দৈনিক কবিতা আশ্রম, ৬ শ্রাবণ ১৪২৭
আবহমান বাংলা ভাষা
ছবি: অমিত সাহা
নির্মল হালদার
কোল
দুখিয়া সোরেনের মাথার সিঁথি
যেন এক পথ।
কোথায় যাবে কতদূর যাবে?
যদি জঙ্গলে যায়,
যদি দেখা হয় দাঁতাল শুয়োরের সঙ্গে?
যদি পথে পড়তেই থাকে কুঠারের পর কুঠার?
দুখিয়া সোরেনের মাথা আমার কোলেই থাক।
দিশারী মুখোপাধ্যায়
অভিমন্যুকে চাই
অভিমন্যুর মা, অভিমন্যুকে তোমার গর্ভ থেকে
বার করে দাও
ওকে যুদ্ধে পাঠাব
শত্রুপক্ষের সৈন্য কী একটা ব্যূহ রচনা করেছে
আমাদের কোনো সেনাপতিই
সেই ব্যূহ ভেঙে ঢুকতে পারছে না
গোটাপৃথিবী জুড়ে আমাদের
দেড় কোটি সৈন্য মারা গেছে
আহত হয়ে শিবিরে রয়েছে কয়েক কোটি
আমাদের ইন্দ্রপ্রস্থে আজ মৃত্যু-মিছিল আর
স্বজন হারানোর কান্না
আমাদের ঘুরে দাঁড়াতে হবে অভিমন্যুর মা
ওকে যুদ্ধে যাবার জন্য তৈরি করে দাও
খাণ্ডব দহনের পাপ থেকে
পিতা ও পিতৃব্যদের উদ্ধার করতে
ওকে আজ চাই
যাবার আগে শেষ চুম্বনটাও দিতে ভুলো না
শহিদের সে অধিকার থেকে যেন বঞ্চিত না হয়
রণবীর দত্ত
প্রণয়
কবিতা কে লেখে? রণবীর না তুমি
সকালের আমগাছতলায় দড়ির খাটিয়া পড়ে আছে
স্তব্ধতা মূর্তিমতী এই খুব কাছে নীল পর্বতের সানুদেশ
স্তনের বোঁটার মতো ওই দিকে কেবলই তাকিয়ে রয়েছি
নীল ও সবুজ দুটো পাঞ্জাবি ছিল আমার, কাঁধে ব্যাগ
টিউশনি দিয়ে শুরু করেছিলাম তারপর নিরুদ্দেশের
টানে কিছুই সহ্য করতে পারিনি। জামরুল ফলের মতো
কালো জামের মতো, পাকা করমচার মতো,
তোমাকে ভেবেছি
কবিতা কে লেখে? রণবীর না তুমি
এখন পৃথিবীকে ছোট করে নিয়ে দুমকার এইদিকে
যেখানে গাছের ছায়া পড়ে, পর্বতের খুব কাছে
আমার নতুন বন্ধু আসলামের তিন পাহাড়ের বাড়িতে
তোমাকে ছুঁয়েই রয়েছি অথচ তুমি রয়েছ সুদূরতম দ্বীপে
হে প্রণয়! কবিতা কে লেখে? রণবীর না তুমি
রজতকান্তি সিংহচৌধুরী
পুনরাগমন
কিশোর পেশীর ঝাঁকুনিতে ঝরে থোকা-থোকা জাম
মা, আমি তোমার কাছে এতদিনে ফিরে কি এলাম?
মায়ের স্তন্যের মতো স্বতঃস্ফূর্ত ঝরে বৃষ্টিজল
দিগন্ত পর্যন্ত যতদূর দেখো – চাষি ও লাঙল
কবেকার গাইগরু আঁকা আকাশের চিত্রপটে
তৃণের সবুজ স্বাদ তাদের গোলাপি জিভে ফোটে
খটাখট তাঁত চলে তাঁতিদের চিরায়ু পাড়ায়
মনসা পুজোয় মাতে বাদ্যকর ঢাকের বাজনায়
দারিদ্র্যকে ওতপ্রোত গায়ে মাখে যে-শিশুর দল
স্কুলের রাস্তায় যেতে তারাও তো আনন্দে ঝলমল।
অরণ্যা সরকার
শিকড়
গাছে গাছে মুখগুলো পাতা হয়ে থাকে
মুখের অতীত সব মুখ
তবু কিছু আদল জমাতে হয়
বোঁটায় সফর রেখে ঝরে যেতে হয়
মাটি তাকে নেবে বলে অনন্ত তেষ্টায়
গাছ ও মাটিই জানে সারাৎসার
আমরা বলি, ‘কিছুই থাকে না’।
নাহিদা আশরাফী
এই কবিতা অপঠিত বলে গণ্য করা হোক
সংসদীয় বিতর্ক –
সন্ধ্যায় মালতীরা নিরাপদ নয়
তবু সন্ধ্যামালতী নামে ফুল কেন ফোটে?
ট্রাক –
রাষ্ট্রের গায়ে
কে যেন সংবিধানের হরফে লিখে দিয়েছে,
‘একশো হাত দূরে থাকুন’
সাইনবোর্ড –
ইদানীং চোখ বেশ পরিষ্কার দেখে।
রাস্তায় নামলেই
পুঁজিবাদীর উদোম গায়ে সাটা স্টিকারে চোখ পড়ে,
‘বেবি অন বোর্ড- হ্যান্ডেল উইথ কেয়ার।’
আর তাবৎ আমজনতার গলায় দেখি
ধারালো ব্লেডের মত ঝুলে আছে, ‘ইউজ মি।’
অমিত সরকার
অন্ধ প্রজাপতিটিকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে
লালন ও আমার মাঝখানে বসে একটি অন্ধ প্রজাপতি
যে রাতে ছোটমাসিদের নৌকা
থেমে গিয়েছিল আঘাটায়
আমাকে ও ছোটমাসিকে একলা রেখে
নেমে গিয়েছিল মাঝি
সেই রাত্রিটিকে আলোও প্রণাম করেছে, ‘নমো, নমো’
অন্ধ প্রজাপতিটির হাত ধরে সেই রাত্রি
হেঁটে গেছে পৃথিবীর ঠোঁটে
তাদের গভীর ছেনালিতে বার বার
পাল্টে গেছে ডানার ভূমিকা
শুধু রাত্রিচর নৌকার টলোমলো আগুন ছুঁয়ে ছুঁয়ে
শুধু অন্ধকার কুড়োতে কুড়োতে এই মীনজন্ম ছুঁয়ে ছুঁয়ে
আমি লিখে রেখেছি
পুড়ে যাওয়া প্রজাপতিডানা ও
একতারাদের হোঁচট কথা…
মঞ্জরী গোস্বামী
আবহমান
তাকে ছুঁতে নেই
নিকট দূরত্ব থেকে বিভাটুকু শরীরে ছড়াও
প্রবল জ্বরের ঘোর যেমন ছড়িয়ে যায়
ঘুমহীন তালপাতা পাখার বাতাসে
যেন কোনো দ্বিধা
মাটিতে ঘুমিয়ে তবে বৃত্তের পরিসীমা বোঝে
তুমি জানো সময়কে মেরে ফেলে
সময়ের জাঁকালো মিছিল
একবার ছুঁয়ে দিলে
তোমাকে ডিঙিয়ে যাবে মিছিলের অগোছালো চলা
পারমিতা ভট্টাচার্য
কুহক
প্রত্যাশা ফুরিয়ে দেখি, ডাকবাক্সে একটি কুহক
গোধূলির পাখি হয়ে বসে। আমি তার
ডানা ছুঁই ভয়ে ভয়ে, কতক বিস্ময়ে, আর
গন্ধ পাই সন্দেহজনক; ―বুঝি, তার
ভাঁজ খুললেই নামবে মধ্যরাত্রি; গাঢ় অন্ধকার…
প্রতিটি বিহঙ্গ দিনে উড়ে আসা সন্ধের ডানা,
এভাবেই চোখ বেঁধে স্থাণু রেখেছিল মোহানায়;
আমি সেই চলচ্ছক্তিহীন
অন্ধচোখ ধুয়ে আজও রাত্রিবাস করি কারাগারে!
মাথায় মৌচাক খোপ। সহস্র গণিতে ঠাসা স্নায়ু;
বন্ধ খিড়কি-খিল ফিরিয়ে দিচ্ছে সন্ধে-ডাক ―
ধীরে বাড়ছে মহাকাল, আলো আলো প্রশান্তির আয়ু…
নির্মম চৌকাঠ প্রান্তে, পাখি ক্রমাগত কড়া নাড়ে…
কুমারেশ তেওয়ারী
বাগান
ক্যামেরা চালু করতেই হাত নাড়তে নাড়তে
দূরে সরে যায় ফুলের বাগান
গাছপালা ফুল ফল দরোজা জানালা নিয়ে
সরে যায় শুদ্ধমতি অরণ্যের দিকে
জুম করেও ধরা যায় না কিছুতেই তাকে
অরণ্যের কোলে যে বাতাস তাকে
মধুবাতা নাম দিলে কী খুশি কী খুশি
সনাতন বাঁশি মুখে ফুঁয়ের প্লাবন
ক্যামেরা নাছোড় দৌড়ে যায় পিছন পিছন—
সোনামন একটা ছবি শুধু, স্ন্যাপসট
বাগান কী দেখে? হাত, হাতের ভেতরে
আড়মোড়া ভাঙে ঘোলাটে চোখের বাঘ
দেখে আর সরে যায় সোমত্ত বাগান
পায়ের চাকায় তার ধ্রুপদ,
লাগিয়ে নেয় পিচ্ছিলতা
এই দৃশ্য দেখে গাছেরাও হাসে খুব
ময়ূরীও পাক খেয়ে বসে পড়ে ডালে
বসে বসে দেখে তার অদৃশ্য ছায়ার থেকে
নিজস্ব ময়ূর
শিখে নেয় নাচের মুদ্রাটি, পেখমে রোদের আতুপুতু
ক্যামেরার লেন্সে এসে পড়ে কালপুরুষের থুতু
রিমি দে
জঙ্গল ভ্রমণ
এই তো তলিয়ে যাবার আগে নড়ে ওঠা রূপ
উপচে পড়া হারিয়ে যাওয়াটুকু স্বপ্ন জঙ্গলের
দিকে এগোতে থাকে অলিগলিপথের বাঘ সিংহ
স্পর্শ করে অরূপের দিকে !
কাঁপতে কাঁপতে কাঁদতে কাঁদতে মুখ লুকিয়ে থাকা
অন্যগুলো অন্যকিছু ছুঁয়ে থাকতে চাইলেও
নিজেকে আরো অনেকটা অচেনা
অন্য করে তোলে কিছু পুষিয়ে দেওয়া পরাজয়
মুছে যাবার আগে ও পরে মৃত গন্ধ নিয়েও
সামান্য টুংটাং ভাঙতে ভাঙতে জুড়ে যাই
জুড়ে যাবার পর জ্বর ও জর্জর বিযুক্তি থেকে নিয়ে
জঙ্গলের ছায়ায় সেইসব নীরবের কাছাকাছি
নত থেকে নততর…
টুপটাপ মৌনজল মৃদু হাসিমুখ
অনন্য অনিবার্য গতি তার
হন্যে হয়ে আঁতিপাঁতি করে খুঁজতে থাকি
আমার আংশিক আর জঙ্গলে মুখ রেখে
চিৎকার করে বলি
‘অতল অতল…!’
তমাল বন্দ্যোপাধ্যায়
মলিন ধারণাজন্ম
কোনও দিন খুশি হলে, মনে করব তুমিই কারণ।
কোনও দিন কান্না এলে জানব তুমি মনে করছ ঠিক—
মন খারাপের দেশে এইসব সাম্যবাদী আশা
লেখায় ছড়িয়ে দিই। লেখাটি তোমাকে ছুঁয়ে দিক।
তুমি কি একেলা হলে মনে করো সে রাসরজনী?
পূর্ণিমায় স্নান সেরে আমাদের সেই অবিরাম…
তোমার কি মনে আছে আমাকে ছোঁয়ার কী আকুতি?
দেখা করতে চুপি চুপি। লোকে করত আমার দুর্নাম।
সেসবের ভার নেই। স্মৃতি জুড়ে ঝাপসা সব লেখা।
এই মুগ্ধ বৃন্দাবনে তোমার যে ফেলে যাওয়া বাঁশি
আজও বাজছে, আজও বাজছে…
তার বেজে চলার নিয়মে
আমি শুধু বেঁচে থেকে যমুনার কুঞ্জবনে আসি।
কোনও দিন দেখা হবে। একদিন হবে তো নিশ্চয়ই।
সেদিনের অপেক্ষায় নিজের ভূমিকাটুকু লিখি।
সেদিন শ্রীমতি নেই, নেই চেনা ব্রজের রাখাল—
তুমি এক ঝাপসা লেখা। আমি তার অপঠিত লিপি।
সুবীর সরকার
মাধবী ও গোল্লাছুটের মাঠ
আদি ধর্মকথা শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে
পড়েছিলাম আমি
হাইকু লিখতে গিয়ে হাই তুলছেন কবি মাধবী
দাস
মাধবী, আমার অতিরিক্ত ফর্সা বোন
১২ মিনিটের ঝগড়া শেষে একটা পুরোনো
গান
আদর ও আহ্লাদ দিয়ে একটা ম্যাজিকের
মতো সম্পর্ক
আমি আর মাধবী একটা শোকমিছিলে
হেঁটেছিলাম
সার্কাসতাঁবুতে বিরহ ঢুকলে
আমার শুকনো চোখ জলে
ভিজলে
মাধবী নেমে যায় গোল্লাছুটের মাঠে
মাধবী শরীরে জড়িয়ে নেয় কুয়াশা
ও রূপকথা
আমার হাহাকারের পাশে শুশ্রূষা নিয়ে
চিরকালের এক বোন হয়ে মাধবী ঝুঁকে
পড়ে গানের ওপর-
‘ফুটিল কাশিয়ার ফুল
ঐ না ভাদর মাসে’
জীবন ও কবিতা নিয়ে দুরন্ত থাকিস রে
তুই
থাকিস বাতাসের মতো।
আর আমি চলে যাবার দিনে শেষযাত্রা জমিয়ে
দিস হাসি ও হাততালিতে
মৌমিতা পাল
ব্রাহ্মনিতম্বিনী
ব্রাহ্মনিতম্বিনী, বিরহে গত শতকের প্রেম।
পালকি নামাল উঠোন
রোগা মেয়েটার ছত্রে ছত্রে সুখ ,জাম-দুপুর;
ডাল-পাখি গাইল-“বিরহ জাগুক”
বলক বাতাস বাহান্ন পীঠে !
লজ্জার মাথা খেয়ে সন্ত্রাস রটিয়ে দিলে
কোথায় পালাবে সে
কোথায় পালাবো আমি!
ঋষ্যমূক চেনাবে নিজেকে!
ব্রাহ্মনিতম্বিনী, বিরহে গত শতকের প্রেম।
রোগা মেয়েটার গোলাপজীবন কতদূর যাবে!
গৌতম গুহ রায়
অগ্নিপাত
এই তৃণভূমি গোপন করেছে তোমার কথা,
বলেনি, তোমার শরীরের তাপ
আগ্নেয় পাথরের মতো
যখন তুমি নদীর জলে পা ছুঁয়ে
এই সবুজ ঘাসের উপর উঠে আসো
তখন তোমার শরীর থেকে
ঝরে পড়ে প্রাচীন ছাইয়ের ধুলো
আমার উরুর আড়ালে ছিল নিশি ডাক,
কোমরের ক্ষত
তোমার ত্বকের কৃষ্টাল জ্যোতি,
নদীরও তখন মুখ নত
ওই কালো পাহাড়ের মতো,
অগ্নিমুখ শুকিয়ে যাওয়া শিলাপথ
আমার নাভি পর্যন্ত, থমকে আছে
অশালীন স্পর্শের শীত
এই তৃণভূমি গোপন করেছে
লড়াইয়ের আঁচড় চিহ্ন জন্মমৃত্যুর নগ্নতা।
ঐ দেহের একমাত্র ভাষা আগুনের অক্ষরে লেখা
আজ দিগন্তে জুড়ে অগ্নিপাতের বিদ্যুৎ গ্রীবা
সারারাত পুড়ে যাওয়ার আগে
মুখাগ্নির মন্ত্র পড়ে এই নতভূমি
ভাস্কর সুতার
ভাষা
তোমাকে ছুঁয়ে দেখা হয়নি বলে-
আজও বেঁচে আছি
মানুষের প্রথম প্রেম তুমি নিজে
অক্ষরে ধারণ করেছিলে, প্রাণ
পৃথিবীকে জল থেকে এনে,
পাল তুলে দিলে…
হায় মানুষ, হায়, মানুষ…
ঈশ্বর শেষ সম্বলটুকুও তোমায় দিয়ে গেল
আর আমি বিশ্বাস করলাম
ঈশ্বর বাংলায় কথা বলেন
রেখে যায় বীজ। রক্তের গোপন আত্মীয়তা।
বিবেকানন্দকে ছুঁয়ে দেখা মানে
বন্ধুর কাছেই থাকা।
আমাকে পাওয়া…
কনক মণ্ডল
গান
প্রতিটি জন্মের গায়ে লিখেছি বসন্ত,
প্রতিটি মৃত্যুর ঠোঁটে লিখেছি অনন্ত।
একে একে এই ছোট্ট জীবনে সমস্ত ঋতু,
বর্ণ, গন্ধ, দিন-কাল সব লিখি থিতু।
আমি যে গান গাইতে পারি না―
আমাকে বিশ্বাস করে একটা গান ওই
বন্দি পাখিটির ঠোঁটে রেখে দাও চুপি!
সে গান রাখাল হয়ে কবিয়াল হবে,
শুনিয়ে বেড়াবে ভগ্ন মন্দিরের কথা।
আমি,
প্রতিটি জন্মের গায়ে লিখেছি গরজ,
প্রতিটি মৃত্যুর ঠোঁটে লিখেছি সহজ।
বন্যা লোহার
চুক্তি
কুসুম নির্মিত আঙুল বুলিয়ে
যে আঁকে অশনিসংকেত,
হীরকচূর্ণ বিপন্নতার মোহ
তাকে ডেকে দাও
এই ক্ষণে রফা হোক!
কথা বলে মুছে যাক
নমনীয় পাললিক স্নেহ
সন্তাপ ভেঙে গেলে চলে যাব
রেখে যাব; আকাশের
সদ্ভাব লেগে থাকা দেহ।
জয়দেব বাউরী
পথ
আমার ভেতরে ঢুকে দিশাহারা হয়ে গেছে যে সকল পথ
প্রহারে প্রহারে ভেঙে আধমরা করে ফেলে রেখেছি যাদের!
সামান্য মাদকে যারা এমনই বেহুঁশ, যে টেনে হিঁচড়ে ফেলা
যায় যেখানে সেখানে! সেই সব পথ এই সন্ধিমুখে ছেড়ে
দেব আজ। চোখেমুখে জলের ঝাপট, দাঁত লাগা খুলে গিয়ে;
হুঁসে ফিরে নিজেকেই ঝেড়েঝুড়ে উঠে বসে দাঁড়াবে সটান।
যতটুকু আয়ু নিয়ে যে এসেছে ততটুকু যাক সবিনয়ে।
বিনয়! সবার থাকে? নেই বলে দিশেহারা, এমন প্রয়োগ!
তবুও যে যার মতো হেঁটে যাক নদনদী অরণ্য পাহাড়ে!
যেতে যেতে ক্ষয়ে যাবে, যেতে যেতে রাজপথ কেউ। বাকি পথ
প্রকৃতির, বাকি পথ পৃথিবীর বাকি পথ রক্তপাত, ঘামের!
ভাসাবে, ওড়াবে আর বসাবে নিজের মতো সাদামাটা ফের।
বঙ্কিম লেট
বলাকা রঙের বৃষ্টি
কবি হতে চাইনি ব’লে আমি কবি নই
কিন্তু সূর্যাস্তের কাছে
নত জানু হয়ে
চেয়ে নিয়েছি ঝরনা কাল ভোরবেলা
গাছের পাতায় ঘাসে লিখব ঝরব ব’লে
ভেজা শার্সি ভেদ করে তোমার চোখের
তলে জমে থাকা ঘন অন্ধকার মুছে
তোমার গায়ের ঘ্রাণ
স্নানাগারে মেখে
সমস্ত কিরণ
আবার ফিরিয়ে দেব
আলোর দেবীকে
হাওয়ায় হাওয়ায় ভেসে যাওয়া মর্মরের
পাতাদের ইতিহাস ধ্রুবতারা জানে
লিলিফুলের মতো ঝরে ঝরে যাওয়া
আমাদের এই স্পর্শ সংক্ষিপ্ত মিলন
তুমি ভুলে যেয়ো
আগামী বর্ষায়:
সুগন্ধের ইতিহাস হয় না কখনও
লিলিফুল পারফিউম হয় না কখনও
পারফিউম লিলিফুল হয় না কখনও
ভুলে যেয়ো ভুলে যেয়ো ভুলতে দিয়ো
শুধু মনে রাখব আমার ধূসর পিঠে
অথবা বোতাম খোলা শস্যখেতে
তোমার দেওয়া রামধনু রঙিন
আলোর আঁচড়
আর ক্ষতস্থান থেকে
বলাকা রঙের বৃষ্টি
অমিত সাহা
ধুলোমুখী ঝড়
ধুলোর মোহনা ছিঁড়ে, উঠে আসে হাসি।
হাসির দু’পাশে, কুমড়ো-বীজের দাঁত…
তুমি বললে আবাদ… আবাদ…
দাঁতেদের আশেপাশে, বিকেল রঙিন।
রঙিন আকাশে, মেঘের সাঁকোটি দোলে…
তুমি বললে তারাশূন্য কোলে…
দুলছে পরজীবী-বৃষ্টি, বিদ্যুতে… সিন্ধুতে…
সিন্ধু মানে চিঠি, চিঠি কি শুধু আবেগ?
তুমি বললে বর্ণমাখা-মেঘ…
আবেগতাড়িত প্রশ্নে, ধুলোমুখী ঝড়।
ঝড়ে ঝরছে আলো, হাসির দু’পাশে মেঘ…
মেঘে মেঘে সম্ভাবনা ডাকে…
ধুলো তো চিঠির স্তূপ! পোড়ায় পোকাকে…
গল্প
ভবদুলাল আর প্রভাতী
সন্মাত্রানন্দ
সিদ্ধিদাত্রীর মন্দিরের সামনে বড়ো কাঁঠালগাছটার ছায়ায় বসে ছিল ভবদুলাল। বড়ো ধূপ, বাতাসে যেন আগুনের হলকা বয়ে যাচ্ছে। গাছের গুঁড়িটি লাল পাথর দিয়ে বাঁধানো, কাঁঠালগাছের ছায়ায় স্থানটি শীতল হয়ে আছে এই রক্ষে। মন্দিরের একপাশে মায়ের ভোগঘর; সেখানেই প্রসাদ পেয়েছে ভবদুলাল দুপুরে। এখান থেকে যাবে সে পাথরঘাটায়। অনেকটা পথ, তবু রোদের তেজটা একটু কমে এলেই যাত্রা করা শ্রেয়স্কর। দুটো নাগাদ বেরিয়ে পড়লে সন্ধের মধ্যে পাথরঘাটায় পৌঁছুতে পারবে।
কাঁঠালগাছের বড়ো বড়ো সবুজ পাতার ফাঁক দিয়ে দূরের ধোঁয়াটে আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল ভবদুলাল। হঠাৎ একটি মেয়ের ডাকে তার সম্বিৎ ফিরল। তাকিয়ে দেখল, বছর পঁয়ত্রিশেকের একজন মহিলা। নির্ঘাত মন্দিরে পূজা দিতে এসেছেন। হাতে ফলমূল, মিষ্টির প্যাকেট। স্মিত হেসে বললেন, যাবেন কোথায়, বাবাঠাকুর? এখানে উদাস হয়ে বসে আছেন যে!
সিদ্ধিদাত্রীর মন্দিরে পূজা দেওয়ার পর উপস্থিত সাধুসন্ত বা ভিখারী-নাগারিদের কোনো একজনের উদ্দেশ্যে দান করার প্রথা আছে। মহিলাও নিশ্চয়ই সেই উদ্দেশ্যেই ভবদুলালের সঙ্গে আলাপ জমাতে চাইছেন। তা না হয় বোঝা গেল, কিন্তু মহিলার হাসিটি ভবদুলালের এত চেনাচেনা লাগছে যে কেন!
মহিলা হাত জড়ো করে নমস্কার জানালেন। প্রতিনমস্কার জানিয়ে ভবদুলাল উত্তর দিল, যাবো এই পাথরঘাটায়। বড়ো গরম, তাই কিছুক্ষণ জিরিয়ে বেরোবো ভাবছি। আপনি কোথায় যাবেন?
আমি যাবো কাছেই। গণেশপুর।
ও গণেশপুর! সেখানে আমার এককালে বেশ যাতায়াত ছিল। গণেশপুরে কি শ্বশুরবাড়ি নাকি?
না, বাবাঠাকুর। আমার বিয়ে হয়েছে হরিভদ্রতলায়। গণেশপুরে বাপের বাড়িতে এসেছি। এলেই আসি এই একবার মায়ের থানে পূজা দিতে। গণেশপুরের শিবতোষ চন্দকে চেনেন? শিবতোষ চন্দ আমার দাদা।
তাই হাসিটা অত চেনাচেনা মনে হয়েছিল ভবদুলালের প্রথমেই। কী আশ্চর্য! মানুষ ছোটো থেকে বড়ো হয়ে যায়, চেহারা পালটে যায়, তবু হাসিটি একই রকম রয়ে যায় যে! জীবনের ঘাতপ্রতিঘাত হাসিকে পাল্টাতে পারে না তাহলে? ভবদুলাল ভাবছিল।
ভদ্রমহিলা এবার নতজানু হয়ে প্রণাম করলেন ভবদুলালকে। তারপর পঞ্চাশটি টাকা ব্যাগ থেকে বের করে ভবদুলালের পায়ের উপর রাখতে উদ্যত হয়ে বললেন, এই সামান্য যদি গ্রহণ করেন, বাবাঠাকুর, দয়া করে!
ভবদুলাল হাঁ হাঁ করে উঠল, করেন কী, করেন কী? টাকা কেন? টাকা কেন?
মহিলা সামান্য অপ্রস্তুত হয়ে আঁধারমুখ করে বললেন, নেবেন না?
তাঁর ম্লান মুখ দেখে বড়ো মায়া হল ভবদুলালের। বলল, আচ্ছা দিন। টাকা পায়ে দিতে নেই, মা। হাতে দিন।
অমনই প্রসন্ন হাসিতে ভরে উঠল মেয়েটির মুখ।সেই হাসি! ভবদুলালের হাতে টাকাটি দিয়ে বললেন, তাহলে এখন আসি, বাবাঠাকুর?
ভবদুলাল আবার দুহাত তুলে নমস্কার জানিয়ে বলল, আসুন, মা! মা-জননী আপনাকে, আপনার সকলকে ভালো রাখুন।
মেয়েটির চলে যাওয়ার দিকে উদাস নয়নে তাকিয়ে রইল ভবদুলাল। রোদে মুখ রাঙা হয়ে রয়েছে মেয়ের।
গণেশপুরের দিগু চন্দ। দিগুর দুটি সন্তান। বড়োটি ছেলে–শিবু, শিবতোষ চন্দ। আর ছোটোটি মেয়ে। প্রভাতী। ভুতু বলে ডাকত সব আদর করে।
কুলগাজনের হাটে একদিন বুড়োশিবতলায় বসে আছে। তা হবে সে বছর তিরিশেক আগে। এক হাটফেরতা ব্যবসায়ী এসে বসল। সঙ্গের মোটপত্তর দেখে বোঝা যায় কাপড়ের দোকানদার। তবে তেমন বড়ো ব্যবসায়ী নয়। লোক চিনে চিনেই তো জীবনের দিন কেটেছে ভবদুলালের। সে পথের মানুষ।
নাম বলল, দিগু চন্দ। আলাপসালাপ হল খানিক। ভবদুলালের তখন তন্ত্রমতে দীক্ষা হয়েছে বছর দশেক। সে কিন্তু বরাবর সাদা কাপড়ই পরে এসেছে গুরুর নির্দেশে। মাথার চুলগুলো ঝুঁটি করে বাঁধা। মুখে দাড়িগোঁফের জঙ্গল। শুধু আজকের সঙ্গে তফাত এই যে, তখন চুল-দাড়ি-গোঁফ সব কুচকুচে কালো। কথায় কথায় দিগু জানতে পারল, বাবাজির সিদ্ধিদাত্রীর মন্দিরে আসার ইচ্ছা। দিগু বলল, তা সেখেন থেকে তো যেদিন যাবেন, সেদিনই ফিরতে পারবেন না। তাহলে সিদ্ধিদাত্রী দর্শন করে আমার বাড়িতে থাকেন না কেনে?
ভবদুলাল গম্ভীর হয়ে বলেছিল, না, ফেরার পথে নয়। যাবার পথে। আমি তোমাদের বাড়ি যাবো বিকালবেলায়। রাতটা থাকব। তবে তোমাদের গৃহে নয়। প্রাঙ্গনে। সকালে উঠে যাবো মাকে দর্শন করতে। তারপর মন্দিরেই প্রসাদ পেয়ে চলে যাবো পাথরঘাটায়। সেখেনে আমার এক গুরুভাই থাকেন।
দিগু তো বেজায় খুশি। সেই থেকেই পরপর আট নয় বছর দিগু চন্দর বাড়ি হয়ে সিদ্ধিদাত্রীর দর্শনে আসত ভবদুলাল। বছরে একবার। প্রাঙ্গনে নয়, দিগু চন্দ তার ঠাঁই করেছিল তাদের বাড়ির পেছন দিকে পুকুরপাড়ের এক চালাঘরে। তবে ঘুমোনোর সময় ছাড়া চালাঘরে বিশেষ থাকত না ভবদুলাল। খোলা বাহিরের মধ্যেই গোটাকতক উনুন ছিল। চারমুখো, দুইমুখো, একমুখো। চারমুখো উনুন ধানসিদ্ধ করার জন্য। দুইমুখো উনুন খইয়ের জন্য। আর একমুখো উনুনটায় ভাত রান্না হত। ভবদুলাল স্বপাক খেয়ে এসেছে সারা জীবন। দিগু চন্দর বাড়িতেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। ওই একমুখো উনুনেই রাঁধত।
বাগান থেকে কাঠকুটো, দিগু চন্দর ভিতর বাড়ি থেকে চাল, আলু, তরিতরকারির সিধা দিয়ে যেত দিগু চন্দর বছর পাঁচেকের মেয়ে ভুতু। রোগা ফড়িংটির মতো তার শরীর, চোখ দুটি বড়ো বড়ো। কাজল টানা বড়ো মায়াভরা। আর সেই হাসি। কারণে অকারণে হি-হি করে হাসি। দিগু বিরক্ত হয়ে বলত, এত হাসি কেন তোর? মেয়েদের অত হাসি ভালো না।
ভবদুলাল বলত, ওকে ওরকম বোলো না গো, দিগু। দ্যাখো, তোমার বকুনি খেয়ে কেমন জড়সড় হয়ে গেছে মা-টি। হাসতে দাও, দিগু, হাসতে দাও। ওর হাসিটি যেন মা-জননীর হাসি! জয় মা, জয় মা! ওর চাউনিটা দেখেছ, দিগু? দ্যাখো, দ্যাখো। ওর চাউনিতে যেন জগৎ-টা নড়ছে।
দিগু বলত, মা-জননী না, ছাই! সব সময় হাসি আর হাসি। যা তুই পেয়ারাতলায় বেনাডাল দাঁতে দিয়ে খুঁচগে যা।
দিগুর ধারণা, দাঁতে বেনাডাল দিয়ে ঘষলে নাকি মেয়েদের হাসিরোগ সেরে যায়!
একদিন দুপুর থাকতে থাকতে ভবদুলাল গণেশপুরে দিগু চন্দর বাড়ি এসেছে। পথশ্রমে ক্লান্ত থাকায় সন্ধ্যার একটু পরে একটু চোখে চোখ লেগে গেছিল। চালাঘরের দাওয়ায় ঘরের দেওয়ালে ঠেস দিয়ে সে আধশোয়া হয়ে বসেছিল চোখ বুজে। এমন সময় শুনছে, ভুতু থালায় করে চালডাল-তরিতরকারি এনে তাকে ডাকছে, সাধু! ও সাধু! সাধু, তুমি ঘুমাচ্ছ? নান্না করবে না? সাধু, ও সাধু! তোমার ঘুম নেগেচে?
ঘরসংসার করেনি ভবদুলাল। মা মরে গেছিল ছোটোকালে। ঘর ছেড়েছিল যখন আঠারো বছর বয়েস। কখনও নরম দুটো কথা, সামান্য স্নেহের স্পর্শ পায়নি সে কোনো মানুষের কাছ থেকে। মানুষ অবজ্ঞা করেছে। মানুষ শ্রদ্ধা করেছে। ভালোবাসেনি কেউই। শুধু সেই ত্রিশ বছর আগে দিগু চন্দর পাঁচ বছরের মেয়ে ভুতু তার শ্রান্ত চেতনায় স্নেহের স্পর্শ বুলিয়ে দিয়ে গিয়েছিল একদিন।
সেই ভুতু! বা প্রভাতী। কতো বড়ো হয়েছে। হয়ত খুব বড়ো ঘরে বিয়েও হয়েছে তার। সে রোগা চেহারা আর নেই। স্বাস্থ্য ভালো হয়েছে, বেশ সুন্দরীও হয়েছে সে। বাহ্!
ছোটোবেলার সব কথা আর মনে নেই ভুতুর। কারই বা সব মনে থাকে? ভবদুলালকে সে চিনতে পারেনি। চেনার কথাও নয়। ভবদুলালও আর চেনা দেয়নি তাকে। কী দরকার!
দুহাত মাথায় ঠেকিয়ে ভবদুলাল মনে মনে বিড়বিড়ায়, ভালো থাকো। আনন্দে থাকো। জীবনে সুখী হও, মা!
কাঁঠালতলা থেকে উঠে দাঁড়াল ভবদুলাল। রোদের ঝাঁজ একটু কমছে। এখনই বেরিয়ে পড়তে হবে।
পাগল
অমিতকুমার বিশ্বাস
বিস্ফোরণের পর ছিন্নভিন্ন জীবন। কেঁপে ওঠে পুপু ও মোনা। পুপু মোবাইল গেম ছেড়ে চোখ রাখে টিভি-পরদায়। মোনা, যে মেসেঞ্জারে এইমাত্র বন্ধুকে জানিয়ে দেয় আজ স্কুলে যাবে না, টুইশান আছে, সেও চোখ রাখে। চোখে-মুখে ওঁদের হঠাৎ-ই ভয়, বিস্ময়। একটু আগেই দুজনে কার্টুন না মুভি এই নিয়ে চলেছিল তুমুল লড়াই। চলেছিল পুপুর ঘুষি ও মোনার চড়। শেষে পুপুর হাঁচড়ে-কামড়ে দেওয়া। ভাইবোনের এই ধুন্ধুমার কাণ্ডে টেবিল থেকে পড়ে গেল দাদুর সাধের আচারের বোয়েম। বৃদ্ধ তবু শান্ত। নাতি-নাতনির এইসব অত্যাচারেও একরকম সুখ আছে বড্ড— যে অনুভব করে, তাঁর কাছে স্বর্গও বড়ই অনাদরের।
গতকালই সাতাত্তরে পা দিলেন প্রবীর মজুমদার। জন্মদিনের আয়োজন করল পুপু ও মোনা, কেক কেটে, বেলুন টাঙিয়ে, নিজেরা-নিজেরাই। রিমি বিরিয়ানি ও পায়েশ করে সবার জন্য। ওঁরা একটু বড় হতেই এই দিনটা নিয়ে এমন হইচই শুরু করেছে। জীবনের এমন পর্যায়ে এসে এসব বড়ই ভাল লাগে তাঁর।
টিভির বিস্ফোরণের কাছে হেরে গেল ঘরোয়া লড়াই। নিউজ চ্যানেলে তখন ক্যাপশান, ‘দিল্লিতে এই সন্ত্রাসের বলি ৭৭, আহত হাজার ছাড়িয়েছে!’
ভাঙা কাচের টুকরো ও ছড়ানো তেল-আম পরিষ্কার করতে-করতে দুজনের পিঠে দু-ঘা বসিয়ে দেয় রিমা। ‘আরে করছ কী?’ বলেই বউমার হাত থেকে পুপু-মোনাদের আড়াল করেন তিনি। আর-একটু হলে বুঝি বৃদ্ধের গায়েই চড়টা পড়ে। লজ্জায় সরে যায় রিমা। মোনা মুখ ঘুরিয়ে বসে থাকে কিছুক্ষণ। পরে মোবাইল টেনে নেয়। পুপু ভ্যাঁ-ভ্যাঁ করে কিছুক্ষণ কাঁদে। একটু পর তা পোঁ-পোঁ বাঁশির মতো শোনায়। শেষে তাও বন্ধ হয়ে যায়। ‘এই নাও দাদুভাই’ বলে বৃদ্ধ নিজের মোবাইলটা এগিয়ে দিলে চোখ মুছে সেটা টেনে নিয়ে খেলা শুরু করে পুপু।
টিভিতে আরও কিছু চলতে থাকে। সেটা অফ করে দিয়ে তিনি তৈরি হন, ব্যাংকে যেতে হবে, তিনি যে বেঁচে আছেন সেটাই জানাতে, নইলে পেনশান বন্ধ হয়ে যাবে যে ! দু-দিন আগেই হঠাৎ ফোন, ‘ব্যাংক থেকে বলছি, ব্রাঞ্চ ম্যানেজার…’
‘হ্যাঁ, বলুন…’
‘আপনি কি বেঁচে আছেন?’
‘এইতো, দিব্বি আছি। কেন বলুন তো?’
‘আপনাকে একটু ব্যাংকে আসতে হবে, প্রমাণ করতে, আমাদের ডাউট আছে। নেভার মাইন্ড, একটা অবজেকশান জমা পড়েছে। আমাদের অনুরোধ, আপনি দু-একদিনের মধ্যে একবার কাগজপত্র নিয়ে আসুন।’
প্রবীরবাবু একটা চাকরি করতেন, তারই পেনশান। বছরে দু-বার— মে ও নভেম্বরে—তাঁকে ব্যাংকে যেতে হয়, তিনি আদৌ বেঁচে আছেন কি না সেটা প্রমাণ করতে।
এবার হঠাৎ-ই আমন্ত্রণ।
টিভি বন্ধ হয়ে গেলেও পুপু-মোনারা শান্ত। সাহস করে কেউ আর রিমোট ছোঁয়ার চেষ্টা করে না। ক্লাস টুয়ের পুপু স্কুল গেল না আজ, কাল সামান্য বৃষ্টিজলেই সর্দি-কাশি বাঁধিয়েছে। টাটা-সুমো এসেও ফিরে গেল। ড্রাইভার ঘ্যানঘ্যান করল কিছুক্ষণ, ‘একটু ফোন করে জানাতে পারলেন না, এত ভেতরে আসি শুধু আপনাদের জন্যই, এত ঝামেলা সহ্য হয় না…কোনো দায়িত্ব নেই আপনাদের…’
রিমি নানান ব্যস্ততায় ভুলে গেছে। ড্রাইভারকে চটানো যাবে না কোনওভাবেই। অনেক দয়া করেই মালিকের আপত্তি সত্ত্বেও এই গলিতে আসে। খচে গেলেই গেল। তখন হেঁটে গিয়ে বড় রাস্তায় দিয়ে আসতে হবে পুপু-কে। বিরাট ঝক্কি!
একটা জিনিস ভুলে যাওয়া মানে দু-দুটো বিস্ফোরণ! পরেরটা রিমি নিজে ছাড়া আর কেউ-ই টের পেল না আপাতত। পুপু-মোনা আর-এক দফা ঝামেলা করলেই টের পেতে পারে। সংসার বড় গোলমেলে, এখানে একটা টেনশান আর-একটার ঘাড়ে এসে পড়ে।
ছাতা-হাতেই গটগট করে বেরিয়ে গেলেন প্রবীরবাবু। কিছুটা হেঁটে যশোহর রোড, আর-একটু হাঁটলেই ব্যাংক।
যেতে-যেতে ডানদিকের প্রাইমারি স্কুলটি দেখে থমকালেন! এখনও স্বশরীরে আছে, শুধু উঠে গেছে পড়ানো— সেই ঘোষণাও হয়ে গেছে কিছুদিন আগেই। দুজন শিক্ষক যাও বা ছিলেন, তাঁরাও উঠে চলে গেলেন অন্য স্কুলে। এভাবেই তো সব উঠে যায়। বাংলা উঠে হিন্দি, হিন্দি উঠে ইংরেজি। এই যেমন পুপু এখন বাংলা প্রায় বলেই না, বলে হিন্দি, বলে ইংরেজি। কার্টুন দেখেই কিছুটা শিখেছে। বাকিটা স্কুলে। শহরে বাংলা মাধ্যমের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তেমন আর চাহিদা নেই। তাই এক-এক করে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। কেবল যাঁদের বাপ-মায়ের সামর্থ নেই, তাঁরাই এখনও বাঁচিয়ে রেখেছে এইসব স্কুল, এমনকী তাঁদের শিক্ষক-শিক্ষিকাদেরও। এরপর শহর জুরে শিশুরা হিন্দিতে কথা বলবে, ইংরেজিতে কথা বলবে। মাতৃভাষা ধ্বংসের নীরব বিস্ফোরণ মগজে-মগজে! মোনাও একাদশে উঠে একদমই স্কুলে যায় না। মাঝে-মাঝে যেদিন প্রাকটিক্যাল পিরিওড থাকে, সেদিন যায়। তবে না-গেলেও হয়। দশম শ্রেণির শুরু থেকেই এই অসুখ লাগে শহরের বড় স্কুলে। ‘যাব কেন? ওই সময় প্রাইভেট পড়া থাকে যে। স্কুলে থেকে যদি প্রাইভেটে বেশি পাই, কেন যাব স্কুলে?’ মোনা তো মাকে সরাসরি এমনই বলে। মোনার বাবাও মোনার সঙ্গে সুর মেলায়।
‘মিলে সুর মেরা তুমহারা…’ ইউ টিউবে অতীত বেজে ওঠে।
তাহলে এই স্কুলগুলির কী হবে? ইংরেজ আমলেও তো এমন দশা কখনও হয়নি। ভাবতে-ভাবতে এগিয়ে চলেন বৃদ্ধ। দু-পাশে শতাব্দী-প্রাচীন শিরীষগাছ ঘিরে আছে রাস্তা। কয়েকটি কাটা হয়েছে। বাকিদেরও কাটা হবে। রাস্তা চওড়া হবে। সাধের গাছগুলোও উঠে যাচ্ছে। মুছে যাচ্ছে তাদের ছায়াঘেরা ইতিহাসও। ভেতরে ভেতরে বৃদ্ধের কান্না পেয়ে যায় ভীষণ!
ব্যাংক থেকে ফেরার সময় আর-একবার দেখে নিলেন স্কুলটা।
স্কুলটা ছিল। আর বেঁচে ছিল তাঁর বাবার স্মৃতি, হৃদয়ে, যেন আজও নিত্যানন্দ বিশ্বাস ছুটে যাচ্ছেন স্কুলে, অথচ তিনি এ-স্কুলের শিক্ষক নন, সারাজীবন কেবল প্রক্সি দিয়ে গেলেন দেশের লোক অপূর্ব বিশ্বাসের পরিবর্তে।
অপূর্ব বিশ্বাস ছিলেন এ-তল্লাটের এক আরামদায়ক ধূর্ত। জমিজরিপের কাজ করতেন। নয়-ছয়ে ওস্তাদ। এই করেই মুনাফা লোটে প্রচুর। স্বাধীনতা-সংগ্রামীর একটা সার্টিফিকেট জোগাড় করতেও অসুবিধে হয়নি, এমনই শক্ত ছিল তার যোগাযোগশিল্প। মাইনে তুলেছেন স্কুলে না-গিয়েই। টাকা তুলেছেন সারাদিন রেজিস্ট্রি অফিসে পড়ে থেকে, জমিজরিপ করে। আর অবসরের পর স্কুলে পড়ানোর জন্য ও স্বাধীনতা-সংগ্রামের জন্য ডাবল-ডোজের পেনশান তুলেছেন। পায়ের উপর পা তুলে মক্কেলের দোকান থেকে বিনিপয়সায় খেয়েছেন ডাবল-ডিমের পোচ। নিয়েছেন আরও অনেক সুযোগ-সুবিধা। তার পরিবর্তে প্রক্সি দেবার জন্য নিত্যানন্দ বিশ্বাস-কে সামান্য কিছু তুলে দিয়েছেন হাতে।
সামান্যই! তাতে কি আর চলে? ফলে টুউশানি করতে হয়। ছুটে যেতে হয় এবাড়ি-সেবাড়ি। কাপড়ের বড় ব্যবসা, দেড়শো বিঘে জমি— সব ফেলে এদেশের রিফিউজি পাড়ায়! আগুনের পরদা টাঙিয়ে রাখা সভ্যতায় এভাবেই মাটি ছেড়ে আসতে হয় অন্যের মাটিতে। কয়েকবার ভেবেছেন, ফিরে যাই দেশে, কিন্তু দ্বিতীয়বার দোকান-ডাকাতির কথা মনে পড়তেই ভাবেন— আর না, নিজের জীবনটা যা ছিঁড়ে যাবার গেছে, ছেলেরটা যেন না যায়।
সেই স্কুল। প্রবীরবাবুও তো পড়েছেন এখানেই। বাবার হাত ধরে এসেছেন। চটের আসনে বসেছেন। স্কুল তখন দরমার বেড়ার, জিয়লের খুঁটির, টালির। পেছনে চাষের মাঠে গোরু চড়ে বেড়ায় তখন। বেয়াদব বলদগুলো মুখ বাড়িয়ে জিয়লের কচিডাল ভেঙে খেতে চায়। তাদের আক্রমণে বেড়ায় বড় বড় জানলা তৈরি হয়ে যায় একরকম। এখান থেকেই নিজেকে প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম করে নেন ছোট্ট প্রবীর। বাবাকে নিয়ে স্কুলে মোট তিনজন মাস্টারমশাই। শ-তিনেক ছাত্রছাত্রী। বড়মাস্টার নিত্যানন্দ বিশ্বাস বড়ই প্রিয় তাঁদের।
কী মনে হল, যশোর রোড থেকে স্কুলের সামনে এগিয়ে এলেন আজ। স্কুলমাঠে একটা বাঁকা বাঁশ এখনও পোতা। এই বাঁশের মাথাতেই একটা জাতীয় পতাকা গতকাল পতপত করছিল।
বাঁকা বাঁশ? নিত্যানন্দবাবু দেখলেই ক্ষেপে যেতেন! তক্ষুণি সেটি উপড়ে ফেলে নিজের হাতেই পুতে ফেলতেন আর-একটি বাঁশ, তাঁর মতোই ঋজু।
একদিন গোপালগঞ্জের ইন্দুহাটিতে ঘোড়ায় করে ফিরছিলেন ঋজু মানুষটি। ডোলান্ডসাহেব এক গরীব চাষাকে চাবুক দিয়ে অকারণে পেটালে ঘোড়ায় বসেই তাকে সপাটে লাথি মেরে ছিটকে ফেলে দেন। সেই থেকেই ইংরেজদের সঙ্গে তাঁর ঘোর শত্রুতা। বহুদিন তাঁকে পালিয়ে বেড়াতে হয়। পরিবারের প্রতি গ্রামের নিষ্পাপ মানুষজনের প্রতি চড়াও হলে এক রাতে ফাঁড়িতে আগুন লাগিয়ে দেন উনিশের নিত্যানন্দ। একদিন দেশ স্বাধীন হয়, দেশ ভাগ হয়, নতুন নাম হয় পাকিস্তান। নতুন দেশে নিত্যানন্দের কীর্তি ম্লান হয়ে আসে। যাদের জন্য লড়েছিল সে একদিন, তাদেরই কেউ-কেউ লুটেপুটে নেয় তাঁর-ই দোকান। জমিজমাও। দেশের লোকেরা একে-একে দেশত্যাগী হয়। তিনি ক্রমশ একা হয়ে পড়েন। আর-একদিন তিনিও মা-মরা ছেলের হাত ধরে পাড়ি দেন স্বপ্নের দেশে।
স্বপ্ন গোত্তা খাওয়া ঘুড়ির মতো উড়তে-উড়তে সুতো ছেড়ে বেরিয়ে যায়। পানাগড়ে উদ্বাস্তু ক্যাম্পে চার বছরের ভয়ংকর কষ্টের কথা ভাবলেই শিউরে ওঠেন প্রবীরবাবু। শেষে এই শহরে। তখন তো এ-শহর আর শহর ছিল না সেভাবে। স্কুলের চারিদিকের সবুজ দেশ এখন ইটের অরণ্য!
স্কুলের আশেপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে প্ল্যাস্টিক ও কাগজের তৈরি ছোট ছোট পতাকা, গতকাল ও পরশু সেগুলো হুড়িয়ে বিক্রি হচ্ছিল দোকানে। খুব সাজানো হয়েছিল চতুর্দিক। মালার মতো দড়িতে আঠা দিয়ে লাগিয়ে শেষে গাছে গাছে বেঁধে দেওয়া হয়েছিল বেশ। খুব গরমাগরম দেশপ্রেম, গানবাজনা, ‘মেরি দেশকি ধরতি সোনা উগলে’ থেকে লতার ‘বন্দে মাতরম’। আর আজ সেই প্ল্যাস্টিক ও কাগজের পতাকাগুলো দড়ি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে আছে এখানে-ওখানে। মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গেল প্রবীরবাবুর।
নিত্যানন্দ এখানেই হাঁটতেন। এখানেই হত প্রার্থনা-সংগীত। দেশপ্রেমে বুঁদ একজন মানুষ ছোটদের শেখাতেন দেশ কী, মাটি কী!
সেই স্কুল উঠে গেছে।
এলাকার ছেলেরা গতকালই জেবিএল বক্স বাজিয়ে ধুমধাম করে পালন করল স্বাধীনতা দিবস। বারো টিমের মিনি-গোল ফুটবল-নাইট হল এখানেই। রাতে হল ফিস্ট। ওদের কথা ছিল, ‘প্রত্যেকবারের ন্যায় এবারেও এখানে পতাকা উৎপোলন হবেই হবে!’
‘আরে উত্তোলন উত্তোলন!’
‘ওই হল, যে লাউ সেই কুমরো!’
হ্যাঁ, উত্তোলন হল। আর তারপর সব দেশপ্রেম পড়ে রইল ওইখানেই।
প্রবীরবাবু ঝুঁকে এক-এক করে সেগুলো নিজের থলেতে পুরতে লাগলেন। তুহিন পাগল এগিয়ে এসে কিছুক্ষণ চুপচাপ দেখছিল, এবারে সেও ঝুঁকে পড়ে একটা প্ল্যাস্টিকের ছোট্ট স্টিক লাগানো কাগজের তিরঙ্গা তুলে নিয়ে এক লাফে উঠে পড়ল প্রকাণ্ড এক শিরীষের মৃতদেহের উপর— যেন মনুমেন্টের মাথায় দাঁড়িয়ে আছে কেউ! বলল, ‘বন্ধুগণ, আমাদের নেতাজি বেঁচে আছেন, তিনি আজ বিকেলের সাব-মেরিনে ফিরে আসছেন…বন্ধুগণ…’
খালি গা। পরনে ছেঁড়া বারমুডা। পিচকালো শরীর। ছাঁটা চুল। উগান্ডা থেকে এসেছে যেন!
তা এখানে কেন? আবার বাংলা বলে, নেতাজি বলে, সাব-মেরিন বলে, বন্ধুগণ বলে!
কী কাণ্ড, সাহস তো মন্দ নয়!
বাঙালিরা এমন হয় নাকি রে বাবা?
বাঙালি এখন ফর্সা হবার ক্রিম মাখে, শপিংমলে যায়, হিন্দি-ইংরেজি বলে।
কেউ ধুতি পরে শপিংমলে এলে বাঙালি সিকুরিটি-গার্ডেরা তাকেই আগে আটকায়!
‘আচ্ছা আদমি হে তুহিন পাগলা! তু আদমি ইয়া পায়জামা?’ ইউ টিউবে বাজে। কারা হেসে ওঠে?
রাস্তার লোকগুলো তুহিনকে দেখে হাসে। একজনের হাতে দামী চিনা সেট, চিনা টোটোয় চড়ে তখনও বসে, ভিড়ের উদ্দেশে বলল, ‘বিস্ফোরক বেঁধে এঁকে চিনে পাঠিয়ে দিন, চিন উড়ে যাক, বড্ড বেড়েছে গেঁড়েগুলো!’ লোকজন সেখানে বসেই আলোচোনা করতে থাকে চিনকে কীভাবে উচিত শিক্ষা দেওয়া যায়।
প্রবীরবাবু এক-এক করে কুড়িয়ে ব্যাগে ভরলেন সব পতাকাগুলো। এভাবে পড়ে থাকতে দেওয়া যায় না। কিন্তু এত পতাকা কোথায় রাখবেন? মাটির নীচে পুঁতে দেবেন? প্লাস্টিকগুলো মিশে যাবে তো মাটিতে?
এদিকে তুহিন মৃত শিরীষের পেট থেকে ইয়া লাফ মেরে একটা চটের বস্তা জোগাড় করে আনে কোথা থেকে কে জানে। প্রবীরবাবুর মতো সেও তাতে পুরতে থাকে পতাকাগুলো।
শুধু এখানে নয়, গোটা শহরে ছড়িয়ে আছে পতাকা। আবর্জনা ঘেঁটে-ঘেঁটে পতাকা কুড়োতে থাকে তুহিন। এখানে-ওখানে কুড়িয়ে-কুড়িয়ে বস্তা ভরে গেছে তাঁর। কুকুর ঘেউ-ঘেউ করে, কার্বাইড-পাকা ছেলেপুলেরা ঢিল মারে, তবু সে অনড়। একটাও পতাকা মাটিতে পড়ে থাকবে না। ‘বন্ধুগণ, আমাদের নেতাজি বেঁচে আছেন, তিনি আজ বিকেলের সাব-মেরিনে ফিরে আসছেন…বন্ধুগণ…’
এক বাড়ির পাঁচিলের মধ্যে পড়ে আছে কয়েকটি পতাকা। গতকাল এখানে শহরের বাবুরা আলাদা করে স্বাধীনতা উৎযাপন করেছেন। সে রাস্তা থেকেই দেখতে পায় আবর্জনা, পাঁচিলের গায়ে। সেগুলো কুড়িয়ে বস্তায় পোরে। এরপর কী খেয়াল হয়, পাঁচিলে উঠে দেখে, ভেতরে পড়ে আছে আরও কিছু। সেগুলো কুড়োতেই বস্তা সমেত ভেতরে দিল লাফ! অমনি হইহই কাণ্ড পড়ে গেল চতুর্দিকে। দুজন সিকুরিটি-গার্ড ছুটে এল। বাড়ির লোকজন চলে এল। চারপাশের লোকজন চলে এল। তুহিন-কে ধরা হল, বাঁধা হল খুঁটির সঙ্গে।
‘ব্যাটা চোর। মার মার…!’
বিকেলে আবার টিভিটা অন করলেন প্রবীরবাবু। পুপু আঁকায়, মোনা নাচে। রিমি মোবাইল হাতে পাশের ঘরে খুটখুট করে চলেছে। টিভি এখন খবরের চ্যানেলে।
টিভির পরদা জুড়ে একজন মাটিতে পড়ে আছে। তাকে ঘিরে কয়েকশো লোক, পুলিশও। দৃশ্যটি এই শহরের— ক্যাপশানে তেমনই লেখা। পড়ে থাকা লোকটির সারা শরীরে আঘাত আর রক্ত। তার ব্যাগ সার্চ করা হবে।
‘ব্যাগ নয়, চটের বস্তা।’
কেউ বলছে, ‘ব্যাটা ব্যাংক ডাকাতি করে পালাচ্ছিল। প্রচুর টাকা বস্তায়। খুলে দেখুন, পাবেন!’
কেউ বলছে, ‘দাদা, অস্ত্রও হতে পারে!’
কেউ একজন বলল, ‘ওকে কাগজের পতাকা চুরি করতে দেখা গেছে পাঁচিলের এপাশ থেকে, অতএব পাকিস্তানের এজেন্ট হতে পারে। আমাদের স্বাধীনতা চুরি করতে এসেছিল।’
স্বাধীনতা চুরি? এতই সস্থা? আমরা এখন চিনকে টক্কর দিই।
একজন পুলিশ বস্তায় হাত দিতে গেলেই আর-একজন পুলিশ চেঁচিয়ে ওঠে, ‘আরে বম্ব-টম্ব তো হতে পারে!’ শুনেই প্রথম পুলিশটি বারো হাত পিছিয়ে এসে ঠক্ঠক্ করে কাঁপতে থাকে!
সবাইকে সাবধান করে দিচ্ছে পুলিশ।
‘দু-ঘণ্টার মধ্যেই কলকাতা থেকে বম্ব-স্কোয়াড আসছে। তারাই দেখবে সবকিছু। এখন একটা ছোট্ট বিরতি। সঙ্গে থাকুন।’ টিভিতে খবর।
বিরতিতে যাবার আগে পরদায় দিল্লি-বিস্ফোরণের ছবি আর শব্দটা ভেসে ওঠে। শব্দটা টিভি ছাড়িয়ে ক্রমশ সারা শরীরে দূষিত রক্তের মতো ঢুকতে চায়।
প্রবীরবাবু ইনসুলিনের সিরিঞ্জটা নেবার জন্য টেবিলে হাত বাড়িয়ে দেন।
ঈশ্বরফুল
বিভাস রায়চৌধুরী
পর্ব-১২
মা দুগ্গা
তখন রেডিয়োর যুগ। বর্ষার জলে টইটম্বুর দিঘির পাড়ে দুধসাদা কাশফুল উঁকি দিলেই মন আনন্দে নেচে উঠত। স্কুলে যাওয়ার পথে সেই দৃশ্য চোখে পড়তেই চোখে চোখে কথা হয়ে যেত আমার আর ভাইয়ের। মানে পুজো আসছে। গরিব রিফিউজির ছেলে। পুজো মানে আমাদের কাছে নতুন জামাপ্যান্ট পাওয়ার আনন্দ। বছরে ওই একবারই। বাবা-মা বিড়িশ্রমিক। বাবা পিডব্লুডি-র মাটিকাটার কাজ, কাঠের সেতু সারানোর কাজও করতেন সামান্য টাকায়। সন্ধেবেলা মতিগঞ্জের কারখানায় বিড়ি বাঁধতেন। রাতে যখন ফিরতেন আমরা থাকতাম ঘুমের দেশে। মনে হয় কাশফুল আমাদের আনন্দ ও আশা দিলেও বাবা-মাকে দিত অভাবজনিত অশান্তি।
আমরা সেই বয়সে এসব বুঝতাম না। দুই ভাই ভোরবেলা শিউলি কুড়োতে উঠতাম। পুকুর থেকে মা’র জন্য তুলে আনতাম শাপলা। আমরা শাপলাকে বলতাম, নাল। নালের লম্বা ডাঁটির সুন্দর তরকারি হত। এই সময় মা’র মেজাজ থাকত খারাপ। আমরা মাকে খুশি রাখার চেষ্টা করতাম। তার মধ্যেই ঝগড়া লেগে যেত মা-বাবার। দুই ভাই এত্তটুকু বোনকে কোলে নিয়ে কদম গাছ, তেঁতুল গাছ পেরিয়ে বড় মাঠের কাছে পালাতাম। ওখানে দাঁড়ালেই মনে ফিরে আসত আবার চাপা আনন্দের রিনরিন। মস্ত আকাশে তুলোমেঘ ভাসছে। ওই মেঘের ওপার থেকে মা দুগ্গা আসবে আর আমরা নতুন জামা-কাপড় পাব, জুতো পাব। বোন এখনো পারবে না, আমরা দুই ভাই ঘুরে বেড়াব কলেজপাড়া, দীনবন্ধু নগর, স্বামীজি পাড়ার প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে। ভাবনার মধ্যেই ভাই কর গুনে বলত, “দাদা, মহালয়া আর চারদিন!”
মহালয়ার ভোরে কলোনির সব ঝুপড়ি ঘরে রেডিয়োতে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের গলা। তড়াক করে উঠে পড়েছি দু’ভাই। মা-বাবাও খুশিমনে রেডিয়োর সামনে। বাইরে আকাশ ফরসা হবে। মা দুগ্গা আসছে। রওনা হয়ে গেছে। সকালে বাবা দিঘিতে তর্পণ করবে। আর বিকেলে আমাদের নিয়ে যাবে দোকানে। আজই পাব নতুন জামা। তর সইত না। বাবাকে খুব ভাল লাগত। সন্ধেয় ঘরে ফেরার পর হেরিকেনের আলোয় মা’র ঘেমে যাওয়া মুখ দেখে মনে হত আমাদের দুগ্গা।
সেই ছেলেবেলা, বাবা, মা, ভাই, বোন কেউ আর কাছে নেই। সীমান্ত শহরে জাঁকজমকপূর্ণ অগুন্তি পুজো হয় আজ। রাতে আলোর বন্যা। কাশ, কালকাসুন্দে খুঁজতে আরো নিঝুম গ্রামে যাই ছুটির দিনে। ইছামতী প্রায় মরেই গেল! পুজো এসেও আসে না যেন। কিন্তু বাড়ি ফিরে একদিন যেই শুনি মা নতুন পাঞ্জাবি পাঠিয়েছে, হুমড়ি খেয়ে পড়ি। নাক ডুবিয়ে দিই পাঞ্জাবিতে। সব ওখানে আছে। কাশফুলের শোভা, শিউলির গন্ধ, মা দুগ্গা—সব ফিরে আসে এক নিমেষে। দুচোখে বিন্দু বিন্দু জমে ভোরের শিশিরও।
এবার পুজো হবে? মহালয়ার আগে স্বাভাবিক হবে সব? বিশেষ খেয়াল করার ব্যাপার এই যে, নতুন জামা জুটবে না অধিকাংশ মানুষের, করোনার ভয়ে লকডাউন দেশের অর্থনীতি শেষ করে দিয়েছে, পুজোর সময় হয়তো সংক্রমণ সর্বোচ্চ পর্যায়ে, কিন্তু কাশফুল দুলবে মাঠে মাঠে… আকাশে ভাসবে পেঁজা তুলোর মেঘ… সকালের রোদ্দুরে থাকবে সোনা। অর্থাৎ প্রকৃতি থাকবে তার নিজের মেজাজে, মানুষ শুধু মৃত্যুভয়ে সেঁধোবে ঘরের কোণে!
হায় রে, স্বঘোষিত শ্রেষ্ঠ জীবের অহংকার!
ভাইকে মনে মনে বলি, “মা আমাদের অনেক বছর নতুন জামা দিয়েছে… এখন রুগ্ণ মাকে কী দেওয়া যায়? ঋণ শোধ করতে হবে না?”
ভাই যেন বলে, “আমরা তো মানুষ হতে পারিনি, দাদা! আমরা কী দেব? বাবা চলে যাওয়ার পর মা কোথ্থেকে কাশ এনে দুটো টবে লাগিয়েছে। একটার নাম দিয়েছে খুলনা, একটার নাম দিয়েছে যশোর।”
“ফুটেছে কাশ?”
“ফুটবে। যেদিন ফুটবে সেদিনই মহালয়া। মা পাবে নতুন কাশ রঙের শাড়ি। মা দুগ্গা!”
নমস্কারের মুদ্রায় কপালে হাত ঠেকিয়ে, দু’চোখে শ্রাবণ রেখে, আমি আধো স্বরে বললাম, “দুগ্গা দুগ্গা…”