দৈনিক কবিতা আশ্রম, ২ শ্রাবণ ১৪২৭
আবহমান বাংলা ভাষা
দৈনিক
২ শ্রাবণ ১৪২৭
আলোকচিত্র: বন্যা লোহার
শিবাশিস চট্টোপাধ্যায়
সেলিব্রেশন
চেন্নাই সেন্ট্রাল?
ভি.টি. ?
টিটি বলছে ট্রেন এখানে
অন্তত আধঘন্টা দাঁড়াবে
এ লাইনে এটাই প্রথম ও শেষ জংশন
ধুলোদংশন করো যাবার বেলায়
বিষ নেমে গেলেই তো উড়ানপ্রস্তুতি নিতে ছোটা
আকাশ আত্মস্থ হলে নেমে আসতে পারো
খানিক মাথায় দিয়ে বাকিটা তিলক করা যাবে
নয়ন রায়
ভালো থেকো বন্ধু গাছ
আমি বিনীত গাছেদের কাছেই চিরকাল
গাছেদের সান্নিধ্যেই তো বাঁচা সন্ধে সকাল
যাবতীয় দুঃখ সুখের কথা গাছকে বলি
সমস্ত উৎসসুখের প্রথম ফোটানো কলি
প্রেমের বাঁধনে বাঁধি গাছ- বন্ধুগাছ আলো
সুখে দুখের সমস্ত দিন রাত্তির কাটুক ভালো
জীবনের সব লেনদেন এই বেঁচেবর্তে থাকা
গাছেদের ঋণে প্রতিটি দিনের আয়ুরেখা…
সহিষ্ণু স্বভাবে গাছ। নীরব নীরব অযাচিত
ভালোবেসে প্রাণ! কোথায় লুকাবে তার ক্ষত
বনগাঁয় কাটে গাছ বাঁকুড়ার বনেও আগুন
পুড়ছে জীবন – যৌবনে অবহেলা ফাগুন!
কখনো কি বলেছিলে ভালো থেকো গাছ তুমি?
বন্ধু গাছ ভালোবাসা নাও ভালোবাসি আমি…
মালা ঘোষ (মিত্র)
কান পাতো
গর্ভের মধ্যে জন্ম হল যার
সেই তো পৃথিবীর সম্যক দায়ভার!
তারপরেও কতবার জন্ম হয়
নিজের মধ্যে কতবার জন্মায়…
আবার সকলকে নিয়ে
আনন্দে উড়ে যাওয়া।
স্তব্ধ হয়ে যায় পাথুরে উদাসীনতা…
সকলকে উজাড় করে, কী হল!
মাটি তলায় তলায় কাঁপছে
সেই প্রলয় পদচারণ—
কান পাতো…
মুজতাহিদ ফারুকী
রাতের রোহিণী
মনে পড়ে রঞ্জু এসেছিল সেই দিন
নিঃশব্দ দুপুরের পায়ের ঘুঙুর
জড়িয়ে আঙুলে, ক্লান্ত একা ঘরে
তিন গোছা রেশমীর মৃদু রিনিঝিনি
অলস ঘুমের কানে পাহাড়ের ঝরনা
ঝরেছিল
বিজন অরণ্যে জেগে অকস্মাৎ মনে হয়েছিল
আহা, কালের সূচনা থেকে যেন তারে চিনি
অথচ অচেনা আজও অন্ধকার রাতের রোহিণী।
ঈশ্বরফুল
বিভাস রায়চৌধুরী
পর্ব-৮
অনুপমের কর্ণ
অনুপম মুখোপাধ্যায়ের ‘কর্ণ’ চারটি কাব্যনাট্যের সংকলন। কর্ণের সঙ্গে কথোপকথনে কৃষ্ণ, অর্জুন, ভীষ্ম ও দ্রৌপদী। পরীক্ষা নিরীক্ষা মূলক লেখা, পুনরাধুনিক প্রকল্প ইত্যাদির জন্য বিশেষ পরিচিত অনুপম এই গ্রন্থে সময়কে অসাধারণ ধরেছেন, ফেলেছেন বিশ্বাস ও মেধার যৌথ আলো। পৌরাণিক চরিত্রগুলি যেন তাঁদের পৌরাণিক সাজসজ্জা ও পটভূমিকা নিয়ে আজকের কোনো চরিত্রে পরিণত হয়েছেন। প্রসঙ্গত রবীন্দ্রনাথের ‘কর্ণ কুন্তী সংবাদ’ মনে পড়ে। বুদ্ধদেব বসুর কথাও মনে পড়ে। এই দু’জনের কথা মাথায় রেখেই আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলা যায় অনুপম মুখোপাধ্যায় এই গ্রন্থের চারটি কাব্যনাট্যে যে উচ্চতায় পৌঁছেছেন তা অবাক হয়ে চেয়ে দেখবার মতো। আমাদের সাম্প্রতিককালের লেখালেখি ক্ষণকাল নিয়ে খেলা করে। চিরকাল বিষয়টাকে অনুধাবন করার চেষ্টা করেন খুব কম লেখক। অনুপম অত্যন্ত শক্তিশালী কবি। পরীক্ষা-নিরীক্ষায় নিয়ত উৎসাহী অস্থির অনুপম যে উটকো কেউ নন, বাংলা কবিতার ক্লাসিক প্যাটার্ন-টা তিনি যে আয়ত্ত করেছেন আগেই, তারও একটা নিদর্শন হয়ে থাকল এই ‘কর্ণ’।
দু’-এক ঝলক তুলে ধরি?
কর্ণ কে? পরাজিত হয়েও যিনি পরাজিত নন? না কি যিনি প্রাতিষ্ঠানিক জয় চান না?
প্রথম কাব্যনাট্যে কৃষ্ণের সঙ্গে কথাবার্তায় এক জায়গায় কর্ণ বলছেন—
“ভিতর-বাহির খুবই আপেক্ষিক কথা
তবু বলি, এ ভারতে আমার নিজের
পুরোপুরি নির্ধারিত কোনো স্থান নেই।”
কর্ণ এখানে অভিমানী একাকী এক যোদ্ধা। ন্যায়-অন্যায়ের থেকেও অভিমান যাঁর কাছে বড়। ধ্বংস হয়ে যাওয়াই নিয়তি কিন্তু আপসের মধ্যে থেকে কোনো প্রতিষ্ঠা তিনি কামনা করেন না। সমানে সমানে কথা চলে কৃষ্ণ ও কর্ণের। যেন দু’জন অনুপম। একজন অনুপম কৃষ্ণ হয়ে প্রতিষ্ঠার কৌশল, যুক্তি, প্রয়োজন তুলে ধরেন। অন্য অনুপম কর্ণের মুখে তুলে ধরেন নিজের সাহিত্যবিশ্বাস—
“পরোয়া করি না আমি যশের, খ্যাতির।
প্রিয়তর কর্মটিকে ছেড়ে দেব আমি,
শ্রেয়তম ধর্ম যদি হাতছানি দ্যায়,
যদি, সেই হাতে সবই মৃত্যুর আঙুল,
তবু, তাকে ধরে সেই সীমানা পেরোব,
যে সীমানা অশেষের, অথবা শেষের—
অথবা, যে সীমারেখা কোথাও থাকে না,
পলকে মুছিয়ে দ্যায় শূন্যতার বোধ,
শাশ্বত যে অন্ধকার, নামার আগেই—
ভেসে ওঠে অন্যপারে জীবনের গ্রাম।”
এই কর্ণ মহাত্মা ভীষ্মকে বলেন,
“মহাবলী শূন্যতার দাবি আমি জানি,
মানবতা বাদ দিয়ে দেবতা হব না।”
আজকের সময়ের স্বর কর্ণের সংলাপে—
“পুরুষের অহংকারী ধর্মের বদলে
আমাদের বুকে যদি জীবনের ধর্ম—
কূট রাজনীতি নয়, লোকনীতি হত—
মানুষের অভিপ্রায় অনুসারে হত…”
কর্ণ ও অর্জুনের কাল্পনিক মিলনে আরো স্পষ্ট হয়েছেন অনুপম। তাঁর গন্তব্য পরিষ্কার হয়ে যায় পাঠকের কাছে। আজকের দিনে পাঠক আশ্চর্য হয়ে যাবেন অর্জুন ও কর্ণের এই আলোচনায়।
অর্জুন: এটাই নিয়তি, দাদা, সব বিপ্লবীর।
প্রতিবিপ্লবের যে তিক্ত কটু স্বাদ
আদর্শশূন্যতা, সব সহ্য করতে হয়।
যদুবংশ ধ্বংস হয়। লেনিনের মূর্তি
দড়ি বেঁধে টান মেরে মাটিতে মিশায়।
একনায়কের হাতে রাষ্ট্রের চেহারা
বাহিরের দিকে খুব ঝলমল করে।
পৃথিবীতে আজও লোকে স্বর্ণলঙ্কা বলে—
সোনার অযোধ্যা, কিন্তু, কারো মুখে নেই।
কর্ণ: রামরাজ্য বলে বটে— কী তা জানে না।
রাবণ আদর্শ আজও অনেকের কাছে।
আজও উপাসনা হয় মহিষাসুরের।
হিটলার স্তালিনের সে পূর্বপুরুষ।
যুদ্ধের আগের সেই জার্মানির ছবি,
অথবা রাশিয়া দ্যাখ সোভিয়েত যুগে—
বিশ শতকের ওরা দুই লঙ্কাপুরী।
উপরে উপরে সব কত ঝলমলে!
যেন কোনো কষ্ট নেই সমাজ-সংসারে!
রাষ্ট্রের প্রগতি ছাড়া বাকি তুচ্ছ সব।
ভেতরে ভেতরে কিন্তু ফাঁপা আর পচা…
আর দ্রৌপদী আর কর্ণের অংশটি? শুনেছি নিজেকে কর্ণ বলে ভাবেন কবি অনুপম মুখোপাধ্যায়। কর্ণ চরিত্র নিয়ে তাঁর আরো ‘কাজ’ আছে। বর্তমানে তিনি তাঁর সৃষ্টিকে ‘কাজ’ বলতে চাইছেন। এখানে দ্রৌপদী যখন তাঁর কিছু অসহায়তার কথা বলেন তখন কর্ণের মুখের কথা দিয়ে অনুপম আমাদের সমাজব্যবস্থার বিভিন্ন প্রধান শক্তিকে তীব্র আঁচড়ে দিয়েছেন সত্যের নখরে। কর্ণ বলছেন—
“ব্যাসদেব তো যখন যেমন সুবিধা
ঠিক সেই মুহূর্তের বিধান বলেন।
ঋষিদের রীতি এই, ওঁরা অনায়াসে
সমাজ ব্যবস্থা হোক কিংবা রাষ্ট্রনীতি
নিজেদের মতো করে বাঁকিয়েই নেন।”
‘ক্ষত্রিয়ের ধর্ম পালন’ প্রসঙ্গ উঠলে কর্ণের উত্তর আজকের পাঠককে অনেক দিশা দেবে।
কর্ণ বলেন—
“সম্প্রদায় আর ধর্ম ঘুলিয়ে ফেলো না।
ধর্ম শুধু ব্যক্তিগত। সমষ্টির নয়।
যেখানে মর্যাদা আছে, স্বস্তিবোধ আছে,
যোদ্ধা হোক, কবি হোক, যেখানে কাজের
অনাবিল ক্ষেত্র আছে, অবাধ সুযোগ,
সেখানে থাকাই হল ধর্মের পালন।”
বিদায়ের কালে সেই রক্তমাখা বোধ। বিষাদকে সম্পদ ভাবা তাঁরই পক্ষে সম্ভব, মাথা যাঁর আকাশ ফুঁড়ে মহাশূন্যে চলে গেছে।
“আমার মুখেই তুমি আজ শুনে নাও—
রাজ্য নয়, যশ নয়, যাজ্ঞসেনী নয়,
না চাওয়ার অধিকার অর্জন করেছি।
সেটাও তো মিথ্যে নয়, তাই না পাঞ্চালী?
না চাওয়ার অহংকার রাধেয়র থাক।”
সম্ভবত অনুপমের জীবনবোধ, কবিতাবোধ থেকেই উৎসারিত হয়েছে কর্ণের এই উচ্চারণ।
(কাব্যনাট্যের সংকলনটি ‘কবিতা আশ্রম’ থেকে প্রকাশিত।)