আবহমান বাংলা ভাষা

দৈনিক

৫ শ্রাবণ ১৪২৭

Anslem Kiefer

দেবাশিস চন্দ

কাঁপে বিশ্বাসের নোঙর

দীর্ঘায়িত বন্দিকাহিনি, পরিযায়ী পর্যটনে অন্ধকার

রোদক্লান্ত আততায়ীর নাম জানলেও উচ্চারণ বারণ  

সংক্রমণ ছড়ায় মুখে মুখে, কাঁপে বিশ্বাসের নোঙর

তাসের ঘরের মতো ভেঙে যায় লাল নীল প্রতিরোধ

ঢেকিতে জ্বলন্ত সূর্যকে ছাঁট দিতে দিতে চাষিবউ

অপেক্ষায় কখন জ্বলে উঠবে সোহাগের আলো  

    

ভাতের গল্পে মুখ ফেরায় রাষ্ট্র, অর্বাচীন পোড়া কাঠ

নির্জন বাগানে হেঁটে বেড়ান ঈশ্বর—প্রকৃতির প্রতিনিধি

 

নিজামুদ্দিন মণ্ডল

বাঁশি বাজাই

আজও বাঁশি বাজাই

অন্দরমহল কেঁপে ওঠে বিষণ্ণতায়

এই দয়ালু বুকে বার বার বেজে ওঠে শূন্যতা

 

আমি যদি আকাশ হতে পারতাম

কিংবা বহতা নদী –

সব প্রেম, সব দুঃখকে নিয়ে এঁকে দিতাম

                           চতুর্দশী চাঁদ

 

তা-ও আমি পাঠক হয়ে বাঁচতে চাই

খড় মাটি-খড়িমাটির রঙিন দেওয়াল জুড়ে

দু’হাতে লিখে যাব শুধুই বিষণ্ণতা

 

গাজী লতিফ

পাখিছায়া

চালবাজ শিকারীরা দেখে শুনে রাতারাতি বোল পাল্টায় 

রাতে রাতে পাখি ধরে,

দিনে করে ‘পাখিরক্ষা বিশেষজ্ঞ সভা’

নগরে ও জনপদে বারোমাস পাখিহাট;

কেনা-বেচা দিব্য-দিবালোকে 

চড়া দামে পাখি কিনে ঠ্যাং ধরে নিয়ে যায়

                         অগণন মাংসাশী মানুষ 

বিশ্বায়নের নাচে বুঁদ হয়ে বৃক্ষহীন-পাখিশূন্য

                              পৃথিবী আগায় (!) 

শিকারীরা কেঁদে মরে; বিষয়টি পিশাচেরও অন্তরে

                                বেদনা জাগায়।

 

পাখির প্রস্থান পথে প্রজন্মের গান থাকে 

আশা থাকে ভালবাসা থাকে… 

পাখি নেই – ! 

খসে পড়া পালকেরা স্মৃতির দ্রাঘিমা জুড়ে

                               পাখিছায়া আঁকে।

 

কুশল ভৌমিক

আদিগন্ত ফসলের কবিতা

আদিগন্ত ফসলের কবিতা

 

আমার ঠাকুরদা একজন কৃষক ছিলেন 

মাটিগন্ধা হাতে তিনি শস্য ফলাতেন 

ধানের কাছে হৃৎপিণ্ড সমর্পণ করে 

তিনি শিশুর সারল্য নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতেন 

প্রতিটি ধান তখন কবিতা হয়ে উঠত

আদিগন্ত মাঠ তখন কবিতার খাতা। 

 

আমার ঠাকুরদার মতো অমন কবি

হয়ে উঠতে আমি কাউকে দেখিনি

তিনি রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দের চেয়েও

অনেক বড় কবি ছিলেন 

এমনকি সেক্সপিয়রের সনেটগুলোকেও

 আমার কাছে ঠাকুরদার ফসলের চাইতে

 বড় কবিতা মনে হয়নি

ঘাম শরীরে তিনি যখন লাঙ্গল চষতেন –

মনে হতো এক্ষুনি জন্ম নেবে পৃথিবীর

 শ্রেষ্ঠ কোনো কবিতা। 

 

অগ্রহায়ণে তিনি তার সোনালি

কবিতাগুলো নিজ কাঁধে বয়ে এনে

ঠাকুমার হাতে তুলে দিতেন 

ঠাকুমা পরমযত্নে কবিতাগুলোর গন্ধ শুঁকতেন,

 স্পর্শ করতেন, রৌদ্র মাখিয়ে রেখে দিতেন

 গোলাঘরের নান্দনিক মলাটে

আমাদের গোটা বাড়িটাই তখন হয়ে উঠত

 অনিন্দ্যসুন্দর এক কবিতার বই।

 

আমার ঠাকুরদা শস্যগন্ধা কবি ছিলেন 

আমি তার অযোগ্য দৌহিত্র 

দিন রাত শব্দের জট আঁকি

গ্রন্থের কাছে করি আত্মসমর্পণ 

প্রাজ্ঞ বিজ্ঞের কাছে ছুটে যাই

কবিতা লেখার গোপন রহস্য জানতে

অথচ আমার ঠাকুরদা শুধুমাত্র ঘাম,

মাটি আর লাঙল দিয়ে কত সহজেই

লিখতে পারতেন আদিগন্ত ফসলের

 অমর কবিতা।

 

বারো পর্বের ধারাবাহিক

ঈশ্বরফুল

বিভাস রায়চৌধুরী

পর্ব-১১

কবি, সাহিত্যিক বিশ্বনাথ মৈত্র

যখন মাধ্যমিক পাশ করলাম, নতুন এক জগৎ আমার সামনে প্রকাশিত হল।  শ্রীগোপালচন্দ্র সাধুর নির্দেশে ‘সাধুজন পাঠাগার’-এ সদস্য হয়ে গেলাম আমরা কয়েকজন বন্ধু। স্যারের স্বপ্নের লাইব্রেরিতে কত ব‌ই। সবচেয়ে ভাল লাগল ‘বনগ্রামের লেখকদের ব‌ই’ বলে একটি বিভাগ। ওখান থেকে নিয়েই নির্মল আচার্যের ‘মন কিনতু সূর্যমুখী’, বিশ্বনাথ মৈত্রের ‘বেত্রবতীর বুক’, বিশ্বরঞ্জন সেনগুপ্তের ‘রৌদ্রের স্বরলিপি’ পড়লাম। বিশ্বনাথ মৈত্রের কবিতার বই পড়লাম। প্রথমে অবশ্য অন্নপূর্ণা মৈত্র ছদ্মনামে  রচিত বিশ্বনাথ মৈত্রের বিখ্যাত নাটক ‘শিবের দেহত্যাগ’ পড়েছিলাম। পরে লাইব্রেরির অনুষ্ঠানে ওই নাটকে প্রধান চরিত্র শিবের ভূমিকায় অভিনয়‌ও করেছি।  এই সাধুজন পাঠাগারে যে আলো পেয়েছিলাম, সেই আলোই সীমান্তের অন্ধকার জগতের হাত থেকে আমাদের অনেককে রক্ষা করেছে বলেই আমার বিশ্বাস। 

সাধুজন পাঠাগারের পাশেই ছিল বিশ্বনাথ মৈত্রের  ‘দৈনন্দিন প্রেস’। বাবা বিশ্বনাথ জেঠুর ছোট্ট প্রেসে একদিন নিয়ে গেল। দেখি জীর্ণ, কুঁজো হয়ে যাওয়া  এক মানুষ, যার হাসিতে লেগে আছে সকলের জন্য ভালবাসা। আমাকে তিনি কাছে টেনে নিলেন। একসময় বিশ্বনাথ মৈত্র এবং বাবা বিড়ি মজদুর ছিলেন। একসঙ্গে বিড়িশ্রমিক সংগঠন করতেন। বাবা বলল, “বিশ্বনাথদা, ছেলেটা লেখে… আপনার কাছে দিয়ে গেলাম।”  সেই থেকে সাধুজন পাঠাগার আর অদূরে বিশ্বনাথ মৈত্রের ‘দৈনন্দিন প্রেস’ হয়ে গেল আমার প্রিয় দুই ঠিকানা।   তখন তিনি খুব নামী। আমাদের অঞ্চলের সবচেয়ে বিখ্যাত সাহিত্যিক। সারা বাংলায় নানা পত্রিকায় তাঁর গল্প, কবিতা প্রকাশিত হয়। আমার মূল্যায়নে বিভূতিভূষণ-পরবর্তী বনগ্রামে বিশ্বনাথ মৈত্র‌ই শক্তিশালী সাহিত্যিক। তাঁর কাছ থেকেই শিখেছি সাধারণ জীবনযাপন‌ই সাহিত্যিকের ভূষণ, সাধারণ মানুষ ও জগৎপ্রকৃতিই লেখকের সাধনক্ষেত্র। 

খুব কষ্ট হয় বিশ্বনাথ মৈত্রের কবিতা সংকলন, গল্প সংকলন, ছড়া সংকলন, উপন্যাস, নাটক আজ পাঠকের সামনে নেই। মাঝে মাঝে বনগাঁর পত্রপত্রিকায় তাঁর কিছু লেখা পুনঃপ্রকাশিত হয়। পড়ে ব্যথা বাড়ে। নিঃসন্তান বিশ্বনাথ মৈত্রের সুযোগ্য বংশধর সাংবাদিক সীমান্ত মৈত্র এখন ঐতিহাসিক ‘দৈনন্দিন’ পত্রিকা প্রকাশ করেন। তাঁর কাছেই দাবি জানাই বিশ্বনাথ মৈত্রের রচনাবলী প্রকাশের। এই স্বপ্ন সত্যি হোক।

বিশ্বনাথ মৈত্র যখন কর্কটরোগে মারা যান, আমার অল্প বয়স। অনেকের সঙ্গে আমিও শ্মশানযাত্রায় অংশ নিয়েছিলাম। সাহিত্য জগতে যত জড়িয়েছি, তত বিশ্বনাথ মৈত্রের সাহিত্য সংগ্রামকে অনুভব করেছি। প্রায়‌ই দেখতে পাই বিবর্ণ ধুতি-পাঞ্জাবি পরা মানুষটি হাতে টর্চ নিয়ে বোটপুল (এখন সেখানে নতুন ব্রিজ) পার হয়ে মিলিয়ে যাচ্ছেন দূরে। তাঁর জন্য বেদনা হয়। তাঁর বিপুল সৃষ্টিতে ধরা আছে দেশভাগ-পরবর্তী এই সীমান্তদেশের জীবনকথা। আজকের পাঠকের সামনে প্রকাশিত হতে চায় সেইসব লেখা। জীবন নিংড়ে একজন প্রতিভা যা লিখে গিয়েছেন। কোন‌ও দারিদ্র্য‌ই লেখককে দমাতে পারেনি। 

আজকাল লিখতে বসলেই শুনতে পাই অন্ধকার থেকে শব্দ-অক্ষরের কান্না ভেসে আসছে। মূল্যায়নের অভাবে, আমাদের ভালবাসার অভাবে সারা বাংলা জুড়ে কত না বিশ্বনাথ মৈত্র তলিয়ে গিয়েছেন বিস্মৃতির অন্ধকারে। তাঁদের রচনা কাঁদে। অভিমান জানায়। আমার নতুন লেখা লজ্জায় ধুলোয় মিশে যেতে চায়…

বিশ্বনাথ মৈত্র

বিগত দিনগুলি পড়ুন