দৈনিক কবিতা আশ্রম, ৩ আষাঢ় ১৪২৭
আবহমান বাংলা ভাষা
দৈনিক
৩ আষাঢ় ১৪২৭
Untitled by Chandan Mishra
সমর সুর
সীলমোহর
কে যেন ছায়ার মতো ঘুরে বেড়ায় অদৃশ্য
সীলমোহর হাতে।
কোথায় লুকাব গহ্বর জুড়ে অন্ধকার
রাস্তাঘাট, বাজারহাট, প্রেমিকার ঠোঁট
থেকে সরিয়ে রেখেছি ঠোঁট।
এমনকী কাঁধের উপর হাত রেখে
কতদিন বলতে পারিনি
বন্ধু আমি তো আছি তোমার পাশে।
অভুক্ত কুকুর শুয়ে আছে নির্বিকার,
গার্হস্থ্যের মুখ চেয়ে।
কে যেন ঘুরে বেড়ায় অদৃশ্য সীলমোহর হাতে।
মধ্যরাতে কান্নার শব্দে লাফ দিয়ে উঠি
মৃতের বিছানা থেকে।
শবের মিছিল ছুঁয়ে যদি ফিরে আসি
তবে তোমায় দেব নীলকন্ঠ পাখি।
মা কতকাল তোমার কাছে যাওয়া হয়নি।
দেবনাথ সুকান্ত
স্যালভেশন এবং বিচ্ছেদের মাঝ বরাবর
মৃত্যু মৃত্যু মৃত্যু
শুধুমাত্র তোমার কাছেই এক আঁজলা জল
পেয়ে আমি সেই যে সেই
কোন জন্ম থেকে একটা মুখাপেক্ষী
জানালার কাছে সমুদ্র রেখেছি
তা হয়তো কোনও নারীর পক্ষেই জানা
সম্ভব নয়
নারী সেও কি কম কিছু মৃত্যু
ভয় আর তাড়নার ইশারা সংলাপে ডুবে
ডুবে থাকে এক কোমর জলে
কোমর জড়ানো আত্মা সাদা অথচ
মসৃণ ত্বকে স্খলিত জীবন রাখে
সে স্খলন হয়তো বা কোনও
এক সন্ত মহারাজ
থেরবাদী অহর্নিশ জারিত নেশায়
নিজেকে হারিয়ে খুঁজে যাচ্ছে
প্রেম প্রেম প্রেম না কি সেই
যার কাছে অন্তর মহল
একটা উজান চায় মুহূর্তের
তবে নাও নোঙর তুলে নাহয় বসি পাটাতনে
যে কোনও সময় সেই শঙ্খধ্বনি বেজে উঠবে
নেমে এসে বিলীন শিকারি তার
ছিলা থেকে মুক্তি দেবে শর
যা কিছু সতত নতুন সেই টেনে এনে
মুখোমুখি গেঁথে যাবে নিশি যাপনে
উজান তোমাকে দিয়েছে তাপ
সে যখন দুখী ছিল নিজেকে পুড়িয়েছে
সে যখন সুখ পেয়েছে দিয়েছে জ্বলন
এ ঘর ও ঘর হয়ে ঠিক যেখানে
এক কালো বিন্দু অপেক্ষায় থাকে
সেও তার ভেজা নদী খুলে রেখেছে সেখানে
তাহলে প্রেমিক তোমার স্যালভেশন কি
ভেজা কাপড়ের জড়ানো গন্ধের কাছে
বিচ্ছেদ চাইছে
অজস্র বাঁক থেকে সরে সরে এসে এক আভাস
কুয়াশা শুধু কুয়াশা
ফাল্গুনী দে
লোডশেডিং
লোডশেডিংয়ের ভিতর অন্ধকার হাতড়ে
পেয়েছি আলোর মজলিস
পাটভাঙ্গা আঁচল প্রিয় হ্যারিকেন হাতে
নক্ষত্রমালা খোঁজে
নাগরিক যাপন ভুলে রূপকথার সামনে
হাঁটু মুড়ে বসে জীবন
অন্ধকার সিঁড়ি বয়ে অতীত উঠে আসে
আকাশের গ্রীনরুম
আলো নিভে গেলে সম্পর্ক গভীর হয়
ভাঙ্গা পিয়ানোয় কাঁদে মুনলাইট সোনাটা
অন্ধকার বলে দেয় গোপন অলিন্দ ব্যথা
টানেলের গায়ে হায়রোগ্লিফ
তুমি তো গোপন করোনি কিছু আয়নায়
তবু অন্ধকার কেন প্রিয় মনে হয় ?
কেন বিষন্ন রঙের চাদর আজ ফিনিক্স পাখি
ঘুমের ভিতর জিয়ন উৎসব ?
আলোময় বিশ্বাস
অথচ হিমরাতে
ঘোড়াটি কুয়াশার আড়ালে ছিল
তার নড়ন আর অকারণের হ্রেষা ছিল
হাওড় পাড়ের নিখাদ শীত-পোড়ানোর গান।
প্রেতাত্মার দুঃখলীন গল্প নিয়ে
অচেনা কন্ঠস্বরে গান গায় রাত, সে গানের সুর
বেরিয়ে আসে
কলাবাদুড়ের ওম থেকে।
সকালবেলা পাখপাখালির কাকলি শুনে, জল নাচে
প্রসারিত দ্যুতির সাথে নাচে স্থিরচিত্র চরাচর।
অথচ হিমরাতে কালো রক্তক্ষরণের বিষণ্ণতায় ডুবে
থাকে একটি ঘোড়া, সঙ্গীবিহীন।
পাগলাঝোরা
জয়ন্ত দে
পর্ব-৩
মেজদিরা
আমার মেজদির একটা লাল পাথরের সোনার আংটি ছিল। সারা বছরভর কালীঘাটের হাবলিদার দোকানে সেটা যেত আর আসত। কখনও জ্বর ছাড়াতে তো কখনও স্কুলের ফিজ ভরতে। আর মেজদি সারাদিন টংটং করে টিউশন করত। তার হাতে পেন আর শাড়িতে ঢাকা পিঠ।
একবার একজনের লোভী চোখ দেখে আমি খুব রেগে গেলাম। বললাম, ‘তুই স্লিভলেস ব্লাউজ পরে পড়াতে যাস, লজ্জা করে না?’
মেজদি অবাক চোখে বলল, ‘কেন রে, আমার তো গায়ে শাড়ি ঢাকা থাকে।’
আমি আরো তীব্র গলায় বললাম, ‘ছিঃ!’
মেজদি রাগল না। বিষণ্ণ মুখে বলল, ‘বড্ড ঘামি তো, সব ব্লাউজের বগলগুলো ছিঁড়ে গেছে রে ভাই। এবার একটা কিনতেই হবে, না হলে চলবে না।’
আমি বড্ড বোকা আর আবেগপ্রবণ ছিলাম। এখনও মেজদিদের দেখলে চিনতে পারি না। যারা লোভী চোখে দেখে, সে চোখে আঙুল দিতে পারি না। তাই জন্যই হয়তো মেজদিরা আমাদের যমের দুয়ারে কাঁটা দিয়ে নিজেরা যমের বাড়ি যায়। কেন গেলি, কিসের জন্য আজ সে কথা উহ্য থাক। আমরা সবাই ভাল আছি, শুধু এমন দিনে আমার কপাল চড়চড় করে।
বলতে ইচ্ছে করে, চন্দন চাই না, একটু জল দে।
যদি কোথাও থাকিস, ভাল থাকিস।