দৈনিক কবিতা আশ্রম, ৩২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭
আবহমান বাংলা ভাষা
দৈনিক
৩২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭
ছবি: সঞ্চিতা দত্ত
গৌতম রায়
মনুষ্যেতর নই
ফাটা মেঘের আড়ালে জ্যোৎস্না
অন্ধকারের ঘুম ভাঙানোর জন্য নাড়ছে কড়া
অনেক বৃষ্টিপাতের পর
হিমেল হাওয়ার কাছে চাইছে সমর্পণ
একটি ধুন কুসুম ভেঙে নাড়াচ্ছে আলো
পৃথিবীর আদিমতম
কাছে ডাকার আতীব্র কাপলিঙ্ক আবেদন
একটু বহমান জলের আলম্বন পেতেই
সমস্ত ব্যাঙেদের সাথে সহমত
পৃথিবীত্ব রেখে যেতে চায়
জঠর থেকে বেরিয়ে আসা
এই আলোআঁধারি উঠোনে
তার অঙ্কিত নবজাত তিলক
আহা ! খেলাঘর তোর কী মায়া
মায়াই ছায়া থেকে কায়ায়
করে প্রাণসঞ্চার
আমি কি তবে এই আঁশটে সৌরভে
জলে নামব?
আর কারও না হোক
আমার একটি অন্ধকার দরকার
আমি তো মনুষ্যেতর নই ।
তিতাস বন্দ্যোপাধ্যায়
নিষাদ
পারদ অন্ধকারে ডুবে যায় মুখ।
হাতের নিষিদ্ধ মুঠো ভেবে দেখে
সংকল্প, সংশয়!
পিঠের গর্তে ঢুকে পড়ে শীতের চাঁদ
যেন উন্মত্ত ফসলের মাঠ থেকে চুরি হওয়া ভুট্টার বীজ…
অথচ,
শিরদাঁড়া প্রস্তুতকারক সংস্থার সঙ্গে বনিবনা হল না বলেই
এখনও মানুষের বুকের ভেতর অর্ধমৃত পাখিরা
বেহুলার কান্নার মতো অভিশাপ ছিটিয়ে যায়।
মানসী কবিরাজ
বনলতা তুমি
বনলতা কোনও কবিতা পড়েনি কখনও
এবং
তার নিজের সংসার বলতে কিছুই নেই
বাবুপাড়া মণ্ডলপাড়া চৌধুরীপাড়া এসব পেরিয়ে
প্রতিদিন ধুলো মেখে মেখে
তাকে আসতে হয় কাজে
যদিও পাখির নীড়ের গল্পটা বনলতার জানা নেই
তবে দারুচিনি নামে এক মসলার কথা
সে আবছা শুনেছে
সে এখন
অঙ্গনওয়াড়িতে যত্নে রাঁধে মিড-ডে মিল
আর পাহারাদারের চোখে ফাঁকি দিয়ে
আঁচলে ঢেকে নিয়ে যায় বাড়তি খিচুড়ি
এবং
অঙ্গনওয়াড়ির বড়কর্তার নাম জীবনানন্দ হলেও
তার পদবী দাশ কি না সেটা জানে না বনলতা
সে শুধু এইটুক জানে
জীবন-কর্তা কিছুটা মানুষ মানুষ দেখতে বলেই
বনলতার অন্ধ মা’কে এখন আর ভিক্ষা করতে হয় না
মুহম্মদ ইমদাদ
অমরত্ব বিষয়ক
মৃত্যুর প্রধান কারণ জন্ম।
এই জরারে কাবু করতে পারলেই
মৃত্যুকে ঠেকানো যাবে। জন্ম নাই তো মৃত্যুও নাই।
পৌঁছে যাব অমরত্বের ঘরে—এইসব কথা
কানে আসতেছে।
তবু তিন লক্ষ বছর ধরে
জন্ম নেওয়ার চেষ্টা করতেছি।
পারতেছি না। বাপ পাইলে মা পাই না।
মা পাইলে বাপ পাই না।
একবার দুইজন নারী ও পুরুষ
আমারে জন্মানোর ব্যাপারে
একমত হইছিল। তাদের বিচ্ছেদ হয়ে যায়,
আমি আসতে পারি নাই।
এদিকে অমরত্ব বিজ্ঞানীরা জন্মের
আগের আমারে খুঁজতেছে
খোঁজ দিতেছি না। আমি ওদের চিনি,
ওরা শীতের প্রসূতি।
সূর্য হত্যা করে বরফ দিয়ে ঢেকে দিব কবরের স্মৃতি।
আরো তিন-চার লক্ষ বছর চেষ্টা করব
পৃথিবীতে এসে মরার।
এখন আমার দুঃখ নাই।
আমি দুঃখ আনতে পৃথিবী যাব।
দুঃখের পাশে আমার চিরসুখী আত্মা
রেখে বোঝার চেষ্টা করব
কোনটা বেটার, পৃথিবী, না পরলোক।
বিজ্ঞানীদের চোখ ফাঁকি দিয়ে
আসতে পারব কি না
পিতা ও মাতা স্বরূপ দুইজন
নারী ও পুরুষ পাব কি না—
এটাই এখন প্রধান দুঃশ্চিন্তা।
মানুষহীন অমর পৃথিবী দিয়া কী হবে?
নতুন প্রজন্মের বিশিষ্ট প্রকাশক অপু দে-র নিয়মিত কলাম
অপুর সংসার
পর্ব-১২
সত্যজিৎ রায়
খুব বৃষ্টি হচ্ছিল, সঙ্গে ঝড়। কাঠের ঝরঝরে জানালা আর দরজায় দাপুটে হাওয়াতে বড্ড আওয়াজ হচ্ছিল। পিতলের প্রদীপটায় জ্বলতে থাকা সলতে হাওয়াতে কেমন পাগলামি শুরু করেছে। দিদির খুব জ্বর। ক্লাস থ্রি-তে খুব কেঁদেছিলাম দুর্গাদিদির চলে যাওয়ায়। মা-কে জড়িয়ে মুখ গুঁজেছিলাম মায়ের পেটে। সেই মুহূর্তে সাদা কালো পর্দায় বেজে উঠেছিল সেতারের ধ্বনি। এরপরে যতবার ‘পথের পাঁচালী’ দেখেছি ততবার সেই সেতারের সুরে কেঁদেছি। সেই ক্লাস থ্রি-তে সত্যজিৎ রায়-এর সঙ্গে পরিচয়। না, ভুল বললাম, সত্যজিতের সৃষ্টির সঙ্গে পরিচয়।
সত্যজিতের নাম জেনেছি অনেক পরে। তখন হ্যারিসন রোডের বাড়িতে যে ঘরটায় থাকতাম ওই ঘরে দু’দিকের দেয়ালে ছিল সিমেন্টের তাক, আর ওই তাকে থাকত বাবার বই। আমি ওখান থেকে মাঝে মাঝে একটা-দুটো বই বের করে পড়তাম, কখনও না পড়ে শুধু ছবি দেখতাম। একদিন একটা ছোট্ট বই বের করি, নাম ‘ছাতুবাবুর ছাতা’। মনে আছে এখনও বইটিতে নয়টি গল্প আছে। কামাক্ষীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ের অসাধারণ সেই গল্পগুলোর সঙ্গে দুর্দান্ত অলংকরণ। আলংকারিকের নাম দেখেছিলাম সত্যজিৎ রায়। আমি দ্বিতীয়বার পরিচিত হই সত্যজিতের সঙ্গে। না, ভুল বললাম আবার, আমি পরিচিত হই তাঁর শিল্পীসত্তার সঙ্গে।
টিভিতে ছবিতে ছাড়া আমি কোনওদিন সত্যজিৎ রায়কে দেখিনি। কিন্তু ছিপছিপে দীর্ঘ শরীরের এই মানুষটির সম্পর্কে এতজনের কাছে এত কথা শুনেছি যে আমার মধ্যে এক কল্পনার জগৎ তৈরি হয়েছে। চোখ বন্ধ করলেই মনে হয় সামনেই তো মানুষটি খেরোর খাতায় স্কেচ করছেন আর পাশে চিত্রনাট্য তৈরি করছেন। নতুন কোনও ফেলুদা তৈরি করছেন।
‘সোনার কেল্লা’র ফেলুদার সঙ্গে পরিচয় হয় আমার কর্মজীবনে। পরিচয় পর্ব পেরিয়ে কখন যে আপন হয়ে গিয়েছিলাম জানি না। সৌমিত্র জেঠু ও শমীক (বন্দ্যোপাধ্যায়) জেঠুর আড্ডার মাঝে আমি থাকতাম বিস্মিত নির্বাক শ্রোতা। দুই ব্যক্তির সঙ্গেই সত্যজিতের সম্পর্ক ছিল বন্ধুত্বের। সৌমিত্র জেঠু একটি অসাধারণ কথা শুনিয়েছিলেন, “শুটিংয়ের পরে মানিকদার ঘরে গল্প করতে গেছি। কথায় কথায় জিজ্ঞাসা করলাম, মানিকদা আপনি বিশ্বভারতীর আর্ট বিভাগের ছাত্র, এত ভাল ছবি আঁকতেন, আপনার গল্প লেখার হাত এত সুন্দর, এত জনপ্রিয় আপনার লেখা, অথচ আপনি ছবি আঁকার দিকে গেলেন না…আরও অনেক বেশি লিখতে পারতেন, লেখার দিকে গেলেন না… আপনি হঠাৎ করে কেন সিনেমা তৈরি করতে এলেন?— উত্তরে বলেছিলেন, শান্তিনিকেতন থেকে যখন কোনারক, অজন্তা দেখতে গেলাম তখন মনে হল এই শিল্প জগতে আমার নতুন করে আর কিছু দেওয়ার নেই… রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যা লিখে গিয়েছেন তারপরে আমার সাহিত্য জগতে কিছু দেওয়ার নেই… তখন মনে হল একমাত্র এই সেলুলয়েডে আমি হয়তো কিছু দিতে পারি। বাংলায় চলচ্চিত্র জগৎ তখনও তেমন সাবালক হয়ে ওঠেনি।…”

(সৌম্যেন্দু রায় লিখিত ‘চলচ্চিত্র চলচ্চিত্র’ বইটি থেকে।)
এমন ভাবেই শুনতে শুনতে ‘আমার সত্যজিৎ’ তৈরি হতে থাকে। একদিন গল্প করছি প্রফুল্ল রায়ের সঙ্গে। তাঁর বম্বে জগতের গল্প শুনছিলাম। কলকাতায় তপন সিংহ, অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়, অসিত সেন, গৌতম চট্টোপাধ্যায়ের কথা হতে হতে সত্যজিৎ রায়ের কথা এল। সত্যজিতের প্রথম সিনেমা ‘পথের পাঁচালী’ দেখা নিয়ে। প্রফুল্ল জেঠুর কথায়, “পথের পাঁচালী সবে মুক্তি পেয়েছে। সত্যজিতের নাম কেউ তখন আমরা শুনিনি। নরেন্দ্রনাথ মিত্রের লেখা নিয়ে সেই সময় একটা সিনেমা চলছিল ইন্দিরা সিনেমা হলে। দেখতে গেছি। সিনেমাটা ভাল হয়নি। মন খারাপ করে হল থেকে বেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে যাচ্ছি। রাস্তায় এক বন্ধুর সঙ্গে দেখা। আমায় বলে, চল, একটা সিনেমা দেখতে যাব। সত্যজিৎ রায়। তিনি কে? পথের পাঁচালী সিনেমা বানিয়েছেন। মনে মনে ভাবছি এত ভাল উপন্যাসটা নিয়ে কে সত্যজিৎ কী সিনেমা যে বানাল কী জানি। যা-ই হোক, বন্ধুর সঙ্গে বসুশ্রী হলের ভেতরে বসলাম। সব মিলিয়ে জনা পঁচিশ দর্শক। আমার সামনে এক বিদেশিনী বসে আছেন। সিনেমা শেষের পরে মুগ্ধতা কাটিয়ে আমি ওই বিদেশি মহিলার সঙ্গে কথা বলতে এগিয়ে যাই। বলি, আপনার সঙ্গে একটু কথা বলব। উনি বলেন, হ্যাঁ বলুন।
আপনি কি বাংলা জানেন?
তিনি বলেন, একদম জানি না।
আপনি সিনেমাটা বুঝতে পেরেছেন?
নব্বই শতাংশ বুঝেছি। আমি ভারতে এই প্রথম এসেছি। আমার স্বামী গ্রাউন্ড প্ল্যানার। সারাদিন মিটিংয়ে আছেন, আমি বোর হচ্ছিলাম, তাই বেরিয়ে পড়েছিলাম ঘুরতে। এই পোস্টার দেখে আমি সিনেমাটা দেখতে ঢুকি (পোস্টারে ছিল চুল আঁচড়ানোর দৃশ্য)। অসাধারণ। This man will go far. He knows the language of the film.”
এইসব কথোপকথনের মধ্যে দিয়ে চিনতে থাকি আমার কল্পনার আধুনিক রূপকথার নায়ককে। ‘সংসার সীমান্তে’ দেখে তরুণ মজুমদারকে ডেকেছিলেন। তরুণবাবু একদিন ফোন করে তাঁর বাড়িতে যান। নানান কথাবার্তার পর তরুণবাবুকে বলেন, “আপনি এই ছবিটার একটা শর্টার ভারশন করুন ফেস্টিভ্যালের জন্যে। বিদেশের বিভিন্ন ফেস্টিভ্যালে ছবিটা পাঠান।”
তরুণবাবু খানিকটা ইতস্তত করে জিজ্ঞাসা করেন, “আপনি যদি একটু…”।
বাক্য শেষ করার আগেই উঠে পড়েন আর ড্রয়ার থেকে একটি কাগজ বের করে নিয়ে আসেন। যে কাগজটিতে কোথায় কোথায় শর্ট করতে হবে তা নোট করে রেখেছিলেন।
এইভাবে এগিয়ে চলে তাঁর সঙ্গে থাকা, তাঁর সঙ্গে সময় কাটানো মানুষজনের কাছ থেকে আমার গল্প শোনা। তপন সিংহ, তরুণ মজুমদার ও সত্যজিৎ রায়ের একসঙ্গে দিল্লিতে কোনও এক পুরস্কার নিতে যাওয়ার কথা। সত্যজিৎ বাবু অসুস্থতার জন্যে যেতে পারেননি। তপনবাবুকে বলেছিলেন, “আপনি যদি আমার পুরস্কারটি বহন করে আনেন…।”
তপনবাবু ওই অনুষ্ঠানে সত্যজিৎ বাবুর পুরস্কারটি গ্রহণ করতে মঞ্চে ওঠেন। মঞ্চ থেকে নেমে এসে নীচে রাখা একটি মাইক্রোফোনে বলেন, “আজ আমার জীবনে স্মরণীয় দিন। আমার দেশের শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র পরিচালকের প্রাপ্ত পুরস্কারটি আমি সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছি।”
এমন টুকরো টুকরো স্মৃতির কথাগুলো জমতে থাকে আমার ঝুলিতে। কখনও চিত্রগ্রাহক সৌম্যেন্দু রায়, কখনও “প্রস্তুতিপর্বে”র সুকুমার রায় সংখ্যা তৈরিতে সাহায্যকারী পুলক চন্দ, আবার সত্যজিৎ তথ্য ভাণ্ডার দে.মু. কাকু। এঁদের থেকে আমার অনেক গল্প শোনা। হ্যাঁ গল্পই। এক আধুনিক রূপকথার গল্প। রূপকথার গল্প খুঁজতে থাকি ফুটপাথে। পুরনো প্রচ্ছদ সহ ‘সন্দেশ’ বইটি থাকা সত্ত্বেও ফুটপাথ থেকে প্রচ্ছদহীন আবার একটি ‘সন্দেশ’ সংগ্রহ করি। আসলে বাঁধাইয়ের বোর্ডটি তুলতে ভেতরের পাতায় দেখেছিলাম আড়াআড়ি ভাবে নীল কালিতে সত্যজিৎ রায়ের সই! আমার গর্ব, আমার কাছেও সত্যজিৎ আছেন।