দৈনিক কবিতা আশ্রম, ৪ আষাঢ় ১৪২৭
আবহমান বাংলা ভাষা
দৈনিক
৪ আষাঢ় ১৪২৭
The Sower by Vincent van Gogh
নিত্যানন্দ দত্ত
হে বন্ধু হে প্রিয়
এই সোনালী গমের খেতে একদিন
এসেছিলে সুদূরের পাখি
ডানা ভরে এনেছিলে রোদ
ডানা ভরে এনেছিলে জল
তোমার কবোষ্ণ পালকের ওমে
ঘুমিয়েছি সারা শীতকাল
পতঙ্গের ঠোঁটে ঠোঁটে বিষ মুছে
আগলে রেখেছ ফসলের সামান্য আয়ু
গমের খেতের ভিতর শনশন ক’রে
সারাদিন খেলা করেছে আলোর বাতাস
অগণিত ফসলের দেহ একা রেখে
হেঁটে গেছ আগুনের কাছে…
আজ দেখো, এই শান্ত ভোরবেলা,
কাস্তের দাঁত আরও বেশি ধারালো
করে তুলছে গোপন খুনিরা…
পুলিন রায়
এখন কৃষ্ণকাল, তবুও...
ডাহুক মন খুঁজে ফেরে হারানো স্মৃতি এবং পাখিদের ঠোঁটে বসা জোছনা। মানুষের মুখ দেখে দেখে, মুখের ভাষা পাঠ করে করে যে জীবন করেছি অর্জন তা তো পারি না বিফলে ফেলতে। জীবন কখনই ঠকায় না, সে তো দিয়েই যায় দু’হাত ভরে। এখন কৃষ্ণকাল হলেও মনে মনে আছি আড্ডায়, মানুষের তুমুল কোলাহলে, কালো কালো অক্ষরের নিকানো বাগানে।
‘ফিরিয়ে নাও ঘাতক কাঁটা’ বলে প্রার্থনায় প্রকৃতির আপন বৈভবে ছেড়ে দেয় মনপ্রাণ।
পৃথিবীর শ্বাসকষ্টের জন্য দায়ী মানুষই। অনেক করেছ, হে মানবসন্তান! আর কত স্বার্থের যাঁতাকলে পিষ্ট করবে পৃথিবীর প্রাণ? ছুড়ে ফেলে দাও সংহারের তলোয়ার।
গাছের সবুজ আর কলাপাতায় বসা সকালের নরম রোদের চিকচিকে রঙ মুখে মেখে শপথ নাও, নতুন পৃথিবী গড়ার। নাহলে ফিরে ফিরে আসবেই ‘ঘাতক কাঁটা’।
এখন কৃষ্ণকাল। তবুও মেঘলা ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকে—
বিষণ্ণতার চাদরে ঢাকা আলোর প্রদীপ হাতে।
দিব্যেন্দু ঘোষ
একটি পলাশের দুঃখ
আমরা সদ্য জঙ্গল থেকে
উঠে আসা মানুষ-পাখির দল
খিদে পেলে একে অপরের
চোখে চোখ রেখে কাঁদি,
বুকে বুক রেখে অনুভব করি
জমাট বাঁধা বসন্তের জখম ৷
মিলিত যন্ত্রণার তাবুতে বাঁধি ঘর
কিন্তু কোথাও এক ফোঁটা বৃষ্টির
শব্দ নেই… ঘুম নেই…
তোমরা কেউ জানো না
আমাদের ঘরের বাইরে
একটা জীবিত পথ শুয়ে আছে!
আর সেই পথের নীচেই
আত্মগোপন করে আছেন
এক ছিন্নমস্তা দেবী৷
তাকে তার সব ব্যথা থেকে
জাগাতে হবে, তাই…
সমস্ত মোহ
মায়া ত্যাগ করে
আমি এখন যাচ্ছি
তার কাছে…
একটি পলাশের দুঃখ নিয়ে !
সৈকত সেন
আদিম
কোষে কোষে বয়ে বেড়াই অরণ্যের বীজ
শরীর থেকে ঝেড়ে ফেলতে পারি না
আদিম গন্ধ।
দূর থেকে দেখি
তোমার শরীরে এক মাঠ ফসলের সভ্যতা
কাছে যেতে পারি না
যদি তুমি বুনো হয়ে ওঠো।
শুক্রাণু ঘেঁটে তুমি আর মাংসাশী হয়ো না
তার চেয়ে বরং সময়ের মানচিত্র বুকে বেঁধে
উড়ে যাও প্রজাপতির দেশে।
শুধু পাখির ঠোঁটে রেখে যেও
উর্বশির ছায়া।
পাগলাঝোরা
জয়ন্ত দে
পর্ব-৪
হারিয়ে যাওয়া মানুষ
বইমেলা শেষ। সন্ধেবেলা বিলকুল ফাঁকা। একা। শ্যামের বাঁশি হয়ে ফোন বাজছে না, আমিও ‘তাকে’ আকুল হয়ে খুঁজছি না। এত কাল ধরে বইমেলায় বই খোঁজার সঙ্গে মানুষও খুঁজেছি। ‘বন্ধু-মানুষ’, ‘লেখক-মানুষ’, ‘পাঠক-মানুষ’। আর চোখে চোখে একজন ‘হারিয়ে যাওয়া মানুষ’।
সেদিন বসে ছিলাম পত্রভারতীর স্টলে। সদ্য প্রকাশিত হয়েছে প্রফুল্ল রায়ের ‘হারিয়ে যাওয়া লেখা’। সেদিন প্রফুল্লদা ‘হারিয়ে যাওয়া লেখা’র বইতে সই দিচ্ছেন অকাতরে। দেখছিলাম, পাঠকের হাতে হাতে সমরেশদার ‘হারিয়ে যাওয়া লেখা’, শীর্ষেন্দুদার ‘হারিয়ে যাওয়া লেখা’।
ত্রিদিবদা এঁদের সবার হারিয়ে যাওয়া লেখা দু’মলাটে ফিরিয়ে দিয়েছেন।
আমি এক অধম, লেখা নয়, আমি একজন ‘হারিয়ে যাওয়া মানুষ’ খুঁজছি, বলতেই পারেন এটাই আমার হারিয়ে যাওয়া লেখা।
মানুষটিকে দেখলে কি আমি চিনতে পারব? কী জানি কেমন দেখতে হয়েছে আমার সেই ‘হারিয়ে যাওয়া মানুষ’? মুটিয়ে গেছে কি খুব? না, না, শালে সোয়েটারে বড্ড ঢেকেছে! আহা ঠাণ্ডা লাগার ধাত ছিল যে। একগুছি পাকা চুল কি ঝুঁকেছে কপালে? খুব সাজুন্তে ছিল আগে, হয়তো এটা ও ইচ্ছে করেই করেছে, নাতনিদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে! হাঁটুতে কি ব্যথা, তাহলে সেটাও বইমেলার মাঠে নাতির সঙ্গে পাঙ্গা নিয়ে চষে! অম্বল, গ্যাসের ব্যামো আছে নির্ঘাত, হতেই পারে যা চাপা স্বভাব, না খেয়ে খেয়ে!
কার সঙ্গে এসেছে সে বইমেলায়? সঙ্গী নাতনি নাকি? নাকি সেই সায়েবমার্কা স্বামী? কী জানি! গলায় সেই হারটাও আছে, যে ছোট্ট লকেট নিয়ে ঝাঁপ দেয় অপরূপ খাদে? কেউ জানে না ওর পায়ের আঙটে আমার নামের আদ্যক্ষর লেখা আছে। ওর সেই পাসপোর্ট সাইজ ফটো লুকিয়ে পূর্ণেন্দু পত্রীর কথোপকথনে।
সবই তো দিলাম বলে…
আমার, আপনার, হয়তো আমাদের সবার এমন এক একটা ‘হারিয়ে যাওয়া লেখা’ আছে, আমরা তা নিজের মতো করেই খুঁজে ফিরি…। নিজের অজান্তেই।
সামান্য মিল পেলে, আচমকাই… তাকাই!
চোখ সরিয়ে নিতে নিতে ভাবি, কী ভাবি?