দৈনিক কবিতা আশ্রম, ২৩ আষাঢ় ১৪২৭
আবহমান বাংলা ভাষা
দৈনিক
২৩ আষাঢ় ১৪২৭
সন্মাত্রানন্দ
বিশৃঙ্খল লাইন
সবাই তার খোকামির কথা কানাকানি করছে,
সে শুনতে পাচ্ছে না
সবাই ঘৃণায় থু থু করে থুথু ছেটাচ্ছে,
সে শুনতে পাচ্ছে না
সবাই ক্রোধে হুঙ্কার করছে,
সে শুনতে পাচ্ছে না
সে একমনে শান দিয়ে চলেছে অস্ত্রে
তার কপালের শিরা ফুলে উঠেছে হিংসায়
তার পেশীতে সে মেখে নিয়েছে ধর্মের আঠা
তার শ্রুতি নেই, শৈশব নেই, যৌবন নেই,
বন্ধু নেই
কোনও মা হাত রাখেনি তার মাথায়
কোনও পিতা চুম্বন করেনি কপালে
কোনও বোন খুনসুটি করেনি
কোনও নারী তাকে উন্মথিত করেনি
গভীর আলিঙ্গনে
সে স্নেহ বোঝেনি, তিরস্কার বুঝেছে
ক্রোধ বোঝেনি, রাগ পুষে রাখতে শিখেছে
রতিক্রীড়া শেখেনি, ধর্ষণ শিখেছে
প্রার্থনা মানেনি, চিৎকার হেনেছে
এবং সে বিতর্ক করতে জানে না
হত্যা করতে জানে
কাকে সে হত্যা করছে, কাকে?
নিজেকে।
কার রক্ত সে হাতে মেখে নিচ্ছে, কার?
নিজের।
কার জন্য সে কবর খুঁড়ছে, কার জন্য?
নিজের জন্য।
কার থেকে সে পালাতে চায়? বলো, কার থেকে?
নিজের থেকেই।
এই মানুষটিও আমার অসুস্থ ভাই,
আমি তার শুশ্রূষা জানি না,
আমি ক্ষমাপ্রার্থী!
আপনারা আমাকে ক্ষমা করুন।
হরগতি চক্রবর্তী
ডোম্বিনী
যেদিন জগদ্দল থেকে স্বেচ্ছা নির্বাসনে
তোমার প্রেমে কৃষ্ণাচার্য কাহ্ন হল
মঠের আচার্য পদ ছেড়ে—সেদিন
চাণক্য মনু ব্যসদেবের আটন খান খান
মধ্যরাতে সূর্যোদয় হলে কাহ্ন পথের রাজা
আর তুমি তার হৃদয়েশ্বরী গরবিনী রানি
তোমার পায়ের নীচে জাতি ঘৃণা
শিক্ষা পদ অভিমান ধর্মাধর্ম বাণী।
সুবীর সরকার
কোলাজ
এই, কায়দা থেকে সরিয়ে নাও কৌশল
অন্ধকারের গায়ে হিম ছুড়ো না
সুপারিকিলারের বউ একদিন খুন হয়ে গেল
সিনেমাহলের সামনে
মরাকান্নার মত কাক ডাকে
কতদিন নষ্ট শাওয়ারের নীচে দাঁড়ানো হয়নি
আমারও ব্যথা আছে
রবিশস্য ভরা মাঠে মাঠে এঁকে রাখতে থাকি
গুহার ছবি
ঝরনায় ঝরনায় ঘুরে বেড়ান পাখি আমি
ফুরিয়ে যাওয়া আমার অভিধানে নেই
আমাকে বাতিল ভেবে প্লিজ একটুও হাততালি
নয়
শালকাঠের সিন্দুক থেকে বের করে আনা
পুঁথি
কাদা ও কায়দায় দ্যাখো
কীভাবে মিশে থাকে কৌশল
কাকলি চট্টোপাধ্যায়
আয়না
তোমাকে ভালোবেসে
পাখির চোখ পড়তে শিখেছি।
তারপর কেটে গেছে
অগণিত ব্যর্থ মুহূর্ত—
আজ তুমি নেই…
পাখিও নেই!
বিরান ভূমি জুড়ে ছড়িয়ে
কিছু আধপোড়া ভাষা,
খুঁটে খুঁটে আমি আঁচলে বেঁধে নিই।
আঁতিপাঁতি করে খুঁজি সেই চোখ ;
পোড়ামন বোঝে না…
সব চোখে আয়না থাকে না ।।
আলসের বিল
অমিতকুমার বিশ্বাস
পর্ব-১০
ছায়া
রাতগভীরে নিঃসঙ্গ ঢ্যাঙালোকের মতো চাঁদটা শুয়ে আছে দেখে এগিয়ে যাই আলসের বিলে। এখানে ধানের নাড়াগুলো জলের ভিতর নড়ে খালি। এখানে ডোবাজমির উপর জলচাদরও নড়ে মৃদু-মৃদু। এখানে পাটখেতের আলে উবু-হয়ে-বসা একটা ছায়াও নড়ে ওঠে অকস্মাৎ! আমি বলি, “কে? কে ওখানে?” চাপা গলায় ছায়াটা বলে, “আপনি কে?” তারপর আমার মুখের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, “ও, আসুন আসুন, আমার প্রিয় দেশ! আপনার নামই জপ করছিলাম এতসময়। এই দেখুন না কাল থেকে পেটে কিছুই পড়েনি আমার। একফোঁটা জলও না। জলকাদার ভিতর শুয়ে-শুয়ে কাঁদছি কেবল। কোনও এক অসহায় মা ফেলে গেছেন আমায় গতরাতে। দুটো কুকুর চেষ্টা করেছিল ছিঁড়ে খাওয়ার। ঠিক সেই সময়ই কালুপুর থেকে কতগুলো শেয়াল ডেকে ওঠে!” আমার ভয় লাগে। পালাতে ইচ্ছে হয় আপ্রাণ। ঠিক তখনই ছায়ার ভিতর নড়ে ওঠে আর-একটা ছায়া, “প্রিয় দেশ, আমরা পাঁচ-ভাইবোন মায়ের সঙ্গে লাইনপাড়ে থাকি। আমাকে কোলে নিয়ে ভিক্ষা করে আমার মা। মায়ের খুব জ্বর। পরশু সকালে দিন-প্রতি কুড়ি টাকা ভাড়ায় আমাকে নিয়ে গেল একজন। আমাকে দেখালেই নাকি এক থেকে লাফিয়ে দশ টাকা আসে জবর! তাই। কিন্তু এসবে আমার যে কষ্ট হয়। খিদে পায়। কান্না পায়। কিন্তু কাঁদলে খুব মারে। সেখান থেকে পালিয়ে সোজা আপনাকেই খুঁজতে এলাম!” আমি ঘামতে থাকি। শরীর অবশ হয়ে আসে। ঠিক তখনই ছায়ার ভিতর আরও একটা ছায়া নড়ে ওঠে যেন! বলে, “প্রিয় দেশ, আমার মা একজন শ্রমিক। শ্রমিকের আবার জাত-বর্ণ-ধর্ম-গোত্র কী? তবু লোকে তাকে বেশ্যা বলে। প্রতিদিন সে আমাকে কোলে নিয়ে কলকাতার একটা ঘুপচিঘরে যায়। আট-দশজন লোক সেই ঘরে আসে। চলেও যায়। আমি তখন খাটের নীচে শুয়ে-শুয়ে কাঁদি। মাঝে-মাঝে আমার মুখে কাপড় গুঁজে দেয় বুড়ি মতো কেউ একজন। মা কিছু টাকা পায়। কিছুটা পায় না। একদিন খুব সকালে ঘুম ভাঙে আমার। মায়ের সঙ্গে যাব। হঠাৎ মা বলে আমি নাকি বড় হয়ে গেছি। তাই সে একাই কাজে চলে যায়। মা কাল থেকে আর ঘরে ফিরছে না দেখে খুঁজতে বেরিয়েছি। তুমি কি দেখেছ তাঁকে?” আমি ভয়ে-ভয়ে মাথা নাড়ি। চোখ নাড়ি। মুখ নাড়ি। আমার মুখ থেকে শব্দ বেরোয় না কোনও। ঠিক তখনই ছায়াটা নড়ে ওঠে আবার। এবার যেন অন্য কন্ঠ, “ প্রিয় দেশ, পাগলিটা নিজের বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে গেলে বেঁচে যায় বাড়ির লোকজন। কিন্তু একদিন পুলিশ খবর দেয় তাদের মেয়ে হাসপাতালে, আর তাঁর পেটে কিনা আমি বড় হচ্ছি রোজ একটু-একটু করে। কারা যেন জোর করে বীজ পুঁতে গেছে। পাগলিকেও ছাড়ে না ওরা! বাড়ির লোকজন খবর পেয়ে হাসপাতালে আসে। মাকে সঙ্গে নিয়ে যায়, কিন্তু আমায় নেয় না কেউ। অবাক হই। আরে আমি তো আর সেটিং করে আসিনি কার গর্ভে আসব! মনটা ভারী খারাপ হয়ে যায়। ভাবলাম আপনি নিশ্চয়ই এর একটা বিহিত করবেন। তাই আপনার খোঁজেই চলে এলাম।” আমি গুটিয়ে যাই, দলাপাকিয়ে যাই। ছায়াটা আবার নড়ে ওঠে যেন, “প্রিয় দেশ, একটু বড় হলেই আমি স্কুলে যেতে শুরু করি। সেখানে মিড-ডে মিল খাই। বড্ড নোংরা পরিবেশে নোংরা থালাবাসনে ঝালনুনহীন সস্তা খাবার পোকালাগা খাবার রাঁধা হয়। তাই খাই। মাসিদের কাছে আর-একটু চাইলে খ্যাঁচ করে কামড়াতে আসে! তবু চাই। ওই একবেলাই তো পেট পুরে খাই আমরা। স্কুল বন্ধ থাকলে কান্না পায় খুব। রাস্তার পাশে খাবার দেখে দু-হাতে নাকমুখ ঢেকে রাখি। শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। তবু বজ্জাত ঘ্রাণটা ঢুকে যায় শরীরে। জিভে জল আসে। ভাবি, আপনি এর ব্যবস্থা নেন না কেন? ক্ষুধার্ত মানুষের কাছে প্রকাশ্যে এটা কি গন্ধদূষণ নয়? এক প্লেট বিরিয়ানি তো আমার বাপের সারাদিনের আয়! তার অর্ধেক টাকায় যে চাল আসে তা ফুটিয়ে আমরা নুন মেখে খাই সকলে।” ছায়াটা হঠাৎ বড় হতে থাকে ক্রমশ। বড় হতে-হতে ঢ্যাঙা লোকটাকেই আস্ত গিলে খায়। যেন সাপের বিরাট হা-এর ভিতর একটা ছোট্ট ব্যাঙ! ছায়াটা আমাকেও গিলে খাবে বুঝি-বা! খিদের সামনে আর একদণ্ড দাঁড়াতে আমার সাহস হয় না। আমি পালিয়ে যেতে চাই। কিন্তু আমার পা নড়ে না একটুও। কারা যেন জাপটে ধরে আছে আমার পা-দুটো। ভয়ে মুখ থেকে নাভি পর্যন্ত বেরিয়ে এসেছে আমার জিভ! প্রেতছায়ার বিল থেকে আমার ফেরা হবে না হয়তো আর। মায়ের মুখটা মনে পড়ে খুব। আমার তেষ্টা পায়। আমার শীত লাগে। শেয়াল আর ঝিঁঝির ডাকে কানে তালা লাগে। তারই ভিতর হঠাৎ এক সমবেত কন্ঠে শুনি যেন, “আমরা লাইনপাড়ে থাকি ফুটপাতে থাকি ঝুপড়িতে থাকি স্টেশানে থাকি রিফিউজি ক্যাম্পে থাকি পাইপের ভিতর থাকি। আমার পাঁচকোটি ভাইবোন এভাবে সারা দেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকি। আমাদের ধর্ম ক্ষুধা বর্ণ ক্ষুধা জাতি ক্ষুধা এমনকি ভাষাও ক্ষুধা। কেবল আমাদের দেশ হলেন আপনি! আমাদের এক দাদা ক্ষুধায় ধরা দিল ওদের হাতে। সে ডাকাতি করল। খুন করল। একদিন মরেও গেল গণপিটুনিতে। ওদের ওই কালো হাতে আমরা কেউ ধরা দিতে চাই না, প্রিয় দেশ। আমাদের সামান্য গরম ভাত দিন। কাগজ, কালি আর রং-পেনসিল দিন। আমরা শুধু আপনার একটা রঙিন ছবি আঁকতে চাই।”