দৈনিক কবিতা আশ্রম, ২৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭
আবহমান বাংলা ভাষা
দৈনিক
২৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭
ছবি: পপিতা দত্ত
সুকৃতি
বিনয়ানন্দ ঠাকুর
এই মুহূর্তে কোথাও যাব না আমি।
সূর্যের ভিতরে খনন চলছে…
সেখানে সালফিউরিক অ্যাসিড আর
জিঙ্কও রয়েছে, তাও অশুদ্ধ আর
সালফিউরিক অ্যাসিডটাও লঘু।
লঘু মানে জল আছে সেখানে, সূর্যের থেকেও বেশি
জল নিয়ে সূর্য জ্বলছে… আমিও
জ্বলছি অথচ কোনও আলো দেখাতে পারি না!
এর চেয়ে যদি আমি জোনাকি হতেম
দু-এক দিনের জন্য মাঝে মাঝে
মরার জঙ্গল অতিক্রম করে
বন্ধুদের বাড়িতে যেতাম, ভাল হতো
হঠাৎ বাবুই কোনও ঠোঁটে করে নিয়ে তার
ঘরের দেয়ালে রাখা গোবরে বসিয়ে দিত
আর আমি কবিতা পড়তাম সারারাত…
বাবুই ভাবত ঘরে প্রদীপ জ্বলছে।
কাজী নাসির মামুন
মৃত্যু
আমি কতদিন জীবন নামক পরিধির
প্রান্ত খুঁজে খুঁজে
শালিক বনের বাঁশপাতা
বিকল্প ভেবেছি।
বাঁশপাতা একটা সবুজ চাকু, সেই রঙে
আচ্ছন্ন বাতাস ঝির ঝির
কম্পনে জেগেছে;
বলেছে, জীবন্ত রেখা, তুমি
বৃত্তের ঘূর্ণনে বেঁচে থাকো, পরিধির সব বিন্দু
কেন্দ্রের নিজস্ব পাখি; ডানায় লালিত
কত মেঘ, ঝঞ্ঝা, বজ্রনিনাদ সফল
শ্রমের বিদ্যুতে জীবন রাঙায়।
রঙ খুঁজো, রঙে রঙে সয়লাব
আত্মার সকল ফুলে
ভ্রমর বসবে মধু নিতে।
ওটা মৃত্যু। ওকে গন্ধ দাও!
শুধু গন্ধ দাও!
অনিমেষ সরকার
ঈশ্বরী তোমাকে
অন্ধকারে মুখ নামিয়ে ভেসে আছি দেখো! আলো নেই মানুষ নেই, অদ্ভুত গন্ধে ভরা শহর। বহুদিন পর দেখলাম ঈশ্বরী এই মানুষের কান্না কীভাবে বদলে দিতে পারে আরও দশটা মানব বৈচিত্র। ঈশ্বরী আমি না পাওয়ার এই মায়ামৃগ ত্যাগ করতে চাই। গতকাল যত ফানুস উড়ে গেছে আকাশের দিকে পুরো আকাশটাই ঘোলাটে, পুরো আকাশটাই মেঘময়। ছায়া প্রচ্ছন্ন শরীর দেখা যায়। হাহাকার দেখা যায় ভেসে আসে মানিয়ে নেওয়ার আবেদন।
আমি এত দায়িত্বশীল হতে চাই না আদরের ভাগে আমারও কিছুটা অংশ থাক আমিও চাই, ভোরের কুয়াশায় হাঁটতে হাঁটতে চিৎকার করলেও যেন কেউ মুখ দেখতে না পায়।
যেভাবে রোজ তুমি মিশে যাচ্ছ বেইমানদের ভিড়ে, ব্লক করে রেখে দিচ্ছ অনুরোধ, আমিও ওই ছৌনাচের দলে মিশে যেতে চাই,নিজেকে লুকিয়ে আনন্দ দিয়ে যেতে চাই। নাইবা কেউ মনে রাখুক, নাই বা কোনো আঁচল মুখ মুছিয়ে দিক ঘেমে যাওয়া অতীত তার।
ঈশ্বরী এরপর আমি শুধু আমার জন্যই, এই নষ্ট হয়ে যাওয়া আত্মার জন্যই প্রার্থনা করব ঈশ্বরের কাছে, সে থাকুক বা নাই থাকুক, মানুষের ভিড়ে মৃত্যুদূত যদি এসে বসে থাকে সেও সই…
বিশ্বজিৎ
মৃত্যু
চাবি খুঁজছি
খরগোশের মতো…
তুমি আসবে বলে
টিপের দোকানে যত ভিড়।
ফ্রিজের ভেতর বরফ জমছে না
আমি বিদ্যুৎ মাপছি,
পাগল মাপছি
মানচিত্রজুড়ে
জোনাকিদের অভিনন্দন…
নতুন প্রজন্মের বিশিষ্ট প্রকাশক অপু দে-র নিয়মিত কলাম
অপুর সংসার
পর্ব-৯
মানুষের ধর্ম
এই মুস্তাফাদা, একটু চা খাওয়াও না।
আবার কখনও দিনের শেষে রান্না চাপিয়েছে মোকসৎ।
কী রান্না করছ?
আজ মুরগি এনেছি।
ভালই তো গন্ধ ছড়িয়েছে। দাও তো আমাকে আর কাকুকে।
একটা থালায় পাঁচ- ছয় পিস রান্না করা মুরগি নিয়ে হাজির মোকসৎ। হঠাৎ বাবাও উপস্থিত। যোগ দিলেন সেই ভোজনে। মায়ের বকুনির ভয়ে দু’-তিন পিসের জায়গায় এক পিস খেলেন। না না, মুসলমানের হাতে খাওয়ার জন্য নয়। বকুনিটা বাবার বয়েসের জন্যে।
এরা দু’জনেই দে’জ-এর কর্মী, চব্বিশ ঘণ্টার ছায়াসঙ্গী। মোকসৎ পেশায় ছিল রাজমিস্ত্রি। সারাদিনে অনেকবার খাওয়ার ফলে চেহারাটা বেশ গোলগাল আর ভুঁড়িটাও বেশ নাদুস নুদুস। নড়াচড়া তাই খুব বেশি করতে পারে না। যতটা সম্ভব বসে বসেই করতে চায়। হাতুড়ি, ছেনির বদলে এখন হাতে বই ধরেছেন। কোথাও হেঁটে যাওয়ার কথা শুনলেই মুখ ভার। কিন্তু মানুষটি ভীষণ ভাল। হ্যাঁ, তাঁর এই চেহারা নিয়ে আমরা সবাই পেছনে লাগি।
আমাদের দোকানে একটা টিভি রাখা আছে। সারাদিনের ব্যস্ততার পরে খানিকক্ষণ টিভি চলে। কোনও একটা সময় শুরু হত মহাভারত (না, সেই আগের মহাভারত নয়, নতুন)। আর সেই মহাভারত সিরিয়ালের প্রধান দর্শক আমাদের এই দুই মুসলিম কর্মী। সেই সময় যদি কোনও কাজ পড়ত তাদের ওপর, তা সম্পন্ন হত সিরিয়াল শুরুর আগে অথবা পরে। একটা সময় তো এমন হয়েছিল মহাভারতের সব চরিত্র (যা সিরিয়ালে দেখেছে) মুখস্থ। কে কার ছেলে, কে কী জন্যে যুদ্ধ করছে, কোথায় কার সঙ্গে বিয়ে হল, ক’টা বিয়ে হল, সবটাই মগজস্থ করে ফেলেছিল। মজা করে বলতাম, যাক তোমরা এবার হিন্দু হয়ে গেলে।
মুস্তাফা পেশায় দফতরিখানায় মুটের কাজ করত। এই মানুষটার সঙ্গেই আমাদের সব দফতরিখানায় গিয়েছি। কীভাবে বই সেলাই হয়, লেই ফেটিয়ে বোর্ড লাগিয়ে একটা আস্ত বই তৈরি করে ফেলে। মুস্তাফা সেই আস্ত বই মাথায় করে দফতরি থেকে নিয়ে আসত প্রকাশকের ঘরে।

বেশ কিছু দফতরি উঠে গেছে। আবার বেশ কয়েকটা নতুন দফতরি এসেছে। আমার দেখায় হিন্দু মুসলিম দুই সম্প্রদায়ের কর্মী একই সঙ্গে বাঁধাই করে চলেছে। আমি সেইসব বাঁধাইখানায় গিয়ে দেখতাম কেমন ভাবে বই তৈরি হয়। আধুনিক যন্ত্রপাতি আসার আগে হাতে ভাঁজাই করে ফর্মাগুলো গোছ করে পায়ে চেপে সেলাই করতে হত।
তখন দে’জ থেকে প্রকাশ পেয়েছে রামায়ণ, মহাভারত, ভাগবত। আমাদের, মানে আমরা যাঁরা হিন্দু তাদের ধর্মগ্রন্থ এইগুলো। জলিলবাবুর বাঁধাইখানায় আমাদের প্রকাশনার এই ধর্মগ্রন্থগুলো বাঁধাই হত। দেখতাম কোনও হিন্দু এই বই বাঁধাই করছে না। জিজ্ঞাসা করেছিলাম, তোমরা কেন বাঁধাই করো না?
সে কী! রামায়ণ, মহাভারত এ তো আমাদের ধর্মগ্রন্থ, কী করে পায়ে দেব! আমাদের সবক’টি ধর্মীয় বই বাঁধাই করে মুসলিম কারিগর। আর হিন্দু কারিগর বাঁধাই করে কোরআন। কারণ কেউ তাদের পবিত্র গ্রন্থ পায়ে রাখতে পারবে না।
বুকে চমক লাগল। কী আশ্চর্য আমাদের দেশ, তা-ই ভাবতে থাকলাম!