মেঘবতী পর্ব ২
মেঘবতী পর্ব ২
তৃতীয় অনুবাক
এই পৃথিবী বস্তুত ধুলার সংসার। সম্যক সরে সরে যায়, তাই ‘সংসার’ নামটি সার্থক। সরে গিয়ে শেষে এই ধুলাই থাকে। মানুষের জীবনের, ইতিহাসের শেষ পরিণাম এই কয়মুঠি ধুলা। মানুষের পায়ে পায়ে আর গবাদি পশুর ক্ষুরে প্রহত হয়ে ধুলা উঠে যায় আকাশে, দিনান্তের আলো আর ঘরে ফেরা পাখির ডানায় লেগে জেগে ওঠে বিষাদগোধূলি। মেঘের ভিতর ধুলা আশ্রয় পেয়ে বৃষ্টির শতধারায় নেমে আসে পৃথিবীর উপরেই আবার। ফলত ধুলা কোথাও যেতে পারে না কোনোদিন পৃথিবী ছেড়ে। চক্রাবর্তনের পৌনপুনিকতায় ধরিত্রীর বুকের উপর থেকে যাওয়া এই অক্ষত ধূলিরাশি অতএব মানুষের ইতিহাসের আদিবস্তু। অন্তিমও।
একদিন এই ধুলাবিল সংসারে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছিল একটি উদ্ধত শৈলশ্রেণি। মধ্য ভারতের কোনো অধুনাবিস্মৃত প্রদেশে। আজ যেখানে ধুলামলিন বিষণ্ণ শহর এক, সেইখানে সেদিন ছিল এক বনপাদপসমাবিষ্ট উত্তুঙ্গ পর্বত। বারোশো বছর আগেকার সেই ইতিহাসধূসর পৃথিবী। জীবন তখনও আজকের মতই রক্তাক্ত ছিল, যদিও মর্ষকাম ছিল না। তথাপি দুঃখের অভিঘাত থেকে মুক্তির দিশা কতিপয় মানুষ অনুসন্ধান করে ফিরছিল। বেছে নিয়েছিল বিচার ও অতন্দ্র তপস্যার পথ। এ পথ তো নতুন নয় এই জম্বুদ্বীপে। সহস্র সহস্র বৎসর ধরে ভারতবর্ষ এই তো খুঁজেছে অনলস।
বারোশো বছর আগেকার সেই পার্বত্যপ্রদেশে সংসারত্যাগী কয়েকজন যোগীপুরুষ আশ্রয় করেছিলেন এর গিরিকন্দরগুলি। জনসংসদ থেকে বিবিক্ত এই বীতরক্ত মানুষেরা চারিদিক নির্জন করে নিয়ে ডুব দিয়েছিলেন স্বচেতনার অতলে। মনের যেসব সংস্কার নিশ্চুপ পাখির মতন ডানা মুড়ে ঘুমিয়ে আছে, তাদের ডানার রঙ, রেখা, রূপ ঘেঁটে তাঁরা মনস্তত্ত্বের অতন্দ্র গবেষণায় ডুবেছিলেন। আর সেইখানে এসে আশ্রয় নিয়েছিল এক যুবক। নাম তার—উত্তিয়।
কবি ছিল উত্তিয়। আর কে না জানে, কবিতা চিরকালই শোকসেতু। যেসব কবিতা মানুষকে অসঙ্গ-আনন্দের দিকে নিয়ে যায়, তারা মন্ত্র; ধ্যানের কোঠায় তাদের আগম। আর যেসব কবিতা অস্তিত্বের অপারসম্ভব দুঃখের দিকে, অমোঘ শোকাবহতার অঙ্কুরের দিকে নিয়ে চলে, তাদের বলে শ্লোক। উত্তিয় মন্ত্র লিখতে চায়নি, শ্লোক লিখতে চেয়েছিল। পাখিদের বিরহতাপ থেকে অনুপ্রাণনা পেয়ে আদিকবি রত্নাকর সেই যে লিখেছিলেন প্রথম মহাকাব্য, সেই থেকে অনুভবী কবিরা সহমর্মী হয়ে উঠলেন দুঃখের। উত্তিয়ও খোঁজ পেয়েছিল দুঃখনিকেতনের। দুঃখপাখিকে বুকে তুলে নিয়ে, ডানায় আঙুল বুলিয়ে, মুখে মুখ রেখে আদর করে উত্তিয় আয়ত্ত করেছিল অশ্রুর অক্ষর। কিন্তু পার্থিব দুঃখ নিয়ে পুড়তে পুড়তে উত্তিয়র সঙ্গে অন্য একপ্রকার দুঃখের দেখা হল।
সে বড় হা-হা করা পরিতাপ। সে-দুঃখ যে জানে না, যে দেখেনি সেই দুঃখের আঁধার-উজল পিঙ্গল মূর্তি, তাকে একথা বোঝানো সুসাধ্য হবে না। উত্তিয়র দুঃখ এসেছিল শব্দ থেকে। সে বড়ো পরিতাপের সঙ্গে দেখেছিল, সে যা ভাবে, শব্দে তা কিছুতেই অনুবাদ করা যায় না। শব্দ এত প্রতারক! শব্দ ভাবকে বহন করে না। ভাবকে আড়াল করে। শীতঋতুর দ্বিপ্রহরে উত্তিয় তার পিতা শ্রেষ্ঠী স্যমন্তক-নির্মিত প্রাসাদের নির্জন অলিন্দে পদচারণা করতে করতে অনেক দূরের যূথীনিঃশ্বসিত নির্জন বিষণ্ণ পথটির দিকে তাকিয়ে, ঝরা পাতার অবিরল উন্নিদ্র দীর্ঘশ্বাস শুনতে শুনতে, নদীবাতাসের উতরোল হাহাকারের ভিতর স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে ভাবত, চারিপাশের এই অমিত দৃশ্যাবলীকে কেন সে শব্দে শব্দে ধরে রাখতে পারছে না?
দৃষ্টিগ্রাহ্য সাবয়ব দৃশ্যকেই যেখানে শব্দ-তর্জমা করা যায় না, মনের নিরবয়ব চিন্তাগুলিকে, অনুভূতিসমূহকে আর কী উপায়ে অবিকল লিখে ফেলা যাবে? মানুষ আর মানুষের মাঝখানে এই শব্দের অনিবার্য দেওয়াল; অগণ্য জোনাকির অস্থির ঈক্ষণের মতো, নিষ্ঠুর উজ্জ্বল প্রবালপুঞ্জের মতো, দন্তুর রাক্ষসের উচ্চকিত অট্টহাস্যের মতো এই বাধার প্রাচীর নির্মম জেগে আছে। একে অতিক্রম করা যায় না। কাউকে যে বোঝানো যায় না মনের কথা! পৌঁছে দেওয়া যায় না প্রেমের দীপ্তি, দুঃখের কষাস্বাদ, মনখারাপের ঘোমটা-দেওয়া আলো! শব্দরা সশস্ত্র প্রহরীর মতো ব্যক্তি আর ব্যক্তির মধ্যে দাঁড়িয়ে থেকে শাসন করে—মানুষের একাকীত্ব ঘোচে না। মনকে অন্য মানুষের সঙ্গে, অন্য মানুষীর সঙ্গে ভাগ করে নিতেই চায় মানুষ, তথাপি শব্দরা নিষ্ঠুর নিয়তির মতো অত্যাচারী। এ সমস্যা কি কেবল উত্তিয়র, নাকি অন্য কবিরাও এমনই শব্দপীড়িত?—সেই কথা বুঝবার জন্য সে একদিন দেখা করল বয়োজ্যেষ্ঠা এক কথাকোবিদ কবি অনঙ্গসেনার সঙ্গে।
অনঙ্গসেনা একজন রূপোপজীবিনী জনপদবধূ। সেযুগে বারবণিতারাই সব থেকে শিক্ষিতা ছিলেন। কামকলা সহ চতুঃষষ্ঠীকলাতেই তাঁরা পারঙ্গমা। কাব্যকলা এই চতুঃষষ্ঠীকলার অন্যতম। অনঙ্গসেনার কক্ষেই কবিরা নিয়মিত সমবেত হতেন। বিদূষী অনঙ্গসেনার প্রতিভার দীপ্তি প্রতিফলিত হত মধুলোভী কবিদের কাব্যরচনায়। অনঙ্গসেনার নিজের লেখা পদগুলি শুধু ঘুরে বেড়াতো নগরীর বাতাসে, অলিতে-গলিতে। তাঁর রচনার শেষে কোনো পরিচয়-উল্লেখী ভণিতা থাকত না। ফলত, প্রায়শই সেসব পদ মিশে গিয়েছে প্রথিতযশ কবিদের কবিতার প্রাচীন তনুরুচিতে, আজও আমরা সেসব পড়ে মুগ্ধ হই; শুধু জানি না অনঙ্গসেনাই ছিলেন তাদের ধাত্রী, তাদের রচয়িত্রী।
এর আগে উত্তিয় বহুবার অনঙ্গসেনার কাব্যসভায় গিয়েছে। দেখেছে মীনকেতু, পিঙ্গলকেশ, হরিভদ্র, সালোক্যসম্ভূতির মতো সেকালের বিশিষ্ট কবিদের। পর্যঙ্কের উপর অনঙ্গসেনা চরণপল্লব প্রসারিত করে বসে রয়েছেন, মধ্যে মধ্যে বীণার তারে চম্পক-অঙ্গুলি বুলিয়ে অকস্মাৎ সুরমূর্চ্ছনায় ঘরের আকাশ ভরিয়ে তুলছেন। অনঙ্গসেনা এখনও প্রগাঢ়যৌবনা, শুধু কপালের পাশে দুয়েকটি রুপার তার সদ্য দেখা দিয়েছে। ভালদেশ থেকে সেই প্রতিভাভাস্বর রজতকুন্তল্গুচ্ছ কানের পাশে সরিয়ে শানিতমধুর কণ্ঠস্বরে তিনি কথা বলছেন। তাঁকে ঘিরে কবিরা বসেছেন স্ব স্ব আসনে। সমস্ত কক্ষটি ঘৃতদীপের আলোতে, অনঙ্গসেনার মরকতনীল ক্ষৌমবস্ত্র আর কেয়ূরকঙ্কনের দীপ্তিতে, বীণার সুরঝংকারে, পানপাত্রে পাত্রে আসব পরিবেশনের শব্দে, সুবর্ণদ্বীপ হতে আনীত তাম্রকূটের সুগন্ধে ও প্রেক্ষাবাণদিগের বুদ্ধিদীপিত উচ্চারণে ইন্দ্রসভার মতো হয়েছে। শুধু ইন্দ্র এ সভার রাজা নন, অনঙ্গসেনাই এ সভার রাজেন্দ্রাণী। সেই কবিসভার একপাশে উত্তিয় পাথরের মূর্তির মতো বসে থেকেছে প্রতিদিন, কথা বলার সাহস হয়নি।
এক রাত্রে কাব্যালোচনা শিথিল ও রজনীর প্রদীপশিখা মলিন হয়ে এলে কবিরা একে একে বিদায় নিচ্ছিলেন। অনঙ্গসেনা দ্বারপথ অবধি অনুব্রজন করে আলিঙ্গনদানে তৃপ্ত করে প্রত্যেককে বিদায় জানাচ্ছিলেন; অবশেষে কক্ষটি জনশূন্য হয়ে এল। উত্তিয় তখনও যে বৃহৎ কক্ষের এক পাশে বসে আছে, অনঙ্গসেনা তা লক্ষ করেননি। শিথিল কবরীটিকে পুনরায় স্বস্থানে গ্রন্থিবদ্ধ করে দর্পণে নিজের মুখ দেখতে দেখতে অনঙ্গসেনা রাত্রিজাগরণজনিত ক্লান্তিলাক্ষণিক জৃম্ভন তুললেন, আর তখনই একধারে উত্তিয়র উপস্থিতি তাঁর চোখে পড়ল। হাই তোলা অর্ধপথে স্থগিত এবং মুখের কাছে চর্চিত করতলটি আলগোছে স্তম্ভিত হয়ে রইল।
বিস্ময়াবিষ্ট অনঙ্গসেনা জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কে তুমি, যুবক? তুমি কি আমাকে কিছু বলবে বলে অপেক্ষা করছ?’
—আমার নাম উত্তিয়। শ্রেষ্ঠীপুত্র। আমার কয়েকটি প্রশ্ন ছিল।
—হ্যাঁ, তোমাকে আমি দেখেছি বটে মধ্যে মধ্যে এই কবিসভায়। কখনও কিছু বলতে শুনিনি। তুমি কি তরুণ কোনো পদকর্তা কবি?
—আমি কবি নই। কবিতামুগ্ধ।
—যে কবিতামুগ্ধ, সেই-ই কবি, উত্তিয়। হৃদয়ে কবি বসবাস না করলে, কবিতামুগ্ধতা আসে না। সেই মুগ্ধতা থেকে কেউ লেখে, কেউ শোনে। তুমি কি কিছু লিখেছ, যুবক?
—লিখেছি। কিন্তু তাতে অতৃপ্তির আগুন আমার হৃদয়ে ক্রমাগত জ্বলে উঠেছে। আমি কবি, কিন্তু শব্দপীড়িত।
—অতৃপ্তিই তো কবির জীবনীশক্তি, উত্তিয়। অতৃপ্তির অবসানে কবির মৃত্যু হয়। তোমার কথা শুনে তোমার প্রতি আমার আগ্রহ বেড়ে উঠল। রাত ভোর হয়ে আসছে। কাছে এসো। শোনাও তো তোমার কবিতা! সঙ্গে কিছু আছে নিশ্চয়?
—না, সঙ্গে কিছু নেই। কবিতা আমাকে দীর্ঘকাল ছেড়ে গেছে।
—ছেড়ে যাবে কোথায়, উত্তিয়? ফিরে আসবে ঠিকই একদিন। তুমি তাকে অধিকার করতে চেয়েছ। তাই সে পালিয়েছে। কবিতা চিরস্বৈরিণী পলাতকা। কী যেন পীড়ার কথা বলছিলে?
—শব্দপীড়া।
প্রদীপের স্তিমিতালোকে অনঙ্গসেনা দেখলেন এই সুন্দর মুখশ্রীর যুবকের চোখদুটি অশ্রুভারে টলমল করছে। সবেমাত্র কৈশোর পেরিয়েছে মনে হয়। ঠোঁটের নীচে অবুঝ অভিমান জমে আছে। জীবন সম্পর্কে একেবারে অনভিজ্ঞ এই প্রায়কিশোর কবি। অনঙ্গসেনার বড়ো মায়া হল তাকে দেখে। শব্দের উপর এমন অভিমান?
অনঙ্গসেনা তাকে কাছে এনে বসালেন। যুবকের শিরোদেশে কঙ্কনরণন তুলে মমতাভরা হাত রেখে বললেন, ‘শব্দপীড়া? সে কেমন? বলো সে-পীড়ার স্বরূপ।’
উত্তিয়র ঠোঁটদুটি থরথর করে কাঁপছে। তবু কিছুক্ষণের মধ্যে সে নিজেকে সংযত করে নিয়ে বলল, ‘শব্দ আর চিন্তা। যে-চিন্তা, যে-ভাব মনে ওঠে, লিখে ফেলবার পর মনে হয় শব্দরা সেই চিন্তাকে ঠিক ঠিক ফুটিয়ে তুলতে পারেনি। শব্দরা বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। শব্দ আর চিন্তা—এ দুয়ের মধ্যে দুস্তর ব্যবধান রয়ে গেছে। আবার লিখি…আবার লিখি…ছিঁড়ে ফেলি…তবু ধরা দেয় না। এমন কি সবারই হয়? সব কবিরই? আপনারও এমন হয়?’
—হয়, উত্তিয়। সবারই হয়। এই পীড়া সবাই অনুভব করে। শব্দজ্বর। কিন্তু তোমার মতো এত অসহ্য অনুভব তো আমি কাউকে অনুভব করতে দেখিনি! শব্দের তঞ্চকতা সহ্য করতে পারছ না কেন? লিখবার পর কাউকে কি কবিতা পড়ে শোনাও তুমি?
—হ্যাঁ, আত্রেয়ীকে।
—আত্রেয়ী? কে সে? তোমার বান্ধবী?
—আমার বাল্যসঙ্গিনী। শ্রেষ্ঠী শিতিকণ্ঠের কন্যা। আমরা একসঙ্গে বড়ো হয়ে উঠেছি।
—কী বলে আত্রেয়ী তোমার কবিতা শুনে?
—তার মুগ্ধতা সে জানায়। কখনও দ্বিমত পোষণ করে আমার সঙ্গে। কখনও তীক্ষ্ণ সমালোচনাও করে।
—সেই তো স্বাস্থ্যকর আলোচনা। তবে তো তোমার কবিতার একজন শ্রোত্রী তুমি পেয়েছ। অতৃপ্তি কীসের?
—অতৃপ্তি এইখানে যে, আমি আমার লেখার যেসব স্থানে অভিনবতার প্রদীপ জ্বেলে রেখেছি, আত্রেয়ী সেখানে চুপ করে থাকে। আর যেখানে শব্দের অন্ধকার, সেইখানেই তার মুখ উৎসাহে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। তাহলে আমি তাকে স্পর্শ করতে পারছি কই? আমার কবিতা তাকে বিদ্ধ করছে কোথায়? আমার চিন্তা তার মনে পরিবাহিত হল না তো তাহলে?
—আত্রেয়ীর হৃদয় বিদ্ধ করাই বুঝি তোমার কবিতার উদ্দেশ্য, যুবক?
—না, না। শুধু আত্রেয়ী নয়। শুধু কবিতাও নয়। যে-কোনো মানুষ, যে-কোনো কথা। যে-বাক্প্রতিমার মধ্য দিয়ে অন্য মানুষের কাছে আমরা আমাদের চিন্তাকে পৌঁছে দিতে চাই, সেই বাক্প্রতিমা…সেই সব শব্দ কখনই আমাদের ভাবের পর্যাপ্ত অনুবাদ নয়। তাহলে তো আমরা সবাই বিচ্ছিন্ন, যোগাযোগহীন। আপন আপন চিন্তার বলয়ে নির্বাসিত। বিচ্ছিন্নতার এই বেদনা আমাকে একেবারে একাকী করে দিচ্ছে দিন দিন। আমি এত একা…এত বেদনার্ত।
—একা বলে যে তুমি বেদনার্ত, তা নয়, উত্তিয়। দ্যাখো না, আমিও তো একাকিনী। কিন্তু বেদনার্ত তো নই!
—আপনি একা? কীভাবে? আপনি তো—
—বহুজনের দ্বারা পরিবৃত, বহুজনের দ্বারা ব্যবহৃত, বহুজনে লিপ্ত—এই কথাই তো বলতে চাইছ তুমি? কিন্তু, উত্তিয়, মধুপান সারা হলে মধুপেরা তো উড়ে যায়, ফুল তো একা থেকে যায় তার গন্ধমধুর অন্ধকারের ভিতর। কিন্তু সেই একাকীত্ব আমার দুঃখের কারণ হয়নি। একাকীত্ব কারও দুঃখের কারণ নয়। তুমি একা বলে দুঃখিত—তা নয়। তুমি খণ্ডিত বলেই দুঃখিত। সেকথা থাক। তোমার দুঃখ আরম্ভ হয়েছে একটি ভুল ভাবনা থেকে।
—ভুল? কী ভুল?
—তুমি কী বললে? শব্দ আর চিন্তা—এই দিয়ে তুমি কথা শুরু করোনি?
—করেছি। তাতে ভুল কী?
—আগাগোড়াই যে ভুল! শব্দ আর চিন্তা—দুটি আলাদা পদার্থ নয়, উত্তিয়। নয় শব্দ ভাবের বাহক। নয় তার অবরোধক।
—তবে শব্দ কী?
—শব্দই ভাব। শব্দই চিন্তা। ভাবই শব্দ। শব্দ আর ভাবের মধ্যে কোনো দ্বৈততা নেই। ওদের আলাদা করা যায় না, কেননা ওরা আলাদা নয়। পড়নি কি মহাকবি কী লিখেছেন? বাগর্থাবিবসংপৃক্তৌ? পড়নি রঘুবংশ? পার্বতী-পরমেশ্বরের মতোই শব্দ আর ভাব যে অপৃথগ্সম্ভব!
—তাহলে পণ্ডিতেরা যে বলেন ভাষা ভাবের বাহন, ভাষা ভাবের নির্মোক! সেকথা কেন বলেন তাহলে?
—ভাব কি বারাণসীর বণিক, আর ভাষা তার ভারবাহী গর্দভ, শ্রেষ্ঠীকুমার? নাকি ভাব একটি সর্প, আর ভাষা তার খোলস? এই যে ভাব আর ভাষার পার্থক্য, এই ভেদবুদ্ধিটি পণ্ডিত অধ্যাপকদের মাথার খুলির অন্ধকারে ছাড়া আর কোথাও বস্তুত নেই। তোমার চোখ দেখে মনে হচ্ছে, তুমি তর্ক করবে! বলো, শুনি।
তন্দ্রার আবেশ অনঙ্গসেনার শরীর থেকে যেন সরে গেছে। তিনি সোৎসাহে গালে হাত রেখে উত্তিয়র দিকে ঝুঁকে বসলেন। তাঁর চোখ থেকে বুদ্ধির আলো ঝিকিয়ে উঠছে। উত্তিয়রও প্রাথমিক জড়তা কেটে গেছে এই মেধাবিনী নারীর সাহচর্যে। অনঙ্গসেনার শারীরিক রূপের থেকেও তাঁর ব্যক্তিত্ব, তাঁর শানিত মেধার দীপ্তি উত্তিয়কে আকৃষ্ট করে রেখেছে প্রচুর।
উত্তিয় বলল, ‘হ্যাঁ, তর্ক তো ওঠেই। ভাব আর ভাষা যদি অভেদই হয়, তবে একই বস্তু বোঝাতে সংস্কৃতভাষায় এক শব্দ, প্রাকৃত ভাষায় আরেক শব্দ, যাবনিক ভাষায় আরও অন্য শব্দ, আটবিকদের ভাষায় একেবারে অন্য শব্দ ব্যবহৃত হয় কেন?’
—যদি বলি, ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতিতে লালিত মানুষ ভিন্ন ভিন্ন ভাবের অধিকারী, তাই শব্দও ভিন্ন?
—কিন্তু বস্তুটি তো একই। একটিই তো বস্তু—ধরা যাক, ফুল। সংস্কৃত ভাষায় তা ‘পুষ্প’, প্রাকৃত ভাষায় ‘পুপ্ফ’, আরবদেশাগত যবনদের ভাষায় ‘নুয়ার’, দক্ষিণদেশাগত দ্রাবিড়দের ভাষায় ‘মলর’, অরণ্যবাসী আটবিকদের ভাষায় ‘বহা’, আবার গ্রিক বণিকদের ভাষায় ‘আনথস’। ভাব আর ভাষা যদি অভিন্নই হত, তাহলে একই ভাবোদ্দীপনায় ভিন্ন ভিন্ন শব্দপ্রতীক কেন?
—ফুল বস্তুটি আর ফুলের ভাব কি এক, উত্তিয়? এক এক সংস্কৃতিতে ফুলের ভাব এক এক প্রকৃতির। আর ভিন্ন ভিন্ন ভাব হওয়ায়, শব্দও ভিন্ন ভিন্ন। আমি তো ভাব আর ভাষার একাত্মতার কথা বলেছি, উত্তিয়! বস্তু আর ভাবের একাত্মতার কথা তো বলিনি।
—বস্তু তাহলে কী?
—বস্তু অজ্ঞেয়, উত্তিয়। বস্তুকে জানা যাবে না।
—জানা যাবে না?
—না। ভাবনিরপেক্ষভাবে ‘বস্তু’ বলে যদি কিছু থাকেও, তা হবে আমাদের চিন্তার অতীত। যা চিন্তার অতীত, তাকে জানব কীভাবে?
—থাক, এ কথা। বড়ো কঠিন। তার আগে প্রশ্ন উঠছে, একই ভাষাগোষ্ঠীর ভিতর একই ভাব বোঝাতে সেই জনগোষ্ঠীর সমস্ত সদস্য একই শব্দপ্রতীক ব্যবহার করে কেন? কোথাও কি কোনো সভা ডেকে তারা স্থির করেছে যে, এসো, আজ থেকে আমরা সবাই ফুলকে ‘মলর’ বলে ডাকি?
অনঙ্গসেনা হাসতে লাগলেন। তারপর বললেন, ‘একই জনগোষ্ঠীর মানুষেরা ভাবগত দিক দিয়ে অধিক সমীপবর্তী, অতি-সন্নিহিত বলেই একই শব্দ তারা ব্যবহার করে।’
—বেশ। আবার অন্যদিকে একই ভাষায় একই ভাবের বহু সমার্থক শব্দ থাকে কেন তবে? ‘পুষ্প’, ‘কুসুম’, ‘প্রসূন’, ‘সুমন’—একটি বস্তুকে বোঝাতে এতগুলো শব্দ কেন? ভাব আর শব্দ অভিন্ন হলে একই ভাব বোঝাতে তো একটাই শব্দ ব্যবহৃত হত! নয় কি?
—‘পুষ্প’ শব্দ উচ্চারিত হলে যে-ভাব মনে ওঠে, ‘কুসুম’ বলতেও কি ঠিক একই ভাব তোমার মনে ওঠে, উত্তিয়? একটু কি পালটে যায় না? ‘পুষ্প’ বললে যেন বিকাশের ছবি মনে আসে। ‘কুসুম’ বললে যেন নিভৃতে গোপনে ফুটে ওঠার ভাব। অর্থ কি একান্তই এক? ভাব ভিন্ন, তাই শব্দও ভিন্ন।
—শব্দ তাহলে ভাবের দেহ?
—না, শব্দ ভাবের আত্মা। শব্দই ভাব, ভাবই শব্দ।
—তাহলে আমার এত যন্ত্রণার কারণ কী?
—মনের ভেতর যে-ভাব উঠছে, তার কাছে ঠিকমতো পৌঁছুতে পারছ না বলেই ঠিক শব্দ খুঁজে পাচ্ছ না। সঠিক শব্দের স্থানে ভুল শব্দ বসাচ্ছ, তাই শান্তি পাচ্ছ না।
—সঠিক শব্দ বসালেই কি অন্যরা আমার ভাব বুঝবে?
—সঠিক শব্দ তো উচ্চারিত শব্দ নয়, স্থাপন করবে কীভাবে? উচ্চারণের অতীত প্রদেশে যে-নীরবতা আছে, সেই নীরবতার ভাষাই মানুষের সঙ্গে মানুষের সার্থক সংযোগসূত্র।
—শব্দ আর ভাব—দুটি ভিন্ন পদার্থ বলে আমার মনে হল কেন?
—মন চঞ্চল বলেই এ দুইকে তোমার আলাদা মনে হচ্ছে। তুমি একা কেন? বেশিরভাগ মানুষের তাই হয়।
এই বলে অনঙ্গসেনা কোলের বীণাটির তারে আঙুল ছুঁইয়ে সুর তুললেন। কয়েক মুহূর্ত শুধু সুরের মূর্ছনায় ঘর ভরে উঠল। হঠাৎ বীণাবাদন বন্ধ করে অনঙ্গসেনা বললেন, ‘এই যে সুর…তুমি কি মনে করো এই সুরের পেছনে ভাব কোথাও একটা দাঁড়িয়ে রয়েছে? আর সুর সেই পশ্চাদবর্তী ভাবকে ধরে এনে প্রকাশ করছে? তারা দুই আলাদা? তা নয়! সুরটিই সেই ভাব। ভাবটিই সুর। সুর আর ভাব একই। তেমনই শব্দ আর ভাবও অভিন্ন। আলাদা নয়।’
—আমি বুঝতে পারছি না। আমার কষ্ট আরও বেড়ে গেল আপনার সঙ্গে কথা বলে।
—মনকে শান্ত করো, উত্তিয়। এককেন্দ্রিত করো। আমি যা বলছি, তুমি তা বুঝতে পারবে।
কোথায় যেন ভোরের পাখিরা সহসা ডেকে উঠল। বাতায়নপথে আলো ফুটে উঠছে। বাইরের আকাশটা যেন বিনিদ্র মানুষের চোখের পাতার মতন আরক্তিম। ওই আকাশ, ওই বৃক্ষলতা, নদী, ওই সদ্যোজাগ্রত জীবকুল—ওরা সবাই ভাব। অর্থাৎ শব্দ। এই সব শব্দময়। শব্দনির্মিত। শব্দই।
ওরা আসলে কী, তা কোনোদিন জানা যাবে না। অজ্ঞেয়।
উত্তিয় উঠে দাঁড়িয়ে অনঙ্গসেনার নিকট হতে বিদায় নিল। অনঙ্গসেনা শুধু তাঁর দক্ষিণ কর উত্তিয়র শিরোদেশে রাখলেন। সেই স্ফুটমান ভোরের আলোয় উত্তিয় পায়ে পায়ে পেছনে ফেলে এল একটি নির্জন ঘর আর সরস্বতীর মতন প্রজ্ঞাপরমা এক নারী।
চতুর্থ অনুবাক
অনঙ্গসেনার ঘর থেকে ফিরে উত্তিয়র মনে অশান্তি আরও দিনে দিনে প্রবর্ধিত হতে লাগল। সমর্থ শব্দকে সে খুঁজে পাচ্ছে না—এই নিদারুণ সত্য তার হৃদয়কে বিদীর্ণ করে দিচ্ছিল। কবিতার শব্দ, কথনের শব্দ; সমস্ত শব্দই এত দুর্বল! আত্রেয়ীর প্রতি তার যে অনুভূতি, কীভাবে তাকে সে প্রকাশ করবে? অনুরাগ, প্রেম, প্রণয়, বন্ধুত্ব, সাহচর্য, মুগ্ধতা—কোন শব্দ সঠিক এ ভাব-প্রকাশে? একটি একটি শব্দ সে একেক মুহূর্তে পরীক্ষা করছিল আর পরমুহূর্তেই অসন্তুষ্ট হয়ে মাথা নেড়ে সে সেই শব্দটিকে খারিজ করে দিচ্ছিল। কোনো শব্দই আত্রেয়ীর প্রতি তার অনুভবকে সম্পূর্ণ প্রকাশ করতে পারছে না। পারবে না।
অনঙ্গসেনার কথা অনুযায়ী ভাব আর শব্দ যদি অভিন্নই হয়, তবে তো এই যে সে যথার্থ শব্দ খুঁজে পাচ্ছে না, তার মানে, যথাযথ অনুভূতির কাছে পৌঁছুতেই পারেনি সে আজও। তাহলে আত্রেয়ীর প্রতি তার অনুভবটুকুও আন্তরিক হয়নি। তাতে খাদ রয়ে গেছে। শুধু আত্রেয়ীর প্রতিই নয়, পৃথিবীর সমস্ত মানুষ…কাউকেই সঠিকভাবে ভালোবাসতে পারেনি সে, ঘৃণাও করতে পারেনি সঠিকভাবে। আহা! যদি ঠিক ঠিক ঘৃণাও উত্তিয় করতে পারত কাউকে, শান্তি পেত।
এই খাদমেশানো ভালোবাসা, এই খাদমেশানো ঘৃণা, এই খাদমেশানো জীবন নিয়ে সে কী করবে? সমস্ত শব্দের প্রতি তার বিরক্তিতে ভরে উঠল মন, হোক না যতই তা খাদমেশানো বিরক্তি। কথা-বলা সে প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে। শৈশবেই মাতৃহীন উত্তিয়। শ্রেষ্ঠী স্যমন্তক সার্থবাহ নিয়ে দেশে বিদেশে ঘুরে বেড়ান। পিতার সঙ্গে সারা বছর তার দেখা হয় না। এই সুবৃহৎ প্রাসাদে পরিচারক পরিচারিকারাই তার সেবা করে। তাদের সঙ্গে কথা এমনিতেই সংক্ষেপিত ছিল, এখন একেবারেই শূন্য হয়ে গেল। বন্ধু বয়স্যদের সঙ্গে উত্তিয় আর দেখা করে না। কেউ এসে পড়লে দুয়েক কথায় কথা শেষ হয়ে যায়। আত্রেয়ীর সঙ্গেও আর দেখা হয় না তার।
একা একটা ঘরে দ্বার ও বাতায়নের অর্গল বন্ধ করে অন্ধকারে সে বসে থাকে। সে কি পাগল হয়ে যাচ্ছে? যেকোনো শব্দ, নগরীর কোলাহল, পাখির ডাক কিংবা কলসিতে জল ঢালার শব্দ, সেতারের সুর অথবা গাছের পাতার মৃদুতম মর্মর—সমস্ত শব্দই মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষে আঘাত করে প্রভূত যন্ত্রণা দেয় তাকে। খুব ক্রোধ হয়। নিষাদের তূণ যেন ভাঙা ব্যর্থ সব অকেজো তিরে পরিপূর্ণ। এ দিয়ে কোনো লক্ষ্যভেদ হয় না, হবে না। শুধু রাত্রি গাঢ় হলে একটি প্রদীপ জ্বেলে তার শিখার দিকে তাকিয়ে সে মূর্তির মতন বসে থাকে। ঘরে বাতাস কম বলে শিখাটি অনড়, স্থির। সেইদিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে উত্তিয়র মনে হয়, এই শিখাটিও কি একটি শব্দ নয়? শ্রুতিগ্রাহ্য না হলেও, এ হয়ত দৃষ্টিগ্রাহ্য শব্দ কোনো। চোখ দিয়েও তবে শব্দ শোনা যায়? তারপর প্রদীপের বর্তিকা পুড়ে একধরণের সূক্ষ্ম খড়খড় শব্দ ওঠে—অমনই বিরক্ত হয়ে এক ফুৎকারে প্রদীপ নিভিয়ে অন্ধকারে সে ঠায় জেগে বসে থাকে।
অনঙ্গসেনার সব কথা উত্তিয় বুঝতে পারেনি। কিংবা সেই মুহূর্তে সব বুঝেছিল, পরে অনেক ভুলে গেছে। শুধু দুটি কথা মনের ভিতর দগদগে ঘায়ের মতন জ্বলছে। সেই কথা দুটি সে মনে মনে মোহাবিষ্টের মতন আবৃত্তি করে।
‘মন চঞ্চল বলেই শব্দ আর ভাব—এ দুইকে তোমার আলাদা বলে মনে হচ্ছে।’
‘সঠিক শব্দ তো উচ্চারিত শব্দ নয়, স্থাপন করবে কীভাবে, উত্তিয়? উচ্চারণের অতীত প্রদেশে যে-নীরবতা আছে, সেই নীরবতার ভাষাই মানুষের সঙ্গে মানুষের সার্থক সংযোগসূত্র।’
নীরবতার ভাষা? কে শেখাবে তাকে নীরবতার ভাষা হিরণ্ময়? কে শেখাবে মনকে শান্ত করার কৌশল? বিনিদ্র রজনীর প্রহরে প্রহরে উন্মাদের মতো সে পর্যঙ্ক থেকে উঠে দাঁড়ায়, দেওয়ালে মাথা ঠুকে প্রশ্নের উত্তর খোঁজে। পায় না।
একদিন দ্বিপ্রহরে আত্রেয়ী এসেছিল। অনেকদিন উত্তিয় তার সঙ্গে দেখা করেনি। উত্তিয় কি অসুস্থ? এ প্রাসাদে আত্রেয়ীকে সব পরিচারক পরিচারিকারাই আবাল্য চেনে। ভৃত্য-ভৃতিকাদের মুখে আত্রেয়ী শুনল, উত্তিয় নিয়মিত স্নানাহার করে না, কারও সঙ্গে কথা বলে না, একা চুপে স্বকক্ষে অন্ধকারে বসে থাকে। চিন্তায় উদ্বিগ্ন হয়ে উঠল আত্রেয়ীর মন। দীর্ঘ অলিন্দ দ্রুত পার হয়ে এসে সে উত্তিয়র রুদ্ধদ্বার কক্ষের কবাটে করাঘাত করল। কিছুক্ষণ কোনো শব্দ নেই। তারপর ঘরের ভিতর ক্লান্ত পা-টেনে হেঁটে আসার শব্দ। একটি দীর্ঘশ্বাস। তারপর দ্বার উন্মোচন করে কবাট ধরে দাঁড়াল উত্তিয়।
উত্তিয়! এ কী চেহারা হয়েছে! তাকে আর চেনা যায় না। অযত্নবর্ধিত কেশপাশ, গুম্ফশ্মশ্রু। চোখের কোণে কালি জমেছে। যেন কত বয়স হয়ে গেছে তার! আত্রেয়ী জিজ্ঞাসা করল, ‘কী হয়েছে তোমার উত্তিয়? অসুস্থ হয়েছ, আমাকে সংবাদ দাওনি কেন? এ কী! এই মধ্যাহ্নবেলায় কক্ষের দ্বার-বাতায়ন সমস্ত রুদ্ধ করে বসে আছ যে!’
উত্তিয় কিছু না বলে দ্বারপথ হতে সরে এসে প্রদীপ জ্বালাল। তারপর পর্যঙ্কের উপর গিয়ে বসল। চোখের ইঙ্গিতে আত্রেয়ীকে ভিতরে এসে কাষ্ঠাসনে বসতে বলল।
আত্রেয়ী বসেই আছে বসেই আছে, কোনো কথা নেই। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে আত্রেয়ী বলল, ‘কথা বলবে না আমার সঙ্গে তুমি?’
উত্তিয় দুপাশে মাথা নাড়ল। কথা বলবে না।
আত্রেয়ী আবার বলল, ‘চুপ করে আছ! শরীর অসুস্থ তোমার?’
এবার উত্তিয় শব্দ করল, ‘না।’
—তাহলে মন বিষণ্ণ? যেন কোনো কারণে আহত হয়ে রয়েছ!
—হ্যাঁ। বিষণ্ণ, আহত।
—আহত? কে তোমাকে আঘাত দিল? কে সে, উত্তিয়?
—শব্দ।
আত্রেয়ী বুঝতে পারল না। ভ্রূকুঞ্চিত করে পুনরায় জিজ্ঞাসা করল, ‘কী বললে? শব্দ?’
—হ্যাঁ, শব্দ।
—কোনো একটা শব্দ?
—সব শব্দ। সমস্ত আকার। শব্দের সীমাবদ্ধতা। না, না। আমার সীমাবদ্ধতা। আমারই সীমাবদ্ধতা!
এতক্ষণে উত্তিয় একটু মুখ খুলে নিজের যন্ত্রণা প্রকাশ করছে দেখে আত্রেয়ী এবার আশান্বিত বোধ করল। সমুৎসুক হয়ে কাছে সরে এসে বলল, ‘বলো না আমাকে কী ধরনের সীমাবদ্ধতা তোমাকে কষ্ট দিচ্ছে? নিজের লেখায় সন্তুষ্ট হতে পারোনি? উত্তিয়, উত্তিয়! আমার কথা শুনছ?’
হঠাৎ কী যেন হল উত্তিয়র। তড়িৎগতিতে পর্যঙ্ক থেকে লাফ দিয়ে উঠে আত্রেয়ীর মুখ দুই করতলে সজোরে চেপে ধরল সে। তারপর দুই হাতে আত্রেয়ীর মুখ ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে উত্তেজিত অস্বাভাবিক স্বরে বলতে লাগল, ‘বলো, বলো, তুমিও কি একটা শব্দ? একটি দৃষ্টিগোচর শব্দ? তোমাকে আমি ধরতে পারছি না কেন কিছুতেই? অজ্ঞেয়? তোমাকে জানা যায় না? জানা যাবে না কোনোদিন?’
উত্তিয়র অপ্রকৃতিস্থ আচরণে ভয় পেয়ে গেল আত্রেয়ী। সে চেঁচিয়ে বলে উঠল, ‘কী করছ কী তুমি? ছাড়ো, ছাড়ো আমাকে। ব্যথা পাই।’
একথা বলা মাত্রই হঠাৎ একেবারে শান্ত হয়ে গেল উত্তিয়। আত্রেয়ীকে ছেড়ে পর্যঙ্কের উপর গিয়ে বসল। আত্রেয়ী কাঁদছে।
কিন্তু কাঁদছে না শুধু। কাঁদতে কাঁদতে ভাবছে। এবং সেই ভাবনা পুরুষের যান্ত্রিক যুক্তিনির্ভর ভাবনা নয়। সেই ভাবনা নারীমনের অপরিসীম স্বজ্ঞার আলোকে আলোকিত। কীভাবে মেয়েরা ভাবে, তার রহস্য দেবতারাই জানতে পারেন না, মনুষ্য কোন ছার! কাঁদতে কাঁদতে ফোঁপাতে ফোঁপাতে প্রথম যে-প্রশ্নটি আত্রেয়ী করে বসল, তা শুনে অন্যমনস্ক উত্তিয়ও চমকে উঠল। আত্রেয়ী জিগগেস করল, ‘অনঙ্গসেনার কাছে আবার গিয়েছিলে তুমি?’
উত্তিয় অবাক হয়ে বলল, ‘হ্যাঁ। তা গিয়েছিলাম। কিন্তু তুমি কীভাবে তা জানলে?’
আত্রেয়ী এবার ভীষণ ক্রুদ্ধ হয়ে উঠল। উচ্চৈঃস্বরে সে উত্তর দিল, ‘কীভাবে জানলাম, সেটা গুরুত্ত্বপূর্ণ কথা নয়। কেন গিয়েছিলে তুমি? আমি তো তোমাকে নিষেধ করেছিলাম। ওই একটা বুড়ি বেশ্যা কুহকিনী নগরীর সব কটা উর্বর মস্তিষ্ককে চিবিয়ে চিবিয়ে খাচ্ছে…’
উত্তেজিত স্বরে উত্তিয় বলল, ‘চুপ! আর একটাও কুকথা বলবে না তুমি তাঁর সম্পর্কে। তাঁর ব্যক্তিত্ব, মেধা, প্রজ্ঞার কোনো তুলনা নেই।’
আত্রেয়ী আরও কাঁদতে কাঁদতে অশ্রুপরিপ্লুত কণ্ঠে বলতে লাগল, ‘হ্যাঁ, যাও না, যাও, আরও যাও। মাথাটা একেবারে তাকে খাইয়ে এসো। থাকো তুমি তোমার কুহকিনীর মায়ায়। আমি চলে যাচ্ছি…’
উঠেই যাচ্ছিল আত্রেয়ী। তথাপি কীভাবে যেন বুঝতে পারল, উঠে যাওয়া এখন ঠিক হবে না তো! অভিমান করে থাকলে চলবে না। তাতে উত্তিয়র সমূহ সর্বনাশ হবে। অথচ অভিমানের অভিনয়টুকুও করে যেতে হবে। কারণ, এই অভিমান দিয়েই যদি উত্তিয়র ব্যথার কেন্দ্রে প্রবেশ করা যায়…
উত্তিয় বলল, ‘কী—? যাবে বলছিলে? গেলে না?’
আত্রেয়ী এবার চোখে জল নিয়ে হেসে ফেলল। ঝাঁঝিয়ে বলে উঠল, ‘না, যাব না, যাব না। কী করবে কী তুমি? এ আমার ঘর। যাওয়া, না-যাওয়া আমার স্বাধীনতা।’
হঠাৎ যেন বিষণ্ণতার মেঘ কেটে গিয়ে একচিলতে লঘু কৌতুকের রৌদ্ররেখা এসে পড়ল উত্তিয়র মুখে। সে হাসতে হাসতে উঠে দাঁড়িয়ে চকিতে আত্রেয়ীর কাছে সরে এসে গভীরভাবে চুম্বন করল আত্রেয়ীকে।
কিছুক্ষণ আর কোনো কথা নেই। চুম্বনের তন্নিষ্ঠ শব্দ উঠতেই কিন্তু আত্রেয়ীকে ছেড়ে একপাশে সরে গেল উত্তিয়। তারপর প্রায় অস্ফুট শব্দে বলল, ‘খুব ব্যথা পেয়েছিলে?’
—নাহ্। ও কিছু না। এখন স্থির হয়ে বসে বলো তো তুমি, শব্দ তোমাকে কী পীড়া দিয়েছিল?
—থাক। তেমন কিছু নয়।
—ও, যেকথা তুমি অনঙ্গসেনাকে বলতে পারলে, আমাকে সেকথা বলতে পারবে কেন? আমি তো আর কবি নই। অনঙ্গসেনার মতো শব্দরহস্য-অভিজ্ঞা নই।
—তা কেন? তুমিই তো আমার সব কবিতার প্রথম পাঠিকা, আত্রেয়ী। সমস্যা হচ্ছে, শব্দরা বড়ো তঞ্চক। ওদের আমি আর বুঝতে পারছি না। আমার মন অস্থির। কেমন করে মনকে শান্ত বৃত্তিশূন্য করা যায়, তুমি জানো?
—বৃত্তিশূন্য? মানে মনে কোনো চিন্তাই উঠবে না? সেটা কি খুব প্রার্থিত অবস্থা তোমার পক্ষে, উত্তিয়?
—কেন নয়?
—কী লাভ হবে? কিছু ভাবতে পারবে না। কিছু লিখতে পারবে না তখন।
—কী হবে লিখে? কী হবে ভেবে?
—বেশ। লিখলেও না। ভাবলেও না। তা সেই বৃত্তিশূন্য অবস্থায় পৌঁছে তোমার কোন মহার্ঘ লাভটা হবে শুনি।
—নীরবতার ভাষা তুমি জানো? নীরবতার ভাষা জানতে পারব আমি তখন সেই অবস্থায়।
—নীরবতার ভাষা! ঠিক যেন সোনার পাথরবাটি!!
—সোনার পাথরবাটি নয়, আত্রেয়ী। কোনো কোনো নির্মেঘ রাত্রির আকাশ সেই ভাষায় কথা বলে। কথা বলে দূর আকাশের তারা। বনফুলের সুগন্ধ ওই ভাষা জানে। ওই ভাষাটা আমরা ভুলে গেছি বলেই আমরা কেউ আর কাউকে বুঝতে পারছি না। তোমাকেও বুঝতে পারছি না আমি। তুমিও বুঝতে পারছ না আমাকে। একাত্ম হতে পারছি না।
আবার অভিমান গাঢ় হয়ে আসছে, ভিজে আসছে চোখ মেয়েটির। কেন যে তাকে কেউ বুঝতে পারে না! শুষ্ক কণ্ঠে সে বলল, ‘কী করবে ভাবছ?’
—জানি না। ভাবছি, চলে যাব।
—কো-কোথায়?
—জানি না। যদি কেউ বলতে পারে নীরবতার ভাষার কথা। যদি শেখাতে পারে মনকে বৃত্তিশূন্য করার কৌশল।
—আমাকে ফেলে যেয়ো না। আমিও যাবো তোমার সঙ্গে। সে যেখানেই হোক। আমিও শিখব।
উত্তিয় ম্লান হাসল। কিছুক্ষণ আর কোনো কথা নেই। তারপর নীরবতা ভেঙে আত্রেয়ী বলল, ‘আমি এখন যাবো। এই প্রাসাদ থেকে আমাকে না বলে কোত্থাও যাবে না, উত্তিয়। খুব কষ্ট হলে পরিচারকদের মুখে আমাকে সংবাদ দিও। আমি তকখুনই চলে আসব। এমনিতেই আসব ক-দিন পর। নিদ্রাহার ঠিকমতো কোরো। তাহলেই আবার কবিতা আসবে। আমি আসি।’
চলে গেল আত্রেয়ী। তার গমনপথের দিকে তাকিয়ে রইল উত্তিয়। যেন মনে হল একটি কবিতার শেষ চরণ বেয়ে হেঁটে যাচ্ছে আত্রেয়ী নামে একটি মেয়েশব্দ।
বিকাল হল ধীরে ধীরে। সন্ধ্যা এল। অন্যদিনের মতো অন্ধকারে বসে না থেকে প্রদীপ জ্বালল উত্তিয়। পেটিকা হতে বাহির করল তার পুথিখানি। উৎপীঠিকার উপর পুথি খুলে প্রদীপ উজ্জ্বল করে বসল।
বিগত তিন বৎসর সে কী রচনা করেছে, পড়ছিল। মৃত মক্ষিকার মতো শব্দের রাশি। কতো ভুল শব্দ, কতো ভুল প্রয়োগ! কী লিখতে চেয়েছিল আর কী লিখেছে! পড়তে পড়তে ক্লান্তি এল মনে। পুথিতে বাঁধন দিয়ে পেটিকার ভিতর রেখে দিল পুথিখানা।
পর্যঙ্কে শায়িতাবস্থায় তার মনে হল, আজ আত্রেয়ী এসেছিল। জীবনের যান্ত্রিক পরিক্রমার ভিতর যেন নিয়ম-ভাঙা একটু হাওয়ার ঢেউ। কিছুক্ষণের জন্য সে যেন সুস্থ হয়েছিল আজ মধ্যদিনে।
তা ঠিক। কিন্তু তার সমস্যার কোনো সমাধান তো হল না। শব্দমায়া থেকে বাহির হওয়ার কোনো পথ, শ্রুতিপারের শব্দ…নীরবতার শব্দ…অন্যের সঙ্গে একাত্ম হবার উপায়…মনকে চিন্তাশূন্য করার পথ কে তাকে দেখাবে? কেউ আছে এমন এ পৃথিবীতে?
অনঙ্গসেনা কি জানেন সেই মার্গ? বোধহয় না। কেননা, তিনি তো ব্যগ্র নন সেই পথে হাঁটতে। সত্যিই যদি তিনি তা জানতেন, তাহলে কি এই দীন শব্দের আয়োজন নিয়ে জীবনের বর্ণিল সন্ধ্যায় আসর বসাতেন? হয়তো বৌদ্ধিকভাবে এই তত্ত্ব তিনি জেনেছেন, কিন্তু যথার্থ লোকোত্তর অনুভূতির স্পর্শ পাননি। প্রজ্ঞা আছে তাঁর, কিন্তু সম্বোধি আছে কি? নাহ্, অনঙ্গসেনার কাছে সে আর যাবে না। যে একথা জানে, তাকেই সে খুঁজবে। এইভাবে ভাবতে ভাবতে ঘুমপাখি নেমে এল উত্তিয়র চোখের পাতায়।
একটু ভুল হল তার। খোসা ছাড়িয়ে যে-লোক শাঁসটি খেয়েছে, তার কাছে খোসার আর কোনো মূল্য থাকে না, উত্তিয় ধরে নিয়েছিল।
সেকথা ভুল নয়। কিন্তু শাঁস খাবার পর ছাড়ানো খোসাগুলো নিয়ে কেউ যে খেলাও করতে পারে, একথা উত্তিয় ভেবে দেখেনি। নীরবতার ভাষা আয়ত্ত করে নিয়েও পুনরায় শব্দখেলার আমোদ নিতে পারে যে কেউ কেউ, সেকথা বুঝতে তার তখনও অনেক দেরি…
হয়তো তা বুঝবার জন্য তাকে অপেক্ষা করতে হবে বহুকাল। তার জন্য তাকে উত্তিয় থেকে কশ্চিৎ হতে হবে হয়তো একদিন। কিন্তু সেসব অনেক পরের ব্যাপার।
কয়েকদিন পরেই এক রাত্রে উত্তিয় তার পিতার প্রাসাদ ছেড়ে চলে গেল চিরতরে। আত্রেয়ীকে বলে যাওয়ার কথা তার মনেও পড়ল না।
সে-রাত্রি কোনো বৈশাখী পূর্ণিমার রাত্রি ছিল না। কোনো বিশিষ্ট লগ্ন ফুটে ওঠেনি সে-রাতে আকাশের রাশিচক্রে। ইতিহাসের কোনো ক্রান্তিকাল ছিল না সেটি। ভারতবর্ষের অগণ্য অনিকেত মানুষের গৃহত্যাগের মতই সেও একটি স্বাভাবিক ঘটনা মাত্র ছিল।
নগরীর পথে পথে আলোর মালা দুলছিল নদীর বাতাসে। হট্টে আপণে ভিড় জমছিল ক্রেতা ও আপণিকদের। আলোকমালায় সজ্জিত ছিল নগরীর প্রাসাদগুলি। নগরীরই একটি প্রকোষ্ঠে আত্রেয়ীও হয়তো সেদিন সন্ধ্যায় গা ধুয়ে এসে বীণাযন্ত্রে আলাপ করছিল শুদ্ধ ইমন-কল্যাণ।
রাত্রি গাঢ় হলে নগরীর বিশিষ্ট নাগরিক ও কবিকুল সমবেত হয়েছিলেন নটী অনঙ্গসেনার কক্ষে। সালোক্যসম্ভূতি, পিঙ্গলকেশ, মীনকেতু, ভরদ্বাজ। সেখানে জমে উঠেছিল কাব্যরস ও অলঙ্কারশাস্ত্রের আলোচনা, সঙ্গীতের সুরমূর্ছনা।
বারোশো বছর আগের এক নগরীর স্বল্পালোকিত পথে পথে অন্য রাত্রির মতই সে-রাতেও যূথী ও জাতিপুষ্পের মালা নিয়ে হেঁকে চলেছিল পুষ্পপসারিরা। কয়েকজন মদ্যপ ও প্রায়ান্ধ সারমেয় উল্লাপন ও হাসির হররায় ভরিয়ে তুলেছিল বাতাস অন্য রাত্রির মতই। প্রদীপ জ্বালিয়ে নদীস্রোত বেয়ে ব্যাপারিদের নৌকাগুলি ভেসে আসছিল ঘাটের দিকে ঋজু ও বঙ্কিমরেখায়।
সকলেই ছিল। সকলই ছিল।
শুধু এই চিরাচরিত নাগরিক জীবনের শমীবৃক্ষ থেকে একটি বিবর্ণ পাতা মধ্যযামে নদীর বাতাসে সকলের অজ্ঞাতসারে নিঃশব্দে ঝরে গেল হঠাৎ। কেউ জানল না। হারিয়ে গেল কবিতামুগ্ধ এক প্রায়কিশোর—শব্দনিষাদ, শব্দপীড়িত।
উত্তিয়, না কী যেন নাম তার।