দৈনিক কবিতা আশ্রম, ২৪ আষাঢ় ১৪২৭
আবহমান বাংলা ভাষা
দৈনিক
২৪ আষাঢ় ১৪২৭
প্রদীপ দে
যাওয়া আসা
চলে যাবার সময় পথের দুধারে রেখে গেলাম
বিষণ্ণ জলের ঢেউ,
নাকছাবির মতো সাংসারিক ভ্রম।
যত্নে পাহারা দিও দৃশ্যমান পথ, অদৃশ্য আঁচড়।
আদরে আদরে ধুইয়ে দিও
ব্যর্থ মানুষের নিবিড় ছায়া।
বিজন বন পুড়ে গেলে
মৃতবৎসা নদীটির পাশে ফেলে দিই খোলস,
মুঠো খুলে ছড়িয়ে দিই শীৎকার ধ্বনি।
আমার জন্য সাজিয়ে রেখেছ প্রহর, আলোর কুচি?
উদ্দামহীন রাতের পাশে বাজিয়ে চলেছ
অপ্রমত্ত বাঁশি!
অপেক্ষায় থাকি, ব্যথার বুদবুদ শেষ হলে যেন
সাঁকো পেরিয়ে ফিরতি পথে কুড়িয়ে নিতে পারি
অপরাহত মোহ ও মায়া।
অরিজিৎ পাঠক
কবিতা
আমার বসার ঘরে তিনটি ট্রফি সাজানো আছে
লোক এলে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখাই
প্রথমটি পেয়েছিলাম একবার
একটা খেলায় জেতার পর
দ্বিতীয়টি গভীর রাতে সিঁধ কেটে চুরি করে এনেছি
তৃতীয়টি কেড়ে নিয়েছিলাম জোর করে
তার হতভাগ্য বিজয়ীর থেকে
তিনটি ট্রফিই আমার ঘর আলোকিত করে
তিনটি ট্রফির নীচে
একই দোকানের নাম লেখা
অনঞ্জন চট্টোপাধ্যায়
ডুয়ার্স-রাতে
পাতলা নদীর জলে জ্যোৎস্নারা নেমে এল
জল খাবে বলে,
জলের ঠিকানা তাই একফালি আকাশে,
গাঢ় কোলাহলে,
এখনও সম্মোহনে গাছেরা সরে গিয়ে
রুপোলি তরল,
অতনু জ্যোৎস্না মেখে নিকষে গান গেয়ে
আলুথালু জল।
সম্ভ্রমে আড়ি পাতে দুর্জয় মহাকাল
মূর্তি চন্দ্রতটে,
রাতপাখি মান করে, যোগিনী নিদ্রা ভোলে,
শ্বাপদেরা ছোটে।
সাঁকোপাড়ে টেনে নিয়ে সাক্ষী রাখে তারা,
অগম্যার ডাকে,
অতীন্দ্রিয় মূর্ছনায় তীক্ষ্ণ গানে ভরা
আঁধারে পুলকে,
অপরিচিত আবছায়, পাতার খসখসে
অরণ্য ঘনায়,
নিশাচর পোকাদের ঝমঝম, টুপটাপ
আওয়াজ পাতায়,
ধীরে কালো অরণ্যের মাথার ওপর
জ্যোৎস্নারা থইথই,
নিশাচরে সম্মোহন ভেঙে দিয়ে বলে-
ফেরার পথ কই!
ইমেল নাঈম
বিসর্জন
এখানে অজস্র বিসর্জন লেখা
সস্তা ভেবে উড়িয়ে দিচ্ছি সব আবেগ
নীরবতা পান শেষে— অবজ্ঞায় হাসে
একমুহূর্ত প্রহর,
নির্বিকার শব্দগুচ্ছ উড়িয়ে জানাচ্ছি
আগুনের দিন ফুরিয়ে এল ক্রমশ।
চুপিসারে পালিয়ে যায় বখাটে মেঘ
দৌড়ে যাই অচেনা মরীচিকায়,
ক্লান্তি নামলে বুঝতে পারি—
অধরা হয় স্পষ্ট দৃশ্যমণ্ডলী।
সময়কে আগলে রাখছি
এখন যৌবনকাল
অথবা দুরন্ত কৈশোরের শেষ
আমাদের বড় হওয়ার গল্প
প্রায়ই ভুল কালিতে লেখা হয়…
এখানটায় বিসর্জনই লেখা আছে
ভাঙাচোরা দেয়ালের পলেস্তারা
খসার মতো খসছে অনুভূতি,
আমরা দেখছি নিজেদের বিবর্তন।
আলসের বিল
অমিতকুমার বিশ্বাস
পর্ব-১১
সাপলুডো
বিলপাড়ে তখন সাপের উপদ্রব খুব। বাড়ি বাড়ি তাই মনসার থান। দেবী রুষ্টা হলেই রক্ষে নেই!
আমাদের ভিটেবাড়ির কাছেই মনসাবাড়ি। দূরদূরান্ত থেকে লোকজন আসে সেখানে। লাল-পেড়ে সাদা শাড়ি পরে মনসাবাড়ির ‘মা’ তখন মাথা ঝাঁকিয়ে-ঝাঁকিয়ে এলোকেশ ছুঁড়তে থাকেন আর মন্ত্র আউড়ে যান একনাগাড়ে। একসময় ‘মা’-এর উপর মা-মনসা ভর করেন। ‘মা’-এর স্বামী তখন ‘মা’ ‘মা’ করে ডেকে উঠলে তাঁকে ভর-পড়া-কণ্ঠে শান্ত করেন খোদ ‘মা’। তারপর ভিড় থেকে এক-এক করে প্রশ্ন আসে, ‘মা, মা গো! আমার সোয়ামি যে অন্য জায়গায় মন দেছে। তারে তুমি ঘরে ফিরাও, মা!’ ‘মা’ অভাগিনীর স্বামীকে ঘরে ফেরানোর উপায় ও আশ্বাস দেন ভর-কণ্ঠে। তাঁর স্বামী ফিরেছিল কি না খবর পাইনি। তবে হাজার হাজার মানুষ কিন্তু মায়ের কাছে আসত, আটআনা-বারোআনা দক্ষিণা দিত। সেখানে ঘণ্টা হত, কাঁসর হত, শঙ্খধ্বনি-উলুধ্বনি হত, ধূপধুনো হত— এলাকাটা অলৌকিক আবহে জমে উঠত একেবারে। সাপের ছোঁবল খেয়ে জীবনে ফেরার পর আমিও যে কত গেছি সেখানে মায়ের সঙ্গে!
এই মনসাবাড়িতেই রাঙাবউকে আসতে দেখতাম প্রত্যেক শনি-মঙ্গলবারে। কিন্তু বউটি কার, কোন পাড়ায় থাকে, জাতিতেও-বা কী— এসব কিছুই জানতাম না। জাতপাত আমাদের গ্রামে আগের মতো এখনও ভয়ঙ্কর— তবে প্রশ্ন করলে নেই, অনুভব করলে আছে। সম্ভবত গোয়ালপাড়া থেকেই আসে সে। প্রত্যেকদিন শেষ মুহূর্তে আসবে, আর ঠিক আমার পাশে হাতজোড় করে বসেপড়বে। পরনে লাল-পেড়ে সাদা শাড়ি, পায়ে আলতা, কপালে লম্বা সিঁদুর, মাথাটা চুলে ভরা। দোহারাকে অতিক্রম করেছে সবে। ধূপধুনোর উগ্র গন্ধের ভিতর, অজস্র ফুলের সুমিষ্ট ঘ্রাণের ভিতর তাঁর উপস্থিতির একটা ভিন্ন ঘ্রাণ পেতাম আমি। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, ‘মা’-কে কোনওদিন কোনও প্রশ্ন করত না সে! তবে কেন আসে? সুখিরা তো কেউ আসে না এখানে! আমিও কোনো প্রশ্ন করি না যদিও। আমার মা করেন। তাঁর প্রশ্ন ফুরোয়ই না। ভাবি, বারোআনায় এতগুলো প্রশ্ন মঞ্জুর করেন কীভাবে মা-ঠাকরুন?
মাঘীপূর্ণিমায় মনসাবাড়িতে বিরাট উৎসব। রাতে মনসাভাসান। সারারাত হ্যাজাক জ্বেলে অভিনয়। আগে বর্ষায় হত, তখন খুব বিপদ হত সকলের। অগত্যা এই মাঘ। পাড়ায় বিদ্যুৎ এলে-পরে টুনি-টিউবের কী চমক! তবে সকল চমক ফিকে করে দিত বুঝি এই রাঙাবউ। সেদিন যে রঙিন শাড়িতে থাকত সে! একটা বাঁশের খুটিতে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকত সারাক্ষণ। হ্যাজাকের আলোটা মুখে পড়লে দেবতারাও চঞ্চল হয়ে পড়ত বুঝি-বা! ইচ্ছে হত সারারাত সেদিকেই তাকিয়ে থাকি। কিন্তু লক্ষ্মীন্দর-কে সাপে কাটার আগে-আগেই মা আমাদের দুই ভাইয়ের হাত ধরে হিড়হিড় করে টেনে বাড়ি নিয়ে আসতেন। মরা দেখলে নাকি বেঁচে ওঠাও দেখে যেতে হয়, আর তা হতে-হতে সকাল প্রায় সাত-আটটা! আকাশে মাঘীপূর্ণিমার চাঁদ মেঘশাড়ির ভিতর লুকোচুরি খেলে চলেছে। কত তারা চারপাশে তার! আর এই পৃথিবীতে আমি কিনা একা! কেন এমন মনে হয় আমার? ভাবি, ভাবতেই থাকি, আর চাঁদের দিকে তাকিয়ে থাকি বোকাহাবার মতো। চাঁদকে প্রশ্ন করি নীরবে, ‘রাঙাবউ ওভাবেই কি দাঁড়িয়ে থাকবে সারারাত? কষ্ট হবে না?’
মাইকে বাকি পালাটা শুনতে থাকি। লক্ষ্মীন্দার মারা যায়। কান্নার রোল ওঠে। কান্না শুনলে কান্না পায় আমার। বুক ফেটে যায়। মুখটা হাত দিয়ে ঘষি বারবার। চোয়ালে চাপ দিই জোরে। এভাবে অশ্রু লুকোই। মা বলেন, ‘বিটামানসির কানতি নাই!’ আমি কাঁদি না। বরং ভাসান শুনতে-শুনতে ভেলা-চড়ে দূর সমুদ্রে কোথাও ভেসে যাই।
আর-একটু বড় হলাম। দাসেরা তাঁদের ভিটে-সংলগ্ন বিলের বড় জমিটায় প্রকাণ্ড এক পুকুর কাটাল। খেজুরগাছ ফেলে ঘাটও বানাল। স্নান আর সাঁতারের ধুম পড়ে গেল পুকুরে। আমি তখনও সাঁতার পারি না। ভয়ে-ভয়ে জলে নামি। ঘাট ধরে কোমর সমান জলে গিয়ে দাঁড়াই। তারপর নাক টিপে দু-ডুব দিয়েই পালাই।
সেদিন দেরি হল স্নানে। ঘাট বেয়ে উঠছি, দেখি সামনে রাঙাবউ! বারবার পেছন ফিরে তাকাই, সত্যি দেখলাম তো?
হ্যাঁ, সত্যই!
নির্জন পুকুর। রাঙাবউ একা একা সাঁতার দেবে নিশ্চয়ই— পুকুরের এপার থেকে ওপার। ঈশ্বর বুঝি মহাকাশ থেকে দেখবেন একা-একা!
আবার সাপে ছোবল দিল আমায়! তারপর থেকে মনসাবাড়ি যাওয়া বন্ধ করলাম।
এই ছোঁবল নিষিদ্ধ ফল পাড়ার! প্রত্যেক পুরুষই একটা বয়সে তার দ্বিগুন বয়সী নারীকে কামনা করে। পাপবিষে জ্বলেপুড়ে ছাই হয় অবুঝ মন। এ-বিষ নামে না কিছুতেই! আমি পুকুরে যাওয়াও বন্ধ করলাম।
একবছর হয়ে গেছে রাঙাবউয়ের সঙ্গে দেখা হয়নি। সে বেঁচে আছে না মরে গেছে সে-খোঁজও নিইনি। কিন্তু এতদিনেও বিষ নামেনি একটুও। বরং জ্বালাপোড়া বেড়েছে। এদিকে পোড়ামন আমার ‘আমাগো’ পাড়াভরা বিজয়গীতি গায়,
“কি সাপে কামড়াইলো আমারে
ওরে ও সাপুড়িয়া রে
জ্বলিয়া পুড়িয়া মলেম বিষে।।
ওগো বিষ উঠাইছে
বিষোনালে রক্তের সনে মিশে
ও সাপুড়িয়া রে।।”
সেদিন দুপুরে কী মনে হল ডেগাদের বাড়ি গেলাম। ডেগা নেই। গোবিন্দদের বাড়ি গেলাম। সে বিলে কাঁকড়া ধরতে গেছে। আমারও কী মনে হল, একটা লাঠি ভেঙে কাঁকড়া ধরতে নেমে পড়লাম একা একা। গর্তের মুখে একটা কাঁকড়া দেখেই গর্তের গোড়া-পেড়ে ঢুকিয়ে দিলাম লাঠিটা। কাঁকড়াটা আর ফিরে যেতে পারল না গর্তে। বুড়ো-আঙুল ও তর্জনী দিয়ে দাঁড়ার নীচে খপ করে ধরার পালা। ব্যস, চাদুর চুদুরবুদুর খতম! কিন্তু সময়ের সামান্য হেরফেরে ধারালো দাঁড়ায় তর্জনী ফালাফালা।
ভীষণ ব্যথা নিয়ে ফিরে আসি পুকুরপাড় ধরে। ভাবতে থাকি, এখন মাকে গিয়ে কী বলি?
হঠাৎ ভীষণ এক আন্তরিক ঘ্রাণ আমায় শিহরিত করে! প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই এক নারীকন্ঠ, ‘রক্ত কেন? কী হল হাতে?’ সে নিজেই দৌড়ে আসে। ‘ইস্স্’ বলেই পাশে গাঁদাফুলের পাতা ডলে লাগিয়ে দেয় হাতে। তারপর আঁচলের কোনা খ্যাঁচ করে ছিঁড়ে বেঁধে দেয় সেখানে। “ভাগ্যিস সাপ না! সাপ হলেই কিন্তু…”
আমি চুপ। সে বলে, “মা দেখলে মারবে, না?” আমি ডাইনে মাথা নোয়াই। আবার বলে, “এই ছায়ায় নীচে এসে বোসো। রক্ত বন্ধ হোক। তার পর যেয়ো, কেমন?” আবার মাথা নোয়াই। “বোবাছেলে কোথাকার!” বলেই খিলখিল করে হাসতে থাকে সে। হাসিতে মুক্ত ঝরে, জ্যোৎস্না ঝরে, বৃষ্টি ঝরে! হাসতে-হাসতে রাঙাবউ ঘাট বেয়ে নেমে যায় জলে। সে-হাসিতে আমার কিশোরবেলা লজ্জা আর আনন্দে শিহরিত হয়ে ওঠে!
আমি বসে থাকি আমছায়াতলে। দেখি গলা পর্যন্ত জলে শরীর ডুবিয়ে ঘাটের খেজুরগুঁড়িতে গাছিদের রসকাটা শুকনো চোখের ’পর এক-এক করে সকল পোশাক খুলে রাখে। তারপর ফের হাসে। হাসতে-হাসতে ডুবসাঁতারে কোথায় যে হারিয়ে যায় এই নির্জনে! আমি তাকিয়ে থাকি যেখান থেকে হারিয়ে যায় সে। জল এখনও ঘুরপাক খায় সেখানে। আমি তাকিয়ে থাকি ঘাটে-’পর-রাখা পোশাকের দিকে। কৃষ্ণঠাকুর গোপিনীদের পোশাক নিয়ে গাছে লুকিয়ে ছিলেন একবার। আমারও গোপন ইচ্ছে হয় খুব সেগুলো বুকের সঙ্গে জাপটে নিয়ে পালিয়ে যাই আলসের বিলে!
আমার কাটা হাতটা টাঁটিয়ে ওঠে। ‘আহ্’ বলে আর-একহাতের মধ্যে ঢুকিয়ে নিই যত্নে। দেখি আমার কাটা হাতটা তাঁর আঁচলের টুকরো দিয়ে জড়ানো তখন। দেখি টুকরোটা গোটা একটা শাড়ি হয়ে গেল মুহূর্তেই! দেখি সেই ছায়াতল থেকে আমি ছুটে পালাচ্ছি আলসের বিলে সোজা। আর ঘাটে-রাখা তাঁর বাকি পোশাকগুলো সাপের মতো ফণা তুলে ছুটে আসছে পেছনে!
কতটা ছুটলাম?
আর পারছি না আমি।
হাঁপাচ্ছি।
অমনি আমায় টপ করে গিলে খেল একটা সাপ। কিন্তু কী আশ্চর্য, সাপটার লেজ দিয়ে বেরিয়ে আমি আবার ছুটতে শুরু করেছি বিলের দিকেই! আকাশে তখন স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি কৌটোর ভিতর কে যেন খটখট করে ছক্কাটা নেড়েই যাচ্ছে!