দৈনিক কবিতা আশ্রম, ২৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭
আবহমান বাংলা ভাষা
দৈনিক
২৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭
তন্ময় সরকার
কবিতা
সকালের রোদ বিছানায় এসে পড়লে
আমার ভালো লাগে ।
জ্যৈষ্ঠসন্ধ্যার বাতাস আমার জানালার পর্দা নড়ালে
আমি খুশি হই ।
ঘর আসলে বাইরের একটা অনুচ্ছেদমাত্র ।
জগতের ডালে পাতার মতো লেগে থাকে ।
শিরা বেয়ে জল ওঠে, বৃষ্টি নামে ।
মজ্জার মতো ক্লোরোফিল-
গাছের থেকে আলাদা বাঁচতে শেখেনি কখনও ।
এ ঘর যদি ‘আমাদের’ না হয়ে ওঠে,
আমায় তবে দোষ দিতেই পারো ।
ঘরের কোনো দোষ ছিল না তাতে ।
আলো হাওয়া জল মজ্জা – প্রাণ বয় ।
পাপ বয় না ।
শুদ্ধেন্দু চক্রবর্তী
জানালাকবাট আঁকড়ে
একটা কবিতা পাওয়ার আশায় সারাদিন
জানালাকবাট আঁকড়ে একমনে চেয়ে আছি
জটাধারী মেঘের কুন্ডলী লক্ষ করে।
তখন গোধূলিবেলা
সবেমাত্র জল সইতে গিয়েছিল ওরা
সেই পথের একপাশে পড়ে আছে
ডাগর রাধারাণীর নুপূর।
জানালার রঙীন শার্সি ভেদ করে
আমাকে মৃত্যু ছুঁয়ে গেল
স্ফুর্তি স্পর্শ করে গেল
বেদনা রাঙিয়ে দিয়ে গেল
ভয় সন্ত্রস্ত করে গেল
জানালাকবাট আঁকড়িয়ে তখন আমিও নাছোড়
কাঁকড়ার দাঁড়া দিয়ে খুঁটে বের করি
যতিচিহ্নগুলিকে
অথচ নিথর কবিতার দেহ শুধু চেয়ে থাকে
ময়নাতদন্তের আশা করে।
সুবর্ণ আদিত্য
সারভাইভাল
ফিরে এলেও
কাছে আসা যায় না মানুষের
এইসব ছুটে চলা
আর
তিরোভাব নিয়ে গন্তব্য খুঁজে চলা তীর ঘেঁষে
বেরিয়ে গেছে আমাদের শিকারজন্ম
পৃথক অগ্নিতে আরও সন্দেহ ঢেলে
কেবল জ্বলে উঠলে আঁধার
এবং
ধারণের অধিক জ্ঞানে মানুষও তুচ্ছতম প্রাণ
সেইসব দিনগুলোর আগে
কথা ও বাক্যের রহস্য অনুমান করতে গিয়ে
বোবা হয়ে যায় বৃক্ষ
কেউ কেউ যায়
আর আসে না
কিংবা
যারা আসে
কেউই নিজের কাছে পৌঁছে না
এক ফাঁকে
একটা পুঁইশাক
ধীরে, ক্রমশ মাচায় উঠে যাচ্ছে
কনক মণ্ডল
প্ররূঢ়
গোকুলে ফেরেনি কত নাম ধরা পাখি
মন্থর আবেশ যেন কুঠির গহনে
এহেন হৃদয় এক অনন্ত পথিক
ফুলগুলি ছুঁয়ে আছে মৃত্যু অত্যধিক।
ভ্রমর মেতেছে কেন ফুলেরা কি জানে?
জানে কি ডুমুর ফুলে আছে সংগোপন!
কতকাল ঢেকে রাখি মুখোশ মিছিল
পাখিদের লাশ যায় থরে থরে চিল।
হারিয়ে পেয়েছি তারে অন্তরে অন্তরে
যা কিছু কুড়িয়ে আনি দিকচক্রবাল
মুকুট তোমার প্রিয়, প্রিয় প্রশ্নবাণ!
বন্ধুগণ দেখা হোক সম্মুখ শিয়রে…
নতুন প্রজন্মের বিশিষ্ট প্রকাশক অপু দে-র নিয়মিত কলাম
অপুর সংসার
পর্ব-১০
কালিকাপ্রসাদ গানওয়ালা
গৌতম চট্টোপাধ্যায়ের গান আমি প্রথম শুনি বইমেলায় এ. মুখার্জি র স্টলে। তখন সেই গান বোঝার বয়েস বা শোনার কান কোনওটাই আমার তৈরি হয়নি। আমরা যখন স্কুলবয়ের ইমেজ ছেড়ে সদ্য গোঁফ ওঠায় স্কুলের দাদা হয়েছি তখন সুমন, নচিকেতা, অঞ্জন শুনেছি। বন্ধুদের মধ্যে আবার ভাগাভাগিও ছিল। ও সুমন শোনে, সে নচিকেতা। কার গান ভাল, এই নিয়ে অহেতুক তর্কটাও চলত।
এই একক পরিবেশনের জায়গায় ধীরে ধীরে একটা সমষ্টিগত দলগত ভাবে সংগীত পরিবেশন শুরু হল। শুনতে শুরু করলাম, ভাল লাগতে শুরু হল। পরশপাথর, মহীনের ঘোড়াগুলি, চন্দ্রবিন্দু, ক্যাকটাস, ভূমি। চন্দ্রবিন্দু ছাড়া বাকি দলগুলো ভেঙে গেল।
এই বাংলা ব্যান্ডগুলোর গান যখন শুনছি, তখন মাটির সুর নিয়ে এল এক নতুন দল। প্রচলিত গান। আমাদের ভীষণ পরিচিত গান। এই গান বাংলা গান নয় এগুলো বাংলার গান। এই গানে বাংলার মাটির সুর লেগে রয়েছে। নতুন এক বাংলা গানের দলের জন্ম হয়েছে— দোহার। দোহারের অনুষ্ঠান প্রথম কোথায় দেখেছি মনে নেই। প্রথম ক্যাসেট কিনি মনে হয় ‘রূপসাগর’। এই দলের কারও সঙ্গেই আমার পরিচয় ছিল না। অনেক পরে জেনেছি চিনেছি দোহারের হৃদমাঝারে যিনি তিনি কালিকাপ্রসাদ।
এক পড়ন্ত বিকেলে অভীকদা, অভীক মজুমদার দে’জ পাবলিশিং-এর চাতালে কালিকাপ্রসাদের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেয়। সেই আলাপ ধীরে ধীরে কখন আপনি থেকে তুমিতে রূপান্তরিত হয় জানি না। কালিকাপ্রসাদ কালিকা’দা হয়ে ওঠেন।
বইমেলা তখন ময়দান থেকে বিতাড়িত। সল্টলেক স্টেডিয়াম থেকে উঠে গিয়ে পড়েছে মিলনমেলা-য়। প্রথম কয়েক বছরের মধ্যেই সুন্দর ভাবে সেজে উঠেছে মিলনমেলা। কথায় আছে যেচে বাঁশ নেওয়া। তেমনই এক বাঁশ নিয়েছিলাম। বইমেলা কর্তৃপক্ষের কাছে প্রস্তাব দিয়েছিলাম, বইমেলায় একটি মুক্তমঞ্চ হলে কেমন হবে? ‘ভাল হবে’ বলে কর্তৃপক্ষ আমাকেই দায়িত্বটি অর্পণ করে দিল। কালিকাদা’কে তখনই ফোনে বলেছিলাম, “এমন একটা দায়িত্ব পেয়েছি কালিকাদা। তুমি কি ছোট্ট এক ঘণ্টার অনুষ্ঠান করতে পারবে? এই অনুষ্ঠান করার জন্যে বইমেলা কমিটি কোনও পারিশ্রমিক দেবে না। খুব সামান্য ব্যবস্থা।” কালিকাদার উত্তর ছিল, “অপু, কোনও চিন্তা কোরো না, আমরা ঠিক চলে আসব।” এসেছিল। অভীকদার উপস্থিতিতে জমজমাট অনুষ্ঠান হয়েছিল। ওইদিন জানতে পেরেছিলাম দোহারের নামকরণ করেছিল অভীক মজুমদার।
কখনও সাক্ষাৎ, কখনও দূরভাষ, এইভাবেই আমাদের যোগাযোগ হত। ২০১৭ সালের বইমেলায় কলকাতা সাহিত্য উৎসবে ‘হাজার বছরের বাংলা গান’— এই বিষয় নিয়ে দেড় ঘণ্টার অনুষ্ঠান করেছিলেন কালিকা’দা। হল ভর্তি লোক। খুব সুন্দর পরিবেশনা ছিল। এটাই ছিল আমার দেখা কালিকা’দার শেষ মঞ্চানুষ্ঠান। অনুষ্ঠান শেষে অনেক কথা হয়েছিল কালিকা’দার সঙ্গে, মনে পড়ছে সেইসব টুকরো টুকরো কথা।

৭ মার্চ আমরা তিন বন্ধু ফিরছি শান্তিনিকেতন থেকে। বর্ধমানে ঢোকার বেশ কিছুটা আগে হঠাৎ ফোন বেজে উঠল। আর ধরতেই ধরা গলায় প্রথম কথা “কালিকা’দা অ্যাকসিডেন্ট করেছে। গুড়াপ-এর কাছে। কালিকা’দা আর নেই। বর্ধমান হসপিটালে নিয়ে গিয়েছে।”
আমার বন্ধু জানত না যে আমি কোথায় আছি। আমি মনে হয় ভুল শুনলাম, তাই আবার জিজ্ঞাসা করলাম ঠিক কী হয়েছে! সেই একই কথার পুনরাবৃত্তি।
আমার দুই বন্ধু আমাকে বর্ধমান হসপিটালে নামিয়ে দিয়ে চলে যায়। প্রচুর পুলিশ। জিজ্ঞাসা করলাম, “কালিকপ্রস…।”
“আপনি কে?” পুলিশ অফিসার জিজ্ঞাসা করে। “আপনি কি বাড়ির লোক?” আমি ‘না’ বলতে পারিনি। আমি বাড়ির লোক বলেছি। আসলে তখনও কেউ ওখানে ছিল না। পুলিশ অফিসারটি আমাকে বললেন, “আর কিছুক্ষণের মধ্যেই হয়ে যাবে। আমরা বডি নিয়ে বেরোব।” হতবাক আমি কী বলব জানি না। বুঝতেও পারছি না। মৃগনাভিদা-কে ফোন করি। আমার ফোন পেয়ে তিনিও বিস্মিত। শুধু জিজ্ঞাসা করি, “কতক্ষণ লাগবে?”
উত্তর এল, “প্রায় আধঘণ্টা লাগবে।”
ওদিকে পুলিশের তাড়া। যা-ই হোক, বেরোনোর আগে দোহার দলের মৃগনাভিদা আর সত্যজিৎ এসে পৌঁছল। সত্যজিৎকে সামলানো যাচ্ছিল না। মৃগনাভিদা বলল, “অপু, তুমিও চলো সঙ্গে।”
তোমার সঙ্গে এইভাবে কখনও যাওয়ার কথা হয়নি কালিকা’দা!
যখন বর্ধমান পেরিয়ে হুগলির বর্ডার ছুঁলাম তখন ওখানে ঋতচেতাদি ও লোপামুদ্রা মিত্র অপেক্ষায়। প্রতিটা মুহূর্ত ছিল কষ্টের, বিষণ্ণতার আর বিস্ময়েরও।
ঋতচেতাদি, ওইদিন খুব কষ্ট হয়েছে কিন্তু চোখ দিয়ে জল পড়েনি। এখন যখন লিখছি ওইদিনের প্রতিটা মুহূর্ত মনে পড়ে যাচ্ছে, চোখের সামনে ভেসে উঠছে ছবিগুলো। আর চোখ ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে…