আবহমান বাংলা ভাষা

দৈনিক

২৯ আষাঢ় ১৪২৭

অমৃতাভ দে

টিয়াবালি গ্রাম যখন কবিতা হয়ে ওঠে

আগামী জন্মে টিয়াবালি গ্রামে খোলা আকাশের নিচে

তোকে নিয়ে কবিতার ঘর বাঁধব আমি

চারপাশে রোপণ করব কত না শস্যবীজ

ধানের সবুজ বীজতলায় খেলে যাবে শ্রাবণবাতাস

মেঘের সঙ্গে সারাদিন মাত্রাবৃত্ত শিখে নিবি তুই

উঠোনে বিছিয়ে দিবি শব্দমাদুর

হাজার নক্ষত্রের সাথে গল্প করে

                    কাটিয়ে দেব আমরা দুজন

কবিতা-পাগল এসে লিখে নেবে

                 আমাদের যাপিত-জীবন…

সুমন বনিক

কথা রাখিনি

একদিন বৃষ্টিকে বলেছিলাম 

ভিজিয়ে দাও পরিশুদ্ধ কর

বৃষ্টি ভিজিয়ে গেল

পরিশুদ্ধ হইনি।

একদিন সূর্যকে বলেছিলাম 

ভেতরটা আলোকিত করে যাও

সূর্য আলো ঢালল

আলোকিত হইনি।

মৃত্তিকাকে একদিন বলেছিলাম 

সহিষ্ণু করে দাও

মৃত্তিকা পরম মমতা মেখে দিল

সহিষ্ণু হইনি।

বৃক্ষকে একদিন বলেছিলাম 

আরও প্রাণময় সবুজ কর

বৃক্ষ সর্বস্ব উজার করে দিল

প্রাণবন্ত হইনি।

 

যতবার কথা রেখেছে ওরা 

ততবার কথা রাখিনি আমি ।

 

তমোঘ্ন মুখোপাধ্যায়

তন্ত্র

নিগূঢ় প্রেরণাস্রোতে তুমিও কি কৌল হয়ে যাবে?

পাঁচ লঘু চিতাকাঠ (‘ম’-কার) জ্বালিয়ে বামাচারী

আগম, অসদাগম পেরিয়ে ত্রিভুজ কোথা পাবে?

এখানে কারণ নয়, অকারণ শেষ সুধাবারি।

 

বিবসনা ষোড়শীর কোলে ব’সে জননীর রূপ

চক্রের আসনে আনো, তামসিক ঘোর ছিঁড়ে যাক।

কোন অবধূত তুমি? জ্বালো কোন অশরীরী ধূপ?

বীরভাব ছুঁয়ে কোন কালে হবে শেষ ঋতবাক? 

 

মায়া থেকে মহামায়া—পুরুষ প্রকৃতি খুঁজে যায়।

পশুভাব ধীরে ধীরে নিভিয়েছে গুরুর খেয়াল।

অনন্ত আঁধার এক। ধরি তাকে কোন অভিধায়?

রিপুর কুহক শেষে ছিঁড়ে খেল মায়ের শেয়াল।

 

সাধনা জীবনভর। শোকের ফসল দেহমাঠে।

যে বাতাস কাপালিক, মাথা রাখি তার হাড়িকাঠে।

 

সমর সুর

সেফটিপিন

প্রায় প্রতিদিনই বাজারে যাই

তবু কী করে যে ভুলে যাই সেফটিপিনের কথা।

কতকিছুই জোড়াতাপ্পি দেওয়া দরকার

কী করে যে বারবার ভুল হয় 

অন্তত একপাতা সেফটিপিন কেনা ভীষণ জরুরী।

বাজার থেকে বাড়ি ফিরে হিসাব মেলাতে গিয়ে দেখি

ছেঁড়া পকেট থেকে গলে গেছে খুচরো পয়সা

থলে থেকে কিছুটা আনাজ।

আজকাল আর পড়ে যাবার ঝনঝন শব্দ পাই না।

প্যান্টের হুক ছিঁড়ে আছে কতকাল

এমনকি জামার বোতামও।

 

কতকিছুই যে জোড়াতাপ্পি দেওয়া দরকার

বহুদিন ধরে কাঁটা ফুটে আছে পায়ের নিচে 

শুধু সেফটিপিনের অভাবে

সে আজ লালিত যন্ত্রণার মতো রয়ে গেছে।

দুএকটা শিরাধমনী ছিঁড়ে আছে বহুকাল

পড়ে আছে ছেঁড়াফাটা স্মৃতি।

শুধু একপাতা সেফটিপিন কেনার কথা

কেন ভুলে যাই বারবার…

বারো পর্বের ধারাবাহিক

ঈশ্বরফুল

বিভাস রায়চৌধুরী

পর্ব-৪

একটা কাঁঠাল গাছ

                  স্মৃতি কখনোই অতীতদিনের কেবল একটা ধারাবিবরণী নয়। কতদিন ছাত্র হিসেবে কাটিয়েছি বনগ্রাম উচ্চ বিদ্যালয়ে। প্রতিটি দিন কি আর স্মৃতি? হঠাৎ হঠাৎ কিছু ছবি ভেসে ওঠে মনে। ডুবেও যায়। হয়তো আবার ফিরে আসবে সে অন্য কোনও লেখায়, আলাপচারিতায়।

                     বিদ্যালয়ের স্মৃতির বেশিরভাগটা জুড়েই থাকে বন্ধুরা। মনে পড়ে বাসু, দেবাশিস, মানব, সুদর্শন, পার্থ, সমীর,  দীপনারায়ণ, ডাকু-দের কথা। আজ আর এদের সঙ্গে দেখাই হয় না প্রায়। দীপনারায়ণ কোথায় জানিই না। ওহো, সেই সঞ্জীব, যে গল্প লিখে লজ্জা-লজ্জা মুখে আমাকে খাতাটা পড়তে দিত, সে-ইবা কোথায়?  এখনও লেখে? এখনও লিখিস, সঞ্জু? আমার লেখা তোর চোখে পড়ে? 

ডাকুকে ইদানীং দেখছি প্রায়ই। সে এখন ডা. সমীর কাঞ্জিলাল, মানুষের চোখ ভাল করে। ডাকু, তুই আমার চোখ দুটো সারিয়ে দিবি? দিন-দিন আমার চোখে স্বপ্ন উধাও হচ্ছে। আমাকে ফিরিয়ে দিবি কিশোরবেলার সেই স্বপ্ন? সেই নিষ্পাপ বন্ধুত্বের দিন?

আরও কত বন্ধু, যাদের সচরাচর মনে থাকে না, দুম করে কাঁধে হাত পড়লেই বুঝি—এই তো সে! যেমন লিখেছেন সুমন, গানে বলেছেন, “হঠাৎ রাস্তায় আপিস অঞ্চলে/হারিয়ে-যাওয়া মুখ চমকে দিয়ে বলে—/বন্ধু, কী খবর বল?/ কতদিন দেখা হয়নি!”

                     কত মাস্টারমশাইয়ের কথা মনে পড়ে। অসামান্য সব চরিত্র। নির্মল মুখোপাধ্যায়ের বিখ্যাত “কানমলা”, কাঞ্জিলালবাবুর অপূর্ব “মধুমোড়া” (পেটে চিমটি,হো: হো:) কেষ্টবাবুর “অলক্লাস স্ট্যান্ড আপ” আর পিঠে ধুপধাপ ভাদ্র মাসের তাল!  দেববাবু ছিলেন আমাদের ‘হিরো’। ঘোষ স্কুলের সঙ্গে ক্রিকেট ম্যাচে ব্যাট হাতে আমাদের স্কুলকে প্রতিবছর জেতাতেন। সম্ভবত আমি তখন এইট-এ পড়ি, দেববাবু জলেশ্বর স্কুলে চলে গেলেন। আমরা কেঁদেছিলাম। ক’বছর আগে যখন শুনলাম, প্রধান শিক্ষক হয়ে আবার  আমাদের স্কুলে, খুব আনন্দ হয়েছিল। 

আমার একটু লেখালেখির গোপন অভ্যাস ছিল। ডাকু আর সলিল ছাড়া কেউ জানত না। সেই ভালবাসা থেকে  আমাদের আকর্ষণ ছিল বিশ্বরঞ্জন সেনগুপ্ত আর দেবপ্রসাদ ঘোষের প্রতি। আমরা জোগাড় করে পড়ে ফেলেছিলাম বিশ্বরঞ্জনবাবুর গল্পের বই ‘রৌদ্রের স্বরলিপি’, দেবপ্রসাদ ঘোষের কাব্যগ্রন্থ ‘শব্দই  অসির মতো’। তখন খুব একটা বুঝিনি, কিন্তু গর্ব হত একথা ভেবে, দু’জন লেখক আমাদের কয়েক হাতের মধ্যে বসে ক্লাস নেন। আর যাঁর স্নেহ না পেলে আজ আমার জীবনের পরিচয় অন্যরকম হত, সেই গোপালচন্দ্র সাধুর কথা সবসময় আমার বুকের ভেতরে থাকে। গোপালবাবু আমাদের কয়েকজনকে তাঁর বিখ্যাত ‘সাধুজন পাঠাগার’-এ নিয়ে যান। অন্যরা ঠিক পালিয়েছিল। আমি শুধু ধরা পড়ে গেছি। 

চিরনির্বাসিত হয়েছি শব্দ-অক্ষরের মায়াজাদুঘরে!

              আর একজন ছিল। বনগ্রাম উচ্চবিদ্যালয় বলতে যার কথা মনে পড়বেই। কিংবা মনে থাকে না হয়তো সবসময়। ট্রেনে-বাসে, রাস্তার মাঝখানে, টেলিফোনে, কবিতাসভায়, আরেকজন বনগ্রাম উচ্চবিদ্যালয়ের ছাত্রের মুখোমুখি হলেই যে এসে নিঃশব্দে মাঝখানে দাঁড়ায়। দু’জনের কথা শোনে। ছায়া ফেলে। মায়া ফেলে। হয়তো বিরহী চোখের জল। অথবা নীরবে নতুন ছাত্রদলের গল্প বলে আমাদের কানে-কানে। তার প্রাচীন শরীরে কত যে কৈশোর লেগে আছে! সে হল আমাদের লাল বিল্ডিংয়ের সামনের কাঁঠালগাছ। 

চিরবন্ধু কাঁঠালগাছ। 

এই যে এক্ষুনি তার একটি হলুদ পাতা এই লেখার ওপরে এসে পড়ল! ফিসফিস করে কিছু বলছে সে।

 কিংবা লিখতেও চায় অন্তত একটি লাইন।

                       চোখের জল চেপে আমি পালিয়ে যাচ্ছি, কাঁঠালগাছ! 

বাকিটুকু তুমি লিখে দাও…

বিগত দিনগুলি পড়ুন