দৈনিক কবিতা আশ্রম, ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭
আবহমান বাংলা ভাষা
দৈনিক
৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭
ঝড়
ফেসবুক থেকে সংগৃহীত মন খারাপের অভিব্যক্তি
THE STORM,2020 by Binayakruku
বিনায়করুকু
প্রতিক্রিয়া
ঝড়ে রুকুর চোখ বড় হয়ে গিয়েছিল।
চোখের ভিতর একটা তারা যেন।
একটা বইয়ের কাগজ কেটে চোখটা করেছি।
নুন, উজালা, পেস্টের ঝড়। সাদা ঝড়, কালো ঝড়।
ঝড় থেমেও কি যেন পাক খাচ্ছে।
খালি ঝাঁট দিচ্ছি, যাচ্ছে না।
অজিত বাইরী
না, ভাল লাগছে না
না, ভাল লাগছে না
না, ভাল লাগছে না,
কিচ্ছু ভাল লাগছে না ।
এক আতঙ্ক কাটছে না, তার উপর
আর এক আতঙ্ক ঘাড়ে চড়ল।
গতরাতের ঝড়ে যে গাছগুলো
আছড়ে পড়েছে মাটিতে;
আমাদের পরিণতি কম-বেশি
তাদেরই মতো।
গতরাতে শুনেছি শুধু ঝড়ের গর্জন
আর ভেবেছি, ভয়াল জন্তুর
আক্রোশ থেকে
রক্ষা পাবে কি পৃথিবী ?
টিনের কৌটোর মতো দুমড়ে- মুচড়ে
গেছে বসতি।
সন্তান-সন্ততি নিয়ে আশ্রয়হীন মানুষ
অদৃষ্টের মুখাপেক্ষী, ছিন্নভিন্ন
হয়ে গেছে ছেঁড়া ত্রিপলের মতো।
বিদ্যুত নেই, পানীয়জলের অভাব–
এইসব ব্যক্তিগত অভিযোগ
আমাকে লজ্জিত, অপমানিত করে।
সামগ্রিক ধ্বংসের সামনে
অসহায় লাগে;
ক্ষতি কী কারুর একার?
না, ভাল লাগছে না,
কিচ্ছু ভাল লাগছে না ।
গৌরব চক্রবর্তী
কবিতা
এই কবিতায় রাজনীতি নেই, ভয়ভীতি নেই ন্যূনতম!
তোমার করা সব সমাধান, সব অপমান ন্যূনতম!
বাংলা বানান ভুল লিখেছ ভুলের বরাত প্রাপ্তিসম—
এসব ভুলে দু’হাত খুলে হাততালি হোক ন্যূনতম!
তোমার দয়ায় খাচ্ছি হুজুর আমরা মজুর ন্যূনতম!
এই সাইক্লোন বীভৎস নয় সামান্য ঝড়—ন্যূনতম!
ঘরবাড়ি তো ভাঙতে পারেই! কী আর এমন! ন্যূনতম!
ন্যূনতম হাওয়ার গতি, বৃষ্টি হল ন্যূনতম!
ন্যূনতম গাছ ভেঙেছে, কাচ ভেঙেছে ন্যূনতম!
ঘরের ভেতর জল ঢুকেছে ভাসছে মানুষ ন্যূনতম!
খাবার, দোকান, মশলাপাতি, সব্জি, আনাজ, যা ছিল সব
ভাঙতে ভাঙতে ছড়িয়ে যাচ্ছে গড়িয়ে যাচ্ছে ন্যূনতম!
রাস্তাঘাটে কাঁদছে যারা সর্বহারা ন্যূনতম!
কুকুরগুলো বিড়ালগুলো ছিন্নভিন্ন ন্যূনতম!
পাখির বাসা উড়ছে হাওয়ায়, উঠোন-দাওয়ায় প্রাণীর
শরীর… বাড়ির ওপর গাড়ির ওপর গাছ পড়েছে ন্যূনতম!
ন্যূনতম মাথার ওপর ছাদ ভেঙেছে ন্যূনতম!
ফসলগুলো নষ্ট হল, কষ্ট হল ন্যূনতম!
ন্যূনতম ভাগ্যদোষে অসন্তোষে ন্যূনতম
ক্ষয়ক্ষতি হয়, ভীমরতি হয়, শেষগতি হয় ন্যূনতম!
ন্যূনতম আম্ফানে স্যার তোমার কৃপায় দিব্য আছি–
ন্যূনতম বেঁচেই ছিলাম! মরেও গেছি! ন্যূনতম…
ইশরাত তানিয়া
কবিতা
ঘরের দিকে হাঁটা বললে ভুল বলা হয়
ঘর মাটিতে মিশে গেছে। আমফান চলে গেছে খালি পায়ে।
তাহলে কই যাও তুমি শাড়ি লেপ্টে ন্যুব্জ?
মানুষ আসলে কোথায় যায়?
ঋপণ আর্য
কবিতা
সকালকে টের পাচ্ছি
আকাশ এসে থেবড়ে বসবে
তৈরি হওয়া প্রচুর ফাঁকা জায়গায়
নির্মল হালদার
পৃথিবী গ্রহের পুরুলিয়া
পর্ব-২৬
এ শিবানী শিবানী কুথায় যাবি গো? কে লিবেক তর কাঠের বঝা? দিলীপ মাঝির দিকে একবার তাকিয়ে শিবানী চলতেই থাকে। তাকে যেতেই হবে সিরকাবাদের হাট। বঝাটা বিকতেই হবেক। ঘরে টুকুও নুন-তেল নাই। চৈত্রের রোদ চিড়বিড়াতে শুরু করেছে। ঘাম হচ্ছে খুব। মাথায় রোদের তাপ, একটু বেলা হলেই। শিবানীকে হাঁটতেও হবে ১০ কিলোমিটার রাস্তা। তার ঘর থেকে উঠে আসতে হয়েছে পাহাড়ের মাথায় প্রথমে। তারপর অযোধ্যার মাথা থেকে সিরকাবাদ। জঙ্গলে গেলেও হয় না, দেখতে হয় গাছ। চিনতে হয়, কোন্ গাছ পুরনো হয়ে গেছে। কোন্ কোন্ গাছ বুড়ো হয়ে গেছে। তারপর, কাটতে হয় ডাল। সে কাজ করতেও তিনদিন তো লাগেই। আর কাঠের বোঝা বিক্রি হবে একশো কুড়ি টাকায়। লোক এসে তো দর করবে আবার। শিবানীর সঙ্গে তার ন বছরের ছেলে দাপাং। সে কোনভাবেই, তার দিদির কাছে থাকল না। তার ঠাকুমাও বলছিল, যাস না রে ভাই, ঢের ধুর্ চলতে পারবিনাই। হামদের কাছেই থাক। তর মা তর জন্য লিয়ে আসবেক ভাবরা আর লাড্ডু। দাপাং কারো কথাই শোনে না। সে মায়ের সঙ্গে যাবেই। দু-তিন কিলোমিটার নিচের দিকে নামতেই, এক সাইকেল—লোক শিবানীকে বলে, কুথা চললি? উদগে সভেই বন্ধ। কেউ লিবেক নাই তর কাঠ। শিবানী জানতে চায়, কিসকে বন্ধ? সাইকেল—লোক সঠিক বুঝিয়ে বলতে পারে না কিছুই। শিবানীও হাঁটতে থাকে নিচের দিকে। সমতলের দিকে। ছেলেকে দেখে তার মনে হয়, আর পাচ্ছে না। সে কুসুম গাছের তলায় ছেলেকে নিয়ে বসে। ছেলের হাতে দেয় জলের বোতল। নিজেও দু-ঢোক খায়। মনেও খচখচানি, কি হয়েছে বাজারে?
শিবানী হাঁটতে শুরু করে আবার। কিছুটা গিয়েই সে মাথা থেকে নামায় কাঠের বোঝা। ছেলের মুখের ঘাম শাড়ির আঁচলে মুছে দেয়। ছেলের উদ্দেশ্যে বলতে থাকে, তকে বলেছিলি ন ঘরেই থাক। এখন বুজছিস ত বাপ কি কষ্ট কি কষ্ট। দাপাং চুপচাপ থাকে। সে রাস্তার দু’ধারে দেখে, খাদ। গভীর খাদ। ঘন গাছপালা। অনেক অনেক নিচে চরছে গরু। তাদের খুব খুব ছোট লাগছে। রাস্তার ধারে এবার দেখতে পেলো হলুদ ফুল। মায়ের কাছে আবদার করে, ফুল পেড়ে দেবার জন্য। শিবানী বলে, বঝা নামায় লিয়ে তর জন্য ফুল পাড়তে নাই পারব রে। এখন সুকুম থাক, আসবার সময় তকে পেড়ে দিব। দাপাং কি বুঝলো কে জানে। মাকে বলে, মাঈ ভখ লাগছে। হামি কি করব! সঙ্গে ত মুড়ি নাই আনি—বাজারে পৌঁছালে, তাকে চপ কিনে দিব। মাথার উপরে সূর্যদেব খুব হেসে উঠছেন এবার। যা একমাত্র টের পাচ্ছে শিবানী মান্ডি। দাপাং মান্ডি। শিবানীর একবার মনে হল, ছেলেকে কোলে করবে। পরমুহূর্তেই মনে পড়ল তার, মাথার বোঝা ধরবে কে? কেউ তো নেই। এক ঝলক মন খারাপ এসে শিবানীকে ঝাপটা মারে। বাঁদু নদী পার হতেই দুজন সিভিক পুলিশ শিবানীর পথ আটকায়। শিবানী দাঁড়িয়ে পড়ে। দু’জন সিভিক পুলিশ একইসঙ্গে শিবানীকে বলে, তুমরা জান নাই দেশটাতে কি হছে? তুমি যে কাঠ বিকতে যাছ, কে লিবেক? সভেই বন্ধ আছে গো—ঘরকে চলে যাও। শিবানীর অন্তর জ্বলে ওঠে। অথচ কিছুই বলতে পারে না। টুঁ শব্দটিও করে না। ভেতরে ভেতরে রাগ হয় নিজেরই উপর। তাকে আসবার সময় দিলীপ মাঝি তো বারণ করেছিল। সাইকেলবালাও বারণ করেছিল। সে কারো কথা শোনেনি। শিবানী কাঠের বোঝা মাথা থেকে নামিয়ে নদীর বালিতে রাখে। তার মনে হয়, আর চাপাবে না মাথায়। ছেলেকে কোলে নিয়ে ঘরে ফিরবে। শিবানী ভেতরে ভেতরে কেঁদে উঠলো। সে বাঁদু নদীর জল চোখেমুখে নেয়। ছেলের মাথাতে দেয়। বয়ে যাওয়া ক্ষীণ জলের দিকে তাকিয়ে বলে, দাপাং কি কপাল করেচি আমরা তুই নাই বুজবি বাপ আমার।
শিবানীর চোখ আর বাধা মানল না।
১লা জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৭
রাত্রি-৮ টা