দৈনিক কবিতা আশ্রম, ৯ আষাঢ় ১৪২৭
আবহমান বাংলা ভাষা
দৈনিক
৯ আষাঢ় ১৪২৭
ছবি: PIXABAY থেকে সংগৃহীত
অরণ্যা সরকার
বর্ষারং ‘না’-গুলো
এ বছর কদম দেখিনি। গন্ধ এসেছিল। নিরীহ প্রস্তাব নিয়ে বসে ছিল কৌশলের কিনারে। জলকাচা আকাশ তখন নরম পর্দায়। সাদা ঘর। পুরোনো জট খুলে ছড়িয়ে পড়ছে পূর্বস্মৃতি। বিগত বৃষ্টির গন্ধে ঢুকে গেল ভেজা কদম। বর্ষা স্মারকে থৈ থৈ তাকের জ্যামিতি। সংকলনে সজল হাঙ্গামা। প্রতিদিন বদলে যায় স্নান, ভঙ্গিমা। লক্ষ্যসিদ্ধির পর যেমন অপ্সরার ফিরে যাওয়া তেমনি কিছু বিদায় দৃশ্যের মায়াটুকুই সম্বল। দোলনচাঁপারা জানে ডেটল জলে ভেজানো আছে আমাদের বর্ষাকাল। জিটি রোডে মানুষের শুকনো রক্তের পাশে থ্যাতলানো কদম দেখে ঘরে ফিরি। সাদা ঘর। জলকাচা আকাশ। আরও রহস্যময় এই অন্ধকার খামচে ঝুলে থাকা। পূর্বাভাস ছিল, তবু কেন যে—
কুমারেশ তেওয়ারী
আবিষ্কার
আস্ত এক মরুভূমি নিয়ে ঘোরো ফেরো
যার কোনও পাখি নেই, চোখের পলক
উটের বেগার খাটা ভ্রম শুধু
আশরীর এঁকে রাখে ক্যারাভান প্রথা
কুঁজের ভেতরে রাখা পিপাসার জল
নিজেও জানো না কীভাবে তা পেড়ে নিতে হয়
মাঝে মাঝে জ্যোৎস্নার আলো তবু শরীরে ছড়ালে
ভেতরে ভেতরে কে যে গেয়ে ওঠে সামগান
তখন কি খুব লবণাক্ত হও?
নিজেকে হঠাৎ করে ফিরে পেয়ে
মগ্ন হও বশিষ্ঠ-অরুন্ধতীর পাঠে?
জেগে ওঠে অন্তরালে সেতু?
সেতু বেয়ে কে আসে কে আসে
সে কি ফুল্লরার কালকেতু?
দুর্গা দত্ত
ধানে কাপাসে
তুই তো হেঁটেই যাবি বাপ !
রোদে পুড়ে জলে ভিজে
ধুঁকে ধুঁকে শ্বাস টেনে টেনে
কোলে কাঁখে আমাদের হাড়গোড়
পোঁটলায় বেঁধে ছেঁদে
ভাতের গন্ধের খোঁজে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে রোজ
তুই তো হেঁটেই যাবি বাপ!
দিনে রাতে বাদলে ধরনে শীতে
প্রতি পদক্ষেপে
মেপে নিয়েছি আমাদের প্রতি ইঞ্চি মাটি—
আমাদের দেশে বাপ কাঁটাঝোপ, কাদাজল,
শুকনো বালির ঢেউ, শেয়াল-শুকনির লাফঝাঁপ—
আমাদের ঘামে বাপ নুন নাই,
হাড়গুঁড়া শুধু।
আমাদের গায়ে বিষ পিঁপড়ের বাসা।
শুকনো খড়ির দাগ ফাটা ফাটা
বাকলের খাঁজে রক্তটক্ত নাই বাপ!
টলটলে ছানাকাটা জল।
আমরা তো মরে যাই বাপ
প্রতিদিন মোচ্ছব ফুরালে!
শুকনো পুকুরপাড়ে
আমরাই বাজপড়া তালগাছ বাপ!
ইঁদকুড়ির মাঠে যেমন ইঁদকাঠ বছর বছর
মাঠ জুড়ে পড়ে থাকে বোবা হট্টরোল—
তুই তো জানিস বাপ ইঁদপরবের গান!
গা, তবে গা বাপ! গলা ছিঁড়ে গা!
ডাক, তবে ডাক বাপ! জিভ ছিঁড়ে ডাক!
মেঘের ভিতর থেকে আমাদের
আগুনের ফলা করে
ঘরে ঘরে ছুঁড়ে দিক জীমূতবাহন!
মাহমুদ নোমান
ক্ষমা করে দিও
ক্ষমা করে দিও
আমার মতো কাউকে
যে হাঁটতে হাঁটতে…
চৈত্রের রোদে বৃন্তচ্যূত মরিচ,
তলঁয়ের মাটি লেপা বুকে
নাড়িয়ে চাড়িয়ে দিচ্ছ,
টুকটুকে লালের রক্ত
কতকাল,
বটগাছে বোষ্টমীর
জড়ানো থামি-
গোপন বিলটার কাছে,
অমরণী ফুলে ফুলে
জৈব ভাইরাস-
জমিয়ে রেখেছিল কয়েক পদের চুমু
তলিয়ে গেছে ভ্রূ কুঁচকে
শামুকে কাটা,
বাঁয়ে চলা একটা নদী
যতটা জোয়ানকি জল;
তোমরা বুদবুদ দেখেছ
খুঁজে দেখোনি কার দীর্ঘশ্বাস
আগেই ছিল
ধেয়ে ধেয়ে আসছে
ঠোঁট দেখে চোট পাবে
চুমুর মাঠে ভীষণ খরা
ত্রস্ত সমস্ত পারমাণবিক আগ্নেয়াস্ত্র …
পাগলাঝোরা
জয়ন্ত দে
পর্ব-৮
শ্রমিক
‘মে ডে’। লিখতে ইচ্ছে করল। তেমন গূঢ় কোনও কথা নয়, আর বলবই বা কী করে। অল্প বয়সে মে দিবসে জন হেনরি থেকে ‘প্রিয় ফুল খেলবার দিন নয় অদ্য’ বলে প্যাঁ প্যাঁ করেছি। সেদিন বগলে পাউডার দেওয়া হাফগেরস্থ কুচো নেতাদের দিকে কেমন ঘেন্না ঘেন্না চোখে তাকিয়েছি আর নিজের গায়ের ঘেমো গন্ধ, পিঠে আটকে যাওয়া পাঞ্জাবিতে শিহরিত হয়েছি।
পরবর্তীতে শ্রমিক হয়েছি, কিন্তু সেটা হোয়াইট কলার। অগ্রজদের দেখে কাজের সঙ্গে শিখেছি চাটুকারিতা, ধান্দাবাজি ও ঢ্যামনামি। দু’-একজন ছাড়া কেউ প্রায় বলেননি—লড়াই করো।
অথচ এই আমিই গলার শির ফুলিয়ে মিছিলে শ্লোগান দিয়েছিলাম একদিন— লড়াই লড়াই লড়াই চাই, লড়াই করে বাঁচতে চাই।
তখন সে শ্লোগানের মানে বুঝিনি।
আমি দেশভাগ দেখিনি, যুদ্ধ দেখিনি, মন্বন্তর দেখিনি, দাঙ্গা দেখিনি। বন্যা খরা কখনও সেভাবে ব্যক্তিজীবনে আঁচড় কাটেনি। এখন যেটুক দেখছি, তা মহামারী। আর যা গৌরব অর্জন করেছি তা দারিদ্র্য।
সেই গরিবিয়ানা নিয়েই আর-পাঁচজনের সঙ্গে কম্পিটিশনে নেমেছি।
একজন যদি বলে, ছেলেবেলায় আমাদের খুব কষ্টে কেটেছে, হাফ ডিম খেয়েছি; তো আর-একজন বলে, তোদের তবু ডিম জুটত, আমাদের আলুভাতে ভাত আর ঘি।
তবে সত্যি সত্যিই এমন এক পরিবার দেখেছি, যে বাড়ির গৃহকর্তা ক্রমশ অন্ধ হয়ে আসা এক শিল্পী। সারাদিন তাঁরা ভাত না পেয়ে এক চা-পাতাতেই বারবার করা লিকার চা খাচ্ছেন আর কবিতা ছবি গানে সেতারে মগ্ন হয়ে আছেন।
নিজেদের ভাত না জুটুক, মশাকে রক্ত জোগাত দেদার আর আমাদের হাসি ও অর্জুন হয়ে লক্ষ্য ভেদ করার মন্ত্র। সেই মানুষটিও নিজেকে শ্রমিক বলতেন, নিজের ভাবনার শ্রমিক, মর্জির শ্রমিক।
বলতেন— ভারতবর্ষের দুটো জাত, পাউরুটি আর ঝোলাগুড়। ধর্ম দুটো, চোর আর জোচ্চোর।
অনেক কথা বলতেন, যা সে সময় নিতে পারিনি, তাঁকে বুর্জোয়া বলে দাগিয়ে দিয়েছিলাম।
সমরেশ মজুমদার একটি ধারাবাহিকে তাঁর কথা এক কিস্তি লিখেছিলেন, পরে তাঁর চিঠি পেয়ে আরও অনেক কথা লেখেননি। বিমল করও বন্ধুদের কথায় তাঁর উল্লেখ করেছেন।
আর এই মানুষটিকে শেষদিনগুলোর অনেকটা সময় সারাদিন রাত দেখেছি। তিনি নিজেকে একজন শ্রমিক বলতেন, তবে সেটা আমার মতো হোয়াইট কলার শ্রমিক নয়, রঙিন গামছা পরা।
যদিও সেসময় আমি ভাবতাম, এত রঙিন হওয়া আসলে ব্যর্থতা আর দারিদ্র্যের হাড় জিরজিরে চেহারাকে চাপা দিতে বডিপেন্ট।
সেই রঙিন গামছা পরা শ্রমিকটিকে স্মরণ করলাম, কারণ সারা দেশের অগণিত শ্রমজীবী মানুষ যখন সাক্ষাৎ মৃত্যুমুখে, তখন ‘মে ডে’ এসেছে। আর আমরা গুমরে মরছি, বিড়বিড় করছি—এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না, এই মিথ্যাবাদীরা আমার নেতা নন, এই মিথ্যাভাষ্য আমার জাতীয় সংগীত নয়।