আবহমান বাংলা ভাষা

দৈনিক

৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

মৈত্রেয়ী ঘোষ

মাতৃত্ব

 টালির ছাদে ডালপালা ছড়িয়ে বেশ সুন্দর

        সংসার পেতে বসেছে সুন্দরী লাউডগা,

স্বামী, সন্তান নিয়ে কী পরিপাটিই না জীবন!

কখনও একসাথে ভোরের শিশির মাখে, 

কখনও বা হুড়মুড়িয়ে বৃষ্টিতে ভেজে,

তারপর স্নান সেরে সূর্য ঢেলে নেয় 

ভাগাভাগি করে, এবছর বর্ষার সোহাগে

কোলজুড়ে তার সন্তানের খেলা,

কোনোটা কুঁড়ি, কোনোটা একটু বড়,

কোনোটা বা ডাগর-ডোগর, প্রবল

ঝড়ে কিংবা বর্ষার শত অত্যাচারেএকটিও

লাউ বোঁটা থেকে ছিঁড়ে পড়েনি কখনও,

শুনেছি মাতৃত্ব এক পরম বিস্ময়!

রিক্তা রিচি

রোদের উপপাদ্যে

 

রোদের উপপাদ্যে যেমন পুড়ে যায় ফসলের ক্ষেত, নরম পলি মাটি।

তেমনই তোমার প্রেরিত তপ্ত আগুন পোড়ায় আমার পৃথিবীর কচি কিশলয়। 

সভ্যতার বিষাক্ত প্রেমগুলো প্রেম প্রেম বলে কেড়ে নেয় সময়ের ঘোড়া।

সব প্রেম, প্রেম নয়; সব আলো, আলো নয়; সব পুরুষ প্রেমিক নয়।

তুমি তো প্রেমিক, প্রেমের অহংকার।

তোমাতে দেখিছি আমি জীবনের গতিপথ, চোখের কার্নিশে সাজিয়েছি রঙিন ভাটফুল। 

প্রেমের সম্পাদ্যে গেঁথেছি স্বপ্নের গলিপথ, রাজপ্রাসাদ। 

সেই প্রাসাদের কেবল তুমিই এক ও অদ্বিতীয় সম্রাট। 

 

সব কথা শেষ হলে, আরও কিছু কথা থাকে

সব দেখা হয়ে গেলেও আরও কিছু দেখা থাকে।  

আরও কিছু প্রেম, প্রণয়ের ধারাপাত আলগোছে থেকে যায় মনের গহীন বালুচরে।

 

সুব্রত মণ্ডল

বাইশবাঁকির চাঁদ ১১

একটা অদ্ভুত সময়ের মধ্য দিয়ে আমরা হেঁটে যাচ্ছি আগস্ট মাসের দিকে। চারিদিকে বিষণ্ণ লতার মতো গড়িয়ে পড়ছে ভোর। তোমার পায়ের বুড়ো আঙুলের নখ ক্রমশ পচে যাচ্ছে। এই দুঃসময়ে ভারতবর্ষের অর্থনীতি, ক্ষুধা কিংবা বেকারত্বের যন্ত্রণা নিয়ে কিছুই করতে পারছি না আমি। নির্লজ্জের মতো দু’চারটে কবিতা লিখে সুরা পান করে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়ছি ফ্যানের তলায়। 

এসব দেখে তীব্র ঘৃণায় তোমার পেটের ভাত উগরে আসছে। রাগে গজগজ করতে করতে ইচ্ছে করছে আমার মুখে সজোরে একটা লাথি মারতে কিংবা থুতু দিতে। হয়তো-বা ইচ্ছে করছে আমার  সমগ্র শরীরে পেট্রোল ঢেলে সেই আগুনে আমাকে জীবন্ত পুড়িয়ে দিতে। যদি এমন মনে হয় কোনোদিন তবে যেন তুমিই একমাত্র প্রেমিকা আমার, যার জন্য কৃষ্ণগর্ভা নদীতে ডুব দিয়ে সোনার জাদুকরী কাঠি খুঁজে আনতে গিয়ে একশো আটবার আত্মহত্যা করেছিলে স্বয়ং তুমিই।

তোমার বাইশবাঁকে লুকানো নিরামিষ স্পর্শের কথা আজ পর্যন্ত কেউ জানতে পারেনি। আঙুলের আঁকিবুকি সেই কবেই মিলিয়ে গিয়েছে বৃদ্ধ কেলেঘাইয়ের জলে। কোজাগরী জ্যোৎস্নায় স্বর্ণাক্ষরে ইতিহাসের পাতায় সেই কবেই লেখা হয়ে গেছে ২৪ মে ২০১৯-এ একজন অসৎ, লোভী, কাপুরুষ, স্বার্থপর, বেইমান কবির জন্ম হয়েছিল এবং তার জন্মের পরেই কথা বলেছিল বাইশবাঁকির চাঁদ।

তোমার বাড়ির জলের কল খারাপ হয়ে গেলে কিংবা তোমার পিরিয়ডের সময় কে তোমাকে ন্যাপকিন দিয়ে সাহায্য করেছিল তার উপরে ভারতবর্ষের অর্থনীতি কোনওদিন থেমে থাকেনি। বরং  একটা ভুলের উপর আমরা আজীবন দেশ গড়ার স্বপ্ন দেখেছি। 

যে মানুষটা কোনোদিনও তোমার মেয়ের নৃত্যকলা দু’মিনিট দাঁড়িয়ে দেখেনি, বুকে জড়িয়ে ধরে তাকে স্নেহের চুম্বন করেনি, যার বুকে মাথা রেখে তুমি কখনো কাঁদতে পারোনি—সেই জীবাশ্ম পুরুষকে প্রেমিক ভেবে তুমি ঠিক করোনি।

বিগত একবছরে তোমার চোখের কাজল ভীষণ ফ্যাকাশে হয়ে গেছে মেঘাদি। নাভির নীচে শ্যাওলার মতো জমে পড়ে আছে সহস্র জন্মের ক্ষোভ। কপালের ভাঁজ দেখে স্পষ্ট বোঝা যায় কে ঘাই ফেলেছিল আর কে টাঙ্গা এনে অপেক্ষা করেছিল পরিত্যক্ত জলাশয়ের ধারে। ভরা বসন্তে কেই বা কতটা লুকিয়ে রেখেছিল নদী তীরবর্তী মানুষের দৈনন্দিন হাহাকার।

এসব ভাবতে ভাবতে কবে যে মন্বন্তর ঢুকেছে ঘরে বুঝতে পারিনি। এই দুর্দিনে কাঁচা হাতে দু’চারটে জঘন্য কবিতা লিখে দেওয়া ছাড়া তোমাকে দেওয়ার মতো আর কিছুই নেই আমার।

বাইশবাঁকির চাঁদ ১৫

একটা ভুল মানুষের হাত ধরে তুমি সমুদ্রস্নানে চলে গিয়েছ। বিবর্ণ শ্লেটের উপর এঁকে দিয়ে গেছ পরিযায়ী পাখিদের ভেঙে যাওয়া রংবেরঙের ডানা। সহানুভূতির শিখরে অবস্থান করতে গিয়ে পাথরের পর পাথর সাজিয়ে, বারবার নিজেকে একইরকম কায়দায় তুলে এনেছ মধ্যরাতের প্রেক্ষাগৃহে। তোমাকে অভিবাদন জানাতে গিয়ে শহরের সমস্ত আঙুল অকালে খসে পড়ে গিয়েছে। লাল বলয়ে আটকে পড়েছে অজগাঁয়ের মধ্যবিত্ত শরীর। আঙুলের শিহরন থেকে বঞ্চিত হয়েছে অপরিচিত লোমকূপ।

তোমাকে কার্ডিফের রাজপথে কখনো হেঁটে যেতে দেখিনি আমি। ঘুমন্ত শিশুর পাশে সমাহিত করে রাখতে দেখিনি দানের আধপোড়া রুটি। একজোড়া ছেঁড়া চটিতে যাদের স্বপ্ন একুশ মাইল এগিয়ে যায় ঘরে ফেরার রাস্তায়, আমি সেই রাস্তায় তোমাকে খুঁজি রোজ। রাধাচূড়ার ফুলের মতো দেখতে এক খ্রিস্টান যুবতীকে জড়িয়ে ধরে সারারাত চুমু খাই। তারপর পরিযায়ী যন্ত্রণা বুকপকেটে পাটে পাটে সাজিয়ে নিয়ে ভোরবেলা ঘুমিয়ে পড়ি প্রিয় চণ্ডী নদীর পাশে।

তোমার পুতুল চোখের দিব্যি মেঘাদি, তোমাকে ভুলে গেছি এমন চরম মিথ্যাচার নিয়ে আমি কখনো চার্চের পাশে যাইনি। প্রেমিকাকে শোনাইনি তোমার দ্বিচারিতার কথা। শুধুমাত্র একটা যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে আর একটা অদ্ভুত যন্ত্রণার মধ্যে প্রবেশ করেছি মাত্র। এই দুর্দিনে ক্ষুধা যেখানে জীবন, স্বপ্ন দেখা সেখানে নিছকই খেলনা বলে আমি অজুহাতে ছেড়ে দিতে পারিনি তার হতদরিদ্র বৃশ্চিকলগ্না আঙুল।

একটা ভুল মানুষের হাত ধরে তুমি হেঁটে গেছ বলে এ শহরের সমস্ত যন্ত্রণা জমে জীবাশ্ম হয়ে গেছে। উপকণ্ঠে ভেসে আসছে রুটির মতো আধপোড়া প্রেমিকের আর্তনাদ এবং আয়ু।

কবি নির্মল হালদারের চোখে করোনা-র দিনগুলি

নির্মল হালদার

পৃথিবী গ্রহের পুরুলিয়া

পর্ব-২২

হ্যাঁ রে এ মদন মদন… এ মদনা শুনা পাছিস এ মদনা…

দিদি যে রাস্তায় ধান শুকাতে বসলো, হ্যাঁ রে মদন কোনো গাড়ি এসে যদি মেরে দিয়ে যায়? মদন বলে, ল ও ত ন কি, গাঁয়ের আর সব বুড়িরা  ধান শুকায় রাস্তাতেই। গাড়ির ধাক্কায় কোন বুড়িটা মরেছে, আমাকে বলবি? অজিত তখন করুণ মুখে বলে, মদনা তুই বুঝিস নাই, দিদির বয়স তো হল অনেক, আমার বাপের মা—যদি গাড়ির শব্দ শুনতে না পায়? মদন এবার রেগেমেগে বলে, ফালতু ভাবছিস তুই। যদি তোর চিন্তা হচ্ছে, তুই নিজেই ধান শুকাতে বসবি যা। পাহারা দিবি যা। যদি না যাবি, মন দিয়ে তাসটা খেল।

সারাদিন কাজ কম্ম নাই। হরি মন্দির শিব মন্দিরের চাতালে, ছোকরার দল জড়ো হয়ে তাস  পেটাতে থাকে। ছোকরাদের একজন রাধানাথ বলে উঠল হঠাৎ- পুরুলিয়াকে গ্রীনজোন বলে, আমাদের অন্তত উপকার করেছে। কাজ ত নাই। তারপরে যদি, তাস খেলতে না পারতম মরে যেতম রে। একদম মরে যেতম। মদন বলে, কি তাস খেলবি অজিতের মুখটা দেখ। যেন  মাড়জল পেটে পড়ে নাই। এ অজিত অজিত—তাসটা ফেল ইদিকে। খেলাটাকে আগ করা—কি আর আগ করাবেক, অজিতের মন চঞ্চল হয়ে উঠল। সে উঠে পর ছুটতে শুরু করল। দিদি আছে তো আছে তো, এই আশঙ্কায় অজিতের বুক ধুকপুক করে। ঘরে উঠান নাই। গাঁয়ের অনেকেই ধান শুকায় রাস্তাতে। একজনকে থাকতে হয় পাহারাতে ও। কাওয়া-বনিতে খুঁটে খুঁটে শেষ করে দিয়ে যাবে। মা থাকে ঘরের কাজে। দিদি ছাগল ভেড়ি চরাতেও যায়। সাতদিনে দুদিন ধান শুকানো। ধান শুকানোর কাজ। ধান পাহারার কাজ। অজিত ঠিক—ঠিকানায় পৌঁছে দেখে দিদি ঝিমায়। অজিত ভাবে, এই এখন একটা গাড়ি এলে, দিদি তো শুনতে পাবেক নাই। সে দিদির গায়ে ঠেলা দিয়ে বলে—চল্, ঘরে চল্ ঘরে চল্…

২৭শে বৈশাখ, ১৪২৭

কবিতা আশ্রম পরিবারের কবি প্রণাম

পর্ব-১

পর্ব-২

পর্ব-৩

পর্ব-৪

পর্ব-৫

পর্ব-৬

পর্ব-৭

পর্ব-৮