দৈনিক কবিতা আশ্রম, ৩ শ্রাবণ ১৪২৭
আবহমান বাংলা ভাষা
দৈনিক
৩ শ্রাবণ ১৪২৭
ছবিঋণ: পল ক্লে
মীরা মুখোপাধ্যায়
বিবাহদ্বীপের গল্প
চাঁদের আলোর জন্য জেগে আছে অলৌকিক দ্বীপ
চাঁদ উঠলেই বিবাহমুহূর্ত শুরু হবে।
লাল কাঁকড়ার দল নেমে গেছে জল সরে গেলে
বালির উপরে শুধু পড়ে আছে শামুকের খোলা…
সমুদ্র যেখানে এসে থমকেছে
সেখানে আলো ও জলে মাখামাখি কয়েকটি ছায়া
আশ্লেষে একাকার।
মাংসের গন্ধ ভাসছে
ক্যানোর মাঝিরা ঝিনুক পুড়িয়ে খাচ্ছে তীরে
আজ রাতে চাঁদ উঠবে অনেক দেরিতে,
বিবাহমুহূর্ত অপেক্ষায় জেগে আছে
চাঁদের আলোর জন্য পৃথিবীর অলৌকিক দ্বীপে
লিপি কাজী
দুঃখ বিলাস
আমি এখনও মুঠোয় করে দুঃখ জমাই,
যদি উদ্বৃত্ত দুঃখ থাকে রেখে যেও
রাত্রির ঘ্রাণ শুকতে জেগে থাকি
জেগে থাকি, সময়ের একাকিত্ব গুনতে
তোমাদের মত সময়ও খু-উ-ব হিসেবি আজকাল
ছয়টা বারোটা, বারোটা ছয়টা ডিউটি করে
ব্যস্ত ভীষণ!
ইদানিং সবার ভালবাসাই কেমন কর্পোরেট
ফ্ল্যাট, গাড়ি, শাড়ি, নারী সব গুছিয়ে
অবসরে সব হংস মিথুনেরা
আস্তিনের কোনায় ভালবাসাহীন
আয়েশি দুঃখ খোঁজে
শাড়ির ভাজে, ভ্যানিটির পাশে, কিংবা
ফাইলপত্রের চিপায়।
এখন আর পাশ বালিশে
ভেজা কোনও দুঃখ থাকে না।
দুঃখরা কেমন অবহেলায়
সতেজ হয়ে বাঁচতে শিখে গেছে,
তবু আমি দুঃখ জমাই
সত্যি-মিথ্যে দুঃখগুলো
এক বিকেলে, অমন করেই রেখে যেও।।
প্রীতম সেনগুপ্ত
নিউটন সাহেবের নুড়ি
একটা কলার তোলা ছেলে বলল—দেখে নেব
একটা সুভদ্র বড় ঘরের ছেলে বলল—
কাজটা অন্যায়,
একটা সবে অফিসে চাকরি পাওয়া ছেলে বলল—
কাজকম্ম নেই নাকি?
একটা ক’দিনের মধ্যেই বিদেশগামী হতে যাওয়া ছেলে
বলল—হায় পোড়া দেশ!
একটা বেকার হতাশ ছেলে বলল—
হা চাকরি হো চাকরি
একটা প্রেমে লাথ খাওয়া ছেলে বলল—বড় নিষ্ঠুর!
একটা জগৎ চিনে যাওয়া ছেলে বলল—ভারসাম্য রাখুন।
সবশেষে এক পাগল বিজ্ঞানী এসে বললেন—
নিউটন সাহেব সমুদ্রের ধারে কয়েকটা
নুড়ি কুড়িয়েছিলেন মাত্র!!
মাহবুবুল আলম
এ আশায় বেঁচে থাকি রোজ
এ অসুখ সেরে যাবে একদিন
আমাদের বাড়িতে, সোবেহ সাদেক-এ
আবার আসবে ভোর,
আবার আসবে সকাল;
তখন তুমি নবান্নের সাজে
আধাখোলা গায়ে শ্যামাঙ্গিনী বধূ
বিছিয়ে দেবে ধান নিকানো উঠোনে।
ফলের সম্ভারে ভরে ওঠবে গাছ
এ আশায় বুকবেঁধে আছি,
কোনো এক প্রসন্ন ভোরে
সবাই মিলিত হব এক সাথে
ভৈরবী সুরের মূর্ছনায়
ভরে উঠবে আকাশ বাতাস
সাগরও মেতে ওঠবে দারুণ উচ্ছ্বাসে।
ঈশ্বরফুল
বিভাস রায়চৌধুরী
পর্ব-৯
রাহুলগাছ
আমার ধারণা ছিল কবিতা লিখে এবং কবিতার জন্য সব কিছু সহ্য করে আমি অবিস্মরণীয় ভূমিকা পালন করেছি। সব অহং এক নিমেষে উড়ে গিয়েছিল রাহুলের সঙ্গে দেখা হতেই। অনুভব করেছিলাম কবিতালেখক হিসেবে অনেকের মতোই হররোজ নদী, পাহাড়, গাছ, আকাশ, প্রান্তর শব্দগুলি ব্যবহার করলেও তাদের ভালবেসে অনুভব করিনি। পরিচিত কাব্যিক শব্দ হিসেবেই ওরা কবিতায় এসেছে। ভাল না বাসতে পারলে, বিপন্ন ভালবাসার জন্য ততোধিক বিপন্ন না হতে পারলে লেখা মিথ্যে হয়ে যায়। রাহুলদেব বিশ্বাস, আমার রাহুল গাছ, যশোর রোডের শতবর্ষী বৃক্ষ ছেদনের বিরুদ্ধে একদিন একাই হেঁটেছিল ৩০ কিমি। যশোর রোডের গাছ আন্দোলনে অনেক শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ অংশ নেন। এপিডিআর মামলা করে। পরে একদল ছাত্রছাত্রী আরেকটি মামলা করে। নানা সংগঠন নানা কর্মসূচি নেয়। সবার লড়াইয়েই গাছগুলি আজও বেঁচে আছে। সম্প্রতি ভয়ংকর ঝড়ে নিজে প্রাণ দিয়ে মনুষ্যবসতিকে রক্ষা করেছে যশোর রোডের কিছু বৃক্ষ। আমার নগণ্য জীবনে যশোর রোডের গাছ আন্দোলন সবচেয়ে বড় ঘটনা। এতদিন এই পরিবেশে বড় হয়েছি, গাছগুলি দৃশ্য হয়েই ছিল। নয়ন মেলে তাকে দেখতে, ভালবাসতে শেখাল রাহুল। তার এই ‘গাছের জন্য হাঁটা’ অনেকের কাছে হাসাহাসির বিষয় হলেও এটাকেই আমার সঠিক মনে হয়েছিল। গাছকে অনুভব করা, তাকে ভালবাসা, তার আসন্ন মৃত্যুর কথা ভেবে অন্তরে ব্যথা পাওয়া, কেঁদে ফেলা—এটাই সৎ শিক্ষা। প্রচণ্ড গরমে যখন কাবু, হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে, রাহুল বলছে, “দাদা, ওই যে দূরে গাছ দেখা যাচ্ছে…কত বছর ধরে পথিকের জন্য ছায়া নিয়ে অপেক্ষা করছে… এভাবেই গাছ আমাদের আশ্রয়। মানুষ হঠাৎ সব ভুলে গেল?”
এক-একটা বড় গাছের নীচে দাঁড়িয়ে রাহুল বলত, “অনেকক্ষণ গাছটাকে দেখুন। গাছ আপনার সঙ্গে কথা বলবে।” সত্যিই গাছ তার সবুজ দেশে আমাকে ডেকে নিত আর দেখাত কোটরের পেঁচা, মগডালের বাজপাখি, এক ধরনের সাপ, অজস্র পোকামাকড়, অর্কিড। এত বছর বয়সে এভাবেই আমার জ্ঞানচক্ষু খুলে দিল রাহুল।

গাছের মানুষবন্ধুদের সঙ্গে হাঁটছি গাইঘাটা থেকে বনগাঁ। কত ব্যঙ্গ, কত ভালবাসা উড়ে আসছে। ততদিনে যশোর রোডের গাছ আন্দোলন বিখ্যাত হতে শুরু করেছে। সংবর্ধনা ইত্যাদি ইত্যাদি। রাহুল শুধু হাসে আর বলে, “দাদা, গাছ কি আমাদের একটুও বিশ্বাস করছে?” রাহুলের কথা সব সময়েই গভীর। সন্দেহটা জরুরি মনে হল খুব। মনকে আরও সরল করে ভাবলাম— আমরা মহৎ নই, সংগ্রামী নই, সমাজ-উদ্ধার সমিতি নই; আমরা কেবল মৃত্যুদণ্ড পাওয়া বৃক্ষদের বলতে চাইছি— ‘বিশ্বাস করো, বনস্পতি… আমরা ব্যথিত… বিশ্বাস করো’।
বিশ্বাস ভিক্ষা করাই সাধনা—রাহুলের কাছেই শিখলাম।
রাহুল পরবর্তীতে কয়েকজন সমমনের পরিবেশ কর্মীকে নিয়ে ‘পরিবেশ বাঁচাতে পাহাড় থেকে সমুদ্র’ হেঁটেছিল—দার্জিলিং থেকে সাগরদ্বীপ। বিশ্বে নজির আছে এমন? জানি না। তবে দেড়মাস হাঁটতে হাঁটতে রাহুল, সঞ্জিত কাষ্ঠরা রাজ্য জুড়ে অসংখ্য পরিবেশ কর্মীকে এক বন্ধুতার মধ্যে এনে ফেলে। পরিবেশ আন্দোলন মঞ্চ শক্তিশালী হয়ে যায় এই পদযাত্রায়।

রাহুলের মুখ দাড়িতে ভরে যাচ্ছে…শরীর আরও দুর্বল লাগছে…রাজ্যের অধিকাংশ মানুষ খেয়ালই করছে না এই পবিত্র ও জরুরি ব্রতকে, তখন লিখেছিলাম এই কবিতা—
রাহুল হেঁটেই চলে
সবাই পাগল বলে…কেউ কেউ বলে, ধান্দাবাজ…
রাজনীতি যারা করে, পক্ষে ও বিপক্ষে টানটান!
রাহুল হেঁটেই চলে… গাছ নদী জলাভূমি ছুঁয়ে
একটি শালিখ যেন রেখে আসে তার অভিমান
রাহুল হেঁটেই চলে…সঙ্গী হয় ব্যথিত মানুষ…
টাইগার হিল থেকে হেঁটে হেঁটে সাগরে পৌঁছবে!
শুকিয়ে এসেছে মুখ… চুল-দাড়ি বড়…পায়ে ক্ষত…
রাহুল হেঁটেই চলে অন্ধ প্রেমে, বিষাদে, বিক্ষোভে
কতজন বাঁকা হাসে,” এইভাবে হেঁটে কিছু হয়?”
কী হবে? কী চাও? তুমি লুণ্ঠনকারীর কাছে কেনা!
বোকার মতন নষ্ট করো শুধু নিজেরই ভুবন!
সেতু হবে, রাস্তা হবে, কিন্তু ভাই তুমি বাঁচবে না…
রাহুল হেঁটেই চলে…রাহুলেরা হেঁটে চলে রোজ…
খেয়াল করে না কেউ কান্না এসে মিশে যায় ঘামে!
“এইভাবে হেঁটে কিছু হয়?”— হয়। ব্যথাই শাশ্বত।
মানুষের শূন্য বুকে এইভাবে একদিন
হৃদয় শব্দটি এসে নামে…