আবহমান বাংলা ভাষা

দৈনিক

৪ শ্রাবণ ১৪২৭

ছবি: চন্দন মিশ্র

দুর্গা দত্ত

স্বপ্ন

আমি কোনো অন্ধকারে তোমাকে দেখিনি

আমি কোনো আলোতেও তোমাকে দেখিনি

জ্যোৎস্নাজলে ডুব দিয়ে উঠবার পরেও  

বেভুল মাতাল চোখে 

আমি তোমাকে কখনও দেখিনি

 

ঘূর্ণিস্রোতে ঘেরাটোপে হ্রদের কিনারে

সৃজনী বৈরাগ্যে আমি কখনও দেখিনি  তুমি 

বসে আছ ছায়েবানুগতা 

 

বনতোষিণীর মৃদু সজল চলন 

কখনও দেখিনি বলে এইবার  এই শেষবার 

উড়িয়ে দিয়েছি সব বিকেলের ধুলো

গ্রামীণ মেলার রাতে শেষ প্রহরের ঠিক মুখে

সারাজীবনের সব খুদকণা লাভ ক্ষতি 

নিজেরই দু’হাতে নিংড়ে উপুড় করেছি দেখো 

সুচতুর জুয়াড়ির ঢাণ্ডির আসরে …

 

সেই থেকে নিরম্বু উপোস, 

পড়ে আছি পথে পথে তোমাকে দেখব বলে 

ভোরের আলোয়…

 

তুচ্ছ করে দিয়ে সব সামাজিক দিকচক্রবাল 

তুচ্ছ করে পূর্বাশ্রম অনন্তসন্ন্যাস 

শিশির মাড়িয়ে তুমি হেঁটে আসছ অবিরাম

চেনা-অচেনার সুঁড়িপথে ভেজা ভেজা পায়ে 

ঠাণ্ডা ঘুম হয়ে

আমার নিঃশ্বাস ছুঁয়ে ছুঁয়ে …

শুদ্ধেন্দু চক্রবর্তী

অতিমারি শেষ হলে

একটা বিলাসবহুল জাহাজে চেপে বসব বেশ

চোলসম্রাট রাজরাজের মতো পাড়ি দেব সিংহল   

সারারাত গান বাজবে

জল সরে যাবে কালো সময়ের মতো

হোমযজ্ঞ হবে। আহুতিতে দান করব বিষ

হলাহল ঢেলে দেব আগুনের উপর

প্রিয়ার শয়নকক্ষে যাব

টহল দিতে যাব সীমান্তফটকগুলিতে

টহল দিতে দিতে ভুলে যাব নিজস্ব

বাড়ির ঠিকানা

 

আবার বারুদ গর্জে উঠবে শহরে

দাহ্য গ্রাস করে নেবে কচি খোকাখুকু রাক্ষুসির মতো

স্বরলিপি মেনে তৈরি হবে গণকবরতালিকা।

মাঠের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত অবধি

স্বরবর্ণ আর ব্যঞ্জনবর্ণের ভিড়ে

খুঁজে নেব চেনা পদবির হাতছানি 

 

শান্ত একাকী শহরের ল্যাম্পপোস্টে

অতিমারী শেষ হলে লিখবে পাগল

সূর্য নয়,পৃথিবীর চারপাশে একাধিক সূর্যরা ঘোরে

 

ঠিক এই অতিমারি শেষ হয়ে গেলে…

 

অনিরুদ্ধ আলম

বাগান

বুকের মাঝে এগারো দশমিক  

বুনেছি বোধ, রোদছন্দ, ধুলোগন্ধ,

      সন্ধ্যারেখা, দশটি গাঢ় দিক 

একটি দিঘি জংলা রঙে দারুণ ঝিকিমিক। 

 

সেই বাগানে হেমন্তের পয়মন্ত বাতাস যায় বয়ে 

তোমার দেয়া কষ্ট যত ফুটেছে

                      শত অপরাজিতা হয়ে। 

 

বেদনা আমি রাখিনি অনাবাদী 

ডোল ব্যথারা আমার সবি।

                  কী সচ্ছল অন্ত কিবা আদি!  

বৈতালী ও-ব্যথাতে জল ঢালি 

ওগো রমণী, তুমি অমনই,

                 বাগানে একগুচ্ছ রূপশালী।

 

 

অয়ন্ত ইমরুল

তোমারে ডেকেছে সেই

তোমারে ডেকেছে সেই ডানাকাটা ব্রিজ

গোপালখালির  বাঁকে  আড়ালের   ছায়া   

আরেক  নদীর  জলে  ছিল  বুঝি  মায়া

খুলিয়া  ফেলিয়া  দিলা   বাহুর  তাবিজ!

ঝিনুক   স্বভাবে  খোলা   মনের   কথায় 

দাদার   হুঁকার  মিড়ে  ঘুঘু   ডেকে   যায়

জামিরে  আসিয়া  রোজ   দুপুর  লুকায়

কলসি  সে  ভেসে  যায়   দূর  মোহনায়।

 

চোরাস্রোতে  হারায় যে  কোমরের বিছে

ডোমকাক ফিরে আসে  পলাশে-শিমুলে

তোমায় পুষিয়া রোজ বাড়ে যে গোকুলে

এমন   ঢেউয়ের  নদী   পারাপার   মিছে।

 

জেলেদের  নৌকা ডুবে  থাকে না  হদিস

পানির  পালায়  তবু  ছিটিয়ে  রাং  দিস।

 

 

বারো পর্বের ধারাবাহিক

ঈশ্বরফুল

বিভাস রায়চৌধুরী

পর্ব-১০

উদ্ভিদ প্রথম প্রাণ

রাহুল মনে আসতেই গাছ এসে ঘিরে ধরেছে চেতনা। যারা লেখাটা পড়েছেন, তাদের জানাই  সুপ্রিম কোর্ট গাছ কাটায় নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে, বিকল্প উপায়ে সরকারি প্রকল্প সাধন করতে বলেছে। প্রমাণিত হচ্ছে  আমার দেশ কল্যাণমুখী রাষ্ট্র, তার আইন রক্ষা করে গাছ, অন্য প্রাণী, পরিবেশকে। ( যদিও এপিডিআর ও ছাত্রছাত্রীদের দায়ের করা মামলার চূড়ান্ত রায় হয়নি…সব ভাল কথা মুহূর্তে পালটে যেতে পারে…যেমনটি হয়েছিল হাইকোর্টে, প্রতিদিন প্রকৃতি বাঁচানোর কথা বলে শেষদিন উন্নয়নের পক্ষে রায়!!!)

আসলে আজকের সমাজের অধিকাংশই ভারতবর্ষকে ভোটের আর লুঠের চোখে চেনে। প্রাচীন ভারতবর্ষে মুনি-ঋষিরা অরণ্যে তপস্যা, আরাধনা করতেন। তাঁদের চিন্তায় গাছ ছিল অত্যন্ত উচ্চ স্থানে। তৈত্তরীয় ব্রাহ্মণে ‘ব্রহ্ম কী’ এই আলোচনায় বলা হয়েছে, “ব্রহ্ম‌ই হচ্ছেন বন, ব্রহ্ম‌ই হচ্ছেন বৃক্ষ। এই বন এবং বৃক্ষ থেকেই জগৎ নির্মিত হয়েছে।” (ব্রহ্ম বনং ব্রহ্ম স বৃক্ষ আসীদ যতো দ্যাবাপৃথিবী…)

তো এই জ্ঞানের কথাটি কাকে বলব? মূর্খ মাফিয়া আর গুন্ডাবলে বলীয়ান যেকোনও সরকারকে? মানুষের সভ্যতা মৃত্যুমুখে, তখন‌ও যেদেশে  ত্রাণের টাকা লুঠ হয়, টাকায় কেনা হয় মরুভূমির এম‌এল‌এ!!!

ইতিহাসের একটা কথা বলি। ব্রাজিলের পোর্তো আলেগ্রে (Porto Alegre) শহর।  একশোটির বেশি রোজ‌উড গাছ পোঁতা হয়েছিল ১৯৩০ সালে। উন্নয়নের অজুহাতে ওইসব বৃক্ষ ওখানেও কাটতে চেয়েছিল কিছু প্রভাবশালী। প্রতিরোধ গড়ে তোলে সাধারণ মানুষ।  বৃক্ষগুলি বেঁচে যায়। আজ এই বনপথ একটি আকর্ষণ।  শহরের প্রাণ ও শীতল বাতাস-দানকারী এই বৃক্ষদেবতাদের দেখতে আসে অজস্র ভাল মানুষের দল। ২০০৬-এ ঘোষিত হয়েছে রোজ‌উড বৃক্ষগুলি দেশের ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক, বাস্তুসংস্থানগত ও পরিবেশগত ঐতিহ্য। বৃক্ষ ও মানুষের সম্পর্ক জিতে গিয়েছে এভাবেই।

 

 

যশোর রোডের দুপাশের শিরীষ, মেহগনিরা আরো প্রাচীন, আরো ঐতিহ্যবাহী। দেশভাগ-পরবর্তী ইতিহাসের, একাত্তরের যুদ্ধের ইতিহাসের (বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সাহায্যকারী ভারতীয় সৈন্য এই পথ দিয়েই যায়) সাক্ষী। যশোর রোডের শুরুর অংশটুকু বাংলাদেশে, সেখানেও উন্নয়নের নামে গাছ কাটার চেষ্টা চলছে, প্রতিরোধেও নেমেছে মানুষ। লুণ্ঠনের চোখে না দেখে ভালবাসার চোখে দেখলে কত ভাল হয়! দুই দেশে থাকা ‘যশোর রোড’ অনায়াসেই কিন্তু হতে পারে   উত্তর আয়ারল্যান্ড, ফ্রান্স, জাপান, জার্মানি সহ বিশ্বের নানা দেশের ‘প্রাচীন বৃক্ষঘেরা সড়ক’-এর তালিকায় সবচেয়ে আকর্ষণীয় নাম।

তবে কিনা বর্তমানে এই দেশে গাছবন্ধুরা, পরিবেশ কর্মীরা সংখ্যালঘু। শুধু গন্ডায় গন্ডায় কবি, শিল্পী, সমাজসেবী, তার্কিক!! সবাই কীর্তি স্থাপন করতে চায়, শুধু জীবনের আদিটাকে অনুভব করতে চায় না।

তবু ‘কবিতা আশ্রম’ বলবে—উদ্ভিদ প্রথম প্রাণ… গাছ ভালবাসো না, গাছ থেকে দূরে সরে গিয়েছ বলেই মারণ ভাইরাস ছুটে আসছে…যে যত আরণ্যক সে তত লড়াইয়ের শক্তি ধরে বেশি।

আনন্দ‌ই লাগে— মূর্খ আর মাফিয়ারা আজ আপন দর্প মুঠো করে ধরে বসে আছে!!!

ঐতিহ্যশালী বনপথ যশোর রোড

বিগত দিনগুলি পড়ুন