দৈনিক কবিতা আশ্রম, ৩১ আষাঢ় ১৪২৭
আবহমান বাংলা ভাষা
দৈনিক
৩১ আষাঢ় ১৪২৭
ছবি: সংগৃহীত
ঈশিতা দেসরকার
লকডাউন
বারান্দায় যেতে ভাল লাগে না।
রাস্তা ঘেঁষা বারান্দা লজ্জার এপিটাফ।
গ্রিলে গাঁথা পোড়া পালক;
শুকনো হাতের রেওয়াজ।
বিষণ্ণতা আকাশের দিকে ওলটানো
কব্জির মতো ঝুলে আছে।
রুমাল মেলতে গিয়ে দেখি;
মানসিক ভারসাম্যহীন ছেলের বাবা
বেরিয়েছে কাজের খোঁজে।
মুখে কাপড়; কোমরে ক্যাথেটার।
সত্তর পেরোনো সুশান্ত মামা;
সেলাই মেশিনের নীচে নতুন সুতোর
স্বপ্ন দ্যাখে।
আমি খুঁজি হেরে যাওয়া পাঠ্য বইয়ের মলাট;
সুশান্ত মামা জিতে যায়।
ছেলের মুখের লালা মুছে দাঁড়ায়
ভিক্ট্রি স্ট্যান্ডের মাথায়;
বারান্দায় যেতে লজ্জা লাগে আমার।
নিউটন বালা
পলাতক
পালাতে গিয়ে ধরা পরে গেলাম পিতামহের কাছে ।কাছে এসে কাঁধে আলতো হাত রেখে তিনি বললেন,—কোথায় পালাচ্ছ তুমি? পালিয়ে যাওয়ার মতো কোনো জায়গা নেই এই পৃথিবীতে আর। পৃথিবীর সমস্ত মানুষই পলাতক। মাত্র এতটুকু দুঃখ খুঁড়তে এসেই তুমি পালিয়ে যেতে চাইছ! খনন করো , দুঃখ খুঁড়তে খুঁড়তে গভীর থেকে গভীরে যাও। দুঃখের যত গভীরে যাবে জানবে, সুখ ততই নিকটে আসছে। কোনো কিছু থেকেই পালিয়ে যাওয়া মানুষের কাম্য নয়।
পিতামহ দুঃখ খনন করতে জানতেন। আমি তো তাও শিখিনি দুঃখ খোঁড়ার চেয়ে মাটি খোঁড়া সহজ –এখন আমি মাটি খুঁড়ছি, মাটি। সাড়ে তিন হাত মাটি।
মো. রেজাউল করিম
দুঃসময়ের রোদন
আসমান থেকে নামে অদৃশ্য এক মৃত্যুদূত
মানুষ মরে একাকী, শীতাতপ-নিয়ন্ত্রিত যমালয়ে
সকলে যায় চলে যায় দূরে, বহু দূরে; সম্ভব হলে-
সাত সমুদ্দর, তেপান্তর পেরিয়ে ভিন দেশে।
স্বজনের নাই আগ্রহ কিংবা আকুতি,
সদ্যমৃত প্রিয়জনের প্রিয় মুখটি দেখা
কিংবা তার কফিনে শেষ শ্রদ্ধা- পুষ্পার্ঘ্য অর্পণে।
প্রিয়জনের অন্তিম শয়ান- কীভাবে কে জানে?
পাথরে ফুল ফোটে, মরুতে সবুজ বনানী,
মনের গহনে নির্বাক ভালোবাসা ডুকরে কাঁদে;
অদৃশ্য যমের শীতল স্পর্শে ভালোবাসাও মৃত।
মৃত্তিকা গহ্বরে শুয়ে সে-জন ভাবে, সবই কি ছলনা?
কষ্ট-কঠিন প্রশ্নের মুখে প্রিয়জন কাঁদে লুকিয়ে,
দেখ- চাঁদের গায়ে অশ্রুধারা, অবিরাম অঝোরে।
মৌসুমী রায়
ছায়াপ্রতিমা
আমার বুকের ভিতরে
একচিলতে ছায়াবারান্দা
জুড়িয়ে যেও
রোদেতাপে ফুটিফাটা
নিদাঘ বোশেখে
আমার বুকের ভিতরে
ছায়াতরু ডালপালা ছাড়ে
বসন্তের ঝড়ে
কাকে বকে সংসার পাতে
ফল দেয় ফুল হয়ে ফোটে
আমার বুকের ভিতরে
ছায়ানদী অবিরল বয়
যত বিষ যত বিষ ঢালো
নীলকন্ঠ উড়িয়েছি
দশমীভাসানে
খড়ের কাঠামো আমি
টিমটিমে শিখা
চণ্ডীদালানে …
ঈশ্বরফুল
বিভাস রায়চৌধুরী
পর্ব-৬
টিকটিকি আর কুমির
আমাদের পাশের পাড়ার মানুষ কবি মলয় গোস্বামী। গোস্বামী বাড়ির মানুষেরা অন্যরকম। কলোনির অন্য সব বাড়ি থেকে ঝগড়া ভেসে আসে। ওই বাড়ি থেকে ভেসে আসে গান। পণ্ডিত মশাইয়ের সব ছেলেমেয়েরাই গান করে, নাটক করে, লেখে। সেই বাড়ির মেজো ছেলে মলয় গোস্বামী। কাকুর বন্ধু। কিন্তু কোনও কবিকে আমি ‘কাকু’ বলতে চাই না। আমি তাঁকে ‘মলয় গোস্বামী’ বলেই ডেকেছি চিরকাল। মলয় গোস্বামী বাংলাভাষার একজন অসাধারণ কবি। সেইসঙ্গে গাইতে পারেন, আঁকতে পারেন, অভিনয়ে পারদর্শী, আরও কত কিছু। সাহিত্যের সব শাখাতেই তিনি যে শক্তিশালী, সে আমরা বনগ্রামের সাহিত্য পাঠকেরা জানি। কিন্তু কবিতাই তাঁর মূল শক্তি। কবিতার মায়াবনবিহারিণী হরিণী তাঁকে অন্য কোনও জীবনে থিতু হতে দেয়নি। ছন্দে অসম্ভব দখল থাকলেও মলয় গোস্বামী ছন্দ-সর্বস্ব নন। তিনি কখনোই চাননি ছন্দের দোলায় তাঁর কবিতার বক্তব্য বা ছবিটি হারিয়ে যাক। একটি কবিতায় পরিষ্কার লিখেছেন, “কে বলে ছন্দে লিখি? / পশুর মতো গন্ধে লিখি…”।
গন্ধ খুঁজে বেড়ান তিনি আত্মজীবন, জনজীবন ও জগৎ-জীবনের। তাঁর দেখাটাই অদ্ভুত—মায়া, অতীন্দ্রিয়তা, কৌতুক এবং নিখাদ বাস্তবের সম্মেলনে এই কবি অনন্য। এই যে লেখেন, “জোনাকির ব্যাকুলতাই আলো” বা “অভিমান রঙের বাবা / চলেছে মাঠ চিরে সরু পথ ধরে”—কী করে আসে এমন কথা? কবিতা সহর্ষে ‘বাঃ! বাঃ!’-এর বিষয় নয়, কবিতা একান্ত বিবেচনার বিষয়। কারণ হৃদয় থেকে উড়ালের সময় পাখি যে তার নখরে কবির আত্মার একটু-না-একটু অংশ নিয়ে যায়! কবিতাকে খতিয়ে দেখাই পাঠকের খেলা। প্রতিটি কবিতাই কিন্তু বহন করে তার জন্মরহস্যকে, যা আসলে কবির অবস্থান।
মলয়ের একটি অপূর্ব কবিতার অংশ—
“লেখার সরঞ্জাম বলতে আমার যা কিছু
তা হচ্ছে
একটি ফুসফুসের দোয়াত
তার ভিতরে আছে অতিরিক্ত শ্রমসিক্ত লাল কালি
আর এই দ্যাখো
আমার হাড়ের কলম…”
অজস্র কবিতা লিখেছেন, আজও লিখে চলেছেন এই কবি। শেষ-সত্তরের কবি মলয় গোস্বামী কবিতার জন্যই সারাদিন বাঁচেন। নানা রসের কবিতা লিখেছেন। একদিন ‘পণ্ডিত মশাইয়ের ছেলে’ ছিলেন উৎকৃষ্ট ও নাক-উঁচু, আর বর্তমানে সরল সোজা মানুষের কথাই তাঁর কাব্যভাষা। না-পাওয়া আর বঞ্চনাই শিল্পীকে তাজা রাখে বোধহয়।
আশ্চর্য একটি কবিতা ‘দেশলাই’!
“দেশলাই খুলতেই দেখি কালো কালো মাথা আর কৃশ রক্তবীজ
শরীর নিয়ে সারি সারি আমার ছেলেরা ঘুমিয়ে আছে।”
বাক্সের মধ্যে সারি সারি দেশলাই কাঠিগুলোকে কবি পুলিশের গুলিতে হত পরপর শোয়ানো বিপ্লবীর লাশ হিসেবে দেখছেন। কী অনায়াস মারাত্মক!
কবিতার শেষে শোকাহত কবিকে কবির প্রিয় নারী বলছেন—
“ওদের ওপর যেন চোখের
জল না পড়ে দেখো।
ওই ছোট্ট পুঁচকে কালো মাথাগুলোর মধ্যে
কিন্তু আগুন আর আলো ভর্তি হয়ে আছে…”।
সর্বনাশা কৌতুকের একটি কবিতা পরিশেষে পেশ করি। কোনও মন্তব্য করছি না। পড়ামাত্র আপনি কেঁপে উঠবেন।
কুমির /মলয় গোস্বামী
……………………………
টিকটিকিকে পাম্প করেছি—
গহীন কৌশল!
ওপর থেকে বোঝা যাবে না। তলায় চোরা স্রোত
আড়াল থেকে অনেক গল্প এগিয়ে চলে যায়—
সবাই ভাবে খেলার ছলে পাম্প করেছি কষে
পাম্প; ফুলছে!—পাম্প; ফুলছে!—ক্রমান্বয়ে কুমির।
টিকটিকিটা ফুলে ফেঁপে কুমির হয়ে যায়।
হাওয়ায় প্রচুর সমীহ আসে—শ্রদ্ধা করে ভিড়—
কুমির-রূপী টিকটিকিটা খেলিছে গঙ্গায়।
কুমির কিন্তু কামড়ে দিল, যেমন কুমির দ্যায়—
কুমির ঘোরে দিনের বেলায় রোদ্দুরে পিঠ দিয়ে—
পাম্প নিয়েছে, ভুলে গেছে—বিগত টিকটিকি!
ফেলে আসা দিনকে যেমন মানুষ ভুলে যায়!
চতুর্দিকে ছড়ানো আছে এবম্বিধ কুমির
কিন্তু একটা টোক্কা দিলে লেজটা খসে যাবে;
এই প্রতিভা, পরম্পরা রক্তে মিশে থাকায়
টিকটিকি আর কুমিরগুলো আলাদা করা যায়।