দৈনিক কবিতা আশ্রম, ২২ আষাঢ় ১৪২৭
আবহমান বাংলা ভাষা
দৈনিক
২২ আষাঢ় ১৪২৭
ছবি: চন্দন মিশ্র
রাহুল পুরকায়স্থ
বোবা
উলঙ্গ ছুটেছে দেখো নগ্ন নদীটির দিকে
আজ মেঘ, আজ বৃষ্টি, আজ বজ্রপাত
তোমার নিপাত হোক, আমার নিপাত এই দৃশ্যে
দৃশ্যান্তরে সমবেত রুদ্ধদল পাপড়ি মেলুক
আমি দেখি, তুমি দেখে যাও
ক্ষুধাহীন দেশে যদি ক্ষুধার্তের গান গাও
কীবা অর্থ তার!
বোবা খোঁজে বাকশক্তি ক্ষুদ্র কবিতার
গৌতম গুহ রায়
জল আখ্যান
নদী একটা পুরস্কার চাইছে,
বরফ ভেঙে ছুটতে ছুটতে
ইচ্ছামৃত্যুর এই ঘাটে দাঁড়িয়ে।
বর্ষায় তার ভরাট যৌবন,
নৌকা ভর্তি ঘুম কুচি, বরফের মতো
ভালুকের চর্বি আগুন হয়ে জ্বলে, রক্তজবা
ভাসছে এখানে, নদী দুভাগ হয়ে
যেখানে পুষে ছিল তার বাঘিনিকে।
শাহীন রেজা
যুবক
মেঘের মতো মেললে তোমার ডানা
বাতাস থেকে কুড়ালে বেগ ঝড়ের
এক নিমিষে উড়িয়ে বালুর চর
লণ্ডভণ্ড বিকাল দুপুর এবং সে শৈশব
যুবক তুমি দাঁড়িয়ে গেলে একা
সামনে বিশাল অধর্ম আর পাপ
পাহাড় সমান সর্বনাশের ঢেউ
সাহস নিয়ে খুললে দেহের তালা
তোমার চোখে সুরমা আঁকে দিন
খোলস ভেঙে বেরোয় ফেরেশতারা
সত্য ন্যায়ের হিসাব কষে কষে
সবাই লড়ে বিপন্নতার ভিড়ে।
সুমন চট্টোপাধ্যায়
হ্যালুসিনেশন
বিষাদের উৎসবে এসেছি, বুকের মধ্যে লুকিয়ে
মনখারাপের আদিম ডালপালা, হাসির মধ্যে
তুমি শুনতে পাচ্ছ পতনের প্রকৃত আফসোস?
তোমার মধ্যে কে বসে, সন্ধ্যার নিহত জোনাকির
স্মৃতিতে বাজিয়ে যাচ্ছে অনন্ত ভায়োলিন,
সুরে তার খেলা করে কবেকার ছেলেবেলা…
জঙ্গলের মধ্যে এক অলীক ঝরনা, তার জমির
নুড়িপাথরে, মনে হয়, জীবনের ঘ্রাণ লেগে আছে
এখন যখন ঝড় হননের নেশায় বুঁদ, আমায়
ধ্বংস করে দিচ্ছে শিকড়-বাকড়ে, তখন
দেখছি আজও বিভ্রমের অনুপম ক্ষণে
তোমার নির্মোক হয়ে বিছানায় চাঁদ পড়ে আছে!
আলসের বিল
অমিতকুমার বিশ্বাস
পর্ব-৯
আশ্চর্য প্রদীপ
মহিতোষদের রিফিউজিঘরে এলে মনে হত আলাদিনের প্রদীপ খুঁজতে এসেছি! ঘরের এখানে-ওখানে খাটের নীচে ধানের বস্তা, পাটের গাদা, তিল-সর্ষের ধামা-চ্যাঙারি। মেঝে ফুঁড়ে ইঁদুরের গর্ত। ইঁদুরমাটি ঢিবি হয়ে আছে। দেয়ালে সাদাবালির পলেস্তারা খসে গেছে কবে! বৃষ্টিজল দেয়াল চুঁইয়ে এসে আঁকছে বিবিধ গুহালিপি। উপরে বাঁশের মাচায় মাটির হাঁড়ুিকুড়ি। মাচার উপর টালি। ঘরের সঙ্গে আছে আরও চালাঘর। ঘরে আছে ক্ষুদ্র এক জানলা, তাকে গর্ত বলাই ভালো। দরজা বন্ধ হলে সেখান থেকে সিনেমাহলের প্রোজেক্টরের মতো আলো গুহাক্যানভাসে অদ্ভুত চলচ্চিত্র সৃষ্টি করে! এই দেয়ালেই ঝোলানো ছিল ইয়া লম্বা এক তলোয়ার। খোলা। মনে মনে ভাবতাম, আলাদিন কি ভুলে গেছে এটাকে?
তলোয়ারটি ধীরেন দাসের। মহিতোষের খুড়ো। এই খুড়ো নাকি এককালে যাত্রা করতেন খুব। সেই স্মৃতি ঝুলে আছে সিঁদুরের মতো, অথচ বধূটি জানে সে আর ফিরে আসবে না কখনও! মাঝে মাঝে এও ভেবেছি— মলিন দেয়ালের সংকোচ হত না তো অমন রাজকীয় অস্ত্রটি কোমরে ঝুলিয়ে রাখতে? দেয়াল উত্তর দেয়নি। ঘরের দেয়াল বাচাল নয়, বরং প্রাচীন গাম্ভীর্যে পরিপূর্ণ। উত্তরটা স্পর্শ করতাম। স্পর্শ করতাম সেই ক্ষুদ্র জানলা দিয়ে দেয়ালে-পড়া-আলোকেও। দেয়াল-জুড়ে তখন হল্লারাজা! আর সেই রাজপাট দেয়ালে তুলে রেখে ধীরেনখুড়ো কিনা লাঙল নিয়ে আলসের বিলে!
ছোট্টদির একমাত্র ভাই যদুবর যাত্রাপালা ও শখের নাটক করছে চুটিয়ে। তখন সে তরুণীদের উত্তমকুমার। তাঁর নেওটা আমরা।
আমাদের রিফিউজি পাড়াটা তখন যাত্রাময়। সকলের হাবভাবে যেন যাত্রার প্রভাব। কিংবা যাত্রার মধ্যেই তাঁদের স্বাভাবিক বিচরণ। যাত্রাটা বুঝি-বা বড় বেশি বাংলার!
একটুকরো পাউরুটির লোভে আমি মেজদার হাত ধরে পাঠশালায় যাওয়া শুরু করি। কোথাও পাউরুটির গন্ধ পেলেই ডেগু-গোবিন্দরা বলে ওঠে, ‘যাহ্, গ্যাছে গা!’ তখন দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্র, মহিতোষ বলে, ‘চল, তোরে পারুটির কারখানা দ্যাখাবো!’ অবাক কাণ্ড! আমাদের পাড়াতেই আবার পাউরুটির কারখানা?
আমাদের বাড়ি থেকে দুশো মিটার পুবে গেলে ঠিক দক্ষিণে একটা গলি পড়ে—এই গলিতে দুটো বাড়ি পার হতেই মহিতোষ বলে, ‘ওই দ্যাক!’ কিছু দেখার আগেই কেক-রুটির ঘ্রাণে আমার তো তখন ‘গ্যাছে গা’-অবস্থা! জানলার ওপাশের লোকটা চাকু দিয়ে কেক কাটছে খচাখচ। আরে, এই কেকই তো চল্লিশ পয়সা দিয়ে কিনে খাই! কিন্তু রুটি কই?
কয়েকটা অচেনা ছেলেমেয়ে হইহই করতে-করতে কারখানায় ঢোকে। লোকটার হাতে একটা কয়েন তুলে দেয় তাদেরই একজন। লোকটা তখন একমুঠো কেকের ছাঁট একটুকরো খবরের কাগজে পেঁচিয়ে তুলে দেয় তার হাতে। ওরা মুখে পুরে লাফাতে-লাফাতে চলে যায়। আমরা দুজনে দুজনার মুখ চাওয়াচায়ি করি। আমাদের কয়েন নেই!
মন খারাপ। বাড়ি ফিরব। মহি বলল, ‘ওদিকদে চ’।’
ওদিক মানে গলি দিয়ে আরও দক্ষিণে কিছুটা, চারটে বাড়ি পেরিয়ে ডাইনে, অর্থাৎ পশ্চিম দিকে, তারপর আরও চার-পাঁচটা বাড়ি পার হলেই আলসের বিল। সেখান থেকে বিলের মাঠ ধরে কোণাকুণি বিলপাড়ে আমাদের বাড়ি।
সামান্য এগিয়েছি, হঠাৎ মহি বলে, ‘এডা কার বাড়ি জানিস?’
‘না তো!’ মনে মনে বলি, মামার বাড়ি তো আর না যে এখন আমায় কেকের ছাঁট খেতে দেবে!
‘এটা ত্রিদিব ঘোষের বাড়ি!’ মহি বলে। শুনে আমি বোধহয় সেখানেই জ্ঞান হারাই!
জ্ঞান হারানোটা খুবই স্বাভাবিক। এই তো ঢিলছোঁড়া দূরেই কেশবলাল মাঠ, গত মাসে পাশের পাটগুদামে চারটে খুন! আর তখন গোয়ালা-চাঁড়াল গ্যাং-ওয়ার ভয়ঙ্কর রূপ নিয়েছে। নন্দু ও নাড়ু ঘোষের ভয়ে কাঁপছে গোটা সুভাষনগর। বিপক্ষে ফাইট দিচ্ছে বিপুল-যাদব। সন্ধে হলেই যশোর রোডের উপর বনগাঁ-রাণাঘাট এক নাম্বার লেভেল ক্রসিংয়ের দখলদারী নিয়ে হামলা হচ্ছে রোজই। রোজ বোমা-পেটো-গুলির শব্দ! কেশবলাল মাঠেও পড়ছে বোমা। ফাঁকা মাঠে নতুনরা হাত পাকাচ্ছে। এই বোমা-বারুদের ধোঁয়ার ভিতর থেকে উঠে এসে একজন যাত্রাসম্রাট বাংলা কাঁপাচ্ছে তখন!
‘ত্রিদিব ঘোষ’—এই নাম যে শুনেছি কত, কিন্তু ভিটেবাড়িটা দেখলাম এই প্রথম! আমাদের মারদাঙ্গা পাড়ায় এসব ভাবাটাই দিবাস্বপ্ন!
কেশবলাল মাঠে ত্রিদিব ঘোষের অভিনয় দেখেছি পরে। খলের ভূমিকায় যদুদার বন্ধু ত্রিদিব। উৎকট হাসছেন মঞ্চে। মাইকে কাঁপছে চতুর্দিক। আমার কাছে তখন বাস্তব আর মঞ্চকল্প গুলিয়ে যাচ্ছে! আমি যেন দেখতে পারছি অন্ধকার কেশবলাল মাঠের মাঝ-বরাবর তিনটে লাশকে রিকশাভ্যানের চালায় তুলে নিয়ে গেল কারা! তারপর তো এক খুনিও খুন হয়ে গেল বখরা নিয়ে ঝামেলায়। শেষে চারটে লাশ বনগাঁ-শেয়ালদা রেললাইনের ধারে, পাটখেতে!
মনে পড়ে যায় অনেক কিছুই— অনেক রক্ত, অনেক প্রেম, অনেক কেক-পাউরুটির ঘ্রাণ। মনে পড়ে ধীরেনখুড়োর নির্বাক তলোয়ার, যদুদার উত্তমহাসি, ত্রিদিব ঘোষের মঞ্চ কাঁপানো বীভৎস উপস্থিতি। তবু তো যাত্রা ছিল পাড়ায়, গোটা গ্রামে, গোটা বাংলা জুড়ে। এখন নেই। নেই বলেই হয়তো গত ২৯ জুন বড় বেশি নীরবতার ভিতরই চিরদিনের মতো ত্রিদিব ঘোষ হারিয়ে গেলেন যাত্রা থেকে!