দৈনিক কবিতা আশ্রম, ৩১ বৈশাখ ১৪২৭
আবহমান বাংলা ভাষা
দৈনিক
৩১ বৈশাখ ১৪২৭
অলংকরণ: অমিত সাহা
নির্মল হালদার
পৃথিবী গ্রহের পুরুলিয়া
পর্ব-১৭
দলে পাঁচ জন। তিনজন পুরুলিয়া আসবে। বাকি দুজন যাবে ঝাড়খণ্ডের গ্রামে। পুরুলিয়ার তিনজনের মধ্যে দুজন যাবে অযোধ্যার গ্রাম। আরেকজন বান্দোয়ানের কাছে। অন্ধকার কাটতে এখনও অনেক দেরি। সবে তিনটে বাজে। ঘুটঘুটে অন্ধকারে একটু ভয় ভয় করছে পাঁচজন যুবকের। কিন্তু যেতেই হবে। দালাল চলে এসেছে। পাঁচজনকে রাস্তা দেখিয়ে দেবে। এক জেলা থেকে আরেক জেলায় যাওয়ার জন্য পুলিশ যেন ধরতে না পারে, সে ব্যবস্থাও দালাল করেছে। দুজনকে আবার ঝাড়খণ্ড বর্ডারে নিয়ে যেতে হবে । দালালকে এইজন্য দিতে হবে ৫০০০ টাকা। এই পাঁচজন যুবক একই সঙ্গে এক ঠিকাদারের সঙ্গে কাজ করে। লেবারের কাজ। কনস্ট্রাকসনের কাজ। আসানসোল শহর থেকে খানিক দূরে তাদের বসবাস। একটি টিনের চালাঘরে একসঙ্গে অনেক লেবার থাকে গাদাগাদি হয়ে। বাকি লেবাররা ট্রেন বাস বন্ধ হওয়ার আগেই নিজের নিজের বাড়ি চলে গেছে। এই পাঁচজন টাকা পায়নি বলে আটকে গেছিল। ট্রেন বাস বন্ধ হওয়ার পরে টাকা পায়। কিন্তু বাড়ি যাবে কিসে? ঠিকাদার বলে, তোরা ইবার নিজের নিজের পথ দেখ— আমি নাই পারবো খেতে দিতে। কাজ বন্ধ হয়ে গেছে, টাকাও পাবো নাই। কীকরে তোদের খাওয়াবো? এই পাঁচজনের একজন অশ্বিনী মুণ্ডা ঠিকাদারকে বলে, দাদা যাব কীভাবে? বাস নাই ট্রেন নাই, আমরা কি হেঁটে যাব?
একই সুরে কথা বলে বাকি চারজন। ঠিকাদার দেখে সত্যি তো, এ এক নতুন বিপদ। তারপর জানতে পারে দালালের খবর। সেই দালালকে ধরে নিয়ে এসে, অশ্বিনীদের সঙ্গে কথা বলিয়ে দেয়। রাস্তাতে দালাল কথা বলছে না। পাঁচজন যুবককেও কথা বলতে বারণ করেছে। এবং পাঁচজনের মুখেই গামছা বাঁধা। পিঠে ব্যাগ।
চৈত্র মাসের হাওয়া বইছে। শিরশিরানি ঠাণ্ডা। রাস্তাতে কোথাও দেখতে পেল না একটিও কুকুর। ৫ জনের ১ জন লম্বোদর বলে, এ বাবা কুকুরগুলাও যে নাইরে—পুলিশের ভয়ে পালায়ছে নকি? দালাল তখন, বলেছি না কথা বলবে না একটাও— পাঁচজন হাসে চুপচাপ। সামনে দাঁড়িয়ে আছে একটি পুলিশ গাড়ি। দালাল দেখতে পেয়েই বলে, তোরা লুকায় যা। ওই যে ঝোপঝাড় দেখছিস, উদিকে। আমাকেও লুকাতে হবে। কতক্ষণ লুকিয়েছিল কেউ মোবাইল দেখেনি। এবং দালালের কথামতো মোবাইলের সুইচ অফ করতে হয়েছিল। বেজে উঠলেই পুলিশ টের পেয়ে যাবে। ভোর হয়ে আসতেই, পুলিশ গাড়ি চলে গেল। এরা নিঃশ্বাস ফেলল স্বস্তির। আবার হাঁটতে শুরু।
৫ জনের ১ জন হিমাদ্রি মাহাত আস্তে আস্তে বলে, দালালকেই বলে, দাদা কুথাও চা দেখতে পেলে একটু দাঁড়াবো। দালাল বলে,আর চা-ফা খেতে হবে নাই। দেরি হয়ে যাবে। ঝাড়খণ্ডের দুজন বলে, চা খেতে আর কতক্ষণ, ৫ মিনিট সময় লিব। ঠিক আছে ভাই ঠিক আছে, তবে দেখ, চা দোকান খুলা পাবি তো! দালালের আশ্বস্ত বাক্য শুনে, পাঁচ জনের মুখে হাসি দেখা গেল। প্রায় তিন মাস পরে বাড়ি যাচ্ছে সবাই । এখানে ৬ মাসে একবার ছুটি। লকডাউনের কারণে, ছুটি পেয়ে গেল আগাম। সবারই ঘরে চিন্তা করছে। না গেলেই নয়। কিন্তু এমন বিপদ, ঘর না-পৌঁছোনো অবধি শান্তি নেই। বরাকরের কাছে এসে দালাল জানায় আর যেতে পারবে না। নিজের নিজের রাস্তা দেখে নাও। ঝাড়খণ্ড বা ধানবাদ যেতে হলে, বরাকর থেকেই দু’জন যুবক বাকি তিনজনের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। দালাল চলে যায় আসানসোলের দিকে। পুরুলিয়াগামী তিনজন দামোদর ব্রিজ পার হয়ে ভাবে, নদীতে সিনান করে লিলে হয়। লম্বোদর বলে, দেরি হবে রে ভাই—জলদি চল্। খিদে পাচ্ছে সবারই। ব্যাগ থেকে পাউরুটি বের করে শুকনো চিবিয়ে খায় । চিবোবে কি, নিতুড়িয়াতে পুলিশ তাদের ধরলো। যেতেই হলো থানাতে। পুলিশের প্রশ্নের কাছে পাঁচজনই সিঁটিয়ে যায়। থানার বড়বাবু অর্ডার করেন, এদের হোম কোয়ারান্টিনে পাঠাও।
তখন দুপুর। যুবকদের পেট চোঁ চোঁ করছে। লম্বোদর কেঁদেই ফেললো। অশ্বিনী হাসতে হাসতে বলে, চল কদিন ভালই থাকবো। হঁ ঘরের চেয়ে ভালো থাকবি বল? লম্বোদর কাঁদতে কাঁদতেই অশ্বিনীকে জড়িয়ে ধরে—ই কি হলো রে। টাকাও গেল। ঘর যাওয়াও হলো না।
১৯ বৈশাখ, ১৪২৭