আবহমান বাংলা ভাষা

দৈনিক

৩০ আষাঢ় ১৪২৭

উডওয়ার্ক: পবন লোহার

প্রতিমা রায়বিশ্বাস

হৃৎপিণ্ডে গ্লেসিয়ার

বিবেক তুমি গোমুখ হও ভেসে যাই  গঙ্গাস্রোতে 

এত কান্না জানে আকাশ ভাঙা ওই নীল চোখ!

বেদনারা আহত শামুক…

মুখবুজে ভিতরেও তার আঘাতে অশ্রু…

জন্মায় লোহিত সাগর।

 

মৃত্যুর পাড়ে ঘুরতে এসেছি আমি, 

দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আবারও একটি বার

বুকের ম্যাসেঞ্জারে পাঠিয়ে দিচ্ছি  

জীবনের কপিপেস্ট।

আরও একবার সমতল চিরে নদী অভিঘাতে

শস্য শ্যামলাং মলয়জশীতলাং…  

 

এখানে বাতাস বড় শান্ত,

অরুণ মেঘে মেঘে দেখেছি এখানে সঙ্গম…

মেঘ ছানা আর দুরন্ত হরিণ শাবক উড়ে উড়ে ওই…

আকাশ তুমি  মেঘবতী জঙ্গল।

 

সিংহের ঝাঁপিয়ে পড়ার মত আমিও আজ ঝাঁপ দেব 

খাদ মাখা ওই পাথরের গায়।

ওই তো দেখা যায়…  তোমার চিবুকের পাশে 

বেইমানি তিলের মতো।

 

নদী হতে গেলে আগে দিক বুঝে নিতে হবে,

না-হলে অগ্নিকোণ থেকে উড়বে আগুনপাখি।

জ্বলে যাব আবারও আমি…

               শূন্য জ্বলে শীতলে অধিক।

ঈশান কোণে সূর্যমুখী ফুল…

উপরে তার বৃহস্পতি খেলে থাকে

শীত শীত কম্পিত চিবুকে তার 

জলেরা স্ফটিক।

 

কোন দিকে গেলে জল জানে ভালোবাসা-ভাষা,

কবিতা বানিয়ে রাখে সুখ?

সেদিকে আবেগ জলে গুলে গুলে

                 ঢেউ ঢেউ…মহাঢেউ 

মমতার কণারা নৌকার মতো

                জেনেছি উথলি উৎসুক।

 

গোমুখ তোমার অন্তঃপুরের রানি সাদামেঘ….

বিবেক চিরে ভিজে ভিজে

উৎস্রোত-অলংকারে ভূষিতা এক দেবী

চলো নীল সৈকত চলো। অশান্ত সমুদ্র ডাকে।  

 

 

 

পৌষালী চক্রবর্তী

লকডাউন

ললাটলিখনে গাঁথা আছে

জ্বালানি কাঠখোদাই-এর ছল 

নদী জল হাওয়া মাঠ ছুঁয়ে ছুঁয়ে ঘরে ফেরা

দেখি নুনের ভাপ ওঠে

মটরশাকের খেত কবে থেকে নির্জলা

 নির্বাসনে ছিল খোঁজ রাখিনি

 

ভাতের ঘ্রাণ মনে হয় গত শীতের কুয়াশা।

অমিতাভ মীর

সহস্র আলোকবর্ষের পথে

মধুর ফাল্গুনে শতরূপা বাসন্তীর বাগিচায়-

শতবর্ষ ধরে মধুপের মতো মউ পিয়াসায়,

শতবার আসা বারবার ফিরে যাওয়া নয়;

পথযাত্রা আমার সহস্র আলোকবর্ষ পরিক্রমায়।

 

ফাগুনের বনেই আদমের আদি আবাস, 

ভুলের মাশুলে রোদসীর তলে এ নরকবাস।

জীবাত্মা আর পরমাত্মার হয় না বোঝাপড়া, 

দোটানায় থেকে অনন্তকাল ভুগছে আদমসন্তান। 

 

সহস্র আলোকবর্ষের পথে হয়তো কোনও এক

অরুন্ধতীর বুকে থামবে আমার জীবনরথ,

অনন্ত সুখের অনন্ত ফাগের সেই অমরায়;

পাড়ি দিয়ে পৌঁছে যাব ঠিক সে অসীম পথ।

 

অপরাজিতা ভট্টাচার্য

কত ধাপ

স্বপ্ন আর ঘুমের মাঝে 

কত ধাপ ছিল!

কত ধাপ  উঠে বা নেমে!

 

ঘুম হাসে বিদ্রুপে …

না-পারাটা পাগল করে মারে।

 

দিক শূন্য দাপাদাপি …

নাকি শুধু  ধাপ মাপি !

 

ভাবতে ভালই লাগে 

সময় শেকল ভেঙে 

আমার এ না-পারাটা বাঁচে। 

 

বারো পর্বের ধারাবাহিক

ঈশ্বরফুল

বিভাস রায়চৌধুরী

পর্ব-৫

প্রকৃত সারস

নানা ভাবে জীবন কেটেছে। বহিরঙ্গে আলাদা হলেও ভেতরে ভেতরে কবিতার জন্য আকুল থেকেছি। বয়স বাড়লে কামনা কমেছে। তখন আর শুধু নিজের লেখার জন্য নয়, অন্যের লেখার জন্যেই ইচ্ছে হয়েছে বাঁচার। এই সিদ্ধান্ত থেকেই এসেছে ‘কবিতা আশ্রম’। কতজন এসেছে এই কাজে। যোগাযোগটুকু নিয়ে চলেও গেছে দ্রুত। আমার ঘাতকদের শিবিরে সাময়িক বড় আসন পেয়েছে তারা। আমি কিচ্ছুটি মনে করিনি। আজও মনে করি না। প্রত্যেকের স্বাধীনতা আছে আমার, আমাদের চিন্তাকে না-মানার। 

তবে লেখালেখির জগৎ স্থূল চোখে যোগাযোগ-ভিত্তিক মনে হলেও তা আসলে বিদ্যার জগৎ, জ্ঞানের জগৎ। সেজে থাকলে কী হবে, বেঁচে থাকতে থাকতেই সব সাজ মুছে যাবে, পাঠকের সামনে প্রকাশিত হবে প্রকৃত। 

ভাবতেই ভয় করে। মন খারাপ করে ঘুরে বেড়াই। কেউ লেখার কথা বললে ভাবি— ‘আদৌ কি আমার লেখার কিছু ছিল?’

এর মধ্যেই দেখা হয় অসুস্থ কিন্তু অপরাজেয় কবি  রাহুল পুরকায়স্থ-র সঙ্গে। ক্ষীণ গলায় সে গর্জন করে, “সার্কাসে জড়িয়ে পড়িস না।” 

দেখা হয়ে যায় বাঁকুড়া-পুরুলিয়ার আদিবাসী-মূলবাসী মানুষের জীবন লিখে চলা সাহিত্যিক সৈকত রক্ষিতের সঙ্গে। যিনি একটি টিলার মাথায় একটি জীবন্ত সৃজন উৎসবের  জন্ম দিয়েছেন। যিনি নিজেকে ‘লেখক’ মনে করেন না কিছুতেই। তাঁর ‘সমগ্র’ প্রকাশ প্রসঙ্গে হেসে এড়িয়ে যান বারবার। নাগরিক জীবন ছেড়ে পুরুলিয়ার জীবনে মিশে গিয়েও ‘সর্দার’ সেজে থাকেন না তিনি কখনও। লেখার চরিত্রদের বলেন না, “তোমাদের কথা বাবুদের কাছে পৌঁছে দিয়েছি… আমি তোমাদের ঈশ্বর হ‌ই গ!”

সারা জীবন সুবর্ণরেখার দুপাড়ের মানুষের কথা লিখে পুরস্কৃত সাহিত্যিক নলিনী বেরাকে জিজ্ঞেস করি, “আনন্দ পুরস্কারের দশ লক্ষ টাকা নাকি লোধা-শবর উন্নয়ন সংস্থাকে দিয়েছেন?” স্বভাবলাজুক সাহিত্যিক উত্তরে বলেন, “বনগাঁতেই আছ তো? মলয়, মলয় গোস্বামীর খবর কী? ভাল আছে?”

 এই মানুষদের কথা ভাবতে ভাবতে অহেতুক ভিড় মন থেকে  দূর হয়। মনে নীলিমা নামে। আমরা শূন্যের ঢেউ। লেখক হ‌ই  আর যে কেউকেটাই হ‌ই— শূন্যের ঢেউ…শূন্যের ঢেউ… শূন্যের ঢেউ….

যত ঢক্কানিনাদ ওই শূন্যতার মাঝেই! যাঁরা জানেন, কামনাগন্ধী মানুষ দেখলেই তাঁরা প্রসঙ্গ পালটে উড়ে যান। বিনয় মজু্মদার যাঁদের অমর নাম দিয়েছেন ‘প্রকৃত সারস’।

ছবিঋণ: জ্যাক্সন পোলক

বিগত দিনগুলি পড়ুন