দৈনিক কবিতা আশ্রম, ৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭
আবহমান বাংলা ভাষা
দৈনিক
৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭
গল্প
আলোকচিত্র-অতনু সাহা
অর্পণ চক্রবর্তী
বুদ্ধ পূর্ণিমা
চাঁদু, হাঁটছিলাম। হাঁটছিলাম বললাম কারণ আমিই চাঁদু। মাঠটা পেরোতে হবে। অকারণে এতো বড়ো একটা দিলখোলা মাঠ ঢিবি, কাঁটাঝোপ, গরুর খুঁটো, খানিক খানিক ঘাস নিয়ে শুয়ে শুয়ে আমার পরীক্ষা নিচ্ছে। হনহন করে এটা পেরোতেই হবে আমায় । এই মাঠের নেশা মারাত্মক । একবার বসে পড়লে আর উঠতে পারব না । পকেটের পাঁইটটা এখানেই মেরে দিয়ে গড়াগড়ি খাব। ওদিকে পূর্ণিমার নাচ শেষ হয়ে যাবে। আমার বৌ জোছনাকে আজ হাসি হাসি মুখে দুধ আর আতপচাল গুছিয়ে রাখছে দেখে এসেছি। নাঃ! এই হতচ্ছাড়া মাঠে দুদণ্ড বসি-ই না হয় । একটি ঢোক। ব্যাস । আজ ঠিক পৌঁছাব সময়মত।
বরাবর দেরি হয়। প্রতি বচ্ছর ফিরে দেখব বৌ ঘুমোচ্ছে। আর পূর্ণিমা—বৌয়ের ছোটবেলার বন্ধু, আমার বন্ধু, না শত্রু, না পিরীত নাকি সবই—সে আবার সুজাতা নাম নিয়ে ভিখারিটাকে পায়েস খাইয়ে খালি পাত্রটা ফেরত দিতে এসেছে। লজ্জাও নেই মাইরি, ওই সুজাতা নামে নাচাগানা পার্টির সঙ্গে ফাংশান করতে যায় বিহার ইউপি, ওই নাম নিয়েই ভিখিরি সাধুটার সঙ্গে লটঘটও করে আসবে। পুরোটাই গদগদ গলায় আমাকে বলবেও। আমি কি বানের জলে ভেসে এসেছি! আজ আমি আগেই ফিরব। ও পায়েস আজ আমি খেয়েই ছাড়ব। আপাতত একটু শুই ।
শালার চাঁদটা আজ একঘর। অ! বুদ্ধপূর্ণিমা না আজ! ভিখিরিটা গাছের তলায় আজ থাকবেই। পূর্ণিমা মিটিমিটি হেসে বলছিল—ওকে নাকি প্রতি বছরই বলে এই শেষ, পরের বছর থেকে আর আসতে হবে না। কিন্তু ফি-বচ্ছর আসে। পায়েসের লোভে। আমার বৌটার আবার বলতে নেই রান্নার হাতটা চাম্পি। যাক গে, বোতল শেষ। এখন একটু ঘুমোই। সামনের বছর দেখে নেব’খন।
ছবি- চন্দন মিশ্র
নাহিদা আশরাফী
বাতেন মুন্সীর মৃগী ব্যামো
সবাই ভাবত মৃগী ব্যামো। আসল ঘটনা অন্য। বাতেন মুন্সী অবশ্য অনেক আগেই বিষয়টা ধরতে পেরেছিল। সেগুন কাঠ দিয়ে বানানো নতুন ড্রেসিংটেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়াতে গিয়ে আয়নার মধ্যে খুব স্পষ্টভাবেই সখিনাকে দেখেছিল সে। আঁতকে উঠে হাত থেকে চিরুনি পরে যাবার অবস্থা । আর একদিন, নতুন বউটা আগুন গরম ভাত এনে সামনে দিল। রাগে চুলের মুঠি ধরে টান দিতেই বউটার চোখের দিকে তাকিয়ে স্তব্ধ হয়ে গেল। বউটার চোখে সেই হালিমার ঘৃণামাখা চোখ বসানো। আর ওই যে সেদিন, আরাম কেদারায় একটু ঝিম মতন এল আর ঠিক তখনই বাতেন মিয়া অনুভব করল দু’পাশ থেকে কে যেন তার গলা টিপে ধরছে। বাতেন মুন্সী হাসফাস করে চেয়ার ছেড়ে উঠতে যাবে তখনই দেখল আরাম চেয়ারের রিভলভিং হাতাটা তাকে আটকে রেখেছে। নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে চোখে রক্ত উঠে যাচ্ছিল প্রায় । চিৎকার করে কাউকে ডাকবে অথচ গলা দিয়ে স্বর বেরুচ্ছে না। সেই থেকেই শুরু।
শেষের দিকটায় পাগলের মতই হয়ে গিয়েছিল বাতেন মুন্সী। ঘরের চেয়ার, টেবিল, খাট-পালঙ্ক এমনকি ঘরের খুটি, জানালা, দরজা সব তাকে এমন ভাবে আঘাত করতে শুরু করে, যে চিৎকার করে ঘরে মরার মতন পরে থাকত। এক সময় আঘাতের জায়গাগুলোতে পচন ধরল। দুর্গন্ধে আগের পক্ষের ছেলে মেয়ে বা নতুন বউ কেউই কাছে আসত না। মাঝে মাঝে তীব্র চিৎকার ভেসে আসত তার ঘর থেকে , “ছাইড়া দে সখিনা, ছাইড়া দে হালিমা। আমারে মাফ দে।” সেই ভয়াবহ চিৎকার শুনে সবাই ভাবত বাতেন মুন্সী নির্ঘাত পাগল হয়ে গেছে।
পরিস্থিতির ভয়াবহতায় একটা সময় সে নিজেই নিজের মৃত্যু কামনা করতে শুরু করে। কারণ কেউ না জানুক সে তো জানত কেন তার এই পরিণতি …
২
সময়: ১৯৭১, স্থান: ভেবে নিন বাংলাদেশের যে কোনও প্রত্যন্ত গ্রাম । কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে ধরে আনা হয়েছিল ছ’টি মেয়েকে। অপরাধ ঠিক তাদের নয়, তাদের বাবা অথবা স্বামী অথবা ভাইয়ের। সবার সামনে প্রতিটি মেয়ের উপর দশ থেকে বারোজন পাকিস্তানী ও রাজাকার হায়েনা হামলে পড়ত। উপভোগের পরে মৃত্যু নিশ্চিত হলেও যে ছাড়া পেত এমন ভাবার কারণ নেই। পৈচাশিক আনন্দে মৃত মেয়েগুলোর স্তন, উরু সব কেটে নিয়ে তারা লোফালুফি খেলত । একসময় এই খেলাটা পাকিস্তানী শুয়রের বাচ্চা মেজরের এত মনে ধরল যে ছয়টি মেয়ের প্রত্যেককে একই ভাবে মরতে হল। সবচেয়ে ছোট মেয়েটির বয়স ছিল বারো বছর। মেয়েটিকে তার মায়ের সামনেই দশজন হায়েনা ছিড়ে খেল। সেই দশজন দশাসই খেলোয়ারের একজন আমাদের গল্পের বাতেন মুন্সী । উফ! সেই মেয়ে আর তার মায়ের চোখ; অনেকদিনে ভুলতে পারেনি সে। পরে অবশ্য বডিগুলোর তিনটি স্কুল মাঠের পূব কোণায় আর বাকি তিনটিকে দক্ষিণ কোণায় পুতে ফেলার নির্দেশ দিয়েছিল মেজর। আর মেজরের পা-চাটা বাতেন মুন্সী অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছিল নির্দেশ ।
দেশ স্বাধীনের পর বাতেন মুন্সী যথারীতি তার ভোল পালটে ফেলেন । চিহ্ন মুছে ফেলতে মাঠের পূব কোণ ঘেঁষে এক বিরাট শাল সেগুনের বাগান করেন আর দক্ষিণ কোণায় কে বা কারা বাঁশের চারা পুঁতেছিল। এখন সেখানে এক বিরাট বাঁশঝাড়।
তৃতীয় নাম্বার বউ আনার আগে নতুন ঘর আর নতুন আসবাব বানাতে সেই বাগান থেকে সবচেয়ে প্রাচীন দুটো শাল আর একটা সেগুন গাছ কাটিয়ে আনান বাতেন মুন্সী। কিন্তু তারপর থেকেই তার এই দুরবস্থা।
৩
কিছুক্ষণ আগেই বাতেন মুন্সীর শেষ গোসল করানো হয়েছে। খাটিয়ার কাছেও সহসা কেউ ভিড়ছে না গন্ধে । না ভিরুক। কোনও দুঃখ নেই বাতেন মুন্সীর। মুক্তির আনন্দে সে আত্মহারা। আর সখিনা, রাহেলা বা ময়না তাকে এত ভয়াবহ কষ্টে ফেলতে পারবে না। কবরে অন্তত শাল সেগুন কাঠের কিছু নেই। কে যেন এসে খবর দিল কবর খোঁড়া শেষ। সবাই ধরাধরি করে বাতেন মুন্সীর খাটিয়া কবরের কাছে নিয়ে গেল। তাকে শুইয়ে দেয়া হল কবরে। আহ কি শান্তি! আর কোনও ঝামেলা নেই । লোকজন তার শরীরের উপরে প্রথমে চাটাই দিয়ে তারপর দক্ষিন কোণা থেকে কেটে আনা শক্তপোক্ত বাঁশগুলো সাজিয়ে দিল সুন্দর করে।
শুধু বিস্ফোরিত চোখে বাতেন মুন্সী দেখল বাঁশ নয় এক হিমশীতল হাসি দিয়ে কবরে নেমে এসেছে মায়মুনা, সালেহা আর বারো বছরের মেয়েটি।
আলোকচিত্র-বন্যা লোহার
শুভঙ্কর বিশ্বাস
হৃদয়
গাছের ছায়া স্বচ্ছ জলের উপর আলপনা এঁকেছে। শুকনো পাতা হাওয়ায় দোল খেতে খেতে পড়ল নদীর উপর। মৃদু স্রোত তাকেও ভাসাল দূরের মাঝি বৈঠা বাওয়ার তালে গান গাচ্ছিল গুনগুন রবে। হলদে পাকা ধানখেতের দিকে তাকিয়ে হাঁক দিল, ‘ওহে চাষি ভাই !’
কৃষক দুহাত তুলে গলা ছেড়ে বলল, ‘ফসল ফলেছে মেলা, এ বছর দুঃখ নাই !’
একটা হলুদ ফড়িং শূন্যে উড়তে উড়তে এসে বসল জিয়লের শুকনো ডালে। একবার এদিক ওদিক চাইল স্থির ডানা মেলে। খুদে চড়ুই ধানখেত থেকে কিছু খাবার মুখে নিয়ে চলল কচি ছানাদের কাছে। আজ সারাদিন তারা ডেকেছে মা মা করে ।
আলপথে ছোট্ট মেয়ে একা বসে। ধানের গোড়ায় জমা জলে সে দেখছে তে-চোখো মাছের চঞ্চলতা। আর ভাবছে, ‘মাছেদেরও বুঝি ঘরবাড়ি হয়। ওদের পেছনে গুড়িগুড়ি মাছগুলো কেমন সাঁতার দিয়ে চলে যায়। কোথায় যায়, সন্ধ্যা হলে বাড়ি ফেরে ওরা?’
পাশে জল থেকে মাথা উঁচু করে ওঠা ঘাস শিষ তুলে দাঁড়িয়ে। শুঁয়োপোকাটা একটা থেকে অন্য, এমন করে সেখানে পৌঁছাল, সবচেয়ে উঁচু কচি নরম পাতাটি সে খাবে। তার ভারে নরম ঘাস নুইয়ে যাচ্ছিল জলের কাছে। মেয়েটি দেখল পোকাটা জলেই পরে যেত, হঠাৎ পাশের শক্ত পাতাটা জড়িয়ে না নিলে।
জামগাছের উঁচু ডালটায় কোকিলের কুঁহু অবিরাম। দূরের বাঁশবনে পাপিয়ার ‘পিউ কাহা’ কেউ যেন খুব কান পেতে শুনছে।
আজ দিন শেষ হয়ে এল।
গোধূলির কপালে আঁকা লাল টিপ, সে রঙে সমস্ত রঙিন। এক আকাশ মুখে যুবতীর মতো কোমল লাজুকতা। কাকে যেন খুঁজছে।
একখণ্ড মেঘ ধীরে ধীরে সে-টিপ ছুঁলো, বলল ‘তোমার হৃদয় ?’
হাওয়ায় পাকা ধানের শনশন, সিঁদুরে নদীর চঞ্চলতায় পাড়ের ছলাৎ বলল, ‘আছি’।
নির্মল হালদার
পৃথিবী গ্রহের পুরুলিয়া
পর্ব-২০
রাধা রাধা বলে বাঁশি তো বাজে না। বৈশাখ থেকে জ্যৈষ্ঠ গ্রাম থেকে গ্রাম মেলার পরে মেলা। ঝুমুর গানের আসরের রিঝ—রঙ। ছো-নাচের উলফা। ওরে ও বাঁশিয়াল…কুথা যাছিস দাঁড়া ন টুকু। দাঁড়া। আসর-বাসর ত নাই। তবলা বাজায় মাঝি। মাঝি রাজোয়াড়। সেই বিমলকে দাঁড়াতে বলে,জানতে চায়—–পূজা তক এই কী চলবেক? বিমল নামটা সবাই ভুলে গেছে। বাঁশি বাজায় বলে, সবার কাছেই বাঁশিয়াল নামে পরিচিত হয়ে গেছে। এই ধরণে বাঁশি বাজলো না। ধরণের যা তাপ যা রোদ বাঁশি বাজলে চারদিক শান্ত হয়ে যায়। বাঁশি বাজলো না। ঝুমুর গানের আসর মানেই, বিমল অনিবার্য। বাঁশি ছাড়া ঝুমুরের বিরহ কি করেই বা কিরীটি শোনাবে। কিরীটি মাহাত পুরুলিয়াতে ঝুমুর শিল্পী হিসেবে খ্যাত। পুরুলিয়ার বাইরেও ঝুমুর করতে যায়। সঙ্গে থাকবেই বিমল। সঙ্গে থাকবেই দুর্যোধন। মাঝিও থাকে। কোথাও কোনো আসর বসছে না। বিমল তো বাঁশি বাজিয়েই করে-কমমে খায়। কি করবে— কি করে চলবে তাদের সাত জনের সংসার? কেউ উত্তর দিতে পারবে না। সরকার থেকে চাল দিলেই কি, সব হয়ে গেল। চাল ফোটাতে গেলেও আগুন লাগে। কয়লা লাগে ঘুঁটে লাগে। কাঠ লাগে। কেরোসিন চাই।
এ বাঁশিয়াল বাঁশিয়াল শুনবি হামার কথা? হ্যাঁ রে কেন্দ্র সরকার নকি টাকা দিছে? কুথা থেকে পাওয়াবেক? তোর বউ পেয়েছে? টাকা ট মহিলাদের দিছে। ই বেপারে তুই কিছু বলতে পারবি? বিমল সবকিছু জেনেও বলল না। মন খুব খিঁচড়ে আছে। সকাল থেকেই বউ ঘ্যানর ঘ্যানর করছিল, কাঁদছিল ছোট ছেলেটা। সব রাগ ঝেড়ে ফেলেছে ছেলের উপর। ছেলেটাকে পিটিয়েছে খুব। ছেলের দুধের কৌটো শেষ। টাকা খুঁজছিল বউ। বিমল পাবে কোথায় টাকা! যদি ধার পেয়ে যায় কে আনতে যাবে শহরে। বিমলের আশঙ্কা, সুরের রক্ত শুকিয়ে যাবে না তো। সে যে বুক থেকে সুর টেনে টেনে সবাইকে শোনায়, এবার কী ফুরালো? আসরে আসরে বিমল ডাক পায় বলেই, তার প্র্যাকটিস হয়ে যায়। ঘরে আর বাজাতে হয় না বাঁশি।ডাক আসে না। বাজে না বাঁশি।
থম থম করছে চারদিক। গাঁয়ের শিব মন্দিরের চাতালে সকাল-বিকেল ছেলে ছোকরা বুড়োরা গল্প করছে না একদম। একসঙ্গে জড়ো হওয়া চলবে না। কতটা মিথ্যে কতটা সত্যি কে জানে! বিমল জানে, তার ঘরের এক কোণে একটা থলিতে ঝুলছে একগাদা বাঁশি। মাকড়সা জাল বুনছে। জালে জালে সুর ফেঁসে গেল। বাঁশিরা প্রাণপণ চেষ্টা করছে, সুরে সুরে গানে গানে থলি থেকে বাইরে আসবার জন্য। বাইরের পৃথিবীতেও সুর। ভিতর বাহির এক হয়ে একটা বাঁশি হয়। একজন বাঁশিয়াল হয়। বিমল ডুকরে কেঁদে উঠতে গিয়ে বসে পড়লো, মহুল তলায়।
২৫ শে বৈশাখ ১৪২৭