আবহমান বাংলা ভাষা

দৈনিক

৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

অলংকরণ: অমিত সাহা

কবি নির্মল হালদারের চোখে করোনা-র দিনগুলি

নির্মল হালদার

পৃথিবী গ্রহের পুরুলিয়া

পর্ব-২১

আজকের দিন ট কি বঠে তুই জানিস সুবোধ? সুবোধ পাল্টা প্রশ্ন করে, কি বঠে? এ বাবা তুই নাই জানিস, আজ রবি ঠাকুরের জন্মদিন। তদের ছুটি নাই? রবি ঠাকুর কে বঠে? সুশান্ত মাস্টার উত্তর না দিয়ে চলে যায় বাঁধের দিকে। সত্যি তো সুবোধের জানার কথা নয় রবীন্দ্রনাথকে। শুধু রবীন্দ্রনাথকে নয়, অনেককেই জানেনা সুবোধ। তার জন্য তাকে দোষ দিতে পারি না। সুশান্ত মাস্টার মনে মনে এও বলে, আমি নিজেই কি সুবোধকে লেখাপড়া করার সুযোগ করে দিয়েছি? আমি যে দুবেলা এখনো দু’মুঠা পাই, তার থেকে একমুঠা সুবোধকে কবে দিতে গেলম? হামদের কুশটাঁড়ে সবাই তো দিনমজুরের কাজ করে। বেশিরভাগ জন স্কুল যায় নাই। হামার বাপ হামকে কিকরে যে পাঠায়ছিল, বাপ তো আর বলতে লারবেক। উপরে চলে গেছে।

 

রাস্তায় সুশান্ত মাস্টারের সঙ্গে দেখা হল খালেদ চাচার। সে জিজ্ঞেস করে, হ্যাঁ ব মাস্টার পুরুলায় দোকানদানি খুলেছে নকি, খবর জানো কিছু? সুশান্ত মাস্টার জানায়, শুনছিলম খুলেছে, তবে আমি নিজে যাই নাই। দুজন দুজনের রাস্তায় চলে যায়। পড়ে থাকে, বাকি থাকে কথারা।

 

সুবোধের মত সরল মানুষ আজকাল আর দেখা যায় না। গাঁয়ের লোক তাকে যখন যা বলে, সে কাজটা করে দেয়। কাজটা করে দেয়। বিনিময়ে হয়তো, এক থাল বাসি ভাত। কিংবা মাড়জল। তার রকম সকম দেখে, গাঁয়ের অনিল মিস্ত্রি তাকে ডেকে বলে, চল্ আমার সঙ্গে কাজ করতে চল—হাতে টাকা পাবি। তারপর থেকে সুবোধ অনিল মিস্ত্রির সঙ্গে লেবারের কাজ করে। এবং সুবোধের মতো লেবাররা লেবার হয়েই থাকে। মিস্ত্রিও হতে পারে না।

 

এক এক সময় সুশান্ত মাস্টার ভাবে, সুবোধের মতো লেবারদের জানাবে, কাজকম্মো করে এসে, রাতের বেলায় তোরা আমার কাছে পড়তে আসবি। ভাবা পর্যন্তই, বাস্তবায়িত করতে পারে না সুশান্ত মাস্টার। আর তাই, ভেতরে ভেতরে কষ্ট পেয়ে থাকে। এই তো, বিনা দোষে বিনা অপরাধে ১৬ জন লেবার ট্রেনে কাটা পড়ে মরে গেল। তারা পায়ে হেঁটে ঘরে ফিরে আসতে চেয়েছিল। মাঝরাস্তায় আর পাচ্ছিল না। ট্রেনের লাইনেই শুয়ে পড়েছিল। তা বাদে যা হবার তাই হল। আমাদের সরকার তো কোনো দায় লিবে নাই। কিন্তু আমি বলবো, সরকার যদি আগেই উয়াদের ঘর পাঠায় দিতো, তাইলে অকালে মরত নাই। ধুর ধুর এ দেশটার কিছু নাই হবেক। কই একজনও তো নাই বললো, ১৬ জন লেবার মরে গেল, এজন্য আমরা প্রতিবাদ করছি, এ দেশের সরকার জবাব দিক, ক্যানে মারা যাবেক?

 

সুশান্ত মাস্টারের সঙ্গে সজল বাবুর দেখা হয়ে গেল। উনি তিলাবনি থেকে আসছেন কুশটাঁড় হেল্থ সেন্টারে। দু’চারটে কুশল বিনিময়ের পর, ১৬ জন লেবারের মরে যাওয়া নিয়ে কথা উঠতেই, তিনি বলেন, হ্যাঁরে সুশান্ত অনেকদিন তো মাস্টারি করলি, এখনো এদেশটাকে নাই বুঝলি তুই? লেবার মরেছে তো কি হয়েছে, সরকারের বিরুদ্ধে কেউ কিছু বলবেক নাই। তুই বোধহয় জানিস নাই, জালিয়ানওয়ালাবাগে ব্রিটিশদের হত্যাকাণ্ডের পর রবীন্দ্রনাথ ফিরায় দিয়েছিলেন, নাইট উপাধি।   ত সুশান্ত রবীন্দ্রনাথও নাই। নাই, আমাদের পিঠের শিরদাঁড়াট।  সুশান্ত মাস্টার মনে মনে গুমরে ওঠে। সে ফিরে যায় ঘরের দিকে। গাঁয়ের এক মুরুব্বী জানতে চায়, মাস্টার সকালের খবরে কি বললো হে? ই ট কতনা দিন চলবেক? নিরন দিন। খাঁ খাঁ করছে চারদিক। কোথাও কোনো জলের চিহ্ন নাই। যদি সরকারে অর্ডার করত, যাও স্কুলে স্কুলে রবীন্দ্র জয়ন্তী পালন করো, তাইলে মরে যেতম।

স্কুলটা যে ঢের ধুর্। রবি ঠাকুরও ঢের দুরেই থাকে, আমরা ছুঁতেই পারব নাই।

 

২৬ বৈশাখ, ১৪২৭

কবিতা আশ্রম পরিবারের কবি প্রণাম

পর্ব-১

পর্ব-২

পর্ব-৩

পর্ব-৪

পর্ব-৫

পর্ব-৬

পর্ব-৭

পর্ব-৮