আবহমান বাংলা ভাষা

দৈনিক

৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

ছবি: চন্দন মিশ্র

সমীরণ ঘোষ

অপেক্ষা

 

বরফ-শূন্য থেকে আমাদের চূর্ণভাঙা স্লেজ কবে 

যে ফিরবে, বলো বলো

আমাদের তুষারদগ্ধ স্লেজ আদৌ ফিরবে

একবার বলো

 

মেরু-হায়েনার হাসি হিমানীজমাট, ক্লান্তিকর শুধুই ঝরছে

প্রেতগাছ শিস দিচ্ছে ঘুমস্তব্ধ তীব্র ইশারায়

 

আর কোনো সম্ভাবনার রেখা তুমি কি দেখছ মেরুগ্রামে

 

আমাদের স্মৃতিভ্রষ্ট স্লেজ উষ্ণগরম পায়ে

ফিরবে কি লুপ্ত নিশানায়

ছবি: চন্দন মিশ্র

অপরাজিতা ভট্টাচার্য

দেখো যেন

 

আমি শুধু বলেছিলাম,

তোমার আমার মধ্যে খুলে যাচ্ছে কিছু কুঁড়ি,

তুচ্ছ সে-সব ফুল চিনেছে আমাদের,

ভালবাসা ছাড়া সে সব ফুল ফোটে না।

তোমার আমার মধ্যে খুলে যাচ্ছে বাংলা ভাষা, 

যে ভাষায় বিনা কসরতে বলতে পারি

হাঁটছি আমি, হাঁটছ তুমি, চেষ্টাটুকু মাঝে

আমি দেবী নই, নই ফিঙে, দোয়েলও

নিতান্ত নগণ্য তবু বলেছিলাম 

দেখো যেন অভাবেও চুমু খেতে পারি। 

ছবি: চন্দন মিশ্র

পার্বতী রায়

একদিন

 

তোমাকে মনে রেখেছি।  মনে রাখাটাই সব। এখন আর ব্যস্ত নয় শহর। ট্রাফিকের চিৎকার নেই।

শান্ত হয়ে বসে আছে পার্ক। চোখের নিচে নদী। 

জানি, ভুলে যাবে একদিন। ভুলে যাবে দেখা হয়েছিল!

প্রতিটি মানুষের জন্য শুভেচ্ছা জানাচ্ছে  গাছ। তোমার স্মৃতির থেকে খুলে পড়ছে এক একটি নক্ষত্রের শহর।

একদিন ভুলে যাব ভাইরাস , ভুলে যাব এইসব মৃত্যু নিয়ে লেখা কবিতা গুচ্ছ ।

 

ছবি: চন্দন মিশ্র

জামিল রায়হান

স্বপ্নে জাগরণে

 

ভাত ভাজা ভোর লেগে আছে ঠোঁটে,
বৃষ্টিতে ধুয়ে গেছে স্বপ্নের ঘুম, পুরোটা আকাশ আজ রোদের দখলে,
বুকের মধ্যিখানে ভেজা কাক ডাকে।
 
ছিলেই তো সারারাত বুকের বোতামে,আলুথালু কেশ,
অবারিত মাঠ শিশু আহ্লাদে আনন্দ অধীর,
জলের সোহাগ মেখে গা জুড়ায় গাছের পাতারা।
 
কত কী যে ঘটে যায় নির্বিরোধী ঘুমে, স্বপ্নের পাতা ঝরে
অলিখিত ঝড়ে, মৃতেরা জীবন পায় ক্ষণিকের চুমে,
আয়ুহীন এ জীবন  শুধু ছুঁয়ে যাওয়া।
 
ভোর আসে ম্রিয়মাণ, কাকে ভালবেসে?
ভেজা কাক ঝুলে থাকে ছেঁড়া তারে, ভাঙা কার্ণিশে।

ছবি: চন্দন মিশ্র

কাজী নিজামুদ্দিন

নদীর জন্য

 

আমার উত্তরাধিকার ছিল যে নদী 

যে নামে প্রিয় নদীটিকে ডেকেছি

সে নাম তো আমি ভেলায় চড়িয়ে

তোমার দেশে পাঠিয়েছি বহুযুগ আগে।

 

আমাকে নদীর নামে ডেকেছিল পাখি

প্রথম আলোয় সে নাম জেনেছিল সূর্য 

আমার নদীজন্মের ঋণ শোধ হল না

পাড় ভেঙে  তাই তোমার কাছে যেতে চাই।

 

পাহাড়ের কোলে বরফের নীচে যে নদী 

সে নদী আমায় কোলে তুলে নিয়েছিল

সেই ই আমায় শিখিয়েছিল স্রোতের ভাষা

দুরন্ত মাছরাঙা এক সেই কন্ঠ  তোমায় দেবে।

 

আমি আবার এই ঘরে বসে একা একা

নিজেকে আবিষ্কার করেছি নতুন রূপে

তোমার দেওয়া নদী নাম সব লিখে দেব

নদীতীরে সভ্যতার আসরে শান্তি লিখে দেব।

 

নদী তীরে গ্রামে গ্রামে সবুজ কবিতা লিখে দেব

নদী তীরে মানুষ পশু  পাখির আরোগ্য লিখে দেব

তখন  আবার আমায় চেনা নদী নামে ডেকে নিও।

 

 

কবি নির্মল হালদারের চোখে করোনা-র দিনগুলি

নির্মল হালদার

পৃথিবী গ্রহের পুরুলিয়া

পর্ব-২৫

 

শুনা পাছি নাই জোরে বল্। তর মা সিধাছে কবকে আসবি? তর কুমপানি যদি ছাড়েই দিলো, ঘরকে পাঠাতে নাই পারল রে? গাঁয়ের কত্ গুলা এসেছে গুজরাট থেকে। আর তুই আলি নাই। তর মাঈ আর আমি রাস্তার দিকে ভেলে আছি, এই আলি তুই এই—ভেলে ভেলেই দিন শেষায়। বেলা ডুবে গেল। তর মাঈ কেঁদে কেঁদে রাঁধনা ঘর ভুলে গেছে। বেশিরভাগ দিন দুজনেই খাছি নাই। তর বউ আর ব্যাটাকে পাঠাই দিলম উয়ার বাপের ঘর। ইখানে থাকলে শুধু কাঁদনা। হামদের লাতি ত অত নাই বুজে। উ বেচারি মায়ের দুধও পাছে নাই। হঁ শুনা পাছি টুকু টুকু। তুই বল  কবকে আসবি? কবকে? তর মাঈ-এর মনটা থিরাবেক। আমি তর বাপ হয়েও বুকে পাথর লিয়েছি। তর মা ত মেয়ালোক, মনটা বড় লরম। উ নাই পাছে। দিনভর লোর পড়েই যাছে। এখন তর মাঈয়ে বলছে, তকে অতনা ধুর্ না-পাঠালেই ভাল হতো। হামদের সরকারকেই বা কি, তদেরকে কিছু সুবিসথা করে দিল নাই। হ্যাঁরে ধনা কুমপানি দু’বেলা খাতে দিছে ত? আজ কী খালি ব্যাটা? ধনা এ ধনা মনে হছে, বন্ধ হয়ে গেলো ফোনটা। একদম শুনা পাছি নাই। ইখানে ঝড়-জল রোজেই, লাইট বন্ধ হয়ে যাছে। ফোন কেটে যাছে বারবার। হঁ হঁ ইবার শব্দ আসছে, শুন্ ধনা, চলে চলে আসবি নাই বাপ আমার। কত কি শুনছি, মন থির নাই থাকছে। তর মাঈয়ে কি বলছিল জানিস, টাকা টাকা আর করব নাই—দরকার নাই টাকার, হামার ঘরের ছেলা ঘরে আসুক। হঁ বাপ তুই যত চাঁড়ে পারবি চলে আয়। ইবার এলে, তকে আর নাই পাঠাব। অমন কাম কাজের দরকার নাই। দরকার নাই। ধনারে তুই হামদের বুকের ধন। আয় বাপ বুকে আয়। এখনি মরলে মুয়ে জল দিবার কেউ নাইরে। তুই ত হামদের একটাই—হঁ হঁ রাখ—রেতে খাঁয়ে লিবি তা বাদে বহুকেও ফোন করবি। উয়ত তর রাস্তার দিকে ভেলে আছে। বাপরে—চেষ্টা কর, ধরাধরি করলে যদি আসা যায়, তাইলে কাউকে ধরাধরি কর্। তর ব্যাটার মুখটা মনে কর বাপ মনে কর্—

তর মাঈ বাপের মুখটাও মনে রাখ।

 

৩১ বৈশাখ, ১৪২৭

 

 

আলোকচিত্র: অমিত কুমার বিশ্বাস

কবিতা আশ্রম পরিবারের কবি প্রণাম

কবিতা আশ্রম আয়োজিত কবিতা পাঠ

অফুরন্ত বাংলা কবিতা

সুবোধ সরকারের কবিতা