আবহমান বাংলা ভাষা

দৈনিক

৮ আষাঢ় ১৪২৭

ছবি: PIXABAY থেকে সংগৃহীত

আলো বসু

মরণের পরে

ডাল ভাত চচ্চরি চুনোমাছ আর ভাত ঘুম

ভাত ঘুম জীবন দিয়ে লেখা পড়ছে না!

এর চেয়ে মরণ ভালো !

দৃষ্টি, হাটখোলা পলকে

        তোমার উদাস চাওয়া বহির্মুখী

হাওয়ায় উড়ছে  যা কিছু,

        ঠিকমত চাওয়া হল কি হল না

গিলে ফেলছ টপাটপ 

আলগা জীবন কতটুকুই বা লেখাতে পারে!

দৃষ্টি, তুমি ভেতরে নজর দাও, মরিয়া হয়ে চাও 

মরিয়া বলতে মরণ ঝাঁপ

সেখানেই তো স্রোতের কলস্বর,

ঢেউয়ের উথালপাথাল! ছন্দের ছড়রা!

স্থির থাকো জন্মের চাওয়ায়!

আমার হাত ধরে তুমি নিয়ে চল সখা!

   আঙুলে আঙুল জড়িয়ে আবার

টিপছাপ দেব কোনও নতুন কপালে।

বঙ্কিম কুমার বর্মন

দোসর

আড়চোখে লেগে থাকা পাহাড়ের ঘোড়া
ধ্বনির ডানায় সবই আলপথের দোসর

কে নেবে দায় আমাদের সুশ্রুত মিছিল
জমানো খুচরো পরিশ্রমের ডগায় 
দোল দেয় শিশুটির ফুরসৎ

যেহেতু ঘরভর্তি অজুহাত ভুরু কুঁচকে তাকায়
বুনতে থাকি ঘামের ললাটে প্রান্তরের যৌবন

ডুব খাওয়া সরল বাগানের —
ছিপছিপে বনেদি নালিশে গেঁথে দিই নৌকার ফুসফুস ।

পৌষালী চক্রবর্তী

অলৌকিক সওয়ারি

চোখ বেঁধে নেমে গেছে রাত 

পদ্মকোরক তুলি ডুব জলে

চিরাগ জ্বালছে ওই নয়নে তোমার

চিরচেনা নস্যাৎ করে দিয়ে।

 

এমন অমেয় এই ক্ষণ

কত ঋণ চাঁদটির কাছে

ধূলিমুঠো খুলে গেলে পর

দেখো, সবই জমা হয়ে আছে।

 

আদমসুমারি শেষে  

নারীমন চলে যাবে পদ্মের বিলে।

 

জোবায়ের মিলন

জগতের মা

নয়নে তারা নাই, বিক্ষত মাছের পোনা

মা- আমার গা ছুঁয়ে দেখেন বার বার

নিজেরে চুপি চুপি আয়নায় দেখেন

ভুলে-ভালে চলে এলে একটা কাশি

দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরেন ছলছল চোখে

যত বলি- দূরে যাও মা;

               মা ফালিফালি হোন তত!

জপমালা আর সজল বদনে

গোধূলির দিকে চেয়ে কার সাথে যেন, মা

কথা কন প্রতিক্ষণে, আর

আমার গতরে ফুঁ দেন বিড়বিড় করে;

আমি ভাবি- আহারে মা! জগতের মা।

লক্ষীন্দর বাউরী

নিজস্ব

মাঝে মাঝে থেমে যেতে ভালো লাগে

কলম থামিয়ে রেখে কল্পিত ভাবনা ওড়াই।

অদেখা শব্দজালে ধরে ফেলা পাখির মেজাজে

চুপচাপ বসে থাকি – ব্যাধের মতন।

 

তারপর কোলাহলে আসি…

বুকে জমা নীরবতা, ভীষণ উচ্চারণ-প্রিয় 

কত লোক, কত শোক, কত আলাপের মহড়াতে

আমাদের কেউ নেই – এ ভাবনা ভাবতে শিখিনি।

 

তাই মাঝে মাঝে থেমে যেতে হয়

আমরা যে আত্মপিয়াসী।

 

বারো পর্বের ধারাবাহিক

পাগলাঝোরা

জয়ন্ত দে

পর্ব-৭

গ্রাম শহর

আমার মামার বাড়ি ছিল হাওড়ার প্রত্যন্ত এক গ্রামে। ছোটবেলায় গ্রীষ্মের ছুটিতে মামার বাড়ি যেতাম। তখন একটা কথা উঠতে বসতে শুনতাম, ‘তোদের দেল টিপলে আলো, কল টিপলে জল’। ওদের চোখে এটাই ছিল আমাদের কলকাত্তাইয়া শহুরে জীবনের এক অসাধারণ যাপনচিত্র। তারপর শুনেছি, ‘ফুলু প্যান্টুবাবু’। শহরের ছেলেরা খুব ছোটবেলা থেকে ফুলপ্যান্ট পরে কিনা! ওরা যা বলে বলুক, আমি কিন্তু এসব নিয়ে একটা গর্ব অনুভব করতাম। 

আমার গর্বের বেলুন ফুটো করে দিতে, ওরা ডুবসাঁতার দিয়ে পুকুর পার হত, খপ করে জলে ভেতর হাত ডুবিয়ে মাছ ধরত, আর  সাপের লেজ ধরে বোঁ বোঁ ঘুরিয়ে ছেড়ে দিত শূন্যে। 

পাশের থেকে কেউ না কেউ আমাকে বলত—ওটা ঢেমনা। মানে বলতে চাইত, ঢেমনা সাপ বিষ নেই। 

আমি ‘ঢেমনা’ কথাটা জানতাম গালাগালি। চাল‌ওয়ালি মাসিরা হল্লাগাড়ির পুলিসদের বলত। আমি ‘শালা, বানচোত, মাইরি’ এগুলো দাঁড়ি কমার মতো বলতাম। আর যে-কোনও মিথ্যে কথাকে ‘মা কালীর দিব্যি’ দিয়ে সত্যি করে দিতাম। আমাদের পাশের বাড়ির বাসিন্দা ছিলেন মা কালী। তাই ‘মা কালী দিব্যি’ আমাদের পেটেন্ট নেওয়া ছিল। সবাই বিশ্বাসও করত।

সে-সময় বাঙাল-ঘটির মতো গ্রাম আর শহরের একটা টক্কর ছিল। তাই ওরা যখন ডুবসাঁতারে পুকুর পারাপার করত, আমি তখন ববি-র ডিম্পল কাপাডিয়ার জল থেকে উঠে আসার রোমহর্ষক ছবি শোনাচ্ছি। ওরা যখন কাদায় হাত ঢুকিয়ে কই মাছ তুলছে, আমি তখন পুলিশের কালো গাড়ি এসে নকশাল বাবলাদাকে তুলে নিয়ে যাওয়ার গল্প বলছি। ওরা যখন শূন্যে সাপ ভাসাচ্ছে, আমি তখন টুপি কাশীর হাতের সোডার বোতল কেমন পাক খেতে খেতে যায় তার দৃশ্য আঁকছি।

টিভি এসে, পরে ইন্টারনেট এসে, সবাইকে এক করে দিয়েছে। 

এখন জিনস পরে খেঁদি ছাগল চরাতে চরাতে ফেসবুকে কলকাতার কার্তিককে লেখে—মিস ইউ। আর শহুরে সরস্বতীরা বসন্ত পড়ল কি পড়ল না, পলাশের মা-মাসিকে এক করে সেজেগুজে ধিঙ্গি নাচ করে— আজি বসন্ত এসেছে দ্বারে…।

তবু তখন শহর আর গ্রামের টক্করে কোথাও কোথাও এক ছিল। যেমন খাবার জলে। গ্রামের টিউব‌ওয়েল আর আমাদের কালীঘাটের বাড়ির চাপা কলে। দু’জনের বুক থেকেই মধু পড়ত। টালার জলে কী স্বাদ! আয়লার পর থেকে এখন গ্রামের বেশিরভাগ টিউব‌ওয়েল দিয়ে নোনতা জল ওঠে। আর নয়তো আর্সেনিক। আর শহরের কলের জলের পিছনে মেশিন ফিট করতে হয়। ঠান্ডা না করলে সেই জল বিস্বাদ। এখন জল থেকে মালই মোক্ষ।

তখন গ্রামে সন্ধে হলে ঝুপ ঝুপ করে অন্ধকার নামত। বিকেল থেকে হ্যারিকেন পরিষ্কার হত। লম্ফ উসকে রাখত। শহরেও হত। লোডশেডিং। পড়াশোনা থেকে মুক্তি। ঘরের উঠোন পেরিয়ে পাড়ার রকে। ছোটদের রকে মজিদ তো বড়দের রকে মাল-বাজারের মা মালতী! দাদাদের রকের চিঠি অন্ধকারেও ঠিক পথ চিনত। ভাল মেয়েরা ভাবছে দেবুদার মতো বর হবে। ডেঁপো ছেলেরা জানে লোডশেডিং শেষ হলে বউদি চানের ঘরে— কী সুখ, কী সুখ জলের!

আজ শুনছি, অনেকদিন পরে গ্রাম শহর এক করে অন্ধকার হবে। হোক। আজ নয় দেল টিপে অন্ধকারই নামবে। গোনা টাইম! বুঝি শুধু শরীর আছে, মন নেই। রক নেই, চিঠি নেই, আরও কী সব, কী সব যেন নেই।  

তবে টক্কর আছে। জাত নিয়ে। 

ঘেন্না লাগে। মাঝে মাঝে ভাবি, এত বিষ জমে ছিল বুকে! 

ছবি: PIXABAY থেকে সংগৃহীত

বিগত দিনগুলি পড়ুন