দৈনিক কবিতা আশ্রম, ২৭ আষাঢ় ১৪২৭
আবহমান বাংলা ভাষা
দৈনিক
২৭ আষাঢ় ১৪২৭
ছবি: সঞ্চিতা দত্ত
পিন্টু পাল
স্বপ্ন
কতটা অন্ধকার নামলে দু’চোখ স্বপ্ন দেখে
কতটা অন্ধকার থাকলে সেই সব স্বপ্ন
এক এক করে খুন হয়ে যায় ?
এই ধরো, সেই কবেই খুন হয়ে গেছে
দাদুর আলকাতরা মাখা জল ছেঁচা দোন,
বাবার প্যাডেল ভাঙা হিরো সাইকেল,
কিংবা উঠানে মায়ের বাঁশ দিয়ে ঘেরা
শিশুগাছের চারা
২.
অন্ধকার অর্ধেক। তাই, এখনও মাঝরাতে
ছাদে উঠে
আকাশের দিকে অবিরাম চেয়ে থাকি
কী-জানি কখন এসে
মিলে যাবে বোবাকান্না ও শিশিরপতন !
৩.
মাঝেমধ্যে ভাবি অন্ধ হয়ে গেছি
কতটা অন্ধকার জমলে দু’চোখ আর স্বপ্ন দেখে না
প্রিয় চোখ, তুমি ছুঁয়ে দেখনি ?
শান্তনু পাত্র
প্রহর
একা হব বলে কতবার ভিড় ছেড়ে ভিড়েছি অন্ধকারে
যৌথ সঙ্গমে দুইটি চোখের পাতা কাছে আসে
গভীরে নেমে যায় দুর্বল চুম্বনে, নিষ্পলক স্বরে
ঘুমস্পর্শে জেগে উঠি
ঘামস্পর্শে জেগে উঠি
খিদের কাছে অবৈধ ইশারাও পবিত্র হতে পারে
তানিম ইশতিয়াক
চিনতে পারো?
এই যে এলাম তোমার কাছে
নতুন বেশে
চিনতে পারো?
আগের যুগের জীবাশ্ম এক
বটেশ্বরের মাটিমাখা
হাড় করোটি গুনে দেখো
বাম বুকে কার নামতা লেখা
কেমন করে নড়ে চড়ে,
আজও কেমন ধুকপুকানি
চিনতে পারো?
কে এসেছে কোথায় গেছে
কাজ কী তোমার সেসব জেনে?
কিন্তু তুমি দাঁড়িয়ে গেলে
হঠাৎ কিছু পড়ল মনে?
চেনা স্বরের কুহক ডাকে
ঝাপসা কেমন দৃষ্টি তোমার
চোখের ভেতর বিষণ্ণ ট্রেন
জংশনে কার দেখা পেলে?
দেখলে কি আর ছুঁতে পারো, নাই-বা ছুঁলে,
কিন্তু কি আর আগের মতো
চিনতে পারো?
পিচঢালা পথ মরীচিকা
রাস্তা আঁকা পাঁজর-রেখা
সবটা তুমি মাড়িয়ে গেলে
কিংবা আমিই দিলাম ঠেলে
আজ সে পথের বাঁকে বাঁকে
চোখ পিটপিট তোমায় ডাকি,
শুনতে পারো?
আমার এখন বুক থেকে রোজ
বুদবুদিয়ে স্মৃতি ওঠে,
অন্ধ অতল নির্জনতায়
গন্ধরাজের ছন্দ ফোটে!
তুমি কি আর আগের মতো
আমার কথায় ঝুঁকতে পারো?
পার্লারে যা প্রলেপ মাখো
সেই কোলাহল পর্দা ছিঁড়ে
আনকোরা ঘ্রাণ শুঁকতে পারো?
এই যে তোমায় ডেকে গেলাম
দেখাও দিলাম
বুঝতে পারো?
অন্ধকারে হাত বাড়িয়ে, বিড়বিড়িয়ে
খুঁজতে পারো?
বাঁচতে জীবন কেমন মরো
কার সাথে রাত যাপন করো
তোমার এমন দিনগুলো ঠিক
নিজের বলে মানতে পারো?
ডুবল যে-জন তোমার চোখে
তার খবর কি জানতে পারো?
সেই চেনা রূপ অচিন সময়
ঋতুর বদল চিনতে পারো?
শৌভিক চ্যাটার্জী
বিষ
সাপ আর ময়ূরের সাথে কর্দমাক্ত
কৈশোর যাপনের পরেও;
সে যুবা,সর্পদংশনের ভয় পাবে!
তাও কি হয় নাকি!
কিন্তু তোমার বিষের থলি থেকে আজকাল
কান্নার আওয়াজ কেন আসে?
মরুভূ মরীচিকা কখনও সখনও নেমে আসেও
যুবা কলমের আগায়!বিভ্রান্ত পদ্যের ছদ্মবেশ।
সে কবিতাও কুম্ভক প্রাণায়ামের মতো,
মুক্ত করে অতীত দমবন্ধ শ্বাসবায়ু!
কিন্তু প্রায়শই, শ্যাওলা জলের অর্ধনিমজ্জিত
কুম্ভীর নিস্পন্দিত, নিষ্পলক চাউনি,
পড়তে ভুল করে তৃষাতুর হরিণ!
সবাই যে কবিতা করতে পারে না!
ঈশ্বরফুল
বিভাস রায়চৌধুরী
পর্ব-২
তদন্ত চলছে
বাংলাভাষার কিংবদন্তি কবি বিনয় মজুমদার কেমন ভাবে জীবন কাটিয়েছেন সবার জানা। কবি তাঁর নিজ সিদ্ধান্তে চলেছেন, এখানে আমাদের কোনো কথা চলে না। কিন্তু এত বড় একজন কবিকে এই সমাজ একটু ভাল অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থানের ব্যবস্থা উপহার দিতেই পারত। যারা মনে করেছে বিনয় বালছাল, তাদের কাছে কিছু আশা করিনি। কিন্তু বিনয়ের বিশিষ্ট অনুরাগীর সংখ্যা কম ছিল না। অনেকেই মাঝে মাঝে আসতেন। কেউ হালকা উপহারের বেশি ভাবেননি। আসলে ‘কবি’র প্রতি বর্তমান সমাজের দৃষ্টিই এরকম—দায়হীন শ্রদ্ধা এবং চর্চাহীন নামোচ্চারণ! কিছু কবিতালেখক যাঁরা চলতি সমাজে বেশ খাতির-টাতির পান, তাঁদের নিশ্চিত প্রভাবশালী অন্য পরিচয় আছে। তাঁদের রচনাও চর্চা করে না ভক্তবেশী সুবিধাপ্রার্থীরা। কবির দিগন্তজ্ঞান তাদের দরকার নেই, অন্য সুবিধার জন্য কবি ব্যক্তিটিকে দরকার আছে। কলকাতা, পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, দুর্গাপুর, ঠাকুরনগর, বনগাঁ, কাকদ্বীপ, শিলিগুড়ি বা মালদা, মেদিনীপুর—সব জায়গায় একই ছবি। সমাদৃত বা উপেক্ষিত, সব কবির প্রতিই সমাজ উদাসীন। কবির দান বুঝবে কী করে ভোগবাদী সমাজ?

সেদিন গভীর রাতে আনন্দবাজার পত্রিকার বিশিষ্ট সাংবাদিক সীমান্ত মৈত্র যখন ফোন করে বলল বিনয় মজুমদারের সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কারের স্মারক চুরি হয়েছে, আমার অবাক লাগেনি। গ্রাম্য তাচ্ছিল্যের দৃষ্টি আর নাগরিক ভুয়ো খাতির-দৃষ্টির মধ্যে তফাত কোথায়? বরং চোর কেন ওই স্মারককে চুরির যোগ্য মনে করল—এতেই আমি অবাক। সে কি ঘর সাজাবে এমন কোনো খদ্দের পেয়েছে?
সাংবাদিকরা সক্রিয়। পুলিশি তদন্তে কী উঠে আসে দেখি।
এই চুরির বিষয়ে বিনয় মজুমদার স্মৃতিরক্ষা কমিটি-র সম্পাদক শিবেন মজুমদার ফেসবুকে যে কথা জানিয়েছেন, তার কিছু অংশ তুলে ধরছি—
“সকলের অবগতির জন্য লিখছি। গতকাল ৩০/১২/২০১৯ কবি বিনয় মজুমদার সাধারণ গ্রন্থাগারের দরজার KNOP ভেঙে গ্রন্থাগারে ভিতরে প্রবেশ করে স্টিলের আলমারি থেকে ‘কে’ বা ‘কারা’ বিনয় মজুমদারের ‘সাহিত্য অকাদেমি’ পুরস্কারটি চুরি করে নিয়ে গেছে। গাইঘাটা থানায় FIR করা হয়েছে। পুলিশ দ্রুততার সহিত তদন্ত শুরু করেছে। DSP, O.C সহ একাধিক পুলিশ আধিকারিক ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। তদন্ত চলছে।”
বিনয়দা নিশ্চয়ই এখন সারা মুখে রহস্য ছড়িয়ে তাঁর বিখ্যাত হাসিটি হাসছেন!