথে-পথে গাছের পাতা নেমে এসেছে রাত্রিছায়ায়। এখানে তোমার মুখ অপরূপ হরিণের ত্বকের মতো মৃদু মায়াময়। এখানে ঘুমে কাতর তোমার সফেদ পদধ্বনি শুনে বাঘেরাও শান্ত শ্রোতার মতো মুগ্ধ। এই হোগলাবন আরও ডিঙিয়ে-ডিঙিয়ে— এই যে একটা পুরোনো আধপোড়া সূর্যকে বগলদাবা করে আমাদের এইসব প্রিয়-অপ্রিয় জনঅরণ্য ছেড়ে— পুজোর রাতে চমকানো মানুষদের আরও চমকে দেওয়া ধমকে দেওয়া নকলভণ্ড আলোপথ ছেড়ে— কিংবা আতশবাজির মতো ক্ষীণকায় সুতীব্র দহনসম্ভোগের পর ঝরে-পড়া অনুত্থিত বিষাদ্গাঁথা ছেড়ে— কোথায় চলেছ তুমি— একা-একা?

উঠোন, নাকি আলসের বিলের টঙপাড়া? আগেও এসেছি এখানে বার-দুয়েক। গোধূলি আলো মেখে আপাপুকুরের কোল ঘেঁষে হেঁটেছিও বেশ, কিন্তু কখনও জানতে চাইনি মাছভেড়ির মাঝে নাম কী তার। অথচ যেখানে যাই, নাম জিজ্ঞাসা করি। যদিও মানুষজনের নাম আমার কিছুই মনে থাকে না আর। আম-জাম সব একই রকম মনে হয় আজকাল। এখানে অনেক অনেক গোধূলি আগে, ভেড়িহীন সংস্কৃতির আগে, কেউ আসত তাঁর প্রিয়ার সাথে। নৌকো পার হয়ে যখন তাঁরা নেমে পড়ত অন্যপথে, ঠিক তখনই প্রিয়ার মায়াচাউনি গান হয়ে যেত হঠাৎ। আকাশ থেকে ঝরা জোছনা কিংবা পাখিদের ঘরে ফেরার উল্লাস ফেলে প্রেমিকটি আরও ডুবে যেত কোথাও। সে ডুবেই গেছে একদিন— চাঁদ যেভাবে সকল মায়া ছেড়ে ডুবে যায় অবশেষে, হোগলাবনের গাঁ ঘেষে চলে যাওয়া জলপথে! প্রেমিকাও উধাও বাহারি বাতাসে। তবু সেই কন্ঠস্বর আজও বাজে, দূরে কোথাও গাঢ় আঁধারে টিমটিম করে জ্বলতে থাকা কোজাগরী নৌকোর ভিতর নির্জন দীপের মতো! কোথায় যাচ্ছ শেষমেশ? কোন দেশে? কোন আকাশে এত হলুদ কান্না মোমের মতো গলে পড়ছে টুপটাপ? এইসব শোলা-হোগলা ডিঙিয়ে-ডিঙিয়ে তুমি যে সুখের কথা বলছ, তা আসলে চন্দ্রবোড়ার জিভের ডগার স্বাদকোরক মাত্র। এইসব ক্ষণনির্মিত পাহাড়প্রলাপের নীচে চাপা পড়ে যায় বাদামী প্রশ্বাস ও প্রতিটি উটের অসমাপ্ত সম্ভোগ। যে ছায়াপথে এখনও জেগে আছি একটা পূর্ণাঙ্গ হত্যা-ইচ্ছেতে অথচ বারবার ফিরে আসছি ডানকানের ঘর থেকে সটান তোমার কাছে, আর তুমি সেখান থেকে আচমকা ধাক্কা মেরে ফেলে দিলে অতল যোনিগহ্বরে? এখানে সামান্য তৃষ্ণা মেটে উটের তাজারক্তে। এখানে পশুপিঠেই মানচিত্র বয়ে বেড়ায় সভ্যতা। এখানে মৃত্যুট্রাপিজে হেঁটে চলেছে প্রেম। ইচ্ছে হয় না আসতে— এসেই পড়ি তবু বারবার— আসতেই হয় যে ফিরে! উটের পদাঘাতের মতো অপেক্ষামান সারিমানব হয়তো আমাকে ছুঁড়ে ফেলবে একদিন চোখ ঝলসানো আর-একটি জন্মের দিকে। 

‘যতটা শক্ত হচ্ছে মুঠো, ততই আলগা এখন সম্পর্ক’— বলেই ফণীমনসার মতো উঠে দাঁড়ালে সহসা। অথচ দেখো, হাতের প্রতিটি রেখার ’পর দিয়ে হেঁটে গেছে অজস্র বালুকণা, যা বীজধানের মতো ছড়িয়ে দিলাম চরাচরে। কী লিখব আর কী লিখব না— এসব ভাবতে-ভাবতেই এখানে সন্ধে নামে। অথচ একটা পাখিও ডাকে না সেভাবে। ফাটলে ডুবতে-ডুবতে প্রতিদিন আরও জেদি হয়ে যাচ্ছি বাতাসের কাছে, আরও পালিয়ে বেড়াচ্ছি সম্পর্কের পোড়ানুন থেকে একটু-একটু করে। প্রতিদিন ঘর থেকে বেরোচ্ছি আর ভাবছি এটাই বুঝি শেষ রুটি খেলাম একসাথে, অথচ নিজেকে নিজেই খুন করে গুম করার পরিবর্তে ফেরত নিয়ে আসছি স্বস্থানে। বাড়ির লোকজন একটা তাজা লাশকে হাঁটতে দেখে হেসে উঠছে গোপনে। ভাবছে, ওই তো হাতের মুঠো খুললেই আতশবাজি জ্বলে উঠবে এখনই! তেমন হয় না। অগত্যা একটা পূর্ণাঙ্গ লাশের ঘুম থেকে উঠে দেখি জানলার বাইরের লোকগুলি এখনও শিশ্ন বাগিয়ে একে-অপরের দিকে তেড়ে যাচ্ছে কী এক অলীকমোহে। কী করব বুঝে উঠতে পারি না বলেই তুমি আজও আমায় কাপুরুষ ভাবো। ভাবো সারাজীবন মায়োপিয়াবোধে কেবল পাতিহাঁসেদেরই লাফিয়ে পড়তে দেখেছি জলে! ভালোই বুঝি একটা লাশ শুধু এপার থেকে ওপার আর ওপার থেকে এপার আসা-যাওয়া ছাড়া আর কিছুই করতে পারে না। একটা ধুম অন্ধকার মুড়ি দিয়ে লুকিয়ে থাকতে-থাকতে কবে যে হারিয়ে যাই বিল থেকে পাড়া থেকে গ্রাম থেকে—  কেউ-ই তার টের পায় না কিছু। যমদূতের কাছে তাই একটা দীর্ঘ চিঠি লিখি— আসুন। লাশটা নিয়ে যান। অন্তত এখন থেকে একটু পাংচুয়াল হতে শিখুন, স্যার!

আলোকচিত্র: অমিতকুমার বিশ্বাস

বিগত দিনগুলি পড়ুন