আবহমান বাংলা ভাষা

দৈনিক

২৬ আষাঢ় ১৪২৭

ছবি: সঞ্চিতা দত্ত

বিপ্লব ঘোষ

অলৌকিক

যখন পৃথিবীর সমস্ত যোদ্ধা

          ঘরে ফিরে গেছে শেষে….

         ঠিক তখন আমরা

মহাজাগতিক মেঘের রথে বসে

                      প্রহর গুনছি

                     আমি ও আমার মেয়ে।

 

একদিন অঘটন ঘটবে

জীবনের আদি সৃষ্টি জলের মতো

 

এক অলৌকিকের জন্ম হবে।

 

অলক্তিকা চক্রবর্তী

বাজনদার

জানি না এখনও অস্ফুটে কী যে বলো

কথা হয় নাকি মধ্যরাতের মেধায়

সরে যাওয়াটাই দেখিয়েছ ঘুরে ফিরে

চালচুলোহীন নিয়মেই গলা সাধা

 

বিপরীত সেই মুদ্রাটি কি এখনও

এঁটে বসে আছে জানলাটি খোলবার 

দায় তারও আছে হাওয়ার কাছেই শুনো

কীভাবে রোদের ব্যর্থতা বারবার

 

 

ছুটিরা নিজের নিয়মেই নেমে আসে

খণ্ড খণ্ড নিঃশ্বাস ডুবে যায়

জানি না অযথা হাতে পায়ে  বেড়ি দিয়ে

 কেমনে জীবন জটিলের পথে ধায়

 

 

মারপ্যাঁচগুলো তাকে তুলে রেখে জানি

আবার ভেজাবে চিঁড়ে থেকে জিরে কথা

সাজানো হাতের শৃঙ্খল খুলে ফেলে

নাচাবে শহর রমণীয় কপটতা  

 

তুমি মানে প্রেম শেষকথা তবু জানি

দরবারি না কি ইমন কেদার ছুঁয়ে 

রাগিণীর মতো বাজিয়ে চলেছো আজও  

পরমাত্মায় ওগো প্রিয়তম নেয়ে।

 

তাহমিনা শিল্পী

মনের ঘুঙুর

কুঞ্চিত কপালের মাঝে বয়ে চলে সরু নদী 

অমাবস্যায় দুঃখের জোয়ার ফুলেফেঁপে উঠলে 

ভাঙে দুপাড়, গুটিগুটি পায়ে নিরুদ্দেশ হই। 

আঁধারের এক একটি রাত শেষে 

পূর্ণিমার ঘ্রাণে জেগে উঠি। 

ভোরের চৌকাঠে দাঁড়িয়ে করি আলোর খোঁজ। 

আমার কোন ঘর নেই, স্বজন নেই, 

সর্বহারা আমি। 

ইথারে ভেসে আসে ডাহুকের ডাক 

বৃষ্টির রিমঝিম সুরে মিলেমিশে একাকার হই। 

শুদ্ধতা ছুঁয়ে যায় সবুজ ভূমি 

ক্রমাগত বাজে মনের ঘুঙুর।

 

সন্দীপন দাস

প্রক্ষোভ

এলোমেলো আলো চিরে ছুটে আসছে জেদি ঘোড়া
পথে মরে পড়ে আছে সন্ধেমণি ফুল, পাশে তুমি
তারও পাশে ঈশ্বর…
সব পাতা ঝরে গেলে গাছ চুপিচুপি মরে যায় বুঝি?
 
সন্ধ্যাতারা, বুড়ো ল্যাম্পপোস্ট, শূন্যতাও…
অভিমানী সূর্যাস্ত জল থেকে তুলে নেয়
গোপন জীবন…
 
ও আগুন,আমি তো ছায়ামাত্র
আমি বড়জোর লুকিয়ে তাকে, আর
তোমাকে পাতাল অবধি নিয়ে যেতে পারি…
পাতাল অবধি…
বারো পর্বের ধারাবাহিক

ঈশ্বরফুল

বিভাস রায়চৌধুরী

পর্ব-১

ঈশ্বরফুল

জ্বর নিজেই একটা কবিতা। 

আর কবিতা? সে চিরসবুজ সর্বনাশ! 

ভোরে উঠে শান্তিনিকেতন যাওয়ার কথা ছিল। দেখি মাথায় একটা ছোট্ট নদীর উঁচু পাড়। বুনো ঝোপঝাড়ে ভাঁটুই ফুল আসন্ন। ক’দিন পরে দলে দলে ফুটলেই এইসব নদীপাড়, মাঠঘাট হয়ে যাবে মিষ্টি গন্ধে ভরা আশ্রম। বাংলার ভাঁটফুলকে জীবনানন্দ ঘুঙুরের মতো নাচতে দেখেছিলেন বেহুলার পায়ে। কেউ বলে, বনজুঁই। 

তো জ্বরের ঘোরে শুনতে পেলাম ভাঁটুই মুকুল আমাকে বন্ধুর গলায় বলছে, “তোমার জীবনে পঞ্চাশ বার এলাম, একটা নাম দিলে না? তুমি কীসের কবি?”

শুনে হাউমাউ করে কাঁদছি। ‘কবি’ ডাক বহনের ক্ষমতা আমার ক‌ই? কিছুমিছু লিখে নানা ধান্দা করেছি, সাংসারিক প্রাপ্তির আশায় ক্ষমতাবানদের চারপাশে ল্যাজ নাড়িয়ে বেরিয়েছি, নিসর্গ-প্রেম-প্রতিবাদকে অনুভব না করেই লেখাপণ্য বানিয়ে বাজারে ছুটেছি—আমি কেমন করে কবি হব? আমি নিতান্তই একজন করে-খাওয়া মানুষ।

অপরাধবোধে জ্বর বাড়ছে। বিড়বিড় করে ডাকছি দেবতাকে, “বিভূতিভূষণ… বিভূতিভূষণ…”।

মাথা ভার। লাল-নীল তারা। হঠাৎ একদলা কুয়াশায়   সবকিছু মুছে দিয়ে  বিভূতিভূষণ এলেন। মাথায় হাত রাখলেন।  মুহূর্তে শান্তি নেমে এল যেন। এবারের কান্নাটা প্রায়শ্চিত্ত।

একটু পরে দীর্ঘ ঘুমে যাব। ভেজা গলায় বিভূতিভূষণকে বললাম, “ভাঁটফুলের দল একটা নাম চাইছে। আমার সাধনা নেই।”

ভোরের আলোর মতো হাসলেন দেবতা। এই হাসি বিষাদ সারায়।

বিভূতিভূষণ বললেন, “অনুতাপ‌ই দুঃখকে সুন্দর করে। সেই সুন্দর‌ই ঈশ্বর।  ঈশ্বর সভাপতি নন, ঈশ্বর এক নির্জন বিশ্বাস। কোনো না কোনো জ্বরের ভেতর যা প্রস্ফুটিত হয়। … এই ফুলের নাম দাও ঈশ্বরফুল…”

 

বিগত দিনগুলি পড়ুন